Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

দ্বিতীয় জীবনগুলো

দ্বিতীয় জীবনগুলো
অলঙ্করণ কাব্য কারিম
রাবেয়া রব্বানী


  • Font increase
  • Font Decrease

তৃষা
নিকুঞ্জ ১২
সকাল সাতটা
৮ জুলাই ২০১৯

ভেজা কাপড়ে বারান্দা মোড়ানো। ধোঁয়াগুলো চারপাশে কুয়াশার মতো জমে বসেছে। পাল্লা দিয়ে আমিও সিগারেটটাকে একটা ঠোঁটের মতো নিষ্পেষণ করছি। ফ্রয়েড যখন বলেছেন, “চুমু খাওয়ার মতো কোনো কিছু পাওয়া না গেলেই ধূমপান অপরিহার্য হয়ে উঠে”—তখন হলেও হতে পারে ঠোঁটের উত্তেজনাই এর প্রতি আমার আকর্ষণের কারণ। তবে সকল মন্দেরও কিছু ভালো থাকে, যেমন সকালের সিগারেটটা টানার সময় সারাদিনের একটা রুটিন এঁকে ফেলা যায় আবার অনেক সূক্ষ্ম কিছু নজরে পড়ে। এইতো এখন আমার চোখে পড়ল এক সপ্তাহর টানা বৃষ্টিতে সবকিছুই কেমন উর্বরতা পেয়েছে। গ্রিলের নিচের দেয়ালে মিহি মাদুরের মতো শ্যাওলা জমে আছে। গত রাতে টয়লেটে লাইট জ্বালাতেই দেখি তেলাপোকাগুলো বাচ্চাকাচ্চাগুলো ছুটোছুটি শুরু করেছে। মাসিক হওয়ার দিন পার হয়ে গেছে তিনদিন হয়, এর ওপর রুশোর খণ্ডকালীন কাছে আসা আবার আমাকে কাবু করে নিচ্ছে। এইসব নিয়ে ভাবনাটা অবশ্য কিছুটা পেছানো যেতে পারে, অন্তত সূর্য ওঠা পর্যন্ত।

সূর্য ওঠা পর্যন্ত একটা গড়িমসি ভাব আমি নিতেই পারি। অন্তত আজ রান্না না করে বাইরে থেকে খিচুড়ি কিনে আনতে পারি। দুপুরে সেটে গিয়ে রুশোর স্যাঁতস্যাঁতা সান্নিধ্যে গা পেতে দিতে পারি। এক্ষেত্রেও আমার অনেক যুক্তি আছে। মাত্র চার মাস হয়েছে বিপিন আর আমার বিয়ে হয়েছে। তাকে বোঝার আগেই আবার অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। পনের দিন হয় আমি কি আগের চেয়ে বেশি একা নই? তাছাড়া কাজের খাতিরে রুশোকে এড়ানোর কোনো কায়দা আমার নেই। রুশো ফার্স্ট এসিসটেন্ট ডাইরেক্টর আমি সেকেন্ড। আজ শুটিং না থাকলেও বেক স্টেজের কাজ তো চলছেই। সেট তৈরি হচ্ছে, ক্যারেকটার রিহার্সাল করছে। কিছু বোঝাপড়া আমারও থাকা জরুরি। কিংবা অলস দুপুরে ঘুমুলে মুখে মেদ বাড়ে রাতে ঘুম হয় না কিংবা স্টুডিওতে ঘন ঘন ঢু দিলে হয়তো নোমানুর নোমানের সুনজরে পড়ে আমি তার পরবর্তী বিগ প্রোডাকশনের কাজেও থাকতে পারব। বিপিন নিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত সে আসলেই আমাকে নিয়ে যেতে পারবে কিনা সে বিষয়ে কিছুই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যেহেতু, সেহেতু এতদিনের গড়া ক্যারিয়ারে আমি পানি ঢেলে দিতে পারি না। কিংবা সূর্য ওঠা পর্যন্ত আমি ভিন্ন একটা চরিত্রে অভিনয় করতে পারি। ন্যাকা, কিংকর্তব্যবিমূঢ় নারী, কত পদই তো আছে।

আজ চাইলে শাড়িও পরা যায়। এমন কেউ হয়তো আজ সেটে আসবে যে আমার শাড়ি পরাটা পছন্দ করে তাকাবে। মেলো ড্রামার মেয়েদের মতো আমি যেনতেন আবেগ দেখিয়ে ফেলব না, আমার চলন হবে দ্রুত ও উচ্ছল ও বিক্ষিপ্ত। সিঁদুরটা এত চিকন করে আঁকব যে প্রায় বোঝাই যাবে না। শাঁখাটা না হয় আজ পরব না। মা আর বিপিন কল করলে বলে দিব ব্যস্ত আছি। রুশো যদি আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চায় বা হাতিরঝিল যেতে চায় আমি না না করতে করতে হ্যাঁ বলে ফেলব। এরপর আলো অন্ধকারে ছুটতে থাকা রিকশায় আমার গায়ের ওমে প্রভাবিত হয়ে রুশো যদি বলে ফেলে যে সে আসলেই আমাকে ভালোবাসে আমি অবিশ্বাসের সুর দিব না। বলব না তোমার প্রেম ঋতুকালীন সবজির মতো। ঘুরে ঘুরে আসে আবার চলে যায়। ভাব দেখাব রুশোর প্রেম স্থির ও অবিনশ্বর। তবে গদগদও হওয়া যাবে না। গদগদ ভাবে রুশোর ভয় আছে। এখনো কি সে বোঝেনি আমিও কম যাই না? এই যে নাকের উপর দিয়ে বিয়ে করে ফেললাম। চার মাস দরকার ছাড়া কথাই বললাম না প্রায়। সে নিজে টান দেখালে আমি তার প্রতি কিছুটা টান বোধ করি এই যা। বর্ষাকাল বলেই না রুশোর প্রেম চড়া তাও কি আর আমি বুঝি না? গত কয়েকদিন ধরে সে যেই তালে আমার নিস্পৃহতা ভাঙার পায়তারা করছে তার একটাই অর্থ, তার এখন রোমান্স দরকার। বিপিন? কামলা দিতে দিতে বিপিনের শরীরে তেজ নেই আর মন সেটা আগেই কেউ খেয়ে রেখে দিয়েছে। এই আধ খাওয়া মন আবার নতুন করে গজাতে গজাতে আমি বুড়ি হয়ে যাব নাকি? সূর্য ওঠা পর্যন্ত সেটেলড মেরেজের দোষগুলো নিয়ে বলতে থাকলে একটা মহাকাব্য তো হয়েই যাবে। এইটুকু সময়ের জন্য একজন নিষঙ্গ নারী হিসাবে আমি আমার নিজের জন্য নিজে কিছু ব্যবস্থা করলে পৃথিবীর গতিতে কোনো খুঁত আসবে না। পৃথিবী ঠিকঠাক তার নিজ অক্ষের ওপরই চলবে।

রুশো
বাংলাদেশে ফিল্ম ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশন, তেজগাঁ
সকাল সাড়ে সাতটা
৯ জুলাই ২০১৯

শুটিং ফ্লোরে নাশতার পর চা, চায়ের পর কফি। তারপর বেলা গড়াতেই আবার হালকা নাস্তা, এরপর দুপুরের খাবার আবার সন্ধ্যে হতেই ভারী নাশতা। অনেকেই দেখি বেশি কিছু খেতে পারে না। তবে আমি কিচ্ছু বাদ দিই না। এগুলো হচ্ছে ইনপুট বা নিবেশ। এক্ষেত্রে সকল সেন্স অর্গানকে আমি গুরুত্ব দিই। শব্দের ভোজ, ঘ্রাণের ভোজ, দৃশ্যের ভোজ, স্বাদের ভোজ এইসবের তিল তিল নিবেশ শরীর ও মনের ভেতর প্রক্রিয়া করেই তো কিছু উৎপাদিত হয়। আর আর্ট তো যেনতেন কিছু না। নাটকের দৃশ্যটা পর্দায় শৈল্পিকভাবে নামাতে নানান কিছুতে আমাকে ধ্যান দিতে হয়। সৌন্দর্য বোধ তো লাগেই সাথে লাগে পরিমিতি জ্ঞান, লাগে একটানা খেটে যাওয়ার শক্তি। তাই আমাকে সবকিছু ঠিকঠাক নিতে হয়। তারপর বাইরে দাঁড়িয়ে কসে একটা সিগারেট টান দিতেই সব স্মৃতি আর নতুন নিবেশ মিশিয়ে আগে নিজের মতো করে সারাদিনের শুট করা দৃশ্যগুলো কল্পনা করে নিতে হয়। তা মূল ডিরেক্টররা আসুক কি না-আসুক। প্রথম বিকল্প পরিচালক হিসাবে এই ব্যবস্থাপনায় আমাকে পরিপূর্ণ প্রস্তুত থাকতে হয়। নিবেশ ও প্রকাশের এই প্রক্রিয়ায় আমার তৃষাকে প্রয়োজন হয়। কারণ নিয়মিত ধারে কাছে থাকা আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত নারী উপাদান সে। তার ওপর মাথা ভালো। গায়ের রঙটা যা একটু ময়লা, এটা অবশ্য চোখের জন্য একটা অপূর্ণাঙ্গ নিবেশ। তবে চেহারা আর ফিগার ভালো বলে মাঝেসাজেই এই ব্যাপারটা কেমন করে যেন দাবিয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষার সময় এবং বিশেষ করে যখন শরীর কাউকে ছুঁয়ে থাকার নির্ভার অনুমতি চায় তখন তৃষা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। বলা যায় তৃষা আমার ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো কিংবা গোপন বিশ্বস্ত বন্ধু। নারী পুরুষের এই ধরনের অনুভূতির সত্যতা মানুষ একগামিতা দিয়ে বিচার করে। ওকে একেবারে পেয়ে ফেলার কোনো ইচ্ছে আমার কখনোই হয়নি, অতএব একে প্রেম না বললাম। ওর বিয়ে হয়েছে ভালোই হয়েছে তা না হলে কখন কোন দাবি দাওয়া নিয়ে হাজির হতো বলা যায় না। এই যে বিয়ে করে ফেলল যে কোন দিন চলে যাবে অস্ট্রেলিয়া তাতে আমার আনন্দই হয়। হ্যাঁ, কাছাকাছি থাকে বলে এখনো একটা প্রক্সিমিটি এফেক্ট কাজ করে, যেমন হুটহাট ছুঁতে ইচ্ছে করে, ওর নির্লিপ্ততা আমাকে কষ্ট দেয় সেটাকে আমার অনুরক্তিতে আনা পর্যন্ত আমার সব উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পেতে থাকা জিনিস না পেতে থাকলে, আর পাওয়া যাবে না এই ভাবনা মাঝেমাঝে তৃষাকে একটা বিশাল স্থানে বসিয়ে দেয়। ওকে ছাড়া তখন আমার হা পিত্যেশ আসে। না না, একে ভালোবাসা বলা যায় না কোনো যুক্তিতেই। আমার প্রতি নির্ভরশীল হতে থাকা তৃষাকে যে আমার একদম সহ্য হয় না। লতার মতো একটা ঝুঁকে থাকা মেয়ে মানেই নিবেশ পথকে রুদ্ধ করতে থাকা একজন শত্রু তৈরি করা, যে চাইবে সকল ভোজ শুধু তার কাছ থেকেই হতে হবে। মনোগামী ভোজনকারীর অন্তত আর্ট হয় না।

আবার আসা যাক চোখের ভোজ প্রসঙ্গে। আজ রোদ বেশি বলে ভারী পর্দাটা টানিয়ে দিয়েছে। পর্দাটার দিকে তাকালেই মনে পড়ে রুপা আপার কথা। একটা জুনিয়র আর্টিস্টের বড় বোন, ওর সাথেই আসত রোজ। এই নাটকের আগের নাটকে এই ফ্লোরেই কাজ করতে হয়েছে আমাদের। তখন এই পর্দাটা সরানোর আগেই তার পায়ের শব্দে আমি এখান থেকে পেছনে ফিরে তাকাতাম। রুপা আপার অসাধারণ সৌন্দর্য যেন মহাকাশের কালো শূন্যতা ছাপিয়ে প্রথম সূর্যের আলোর মতো আমার চোখে এসে পড়ত। টানা চোখ, গোলাপি ঠোঁট কালো চুল আর অস্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা, মোনালিসার মতো মৃদুহাসি, উফ। রুপা আপার কাছে যেতেই আমার গলা শুকিয়ে আসত। এটাকে ঘোর বলা যেতে পারে। আমি যখন রুপা আপার রূপের চারপাশে পোকা মাকড়ের মতো ঘুরছি তখন আবার এলো ন্যান্সি। অন্য ফ্লোরে কাজ করে ও, তবে প্রায়ই আমার সাথে গল্প করতে চলে আসত। স্ট্রাগলারদের কৌশল বুঝি আমি, তবে আমার দরকার ছিল নিবেশ। ন্যান্সির হলুদ মসৃণ পা লম্বা করে মেলে রাখত আমার সামনে, সোজা চুলগুলো মুখের ওপর চলে আসত। তখন তৃষাকে কাজ ছাড়া আমার মনেই পড়ত না বিশেষ। স্বার্থপর বললে বলতে পারেন। আমার স্বার্থ হচ্ছে আর্ট। তৃষাকে কোনো একদিন একটা নির্দোষ চুমু খেতে খেতে বুঝিয়ে বলেছিলাম কথাটা। বুঝেছিল হয়তো।

নাটক শেষ হতেই একসাথেই রুপা আপা চোখের আড়াল হয়ে গেল আর ন্যান্সি পেয়ে গেল বিগ বাজেট অফার। একটা মোবাইলে যেচে মেয়েদের সাথে যোগাযোগ আমার আসে না। প্রকৃতি যে ভোজের ব্যবস্থা করবে একজন সত্যিকারের আর্টিস্ট তার ওপরই আস্থা রাখবে। তাই বারবার ঘুরে ফিরে আসে তৃষা।

এখন বর্ষাকাল। মাঝেমাঝেই ঝড়ো হাওয়া আসে। কারেন্ট চলে যায়। সবাই সেটের কালো পর্দা খুলে দরজায় এসে দাঁড়াই। বাতাসে নারকেল গাছ নুয়ে পড়তে চায়। এমন সময় তৃষা ছাড়া আর নারী কই যার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো যাবে?

বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন,তেজগাঁ
সকাল নয়টা
৯ জুলাই ২০১৯

ওই তৃষা এত দেরি করছোছ কেন? নিজেই যদি কল টাইমের পরে আসো তাইলে তুমি কি বালের সেকেন্ড এ ডি হইছো?
দেখতাছো না আমি পাঠাওয়ের বাইকে আসছি। এত জ্যাম! আমি রেগুলার দেরি করি? রুশো, ঝামেলা করবা না সকাল সকাল।
হইছে যা আগে ক্যারেকটার কলশিট কনফার্ম কর, কস্টিউম দেখ, সবাই আইসা বইসা আছি, খালি ম্যাডাম লেট।

চিৎকারে রুশোর গলার রগ ফুলে যাচ্ছে। শুধু তৃষা না আজ প্রোডাকশনের সবার ওপরই ঝড় গেছে। কাজের চাপ থাকলে রুশোর হুঁশ থাকে না। এর মধ্যে আজ সকালেই চলে এসেছেন নোমানুর নোমান। এ নেই সে নেই। কী একটা বাজে অবস্থা।

তৃষা মুখ কালো করে মেকআপ রুমে আর্টিস্টদের কস্টিউম চেক করছে। এই রুমে এসি আছে বলে সিনিয়র আর্টিস্টসহ অনেকে বসে থাকে। একজন বয়স্ক লোক বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন অথচ মেয়ে আর্টিস্টদের শাড়ি পরা বাকি। উনাকে কিভাবে ওঠাতে হবে না বুঝে তৃষা বাইরে যায়।
এই রুশো! রুশো।
কী? তর এখন আবার হইছে কী?
রুশো মুখে রুটির টুকরা নিয়ে কথাটা মনিটর টেবিল থেকেই বলল। কাছে গিয়ে তৃষা দেখল সেখানে নোমানুর নোমানও নাশতা করছেন। রুশোর মুখে খাবার দেখে তৃষার আরো রাগ লাগছে। নিজের খাওয়াটাই বোঝে, কী বিশ্রী স্বার্থপর একটা ছেলে রুশো! সে নোমানুর নোমানের সামনেই বলে ফেলল, কাজ করব কিভাবে দাদা? এই বয়স্ক লোকটা কে মেকআপ রুমে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। মেয়েরা তো চেঞ্জ করবে। ইজি ফিল করতেছে না।
নোমানুর নোমান খাওয়া থামিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, উনি কে জানো না? এই নাটকের নাট্যকার। একসময়ের জনপ্রিয় লেখক আবু রায়হান হায়দার।
তৃষা হা করে বলল, দাদা উনি আবু রায়হান হায়দার? হঠাৎ চিনতে পারিনি। ফেসবুকে আরো একটু কম বয়সী দেখায় না?
রুশো ডিমটা মুখের সামনে ধরে বলল, ফেসবুক হচ্ছে তারার আলো। কোটি কোটি আলোকবর্ষ পরেরটা আমরা দেখতে পাই। হা হা।

হাসি চাপতে গিয়ে নোমানুর নোমানের শরীর কেঁপে উঠল। তিনি নিজেকে সংযত করে বললেন, আস্তে বলো। উনার মেয়ে আছেন সেটের কোথাও। আর উনি ঘুমাচ্ছেন না উনার ন্যাক্রোলেপসি আছে। হঠাৎ হাত পা কলাপস হয়ে যায়।
তৃষা ফিসফিস করে বলল, ফেসবুকে যা রগচটা দাদা। এই আনফ্রেন্ড করছেন, একে ওকে গালাগাল করছেন। আমি উনার ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলাম। কেন জানি আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছিল।
ইন টলারেন্স আছে উনার। বাদ দাও এখন। সবাই সাবধান আজ সকালে উঠেই নাকি তিনি গো ধরেছেন সেটে আসবেন। তার গল্পের কী বারোটা বাজানো হচ্ছে তা দেখবেন। যাই হোক নাশতা তাড়াতাড়ি সেরে ফেল। সিন ওঠাব এখন।

..................

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/06/1565094720140.jpg

সকাল দশটা বাজে। তৃষা তার কাজ তাড়াতাড়ি সেরে একটা রুটি জোর করে গিলে ঠিক সেটের সামনে রেডি হয়ে বসে আছে। কালো পর্দাটা ভালোভাবে টেনে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চাশ জনের বেশি মানুষ ফ্লোরটাতে কিন্তু পিনপতন নীরবতা। নোমানুর নোমানের হাতের সিগারেটের আগুন অন্ধকারে ওঠানামা করছে। আবু রায়হান হায়দার নোমানুর নোমান ও রুশোর সাথে মনিটরের সামনে বসে আছেন। একমাথা কাঁচা পাকা চুল, ভারী চশমা, হাতে একটা লাঠি। নাক বন্ধ হয়ে থাকা বাচ্চাদের মতো তার ঠোঁট দুটো খোলা। যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না এমনভাবে তিনি কিছুক্ষণ সেটের দিকে দেখছেন, কিছুক্ষণ দেখছেন মনিটর স্ক্রিনের দিকে। পজিশন বুঝে নিয়ে মাইকে রুশো বলল, অল কোয়া-ইট। রোল ক্যামেরা। নোমানুর নোমান বললেন, একশন।

সেটে অদিতি ও আরিফ অভিনয় করছে। এসময়ের সেরা জুটি। অভিনয়েও সেরা। একটা দুটা সংলাপ বলার পরই আবু রায়হান হায়দার কী যেন বিড়বিড় করে উঠলেন। রুশো তার মুখের কাছে কান নিয়েও কিছু শুনতে পেল না। কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। রুশো বুঝতে পারল ভদ্রলোকের বাঁ-পাশে প্যারালাইসিস জাতীয় কিছু হয়েছে। তাই জিভ অসাড়। সেট থেকে আসা আলোতে রুশো তার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকাল। আহা! স্যোশাল সাইটে বীরযোদ্ধার মতো শব্দের অস্ত্র নিয়ে তৈরিই থাকেন যিনি সরাসরি কতটা অথর্ব, অসহায়। আবু রায়হান হায়দার তার হাতের লাঠির ওপর সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়ালেন। রুশো তাকে ধরতে গেলেই জড়ানো গলায় বললেন, ছোঁ...বে না...। মেকআপ রুম থেকে তার মেয়ে চলে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে চেষ্টা করল। সমস্যা বুঝে নোমানুর নোমান উঠে বললেন, কাট।

রুশো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কালো পর্দাটা সরিয়ে ফ্লোরের বাইরে এসে দাঁড়াল। পেছনে তৃষাও এলো।
কী হইছে রুশো?
বুড়ার রাগ হইতাছে বুঝস না। কী ছাইপাশ বানাইতাছি আমরা। হা হা হা।
তৃষা বলল, রুশো এভাবে বুড়া বলবা না। আমি কিন্তু আসলেই উনার ফ্যান।
রুশো বলল, তুই তো আমারও ফ্যান।
কইসে?
কইসে কী? চল আজ দুইজনে রন্টির ফ্লাটে যাই।
কেন তুমি আমার লগে মাগনা চার্ম নিবা? ভাবছো বিয়া হইয়া গেছে এখন আর ঝুট ঝামেলা নাই। কইবা আর ফ্লাটে দৌড় দিব?
রাখ তোর বিয়া। এইসব বিয়া ফিয়া ফালতু। আমিও তো বিয়া করমু, তখন তুই যদি আমাকে কোনো ফ্লাটে নিয়ে যাইতে চাস। আমি যামু। হাহা।
রুশো হাসছে।
যদিও রুশোর সাথে আর কোথাও যাওয়ার প্রশ্ন আসে না তবুও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তৃষা নিজেকে যুক্তি দেখাচ্ছে কেন সে রুশোর সাথে যাবে না। তার প্রথম যুক্তি, সে তো রুশোর কাছে কিছুই চায় না তবু সে যে তার প্রেমিকা না ব্যাপারটার গতকাল বিকেলেও একটা প্রকট চুমু খাওয়ার মাঝখানে রুশো বুঝিয়ে দিয়েছে, এই ব্যাপারটা বারবার বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা স্পষ্ট অপমান আছে। দুই, কখন তৃষা রুশোর সাথে রোমান্সে জড়াবে তা রুশোই নির্ধারণ করে। কোনো একজনের সিদ্ধান্তে যখন কোনো সম্পর্কের গতি নির্দিষ্ট হয় তবে তা দাস প্রথার মতো জঘন্য একটা সম্পর্ক।

রুশো তৃষার হাত ধরে ফ্লোরের পিছের চাপা গলিটাতে গিয়ে একটা সিগারেট জ্বালাল এবং তৃষাও ঝটপট নিজের প্যাকেট বের করে তা থেকে আগুন নিল। কয়েক টান দিয়ে তৃষা বলল, যাব না।
রুশো আবার তৃষার কোমরে হাত দিয়ে কাছে টেনে নিতে নিতে বলল, চল না রে রন্টির ফ্লাটে। তৃষা হেসে ফেলে বলল, একটু বেশি বোল্ড হইয়া গেছো মনে হয়। নাকি আর কাউরে পাইতাছো না?
অন্যদের দিয়া তোর কী কাজ? আমি কি তোর জামাইর কথা জিজ্ঞেস করছি?
তৃষা এক এক করে স্তনের দিকে এগিয়ে যাওয়া রুশোর আঙুলগুলো ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, আসলে যাব না এই জন্য যে, তোমার সাথে ফাউ রোমান্স মারানোর বিগার উঠে নাই আমার?
আরে হইছে কি?
তৃষা দ্রুত সিগারেটটা শেষ করে গলিটা থেকে বের হতেই দেখে ফ্লোরের দরজার নোমানুর নোমান দাঁড়িয়ে আছেন। রুশোও বের হয়ে আসে পিছে পিছে। রুশো তার সিগারেটসহ হাতটা পিছে ধরে রেখে জিজ্ঞেস করল, দাদা। শুটিং কি হবে না?
হবে। উনি চলে যাচ্ছেন। আমাকে কিছুটা পছন্দ করেন বলেই অভিনেতা অভিনেত্রীদের ওপর গেছে। হাহা।
তৃষার মনে হলো, লম্বা চউড়া ছাতির নোমানুর নোমানের হাতে বাদামি স্লিম সিগারেটটা ঠিক পর্যাপ্ত না আর তাই বুঝি উনি চেইন স্মোকার হয়ে উঠেছেন।
রুশো বলল, আচ্ছা দাদা এত এরোগ্যান্সি কেন বেডার? স্ট্রোকের রোগী তাই এত তেজ।
নোমানুর নোমান এক মুখ ধোঁয়া আকাশের দিকে উড়িয়ে দিয়ে তার দুই ভ্রুর মাঝখানটা স্পর্শ করে বললেন, প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স নিয়ে কাজ করা লোক এরা। মূল কল্পনা কিন্তু এদেরই। আমরা কাজ করি পরের ধাপে। বেডা ফেডা বলো কিভাবে?
রুশো ‘সরি দাদা’ বলে মুখ নিচু করল।
তৃষা বাঁকা হাসি হেসে ফ্লোরের ভেতরে পা বাড়াল।

আবু রায়হান হায়দার
স্মৃতি মহল, বনানী
সকাল ১০টা
১০ জুলাই ২০১৯

এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে এক কাঁধ আর নিম্নভাগ ঢাকা, মাথায় পপি ফুলের মালা, লালচে কোঁকড়ানো চুল। সোনালি রঙের পেয়ালা থেকে সবসময় কিছু পানরত সোমনাস। হ্যাঁ, সবসময় এভাবেই সোমনাস আসে আমার কাছে। মাঝেমাঝে সাথে থাকে ওর ন্যাতানো ছেলেটা, অই যে মরফিউস না কী ছাই নাম। ব্যাটা যতটুকু সময় থাকে বারান্দায় শরীর এলিয়েই পড়ে থাকে। জিভের অসাড়তা থাকা সত্ত্বেও সোমনাস আমার সব কথা বোঝে। আমি তাকে স্পষ্টভাবে বললাম, সোমনাস, এই সকালেই আমি তোমাকে দেখতে চাইনি। লোপা নাশতার টেবিল থেকে ডাকছে।
এই পৃথিবীতে আমাদের সকল ঋণ পরিশোধ করে যেতে হয় হায়দার, এমনকি ঘুমেরও। তোমার ঘুমের হিসেবটা আমার কাছে আছে। অনেক বাকি আছে, দেখাব?
সোমনাস তার কোমরে জড়ানো কাপড়ের গিট থেকে একটা কাগজ বের করল।
ধুর! এসব দেখতে চাই না এখন।
আমি উঠে দাড়াতেই সোমনাস দৌড়ে এসে আমাকে চেপে ধরেছে। শালার শক্তি কম না। আমাকে কোথায় যেন তলিয়ে নিয়ে যায়। কিছুই মনে থাকে না।

চোখ খুলতেই দেখি লোপা ঝুঁকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সোমনাসের অত্যাচারে শরীর মন হঠাৎ এমন অচেতন হয়ে যায় অনেকদিন ধরেই। তবু লোপা প্রতিবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়! বাবা তো! নিজের অংশটা আসলে কেউই হারাতে চায় না। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোপাকে ধরে উঠে দাঁড়াই। নাশতা করতে হবে।

নাশতায় কীসব ওটস ডিমের সাদা অংশ একবাটি মশলা ছাড়া সবজি। গেলা শেষ হতেই লোপা এক এক করে রাজ্যের ঔষধ আমার মুখে পুরে দেয়। অসহায় গাছের মতো আমি আবার হা করে গিলে নিই।
বাবা চলো তোমার ঘরে যাই।
না...
এখানে বাতাস কম তোমার সাফোকেশন হবে।
খ...ব...র দে...খ...ব।

খবর বেশিক্ষণ দেখা যায় না। কাপুরুষ জনগণ, জঘন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা, শুধু হত্যা, অন্যায় আর তেলবাজী। অযোগ্য লোকে দুনিয়া সয়লাব। রাগে আমার গা জ্বলে যায়। রিমোটটা ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।
লো...পা...
কী হয়েছে বাবা! বলেছিলাম খবর দেখার দরকার নেই। না তুমি দেখবেই আর প্রেশার হাই করে ফেলবে। চলো।
লোপা জোর করে আমাকে আবার শোবার রুমে নিয়ে যায়। সোমনাস কাঁধ থেকে কাপড়টা একটু খুলে রেখেছে। ঠিক ফ্যান বরাবর সে এখন আরাম কেদারায় বসে আছে। বাতাস তার মাথার পপি ফুলের পাপড়ি চুইয়ে আমার নাক ছুঁয়ে যাচ্ছে। সকালেই আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি! আমাকে ঘুমের দিকে এগুতে দেখে সোমনাস তার হিসাবের কাগজে কিছু একটা টুকে রাখতে চাচ্ছে। সে কলম খুঁজে পাচ্ছে না। আমি কোনোরকম নিজেকে জাগ্রত রেখে বললাম, খুন করে ফেলব তোমাকে সোমনাস।
লোপা আবার শোবার রুমে ঢুকে বলল, গোঙাচ্ছো কেন বাবা?
সো...ম...না...স। আমা...কে... ঘু...ম পাড়া...য়।
আবার সোমনাসকে দেখছো? বাবা তোমাকে হাই পাওয়ারের ঘুমের ঔষধ দেয়া হয় তাই তুমি ঘুমাও। গ্রিক মিথোলজির দেবতাদের তো আর খেয়ে কাজ নেই তোমাকে ঘুম পাড়াতে আসবে? এইসব হ্যালুসিনেশন তুমি বোঝো না? সত্যি করে বলো তো বাবা আমি সরে গেলে কি ঔষধ মাঝেমাঝে মুখ থেকে ফেলে দাও?
যা… তু…ই…।
না যাব না। অনেক হয়েছে আজ তুমি সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যাবে আমার সাথে।

মায়ের মতো মুণ্ডহীন গর্দভ হয়েছে। বাকযন্ত্রের অসাড়তা দিয়ে আমাকে বিচার করছে। আমাকে হ্যালুসিনেশন শেখাচ্ছে। লোপা বালিশটা ঠিক করে দিতে দিতে আবার বলল, বাবা অনেক হয়েছে আর পারি না, শান্ত হয়ে ঘুমাও তো।

আহ সে আর পারছে না। এই আমড়া গাছটাকে এই জন্যই এর জামাই আর নিচ্ছে না। আমারটা খেয়ে পড়ে আমাকে নিয়েই আর পারছেন না মা ভগবতী। ইচ্ছে করছে ধাক্কা দিয়ে একে ঘর থেকে বের করে দিই। আমি বিছানার পাশে ফুলদানীটা নিচে ফেলে দিলাম। একটুর জন্য ওর পায়ে লাগেনি। লোপা নাটকিপনা করে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গেছে। যাক। কোলাহল শুনে সোমনাসের রোগা ছেলেটা মরফিউস না কী ছাই নাম, সে বারান্দা থেকে এসে দাঁড়িয়েছে। সোমনাস একে একে পপি ফুলগুলোর পাপড়ি ছাড়াচ্ছে। ফুলস্পিডে ফ্যান ঘুরছে, বাইরে থেকেও কিছু বাতাস এসে তাল দিচ্ছে, তার সাথে উড়ছে পাপড়িগুলো। চোখ বুজে আসছে।

রুশো
মোহাম্মদপুর পি সি কালচার হাউজিং
রাত এগারোটা
১৫ জুলাই ২০১৯

আমি আমার সৎ বাবা ইয়াসের খানের জুতোয় কালি করে দিচ্ছি। আমার আসল মায়ের সাহস নেই কাজ শেষ হবার মাঝখানে আমাকে ভাত খেতে নিয়ে যায়। তিনি পুরনো পর্দা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কালি করা কেমন হচ্ছে সৎ বাবা চশমা ফাঁক দিয়ে তা যাচাই করছেন।

চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করলেও আমি মিষ্টি হাসি দিই। এই বাসায় রাগ দেখানোর ক্ষমতা একমাত্র আমার সৎ বাবার। কেননা আমি এই সংসারে এক পাইও দিই না। আমার কামাই সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। টাকাগুলো আমি ব্যাংকে জমাচ্ছি নিজের ডিরেকশনে একটা ফিল্ম করব এই আশায়। একবেলা যাই খাই বা না খাই রাতে ফ্রিতে শুতে পাই বলে লোকটা সারাদিনের জমানো কাজ করায়। কল ঠিক করায়, মশারির পেরেক লাগায়, টিভির জ্যাক ঠিক করায়, আমার ছুটির দিনে তার ছেলেমেয়ে দুটোকে অংক করায়, বাজার করায়। মাঝে মাঝে কিছু না পেলে এভাবে জুতা পলিস করায়। আমি করে দিই। আমি তো দা মারসান সিনেমার নায়ক মার্ক ওয়াটনি, কত প্রতিকূল অবস্থায় আমি জীবনের গান আমি গেয়েই যাচ্ছি, অক্সিজেনহীন মঙ্গলের বুকে গাছ লাগিয়েছি, পানির ব্যবস্থা করেছি আরো কত প্রতিকূলতা সহ্য করেছি। আর তো কদিন, এই তো উদ্ধারকারী রকেট এলো বলে। আর তো কদিন, আমি এই জীবনের মাধ্যাকর্ষণ পার করে দ্বিতীয় জীবনে চলে যাব।

তৃষা
নিকুঞ্জ ১২
বিকেল চারটা
১৬ জুলাই,২০১৯

শুটিং সেটের কাজ শেষ হতে হতে বৃষ্টিও শেষ। সকল উর্বরতা এখন বেখাপ্পা। সূর্য উঠলে মূল জীবনে ফিরতেই হয়। কত জরুরি বিষয় থাকে মূল জীবনে। এখন বাচ্চা হলে আমার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে ঝামেলা হবে তাই গত পরশু রুবিনার কথা অনুযায়ী এম এম কিট কিনে খেতে হয়েছে। আজ ভোরে হাই কমোডে বসতেই জমাট ভ্রুণটা কিছু বের হয়েছে, রক্তপাত শুরু হতেই হতেই খেয়াল করলাম তেলাপোকার ঔষধও কাজ করেছে। ফ্লোর জুড়ে পড়ে রয়েছে মৃত তেলাপোকার দল। ডেটল, ফিনাইল, মসকিউতো কিলারও সমান তালে ব্যবহার করছি। কোনো খুদে জীবন আর উসকে উঠতে দিব না। এসবের পাশাপাশি রোজই রুশোর প্রতি অনুভূতিটাও হাতড়ে দেখছি। সুসংবাদ এই যে, তাও মৃতপ্রায়।

দু একদিনের মধ্যে মা চলে আসবেন। বিপিনের বাসা থেকেও কয়েকজন আসার কথা। তাই আমি বসে নেই। এখন সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে রেলিংয়ের নিচের দেয়ালের শ্যাওলাগুলো তুলে ফেলছি। সিগারেটটা এই মুহূর্তে একটা ঠোঁটের মতো লাগছে না। ফ্রয়েড ঠিকই বলেছেন, কখনো কখনো সিগারেট কেবল একটি সিগারেটই হয়ে ওঠে।

আবু রায়হান হায়দার
স্মৃতি মহল, বনানী
বিকেল চারটা
১৬ জুলাই ২০১৯

আজ বিকেলে সোমনাস আসেনি বলে পিসিতে বসতে পারলাম। আহ ফেসবুক! এখানে আমি পুরোদমে একজন সক্রিয় মানুষ। এখানে কথা বলতে জিভ লাগে না, ঘুরে বেড়াতে লাঠির ওপর ভর দিতে হয় না। তবে সমস্যা, ছাতার মতো বেড়ে ওঠা পত্রিকা, সম্পাদক আর ক্লীব কবি-লেখক নামক পাতি সেলিব্রেটিদের নিয়ে। এদের একদম সহ্য করতে পারি না। এইতো একটা স্ক্রিনশট রেডি করেছি। পোস্ট করব বলে। একটা পা চাটা, নির্লজ্জ ভণ্ডের মুখোশ খুলব আজ।

আমি পুছি না। এইসব কু তার্কিক পাঠা, সেলিব্রেটি ছাগল, গ্রুপ করা গরু-গাধা, ধর্মান্ধ অশ্বডিম্বের দলকে আমি একদম পুছি না। খুব বেশি সময় তো নেই। সোমনাস আসতে আসতে আগাছাগুলোকে ছেঁটে নিতে হবে। আমার আঙিনা অযোগ্যদের জন্য নয়।

আপনার মতামত লিখুন :

কালোত্তীর্ণ ল্যাতিন সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস

কালোত্তীর্ণ ল্যাতিন সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস
শুভ জন্মদিন, হোর্হে লুইস বোর্হেস

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে। ছিলেন তিনি বহুমাত্রিক একজন লেখক। রচিত ছোটগল্পের জন্য তিনি বেশি বিখ্যাত হলেও, সাহিত্যজীবনে একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনাও লিখেছেন তিনি। অনুবাদক হিসেবেও দেখিয়েছেন অসাধারণ সব কাজ। তাঁর অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গিয়েছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মারিও বার্গাস ইয়োসা, মিশেল ফুকোর মতো তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের। ২৪ আগস্ট এই বহুপ্রজ প্রতিভার ১২০তম জন্মবার্ষিকী।

স্প্যানিশ ভাষার লেখক ছিলেন তিনি। ‘তিনি শুধু স্পেনের লেখক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁর অসাধারণ কাজের জন্য পরিচিত পেয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী। স্প্যানিশ সাহিত্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর অন্যতম সেরা দুটো কাজ ‘ফিকশনস’ ও ‘এল আলেফ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। নাটকীয়তা, রহস্য, দর্শন, কাল্পনিক বিষয়বস্তু ও মিথলজির সম্মিলনে লেখা তাঁর বিভিন্ন ছোটগল্পের সঙ্কলন এই বই দুটো। ‘দার্শনিক সাহিত্য’ ও ‘ফ্যান্টাসি’ ঘরানায় বেশ কিছু চমৎকার কাজ উপহার দিয়েছেন তিনি। অনেকেই মনে করেন, ২০ শতকে ল্যাটিন আমেরিকার ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বা ‘জাদু-বাস্তবতা’র শুরুটা হয়েছিল হোর্হে লুইস বোর্হেসের কাজ দিয়েই। সাহিত্যজীবনের শেষদিকে তাঁর রচিত কবিতাগুলোকে তুলনা করা হয় স্পিনোজা, ক্যামোস ও ভার্জিলের কাজের সাথে।

বোর্হেসের জন্ম ১৮৯৯ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আয়ার্সের এক শহরতলীতে। পরে তিনি তাঁর পরিবারের সাথে চলে আসেন সুইজারল্যান্ডে। ১৯২১ সালে আবার আর্জেন্টিনাতে ফিরে আসার পর তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হতে থাকে সেখানকার বিভিন্ন পরাবাস্তব সাহিত্যভিত্তিক জার্নালে। এরপরে গ্রন্থাগারিক ও পাবলিক লেকচারার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৫৫ সালে ‘জাতীয় পাবলিক লাইব্রেরি’র পরিচালক ও বুয়েনোস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। তবে, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৫৫ বছর বয়সে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান তিনি। তবে, অনেক সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, তাঁর এই ক্রমবর্ধমান অন্ধত্ব কল্পনাশক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবনী সাহিত্য প্রতীক তৈরিতে সাহায্য করেছিল। সারাজীবন ধরে কবিতা লিখলেও অন্ধত্বকে বরণ করে নেওয়ার পর তাঁর কবিতা লেখার স্পৃহা যেন বেড়ে যায়। তখন পুরো সাহিত্যকর্মটিই মনে ধরে রাখতে পারতেন তিনি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634890778.jpg

বোর্হেসের বিখ্যাত ছোটগল্পের সঙ্কলন ‘এল আলেফ’ ◢ 


বিভিন্ন সময়ে লেখা তাঁর ছোটগল্পগুলো তাঁর জীবদ্দশায় সংলিত হয়েছে বিভিন্ন গল্পগ্রন্থে। তাঁর ছোটগল্পের সঙ্কলনের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গার্ডেন অব দ্য ফার্কিং পাথস’ (১৯৪১), আর্টিফিসেস (১৯৪৪), দ্য আলেফ (১৯৪৯), দ্য মেকার (১৯৬০), ল্যাবিরিন্থ (১৯৬২) ‘ব্রডি’স রিপোর্ট’ (১৯৭০), ‘দ্য বুক অব স্যান্ড’ (১৯৭৫) এবং শেক্সপিয়ার’স মেমরি (১৯৮৫)।

বিশ্বব্যাপী বোর্হেসের প্রধান পরিচয় মূলত গল্পকার হিসেবে হলেও গল্পকার বোর্হেসের আত্মপ্রকাশ কিন্তু তিনটি কবিতার বই ‘বুয়েনোস আইরেসের জন্য আকুলতা’ (১৯২১) , ‘সামনের চাঁদ’ (১৯২৫), ‘সান মার্তিন নোটবুক’ (১৯২৯) এবং পাঁচটি প্রবন্ধের বই দিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634957228.jpg

বোর্হেসের নির্বাচিত কবিতাগ্রন্থের প্রচ্ছদ। নিজের অন্যান্য সাহিত্য সত্তার চেয়ে কবি সত্তাকেই বেশি ভালোবাসতেন তিনি ◢ 


মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ বইটিও কবিতার বই: ষড়যন্ত্রকারী । অসাধারণ সব গল্প, প্যারাবোল আর প্রবন্ধ লেখা সত্ত্বেও বোর্হেস নিজেকে প্রথমত এবং প্রধানত কবি হিসেবেই বিবেচনা করেছেন সবসময়। তাঁর গল্পগুলো গল্পের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করার পরেও তা সবসময় কবি মনের গভীরতম বোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত।

বোর্হেস হয়তো এই কারণে তাঁর অন্য সব সত্তার চেয়ে কবি সত্তাকে বেশি গুরুত্বের সাথে দেখতেন। ১৯৭১ সালে বোর্হেস তাই কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই বলছেন যে, “ভবিষ্যতে হয়তো কবিতার জন্যই মানুষ আমাকে মনে রাখবে বা ছুড়ে ফেলে দেবে।” তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন তাঁর কবিতাকে বা কবিসত্তাকে।

একজন উল্লেখযোগ্য অনুবাদকও ছিলেন বোর্হেস। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, পুরাতন ইংরেজি ও পুরাতন নর্স ভাষা থেকে তিনি বই অনুবাদ করতেন স্প্যানিশ ভাষায়। বুয়েনোস আয়ার্সের স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর অনুবাদ করা অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য হ্যাপি প্রিন্স’ গল্পটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা। তখন তাঁর বয়স ছিল কেবল নয় বছর। এরপর প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর ধীরে ধীরে অনুবাদের কাজে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে যান। উইলিয়াম ফকনার, হারম্যান হেস, এমব্রোস বিয়ার্সে, ফ্রাঞ্জ কাফকা, রুডইয়ার্ড কিপলিং, এডগার অ্যালান পো, ওয়াল্ট হুইটম্যান, ভার্জিনিয়া উলফের মতো নামকরা লেখকের সাহিত্যকর্ম স্প্যানিশে অনুদিত হয়েছে তাঁর হাত ধরেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634986840.jpg

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থেরও অনুবাদ স্প্যানিশ ভাষায় করেছিলেন বোর্হেস ◢ 


জার্মান এবং রুশ ভাষা থেকে তিনি অনুবাদ করেছেন গ্যেটে ও দস্তভয়স্কি। মূল আরবি থেকে অনুবাদ করেছেন সহস্র এক আরব্য রজনী এবং কোরান শরীফ। পাঠকেরা জেনে আনন্দিত হবেন যে রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থেরও অনুবাদ করেছেন তিনি। তবে বাংলা থেকে নয়, ইংরেজি অনুবাদ থেকে।

বোর্হেসের সাহিত্যকর্মগুলো আধুনিক সাহিত্যেরই অংশ যা প্রভাবিত হয়েছে প্রতীকীবাদের মাধ্যমে। ভ্লাদিমির নবোকভ ও জেমস জয়েসের মতো তিনিও স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে ব্যাপকতর প্রেক্ষাপটের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। যেখানে নবোকভ আর জেমস জয়েসের সাহিত্যকর্মগুলো হতো আকারে বিশাল, বোর্হেসের কাজগুলো হতো আকারে বেশ ছোট। আবেগচালিত শিল্পের সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রচারমাধ্যমের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিনিধিত্ব করতেন বোর্হেস। যদি শিল্প কোনো হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে বোর্হেসের আগ্রহ ছিল এই হাতিয়ারকে মানুষের সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করার দিকে।

বোর্হেস ছিলেন তাঁর পরের প্রজন্মের অনেক কবি-সাহিত্যকিকদের অনুপ্রেরণার উৎস। সেই লেখকেরা পরে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন বোর্হেসের প্রতি তাদের অনুরাগের কথা। কিংবদন্তি লেখক গার্সিয়া মার্কেস উচ্ছ্বাসের সাথে বলেছেন, “তাঁর ব্যাপারে আমার কোনো সমস্যা নেই। বোর্হেসের প্রতি আমার প্রবল অনুরাগ, প্রতি রাতে তাঁর লেখা পড়ি। বুয়েনোস আইরেস থেকে একটিমাত্র জিনিসই কিনেছি আমি আর তা হলো বোর্হেসের রচনা সমগ্র। আমি যেখানেই যাই আমার স্যুটকেসের ভেতর খণ্ডগুলি থাকে, প্রতিদিন পড়ি। তাঁর গল্পগুলি ফাঁদতে গিয়ে তিনি যে সুর ও স্বর বাঁধেন, সেটা ভীষণ পছন্দ আমার।”

লাতিন আমেরিকার আরেক বামপন্থী মহান ঔপন্যাসিক আউগুস্ত রোয়া বাস্তোসও বোর্হেসের সাহিত্যিক গুরুত্বকে সম্ভ্রমের সাথেই স্বীকার করে নিয়ে বলেন, “আমার ধারণা বোর্হেসের যা টিকে থাকবে তা হলো সাহিত্যের বৈপ্লবিক রূপান্তরের সম্পর্কিত তাঁর কাজগুলো। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে বোর্হেস ছিলেন বিপ্লবী; লাতিন আমেরিকায় তার সাহিত্যিক অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

সাহিত্যে অবদানের জন্য ‘প্রিক্স ইন্টারন্যাশনাল’-এর মতো পুরষ্কার তিনি লাভ করেন ১৯৬১ সালে। ১৯৭১ সালে লাভ করেন ‘জেরুজালেম পুরস্কার’। ১৯৮৬ সালে মৃত্যবরণ করেন তিনি। তবে, প্রস্থানের পর পৃথিবীব্যাপী তাঁর সাহিত্যকর্ম ও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ক্রমে বাড়ছে। হচ্ছে তাঁকে নিয়ে অনেক গবেষণা। যা একজন কালজয়ী ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর গুরুত্বের ব্যাপারটাকেই প্রতিনিয়ত তুলছে নতুন উচ্চতায়।

মোহন, কয়েকটি রাত, অশ্বথগাছ ইত্যাদি

মোহন, কয়েকটি রাত, অশ্বথগাছ ইত্যাদি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

রাত.
এত রাতে কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নাই। তবু হাটবার বলে মোহনের মনে হয় নিশ্চয়ই দলছুট কেউ একজনের দেখা পাওয়া যাবে। সে সিগারেটটা হাতে ধরে (যেহেতু সে ভুল করে আগুন আনে নাই) খানিকটা আশার আলো জাগিয়ে রাখে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে একজন হাজির হয়ে মোহনের আশার সলতেটা জ্বালিয়ে দেয়। লোকটাকে দেখে মোহন খুশি হয়ে ওঠে। সে প্রথম দেখতে পায়, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটা আলো হেঁটে হেঁটে আসছে। এ আসার গতিটা এমনই নিশ্চিত যে, এ কোনো জোনাকি পোকার নয়, মানুষের। ফলে আলোটা তার কাছাকাছি হলে সে বিড়বিড় করে বলে, আগুনটা দেওয়া যাবে?
মোহনের কথাগুলো লোকটার কানে পৌঁছাল বলে মনে হয় না। লোকটা মোহনকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে থাকে।
মোহন পুনরায় বলে, আগুনটা দেওয়া যাবে?
এবার মনে হয় শুনতে পেল। লোকটা পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে মোহনের দিকে সিগারেটটা বাড়িয়ে বলে, নিশ্চয়ই।
সিগারেটটা নিতে গিয়ে মোহন টের পায়, লোকটার হাত কাঁপছে। কাঁপছে যে তা নিশ্চিত। আর না হয়, হাতে ধরে রাখা সিগারেটটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যাবে কেন? মোহন অবশ্য উঠিয়ে নেয়, নিজেরটায় ধরিয়ে ফেরত দেয়। তারপর খুব মৃদু স্বরে ধন্যবাদ জানিয়ে অশ্বথগাছের দিকে এগুতে থাকে।
ধন্যবাদের উত্তরে লোকটা কথা বাড়ায় না। ঘুরে সোজা হাঁটা দেয়। কয়েক সেকেন্ডের দেখায় লোকটাকে মোহনের মনে হয় কেমন চটপটে, অস্থিরচিত্তের। পোশাক-আশাকে অবশ্য শহর থেকে আসা লোক বলেই মনে হয়।

অনেকক্ষণ ধরে সিগারেট টানে। একটার আগুন থেকে আরেকটা। মাথার উপরে থাকা অশ্বথপাতায় বাতাস এসে মৃদু কলকাকলির জন্ম দেয়। সঙ্গে যোগ হয় জেগে ওঠা দু-একটা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনে সে গাছের এদিক-সেদিক চোখ ঘুরিয়ে উৎস খোঁজার চেষ্টা করে। অন্ধকারের কারণে জায়গাটা ঠিক ঠাওর করতে না পেরে সামনে কী আছে দেখার চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ এভাবে কাটিয়ে মোহন সড়ক থেকে নেমে পড়ে। ধানক্ষেতের আইল ধরে গ্রামের দিকে হাঁটা দেয়। গ্রামের পথটায় পৌঁছামাত্র একটা টর্চের আলো এসে মুখে পড়ে। তারপর আরেকটা টর্চের আলো। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। এতে লাইট দুটা নিভে গিয়ে একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। শেষবার জ্বলে ওঠার সঙ্গে লাইট দুটা একটু এগিয়ে এসেছে বলেও মনে হয়। এগিয়ে এসে নিভে যায়। নিভে গিয়ে আর জ্বলে না। মোহন দাঁড়িয়ে আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো নিভে যাওয়ার পরও সে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করে। কিছু ঘটছে না দেখে মোহন আলোর উৎসের দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে।

বাড়িটার চারদিক নানান গাছ ঘিরে রেখেছে। দেখে মনে হয় গাছগুলো গৃহপালিত। গাছের ছোট, বড়, লম্বা, চিকন এরকম নানা পাতা অন্ধকারের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে। দেউরি জড়িয়ে ধরে রাখা সন্ধ্যামালতির গাছটা একটা প্যাঁচানো রহস্যের জন্ম দিয়ে পড়ে আছে। এভাবে যথার্থ অনুগতের মতো রাত জেগে কর্তার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। মোহন খুব মৃদু পায়ে বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। সামনের ঘরে আলো জ্বলছে। অবশ্য ঠিক স্পষ্ট বোঝাও যাচ্ছে না। সে হেঁটে হেঁটে ঘরটার আরো কাছাকাছি এসে চুপচাপ দাঁড়ায়।

কোনো শব্দ নেই। এমনিতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া চিৎকার নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তছনছ করে দেয়। কিন্তু আজ সব সুনশান। এরকম অস্বস্তিকর নীরবতার ভেতর মোহন কান পেতে রাখে। কোথাও একটা শব্দ—পাতাটির নড়ে ওঠা, পাখির ডানা ঝাপটানো, সামনের পুকুরে একটা মাছের ঘাঁই অথবা, অথবা...। কোন একটা শব্দের জন্য মোহন অস্থির হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মোহনের আশা পূরণ হয়। শেষ পর্যন্ত একটা নারীর মিহি হাসি মোহনের কানে এসে আছড়ে পড়ে। এতে মনে হয় নিশুতিরাত একটা হাসির সূত্র ধরে প্রাণ ফিরে পেল। এরপর, কাছের কোথাও থেকে পাখির ডানা ঝাপটানো, শিয়ালের হুক্কাহুয়া, বাতাসে পাতার বাড়ি খাওয়া—এমন বিচিত্র আওয়াজ মোহনের কানে আসে। সে এসব শব্দের উৎস (যেসব শব্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত একটি মিহি হাসি) নিয়ে গাছপালাঘেরা বাড়ির বাইরের উঠোন ত্যাগ করে। তার মনে হয় এমন রহস্যের ভেতর আরো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা কোনোমতেই আর সম্ভব নয়।

যে আইল দিয়ে মোহন সড়ক থেকে গ্রামে প্রবেশ করেছিল, সে আইল পর্যন্ত হেঁটে এসে একটু থামে। তারপর সড়কের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গ্রামে যাওয়ার পথে যেখানে ওর ওপর টর্চের আলো এসে পড়েছিল, সেখানে পৌঁছামাত্র শিকারী চিতার মতো আলোটা আবারও শরীরে ঝাপিয়ে পড়ে। ‘ক্যালা’, মোহনের গলাটা একটু চড়া বলেই মনে হয়। অথবা রাত গভীর বলে শব্দটা একটু রগড়ে গেছে। যাই হোক, ‘ক্যালা’ বলার পর আলোটা নিভে যায়। ফলে মোহন সেদিকে আর ভ্রুক্ষেপ না করে দ্রুতপায়ে বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে অশ্বথগাছটাকে ইনিয়ে বিনিয়ে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু অন্ধকারে মোহনের এই দেখার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তারপর কী জানি হয়। অন্ধকার হাতড়ে একটা ঢিল খুঁজে বের করে। তারপর ঢিলটা বটগাছের দিকে ছুড়ে মেরে বলে, ক্যালা। ঢিল ছোড়ায় অশ্বথগাছে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এতে মনে হলো মোহনের উৎসাহ বাড়ে। সে আবার হাতড়ায়। কিন্তু এবার আর কিছু পায় না। ফলে বটগাছের নিচে এসে আঙুলে চেপে রাখা সিগারেটটা বটগাছের দিকে ছুড়ে মারে, তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে এনে তাও বটগাছের দিকে ছুড়ে মেরে বলে, ক্যালা। বিড়বিড় কর বলে, ক্যালা, ক্যালা...

দিন.
হৈ-চৈ হচ্ছে, খানিকটা চোটপাটও। পাশের ঘর থেকে তিন-চারটা কণ্ঠ ঘুরেফিরে উঠে আসছে। চোটপাটের এমন আওয়াজে মোহন ঠিকে থাকতে না পেরে বিছানায় উঠে বসে। চোটপাটের মধ্যেও বেশ অনেকক্ষণ ঘাপটি মেরে পড়েছিল। কিন্তু এমন চিৎকার-চেঁচামেচি কাহাতক সহ্য করা যায়। এর মধ্যে যার কণ্ঠ বেশি শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন কাওসারের বড় ভাই মহিউদ্দিন।
‘দ্যাউখাইন জমি আমার, খায় হে, তা ম্যালাদিন, ১৫ বছর অইবই। হের বাপের আমল থাইক্যা। এখন ফেরত চাই, দিত না, কেরে? কউহ্যাইন, দিত না কেরে?
কথা শেষ করে বোধহয় কিছু সময়ের জন্য উত্তরের অপেক্ষা করে। কিন্তু কোনো হা বা না শোনা যায় না। আবার মহিউদ্দিন, ‘আপনে যদি আমার লগে থাকুইন, তাইলে হের জমি আমি নিয়ামই। লাঙ্গল লইয়া জমিতে নামলে ঠেংডি ভাইঙ্গা দিতাম না।’
এবার মোহনের বড় ভাই সুলতানের গলা, মামু-ভাইগনার ব্যাফার, মারতে তো ফারবেন না।
‘মারার কাম নাই, একটু ডর দেখাইলেই ও আইগ্যা দিব।’

এরপর গলাটা নিচে নেমে যায়। ফিসফিস করে কিছু একটা বলে। এতে মোহন স্বস্তি পায়। আর যাই হোক চোটপাট তো শুনতে হবে না। তবে দুপুর প্রায় হয়ে গেছে বলেই মনে হয়। ঘরের বেড়ায় সূর্যের যে আলো পড়েছে, তাতে অনেক তেজ।

মোহন বিছানা থেকে উঠে পড়ে। টিউবওয়েলের সামনে রাখা বদনায় পানি ভরে বাড়ির পেছন দিকে হাঁটা দেয়।

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায়, আম্বিয়া বেগম ঘরের এককোণে বসে রান্না তদারকি করছে। মোহনকে দেখে আম্বিয়া বেগম বলে, কিতা?
মোহন কোন উত্তর দেয় না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এতে আম্বিয়া বেগমের গলায় ঝাঁঝ উঠে আসে, তোর তো খাওন লাগে না। বাতাস খাইলেই অয়।
মোহন চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকে। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না।
‘বহ।’
আম্বিয়া বেগম মোহনের দিকে একটা ছোট চকি এগিয়ে দেয়।
মোহন চকিটা সামনে পেয়ে তাতে বসে পড়ে।
‘কাজল চ্যারাডাটারে ভাত দে।’
আম্বিয়া বেগমের নির্দেশ পেয়ে কাজের মহিলা এক প্লেট গরম ভাত মোহনের সামনে বাড়িয়ে দেয়।
প্লেট থেকে ধোঁয়া উড়ছে। মোহন প্লেট সামনে রেখে বসে থাকে। কাজের মেয়েটা ভাতের মধ্যে একবাটি তরকারি ঢেলে দেয়।
আম্বিয়া বেগম পাখা হাতে ছেলের প্লেটে বাতাস করে।
‘নে ঠান্ডা অইছে, খাইয়া নে।’
মোহন কোনো কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খেতে শুরু করে।
‘তুই কি পড়ালেহা ছাইড়া দিসছ?’

মায়ের কথায় সামান্য সময়ের জন্য মোহন প্লেট থেকে মাথা তোলে। ওর মাথা ওঠানো দেখে মনে হয় কিছু একটা খুঁজছে। পরক্ষণেই অবশ্য মাথা নিচু করে আবার খেতে শুরু করে।

মোহনের কোনো উত্তর না পেয়ে আম্বিয়া বেগম চুপচাপ বসে থাকে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আম্বিয়া বেগমের কথা আবার শুরু হয়, তোর জীবন কি এইবাবেই যাইব?
মোহনের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সে মাথা তুলে বলে, পানি দিতে কও।
আম্বিয়া বেগম বলে, কাজল হানি দে।
‘কিছু একটা ক?’
‘কিতা কইতাম?’
‘তুই করবিটা কী?’
মোহন মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সামনে রাখা গ্লাস থেকে প্লেটে পানি ঢেলে হাত ধোওয়ায় মন দেয়।
‘পড়ালেহা আর করবি না।’
‘ভালালাগে না।’
‘কয়দিন আগেও তো এমনডা আছিলি না।’
‘তুমার পুলাডিরে কও ভালা অইয়া যাইতে।’
‘তুরে কী কইতাছি, হের উত্তর দে।’
‘খালি মানুষের জমি দখল করে, মারে, আটকায়। তুমি কিছু কইতে পারো না?’ আম্বিয়া বেগম চুপ।
মোহন কাজের মেয়ের দিকে হাতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, পানি দে।
কাজল নামের মেয়েটা নিঃশব্দে মোহনের গ্লাস টেনে নিয়ে তাতে পানি ভরে মোহনের দিকে ঠেলে দেয়।

রাত.
প্রতিদিন সন্ধ্যা হতেই মোহন দক্ষিণপাড়ার দিকে হাঁটা দেয়। গ্রামে থাকলে এটা তার নিত্যদিনের কাজ। ওখানে পাড়ার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে, কার্ড খেলে বাড়ি ফেরে। কোনোদিন ফেরেও না। কিন্তু আজ ভর সন্ধ্যায় বিছানায় শুয়ে আছে, চোখের সামনে বই ধরা। চোখের সামনে বই ধরা থাকলেও খুব পড়ছে, তা নয়। অনেকটা অস্থির, বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে অনেক পর পর। এভাবে বহুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকে উঠে বসে। পাশে রাখা ঘড়িটা হাতে পরে নেয়। টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে পকেটে গুঁজে বেরিয়ে পড়ে।

বেরিয়ে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোয়। ভীষণ গরম। এই রাতের বেলায়ও ধরধর করে ঘাম পড়ছে। মোহন হেঁটে হেঁটে তাল গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। কোথাও ধপাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ফুকতে থাকে।
‘কেলা?’
হঠাৎ লাইটের আলো মোহনের মুখের ওপর এসে পড়ে।
মোহন অনেকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সিগারেটটা পেছন দিকে সরিয়ে নেয়। পরমুহূর্তে অবশ্য ধাতস্থ হয়ে সে আগের মতো সিগারেট টানায় মনোযোগ দেয়।
এতে লাইটটা মোহনের মুখের ওপর থেকে সরে যায়।
সুলতান জিজ্ঞেস করে, এইহানে কী করছ।
মোহনের কানে কোন কিছু ঢুকল বলে মনে হয় না। সে সিগারেটে টান দিতে থাকে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে আলোটা সামনের দিকে চলতে শুরু করে। এর সঙ্গে একটা রগড়ানি শোনা যায়। যা অস্পষ্ট, কিন্তু রগড়ানি বলেই মনে হয়। মোহন আরো কিছুক্ষণ সিগারেট ফোকে। খুব গরম। আবার একদঙ্গল বাতাস গরমটা একটু থামিয়ে যায়। একটু বাতাস বাড়লেই মাথার উপর তালগাছের পাতা ঝনঝন আওয়াজ করে।

তালগাছের নিচ থেকে বেরিয়ে সে সড়কের দিকে এগোয়। যেখানে ঝোপ থেকে হাটবারে টর্চের আলো বেরিয়ে আসে, আজ সেখানে জোনাকিপোকার দল হাট বসিয়েছে। মোহন সড়কে উঠে এসে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে মোটে নয়টা। আজকে তো আর হাটবার না। এ কারণে নয়টা বা বারোটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। মোহন অবশ্য এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না। সে সড়ক দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করে। অশ্বথগাছটা পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকে।

সড়কটার একপাশে গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলোর মুখ সড়কের দিকে ফেরানো। বাড়িগুলো শেষ হয়ে গেলে ফসলের ক্ষেত, এরপর সড়ক। সড়কের অন্যপাশে ধানক্ষেত, বিল, একাকার হয়ে আছে। অবশ্য এই রাতের বেলায় কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। মোহন তার ডানপাশে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকা বহু বছরের পুরনো জামগাছটা পেরিয়ে যায়, কারো সঙ্গে দেখা হয় না। তারপর সড়ক ঘেঁষে যে পুকুরটা পাড় হয়ে যায়, তাতেও কারো দেখা মেলে না। এভাবে অনেক পথ হেঁটে মোহন ফাইজুলদের বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। একটা হারিকেন জ্বালিয়ে ফাইজুল আর কাওসার খেলছে, পাশে দাঁড়িয়ে তারেক ওদের খেলা দেখছে।

মোহনকে দেখে ওরা হৈহৈ করে ওঠে, আয় আয়। তোর লাইগ্যা খেলাডা হইতাছে না।
মোহন ক্যারামের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘ল তাইলে শুরু করি, তারেক তাগিদ দেয়।’
মোহন কোনো কথা বলে না।
মোহন আর তারেক একদলে ভাগ হয়ে যায়, কাওসার আর ফাইজুল আরেক দলে।
‘৫০ ট্যাহা।’
বলে ফাইজুল পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। এর উত্তরে কেউ কিছু বলে না। বোর্ডে গুটি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
খেলা শুরু হয়ে যায়।
মোহনরা প্রথম গেইম হেরে যায়, আরেকটায় হারলে টাকাটা কাওসার ও ফাইজুল জিতে নেবে।
মোহন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে ১০টা।
‘আর খেলতাম না।’ বলে মোহন বোর্ডের গুটি এলোমেলো করে দেয়।
হঠাৎ করে মোহনের এমন গোয়ার্তুমিতে কাওসার ক্ষেপে যায়, খেলতি না কেরে, হাইরা যাইতাসছ বইল্যা গুটিগুলা এইবাবে আওলাইয়্যা দিবি।
মোহন কোনো কথা না বলে পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে বোর্ডের ওপর ছুড়ে মারে। তারপর নিঃশব্দে সড়কের দিকে হাঁটা দেয়। মোহনের হঠাৎ এমন চলে যাওয়া দেখে পেছন থেকে কাওসার ডাকতে থাকে, ল, ল ট্যাহা লাগব না।
মোহন অবশ্য তাতে কান দেয় না, সে সড়কে উঠে উত্তরমুখী হয়ে হাঁটতে শুরু করে।

মোহন আজ বাড়িটার বাইরের উঠোনে না দাঁড়িয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে যায়। গতকালের থেকে আজকে রাত অনেক কম। তবে আজ কোনো ঘরে আলো নেই। বোধহয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মোহন নিঃশব্দে পূর্ব দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা আধাপাকা ঘরটার দক্ষিণ কোনে এসে কয়েক মিনিট জিরিয়ে নেয়। তারপর পাশের দরজায় দুবার টোকা দিয়ে একটু সরে আসে। টোকা দিতে না দিতেই দরজা খুলে যায়। মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে কেউ কান পেতে ছিল। মোহনের মন হঠাৎ ভালো হয়ে যায়। এমনকি দরজা খুলে যাওয়ার পরমুহূর্তে জুঁই বেরিয়ে আসবে—এমনটাই আশা করে ছিল। কিন্তু দরজা দ্রুততার সঙ্গে খুলে গেলেও ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে আসে না। বেশ কিছুক্ষণ এরকম নীরবতা চলে। খুব বেশি সময় না হলেও মোহন এই সামান্য সময়ের ভেতর একটা বিরাট গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। সে বুঝে উঠতে পারে না, এখন তার কী করা উচিত। এমন একটা ভাবনা মোহনকে যখন এপাশ-ওপাশ টানছে, তখন ভেতর থেকে জুঁইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ভেতরে এসো।

জুঁইয়ের এমন আহ্বানে মোহন খুব অবাক। সে কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে ওখানেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ইচ্ছা করলেও কোনোমতেই পা নাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না। মনে হয় বহুদিনের অনভ্যস্ততা তাকে একটা স্থির বিন্দুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

জুঁই বেরিয়ে এলে মোহন স্থির তাকিয়ে থাকে। জুঁই বেরিয়ে এসে মোহনকে দেখে দাঁড়ায়। মনে হয় চিনে নিতে একটু সময় নিচ্ছে। তারপর হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।

মোহন দেখে সবকিছু সেই আগের মতোই আছে। অবশ্য এমন কী সময় পেরিয়েছে, মাত্র তো ছয়টি মাস। তাতে আর কী বদলাবে? বদলায়নি। ঘরটায় এককোনে রাখা জুঁইয়ের পছন্দের গাছটা সেরকমই আছে। প্লাস্টিকের, কিন্তু মোহনের এখানে এলে সব সময় মনে হতো, এ জুঁইয়ের মতোই জীবন্ত।
‘কী ভাবছো?’
মোহন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
‘না, কতদিন পর তোমার কাছে এলাম।’
জুঁই শব্দ করে হাসতে গিয়ে থেমে যায়। মোহনের মনে হয়, গতকাল রাতে যে হাসিটা শুনেছিল, তার সঙ্গে এ হাসির মিল খুব। তারপরই সে অবশ্য সন্দিহান হয়ে ওঠে, জুঁই যে হাসল এ হাসি কতদিন ধরে মোহন শুনে আসছে। এই হাসির সঙ্গে গতকাল রাতের হাসির মিল কোথায়? এসব ভাবনা রেখে মোহন সোজা পথ হাঁটে—
‘জুঁই, তুমি গত ৬ মাস কই ছিলা?’
মোহনের কথায় জুঁই বিরক্ত বলেই মনে হয়।
‘নেত্রকোনা।’
‘নেত্রকোনা মানে?’
‘মুর্শেদা আপার বাসায়।’
‘গ্রামের লোক কিন্তু এই কথা বলে না।’
‘আমার কথা শুনার জন্য তুমি কি গ্রামের লোকদের জিজ্ঞেস করো?’
‘তা কেন?’
‘তাহলে আমারে খুঁজে দেখছিলা?’
‘তোমারে খোঁজে মুর্শেদা আপার বাসায় গেছিলাম।’
‘কবে?’
‘বেশ কয়বার।’
‘কই আমার সাথে তো দেখা হইল না।’
‘ভেতরে যাই নাই। বাসার সামনে থাইকা কয়েকদিন ঘুইরা আইছি।’
‘মোহন, সবাই বলে তুমি তুখোড় ছাত্র, আমি বলি, তুমি তুখোড় গাধা।’
এই কথার পর মোহন হঠাৎ চুপসে যায়। হারিকেনের আবছা আলোয় ঠিক বোঝা যায় না মোহনের মুখ লাল হয়ে উঠল কিনা।
‘তুমি নাকি পড়াশোনা বন্ধ করে দিছো?’
মোহন চুপ করেই থাকে।
‘তুমি আমাকে বিয়ে করবে বলছিলা, ওই ইচ্ছা কি এখনো আছে?’
কথা কটা বলে জুঁই হাসতে থাকে।
এমন প্রশ্নে মোহন আগের মতোই চুপ করে থাকে।
‘এটা হচ্ছে তোমার আরেক সমস্যা। তোমার ভাইগুলার ঠিক উল্টা হইছো তুমি।’
‘আমার ভাইরা এইখানে আসলো কিভাবে।’ মোহন কথা বলে।
‘ভাইরা আসে নাই। কিন্তু ভাইদের ভাই তো আসছে।’
মোহন আবারও আগের মতো চুপ হয়ে যায়। দুজন বেশ কিছুক্ষণ একটা নীরবতার ভেতর ডুবে থাকে। তারপর জুঁই বলে, তুমি এখন যাও।

রাত (দ্বিতীয় ভাগ)
মোহন সড়কে এসে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ১১টা পেরিয়ে গেছে। এখন কোনো দিকে যাওয়ার নাই। ফাইজুল, তারেক সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই। নিজেকে মোহনের বেশ অসহায় মনে হয়। ফলে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সে বাড়ির দিকে রওনা করে। কিন্তু বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পায় চোখের সামনে সড়ক এসে হাজির। কখনো কখনো মোহনের এরকম হয়।

হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে শোনে জুঁই নাই। নাই মানে ওই বাড়ির রুস্তমের বউ জানাল, জুঁই নাই। পালাইয়া গেছে। রাতে উঠেছিল রুস্তমের বউ, জঙ্গলে গিয়ে কাজ সারতে। তখন সে দেখতে পায়, একটা লোকের সঙ্গে জুঁই সড়কের দিকে উঠছে।

অশ্বথগাছের পাতার ভেতর থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে। মোহন ঘড়ির দিকে তাকায়। পাখিরা তাদের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় না। তারা প্রতিদিন খুব সকালে বেরিয়ে যায়। সারাদিন খাদ্য অন্বেষণ করে। নানা জায়গা ঘুরে সন্ধ্যায় সারাদিনের স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে, রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করে বা সঙ্গম করে, ডানা ঝাপটায় ইত্যাদি। এরকম অনন্তকাল ধরে চলে আসছে। আসুক, তাতে মোহনের কী। সে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে, কীরে পাখি বিশেষজ্ঞ হয়ে যাাচ্ছিস নাকি।

অনেকক্ষণ পর মনে হলো সড়ক দিয়ে কেউ আসছে। কেউ আসছে তা টের পেয়ে মোহন ওর হাতে থাকা সিগারেটটা ফেলে দেয়। সঙ্গে একটু যেন সতর্ক হয়ে ওঠে। মিনিটখানেক অপেক্ষার পর লোকটা মোহনের কাছে পৌঁছালে মোহন লোকটার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
‘আগুন হইব?’ বলে অনেকটা পথরোধ করে দাঁড়ায় মোহন।
‘জ্বি।’
লোকটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পকেট থেকে ম্যাচ বের করতে উদ্যত হয়।
তখন মোহনের খেয়াল হয়, তার হাতে সিগারেট নাই। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেখে প্যাকেটেও নাই। এতে মোহন নয়, মনে হলো লোকটাই খানিক বিব্রত। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে মোহনের দিকে এগিয়ে দেয়। মোহন একটা সিগারেট টেনে নিয়ে জ্বালায়।
‘থ্যাঙ্কস...স।’ ধন্যবাদটা দীর্ঘ হয়েই বের হয় মোহনের মুখ থেকে।
তারপর ম্যাচটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে মোহন সামনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। লোকটা অবশ্য কথা বাড়ায় না। সে হাঁটতে শুরু করে।

লোকটার চলে যাওয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগোয়, তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদিক থেকে ঘুরে সে আবার অশ্বথগাছের নিচে চলে আসে। হাতে থাকা ফাঁকা সিগারেটের প্যাকেটটা গাছের দিকে ছুড়ে মেরে বিড়বিড় করে। তারপর হাতে সিগারেটটা অশ্বথ গাছের দিকে ছুড়ে মারে। এই ব্যাপারগুলো এতো নিস্তরঙ্গ যে, এতে গাছের ভেতর থেকে পাতা বা পাখিদের কোনো গুঞ্জরনও বেরিয়ে আসতে শোনা যায় না।

দিন.
মোহন ঘুম থেকে উঠে দেখে বিকাল হয়ে গেছে। এটা অবধারিত, না জাগা পর্যন্ত কেউ ডাকবে না। ঘুমের মধ্যে যদি মরে পড়ে থাকে, তাহলে? কিচ্ছু যায় আসে না। এসব ব্যাপার নিয়ে সে অবশ্য ভাবতেও চায় না। পেট ক্ষুধায় চোচো করছে। সে প্রথমে বালিশ টেনে নেয়। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। ক্ষুধাটা অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। উঠে পড়ে। কোনোমতে হাতমুখ ধুয়ে মোহন রান্নাঘরের দিকে ছোটে। ওর জন্য কিছু খাবার রাখা থাকে সবসময়। সে আশায় পুরো রান্নাঘর তন্নতন্ন করে খোঁজে। দুয়েকটা পাতিলের তলানীতে কিছু তরকারি পড়ে থাকলেও ভাতের পাতিল ফাঁকা। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে আসে। একবার মনে হয় মার কাছে গিয়ে বলবে। কিন্তু এ কোনোদিনই ওর হয়ে ওঠেনি। আজকেও না। ঘড়িটা হাতে পরে নেয়। ক্ষুধা সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সারা পেট ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ক্ষুধাটাকে কোনোমতেই পাত্তা দিতে চায় না। তার মাথাজুড়ে গতরাতের সড়ক, বটগাছ, একটা মানুষ স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট রেখায় একটা দাড়িয়াবান্দার ঘর তৈরি কর যাচ্ছে।

মোহন দক্ষিণ দিকের জঙলাটা পার হয়ে জুঁইদের বাড়ির উঠোনে উঠে আসে। জুঁইদের উঠোনে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে হৈহৈ করে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। মোহন বাচ্চাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ভেতরের উঠোনে চলে আসে। ভেবেছিল ওকে দেখে কেউ না কেউ বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সেরকম কারো মুখোমুখি হতে হলো না। এমনকি কালাচান মিয়া, ওই কাল্লুটা, যে সারাদিন বাইরের ঘরের বারান্দায় বসে থাকে দুটা লাল চোখ নিয়ে—সেও নাই। বস একসঙ্গে হাগতে গেছে, বিড়বিড় করে বলে মোহন হেসে ওঠে। বাড়ি ফাঁকা থাকলেও জুঁই সচরাচর ঘর থেকে বের হয় না; মোহন এটা ভালো করেই জানে। সে সোজা এসে দরজায় দাঁড়ায়। জুঁই আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে।
‘জুঁই।’ মোহন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘এই সময় তুমি কেন এসেছো?’
মোহন কথা না বলে ভেতরে এসে বিছানায় বসে পড়ে।
‘তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।’
জুঁই চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ, তারপর বলে, কী বলবে বলো।
‘তুমি কী চাও?’
‘কার কাছে?’
‘কারো কাছে না, আমার কাছে তো নয়ই? তুমি আসলে চাওটা কী?’
জুঁইকে একটু গম্ভীর দেখায়। এই গম্ভীরতা অবশ্য মুহূর্তের মধ্যে পথ ঘুরে বিরক্তিতে রূপ নেয়।
‘মা যে কোনো সময় চলে আসবে। তুমি এখন যাও।’
‘যাব না।’
‘মানে? তুমি এখন যাও।’
‘যাব, কিন্তু শিয়ালদের তাড়াবে কে?’
এবার জুঁইয়ের কপালে মিছিলের মতো কয়েকটা ভাঁজ জড়ো হয়। সে মোহনকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে বলে, তুমি এখন যাও।
মোহনও কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দরজায় এসে কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠে অনেকটা মিনতির সুর। বলে, আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে, সামান্য একটু ভাত হবে?
‘কি আবোল-তাবোল বলছো মোহন। তুমি এখনই বেরোও।’
মোহন বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার আগে ওর কণ্ঠ জড়িয়ে আসে, তুমি জগদ্বমাতা। তোমার কাছে একটু খাবার হলো না! বলে অনেকটা যাত্রার নায়কের মতো মাথা দুলিয়ে মোহন উঠোন থেকে বেরিয়ে যায়।

রাত (প্রথম ভাগ)
মোহন ফায়জুলদের বাড়িতে এসে দেখে বাইরের ঘরের বারান্দায় তারেক বসে আছে।
‘তুর এইখানেই যাইতাম। তারেক মুখটা খুশিতে জ্বলে ওঠে।’
‘আমার এইখানে কেরে?’
তারেক কোনো কথা না বলে মিটিমিটি হাসে। মোহন বেঞ্চিতে বসতে গিয়েছিল। কিন্তু ফায়জুল চলে আসায় তারেক উঠে পড়ে। বলে, ল।
কই? মোহন জানতে চায়।
ওরা মোহনের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। পিছু পিছু মোহন। তার তখন পেটের ভেতর একটা বিরাট শূন্যতা দোল খাচ্ছে। একবার মনে হয় ওদের দাঁড় করিয়ে ফায়জুলকে বলবে, আমারে ভাত দে, আমার পেট ভরা ক্ষুধা। বিরাট ক্ষুধা।
কিন্তু বলতে পারে না?
দক্ষিণ দিকে কিছুদূর হাঁটার পর পশ্চিম দিকে আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট সড়ক নেমে গেছে। তারেক, ফায়জুল নতুন সড়ক নেমে গেলে মোহন ওদের অনুসরণ করে।
ছোট সড়কটায় নেমে গেছে দেখে মোহন নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলে, ও তোরা তাইলে দরগায় যাবি?
‘দরগা!’ দুজন একসঙ্গে হেসে ওঠে।
ওদের এমন হাসি মোহনকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। ওর ভেতর একটা অবিশ্বাসও উঁকি দিয়ে যায়। ফলে মোহন ওদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। ওদের হাঁটা, চলার গতি সব পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করে। তাতেও বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে সকালের কথা মাথায় আসে। সকালে চোটপাটের দাপটে তার ঘুম ভেঙে যায়। শেষে কী জানি ফিসফিসানি। ওদের এই রহস্য করার সঙ্গে সেই ঘটনার কি কোনো যোগসূত্র আছে? মোহন দাঁড়িয়ে পড়ে, টের পেয়ে ওরাও।
‘কী, কী অইলো?’
‘না কিছু না।’ মোহন এমন ভাব করে যেন পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে গিয়েছিল।
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করে। খুব বেশিক্ষণ না, আধাঘণ্টা হবে। গ্রামের পথ আধাঘণ্টা কিছুই না। ওরা হেঁটে হেঁটে একটা ছোট নদীর পাড়ে এসে পৌঁছায়। মোহন এর আগে বহুবার এখানে এসেছে। নিজেদের গ্রাম থেকে দুইটা গ্রাম, তারপর একটা ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে এখানে আসতে হয়।
‘ওই আচস?’ তারেক হাঁক দেয়।
‘হ তারেক ভাই।’ একটা স্বর নদীর ওপার থেকে ভেসে আসে।
পরমুহূর্তে বলে, খাড়ান আইতাছি।
‘কই যাস তোরা।’ মোহনের কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা।
ফায়জুল বলে, এত অস্থির কেরে, যেখানে যাইতাছি তোর বালাই লাগব।

মোহন আর কথা বাড়ায় না। নদীর ওপার থেকে একটা নৌকা এসে এপাড়ে ভিড়ে। ওরা দুজন উঠে মোহনকে তাগিদ দেয়। মোহনও উঠে পড়ে। নৌকাটা দুলুনি দিয়ে ছেড়ে দেয়। নদীটা এমনিতেই ছোট। এই ভাদ্র মাসে তা পেরুতে মিনিট দশেকের বেশি সময় নেয় না। নদীর এপাড়ে এসে দেখে কাওসার দাঁড়ানো। ওদের পেয়ে খুশিতে ওর দাঁত বেরিয়ে আসে, আইছস।

কাওসারকে দেখে বিষয়টা ওর কাছে আরো রহস্যময় মনে হয়। একবার ভাবে সে যে করেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। পরক্ষণেই মনে হয়, ভয় পাওয়ার তো কোনো মানে নেই। সবাই ছোটকালের বন্ধু, নিজে নিজে আশ্বাস খোঁজে।
‘মোহনরেও লইয়া আইছস?’ কাওসারের হাসি কান পর্যন্ত লম্বা হয়।
কাওসারের এই কথায় মোহন নিশ্চিতভাবে আশ্বাস পেয়ে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১টা বাজে বাজে করছে। রহস্যের কূলকিনারা করতে ওদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছা হয়, আবার অশ্বথগাছটাও অনবরত টানছে।

নদীর পাড় থেকে দক্ষিণের দিকে হাঁটতে থাকে। নৌকা বয়ে নিয়ে আসা ছেলেটা সবার সামনে; আর মোহন সবার পেছন পেছন হাঁটছে। মোহনের মনটা ঘুরে যায়। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, আমি যাই।
‘কী কস?’ তারেক ঘুরে মোহনকে আটকায়।
‘আমার যাইতে ইচ্ছা করতাছে না।’
সামনে থেকে ফায়জুল আর কাওসার একসঙ্গে কাই কাই করে ওঠে, আইয়া পড়ছি, আইয়া পড়ছি রে।
মোহন আবার ওদের পিছু পিছু হাঁটে।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ছোট জঙ্গল পেরিয়ে খালের কাছে চলে আসে।
‘এটা তো শশ্মান?’ মোহন বলে কিন্তু তা অস্ফূট থেকে যায়।

শশ্মান পেরিয়ে আরো একটু পথ। ওরা একটা ছোট কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটার ছোট্ট একটা উঠোন এই রাতের বেলাতেও সাদা চাদরের মতো আলো ছড়াচ্ছে। উঠোনের এপাশ থেকে ওপাশ দড়ি টাঙানো। ঘর ঘেঁষে একটা পেঁপেগাছ অনেকগুলো কাঁচাপাকা পেঁপে ধরে বড্ড কষ্টে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গের ছেলেটা বলে, মুর্শেদা দরজা খোল।
এতক্ষণে মোহনের কাছে বিষয়টা স্পষ্ট হয়। একটা মেয়ে দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা কুপি। কুপির আলোতে মেয়েটাকে দেখে মোহনের মায়া লাগে। ওর উঁকি দেওয়ার ভেতর কেমন একটা আড়ষ্টতা। এ আড়ষ্টতা, না অসহায়ত্ব মোহন তা বুঝে উঠতে পারে না।
তারেক, কাওসার, ফায়জুল হা হা করে মেয়েটাকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে ভেতর ঢুকে যায়। মোহন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘কই, ভিতরে আয়।’ ভেতর থেকে কাওসার আমুদে গলায় মোহনকে ডাকতে থাকে। এর মধ্যে ওদের পথ দেখিয়ে আনা ছেলেটা বাইরে এসে বলে, বাই, আওহাইন, ভিতরে আওহাইন।
তারেক, কাওসার, ফায়জুল চকির ওপর বসে পড়ে।
যে মেয়েটাকে একঝলক দেখেছিল, সে নাই। ঘরের ভেতর একটা ছাচের বেড়ার উল্টাদিকে কুপির আলোটা জ্বলছে।

এখানে সে কী করবে! তার খুব জুঁইয়ের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে। আজও গতকালের মতো টোকা দেওয়ামাত্র যদি দরজা খুলে আহ্বানের স্বরে ডেকে ওঠে। কিন্তু না বড্ড বিরক্ত লাগে মোহনের। পৃথিবীটা অনেক বড়, পৃথিবী না হোক নিদেনপক্ষে বাংলাদেশ। এখানের কোটি কোটি মানুষের ভেতর থেকে দুটা চোখ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা একটা মানুষ নিশ্চয়ই আছে। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
একটা আঁচলের স্পর্শে মোহন ফিরে আসে। দেখে মেয়েটা সামনে দাঁড়ানো।
বাহ, কী লাবণ্যতা ঘিরে আছে মেয়েটাকে। কপালে একটা টিপ, ঠোঁটও লাল করেছে। সবার ভেতর একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
‘নাম কী?’ ফায়জুল জিজ্ঞেস করে।
‘মুর্শেদা।’ মেয়েটা ফ্যাশফ্যাশে গলায় উত্তর দেয়। এই ফ্যাশফ্যাশে গলাটা শুনে মোহনের মুগ্ধতা মিলিয়ে যায় একদম।
এরপর মোহনের কাছে দৃশ্যটা খুব বিশ্রি ঠেকে। সবাই চকিতে বসা, শুধু মেয়েটা দাঁড়ানো। কেন? কিছুই নয়, অথচ মোহনের কাছে দৃশ্যটা অনেক বাজে মনে হয়।
‘পয়লা ক্যাডা।’ তারেকের মুখ দিয়ে কথা কয়টা যে গতিতে বেরোয়, তার থেকে বেশি গতিতে বেরোয় হাসি।
কিন্তু বিষয়টা প্রকৃতই অনেক সিরিয়াস, তা এই কথার পর সবার নীরবতা দেখে বোঝা যায়। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে কাওসার বলে, মোহন?
‘হ, হ মোহন।’ অন্য দুজন সায় দেয়।
ওরা যে ছোটকালের বন্ধু, ওরা যে অনেক ভালো বন্ধু, মোহন তা টের পেতে থাকে। আরো টের পায়, একটা অস্বস্তি ওর ভেতরে বিরাট জায়গা দখল করে নিয়েছে। মোহন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১২টা। সে বলে, আমি যাই?
‘কিতা কছ?’ তারেক অনেকটা চিৎকার দিয়ে ওঠে।
ফায়জুল ওকে বেড়ার উল্টোদিকে প্রায় ঠেলে দিয়ে আসে। পেছন পেছন মেয়েটা এসে হাজির।
‘আওহাইন।’ মেয়েটার আহ্বান শুনে মোহন চমকে ওঠে। এমন একটা আহ্বানের জন্য কি সে এতদিন অপেক্ষা করে ছিল! বিরাট একটা ঘোরের ভেতর সে ব্যাপারটা ভাবে। এই ভাবনার ঘোরে মেয়েটার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় মোহন। পরক্ষণে কী ঘটবে এমনটা আন্দাজ করা সহজ। কিন্তু মোহন সহজ পথে যায় না। সে যায় অন্য পথে। অসহায়ের মতো বলে, বাড়িতে ভাত আছে?
মোহনের এমন কথায় মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মোহন অবশ্য আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এ ঘরে চলে আসে।

‘কী অইছে?’ সবাই জানতে চায়।
‘আমি যাই।’ মোহন এই কথা বলে বন্ধুদের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।
‘যেডার এইখান যাইবি, হেইডাও তো একই।’ তারেক খ্যাক করে ওঠে।
মোহন কোন কথা বলে না। এতে বোধহয় ওদের উৎসাহ বেড়ে যায়।
ফায়জুল বলে, বড্ডারে আগে, হেরপরে ছোডডার ওইহান যাইস।
বড়টা মানে এই মেয়েটার নাম তো মুর্শেদা। মোহন ক্ষেপে যায়।
‘চুপ। কুত্তার বাচ্চা।’ মোহন চিৎকার দিয়ে ওঠে।
‘কী, কী কইছস?’ ফায়জুল মোহনের দিকে তেড়ে আসে।
তিনজনের মাঝখানে তখন কাওসার এসে দাঁড়ায়।
আর এগোয় না। সবাই চুপ হয়ে যায়।
এরপর মোহন সোজা নদীর দিকে হাঁটা দেয়।

রাত (দ্বিতীয় ভাগ)
বটগাছের নিচে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা ১টা পেরিয়ে যায়। কই, রাতগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই! একই। কিন্তু মোহনের শরীর আজ কোনোমতেই চলছে না। সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে বলে ভাবে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে আর সময় ব্যয় করে না। সোজা জুঁইদের বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে একটু ভাবে। শরীর বড্ড টলায়মান। যে কোনো সময় যে কোনো দিকে হেলে যেতে পারে। তারপরও মোহন গুটিগুটি পায়ে ভেতরের উঠোনে এসে পড়ে। উত্তরপাশের ঘরটার কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর সামান্য রেখা বেরিয়ে বাইরে পড়েছে। মোহনের কাছে এই আলোকে একটা দ্যোদুল্যমান রঙধনু বলে মনে হয়। সে এই আলোর ঝিলিক মাথায় নিয়ে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর ঘর থেকে একটা হাসি ছিটকে বেরিয়ে আসামাত্র মোহন দরজায় এসে ধাক্কা দেয়।
দরজায় শব্দ হতেই ভেতরের আলোটা নিভে যায়।

মোহন বোধহয় আরেকটু টলায়মান হলো। এবার তার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। সে অনেক কিছু খুঁজে বেড়ায়, মনে করার চেষ্টা করে, এই আলো নিভে যাওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে তার কি কোনোদিন দেখা হয়েছিল? এই আলো নিভে যাওয়ার পর কী ধরনের দৃশ্যের অবতারণা হয়। এসব ভাবার চেষ্টা করলেও পেটটা ঠিকমতো সহযোগিতা না করায় সে আবার দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে।
না কোনো সাড়া নেই। ফলে আবার ধাক্কা।
‘কে?’ জুঁই বড্ড কড়া গলায় আওড়ায়। মনে হয় ফ্যাসফ্যাসে।
‘দরজা খোল।’ মোহনের কথাগুলো কাঁপা কাঁপা হয়ে বেরয়।
‘তুমি এত রাতে কী চাও?’
‘দরজা খোল।’ মোহনের গলায়ও চড়া ভাব।
আর দেরি হয় না। দরজা খুলে যায়। জুঁই মোহনের মুখোমুখি হয়ে বলে, কী চাও?
মোহন জুঁইকে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতর চলে আসে। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে এর আলোয় কিছু একটা খুঁজে নেয়। সে দেখতে পায় ঘরের এক কোণে একটা লোক গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝলকে চিনতে পারে। চিনে সে চমকে ওঠে। এ যে তার বড় ভাই, সুলতান।
আর দেরি করে না। মোহন ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে দরজায় জুঁইয়ের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ধাক্কা খেয়েই বোধহয় জেগে ওঠে। জুঁইয়ের হাতটা চেপে ধরে।
‘ছাড়। জুঁই ধমক দিয়ে ওঠে।’
মোহন বাধ্যগতের মতো ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র