কিউরেটর



এনামুল রেজা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিকেলটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। রোদের উত্তাপ ও আলো দুটোই ম্রিয়মাণ। বর্ষার দ্বিতীয় মাস অথচ আকাশ পরিষ্কার। ভাসমান সফেদ তুলোর মতো শরৎঘেঁষা মেঘ। চার রাস্তার একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে মন খারাপ হলো। ফুলহাতা শার্টের ডান আস্তিনে কপালের ঘাম মুছলাম। একটা খালি রিকশা আসছে সোজাসুজি। সরে দাঁড়ালাম একপাশে।

রাস্তার ওই ধারে একটা দশতলা বিল্ডিংয়ের নিচে ছোট্ট চায়ের দোকান। ঢালু কংক্রিটের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে তৈরি সিমেন্টের দু সারি বেঞ্চ। তীব্র চায়ের তৃষ্ণা পেল। গরমে প্রাণ বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু চায়ের ঘ্রাণ নাকে এলে কবে আর ঠিক থেকেছে মাথা! বহুক্ষণ ধরেই ঘুরছি পায়ে হেঁটে। রিপনদের বাসাটা কেউ চিনল না। এতজনকে জিজ্ঞেস করলাম। গেটের দু পাশে বড় দুটো নারিকেল গাছওয়ালা একতলা পুরানো বাড়ি, ছাদ ভরে আছে টবে বেড়ে ওঠা অজস্র গাছপালায়। একদম যেন ঝুলন্ত বাগান।

পীরের মহল্লা শহরটির নাম। হবে, আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে এখানে আস্তানা গেড়েছিলেন একজন বা বহুজন পীর। লোকজন আসত, মানত করত বটবৃক্ষে সুতো বেঁধে, দরগায় চড়ত শিন্নি। কল্পনা করে নিতে বেশ লাগে। রিপনরা এলাকার পুরনো পরিবারগুলোর একটি। কখনো তাকে বা তার বাবা নঈমুল হক সাহেবকে জিজ্ঞেস করে অমন পীর বিষয়ক জটিলতার কথা শুনিনি অবশ্য। এর আগে এসেছিলাম একবারই। রিপনের বোন তমালিকার বিয়েতে। সাজানো গোছানো এক ছোট্ট শহর মনে হয়েছিল পীরের মহল্লাকে, বাসার ছাদ থেকেই শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা নদীটা দেখা যেত। বেশ প্রশস্ত হলেও শান্ত সমাহিত নদী, ওইপারে গ্রাম।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মাঝবয়সী লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নঈম ডাক্তারের বাসাটা কোনদিকে জানেন?’ চাঅলা গরম পানির বলক ওঠা একটা কেতলিতে শুকনো কালো চা পাতা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘কোন নঈম ডক্তর?’
ওই যে পীরের বাজারে বড় চেম্বার আছে, বাড়িটা পুরনো ধাঁচের, ছাদ ভরা গাছপালা।
দুইটা বড় নারিকেল গাছ আছে বাড়ির সামনে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম। আপনি চেনেন?
জ্বি চিনি। কিন্তু এসবে লাভ নাই।
চাঅলার উত্তরটা বুঝলাম না। কিসে লাভ নেই? দেখলাম অন্যপাশের বেঞ্চে বসা দুজন লোক আগ্রহী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। একজনকে বেশ চিনলাম। ওই লোকটিকেই না রিকশা থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেছিলাম রিপনদের বাসা কোনদিকে? কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে আবার বললাম, ‘রিপন আর আমি একই অফিসে কাজ করি। এসেছি মায়ানগর থেকে। ঠিক কোন দিক দিয়ে গেলে পৌঁছতে সুবিধা হবে বলবেন?’

আচমকা কাঁধে কেউ হাত রাখলে ঘুরে চাইলাম বাঁ দিকে। কম্পিত মিহি কণ্ঠে রুগ্ন এক বৃদ্ধ কাঁধ থেকে হাতটা না সরিয়েই কথা বলে উঠলেন। ‘নঈম ডাক্তারের বাড়ি খুঁজতাছেন শুনলাম। তা নাম কী আপনের? কুনখান থাইকা আসা হয়?’

বুঝতে বাকি রইল না। ঘণ্টাখানেক ধরে এই সর্পিল অলিগলির ছোট্ট শহরটায় ঘুরে বেড়াচ্ছি রিপনদের বাসার সন্ধানে এবং বেশ রটে গিয়েছে একজন অচেনা লোকের ওধারা অনুসন্ধান। আজকের যুগে বাসাবাড়ির নম্বর ছাড়া কেউ কোথাও যায়? মোবাইল ফোনই বা আছে কেন? তবে সঙ্গে থাকা নম্বরটি যে বন্ধ, বহুবার ডায়াল করেও সংযোগ মেলেনি, কাকে বোঝাব?

দশ বছর একসঙ্গে কাজ করেছি রিপন আর আমি। ঠিক দু সপ্তাহ আগে হুট করেই সে অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। একদিন, দুদিন এমনকি তিনদিনকেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ভেবেছিলাম হয়তো বাড়িতে গিয়েছে জরুরি কাজে। কিন্তু এমন বিনা নোটিশে এতদিনের কামাই অফিস মানবে কেন? শেষে আমিই বাধ্য হয়ে ম্যানেজমেন্টকে অনুরোধ করেছিলাম। রিপনের সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ আমার, আসছে উইকেন্ডে অন্তত একবার দেখে আসি ওদের বাসায় কোনো ঝামেলা হলো কিনা। এরপর অফিস যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা নিশ্চিই অবিচার হবে না। এতদিনের অভিজ্ঞ কর্মী, ওর মতো কন্টেন্ট ডেভলপার চাইলেও যে বাজারে হুট করে মিলবে না, ম্যানেজমেন্টের বেশ ধারণা ছিল। উইকেন্ডের দুদিন আর একদিন বাড়তি যোগ করে মায়ানগর থেকে একশো নব্বই মাইল দূরের মফস্বল শহর পীরের মহল্লায় এসেছি আমি। কিন্তু সাত বছর আগের সেই পুরনো ধাঁচের বাড়িটি খুঁজতে এমন হোঁচট খেতে হবে কে জানত? শহরটির ভুতুড়ে পরিবর্তন হয়েছে এই আধা যুগে, না মেনে উপায় নেই।

বৃদ্ধের প্রশ্নের জবাবে কিছু বলবার আগেই আরো কিছু লোক চায়ের দোকানটিতে জড়ো হয়ে গেল। আমি এক আগন্তুক বসে আছি, আমাকে ঘিরে জনা দশেক মানুষ।
‘শেষ কবে এসেছেন এদিকে আপনি?’ প্রশ্নকর্তা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা দেখা গেল না। তবু উত্তর করলাম, ‘বছর সাতেক আগে। কিন্তু কী বিষয় বলেন তো ভাই?’
চারপাশে একটা মৃদু শোরগোল উঠল। বিষয় আর কী.. শহর কি আর ছোট আছে.. নাকি সেই শহর আছে…
কিন্তু, ওই যে চাঅলা ভাই তো ঠিকই চিনেছিলেন। কী ভাই, চেনেন নাই?
আমার প্রশ্নে চাঅলা হতাশ দৃষ্টিতে দূরে কোথায় চেয়ে রইল। বৃদ্ধ লোকটির কণ্ঠ বেজে উঠল তখন রোদ পড়ে আসা ঘিঞ্জি শহরটির এই কোনে, ‘ও তো সবই চেনে। আপনাকেও চেনে। কী রে চিনিস না?’
চাঅলা বলল, ‘জ্বি। ইনি গল্প লেখেন। এনার স্ত্রীর আটমাসের পেট। কিন্তু এসবে লাভ নাই।’
‘মানে কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্নটা নিজেকেই করলাম বিড়বিড় করে। আমি লেখক কিন্তু বিখ্যাত কেউ তো নই। মাসখানেক পর পদ্ম-র ডেলিভারি ডেট, এই তথ্যও নির্ভুল। ওর কথা মনে পড়তেই কীরকম অদৃশ্য ওজন চেপে বসল আমার কাঁধে। ব্যাখ্যা করা যায় না এমন এক আতঙ্ক টের পেলাম। কী করছে পদ্ম এখন? এমন বিকেলগুলো গল্পের বই পড়ে কাটাতেই ও ভালোবাসে। নধর উপান্তের লেখা ওই বইটা কি এখন পড়ছে ও? সেই যে এক লোক অনেক বছর শেষে নিজের গ্রামে ফিরে দেখল পুরো গ্রামটাই ফাঁকা। ঘরবাড়িগুলো জনশূন্য। ঘেসো জমির মাঝখান দিয়ে পায়েহাঁটা পথ। দড়িতে মেলে দেওয়া কাপড় উড়ছে। টিউবওয়েলের নিচে জমে আছে জল। কিন্তু প্রাণের চিহ্ন নেই কোথাও। কিছু আগেই যেন সবাই ছিল। হঠাৎ উধাও হয়েছে। তারপর…

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896425693.jpg

আমরা দুইটা কাম করবার পারি বাবাসাহেব। এক, আপনারে মায়ানগরের ফিরতি গাড়িতে উঠায়া দেওয়া, দুই…’—বৃদ্ধটির মুখে বাবাসাহেব সম্বোধন শুনে কিছুটা ধাতস্ত হওয়া গেল। কমে এলো আতঙ্কের ভার। অজানা জায়গায় অপরিচিত জনগণের কৌতূহলের কারণ হতে কার স্বস্তি লাগবে? আমি আরেক কাপ চায়ের কথা বললাম। ব্যাকপ্যাক থেকে একটা সিগারেট বের করে টংয়ের খুঁটিতে ঝুলন্ত গ্যাসলাইটারে সেটা ধরিয়ে দীর্ঘ একটা টান দিলাম। নিকোটিনের তিতকুটে আর কষটা স্বাদ মুখ হয়ে আমার কণ্ঠের দেয়ালে ঘাঁ মারল। খুশখুশে কাশি উঠে এলো প্রতিক্রিয়ায়।
বৃদ্ধ বললেন, মায়ানগর ফিরত যান আপনি। আমগো এলাকায় নঈম ডক্তর বইলা কেউ থাকে না।
জ্বি। আমি বুঝেছি চাচামিয়া।
বুঝলে তো ভালাই। এখন ছয়টা বাজে। ঠিক রাইত পৌনে নয়টায় এখ্যান ট্রেন নরসিংহ থেকে মায়ানগরে ফেরে। আমগো ইস্টিশন থিকা সেইটায় উঠবার পারবেন। সোজা চইলা যান। উইটিং রুমে বইসা অপেক্ষা নিবার পারেন। চাইলে একটু ঘুমায়াও নিলেন।

মিয়াভাই, আপনার পরিচয় তো খোলাসা হলোনা। নাম কি আপনার? ভিড়ের মাঝখান থেকে সুদর্শন এক যুবক জানতে চাইল হঠাৎ। বয়সে আমার ছোট হবে। এক ধরনের উপহাসই হয়তো খেলা করে উঠল ভিতরে, বিরূপ পরিবেশকে সামাল দেবার মেকানিজম কি বলা যায় ব্যাপারটাকে?
আমার নাম শিপলু। তবে ওই চাঅলা ভাই তো জানেন আমার পরিচয়। তার থেকে সব জেনে নেবেন আমি চলে যাওয়ার পর।
খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হলো না। যুবকটি কৌতূহলের সুরে প্রশ্ন ছুড়ল আবার, আপনি লেখেন। সাংবাদিক আপনি, ঠিক ধরেছি?
না রে ভাই।
আপনার ব্যাগে তাহলে কী? ক্যামেরা? আমাদের খুলে দেখাবেন?
কথাবার্তার এই পর্যায়ে বৃদ্ধটি সেই একইরকম কাঁপা কিন্তু মিহি কণ্ঠে ধমক লাগাল। ‘হইছে, থাম তো মুরশিদ। ইনি লোক ভালো, দেইখা বুঝোস না? সত্য কইতাছে।’

কোনো উপায় না দেখে হাত উঁচিয়ে একটা রিকশা ডাকলাম। লোকগুলো আমাকে ঘিরে রাখা বৃত্ত ভেঙে বেরোবার পথ করে দিল। মায়ানগরে ব্লকের পর ব্লক বহুতল দালানের গ্রাস চোখ সওয়া আমার কিন্তু এই ভুতুড়ে শহরটি কীরকম ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে উঁচু উঁচু দালানে, দৃষ্টি বাধা পাচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই। ঘিয়ে, ছাইরঙা কিংবা সাদা বাড়িগুলো মাঝখানে সড়ক রেখে দু পাশে সীমানা দেয়াল তুলেছে। অধিকাংশই নতুন। ছোট ছোট জানালা, বারান্দা নেই, কংক্রিটের খাঁচা যেন। কিছু আবার আছে সুপরিসর, ঝুলন্ত বারান্দায় নারী পুরুষ কিংবা শিশু।

এভাবে কে চায় সেধে বিপদে পড়তে? খুব খারাপ কিছু ঘটতে পারে কখনোই ভাবিনি। আগেরবার পীরের মহল্লায় এসে বেশ তো লেগেছিল। তিনদিনের ছুটি রিপনদের বাসায় শুয়ে বসে আড্ডা মেরে কাটিয়ে দেওয়া চলবে, এই ছিল পরিকল্পনা। অনুমান ছিল, মায়ানগর থেকে এভাবে কাউকে না বলে ওর অকস্মাৎ অন্তর্ধানের কারণ বিয়ে। জানি না, হয়তো দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে পরিণয় এগিয়ে এসেছিল তার। খুব রিজার্ভ ধরনের মানুষ রিপন। এত বছর একসঙ্গে কাজ করলাম, কত জায়গায় গিয়েছি একসঙ্গে আমরা। অথচ কোনোদিন নিজের একান্ত বিষয়ে মুখ খুলেছে তা হয়নি।

সে তুলনায় রিপনের আব্বা-আম্মাকে মনে হয়েছিল প্রাণখোলা। গাছপালার দারুণ শখ ছিল। তমালিকার বিয়েতে এসে দিন চারেক ছিলাম আমি। বোঝা চলছিল, একদম একলা হয়ে পড়বেন তারা। রিপন শহরে ফিরবে আমার সঙ্গে, তখন এ দুজনের কাটবে হাতছাড়া হওয়া দু সন্তানের স্মৃতিচারণ করে। নিঃসঙ্গতার প্রশ্নেই একদিন নঈম চাচা আমাকে বলেছিলেন, ‘বুঝলে শিপলু, ঘরের চেয়ে শক্তিশালী বন্ধু কিছু আর নেই। দেখো, মানুষ কেমন কাছের মানুষকে ছেড়ে চলে যায়, ঘর কিন্তু কখনো মানুষকে ছাড়ে না। সে আশ্রয়দাতা, সঙ্গী হিসেবেও চমৎকার। এই যে বনে-বাদাড়ে ভর্তি বাড়িটা দেখছো, আমার পরদাদার হাতে তৈরি। এতগুলো প্রজন্ম সে পার করল। এ বাড়ি কথা বলে, তা জানো তো?’ চাচি হেসে উঠেছিলেন, ‘ছেলেটার মাথা খারাপ করা আর কী! বাড়ি কথা বলবে কেন?’

কিন্তু এখন? খোঁজ তো দূর, যেনবা এই এলাকায় রিপন আর ওদের কথাবলা বাড়িটার অস্তিত্বই ছিল না কোনোদিন।

সন্ধ্যা নামল ধীরে ধীরে। দোকানপাটে জ্বলে উঠল লালচে বা শাদাটে বাল্ব। পীরের বাজার ছাড়িয়ে আরো অনেকটা দূরে রেল স্টেশন। রিকশার নিচে বাঁধা হারিকেন ঝাপসা আলো ফেলছে আধো-অন্ধকার পথের শরীরে। দু পাশে দালানগুলো কমে গিয়ে বেড়ে চলেছে গাছপালা আর খানাখন্দের সারি। হঠাৎ করেই যেন বা গিরিপথ ছেড়ে সমভূমির দিকে এগিয়ে চলেছি। আকাশের চেহারা এখন আর পরিষ্কার নয়, বেশ মেঘ জমেছে, বৃষ্টি আসলে বিপদে পড়ব। ছাতা কিংবা রেইনকোট, কোনো কিছু আনবার দরকার মনে করিনি রওনার আগে। অন্য সময় হলে এমন দৃশ্য আর পরিবেশ আমাকে আনন্দ দিত। মায়ানগরে এমন নিরালায় রিকশা ভ্রমণের উপায় তো আর নেই। শব্দে দূষণ, বাতাসে দূষণ, মানুষেও।

সোজা রাস্তাটা ডানে মোড় নিয়ে সম্ভবত স্টেশনের দিকে চলে গেছে। সেদিকটায় দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূর্তি হাত উঁচিয়ে কিছু ইশারা করছে। কাছাকাছি হতে দেখলাম, সেই সুদর্শন যুবকটি, কী নাম যেন? বিষণ্নতায় ভার হয়ে থাকা হৃদয়কেও একটা নিরুত্তাপ কৌতূহল দখল করে নিল মুহূর্তে। রিকশাঅলাকে বললাম, ‘ভাই, একটু সাইড করেন তো একপাশে।’

‘মিয়াভাই, আমাকে চিনেছেন? আমার নাম মুরশিদ। ভয় পেয়ে চম্পট দিচ্ছেন নাকি?’ অন্ধকারেও লোকটার সাদা দাঁত দেখে বোঝা গেল নিঃশব্দে হাসছে। এবার কিছু মুহূর্ত আগের কৌতূহল ছাপিয়ে হৃদয় দখল করল একটা ভয়ানক ক্রোধ।
ফাজলামো করার জায়গা পান না? রাজধানীতে ফিরে আপনাদের ছেড়ে দেব ভেবেছেন?
এই যে মিয়াভাই, রাগ করছেন দেখি। রাগের কিছু নেই। আবার ধরেন, আপনি বন্ধুর সন্ধান ভালোমতো না করেই পালিয়ে যাচ্ছেন…
আমি মোটেই পালিয়ে যাচ্ছি না।
বললেই কি মেনে নেব? কলিগের সন্ধানে এসে তাকে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন না?
অনুমতির প্রয়োজন বোধ না করেই রিকশায় উঠে এলো মুরশিদ। আমুদে কণ্ঠে রিকশাঅলাকে বলল, ‘নেন দেখি ভাই। সামনে নেন আবার।’

হেলেদুলে রিকশা চলতে শুরু করল। মোরশেদ ছোটখাট স্বাস্থ্যবান মানুষ। কালো সুতি প্যান্টের ওপর নীল সাদার চেকচেক ফতুয়া পরেছে, অচেনা পারফিউমের সুবাস আসছে তার গা থেকে। ফাঁকে ফাঁকে জরদার ঘ্রাণও। সে যে পান খায় আগে খেয়াল করিনি। কিছুদূর চুপচাপ রিকশা এগিয়ে গেল, কাছাকাছি কোথাও থেমে থেমে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ফতুয়ার বুক পকেট থেকে এক খিলি পান বের করে মুখে পুরল সে।

দেখতেই তো পাচ্ছেন শহরটা বদলে গেছে কীরকম? সাত বছর আগে যেমন দেখেছেন, এতদিন পর আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও অবাক মানত। একতলা বাড়ি পেয়েছেন একটাও? পাবেন না হাজার খুঁজলেও। সব ছয়তালা সাততালা দালান। নানান এলাকার মানুষে মাছির মতো ভনভন করছে। তবু ছোট শহরের এই সুবিধা। কিছুদিন গেলেই সবাই সবাইকে চিনে ফেলে।
আমার একটা কথার জবাব দেবেন দয়া করে?
কী কথা?
নঈম ডাক্তার বা রিপন নামটা কি সত্যিই এমন অপরিচিত? কী এমন হয়ে গেল এর মাঝে? একবারও আমার মনে হচ্ছে না যে ভুল এলাকায় এসে ওদের সন্ধান করছি।
না মিয়াভাই, অপরিচিত কেন হবে? সব ঘটনা সবার সামনে তো বলাও যায় না।
কী বলব তা ভেবে উঠবার আগেই আমাদের রিকশা থেমে গেল। কিন্তু রেল স্টেশন কোথায়? এদিকটা দেখছি শহরের পরিত্যক্ত অংশ। চারদিকে বাড়িঘর কিছুই নেই। একসময় ছিল তার প্রমাণ হিসেবে অসমতল ভিতগুলো রয়ে গেছে। বাজারটা কেউ গুঁড়িয়ে দেয়নি তবে ম্লান অন্ধকারে ছায়া ছায়া শাটারবিহীন দোকানের সারি, খাওয়ার হোটেলগুলোর সামনে উঁচু মাটির বিশাল চুলোতে ধ্বস নেমেছে। মুরশিদ বলল, ‘ওই পশ্চিমে সোজা হেঁটে যান, বাজারটা পার হলেই রাস্তার পাশে দেখবেন দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ওইটাই খুঁজছেন আপনি। এগিয়ে যান।’

যুবকটির কথাবার্তা বোধের অগম্য হয়ে উঠেছে। তবু কিছু বলার চেয়ে মনে হলো নেমে যাই রিকশা থেকে। ব্যাকপ্যাকটা কোলের ওপর থেকে কাঁধে চড়িয়ে পশ্চিমে অস্থির পায়ে হাঁটা ধরলাম। ওই তো, নঈম ডাক্তারের বাড়ি ছাড়া ওটা আর কী?

হ্যাঁ, অবিকল সেই বাড়ি। গেটের দু পাশে নারিকেল গাছ দুটির মাথা বাতাসে নৃত্যরত। কিছু আগের গুমোটভাব কেটে গেছে। বাসার ছাদে এক ছোটখাটো মিনিয়েচার অরণ্যের মতো তৈরি হয়েছে টবে লাগানো গাছে, সেখানে জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। কিন্তু মানুষ কোথায়? আলো জ্বলছে না যে ভিতরে? কয়েকবার রিপনের নাম ধরে ডাকলাম। কোনো সাড়া এলো না। গেট পেরিয়ে ছোট্ট একটা উঠোনের মতো ছিল, এখন ঠিক উঠোনের কোন দিকটায় দাঁড়িয়ে আছি ঠাহর করা যাচ্ছে না। আঁধার বাড়ছে প্রতি মুহূর্তেই।

‘পেলেন কাউকে?’ মুরশিদের প্রশ্নে চমকে উঠলাম। নিঃশব্দে কখন পাশে দাঁড়িয়েছে।
না, কেউ তো সাড়া দিল না।
কেউ থাকলে নিশ্চয়ই দিত।
দেখেন ভাই, আপনাদের শহরে ঢুকবার পর থেকে কোনো কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। খুলে বলবেন প্লিজ?
প্লিজের কিছু নেই আসলে। মাথায় ঢুকবে সব, ধীরে ধীরে।
মানে?
একটু আগেই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম না? আবার করি, গোটা পীরের মহল্লায় একতলা বাড়ি দেখেছেন কোনো?
ভুল বলছে না মুরশিদ। বারবার যে মনে হচ্ছিল শহরটা আগের মতো নেই, এই কি সেই বদলের কারণ?
কী ভাবেন? দেখেন নি তো? এখন এই যে নঈম ডক্তরদের ভিটায় দাঁড়িয়ে আছেন, গোটা শহরে এই একটাই বাড়ি যেটা একতলা। শহরের সমস্ত লোকজন ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছিল তাদের পুরনো নিবাস। বহুতল ভবনের সংখ্যা যেমন বাড়ছিল শহরের নতুন অংশে, এর পক্ষে জনমতও। এমনকি যাদের অর্থ নেই, তারাও চাইছিল উঁচুতে উঠতে। দেখছেন না, শহরের এই দিকটা কীরকম পরিত্যক্ত হয়ে আছে? এ মহল্লাটা ধীরে ধীরে সমান করে দিয়েছে নগরভবনের বুলডোজার এসে। শুধু ওনারাই ছিলেন সবকিছুর বিপক্ষে। আপনার কলিগ আর তার বাবা-মা। এ বাড়িটা তাই রয়ে গেল। অবিকল। কেউ একটা টোকা পর্যন্ত দেয় নাই কোনো দেয়ালে।
বাড়ি রয়ে গেল। কিন্তু ওরা কোথায়? কী করেছেন আপনারা তাদের সঙ্গে?

আমরা একটা বিপ্লব শুরু করেছিলাম। সেই বিপ্লবের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল নঈম ডক্তরের পরিবার। সবাই এই পুরনো দিকটা ছেড়ে গেলেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে রইল। একঘরে হয়ে গেলেও, দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আর তাদের অবিবাহিত পুত্র, মেয়েটার বসবাস তো বিদেশেই ছিল বিয়ের পর থেকে। তাদের আর বিশেষ প্রয়োজন কী সমাজের কাছে? কিন্তু আপনি তো অস্বীকার করবেন না যে, সমাজের সিদ্ধান্তে যারা নেই, সমাজে থাকবার কোনো দরকারও তাদের নেই।
নেই মানে? ওরা কোথায় এখন? আপনারা এই সামান্য কারণে তিনজন মানুষকে ভিটেছাড়া করেছেন?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896478188.jpg

নাহ। আমরা কি ছোট লোক? ঠিক এক সপ্তাহ আগে টাউন হলে সভা হয়েছিল। ভোটাভুটি। পীরের মহল্লা হবে দেশের প্রথম বহুতল শহর। আমরা সেইটা থেকে মাত্র একধাপ দূরে ছিলাম। নগরপিতা বললেন, ‘নঈম ডক্তর যদি এখনো তার সিদ্ধান্ত থেকে না সরে আসে, তবে ভিন্ন উপায় আমাদের সামনে নেই। একজন মানুষ আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা হতে দেব না আমরা।’ পুলিশ কমিশনারের দিকে চেয়ে নগরপিতা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তাই কি দেওয়া উচিত?’ উঠতি বয়সের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণী তখন বলেছিল, ‘এমন ডিসিশান পুরো শহরটাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। কেস-কামারি হবে, পত্রিকায় সংবাদ হবে, নানান আশঙ্কা। তার জবাবে নগরপিতা উত্তর দিয়েছিলেন, আহা, সে কী চমৎকার উত্তর, ‘এত বড় একটা বিপ্লব হতে যাচ্ছে, আর লোকে জানবে না? দরকার পড়লে লোকে আন্দোলন করবে দিন রাত। পায়ে হেঁটে লং মার্চে যাবে মায়ানগর অভিমুখে। অনশন চলবে সংসদের সামনে। একটা ব্রাইট ফিউচারের জন্য এমন সংগ্রাম কি নগরবাসি করবে না?’

অন্ধকার গাঢ় হবার আগেই আকাশ জুড়ে অজস্র নক্ষত্র ফুটে গেল। সেই নক্ষত্রের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যে পৃথিবীতে আমি আছি এখন, একে ঠিক চিনি না। মুরশিদ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘চলেন, আপনাকে ইস্টিশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’
পায়ে হেঁটে পরিত্যক্ত বাজারটা পেরিয়ে এলাম। যেখানে রিকশাটা ছিল, অবিকল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রিকশাঅলা নেই। কী করব ভেবে পেলাম না কয়েক মুহূর্ত। মায়ানগর ফিরে কী বলব ম্যানেজমেন্টকে?

আমার চিন্তার সুতো কাটল অজস্র মানুষের পায়ের শব্দ। একদল লোক যেন মিছিল করে এদিকেই আসছে এগিয়ে। প্রায় সবার হাতে চার্জার লাইট। মিছিলের সামনের দিকে সেই বৃদ্ধটি। পাশে রুগ্ন আর অস্বাভাবিক লম্বা এক লোক। সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরে থাকায় যাকে দীর্ঘ এক মৃতদেহ বলে ভ্রম হলো এক মুহূর্তের জন্য।

মিছিলটি আমার খুব কাছে এসেই থেমে গেল। যতজনের চোখের দিকে তাকাবার সুযোগ হলো, তাদের দৃষ্টিতে একধরনের চেপে রাখা বেদনা। বৃদ্ধটি অনুযোগ করে বললেন, ‘কাজটা তুই ঠিক করোস নাই রে মুরশিদ। বাবাসাহেবরে ইস্টিশনে পাঠায়া দিলেই ভালো করতি।’

বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক দীর্ঘাঙ্গ লোকটিই কি নগরপিতা? শোনা যায় না প্রায় এমন খসখসে কণ্ঠে সে বলল, ‘আপনিই শিপলু? রিপনের বন্ধু?’
জ্বি।
শুনলাম রাজধানীতে ফেরত যাচ্ছেন?
হ্যাঁ যাচ্ছি।
কেমন দেখলেন আমাদের শহর?

কিছু বলবার মতো শব্দ খুঁজে পেলাম না আর। এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। কোন এক অফুরন্ত ক্লান্তির ভাণ্ডার থেকে যেন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে ঘুমের আরক। অবসন্ন হয়ে উঠল মন ও শরীর। লোকগুলোর হাতে চার্জার জ্বলছে। মেঘ ডাকছে আকাশে। হালকা বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। আম্মা এর নাম দিয়েছিলেন সুঁইসুঁই বৃষ্টি। কিছুক্ষণের এক অসহ্য নীরবতা শেষে লোকটা বলল, ‘মায়ানগর আর ফেরা হবে না আপনার। বহুতল বিপ্লবের একটা স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। একটা স্মৃতির বাগান। তার দেখাশোনা করতে যোগ্য লোকও তো চাই আমাদের।’
‘মানে?’
নগরপিতার সেই অপরিবর্তনীয় খসখসে কণ্ঠ ঘোষণা করলো, ‘নঈম ডক্তরের বাড়িটাকে আমরা জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করব। আপনি হবেন এই জাদুঘরের কিউরেটর।

   

পাক বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য বেশী সময় দাবি মুজিবের



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
পাক বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য বেশী সময় দাবি মুজিবের

পাক বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য বেশী সময় দাবি মুজিবের

  • Font increase
  • Font Decrease

 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ঊনসত্তুরের উত্তাল দিনগুলিতে স্বৈরশাসক আয়ুব খান একের পর এক বিরোধীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন, যদিও তাতে তাঁর ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম হয়নি। সেই সময়কার ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের খবর গুরুত্বের সঙ্গে স্থান করে নেয়। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডর খবর গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। তেমনি একটি খবর (২১ মার্চ ২০২৩) প্রকাশ করে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা।

ঢাকার দ্য মর্নিং নিউজ’কে উদ্ধৃত করে দৈনিকটি ‘পাক বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য বেশী সময় দাবি’ শীর্ষক খবর প্রকাশ করে। খবরে বলা হয়, ‘ঢাকার মরনিং নিউজ-এর খবরে প্রকাশ, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমান রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য অধিক সময় ধার্য করার দাবি জানিয়েছেন।’

বার্তা সংস্থা ‘ইউ এন আই’ এর বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘শেখ বলেন যে, বিদেশী সংস্কৃতির ধুয়া তুলা রবীন্দ্র সংগীত বাতিল করা চলবে না। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলার কবি নন, তিনি সারা বিশ্বের।’

এতে আরও বলা হয়, ‘শেখ প্রশ্ন করেন যে, আমরা যদি শেকসপীয়র, হাফিজ, মারকস এবং লেনিনের গ্রন্থ পড়তে পারি তবে কেন রবীন্দ্র সাহিত্য পড়তে পারব না? জ্ঞান লাভের জন্যই লোকে এইসব বই পড়েন।’

পাশেই ‘ইউ এন আই’ এর বরাতে সিঙ্গেল কলামে ‘রেডিও পাকিস্তান স্বায়ত্তশাসিত করপোরেশন হচ্ছে’ শীর্ষক আরেকটি খবর। খবরে বলা হয়, ‘ রেডিও পাকিস্তান ১ জুলাই থেকে স্বায়ত্তশাসিত করপোরেশনে পরিণত হবে কাল রাওয়ালপিন্ডিতে ঘোষণা করা হয়েছে।’

সামরিক শাসক আইয়ুব খানের নতজানু হওয়ার খবর জানিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট আয়ুব খাঁর মন্ত্রিসভা আজ এই সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত করে বিরোধীপক্ষের আরও একটি দাবি মেনে নেওয়া হল। বিরোধিপক্ষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দাবি করে আসছিল।’

(চলবে...)

;

ধর্মের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস জানা যাবে যে গ্রন্থে



অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অধ্যাপক ড. মোঃ মোজাম্মেল হক রচিত ‘ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ:  প্রারম্ভকাল থেকে ১৫০০ প্রাক সাধারণ অব্দ পর্যন্ত’ গ্রন্থটি ধর্ম সম্পর্কে জানার এক অসাধারণ স্মারক গ্রন্থ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সভ্যতার যুগ অবধি ধর্মের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে এনেছেন লেখক, যা শিক্ষার্থী থেকে বোদ্ধা পাঠক-সবার জন্যই হবে সুখপাঠ্য। ধর্ম সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত। পৃথিবীব্যাপী মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ভিন্নতা আছে। ভিন্নতা আছে জাতীয়তার ক্ষেত্রেও। এই জাতীয়তা এবং ধর্মীয় ভিন্নতা মানুষে মানুষে ভিন্নতা সৃষ্টি করেছে। এই ধর্মীয়বোধের আচার-আচরণ কোথা থেকে কখন শুরু হয়, এ গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে যে, সভ্যতা যুগের পূর্বেও ধর্ম ছিল। তবে সেই ধর্ম ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। মূখ্যত জীবন-মৃত্যু নিয়েই ছিল মানুষের ভাবনা। গ্রন্থটির সার-সংক্ষেপে বলা হয়, মানুষ মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত হয়ে নতুন এক জগতে বসবাস করে-এমন সাধারণ ভাবনাই ছিল প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বিশ্বাসে। প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা এই জাগতিক জগতের মতো পরজগত সম্পর্কে কল্পনা করতো। এই কারণেই মৃত ব্যক্তির সাথে জাগতিক জগতের খাবার ও প্রয়োজনীয় হাতিয়ার প্রদান করা হতো, যাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে  নতুন অথচ একই রূপ জগতে বিচরণ করে তার জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

পরজগত সম্পর্কে মানুষের এই সাদামাটা বিশ্বাস সভ্যতার সময়ে এসে আমুল পরিবর্তন হয়। এই সময়ে মানুষের কল্যাণের ক্ষেত্রে জাগতিক পৃথিবীতে বিরাজমান গ্রহ-নক্ষত্রগুলোকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়। এবং প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্রের ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয়। এই গ্রহ নক্ষত্রগুলোর অনুকম্পায় সফল সফল উৎপাদন ও অনাবিল আনন্দঘন জীবন-যাচনের নানারূপ কাহিনী সৃষ্টি করে গ্রহ নক্ষত্রের ওপর মানুষের বিশ্বাসকে আরও অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। সে সময়ে মিথ তৈরি হয় যে, জাগতিক পৃথিবীর মালিক হচ্ছেন ঈশ্বর। এবং রাজা বা ফারাওগণ হচ্ছেন কোনো না কোনো গ্রহ-নক্ষত্রের পুত্র। ফলে ভূমি ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠী রাজা বা ফারাও কে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের পুত্র মনে করে উৎপাদিত ফসলের অংশ উপঢৌকন অথবা রাজস্ব হিসেবে প্রদান করে পুণ্য অর্জন করতো। অন্যদিকে, রাজা বা ফারাও যে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতিনিধি/পুত্র সে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতীক হিসেবে প্রতীমা তৈরি করে মন্দিরে স্থাপন করতো।

মিথের নিগূঢ় অর্থের আলোকে মন্দিরে দেবতার উদ্দেশ্যে রাজা বা ফারাও প্রাত্যহিত, পাক্ষিক, মাসিক ও বাৎসরিক পুজা-পার্বণ এবং উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ রেখে রাজ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতো। রাজাদের এরূপ কর্মকা-ের কারণেই সভ্যতার যুগে ধর্মীয় চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপে আবির্ভূত হয়েছিল- যা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। সভ্যতার যুগে মূর্তি, পূজা ও মন্দির কেন্দ্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় অতিষ্ঠ হয়ে কতিপয় জনগোষ্ঠী সভ্যতার যুগের শেষের দিকের বিমূর্ত মতবাদ প্রচার করেিেছল। পৌত্তলিকতার বিপরীতে এই মতবাদের মূল বিষয় ছিল বহু দেবদেবীর পরিবর্তে এক ঈশ^র মতবাদ। এবং ঐকান্তিক সাধনা, ধ্যান, ত্যাগ, তিতিক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে মুািক্ত লাভ বা ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করা । প্রাক সাধারণ অব্দে পশ্চিম এশিয়ার হিব্রু মতবাদ, পারস্যের  জোরাস্ট্রার মতবাদ, ভারতের জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম এগুলোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

গ্রন্থটিতে অধ্যায় রয়েছে তিনটি। এগুলো হলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বিশ্বাস, মিশরীয় অঞ্চলের ধর্ম বিশ্বাস, মেসোপটেমীয় অঞ্চলের ধর্ম। গ্রন্থটির শুরুতে মুখবন্ধে সুদূর অতীত থেকেই ধর্ম মানুষকে জীবন চলার পথ ও পাথেয় দেখিয়েছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষা করেছে এবং মানুষের চিন্ত-ভাবনায় সততা ও পরিশুদ্ধতা আনয়ন করেছে। ধর্মের যে বর্তমান রূপ, অতীতে তা ছিল না। অতীতের ভাবনাগুলোকে কেবলই বিশ্বাস হিসেবে ভাবা যেতে পারে। সেখানে মানুষের মধ্যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ভাবনা ছিল কী-না নিরূপণ করা যায়নি। আবার ঈশ্বর সর্বজান্তা, সর্বত্র বিরজমান, এমন বক্তব্যও প্রচারিত হয়নি। মানুষের বিশ্বাসে তখন কেবলই ছিল প্রকৃতি ও তাদের চারপাশে বিরজমান বিশ্ব-ভ্রমান্ডের আকাশ, বাতাস, গ্রহ নক্ষত্র প্রভৃতি। মানুষ এগুলোকে মঙ্গলময় হিসেবে ভাবতো। কারণ এগুলো কোনো না কোনোভাবে মানুষের জীবন চলার  পথকে সহজ ও সুগম করে তুলেছিল। ফলে এগুলো ছিল তাদের কাছে মঙ্গলময়ী দেব অথবা দেবী এবং এদের আর্শীবাদ ও অনুকম্পা পাওয়ার প্রত্যাশায় মানুষ তাঁদেরকে অর্ঘ্য প্রদান করতো।

হিন্দু নর-নারীরা বিয়ের সময় সাতপাক ঘুরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাতবার ঘুর্ণনের পিছনে বিশ্বাস হচ্ছে যে, সদ্য বিবাহিত এই নর-নারী যেন বারবার পুনর্জন্ম নিয়ে একে অপরকে খুঁজে পায় এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। প্রাগৈতিহাসিক সময়ে পুনর্জন্ম বিশ্বাসের ধারা এমন ছিল না। তখনকার মানুষ বিশ্বাস করতো যে, মানুষ মৃত্যুর পর অন্য এক জগতে পুনরাায় জেগে উঠে এবং সেই নতুন জগতেই সে তার জীবন ও জীবিকা পরিচালনা করে থাকে। মৃত ব্যক্তি জেগে উঠে যেন কিছু খেয়ে পুনরায় শিকারে বের হতে পারে, এই বিশ্বাসের কারণে তখনতকার মানুষেরা শবের সাথে কিছু খাবার ও শিকারের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, কবরে উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করতো।

মানুষের এই সাধারণ বিশ্বাসগুলোই ক্রমশ বিবর্তিত ও পরিশিলিত হয়ে সভ্যতার যুগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়ে পৌত্তলিকতাবাদের বিকাশ ঘটে, গ্রহ-নক্ষত্র কেন্দ্রিক দেব-দেবীর সৃষ্টি হয়, দেব-দেবীরদের মধ্যে সমন্বয় ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাদেরকে একটি পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় এবং তাঁদের মহিমা ব্যক্ত করার জন্য অসংখ্য মিথের জন্ম দেয়া হয়। সভ্যতার যুগে আরও লক্ষ করা যায় যে , মিথের অবয়বে এই সময়ে পূজার নিমিত্ত দেব-দেবীর প্রতীকৃতি তৈরি মন্দিরের পরিসীমায় বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীই ছিল মন্দিরে স্থাপিত দেব- দেবীর ভক্ত।

মিশর ও মেসোপটেমীয়ার ধর্মগুলো ছিল অঞ্চল ভিত্তিক (নীলনদ ও দজলা ফোরাত নদীর অববাহিকা কেন্দ্রিক)। সেই তুলনায় ঐতিহাসিক যুগের ধর্মগুলো কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছিল, যেমন, মানিবাদ, জরথুষ্ট্র মতবাদ, বৌদ্ধ মতবাদ প্রভৃতি। এগুলো ছিল সার্বজনীন ধর্ম এবং এগুলোরর অন্তর্নিহিত বক্তব্য বা মতবাদ সকল অঞ্চলের চিন্তা, চেতনা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে প্রচারিত হয়েছিল। অঞ্চলভিত্তিক ধর্মের পরিবর্তে সার্বজনীন ধর্মের সূচনা হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন আসে। যেমন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ সাম্রাজ্য কেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রচলন হয়। দারিয়ূসের নেতৃত্বে গড়ে উঠা পারস্য সাম্রাজ্য এর জলন্ত উদাহরণ।

ধর্মের ক্রমবিবর্তন ধারাটি অত্যন্ত জটিল। এ গ্রন্থে সাধারণ পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে অত্যন্ত সহজ করে এটি আলোচনাটি করা হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সভ্যতার যুগ পর্যন্ত ধর্ম-বিশ্বাসগুলোকে এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদে মিশরীয় মিথের ওগডোডদের সহায়তায় ‘আতুম/রা’দেবতার উত্থান তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদটি এঁকেছেন অসীম চন্দ্র রায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সেন্টার ফল আরকোলজি এ্যান্ড হেরিটেজ রিসার্চ সেন্টার। গ্রন্থটির মূল্য ৩৫০ টাকা। তবে শিক্ষার্থীরা ১৫০ টাকায় এ গ্রন্থটি কিনতে পারবে। গ্রন্থটি ধর্ম সমন্ধে জানতে আগ্রহী পাঠকের কাছে সমাদৃত বলে বিশ্বাস করি।

লেখক: সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

;

কারার ঐ লৌহ কপাট: সৃষ্টি-বিকৃতির ইতিবৃত্ত



নাজমুল হাসান
কারার ঐ লৌহ কপাট: সৃষ্টি-বিকৃতির ইতিবৃত্ত

কারার ঐ লৌহ কপাট: সৃষ্টি-বিকৃতির ইতিবৃত্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩২৮ সালের অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ২২ বৎসর ৬ মাস বয়সে আড্ডার ফাঁকে একটুখানি সময়ের মধ্যে ‘ভাঙার গান’ শিরোনামে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ কবিতাটি গানের সুরে রচনা করেন। 'ভাঙার গান' শিরোনামেই কবিতাটি 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকার ২০ জানুয়ারি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ অনুযায়ী বাংলা পৌষ-মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতা হলেও এটি ছিল মূলত একটি বিদ্রোহাত্মক গান; কবিতাটির শিরোনামের মধ্যেই সেটি প্রকাশ পেয়েছে।

১৯২৪ সালের আগস্ট মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩৩১ সালে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় কবিতাটির সাথে আরও ১০টি কবিতা যোগ করে মোট ১১টি কবিতা নিয়ে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের দুই মাস পর ১১ নভেম্বর ১৯২৪ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারত শাসনাধীন বঙ্গীয় সরকার গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ সরকার আর কখনো এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ফলে পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতে গ্রন্থটি আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারতে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

পটভূমি:

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধীজীর নেতৃত্বে ভারতবর্ষে সত্যাগ্রহ আন্দোলন চলাকালীন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় 'বাঙ্গলার কথা' নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন হেমন্ত কুমার সরকার। ব্রিটিশ বিরোধী এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারত সরকার ব্যাপকভাবে তরুণদেরকে গ্রেপ্তার করতে থাকে। 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকায় স্বদেশী ভাবপুষ্ট লেখা প্রকাশের জন্য ব্রিটিশ-ভারতের পুলিশ ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন দাশকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। ওই সময় 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকার হাল ধরেন চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী শ্রীযুক্তা বাসন্তী দেবী।

একদিন বাসন্তী দেবী 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকায় প্রকাশের জন্য একটি কবিতা লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে দাশ পরিবারের সুকুমাররঞ্জন দাশকে নজরুল ইসলামের কাছে পাঠান। এ সময়ে নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজাফফর আহমদ কলকাতার ৩/৪ সি, তালতলা লেনের একটি বাড়ির নিচ তলায় একই রুমে ভাড়া থাকতেন। 'ভাঙার গান' শীর্ষক এই গানটি সম্পর্কে কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা'-তে লিখেছেন- "আমার সামনেই দাশ-পরিবারের শ্রী সুকুমাররঞ্জন দাশ 'বাঙ্গলার কথা'র জন্য একটি কবিতা চাইতে এসেছিলেন। শ্রীযুক্তা বাসন্তী দেবী তাঁকে কবিতার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন জেলে। সুকুমাররঞ্জন আর আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম।‌ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু ক'রে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে নজরুল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাঁর সেই মুহূর্তে রচিত কবিতাটি আমাদের পড়ে শোনাতে লাগল।”

পড়া শেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতাটি সুকুমাররঞ্জন দাশের হাতে দেন, যা 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাসন্তীদেবীর অনুরোধে পরবর্তীতে নজরুল ইসলাম কবিতাটি সুরারোপ করে সে গানের স্বরলিপিও তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন বলে জানা যায়। ফলে এ গানের সুরকার নজরুল ইসলাম নিজেই। এই কবিতাটি লেখার দুই/তিন সপ্তাহ আগে ওই বাড়িতে থাকার সময়েই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন। চিত্তরঞ্জন দাশ হুগলী জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তিনিসহ সেখানে বন্দি থাকা অন্যান্য স্বদেশী আন্দোলনের বন্দিরা একত্রে কোরাস আকারে কাজী নজরুল ইসলামের দেওয়া সুরে সর্বপ্রথম ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি জেলখানার ভিতরেই গেয়েছিলেন।

ব্রিটিশ রাজরোষের কারণে কাজী নজরুলের লেখা যুগবাণী, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা ও চন্দ্রবিন্দুসহ মোট ৫টি গ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। বাংলা সাহিত্যে সমকালীন অন্য কোনো কবি বা সাহিত্যিকের এত গ্রন্থ একত্রে কখনো বাজেয়াপ্ত হয়নি। ১৯২২ সালে নজরুল 'ধূমকেতু' নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ধূমকেতু'র দ্বাদশ সংখ্যায় 'আনন্দময়ীর আগমন' নামে নজরুলের একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাটি ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ফলে এই কবিতায় নজরুলের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রাজদ্রোহের মামলা হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত নজরুলের বিচার হয়েছিল কলকাতার আলীপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। পরবর্তীতে এ মামলার রায়ে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। রায় ঘোষণার পরেরদিন তাকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

নজরুল ইসলামকে ২৩ নভেম্বর ১৯২২ থেকে ১৫ ডিসেম্বর ১৯২৩ এই এক বছর জেলে রাখা হয়। জেল-জীবনে কয়েদিদের সঙ্গে কোরাস কণ্ঠে তিনি বহুবার এ গানটি গেয়েছেন। যদিও সে গানের কোনো রেকর্ড নাই। পরবর্তীতে গিরীন চক্রবর্তীর গাওয়া এ গানটি সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। গিরীন চক্রবর্তীর গাওয়া সুরই ছিল নজরুল ইসলামের নিজের করা সুর।

মূলভাব:


‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীদের জন্য একটি উদ্দীপনামূলক গান। গানটির মাধ্যমে কবি যে দ্রোহের প্রকাশ করেছেন তা হলো—প্রতিবাদ-ধ্বংসের মধ্য দিয়েই জাগ্রত হবে পরাধীন ভারতে স্বাধীনতার নতুন পতাকা, স্বাধীনতার নতুন সূর্য স্বাধীন জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে আলো ছড়াবে। গানটির মাধ্যমে নজরুল তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিপ্লবীদের মনে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন পরাধীনতার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়ার আমিয় বাণী।

কবিতাটির প্রকাশ সংক্রান্ত ইতিহাস:
১. পত্রিকা: বাঙলার কথা, শিরোনাম: ভাঙার গান, ২০ জানুয়ারি, ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ, শুক্রবার, ৭ মাঘ ১৩২৮।
২. কাব্যগ্রন্থ: ভাঙার গান, প্রথম সংস্করণ- শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ, আগস্ট ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ, কবিতার শিরোনাম ‘ভাঙার গান’। দ্বিতীয় সংস্করণ- ন্যাশনাল বুক এজেন্সি লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম স্ট্রিট, কলিকাতা- ১২। খ্রিষ্টাব্দ ১৯৪৯ । কবিতার শিরোনাম ‘ভাঙার গান’ (গান) ১। পৃষ্ঠা: ১-২।
৩. নজরুল-রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। প্রথম খণ্ড। বাংলা একাডেমি, ঢাকা। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩/মে ২০০৬। ভাঙার গান। গান-১। পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬০।

গানটির রেকর্ড সংক্রান্ত ইতিহাস:
১. Columbia Records- কলাম্বিয়া রেকর্ডস, প্রখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি কলাম্বিয়া’র তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত রেকর্ড। জুন ১৯৪৯, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৫৬, জি.ই. ৭৫০৬। শিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী।
২. এইচএমভি (HMV), হিজ মাস্টার’স ভয়েস- His Master's Voice, জানুয়ারি ১৯৫০, পৌষ-মাঘ ১৩৫৬, এন. ৩১১৫২। শিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী।
৩. ২০০৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে বিবিসি বাংলার শ্রোতারা ভোট দিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুড়িটি বাংলা গানের যে তালিকা করেছে তার মধ্যে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি ১৬তম।

গানটির চলচ্চিত্রে রূপদান সংক্রান্ত ইতিহাস:

১. চলচ্চিত্র: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। কাহিনীকার- চারুদত্ত। চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক- নির্মল চৌধুরী। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বেঙ্গল ন্যাশনাল স্টুডিওর ব্যানারে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ নভেম্বর, রবিবার ১১ অগ্রহায়ণ ১৩৫৬। গানটির চলচ্চিত্রের স্বরলিপিকার ও স্বরলিপিতে করেছিলেন- রশিদুন্‌ নবী। নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (বিংশ খণ্ড)। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, পঞ্চম গান। শিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী ও সহ-শিল্পীবৃন্দ। সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
পর্যায়: বিষয়াঙ্গ- স্বদেশ, সুরাঙ্গ- সামরিক মার্চ, তাল- দ্রুত দাদরা, গ্রহস্বর: সা।
লিঙ্ক: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন https://www.youtube.com/watch?v=F1StxYnf-yU

২. চলচ্চিত্র: জীবন থেকে নেয়া। জহির রায়হান নির্মিত শেষ কাহিনী চিত্র। চলচ্চিত্রটি ১৯৭০ সালের এপ্রিলে মুক্তি পায়। সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীত শিল্পী: খান আতাউর রহমান। শিল্পী: অজিত রায়, খন্দকার ফারুক আহমেদ ও অন্যান্য। চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবির এই চলচ্চিত্রকে ‘বাংলাদেশের প্রথম জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী চলচ্চিত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
লিঙ্ক: জীবন থেকে নেয়া https://www.youtube.com/watch?v=4gOJVlb_9-A

‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’ উভয় চলচ্চিত্রেই শিল্পী গিরীন চক্রবর্তী এবং অজিত রায় ও খন্দকার ফারুক আহমেদ গানটিকে কাজী নজরুল ইসলামের সুরে গেয়েছেন। দুটি চলচ্চিত্রের গানের সুরের মধ্যে সামান্য একটু ভিন্নতা থাকলেও উভয় ক্ষেত্রেই গানটির বিপ্লবী মূলভাব ফুটে উঠেছে। চেতনার সাথে মিল রেখে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে গানটিকে বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। মূল গানটি জেলখানায় বসে কয়েদিরা কোরাস কণ্ঠে গেয়েছিলেন বলে দুটি চলচ্চিত্রেই গানটিকে জেলখানার কয়েদিদের দ্বারা কোরাস কণ্ঠে গাওয়ানো হয়েছে।

কবিতাটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।


ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

এখানে ‘কারা’ মানে কারাগার, তৎকালীন পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতের যে কারাগারে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত তরুণ বিপ্লবী বীরদের গ্রেপ্তার করে আটক করে রাখছিল। সেই কারাগারের শক্ত লোহার দরজা তথা লৌহকপাট ভেঙে ফেলে তাকে লোপাট অর্থাৎ ভেঙেচুরে গুড়িয়ে ধূলিসাৎ করে ফেলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

‘পূজার বেদী’ হলো যেখানে পূজা করা হয়, সে শ্রদ্ধা-সম্মানের স্থান। পূজার বেদীতে মানুষের মনের গভীর থেকে উঠে আসা পরম ভক্তির আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। কবি এখানে স্বদেশকে পূজার বেদীর সাথে তুলনা করেছেন। যে পূজার বেদীতে ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য থাকার কথা সে বেদীতে আজ ব্রিটিশ সরকার দ্বারা অত্যাচারিত ভারতের বীর সন্তান, স্বাধীনতাসংগ্রামী, বিপ্লবীদের রক্ত জমাট বেঁধে আছে, সে বেদীতে আজ পরাধীনতার শিকল পরানো। এ বেদী আজ বেদী নেই, একে নির্মমতার পাষাণে পরিণত করা হয়েছে। এ শিকল ভেঙে, জমাটবাঁধা রক্ত সরিয়ে পাষাণময় পূজার বেদীকে মুক্ত করে মায়াময় ও পবিত্র করতে হবে, অর্থাৎ পরাধীন দেশের শোষণ-নির্যাতন থেকে দেশকে মুক্ত-স্বাধীন করে তাকে উপভোগ্য ও আত্মনির্ভর করতে হবে।

ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

ঈশান শব্দের অর্থ শিব, মহাদেব, মহেশ্বর। এর আরেকটা অর্থ উত্তরপূর্ব কোণ। হিন্দুমতে শিব প্রলয়ের দেবতা এবং ধ্বংসের রাজা বা নটরাজ। এখানে কবি ‘তরুণ ঈশান’ বলতে শিবশক্তির প্রলয়ের সাথে তুলনীয় ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ বীর সন্তান ও বিপ্লবীদের বুঝিয়েছেন। ‘প্রলয়’ অর্থ ধ্বংস, ‘বিষাণ’ শব্দের অর্থ শিঙা। ইসলামি মতে ইসরাফিল শিঙায় ফু দিলে যেভাবে পৃথিবীর প্রলয় বা ধ্বংস শুরু হবে সেভাবে পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে তাদের ‘প্রলয় বিষাণ’ বাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদের সক্ষমতাকে কবি প্রলয়ের দেবতা মহাদেবের মহাশক্তির সাথে তুলনা করে তাদেরকে পরাধীনতার শিকল ভাঙতে প্রলয় বিষাণ বাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

‘নিশান’ মানে পতাকা,‘ধ্বংস নিশান’ মানে যে পতাকা ধ্বংসের প্রতীক, ধ্বংসের নির্দেশনা দেয়। ‘প্রাচীর’ অর্থ দেওয়াল, ‘ভেদি’ মানে ভেদ করা বা ভেঙে-ফুড়ে বেরিয়ে আসা। কবি স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে এমনভাবে ‘ধ্বংস নিশান’ বা ধ্বংসের পতাকা ওড়াতে বলেছেন যেন তা স্বাধীনতাকামী সূর্যসন্তানদেরকে যে কারাগারে আটক রেখেছে সে কারাগার ভেদ করে ফুড়ে বেরিয়ে আসে, পরাধীনতার প্রাচীর বা দেওয়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসে। সে পতাকা দেখে যেন সমগ্র পরাধীন ভারতবাসী স্বাধীন-মুক্ত হবার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়।


গাজনের বাজনা বাজা!
কে মালিক? কে সে রাজা?
কে দেয় সাজা
মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

‘গাজন’ সনাতনধর্মীদের একটা সামাজিক উৎসবের নাম। চৈত্র মাসের শেষ দিকে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, বাঁশি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের মিলিত বাজনা বাজিয়ে গাজন উৎসব পালন করা হয়। মিলিত বাদ্যযন্ত্রের বাজনা বাজায় গাজন উৎসবের বাজনা খুব প্রকট হয়। কবি এখানে গাজনের বাজনার মতো প্রবল শব্দে বাজনা বাজিয়ে লড়াইয়ে নেমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হওয়ার তীব্র আহ্বান জানিয়েছেন।

কবি এখানে ব্যঙ্গ করে ব্রিটিশ শাসকদের স্বরূপ প্রকাশ করার নিমিত্তে পরাধীন ভারতবাসীকে প্রশ্ন করেছেন—কে মালিক, কে রাজা, কে সাজা দেয়, কে মুক্ত, কে স্বাধীন, কে সত্য? অর্থাৎ ওরা বিদেশি, ভিনদেশি, ওরা আমাদেরকে শাসন করার অধিকার রাখে না। এ দেশ আমাদের, এ দেশের মালিক আমরা, এ দেশের রাজা আমরা, এখানে আমরা মুক্ত-স্বাধীন, এখানে আমাদেরকে কেউ সাজা দেওয়ার অধিকার রাখে না। এখানে আমরাই সত্য, ওই ব্রিটিশরাই এখানে মিথ্যা। ওরা মিথ্যার উপরে দাঁড়িয়ে আমাদের সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করতে পারে না।

হা হা হা পায় যে হাসি,
ভগবান পরবে ফাঁসি!
সর্বনাশী
শিখায় এ হীন তথ্য কে রে!

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

ভগবান মানে সর্বশক্তিমান, সর্বমুক্তমান, সর্বমালিক মহাশক্তি। কবি এখানে ভগবান বলতে এ দেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী বীরদের বুঝিয়েছেন। তারাই এ দেশের মালিক। ভগবানকে যেমন বন্দি রাখা অসম্ভব, ভগবানকে যেমন বন্দি করা অসম্ভব, ভগবানকে যেমন বেঁধে রাখা তথা ফাঁসি দেওয়া অসম্ভব, ভগবানকে যেমন ধ্বংস করা অসম্ভব—তেমনি এ দেশের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী বীর, যারা এ দেশের মালিক তাদেরকেও বেঁধে রেখে তথা বন্দি রেখে ফাঁসির দড়ি পরানো অসম্ভব। সুতরাং এই বীরদেরকে জেলে আটকে রেখে তাদের গলায় ফাঁসির দড়ি দেওয়ার যে পায়তারা ব্রিটিশরা করছে তা দেখে কবির হা হা হা কোরে অট্টহাসি পাচ্ছে। কারণ, স্বাধিকারের জন্য যেভাবে প্রতিরোধ-সংগ্রাম চলছে তাতে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ভগবান অর্থাৎ এ দেশের বিপ্লবী-বীরদেরকে ফাঁসি দেওয়া অসম্ভব।

ব্রিটিশ শাসকেরা বিপ্লবী-বীর ও স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দেরকে প্রচণ্ড শাস্তি দেওয়ার কথা প্রচার করে মানুষকে বিপ্লব-বিরোধী করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। তাদের এ চক্রান্তে যাতে মানুষ ভয় পেয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে যায় সে জন্য কবি প্রচণ্ড আস্থার সাথে প্রশ্ন রেখেছেন—বিপ্লবী-বীরদের ফাঁসি দেওয়া যায়, এমন হীন অর্থাৎ নীচ ও জঘন্য তথ্য কে শেখাচ্ছে? কে ছড়াচ্ছে এমন অসম্ভব কথা? অর্থাৎ কবি মানুষকে অভয় দিচ্ছেন যেন ব্রিটিশ শাসকদের এমন চক্রান্তে ভয় পেয়ে বা বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ আন্দোলন থেকে সরে না যায়। কারণ, এই বিপ্লবী স্বাধীনতাকামী শক্তিকে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।


ওরে ও পাগলা ভোলা!
দে রে দে প্রলয় দোলা
গারদগুলা
জোরসে ধরে হেচ্‌কা টানে!

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

প্রলয় বা ধ্বংসের দেবতা এবং ধ্বংসের মাধ্যমে সৃষ্টির দেবতা দুটোই শিব বা মহাদেব। অর্থাৎ মহাদেব ইচ্ছে করলে যেমন সৃষ্টি করতে পারেন, তেমনি ইচ্ছে করলে আবার প্রলয় বা ধ্বংসও করতে পারেন; এটা নিতান্তই তাঁর খেয়াল। এজন্য শিবকে বলা হয় ‘পাগলা ভোলা’। কবি এখানে জেলখানায় বন্দি স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদেরকে ‘পাগলা ভোলা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কবির মতে ব্রিটিশ সরকার এই পরাধীন ভারতের পুরোটাকেই কারাগার বানিয়ে রেখেছে। ফলে এই কারাগারে বন্দি প্রতিটি মানুষই আসলে ‘পাগলা ভোলা’। পরাধীনতার কারাগারে বন্দি স্বাধীনতাকামী মানুষকে কবি আহ্বান করছেন তাঁরা যেন মহাশক্তিধর ‘পাগলা ভোলা’ তথা মহাদেবের ধ্বংস বা প্রলয় ক্ষমতার মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করে পুরো ভারতবর্ষকে দোলা দিয়ে কাঁপিয়ে তাঁদের ক্ষমতার জানান দেয়। তাঁরা যেন এই কারাগার বা গারদের লোহার শিক জোরসে ধরে হেচ্‌কা টান দিয়ে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে মুক্ত হয়ে আসে।

মার হাঁক হায়দারী হাঁক,
কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক
ডাক ওরে ডাক,
মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে!

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

‘হায়দার’ অর্থ শক্তিশালী, তরবারি বা সত্যের তলোয়ার। আব্রাহামিক ধর্মের শেষ নবি হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর আপন চাচাত ভাই ও জামাতা ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর প্রচণ্ড শক্তি ও শৌর্য-বীর্য থাকার কারণে তাকে ‘হায়দার’ বলা হয়। ‘হাঁক’ শব্দের অর্থ হুংকার। কবি ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীকে হজরত আলীর সেই হায়দারী হাঁকের মতো প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে ব্রিটিশরাজের ভিত কাঁপিয়ে পদানত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘দুন্দুভি ঢাক’ হলো একপ্রকার বৃহৎ ঢাক বা দামামা জাতীয় প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র, রণবাদ্যবিশেষ। বন্দি-জীবন আসলে মৃতপ্রায়-জীবন; কবি বন্দিদশাকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন এবং সেই মৃত্যুদশা থেকে জীবনকে মুক্ত করে স্বাধীন দেশে সজীব হয়ে গৌরবের সাথে বেঁচে থাকার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন এবং সে সাহস সঞ্চার করেছেন।


নাচে ওই কালবোশাখী,
কাটাবি কাল বসে কি?
দে রে দেখি
ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি!

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

বাংলা বৈশাখ মাস এবং এর কাছাকাছি মাসগুলোতে যে প্রচণ্ড ঝড় হয় তাকে ‘কালবোশাখী’ বলে। পরাধীন ভারতবাসীর মনের ভিতরে ব্রিটিশবিরোধী যে ভয়ঙ্কর আক্রোশ ক্রমাগত তোলপাড় করে চলেছিল তাকে কবি কালবোশাখীর সাথে তুলনা করেছেন। তিনি মুক্তিকামী দ্রোহী ভারতবাসীকে কালবোশাখীর ভয়ঙ্কর প্রলয় শক্তি নিয়ে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, এখন বৃথা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সময় নয়। এভাবে কাল বা সময় হরণ করা খুবই অনুচিত। সময় নষ্ট না করে প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার এখনই সময়।

মহাভারতের কাহিনী অনুসারে ভীম হলো পঞ্চপাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব। ভীম অসম্ভব শক্তিশালী ছিলেন। ভারতবর্ষের বিপ্লবী বীরদের উপরে ব্রিটিশরাজ ভীমের শক্তি প্রয়োগ করে অত্যাচার-নির্যাতন করছে, তাদেরকে গ্রেপ্তার করে ভীমের মতো শক্তিশালী কারাগারে বন্দি করে রাখছে। কবি ভারতবাসীকে আহ্বান করছেন যেন তারা তাদের সংগ্রামী শক্তি প্রয়োগ করে ওই ‘ভীম কারা’ বা শক্ত কারাগারের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়ে তা উপড়ে ফেলে মুক্তি-সংগ্রামীদের মুক্ত করে আনে।

লাথি মার, ভাঙ্গরে তালা!
যত সব বন্দী শালায়-
আগুন-জ্বালা,
-জ্বালা, ফেল উপাড়ি।।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

বল প্রয়োগ করে যারা ভারতবর্ষকে দখল করেছে তাদের কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য কবি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী নন, তিনি বল প্রয়োগের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করেই অধিকার ছিনিয়ে আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বন্দিরা কবে মুক্তি পাবেন অথবা আদৌ পাবেন কি না সে অপেক্ষায় তিনি বসে থাকতে রাজি নন। তিনি জনগণের সম্মিলিত শক্তিকে একত্র করে এখনই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সকল বন্দিশালা বা কারাগার ভেঙে সকল বন্দিকে মুক্ত করতে চান। এই শক্তি প্রয়োগকেই কবি ‘লাথি’র সাথে তুলনা করেছেন এবং মুক্ত হওয়াকে ‘তালা ভাঙা’র সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন “লাথি মার ভাঙ্গরে তালা”।

‘আগুন-জ্বালা,ফেল উপাড়ি’ শব্দগুলি দিয়ে কবি স্বদেশীদেরকে উদ্বুদ্ধ করছেন যেন তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করে ব্রিটিশদের সকল অন্যায়, অবিচার, নির্যাতনকে ভারতবর্ষের মাটি থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলেন, উচ্ছেদ করেন। এ দেশের মালিক হবে এ দেশেরই জনগণ, এ দেশকে শাসন করবে এ দেশেরই জনপ্রতিনিধি, ভারতবর্ষ হবে বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম শোষণ-নির্যাতনমুক্ত দেশ।

গানটি বিকৃতির ইতিহাস:

রাজা কৃষ্ণ মেনন পরিচালিত, আরএসভিপি মুভিজ এবং রায় কাপুর ফিল্মস প্রযোজিত, ইশান খাট্টার, মৃণাল ঠাকুর, প্রিয়াংশু পাইনুলি ও সোনি রাজদান প্রমুখ অভিনীত ‘পিপ্পা’ ছবিটি ১০ নভেম্বর ২০২৩ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধকে তুলে ধরেছে। ছবিটিতে নজরুলের গান 'কারার ঐ লৌহকপাট'-এর রিমেক করা হয়েছে। অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রাহমানের রিমেক সংস্করণে গানটি গেয়েছেন ভারতীয় গায়ক রাহুল দত্ত, তীর্থ ভট্টাচার্য, পীযূষ দাস, শ্রায়ী পাল, শালিনী মুখার্জি ও দিলাসা চৌধুরী।

এ আর রাহমান বাংলা গান নিয়ে আগেও কাজ করেছেন। ‘নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস: আ ফরগটেন হিরো’ সিনেমার জন্য রবীন্দ্রসংগীত ‘একলা চলো রে’-এর সংগীতায়োজন তিনি করেছিলেন। এ ছাড়া ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ গানটির সুরারোপও তিনি নিজের মতো করেছেন। তবে নজরুল সংগীত নিয়ে এটাই তাঁর প্রথম কাজ। দক্ষিণ ভারতীয় এ সুরকার তাঁর রেমিক সংস্করণে ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’ গানটির মূল সুরের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট রাখেননি। বিপ্লবী-বিদ্রোহী চেতনার ভাব ও সুরের গানটিকে তিনি লোকগীতির রোমান্টিক ঢংয়ে পরিণত করে নষ্ট করে ফেলেছেন। এমন একটি রুদ্র চেতনার গানকে হত্যা করে তিনি জঘন্য অপরাধ করেছেন যা ক্ষমাহীন।

মূল গানটি কারাগারে মধ্যে গাওয়া হলেও ‘পিপ্পা’ ছবিতে গানটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ছবিতে দেখানো হয়েছে- ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে আগুন জ্বালিয়ে নাচগান করে রীতিমতো উৎসব করে গানটি গাইছেন। গানটি গাওয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে। গানটি রচনার প্রেক্ষাপট এবং এর বিপ্লবী চেতনা এমন উত্সবপূর্ণ দৃশ্যের সাথে যায় না।

চলচ্চিত্রে দৃশ্যের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য বুঝে সেই দৃশ্যের উপযোগী গানের সুর সৃষ্টি করা সুরকারের কাজ। ‘পিপ্পা’ ছবিতে গানের যে পরিবেশ দেখানো হয়েছে ওই পরিবেশে এই বিপ্লবী গানটি খাটে না। সিনেমার দৃশ্যে নরম সুরে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানটি গাইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে আনন্দরত অবস্থায় দেখানো হয়েছে সেটি মানানসই ও যুতসই হয়নি, এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ অসংগতির দায় স্ক্রিপ্টরাইটার ও পরিচালককে বহন করতে হবে। ফলে এ বিকৃতির জন্য এ আর রহমানের সাথে তারাও দোষী।

ভারতীয় গায়ক রাহুল দত্ত, তীর্থ ভট্টাচার্য, পীযূষ দাস, শ্রায়ী পাল, শালিনী মুখার্জি ও দিলাসা চৌধুরী এরা প্রতিষ্ঠিত গায়ক এবং সম্ভবত সবাই বা অধিকাংশই বাঙালি। এই গানের সুর তাদের অজানা থাকার কথা নয়। ফলে এরা সবাইও বিকৃত সুরে গানটি গাওয়ার জন্য অপরাধী।

২০২১ সালে নজরুলের ছোট ছেলে কাজী অনিরুদ্ধের ছেলে কাজী অনির্বাণ ও তাঁর মা কল্যাণী কাজী ‘পিপ্পা’ সিনেমা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গানটি ব্যবহারের লিখিত চুক্তি করেন। চুক্তিনামায় প্রথম সাক্ষী ছিলেন অনির্বাণ কাজী। কাজী অনির্বাণ স্বীকার করেন—মা গানটা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন সুর এবং কথা না বদলে রিক্রিয়েট করার জন্য। মা ওদের বলেছিল, গানটা তৈরি হয়ে গেলে একবার শোনাতে। কিন্তু ওরা তা শোনায়নি। ছবির নির্মাতারা এ দায় এড়াতে পারে না।

উপসংহার:
সব সৃষ্টি কালজয়ী হয় না, সবাই কালজয়ী সৃষ্টি করতে পারে না। যারা কালজয়ী সৃষ্টি করেন তারা তাদের সৃষ্টির সাথে সাথে নিজেরাও কালজয়ী হয়ে অমরত্ব লাভ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম হলেন সেই কালজয়ী স্রষ্টা; তিনি নিজেও অমর, তাঁর সৃষ্টিও অমর। 'ভাঙার গান' শিরোনামে লেখা ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি নজরুলের সৃষ্টিসমূহের মধ্যেও এক অনন্য সৃষ্টি। এ সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এ আর রহমান রাখে না। অনেকে বলেন—সময়ের প্রয়োজনে সৃষ্টির ভিন্নভাবে প্রকাশ হওয়াটা স্বাভাবিক। কথাটা হয়তো সত্য কিন্তু সৃষ্টিকে ভিন্নভাবে প্রকাশ করা এবং তাকে বিকৃতরূপে প্রকাশ করা এককথা নয়। মানুষ যদি পুরনো সৃষ্টির ভিন্নভাবে প্রকাশ সানন্দে গ্রহণ করে তবেই তাকে পরিবর্তন করে প্রকাশ করা হয়, একেই বলে সময়ের প্রয়োজনে সৃষ্টির ভিন্নভাবে প্রকাশ।

‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির সুর পরিবর্তন বাঙালি গ্রহণ করেনি, এটাকে বিকৃতি হিসেবে নিয়েছে। ফলে এ পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।

নাজমুল হাসান: লেখক ও চিকিৎসক।

;

কবি সুফিয়া কামালের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকাখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। 

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের এই দিন (২০ নভেম্বর) সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বিকেল ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সুফিয়া কামালের লেখা কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে- সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, দিওয়ান, অভিযাত্রিক, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি। ‘কেয়ার কাঁটা’ নামে একটি গল্পগ্রন্থ ছাড়াও তিনি ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতি কথা, শিশুতোষ এবং আত্মজীবনীমূলক রচনাও লিখেছেন। সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

;