কিউরেটর



এনামুল রেজা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিকেলটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। রোদের উত্তাপ ও আলো দুটোই ম্রিয়মাণ। বর্ষার দ্বিতীয় মাস অথচ আকাশ পরিষ্কার। ভাসমান সফেদ তুলোর মতো শরৎঘেঁষা মেঘ। চার রাস্তার একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে মন খারাপ হলো। ফুলহাতা শার্টের ডান আস্তিনে কপালের ঘাম মুছলাম। একটা খালি রিকশা আসছে সোজাসুজি। সরে দাঁড়ালাম একপাশে।

রাস্তার ওই ধারে একটা দশতলা বিল্ডিংয়ের নিচে ছোট্ট চায়ের দোকান। ঢালু কংক্রিটের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে তৈরি সিমেন্টের দু সারি বেঞ্চ। তীব্র চায়ের তৃষ্ণা পেল। গরমে প্রাণ বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু চায়ের ঘ্রাণ নাকে এলে কবে আর ঠিক থেকেছে মাথা! বহুক্ষণ ধরেই ঘুরছি পায়ে হেঁটে। রিপনদের বাসাটা কেউ চিনল না। এতজনকে জিজ্ঞেস করলাম। গেটের দু পাশে বড় দুটো নারিকেল গাছওয়ালা একতলা পুরানো বাড়ি, ছাদ ভরে আছে টবে বেড়ে ওঠা অজস্র গাছপালায়। একদম যেন ঝুলন্ত বাগান।

পীরের মহল্লা শহরটির নাম। হবে, আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে এখানে আস্তানা গেড়েছিলেন একজন বা বহুজন পীর। লোকজন আসত, মানত করত বটবৃক্ষে সুতো বেঁধে, দরগায় চড়ত শিন্নি। কল্পনা করে নিতে বেশ লাগে। রিপনরা এলাকার পুরনো পরিবারগুলোর একটি। কখনো তাকে বা তার বাবা নঈমুল হক সাহেবকে জিজ্ঞেস করে অমন পীর বিষয়ক জটিলতার কথা শুনিনি অবশ্য। এর আগে এসেছিলাম একবারই। রিপনের বোন তমালিকার বিয়েতে। সাজানো গোছানো এক ছোট্ট শহর মনে হয়েছিল পীরের মহল্লাকে, বাসার ছাদ থেকেই শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা নদীটা দেখা যেত। বেশ প্রশস্ত হলেও শান্ত সমাহিত নদী, ওইপারে গ্রাম।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মাঝবয়সী লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নঈম ডাক্তারের বাসাটা কোনদিকে জানেন?’ চাঅলা গরম পানির বলক ওঠা একটা কেতলিতে শুকনো কালো চা পাতা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘কোন নঈম ডক্তর?’
ওই যে পীরের বাজারে বড় চেম্বার আছে, বাড়িটা পুরনো ধাঁচের, ছাদ ভরা গাছপালা।
দুইটা বড় নারিকেল গাছ আছে বাড়ির সামনে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম। আপনি চেনেন?
জ্বি চিনি। কিন্তু এসবে লাভ নাই।
চাঅলার উত্তরটা বুঝলাম না। কিসে লাভ নেই? দেখলাম অন্যপাশের বেঞ্চে বসা দুজন লোক আগ্রহী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। একজনকে বেশ চিনলাম। ওই লোকটিকেই না রিকশা থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেছিলাম রিপনদের বাসা কোনদিকে? কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে আবার বললাম, ‘রিপন আর আমি একই অফিসে কাজ করি। এসেছি মায়ানগর থেকে। ঠিক কোন দিক দিয়ে গেলে পৌঁছতে সুবিধা হবে বলবেন?’

আচমকা কাঁধে কেউ হাত রাখলে ঘুরে চাইলাম বাঁ দিকে। কম্পিত মিহি কণ্ঠে রুগ্ন এক বৃদ্ধ কাঁধ থেকে হাতটা না সরিয়েই কথা বলে উঠলেন। ‘নঈম ডাক্তারের বাড়ি খুঁজতাছেন শুনলাম। তা নাম কী আপনের? কুনখান থাইকা আসা হয়?’

বুঝতে বাকি রইল না। ঘণ্টাখানেক ধরে এই সর্পিল অলিগলির ছোট্ট শহরটায় ঘুরে বেড়াচ্ছি রিপনদের বাসার সন্ধানে এবং বেশ রটে গিয়েছে একজন অচেনা লোকের ওধারা অনুসন্ধান। আজকের যুগে বাসাবাড়ির নম্বর ছাড়া কেউ কোথাও যায়? মোবাইল ফোনই বা আছে কেন? তবে সঙ্গে থাকা নম্বরটি যে বন্ধ, বহুবার ডায়াল করেও সংযোগ মেলেনি, কাকে বোঝাব?

দশ বছর একসঙ্গে কাজ করেছি রিপন আর আমি। ঠিক দু সপ্তাহ আগে হুট করেই সে অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। একদিন, দুদিন এমনকি তিনদিনকেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ভেবেছিলাম হয়তো বাড়িতে গিয়েছে জরুরি কাজে। কিন্তু এমন বিনা নোটিশে এতদিনের কামাই অফিস মানবে কেন? শেষে আমিই বাধ্য হয়ে ম্যানেজমেন্টকে অনুরোধ করেছিলাম। রিপনের সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ আমার, আসছে উইকেন্ডে অন্তত একবার দেখে আসি ওদের বাসায় কোনো ঝামেলা হলো কিনা। এরপর অফিস যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা নিশ্চিই অবিচার হবে না। এতদিনের অভিজ্ঞ কর্মী, ওর মতো কন্টেন্ট ডেভলপার চাইলেও যে বাজারে হুট করে মিলবে না, ম্যানেজমেন্টের বেশ ধারণা ছিল। উইকেন্ডের দুদিন আর একদিন বাড়তি যোগ করে মায়ানগর থেকে একশো নব্বই মাইল দূরের মফস্বল শহর পীরের মহল্লায় এসেছি আমি। কিন্তু সাত বছর আগের সেই পুরনো ধাঁচের বাড়িটি খুঁজতে এমন হোঁচট খেতে হবে কে জানত? শহরটির ভুতুড়ে পরিবর্তন হয়েছে এই আধা যুগে, না মেনে উপায় নেই।

বৃদ্ধের প্রশ্নের জবাবে কিছু বলবার আগেই আরো কিছু লোক চায়ের দোকানটিতে জড়ো হয়ে গেল। আমি এক আগন্তুক বসে আছি, আমাকে ঘিরে জনা দশেক মানুষ।
‘শেষ কবে এসেছেন এদিকে আপনি?’ প্রশ্নকর্তা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা দেখা গেল না। তবু উত্তর করলাম, ‘বছর সাতেক আগে। কিন্তু কী বিষয় বলেন তো ভাই?’
চারপাশে একটা মৃদু শোরগোল উঠল। বিষয় আর কী.. শহর কি আর ছোট আছে.. নাকি সেই শহর আছে…
কিন্তু, ওই যে চাঅলা ভাই তো ঠিকই চিনেছিলেন। কী ভাই, চেনেন নাই?
আমার প্রশ্নে চাঅলা হতাশ দৃষ্টিতে দূরে কোথায় চেয়ে রইল। বৃদ্ধ লোকটির কণ্ঠ বেজে উঠল তখন রোদ পড়ে আসা ঘিঞ্জি শহরটির এই কোনে, ‘ও তো সবই চেনে। আপনাকেও চেনে। কী রে চিনিস না?’
চাঅলা বলল, ‘জ্বি। ইনি গল্প লেখেন। এনার স্ত্রীর আটমাসের পেট। কিন্তু এসবে লাভ নাই।’
‘মানে কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্নটা নিজেকেই করলাম বিড়বিড় করে। আমি লেখক কিন্তু বিখ্যাত কেউ তো নই। মাসখানেক পর পদ্ম-র ডেলিভারি ডেট, এই তথ্যও নির্ভুল। ওর কথা মনে পড়তেই কীরকম অদৃশ্য ওজন চেপে বসল আমার কাঁধে। ব্যাখ্যা করা যায় না এমন এক আতঙ্ক টের পেলাম। কী করছে পদ্ম এখন? এমন বিকেলগুলো গল্পের বই পড়ে কাটাতেই ও ভালোবাসে। নধর উপান্তের লেখা ওই বইটা কি এখন পড়ছে ও? সেই যে এক লোক অনেক বছর শেষে নিজের গ্রামে ফিরে দেখল পুরো গ্রামটাই ফাঁকা। ঘরবাড়িগুলো জনশূন্য। ঘেসো জমির মাঝখান দিয়ে পায়েহাঁটা পথ। দড়িতে মেলে দেওয়া কাপড় উড়ছে। টিউবওয়েলের নিচে জমে আছে জল। কিন্তু প্রাণের চিহ্ন নেই কোথাও। কিছু আগেই যেন সবাই ছিল। হঠাৎ উধাও হয়েছে। তারপর…

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896425693.jpg

আমরা দুইটা কাম করবার পারি বাবাসাহেব। এক, আপনারে মায়ানগরের ফিরতি গাড়িতে উঠায়া দেওয়া, দুই…’—বৃদ্ধটির মুখে বাবাসাহেব সম্বোধন শুনে কিছুটা ধাতস্ত হওয়া গেল। কমে এলো আতঙ্কের ভার। অজানা জায়গায় অপরিচিত জনগণের কৌতূহলের কারণ হতে কার স্বস্তি লাগবে? আমি আরেক কাপ চায়ের কথা বললাম। ব্যাকপ্যাক থেকে একটা সিগারেট বের করে টংয়ের খুঁটিতে ঝুলন্ত গ্যাসলাইটারে সেটা ধরিয়ে দীর্ঘ একটা টান দিলাম। নিকোটিনের তিতকুটে আর কষটা স্বাদ মুখ হয়ে আমার কণ্ঠের দেয়ালে ঘাঁ মারল। খুশখুশে কাশি উঠে এলো প্রতিক্রিয়ায়।
বৃদ্ধ বললেন, মায়ানগর ফিরত যান আপনি। আমগো এলাকায় নঈম ডক্তর বইলা কেউ থাকে না।
জ্বি। আমি বুঝেছি চাচামিয়া।
বুঝলে তো ভালাই। এখন ছয়টা বাজে। ঠিক রাইত পৌনে নয়টায় এখ্যান ট্রেন নরসিংহ থেকে মায়ানগরে ফেরে। আমগো ইস্টিশন থিকা সেইটায় উঠবার পারবেন। সোজা চইলা যান। উইটিং রুমে বইসা অপেক্ষা নিবার পারেন। চাইলে একটু ঘুমায়াও নিলেন।

মিয়াভাই, আপনার পরিচয় তো খোলাসা হলোনা। নাম কি আপনার? ভিড়ের মাঝখান থেকে সুদর্শন এক যুবক জানতে চাইল হঠাৎ। বয়সে আমার ছোট হবে। এক ধরনের উপহাসই হয়তো খেলা করে উঠল ভিতরে, বিরূপ পরিবেশকে সামাল দেবার মেকানিজম কি বলা যায় ব্যাপারটাকে?
আমার নাম শিপলু। তবে ওই চাঅলা ভাই তো জানেন আমার পরিচয়। তার থেকে সব জেনে নেবেন আমি চলে যাওয়ার পর।
খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হলো না। যুবকটি কৌতূহলের সুরে প্রশ্ন ছুড়ল আবার, আপনি লেখেন। সাংবাদিক আপনি, ঠিক ধরেছি?
না রে ভাই।
আপনার ব্যাগে তাহলে কী? ক্যামেরা? আমাদের খুলে দেখাবেন?
কথাবার্তার এই পর্যায়ে বৃদ্ধটি সেই একইরকম কাঁপা কিন্তু মিহি কণ্ঠে ধমক লাগাল। ‘হইছে, থাম তো মুরশিদ। ইনি লোক ভালো, দেইখা বুঝোস না? সত্য কইতাছে।’

কোনো উপায় না দেখে হাত উঁচিয়ে একটা রিকশা ডাকলাম। লোকগুলো আমাকে ঘিরে রাখা বৃত্ত ভেঙে বেরোবার পথ করে দিল। মায়ানগরে ব্লকের পর ব্লক বহুতল দালানের গ্রাস চোখ সওয়া আমার কিন্তু এই ভুতুড়ে শহরটি কীরকম ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে উঁচু উঁচু দালানে, দৃষ্টি বাধা পাচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই। ঘিয়ে, ছাইরঙা কিংবা সাদা বাড়িগুলো মাঝখানে সড়ক রেখে দু পাশে সীমানা দেয়াল তুলেছে। অধিকাংশই নতুন। ছোট ছোট জানালা, বারান্দা নেই, কংক্রিটের খাঁচা যেন। কিছু আবার আছে সুপরিসর, ঝুলন্ত বারান্দায় নারী পুরুষ কিংবা শিশু।

এভাবে কে চায় সেধে বিপদে পড়তে? খুব খারাপ কিছু ঘটতে পারে কখনোই ভাবিনি। আগেরবার পীরের মহল্লায় এসে বেশ তো লেগেছিল। তিনদিনের ছুটি রিপনদের বাসায় শুয়ে বসে আড্ডা মেরে কাটিয়ে দেওয়া চলবে, এই ছিল পরিকল্পনা। অনুমান ছিল, মায়ানগর থেকে এভাবে কাউকে না বলে ওর অকস্মাৎ অন্তর্ধানের কারণ বিয়ে। জানি না, হয়তো দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে পরিণয় এগিয়ে এসেছিল তার। খুব রিজার্ভ ধরনের মানুষ রিপন। এত বছর একসঙ্গে কাজ করলাম, কত জায়গায় গিয়েছি একসঙ্গে আমরা। অথচ কোনোদিন নিজের একান্ত বিষয়ে মুখ খুলেছে তা হয়নি।

সে তুলনায় রিপনের আব্বা-আম্মাকে মনে হয়েছিল প্রাণখোলা। গাছপালার দারুণ শখ ছিল। তমালিকার বিয়েতে এসে দিন চারেক ছিলাম আমি। বোঝা চলছিল, একদম একলা হয়ে পড়বেন তারা। রিপন শহরে ফিরবে আমার সঙ্গে, তখন এ দুজনের কাটবে হাতছাড়া হওয়া দু সন্তানের স্মৃতিচারণ করে। নিঃসঙ্গতার প্রশ্নেই একদিন নঈম চাচা আমাকে বলেছিলেন, ‘বুঝলে শিপলু, ঘরের চেয়ে শক্তিশালী বন্ধু কিছু আর নেই। দেখো, মানুষ কেমন কাছের মানুষকে ছেড়ে চলে যায়, ঘর কিন্তু কখনো মানুষকে ছাড়ে না। সে আশ্রয়দাতা, সঙ্গী হিসেবেও চমৎকার। এই যে বনে-বাদাড়ে ভর্তি বাড়িটা দেখছো, আমার পরদাদার হাতে তৈরি। এতগুলো প্রজন্ম সে পার করল। এ বাড়ি কথা বলে, তা জানো তো?’ চাচি হেসে উঠেছিলেন, ‘ছেলেটার মাথা খারাপ করা আর কী! বাড়ি কথা বলবে কেন?’

কিন্তু এখন? খোঁজ তো দূর, যেনবা এই এলাকায় রিপন আর ওদের কথাবলা বাড়িটার অস্তিত্বই ছিল না কোনোদিন।

সন্ধ্যা নামল ধীরে ধীরে। দোকানপাটে জ্বলে উঠল লালচে বা শাদাটে বাল্ব। পীরের বাজার ছাড়িয়ে আরো অনেকটা দূরে রেল স্টেশন। রিকশার নিচে বাঁধা হারিকেন ঝাপসা আলো ফেলছে আধো-অন্ধকার পথের শরীরে। দু পাশে দালানগুলো কমে গিয়ে বেড়ে চলেছে গাছপালা আর খানাখন্দের সারি। হঠাৎ করেই যেন বা গিরিপথ ছেড়ে সমভূমির দিকে এগিয়ে চলেছি। আকাশের চেহারা এখন আর পরিষ্কার নয়, বেশ মেঘ জমেছে, বৃষ্টি আসলে বিপদে পড়ব। ছাতা কিংবা রেইনকোট, কোনো কিছু আনবার দরকার মনে করিনি রওনার আগে। অন্য সময় হলে এমন দৃশ্য আর পরিবেশ আমাকে আনন্দ দিত। মায়ানগরে এমন নিরালায় রিকশা ভ্রমণের উপায় তো আর নেই। শব্দে দূষণ, বাতাসে দূষণ, মানুষেও।

সোজা রাস্তাটা ডানে মোড় নিয়ে সম্ভবত স্টেশনের দিকে চলে গেছে। সেদিকটায় দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূর্তি হাত উঁচিয়ে কিছু ইশারা করছে। কাছাকাছি হতে দেখলাম, সেই সুদর্শন যুবকটি, কী নাম যেন? বিষণ্নতায় ভার হয়ে থাকা হৃদয়কেও একটা নিরুত্তাপ কৌতূহল দখল করে নিল মুহূর্তে। রিকশাঅলাকে বললাম, ‘ভাই, একটু সাইড করেন তো একপাশে।’

‘মিয়াভাই, আমাকে চিনেছেন? আমার নাম মুরশিদ। ভয় পেয়ে চম্পট দিচ্ছেন নাকি?’ অন্ধকারেও লোকটার সাদা দাঁত দেখে বোঝা গেল নিঃশব্দে হাসছে। এবার কিছু মুহূর্ত আগের কৌতূহল ছাপিয়ে হৃদয় দখল করল একটা ভয়ানক ক্রোধ।
ফাজলামো করার জায়গা পান না? রাজধানীতে ফিরে আপনাদের ছেড়ে দেব ভেবেছেন?
এই যে মিয়াভাই, রাগ করছেন দেখি। রাগের কিছু নেই। আবার ধরেন, আপনি বন্ধুর সন্ধান ভালোমতো না করেই পালিয়ে যাচ্ছেন…
আমি মোটেই পালিয়ে যাচ্ছি না।
বললেই কি মেনে নেব? কলিগের সন্ধানে এসে তাকে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন না?
অনুমতির প্রয়োজন বোধ না করেই রিকশায় উঠে এলো মুরশিদ। আমুদে কণ্ঠে রিকশাঅলাকে বলল, ‘নেন দেখি ভাই। সামনে নেন আবার।’

হেলেদুলে রিকশা চলতে শুরু করল। মোরশেদ ছোটখাট স্বাস্থ্যবান মানুষ। কালো সুতি প্যান্টের ওপর নীল সাদার চেকচেক ফতুয়া পরেছে, অচেনা পারফিউমের সুবাস আসছে তার গা থেকে। ফাঁকে ফাঁকে জরদার ঘ্রাণও। সে যে পান খায় আগে খেয়াল করিনি। কিছুদূর চুপচাপ রিকশা এগিয়ে গেল, কাছাকাছি কোথাও থেমে থেমে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ফতুয়ার বুক পকেট থেকে এক খিলি পান বের করে মুখে পুরল সে।

দেখতেই তো পাচ্ছেন শহরটা বদলে গেছে কীরকম? সাত বছর আগে যেমন দেখেছেন, এতদিন পর আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও অবাক মানত। একতলা বাড়ি পেয়েছেন একটাও? পাবেন না হাজার খুঁজলেও। সব ছয়তালা সাততালা দালান। নানান এলাকার মানুষে মাছির মতো ভনভন করছে। তবু ছোট শহরের এই সুবিধা। কিছুদিন গেলেই সবাই সবাইকে চিনে ফেলে।
আমার একটা কথার জবাব দেবেন দয়া করে?
কী কথা?
নঈম ডাক্তার বা রিপন নামটা কি সত্যিই এমন অপরিচিত? কী এমন হয়ে গেল এর মাঝে? একবারও আমার মনে হচ্ছে না যে ভুল এলাকায় এসে ওদের সন্ধান করছি।
না মিয়াভাই, অপরিচিত কেন হবে? সব ঘটনা সবার সামনে তো বলাও যায় না।
কী বলব তা ভেবে উঠবার আগেই আমাদের রিকশা থেমে গেল। কিন্তু রেল স্টেশন কোথায়? এদিকটা দেখছি শহরের পরিত্যক্ত অংশ। চারদিকে বাড়িঘর কিছুই নেই। একসময় ছিল তার প্রমাণ হিসেবে অসমতল ভিতগুলো রয়ে গেছে। বাজারটা কেউ গুঁড়িয়ে দেয়নি তবে ম্লান অন্ধকারে ছায়া ছায়া শাটারবিহীন দোকানের সারি, খাওয়ার হোটেলগুলোর সামনে উঁচু মাটির বিশাল চুলোতে ধ্বস নেমেছে। মুরশিদ বলল, ‘ওই পশ্চিমে সোজা হেঁটে যান, বাজারটা পার হলেই রাস্তার পাশে দেখবেন দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ওইটাই খুঁজছেন আপনি। এগিয়ে যান।’

যুবকটির কথাবার্তা বোধের অগম্য হয়ে উঠেছে। তবু কিছু বলার চেয়ে মনে হলো নেমে যাই রিকশা থেকে। ব্যাকপ্যাকটা কোলের ওপর থেকে কাঁধে চড়িয়ে পশ্চিমে অস্থির পায়ে হাঁটা ধরলাম। ওই তো, নঈম ডাক্তারের বাড়ি ছাড়া ওটা আর কী?

হ্যাঁ, অবিকল সেই বাড়ি। গেটের দু পাশে নারিকেল গাছ দুটির মাথা বাতাসে নৃত্যরত। কিছু আগের গুমোটভাব কেটে গেছে। বাসার ছাদে এক ছোটখাটো মিনিয়েচার অরণ্যের মতো তৈরি হয়েছে টবে লাগানো গাছে, সেখানে জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। কিন্তু মানুষ কোথায়? আলো জ্বলছে না যে ভিতরে? কয়েকবার রিপনের নাম ধরে ডাকলাম। কোনো সাড়া এলো না। গেট পেরিয়ে ছোট্ট একটা উঠোনের মতো ছিল, এখন ঠিক উঠোনের কোন দিকটায় দাঁড়িয়ে আছি ঠাহর করা যাচ্ছে না। আঁধার বাড়ছে প্রতি মুহূর্তেই।

‘পেলেন কাউকে?’ মুরশিদের প্রশ্নে চমকে উঠলাম। নিঃশব্দে কখন পাশে দাঁড়িয়েছে।
না, কেউ তো সাড়া দিল না।
কেউ থাকলে নিশ্চয়ই দিত।
দেখেন ভাই, আপনাদের শহরে ঢুকবার পর থেকে কোনো কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। খুলে বলবেন প্লিজ?
প্লিজের কিছু নেই আসলে। মাথায় ঢুকবে সব, ধীরে ধীরে।
মানে?
একটু আগেই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম না? আবার করি, গোটা পীরের মহল্লায় একতলা বাড়ি দেখেছেন কোনো?
ভুল বলছে না মুরশিদ। বারবার যে মনে হচ্ছিল শহরটা আগের মতো নেই, এই কি সেই বদলের কারণ?
কী ভাবেন? দেখেন নি তো? এখন এই যে নঈম ডক্তরদের ভিটায় দাঁড়িয়ে আছেন, গোটা শহরে এই একটাই বাড়ি যেটা একতলা। শহরের সমস্ত লোকজন ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছিল তাদের পুরনো নিবাস। বহুতল ভবনের সংখ্যা যেমন বাড়ছিল শহরের নতুন অংশে, এর পক্ষে জনমতও। এমনকি যাদের অর্থ নেই, তারাও চাইছিল উঁচুতে উঠতে। দেখছেন না, শহরের এই দিকটা কীরকম পরিত্যক্ত হয়ে আছে? এ মহল্লাটা ধীরে ধীরে সমান করে দিয়েছে নগরভবনের বুলডোজার এসে। শুধু ওনারাই ছিলেন সবকিছুর বিপক্ষে। আপনার কলিগ আর তার বাবা-মা। এ বাড়িটা তাই রয়ে গেল। অবিকল। কেউ একটা টোকা পর্যন্ত দেয় নাই কোনো দেয়ালে।
বাড়ি রয়ে গেল। কিন্তু ওরা কোথায়? কী করেছেন আপনারা তাদের সঙ্গে?

আমরা একটা বিপ্লব শুরু করেছিলাম। সেই বিপ্লবের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল নঈম ডক্তরের পরিবার। সবাই এই পুরনো দিকটা ছেড়ে গেলেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে রইল। একঘরে হয়ে গেলেও, দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আর তাদের অবিবাহিত পুত্র, মেয়েটার বসবাস তো বিদেশেই ছিল বিয়ের পর থেকে। তাদের আর বিশেষ প্রয়োজন কী সমাজের কাছে? কিন্তু আপনি তো অস্বীকার করবেন না যে, সমাজের সিদ্ধান্তে যারা নেই, সমাজে থাকবার কোনো দরকারও তাদের নেই।
নেই মানে? ওরা কোথায় এখন? আপনারা এই সামান্য কারণে তিনজন মানুষকে ভিটেছাড়া করেছেন?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896478188.jpg

নাহ। আমরা কি ছোট লোক? ঠিক এক সপ্তাহ আগে টাউন হলে সভা হয়েছিল। ভোটাভুটি। পীরের মহল্লা হবে দেশের প্রথম বহুতল শহর। আমরা সেইটা থেকে মাত্র একধাপ দূরে ছিলাম। নগরপিতা বললেন, ‘নঈম ডক্তর যদি এখনো তার সিদ্ধান্ত থেকে না সরে আসে, তবে ভিন্ন উপায় আমাদের সামনে নেই। একজন মানুষ আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা হতে দেব না আমরা।’ পুলিশ কমিশনারের দিকে চেয়ে নগরপিতা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তাই কি দেওয়া উচিত?’ উঠতি বয়সের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণী তখন বলেছিল, ‘এমন ডিসিশান পুরো শহরটাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। কেস-কামারি হবে, পত্রিকায় সংবাদ হবে, নানান আশঙ্কা। তার জবাবে নগরপিতা উত্তর দিয়েছিলেন, আহা, সে কী চমৎকার উত্তর, ‘এত বড় একটা বিপ্লব হতে যাচ্ছে, আর লোকে জানবে না? দরকার পড়লে লোকে আন্দোলন করবে দিন রাত। পায়ে হেঁটে লং মার্চে যাবে মায়ানগর অভিমুখে। অনশন চলবে সংসদের সামনে। একটা ব্রাইট ফিউচারের জন্য এমন সংগ্রাম কি নগরবাসি করবে না?’

অন্ধকার গাঢ় হবার আগেই আকাশ জুড়ে অজস্র নক্ষত্র ফুটে গেল। সেই নক্ষত্রের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যে পৃথিবীতে আমি আছি এখন, একে ঠিক চিনি না। মুরশিদ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘চলেন, আপনাকে ইস্টিশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’
পায়ে হেঁটে পরিত্যক্ত বাজারটা পেরিয়ে এলাম। যেখানে রিকশাটা ছিল, অবিকল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রিকশাঅলা নেই। কী করব ভেবে পেলাম না কয়েক মুহূর্ত। মায়ানগর ফিরে কী বলব ম্যানেজমেন্টকে?

আমার চিন্তার সুতো কাটল অজস্র মানুষের পায়ের শব্দ। একদল লোক যেন মিছিল করে এদিকেই আসছে এগিয়ে। প্রায় সবার হাতে চার্জার লাইট। মিছিলের সামনের দিকে সেই বৃদ্ধটি। পাশে রুগ্ন আর অস্বাভাবিক লম্বা এক লোক। সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরে থাকায় যাকে দীর্ঘ এক মৃতদেহ বলে ভ্রম হলো এক মুহূর্তের জন্য।

মিছিলটি আমার খুব কাছে এসেই থেমে গেল। যতজনের চোখের দিকে তাকাবার সুযোগ হলো, তাদের দৃষ্টিতে একধরনের চেপে রাখা বেদনা। বৃদ্ধটি অনুযোগ করে বললেন, ‘কাজটা তুই ঠিক করোস নাই রে মুরশিদ। বাবাসাহেবরে ইস্টিশনে পাঠায়া দিলেই ভালো করতি।’

বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক দীর্ঘাঙ্গ লোকটিই কি নগরপিতা? শোনা যায় না প্রায় এমন খসখসে কণ্ঠে সে বলল, ‘আপনিই শিপলু? রিপনের বন্ধু?’
জ্বি।
শুনলাম রাজধানীতে ফেরত যাচ্ছেন?
হ্যাঁ যাচ্ছি।
কেমন দেখলেন আমাদের শহর?

কিছু বলবার মতো শব্দ খুঁজে পেলাম না আর। এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। কোন এক অফুরন্ত ক্লান্তির ভাণ্ডার থেকে যেন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে ঘুমের আরক। অবসন্ন হয়ে উঠল মন ও শরীর। লোকগুলোর হাতে চার্জার জ্বলছে। মেঘ ডাকছে আকাশে। হালকা বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। আম্মা এর নাম দিয়েছিলেন সুঁইসুঁই বৃষ্টি। কিছুক্ষণের এক অসহ্য নীরবতা শেষে লোকটা বলল, ‘মায়ানগর আর ফেরা হবে না আপনার। বহুতল বিপ্লবের একটা স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। একটা স্মৃতির বাগান। তার দেখাশোনা করতে যোগ্য লোকও তো চাই আমাদের।’
‘মানে?’
নগরপিতার সেই অপরিবর্তনীয় খসখসে কণ্ঠ ঘোষণা করলো, ‘নঈম ডক্তরের বাড়িটাকে আমরা জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করব। আপনি হবেন এই জাদুঘরের কিউরেটর।

দশ টাকার শোক



মনি হায়দার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে মানিব্যাগটা উল্টেপাল্টে দ্যাখে রজব আলী।

মানিব্যাগটা খুব পছন্দ হয়েছে তার। বিশেষ করে মানিব্যাগটার বাদামি রংটা। ব্যাগটা চামড়ার তৈরি। রজব আলী নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোকে। বোঝা যায় না কোন্ পশুর চামড়ায় মানিব্যাগটা তৈরি হয়েছে। মানিব্যাগটার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠরি। রজব আলী কল্পনায় দেখতে পায়- মানিব্যাগটার ভিতরে রাখা টাকায় ভেতরের কুঠুরিগুলো ভরে উঠেছে।

ব্যাগটা প্যান্টের পকেটে নিয়ে যখন হাঁটবে পিছটা ফুলে যাবে, মুহূর্তেই শরীরের কোষে কোষে একটা অন্যরকম অহমিকা অনুভব করে সে।

ভাই, মানিব্যাগটার দাম কতো ? রজব আলী মানিব্যাগঅলাকে জিজ্ঞেস করে।

ব্যাগঅলা রজব আলীর উপর মনে মনে চটে উঠেছে। সেই কতোক্ষণ থেকে ব্যাগটা উল্পেপাল্টে দেখছে। কেনার কথা বলছে না। অথচ রজব আলীর দেখার মধ্যে দুটো ব্যাগ সে বিক্রি করেছে। ফুটপাতের জিনিস এতক্ষণ নাড়াচাড়া কেউ করে না। ব্যাগঅলা রাগ করে কিছু বলতেও পারে না। যদি কেনে ?

আপনি নেবেন ? রজব আলীর দাম জিজ্ঞাসায় ব্যাগঅলা পাল্ট প্রশ্ন ছোড়ে। কারণ রজব আলীকে দেখে তার মনে হয় না এই লোক মানিব্যাগ কিনবে।

রজব আলী একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসের পিওন। পরনের পোশাকে ঐ বহুজাতিক কোম্পানির পরিচয় আছে। ব্যাগঅলার ধারণা এইসব লোকজন সাধারণত মানিব্যাগ-ট্যাগ কেনে না। তাদের সামান্য টাকা আয়, কোনোভাবে সেই পয়সায় মানিব্যাগ কেনার মানসিকতা বা প্রয়োজনীয়তাও থাকে না।
নেবো।

ইতোমধ্যে ব্যাগঅলার সামনে দামি প্যান্টশার্ট পরা একজন ভদ্রলোক এসেছে। সঙ্গে তন্বী তরুণী। তাদের আসায় চারপাশের আবহাওয়ায় বিদেশী সেন্টের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোকের কাছে রজব আলী অযাচিতভাবে হেরে যায়। বাস্তবতার কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে হয় তাকে।

তন্বী তরুণী ও ভদ্রলোক মিলে কয়েকটা মানিব্যাগ দেখে। বাছাই করে। অবশেষে তন্বীয় কথানুযায়ী ভদ্রলোক তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে তারা মানিব্যাগ দেখলো, দাম করলো, কিনলো এবং চলেও গেলো। অথচ রজব আলী বিশ-পঁচিশ মিনিচের মধ্যে মধ্যে দামটাও জানতে পারলো না ! তারা চলে যাওয়ার পর রজব আলী ব্যাগঅলার কাছে যায়।

বললেন না কতো দাম ?

রজব আলীর দিকে আড়চোখে তাকায়, মানিব্যাগ আপনার পছন্দ হয়েছে?

পছন্দ না হলে দাম জিজ্ঞেস করবো কেনো ?

একশো আশি টাকা।

একশো আশি টাকা। রজব আলী মুখ থেকে বিপন্ন শব্দগুলো বের হয়।

বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যাগঅলা, অবাক হওয়ার কি আছে? আপনার সামনেই তো দেখলেন তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ বিক্রি করেছি। ঠিক আছে আপনি ঐ সোয়াশ টাকাই দেন।
সোয়াশ টাকা একটা মানিব্যাগের দাম ! রজব আলীর বিস্ময় কোনো বাঁধা মানে না।

ব্যাগঅলা বুঝতে পারে রজব আলী এতো টাকায় ব্যাগ কিনবে না। সবাইতো ঐ টাকাঅলা ভদ্রলোক নয়, বেশি দাম-দর না করেই তাদের হাকানো দামেই কিনবে। রজব আলীরা তো মানিব্যাগই কেনে না। সেখানে রজব আলী যে কিনতে এসেছে সেটাই অনেক। ব্যাগঅলা মানিব্যাগ বিক্রি করলেও তার পকেটে মানিব্যাগ থাকে না। নিজের সঙ্গে রজব আলীর সাদৃশ্য দেখতে পায় ব্যাগঅলা। একই কাতারের ঠেলা-গুতা খাওয়া মানুষ তারা। লোকটাকে ঠকিয়ে লাভ নেই। হয়তো অনেক আশা করে সারা জীবনে একবার একটা মানিব্যাগ কিনতে এসেছে।

আপনি সত্যিই কি মানিব্যাগটা কিনবেন ? নরম কণ্ঠে ব্যাগঅলা জানতে চায়।

কিনবো বলেই তো পছন্দ করেছি। দাম জানতে চাইছি।

তাহলে শোনেন ভাই, অনেক্ষণ ধরে আপনি মানিব্যাগটা দেখছেন, ফাইনাল কথা বলে দিচ্ছি, মানিব্যাগটা আপনি আশি টাকায় নিতে পারবেন। আশি টাকার এক টাকা কমেও বিক্রি করবো না।
রজব আলীর এই মুহূর্তে ব্যাগঅলাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়। কোথায় একশো আশি টাকা, সেখান থেকে একশত পঁচিশ এবং সবশেষে পুরো শতকই নেই; কেবল আশি টাকা। সে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে রাখে। মানিব্যাগটা পকেটে রাখার সঙ্গে সঙ্গে রজব আলী নিজেকে একজন দামি মানুষ ভাবে। তার পকেটেও অনেকের মতো মানিব্যাগ আছে।

দীর্ঘদিনের একটা আকাক্ষা, একটা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো রজব আলীর। মানিব্যাগ কেনার একটা সিগারেট কেনে। সাধারণত সে সিগারেট টানে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা সিগারেট টানার ইচ্ছে হলো তার। না, কেবল সিগারেটই নয়, একটা ঝাল দেওয়া পানও কিনলো এবং মুখে দিয়ে পরম আয়াসে চিবুতে লাগলো। সিগারেটটা ধরিয়ে পান চিবুতে চিবুতে রজব আলী একটা রিকশায় উঠলো। পর পর তিনটি কাজ সে করলো-যা সে খুবই কম করে। সিগারেট টানা, পান খাওয়া এবং রিকশায় করে বাসায় ফেরা। তার জীবনেএকটুকুই শ্রেষ্ঠ বিলাসিতা। রিকশা ছুটে চলেছে।

রজব আলীর মাথার কোষে, যেখানে স্বপ্ন বিলাসী বা ইচ্ছের রক্তকণিকা থাকে- সেখানে মানিব্যাগ কেনার শখ জাগলো প্রায় মাস তিনেক আগে। সে, অফিসের বড় সাহেবের ব্যক্তিগত পিওন। চা, চিনি, সিগারেট থেকে শুরু করে যা কিছু দরকার সবই আনে রজব আলী। দীর্ঘদিনের চাকরির কারণে সে বড় সাহেবের খুব বিশ্বস্ত ও অনুরাগী। অফিসে প্রতিদিন অনেক মেহমান আসে।

নানান কিসিমের মানুষের আনাগোনা বড় সাহেবের কাছে। এইসব মেহমান আসলেই বড় সাহেব বেল টিপে রুমের বাইরে হাতলবিহীন চেয়ারে অপেক্ষায় থাকা রজব আলীকে ডাকেন। রজব আলী ত্রস্ত খরগোশের মতো ভেতরে ঢোকে। কিন্তু ঢুকেই খরগোশের মতো মাথা উঁচু রাখতে পারে না। কোথাকার কোন এক অদৃশ্য অপরিমেয় শক্তি এসে তার মাথাটাকে নিচু করে দেয়।

তার দাঁড়ানো পর বড় সাহেব বড় অবহেলায়, নিপুণ নৈপুণ্যে, গাম্ভীর্যের কৌশলী পারম্পর্যে অবলীলায় প্যান্টের ডান দিক থেকে মোগল সম্রাটদের ক্ষমতায় মানিব্যাগটা বের করে টেবিলে রাখেন। মেহমানবৃন্দ গভীর অভিনিবেশে বড় সাহেবের কর্মকান্ড দেখতে থাকেন। মানিব্যাগটা টেবিলে রেখেই বড় সাহেব টেবিলের অন্যপ্রান্তে রাখা দামি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে পরম আদরে রাখেন এবং তৎক্ষণাৎ লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট টানেন আয়েসের সঙ্গে।

সিগারেটে দু’-দিনটি টান দিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝখানে আটকে রেখে মানিব্যাগটা তোলেন ডান হাতে। মানিব্যাগটা টাকার কারণে সবসময় পোয়াতি নারীর মতো ফুলে থাকে। বড় সাহেবের মানিব্যাগে টাকাগুলো অধস্তন, পরাধীনভাবে নিবিড় শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। একহাজার, পাঁচশ, একশ, পঞ্চাশ টাকার অসংখ্য নোট সাজানো পাশাপাশি। দেখতে কতো ভালো লাগে ! রজব আলী দেখে। দেখেই তার আনন্দ।

বাম হাতে মানিব্যাগটা ধরে ডান হাতের দুই আঙ্গুলে বড় সাহেব বেশ কয়েকটা নোট বের করেন। একটা নোট রজব আলীর দিকে বাড়িয়ে দেন, শীগগির নাস্তা নিয়ে আয়।

রজব আলী বিনয়ের সঙ্গে টাকাটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এবং নাস্তার আয়োজনে নিদারুণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এইভাবেই রুটিন চলছিলো। হঠাৎ মাস তিনেক আগে রজব আলীর মাথায় এই প্রশ্নটা উঁকি দেয়- বড় সাহেবের গাড়ি বাড়ি টাকা মান-সম্মান ক্ষমতা আছে। রজব আলীর কিছুই নেই। কিন্তু একটা মানিব্যাগতো থাকতে পারে। আর যাই হোক বড় সাহেবের মতো মানিব্যাগ থেকে সেও টাকা বের করে বাস কন্ডাকটর, চালের দোকানদার, মাছঅলা, ডালঅলাদের দিতে পারবে।

এই ভাবনা, স্বপ্ন এবং কল্পনার পথ ধরে কয়েকমাস যাবৎ রজব আলী চেষ্টা করে আসছে একটা মানিব্যাগ কেনার। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। বৌয়ের শরীর খারাপ- ডাক্তারের টাকা দেওয়া, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, বই খাতা কেনা- যাবতীয় সাংসারিক কাজের চাপে মানিব্যাগ কেনা সম্ভব হয়নি। আজকে সে বেতন পেয়েছে। এবং সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে রজব আলী মানিব্যাগটা কিনেই ফেললো। আসলে কখনো কখনো একটু-আধটু রিস্ক নিতেই হয়। নইলে ছোটখাট স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ হবার নয়।

রিকশায় বসেই সে জামার বুক পকেট থেকে বেতনের বাকি টাকাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে মানিব্যাগে। মানিব্যাগটার পেট ফুলে যায়। হাতে নিয়ে তার দারুণ ভালো লাগে। কিছুক্ষণ হাতে রাখার পর রজব আলী মানিব্যাগটাকে পিছনে প্যান্টের পকেটে রাখে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে প্যান্টের পিছন দিকটা ফিরে ফিরে দ্যাখে- কতোটা ফুলে উঠলো ? তেমন না। যেভাবে বড় সাহেবের পিছন দিকটা ফুলে থাকে, সে রকম নয়। রজব আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

রিকশা বাসার কাছে আসলে সে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায়। তার মনের মধ্যে ছোট সুখের একটা ছোট পাখি ডানা মেলেছে। গানের সুর ভাজতে ভাজতে রজব আলী দেড় কামরার স্যাঁতস্যাঁতে বাসায় ঢোকে। সে ঢুকলো সংসারে, তাতে সংসারের কিছু যায় আসে না। সংসারটা তার কাছে সীমাহীন অন্ধগলির মোড়। যেখানে অভাব দারিদ্র ক্ষুধার চাহিদা কুমিরের হা মেলে থাকে, সেখানে তার মতো একজন রজব আলীর আসা না আসায় কিছুই যায় আসে না। রজব আলী স্ত্রী মকবুলা বেগম চতুর্থ সন্তান, যার বয়স মাত্র তিনমাস তাকে মাই খাওয়াচ্ছে।

অন্যান্যরা মেঝেতে জটলা পাকাচ্ছে একটা পুরোনো ক্যারামের গুটি নিয়ে। মকুবলা বেগম ঘাড় ফিরিয়ে রজব আলীকে একবার দেখে আবার মাই দিতে থাকে। রজব আলী কি করবে ভেবে পায় না। সাধারণত বেতন নিয়ে বাসায় ফিরলে তরিতরকারি, চাল, ডাল, লবণ, তেল, সাবান, দুই এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট সঙ্গে নিয়ে আসে রজব আলী। আজকে একবারে অন্যরকম একটা জিনিস এসেছে- যার প্রতি তার নিজের মমতা অনেক। সংসারে অন্যদের প্রতিক্রিয়া কি হবে বুঝতে পারছে না।

শুনছো ? রজব আলী স্ত্রীকে ডাকছে।

কনিষ্ঠতম সন্তানের মুখ থেকে মাই সরাতে সরাতে সাড়া দেয় মকবুলা বেগম, কি ?

একটা জিনিস এনেছি।

মকবুলা বেগম সরাসরি তাকায় রজব আলীর দিকে, কি এনেছো ?

অদ্ভুত একটা হাসি রজব আলীল ঠোঁটে, একটা মানিব্যাগ।

দ্রুত ব্যাগটা বের করে মকবুলা বেগমের হাতে দেয় রজব আলী। ব্যাগটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থানুর মতো বসে থাকে মকবুলা বেগম। একবার কোটরের চোখ দিয়ে তাকায় রজব আলীর দিকে। দৃষ্টি ফিরিয়েই ব্যাগটা অবহেলায় রেখে দেয় সে, মানিব্যাগ ফুটাতে কে বলেছে তোমাকে! বেতন পেয়েছো আজ না ?

বেতন পেলে আর মাথা ঠিক থাকে না। মকবুলা বেগমের লং প্লে রেকর্ড বাজা আরম্ভ হলো, বাসায় কিছু নাই। অফিসে যাবার সময় বললাম, ফিরে আসার সময় ছোট বাচ্চাটার জন্য এক কৌটা দুধ এনো। বড় ছেলেটার খাতা পেন্সিল নেই- নিয়ে এসো। তার কোনো খবর নেই। উনি নিয়ে এলেন মানিব্যাগ। ছেলেমেয়ে বৌয়ের মুখে তিন বেলা ভাত জোটাতে পারে না, উনি মানিব্যাগ কিনে ভদ্দরলোক হয়েছেন! কানার আবার স্বপ্ন দেখার শখ!

রজব আলীর মন শরীর স্বপ্ন আকাক্ষাগুলো শাঁখের করাতে কাটছে এখন। হায়, সংসারের জন্য ব্যক্তিগত দুই-একটা স্বপ্নও কি পূরণ করা যাবে না ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ততো সংসারের সুখের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সামান্য একটা মানিব্যাগের জন্য স্ত্রী এমনভাবে শ্লেষের কথা বলে-একেক সময় মনে হয় রজব আলী আত্মহত্যা করে। পারে না।

স্ত্রীর শান দেওয়া কথার বান থেকে আপাতত রক্ষা পাবার জন্য না খেয়ে বাইরে চলে আসে রজব আলী। এভাবেই সে অক্ষমতার জ্বালা, বেদনা ও ক্ষরণকে তাড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। রাস্তায় দোকানে এখানে সেখানে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার মকবুলা বেগমের সংসারেই ফিরে আসে। পরের দিন রজব আলী যথারীতি অফিসে।

অফিসের লোকজনের কাছে মানিব্যাগটা দেখায়। কেউ দেখে, কেউ আগ্রহবোধ করে না।

বল তো বারেক, অফিসের আরেকজন পিওনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে রজব আলী- মানিব্যাগটা কেমন হয়েছে ?

বারেক মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে- ভালো। খুব ভালো হয়েছে। কতো টাকায় কিনেছো ?
প্রচ্ছন্ন গর্ব রজব আলীর, তুই বল।

আমি কেমনে বলবো ?
অনুমানে।
বারেক কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলে, ত্রিশ-চল্লিশ টাকা।

তোর বাপের মাথা! ধমকে ওঠে রজব আলী। এ রকম একটা মানিব্যাগ জীবনে চোখে দেখেছিস ? কেমন রং এটার ! ভেতরে কতোগুলো ঘর আছে জানিস ! একহাজার, পাঁচশ, একশো, পঞ্চাশ টাকার নোট রাখার আলাদা আলাদা জায়গা আছে। তাছাড়া এই ব্যাগটা বিদেশী। দেশী না।

তোমার মানিব্যাগের যতো দামই থাক, তুমি বাপ তুলে কথা বলবে ? বারেকের আত্মসম্মানে সামান্য ঘা লাগে।

বলবো না, হাজার বার বলবো। এতো শখ করে একশ টাকা দিয়ে একটা মানিব্যাগ কিনলাম। আর তুই কিনা বলিস মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় কিনেছি ! জানিস, এই রকম মানিব্যাগ আছে আমাদের বড় সাহেবের।

হতেই পারে। আমার তো মানিব্যাগ নেই। কখনো ছিলোও না। তাই দাম জানি না। কিন্ত তুমি একটা একশো টাকা মানিব্যাগে জন্য বাবা তুলে কথা বলতে পারো না-

বারেক যখন মানিব্যাগ সংক্রান্ত তর্কে হেরে যাচ্ছিলো, তখনই বড় সাহেব অফিসে ঢোকেন সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু মেহমান নিয়ে। বারেক চট্ করে সরে যায়। রজব আলী দ্রুত দরজা খুলে দাঁড়ায়। বড় সাহেব সঙ্গীদের নিয়ে রুমে ঢোকেন। রজব আলীকে চা আনতে বলেন বড় সাহেব। শুরু হয় রজব আলীর দৌড়।

কয়েকদিন পর বড় সাহেব অফিসে কয়েকজন ক্লায়েন্টের সামনে বসে রজব আলীকে ডাকেন, রজব আলী?

জ্বী স্যার ?
তোমার হয়েছে কি ?

রজব আলী ভেবে পায় না তার কোথায় কখন কি হয়েছে ? ডানে বামে উপরে নিচে তাকায় সে, কই স্যার-কিছু হয় নাইতো।
তোমার হাতে মানিব্যাগ কেনো ?

এই কথার কি জবাব দেবে রজব আলী? হঠাৎ মগজের কোষ কোনো কাজ করে না। সে বুঝে উঠতে পারে না- তার হাতে মানিব্যাগ থাকলে বড় সাহেবের অসুবিধা কি ? কক্ষের সবাই রজব আলীর দিকে চেয়ে আছে। এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। হঠাৎ রজব আলী উপলব্ধি করতে পারে- মানিব্যাগটা থাকার কথা প্যান্টের পকেটে। হাতে নয়। এবং তার আরো মনে পড়লো মানিব্যাগটা কেনার পর থেকে, বিশেষ করে অফিস করার সময় মানিব্যাগটা কারণে-অকারণে তার হাতেই থাকে। কেন থাকে ?

সে কি সবাইকে তার সদ্য কেনা মানিব্যাগটি দেখিয়ে তৃপ্তি পেতে চায় ? যা প্রকারান্তরে অক্ষম অথর্ব মানুষের করুণ মনোবিকৃতি ? নিশ্চয়ই তার অবস্থা দেখে বড় সাহেব, তার পরিষদবর্গ, অফিসের লোকজন হাসছে। রজব আলী নিমিষে নিজেকে বায়ুশূন্য ফাটা একটা পরিত্যাক্ত বেলুন হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করে। লজ্জায় বালুর সঙ্গে সে মিশে যেতে চাইছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে মুশকিল হচ্ছে- সে ইচ্ছে করলেই বালু বা বায়ুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। মানুষ হিসাবে তাকে অনড় ও অবিচল থাকতে হয়।

বড় সাহেবের মুখে অদ্ভুত হাসি- রজব ?

জ্বী স্যার ?
মানিব্যাগটা কবে কিনেছো ?

রজব আলী জবাব দেয় না। দিতে পারে না। ভেতরের কে একজন যেন রজব আলীকে থামিয়ে দিয়েছে। যে রজব আলীর ওষ্ঠ জিহ্বা কণ্ঠ ভেতরের ক্ষুধিত শক্তিকে পাথর বানিয়ে জমাট করে রেখেছে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে কথা বলতে। পারছে না। সে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কথা বলছো না কেন ? বড় সাহেবের কণ্ঠে এখন কর্তৃত্ব ও অপমানের সুর।

ঢোক গিলে জবাব দেয় রজব আলী- কয়েক দিন আগে।

কতো টাকায় ?

একশ টাকা।

তাই নাকি ! দেখি, বড় সাহেব হাত বাড়ান।

রজব আলী সারা জীবনের সমস্ত অভিশাপ নিজের মাথায় ঢালে-কেন সে মানিব্যাগ কিনতে গেলো ? কিনলোই যদি তাহলে পকেটে না রেখে হাতে রাখার প্রয়োজন হলো কেন ? দেখাতে চেয়েছিলো বড় সাহেবকে ? বড় সাহেবের মানিব্যাগ থাকলে পারলে তার থাকবে না কেন ? প্রতিযোগিতা ? কি অসম প্রতিযোগিতা ? কি ভয়ংকর গ্লানিকর পরাজয় !

কই দাও, বড় সাহেবের হাতটা তখনো বাড়ানো। নিন।

রজব আলী ব্যাগটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়।

কোথায় যাও? তোমার মানিব্যাগ নিয়ে যাও-

আর যেতে পারে না সে কক্ষের বাইরে। কক্ষের ভিতরে রজব আলীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বড় সাহেব মানিব্যাগটাকে উল্টেপাল্টে দেখেন। কক্ষের অন্যান্য সবাই বড় সাহেবের হাতের ব্যাগটাকে তীর্যক চোখে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। সে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে তীক্ষ্ন কাঁটা। কাঁটায় বিষ। যা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করছে রজব আলী। এছাড়া তার উপায়ও নেই।

রজব আলী !

বড় সাহেবের ডাকে চোখ তুলে তাকায় সে, স্যার!

নাও তোমার মানিব্যাগ। ব্যাগটা ভালোই কিনেছো।

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিয়ে রজব আলী দরজা খুলে নিমিষে বাইরে চলে আসে। দরজা দ্বিতীয়বার বন্ধ করতে পারে না, তার আগেই বড় সাহেব এবং অন্যান্যদের হাসির ছুরি তীব্র অপমানে রজব আলীর কান এবং মর্মের মূলে আঘাত হানে। মনে হচ্ছে তাদের হাসির হলকা তাকে শান দেয়া ছুরির মতো কাটছে। আর রজব আলী নিজের রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

রজব আলী মানিব্যাগ আর হাতে রাখে না। প্যান্টের পকেটেই রাখে। মাস শেষে মানিব্যাগের ছোট্ট খোপে খুচরো কয়েকটা মাত্র টাকা দেখতে পায় রজব আলী। মানিব্যাগে টাকা নেই, একটা পরিত্যাক্ত রুমালের মতো মনে হয় মানিব্যাগটাকে। এবং রজব আলী বুঝতে পারে- বড় সাহেবের মতো মানুষদের সঙ্গে রজব আলীরা কোনদিন, কোনোকালে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারবে না।

মাস শেষ, রজব আলীর মানিব্যাগের টাকাও শেষ। অথচ বড় সাহেবের মানিব্যাগে মাসের প্রথম দিকে যতো টাকা ছিলো বা থাকে, এখনো সে রকমই আছে। কমে না। বরং বাড়ে। তাহাদের টাকা বাড়তেই থাকে। বাড়বে আমৃতকাল।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে রজব আলী।

দীর্ঘনিঃশ্বাস এবং পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিয়ে নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে রজব আলী। প্রতিদিনের জীবনাচারের সঙ্গে রজব আলী বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মানিব্যাগটা তার সঙ্গে থাকছে প্রতিদিনকার মতো- যেমন তার পকেটে থাকছে একটি রুমাল, একটি চিরুনি।

মাসের প্রথম দিকে মানিব্যাগটা ভরা থাকে, মাঝখানের দিকে কমতে কমতে টাকা অর্ধেকেরও কমে এসে পৌঁছে এবং এই কমার গতিটা বলবৎ থাকে গাণিতিক হারে।

মাসের শেষের দিকে রজব আলী মানিব্যাগ বহন করার আর কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। কারণ ব্যাগের তলায় পাঁচ-দশটা টাকা পড়ে থাকে বড় অযত্নে, বড় অবহেলায়। কখনো কখনো রজব আলীর মনে হয়- মানিব্যাগটা বোধহয় তাকেই উপহাস করছে। মাস খানেক পরে একদিন।

রজব আলী অফিস থেকে ফিরছে। মাস শেষের দিকে। বাসে প্রচুর ভিড়। বাসে ওঠা মানে জন্তুর খাঁচায় ওঠা। জীবন যে কতো অবাঞ্ছিত, বাসে উঠেই সেটা বুঝতে পারে রজব আলী।

বাস থেকে নেমেই হাত দেয় প্যান্টের পকেটে। পকেটটা খালি, বুকটা ধড়াস ধড়াস করে, মানিব্যাগটা নেই ! এতো সাবধানে থাকার পরও মানিব্যাগটা নিয়ে গেলো?

রজব আলী কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মানিব্যাগটা পকেটমার নিয়ে গ্যাছে। রজব আলী মানিব্যাগটার জন্য ভাবছে না। ভাবছে মানিব্যাগের সর্বশেষ পুরোনো ময়লা দশটি টাকা...। ওই দশ টাকা থাকলে আরো দুই দিন বাস ভাড়া দিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারতাম।

;

নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোরে সেরা প্রত্যুষা ঘোষ



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম
পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপি ৬৪ জেলার ক্ষুদে নৃত্য শিল্পীদের নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোর জেলার শ্রেষ্ঠ নিত্য শিল্পী হিসেবে 'মঞ্চমুকুল' পুরস্কার পেলেন প্রত্যুষা ঘোষ (স্নেহা)। সারাদেশের প্রতিটি জেলার ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার (৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন আয়োজিত 'মঞ্চকুঁড়ি ও মঞ্চমুকুল' পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার তুলে দেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘প্রায় সবদেশেই শিশুদের নিয়ে নাটক হয়। আজকে সারা বিশ্বে যে শিশু নাটক হচ্ছে সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করছি ১৯৯০ সাল থেকে। জার্মানিতে একটি নাট্যোৎসবে ‘ডাকঘর’ নাটকটি নিয়ে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম। ২৫ দেশ সেখানে অংশগ্রহণ করেছিল। ৪ জন জুরি মেম্বার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেন। নাটক ভালো লাগে এমন ৫/৭টি দেশের কথা বলেছিলেন তারা; তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি।’

শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতা

জানা গেছে, ২৬২টি শিশু-কিশোর, আদিবাসী ও অবহেলিত শিশু-কিশোর ও যুবনাট্য সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন বিগত ৩৩ বছর যাবত নানান কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারে সারা বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৯০ জনকে ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান করা হয়।

দেশব্যাপি প্রতিটি জেলার থানা পর্যায়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগীত  শিল্পী, নাট্য শিল্পী ও নৃত্য শিল্পীদের বাসাই করা হয়। বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি থানা থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় বাছাই প্রক্রিয়া। সব প্রক্রিয়া সম্পন্নের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যটাগরিতে সারাদেশ থেকে ৩৯০ জনকে নির্বাচিত করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

অনুষ্ঠানে সারাদেশের ৬৪ জেলা থেকে নির্বাচিত   প্রায় ৩৯০ শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং যুব নাট্যবন্ধুদের 'মঞ্চমুকুল' পদক প্রদান করা হয়।

অনুর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের 'মঞ্চমুকুল' পদক  এবং সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

আলোচনা পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট নাট্যকার, গবেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজা  হিলালী। অতিথির বক্তব্য রাখেন পিপলস থিয়েটারের সংগীতের প্রধান শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ইয়াসমীন আলী। শিশুদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সামিয়া মুত্তাকিয়া মহুয়া ও পুষ্পিতা বেপারী। আলোচনাপর্বে সভাপতিত্ব করেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শিশুবন্ধু লিয়াকত আলী লাকী।

;

ভরা শ্রাবণে শ্রাবণী নেই



আকিব শিকদার
অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ভরা শ্রাবণে শ্রাবণী নেই- এই বেদনায় আজ
হৃদ-আকাশে জমেছে মেঘ ধূসর গড়গড়
বুকের ভেতর পদ্মানদীর ভাঙন ভাঙন স্বর
মন ধরে না সাঙ্গ করতে হাতের কোনো কাজ।

ঝির-ঝির-ঝির এই শ্রাবণে নেই রে কাছে তুই।
কামিনী ডালে ফুটেছে ফুল, কেয়ার গুল্মে কেয়া
হাসনাহেনার সবুজ ঝোপে নিকষ কালো ছায়া।
তুই কাছে নেই, বারেবারে তোর স্মৃতিটাই ছুঁই।

লুড্ডু খেলার ছোট্টবেলা রাখলি কি তুই মনে?
শ্রাবণ মাসের প্রভাতবেলায় বকুলতলার কথা
ফুল কুড়ানো, ঝগড়া তুমুল হতো যে কতো সেথা
আজ যে চোখে সেসব ছবি ভাসছে ক্ষণে ক্ষণে।

শ্রাবণ মাসে তুই কাছে নেই- এই বেদনায় আজ
অশ্রু ঝরে চোখের কোণে অশান্ত বাধাহীন
দীর্ঘশ্বাসে থেকে থেকে বাতাস কাঁপানো বীণ
মন ধরে না সাঙ্গ করতে হাতের কোনো কাজ।

;

পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর বার্তা২৪.কম
পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো

পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো

  • Font increase
  • Font Decrease

সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। যে সভ্যতা নিয়ে গৌরব করে পশ্চিমা দুনিয়া, তার বুনিয়াদের মধ্যে লুকিয়ে আছে দখল, লুণ্ঠন, নির্যাতন ও রক্তপাতের ইতিবৃত্ত। প্রতিটি নির্মাণ, উল্লাস ও উৎযাপনের পেছনে চাপা পড়ে আছে গোপন অশ্রুপাত। ফলে সভ্যতার ইতিহাস নামক মুদ্রাটির একপাশে যা রয়েছে, উল্টা পাশে রয়েছে ঠিক বিপরীত চিত্র।

এই সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে তীব্র বিতর্কের মতোই বিদ্যমান রয়েছে প্রচণ্ড ভিন্নমতও। পশ্চিমা-ইতিহাস বয়ানকে মানে না পূর্বদেশের পণ্ডিতরা। ক্যাপিটালিস্ট ইতিহাসকে অস্বীকার করে মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা। ইসলাম সভ্যতার ইতিহাসকে দেখে এদের চেয়ে আলাদা দৃষ্টিকোণে। এসব কারণে, কারো কাছে যা সভ্যতা, আরেক পক্ষের কাছে তা অন্ধকার। যেমন, ইউরোপের কাছে মধ্যযুগ অন্ধকার। কোন মধ্যযুগ? চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপের সময়কাল। যখন গির্জা মানুষকে দাসে পরিণত করেছিল। ধর্মের নামে পুড়িয়ে মারছিল। ঠিক একই সময়কালে, ভারতে, আরবে, চীনে ও বিশ্বের অন্য কিছু স্থানে শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও নির্মাণের সমৃদ্ধি ছিল অতুলনীয়। একইভাবে, ইউরোপের উৎকর্ষের পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক লুটতরাজ, লাতিন আমেরিকার আদিবাসী ও আদি-সভ্যতাকে ধ্বংস করার বর্বরতা।

অতএব, সভ্যতা বললেই হয় না, তা কতটুকু সভ্য, মানবিক ও কল্যাণকর, সেটাও বিবেচ্য। এসব বিশ্লেষণ করে সভ্যতার গতি-প্রকৃতি তুলে ধরার প্রয়াস কম নয়। তবে সেগুলো কোনো একটি পক্ষ বা মতের প্রতিনিধিত্বকারী। সামগ্রিকভাবে সভ্যতার প্রতিটি অভিমুখকে ধরে ধরে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা খুবই কম। বাংলা ভাষায় অত্যল্প।

‘পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো‘ নামের গবেষণা গ্রন্থটি সভ্যতার ইতিহাসের এক প্রাঞ্জল বিবরণ। তবে তা কেবল বিবরণই নয়, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নও বটে। গভীর সমীক্ষায় পৃথিবীর ইতিহাসের নানা পর্যায় ও সভ্যতার নানা পর্ব তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। ঘটনার প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে নেপথ্যের গুপ্ত-কার্যকারণ। ফলে সভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। যাদেরকে মহান অভিযাত্রী বলা হয়, তারা যে ছিল লুটেরা জলদস্যু ও দাস-ব্যবসায়ী, সেটাও উদ্ভাসিত হয়েছে। বিভিন্ন জাতিগত হত্যা ও নিধনের অসংখ্য ঘটনার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিলুপ্তিকরণের উপাখ্যানও বের হয়ে এসেছে। সভ্যতার আলো ও অন্ধকারের এমন পরিচ্ছন্ন ও তথ্যনিষ্ঠ বর্ণনা সত্যিই দুর্লভ।

অবাক করা বিষয় হলো, প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বিপুলায়তন বইটি দীর্ঘদিন গবেষণার মাধ্যমে রচনা করেছেন মফস্বলের এক তরুণ অধ্যাপক। ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যস্থ গ্রন্থটি সভ্যতার ইতিহাসের প্রথম খণ্ড। যার আরো খণ্ডগুলো নিয়ে কাজ করছেন লেখক। প্রচুর দেশি-বিদেশি তথ্য, উপাত্ত ও আকর গ্রন্থ বিশ্লেষণ করে তিনি সভ্যতার ইতিহাসকে পুনঃমূল্যায়ন করার যে প্রচেষ্টা নিয়েছেন, তা সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত।

‘পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো‘ নামের গবেষণা গ্রন্থটির লেখক মুহাম্মদ ফজলুল হক দাউদ, তার জন্ম ১৯৮৩ সালে ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স, ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স এবং এল এল বি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে মফস্বলে স্নাতক পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখকের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে: গল্পগ্রন্থ 'জীর্ণপাতা', রম্য গল্পের বই 'রঙ্গ ব্যঙ্গ', রম্য গল্পের বই 'গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইবেন না'। প্রকাশের পথে আছে: কিশোর উপন্যাস 'জোড়া পাহাড়ের গহীন অরণ্যে', অণুগল্পের বই অল্প কথার গল্প'। লেখক ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস নিয়ে লিখিত বই 'পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো' এর দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে বর্তমানে কাজ করছেন। তাছাড়া বাংলার নবাবী আমল ও ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়ের ইতিহাস নিয়ে লিখিত 'গল্প আড্ডায় নবাবী বাংলা ও মুঘল সন্ধ্যা' এবং নবাব সিরাজ উদ্দৌলার জীবনভিত্তিক ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস 'খোশবাগ' রচনাতেও তিনি ব্যস্ত রয়েছেন।

ইতিহাসচর্চা প্রকৃত প্রস্তাবে গভীর পরিশ্রম ও তথ্যনিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার নামান্তর। প্রযুক্তি ও বাণিজ্য প্রভাবিত পরিস্থিতিতে ইতিহাসের কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ পথে অগ্রসর হয়ে সত্যের মুখচ্ছবি উদ্ভাসিত করার মেধা যেমন অনেকের থাকেনা, তেমনি এমন অলাভজনক কাজে মনোনিবেশ করার মানসিকতাও অনেকের হয় না। যখন অধিকাংশই সম্তা লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে চট-জলদি কিছু হাতিয়ে নিতে আগ্রহী, তখন ইতিহাসের দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার উচ্চাভিলাসী প্রকল্প নিয়ে কাজ করার হিম্মত দেখিয়েছেন লেখক-গবেষক মুহাম্মদ ফজলুল হক দাউদ। তার এই মহতী প্রচেষ্টা সাধুবাদের যোগ্য।

;