কিউরেটর



এনামুল রেজা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিকেলটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। রোদের উত্তাপ ও আলো দুটোই ম্রিয়মাণ। বর্ষার দ্বিতীয় মাস অথচ আকাশ পরিষ্কার। ভাসমান সফেদ তুলোর মতো শরৎঘেঁষা মেঘ। চার রাস্তার একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে মন খারাপ হলো। ফুলহাতা শার্টের ডান আস্তিনে কপালের ঘাম মুছলাম। একটা খালি রিকশা আসছে সোজাসুজি। সরে দাঁড়ালাম একপাশে।

রাস্তার ওই ধারে একটা দশতলা বিল্ডিংয়ের নিচে ছোট্ট চায়ের দোকান। ঢালু কংক্রিটের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে তৈরি সিমেন্টের দু সারি বেঞ্চ। তীব্র চায়ের তৃষ্ণা পেল। গরমে প্রাণ বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু চায়ের ঘ্রাণ নাকে এলে কবে আর ঠিক থেকেছে মাথা! বহুক্ষণ ধরেই ঘুরছি পায়ে হেঁটে। রিপনদের বাসাটা কেউ চিনল না। এতজনকে জিজ্ঞেস করলাম। গেটের দু পাশে বড় দুটো নারিকেল গাছওয়ালা একতলা পুরানো বাড়ি, ছাদ ভরে আছে টবে বেড়ে ওঠা অজস্র গাছপালায়। একদম যেন ঝুলন্ত বাগান।

পীরের মহল্লা শহরটির নাম। হবে, আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে এখানে আস্তানা গেড়েছিলেন একজন বা বহুজন পীর। লোকজন আসত, মানত করত বটবৃক্ষে সুতো বেঁধে, দরগায় চড়ত শিন্নি। কল্পনা করে নিতে বেশ লাগে। রিপনরা এলাকার পুরনো পরিবারগুলোর একটি। কখনো তাকে বা তার বাবা নঈমুল হক সাহেবকে জিজ্ঞেস করে অমন পীর বিষয়ক জটিলতার কথা শুনিনি অবশ্য। এর আগে এসেছিলাম একবারই। রিপনের বোন তমালিকার বিয়েতে। সাজানো গোছানো এক ছোট্ট শহর মনে হয়েছিল পীরের মহল্লাকে, বাসার ছাদ থেকেই শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা নদীটা দেখা যেত। বেশ প্রশস্ত হলেও শান্ত সমাহিত নদী, ওইপারে গ্রাম।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মাঝবয়সী লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নঈম ডাক্তারের বাসাটা কোনদিকে জানেন?’ চাঅলা গরম পানির বলক ওঠা একটা কেতলিতে শুকনো কালো চা পাতা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘কোন নঈম ডক্তর?’
ওই যে পীরের বাজারে বড় চেম্বার আছে, বাড়িটা পুরনো ধাঁচের, ছাদ ভরা গাছপালা।
দুইটা বড় নারিকেল গাছ আছে বাড়ির সামনে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম। আপনি চেনেন?
জ্বি চিনি। কিন্তু এসবে লাভ নাই।
চাঅলার উত্তরটা বুঝলাম না। কিসে লাভ নেই? দেখলাম অন্যপাশের বেঞ্চে বসা দুজন লোক আগ্রহী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। একজনকে বেশ চিনলাম। ওই লোকটিকেই না রিকশা থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেছিলাম রিপনদের বাসা কোনদিকে? কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে আবার বললাম, ‘রিপন আর আমি একই অফিসে কাজ করি। এসেছি মায়ানগর থেকে। ঠিক কোন দিক দিয়ে গেলে পৌঁছতে সুবিধা হবে বলবেন?’

আচমকা কাঁধে কেউ হাত রাখলে ঘুরে চাইলাম বাঁ দিকে। কম্পিত মিহি কণ্ঠে রুগ্ন এক বৃদ্ধ কাঁধ থেকে হাতটা না সরিয়েই কথা বলে উঠলেন। ‘নঈম ডাক্তারের বাড়ি খুঁজতাছেন শুনলাম। তা নাম কী আপনের? কুনখান থাইকা আসা হয়?’

বুঝতে বাকি রইল না। ঘণ্টাখানেক ধরে এই সর্পিল অলিগলির ছোট্ট শহরটায় ঘুরে বেড়াচ্ছি রিপনদের বাসার সন্ধানে এবং বেশ রটে গিয়েছে একজন অচেনা লোকের ওধারা অনুসন্ধান। আজকের যুগে বাসাবাড়ির নম্বর ছাড়া কেউ কোথাও যায়? মোবাইল ফোনই বা আছে কেন? তবে সঙ্গে থাকা নম্বরটি যে বন্ধ, বহুবার ডায়াল করেও সংযোগ মেলেনি, কাকে বোঝাব?

দশ বছর একসঙ্গে কাজ করেছি রিপন আর আমি। ঠিক দু সপ্তাহ আগে হুট করেই সে অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। একদিন, দুদিন এমনকি তিনদিনকেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ভেবেছিলাম হয়তো বাড়িতে গিয়েছে জরুরি কাজে। কিন্তু এমন বিনা নোটিশে এতদিনের কামাই অফিস মানবে কেন? শেষে আমিই বাধ্য হয়ে ম্যানেজমেন্টকে অনুরোধ করেছিলাম। রিপনের সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ আমার, আসছে উইকেন্ডে অন্তত একবার দেখে আসি ওদের বাসায় কোনো ঝামেলা হলো কিনা। এরপর অফিস যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা নিশ্চিই অবিচার হবে না। এতদিনের অভিজ্ঞ কর্মী, ওর মতো কন্টেন্ট ডেভলপার চাইলেও যে বাজারে হুট করে মিলবে না, ম্যানেজমেন্টের বেশ ধারণা ছিল। উইকেন্ডের দুদিন আর একদিন বাড়তি যোগ করে মায়ানগর থেকে একশো নব্বই মাইল দূরের মফস্বল শহর পীরের মহল্লায় এসেছি আমি। কিন্তু সাত বছর আগের সেই পুরনো ধাঁচের বাড়িটি খুঁজতে এমন হোঁচট খেতে হবে কে জানত? শহরটির ভুতুড়ে পরিবর্তন হয়েছে এই আধা যুগে, না মেনে উপায় নেই।

বৃদ্ধের প্রশ্নের জবাবে কিছু বলবার আগেই আরো কিছু লোক চায়ের দোকানটিতে জড়ো হয়ে গেল। আমি এক আগন্তুক বসে আছি, আমাকে ঘিরে জনা দশেক মানুষ।
‘শেষ কবে এসেছেন এদিকে আপনি?’ প্রশ্নকর্তা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা দেখা গেল না। তবু উত্তর করলাম, ‘বছর সাতেক আগে। কিন্তু কী বিষয় বলেন তো ভাই?’
চারপাশে একটা মৃদু শোরগোল উঠল। বিষয় আর কী.. শহর কি আর ছোট আছে.. নাকি সেই শহর আছে…
কিন্তু, ওই যে চাঅলা ভাই তো ঠিকই চিনেছিলেন। কী ভাই, চেনেন নাই?
আমার প্রশ্নে চাঅলা হতাশ দৃষ্টিতে দূরে কোথায় চেয়ে রইল। বৃদ্ধ লোকটির কণ্ঠ বেজে উঠল তখন রোদ পড়ে আসা ঘিঞ্জি শহরটির এই কোনে, ‘ও তো সবই চেনে। আপনাকেও চেনে। কী রে চিনিস না?’
চাঅলা বলল, ‘জ্বি। ইনি গল্প লেখেন। এনার স্ত্রীর আটমাসের পেট। কিন্তু এসবে লাভ নাই।’
‘মানে কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্নটা নিজেকেই করলাম বিড়বিড় করে। আমি লেখক কিন্তু বিখ্যাত কেউ তো নই। মাসখানেক পর পদ্ম-র ডেলিভারি ডেট, এই তথ্যও নির্ভুল। ওর কথা মনে পড়তেই কীরকম অদৃশ্য ওজন চেপে বসল আমার কাঁধে। ব্যাখ্যা করা যায় না এমন এক আতঙ্ক টের পেলাম। কী করছে পদ্ম এখন? এমন বিকেলগুলো গল্পের বই পড়ে কাটাতেই ও ভালোবাসে। নধর উপান্তের লেখা ওই বইটা কি এখন পড়ছে ও? সেই যে এক লোক অনেক বছর শেষে নিজের গ্রামে ফিরে দেখল পুরো গ্রামটাই ফাঁকা। ঘরবাড়িগুলো জনশূন্য। ঘেসো জমির মাঝখান দিয়ে পায়েহাঁটা পথ। দড়িতে মেলে দেওয়া কাপড় উড়ছে। টিউবওয়েলের নিচে জমে আছে জল। কিন্তু প্রাণের চিহ্ন নেই কোথাও। কিছু আগেই যেন সবাই ছিল। হঠাৎ উধাও হয়েছে। তারপর…

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896425693.jpg

আমরা দুইটা কাম করবার পারি বাবাসাহেব। এক, আপনারে মায়ানগরের ফিরতি গাড়িতে উঠায়া দেওয়া, দুই…’—বৃদ্ধটির মুখে বাবাসাহেব সম্বোধন শুনে কিছুটা ধাতস্ত হওয়া গেল। কমে এলো আতঙ্কের ভার। অজানা জায়গায় অপরিচিত জনগণের কৌতূহলের কারণ হতে কার স্বস্তি লাগবে? আমি আরেক কাপ চায়ের কথা বললাম। ব্যাকপ্যাক থেকে একটা সিগারেট বের করে টংয়ের খুঁটিতে ঝুলন্ত গ্যাসলাইটারে সেটা ধরিয়ে দীর্ঘ একটা টান দিলাম। নিকোটিনের তিতকুটে আর কষটা স্বাদ মুখ হয়ে আমার কণ্ঠের দেয়ালে ঘাঁ মারল। খুশখুশে কাশি উঠে এলো প্রতিক্রিয়ায়।
বৃদ্ধ বললেন, মায়ানগর ফিরত যান আপনি। আমগো এলাকায় নঈম ডক্তর বইলা কেউ থাকে না।
জ্বি। আমি বুঝেছি চাচামিয়া।
বুঝলে তো ভালাই। এখন ছয়টা বাজে। ঠিক রাইত পৌনে নয়টায় এখ্যান ট্রেন নরসিংহ থেকে মায়ানগরে ফেরে। আমগো ইস্টিশন থিকা সেইটায় উঠবার পারবেন। সোজা চইলা যান। উইটিং রুমে বইসা অপেক্ষা নিবার পারেন। চাইলে একটু ঘুমায়াও নিলেন।

মিয়াভাই, আপনার পরিচয় তো খোলাসা হলোনা। নাম কি আপনার? ভিড়ের মাঝখান থেকে সুদর্শন এক যুবক জানতে চাইল হঠাৎ। বয়সে আমার ছোট হবে। এক ধরনের উপহাসই হয়তো খেলা করে উঠল ভিতরে, বিরূপ পরিবেশকে সামাল দেবার মেকানিজম কি বলা যায় ব্যাপারটাকে?
আমার নাম শিপলু। তবে ওই চাঅলা ভাই তো জানেন আমার পরিচয়। তার থেকে সব জেনে নেবেন আমি চলে যাওয়ার পর।
খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হলো না। যুবকটি কৌতূহলের সুরে প্রশ্ন ছুড়ল আবার, আপনি লেখেন। সাংবাদিক আপনি, ঠিক ধরেছি?
না রে ভাই।
আপনার ব্যাগে তাহলে কী? ক্যামেরা? আমাদের খুলে দেখাবেন?
কথাবার্তার এই পর্যায়ে বৃদ্ধটি সেই একইরকম কাঁপা কিন্তু মিহি কণ্ঠে ধমক লাগাল। ‘হইছে, থাম তো মুরশিদ। ইনি লোক ভালো, দেইখা বুঝোস না? সত্য কইতাছে।’

কোনো উপায় না দেখে হাত উঁচিয়ে একটা রিকশা ডাকলাম। লোকগুলো আমাকে ঘিরে রাখা বৃত্ত ভেঙে বেরোবার পথ করে দিল। মায়ানগরে ব্লকের পর ব্লক বহুতল দালানের গ্রাস চোখ সওয়া আমার কিন্তু এই ভুতুড়ে শহরটি কীরকম ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে উঁচু উঁচু দালানে, দৃষ্টি বাধা পাচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই। ঘিয়ে, ছাইরঙা কিংবা সাদা বাড়িগুলো মাঝখানে সড়ক রেখে দু পাশে সীমানা দেয়াল তুলেছে। অধিকাংশই নতুন। ছোট ছোট জানালা, বারান্দা নেই, কংক্রিটের খাঁচা যেন। কিছু আবার আছে সুপরিসর, ঝুলন্ত বারান্দায় নারী পুরুষ কিংবা শিশু।

এভাবে কে চায় সেধে বিপদে পড়তে? খুব খারাপ কিছু ঘটতে পারে কখনোই ভাবিনি। আগেরবার পীরের মহল্লায় এসে বেশ তো লেগেছিল। তিনদিনের ছুটি রিপনদের বাসায় শুয়ে বসে আড্ডা মেরে কাটিয়ে দেওয়া চলবে, এই ছিল পরিকল্পনা। অনুমান ছিল, মায়ানগর থেকে এভাবে কাউকে না বলে ওর অকস্মাৎ অন্তর্ধানের কারণ বিয়ে। জানি না, হয়তো দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে পরিণয় এগিয়ে এসেছিল তার। খুব রিজার্ভ ধরনের মানুষ রিপন। এত বছর একসঙ্গে কাজ করলাম, কত জায়গায় গিয়েছি একসঙ্গে আমরা। অথচ কোনোদিন নিজের একান্ত বিষয়ে মুখ খুলেছে তা হয়নি।

সে তুলনায় রিপনের আব্বা-আম্মাকে মনে হয়েছিল প্রাণখোলা। গাছপালার দারুণ শখ ছিল। তমালিকার বিয়েতে এসে দিন চারেক ছিলাম আমি। বোঝা চলছিল, একদম একলা হয়ে পড়বেন তারা। রিপন শহরে ফিরবে আমার সঙ্গে, তখন এ দুজনের কাটবে হাতছাড়া হওয়া দু সন্তানের স্মৃতিচারণ করে। নিঃসঙ্গতার প্রশ্নেই একদিন নঈম চাচা আমাকে বলেছিলেন, ‘বুঝলে শিপলু, ঘরের চেয়ে শক্তিশালী বন্ধু কিছু আর নেই। দেখো, মানুষ কেমন কাছের মানুষকে ছেড়ে চলে যায়, ঘর কিন্তু কখনো মানুষকে ছাড়ে না। সে আশ্রয়দাতা, সঙ্গী হিসেবেও চমৎকার। এই যে বনে-বাদাড়ে ভর্তি বাড়িটা দেখছো, আমার পরদাদার হাতে তৈরি। এতগুলো প্রজন্ম সে পার করল। এ বাড়ি কথা বলে, তা জানো তো?’ চাচি হেসে উঠেছিলেন, ‘ছেলেটার মাথা খারাপ করা আর কী! বাড়ি কথা বলবে কেন?’

কিন্তু এখন? খোঁজ তো দূর, যেনবা এই এলাকায় রিপন আর ওদের কথাবলা বাড়িটার অস্তিত্বই ছিল না কোনোদিন।

সন্ধ্যা নামল ধীরে ধীরে। দোকানপাটে জ্বলে উঠল লালচে বা শাদাটে বাল্ব। পীরের বাজার ছাড়িয়ে আরো অনেকটা দূরে রেল স্টেশন। রিকশার নিচে বাঁধা হারিকেন ঝাপসা আলো ফেলছে আধো-অন্ধকার পথের শরীরে। দু পাশে দালানগুলো কমে গিয়ে বেড়ে চলেছে গাছপালা আর খানাখন্দের সারি। হঠাৎ করেই যেন বা গিরিপথ ছেড়ে সমভূমির দিকে এগিয়ে চলেছি। আকাশের চেহারা এখন আর পরিষ্কার নয়, বেশ মেঘ জমেছে, বৃষ্টি আসলে বিপদে পড়ব। ছাতা কিংবা রেইনকোট, কোনো কিছু আনবার দরকার মনে করিনি রওনার আগে। অন্য সময় হলে এমন দৃশ্য আর পরিবেশ আমাকে আনন্দ দিত। মায়ানগরে এমন নিরালায় রিকশা ভ্রমণের উপায় তো আর নেই। শব্দে দূষণ, বাতাসে দূষণ, মানুষেও।

সোজা রাস্তাটা ডানে মোড় নিয়ে সম্ভবত স্টেশনের দিকে চলে গেছে। সেদিকটায় দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূর্তি হাত উঁচিয়ে কিছু ইশারা করছে। কাছাকাছি হতে দেখলাম, সেই সুদর্শন যুবকটি, কী নাম যেন? বিষণ্নতায় ভার হয়ে থাকা হৃদয়কেও একটা নিরুত্তাপ কৌতূহল দখল করে নিল মুহূর্তে। রিকশাঅলাকে বললাম, ‘ভাই, একটু সাইড করেন তো একপাশে।’

‘মিয়াভাই, আমাকে চিনেছেন? আমার নাম মুরশিদ। ভয় পেয়ে চম্পট দিচ্ছেন নাকি?’ অন্ধকারেও লোকটার সাদা দাঁত দেখে বোঝা গেল নিঃশব্দে হাসছে। এবার কিছু মুহূর্ত আগের কৌতূহল ছাপিয়ে হৃদয় দখল করল একটা ভয়ানক ক্রোধ।
ফাজলামো করার জায়গা পান না? রাজধানীতে ফিরে আপনাদের ছেড়ে দেব ভেবেছেন?
এই যে মিয়াভাই, রাগ করছেন দেখি। রাগের কিছু নেই। আবার ধরেন, আপনি বন্ধুর সন্ধান ভালোমতো না করেই পালিয়ে যাচ্ছেন…
আমি মোটেই পালিয়ে যাচ্ছি না।
বললেই কি মেনে নেব? কলিগের সন্ধানে এসে তাকে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন না?
অনুমতির প্রয়োজন বোধ না করেই রিকশায় উঠে এলো মুরশিদ। আমুদে কণ্ঠে রিকশাঅলাকে বলল, ‘নেন দেখি ভাই। সামনে নেন আবার।’

হেলেদুলে রিকশা চলতে শুরু করল। মোরশেদ ছোটখাট স্বাস্থ্যবান মানুষ। কালো সুতি প্যান্টের ওপর নীল সাদার চেকচেক ফতুয়া পরেছে, অচেনা পারফিউমের সুবাস আসছে তার গা থেকে। ফাঁকে ফাঁকে জরদার ঘ্রাণও। সে যে পান খায় আগে খেয়াল করিনি। কিছুদূর চুপচাপ রিকশা এগিয়ে গেল, কাছাকাছি কোথাও থেমে থেমে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। ফতুয়ার বুক পকেট থেকে এক খিলি পান বের করে মুখে পুরল সে।

দেখতেই তো পাচ্ছেন শহরটা বদলে গেছে কীরকম? সাত বছর আগে যেমন দেখেছেন, এতদিন পর আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও অবাক মানত। একতলা বাড়ি পেয়েছেন একটাও? পাবেন না হাজার খুঁজলেও। সব ছয়তালা সাততালা দালান। নানান এলাকার মানুষে মাছির মতো ভনভন করছে। তবু ছোট শহরের এই সুবিধা। কিছুদিন গেলেই সবাই সবাইকে চিনে ফেলে।
আমার একটা কথার জবাব দেবেন দয়া করে?
কী কথা?
নঈম ডাক্তার বা রিপন নামটা কি সত্যিই এমন অপরিচিত? কী এমন হয়ে গেল এর মাঝে? একবারও আমার মনে হচ্ছে না যে ভুল এলাকায় এসে ওদের সন্ধান করছি।
না মিয়াভাই, অপরিচিত কেন হবে? সব ঘটনা সবার সামনে তো বলাও যায় না।
কী বলব তা ভেবে উঠবার আগেই আমাদের রিকশা থেমে গেল। কিন্তু রেল স্টেশন কোথায়? এদিকটা দেখছি শহরের পরিত্যক্ত অংশ। চারদিকে বাড়িঘর কিছুই নেই। একসময় ছিল তার প্রমাণ হিসেবে অসমতল ভিতগুলো রয়ে গেছে। বাজারটা কেউ গুঁড়িয়ে দেয়নি তবে ম্লান অন্ধকারে ছায়া ছায়া শাটারবিহীন দোকানের সারি, খাওয়ার হোটেলগুলোর সামনে উঁচু মাটির বিশাল চুলোতে ধ্বস নেমেছে। মুরশিদ বলল, ‘ওই পশ্চিমে সোজা হেঁটে যান, বাজারটা পার হলেই রাস্তার পাশে দেখবেন দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। ওইটাই খুঁজছেন আপনি। এগিয়ে যান।’

যুবকটির কথাবার্তা বোধের অগম্য হয়ে উঠেছে। তবু কিছু বলার চেয়ে মনে হলো নেমে যাই রিকশা থেকে। ব্যাকপ্যাকটা কোলের ওপর থেকে কাঁধে চড়িয়ে পশ্চিমে অস্থির পায়ে হাঁটা ধরলাম। ওই তো, নঈম ডাক্তারের বাড়ি ছাড়া ওটা আর কী?

হ্যাঁ, অবিকল সেই বাড়ি। গেটের দু পাশে নারিকেল গাছ দুটির মাথা বাতাসে নৃত্যরত। কিছু আগের গুমোটভাব কেটে গেছে। বাসার ছাদে এক ছোটখাটো মিনিয়েচার অরণ্যের মতো তৈরি হয়েছে টবে লাগানো গাছে, সেখানে জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। কিন্তু মানুষ কোথায়? আলো জ্বলছে না যে ভিতরে? কয়েকবার রিপনের নাম ধরে ডাকলাম। কোনো সাড়া এলো না। গেট পেরিয়ে ছোট্ট একটা উঠোনের মতো ছিল, এখন ঠিক উঠোনের কোন দিকটায় দাঁড়িয়ে আছি ঠাহর করা যাচ্ছে না। আঁধার বাড়ছে প্রতি মুহূর্তেই।

‘পেলেন কাউকে?’ মুরশিদের প্রশ্নে চমকে উঠলাম। নিঃশব্দে কখন পাশে দাঁড়িয়েছে।
না, কেউ তো সাড়া দিল না।
কেউ থাকলে নিশ্চয়ই দিত।
দেখেন ভাই, আপনাদের শহরে ঢুকবার পর থেকে কোনো কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। খুলে বলবেন প্লিজ?
প্লিজের কিছু নেই আসলে। মাথায় ঢুকবে সব, ধীরে ধীরে।
মানে?
একটু আগেই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম না? আবার করি, গোটা পীরের মহল্লায় একতলা বাড়ি দেখেছেন কোনো?
ভুল বলছে না মুরশিদ। বারবার যে মনে হচ্ছিল শহরটা আগের মতো নেই, এই কি সেই বদলের কারণ?
কী ভাবেন? দেখেন নি তো? এখন এই যে নঈম ডক্তরদের ভিটায় দাঁড়িয়ে আছেন, গোটা শহরে এই একটাই বাড়ি যেটা একতলা। শহরের সমস্ত লোকজন ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছিল তাদের পুরনো নিবাস। বহুতল ভবনের সংখ্যা যেমন বাড়ছিল শহরের নতুন অংশে, এর পক্ষে জনমতও। এমনকি যাদের অর্থ নেই, তারাও চাইছিল উঁচুতে উঠতে। দেখছেন না, শহরের এই দিকটা কীরকম পরিত্যক্ত হয়ে আছে? এ মহল্লাটা ধীরে ধীরে সমান করে দিয়েছে নগরভবনের বুলডোজার এসে। শুধু ওনারাই ছিলেন সবকিছুর বিপক্ষে। আপনার কলিগ আর তার বাবা-মা। এ বাড়িটা তাই রয়ে গেল। অবিকল। কেউ একটা টোকা পর্যন্ত দেয় নাই কোনো দেয়ালে।
বাড়ি রয়ে গেল। কিন্তু ওরা কোথায়? কী করেছেন আপনারা তাদের সঙ্গে?

আমরা একটা বিপ্লব শুরু করেছিলাম। সেই বিপ্লবের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল নঈম ডক্তরের পরিবার। সবাই এই পুরনো দিকটা ছেড়ে গেলেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে রইল। একঘরে হয়ে গেলেও, দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আর তাদের অবিবাহিত পুত্র, মেয়েটার বসবাস তো বিদেশেই ছিল বিয়ের পর থেকে। তাদের আর বিশেষ প্রয়োজন কী সমাজের কাছে? কিন্তু আপনি তো অস্বীকার করবেন না যে, সমাজের সিদ্ধান্তে যারা নেই, সমাজে থাকবার কোনো দরকারও তাদের নেই।
নেই মানে? ওরা কোথায় এখন? আপনারা এই সামান্য কারণে তিনজন মানুষকে ভিটেছাড়া করেছেন?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/27/1566896478188.jpg

নাহ। আমরা কি ছোট লোক? ঠিক এক সপ্তাহ আগে টাউন হলে সভা হয়েছিল। ভোটাভুটি। পীরের মহল্লা হবে দেশের প্রথম বহুতল শহর। আমরা সেইটা থেকে মাত্র একধাপ দূরে ছিলাম। নগরপিতা বললেন, ‘নঈম ডক্তর যদি এখনো তার সিদ্ধান্ত থেকে না সরে আসে, তবে ভিন্ন উপায় আমাদের সামনে নেই। একজন মানুষ আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা হতে দেব না আমরা।’ পুলিশ কমিশনারের দিকে চেয়ে নগরপিতা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তাই কি দেওয়া উচিত?’ উঠতি বয়সের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণী তখন বলেছিল, ‘এমন ডিসিশান পুরো শহরটাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। কেস-কামারি হবে, পত্রিকায় সংবাদ হবে, নানান আশঙ্কা। তার জবাবে নগরপিতা উত্তর দিয়েছিলেন, আহা, সে কী চমৎকার উত্তর, ‘এত বড় একটা বিপ্লব হতে যাচ্ছে, আর লোকে জানবে না? দরকার পড়লে লোকে আন্দোলন করবে দিন রাত। পায়ে হেঁটে লং মার্চে যাবে মায়ানগর অভিমুখে। অনশন চলবে সংসদের সামনে। একটা ব্রাইট ফিউচারের জন্য এমন সংগ্রাম কি নগরবাসি করবে না?’

অন্ধকার গাঢ় হবার আগেই আকাশ জুড়ে অজস্র নক্ষত্র ফুটে গেল। সেই নক্ষত্রের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যে পৃথিবীতে আমি আছি এখন, একে ঠিক চিনি না। মুরশিদ আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘চলেন, আপনাকে ইস্টিশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’
পায়ে হেঁটে পরিত্যক্ত বাজারটা পেরিয়ে এলাম। যেখানে রিকশাটা ছিল, অবিকল দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রিকশাঅলা নেই। কী করব ভেবে পেলাম না কয়েক মুহূর্ত। মায়ানগর ফিরে কী বলব ম্যানেজমেন্টকে?

আমার চিন্তার সুতো কাটল অজস্র মানুষের পায়ের শব্দ। একদল লোক যেন মিছিল করে এদিকেই আসছে এগিয়ে। প্রায় সবার হাতে চার্জার লাইট। মিছিলের সামনের দিকে সেই বৃদ্ধটি। পাশে রুগ্ন আর অস্বাভাবিক লম্বা এক লোক। সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরে থাকায় যাকে দীর্ঘ এক মৃতদেহ বলে ভ্রম হলো এক মুহূর্তের জন্য।

মিছিলটি আমার খুব কাছে এসেই থেমে গেল। যতজনের চোখের দিকে তাকাবার সুযোগ হলো, তাদের দৃষ্টিতে একধরনের চেপে রাখা বেদনা। বৃদ্ধটি অনুযোগ করে বললেন, ‘কাজটা তুই ঠিক করোস নাই রে মুরশিদ। বাবাসাহেবরে ইস্টিশনে পাঠায়া দিলেই ভালো করতি।’

বৃদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক দীর্ঘাঙ্গ লোকটিই কি নগরপিতা? শোনা যায় না প্রায় এমন খসখসে কণ্ঠে সে বলল, ‘আপনিই শিপলু? রিপনের বন্ধু?’
জ্বি।
শুনলাম রাজধানীতে ফেরত যাচ্ছেন?
হ্যাঁ যাচ্ছি।
কেমন দেখলেন আমাদের শহর?

কিছু বলবার মতো শব্দ খুঁজে পেলাম না আর। এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। কোন এক অফুরন্ত ক্লান্তির ভাণ্ডার থেকে যেন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে ঘুমের আরক। অবসন্ন হয়ে উঠল মন ও শরীর। লোকগুলোর হাতে চার্জার জ্বলছে। মেঘ ডাকছে আকাশে। হালকা বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। আম্মা এর নাম দিয়েছিলেন সুঁইসুঁই বৃষ্টি। কিছুক্ষণের এক অসহ্য নীরবতা শেষে লোকটা বলল, ‘মায়ানগর আর ফেরা হবে না আপনার। বহুতল বিপ্লবের একটা স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। একটা স্মৃতির বাগান। তার দেখাশোনা করতে যোগ্য লোকও তো চাই আমাদের।’
‘মানে?’
নগরপিতার সেই অপরিবর্তনীয় খসখসে কণ্ঠ ঘোষণা করলো, ‘নঈম ডক্তরের বাড়িটাকে আমরা জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করব। আপনি হবেন এই জাদুঘরের কিউরেটর।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;