বাবার বিয়ে



সানজিদা আমীর ইনিসী
অলঙ্করণ: শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ: শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আমার মা মারা যাওয়ার পরের দিনে আমার দাদি বাবার জন্য মেয়ে দেখতে গেছিলেন। আমি থ্রিতে পড়ি তখন। মেয়ে দেখা, বিয়ে হওয়া এইসব বুঝি। মেয়ে দেখার কথা আমি আমার খালারে বললাম। খালা শুইনা কান্নাকাটি শুরু করল। আমারে বলল, “কপাল মন্দ। কী করবা মা!”

আমি কী করব জানতাম না। আসলে বাবা বিয়ে করলে কী-কী হবে তাও ঠিকঠাক বুঝতাম না। আত্মীয়স্বজন কারো সৎ মা নাই। তবে সৎ মা’রা কেমন হয় তা অনেক সিনেমায় দেখছি। সেইসবও সত্য বইলা বিশ্বাস করতে পারতাম না।

আমার মা যখন আমারে বকা দিত, তখন মা’রে বলতাম, “তোমারে বিক্রি কইরা বাজার দিয়া আরেকটা মা কিনা আনব।”

মা বলত, “তাইলেই সারছে! সেই ঘরে তোর আর ভাত খাওয়া লাগবে না।”

মা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলত। আর সত্যি সত্যি, মা’র বলার ধরনে আমার ভয় লাগত। তখন ভাবতাম, মা সম্ভবত একজনই। ভাবতে ভাবতে বইতে পড়া পোয়েমের লাইনগুলি মাথায় ঘুরত।

“I know a face, a lovely face,
As full of beauty as of grace,
A face of pleasure, ever bright,
In utter darkness it gives us light
A face that is itself like joy,
To have seen it I’m a lucky boy
But I’ve a joy that have few others
This lovely woman is my mother.”

আমি বারবার বিড়বিড় করতাম “This lovely woman is my mother.”

আমি বাবাকে বললাম, দাদি মেয়ে দেখতে গেছিল। আর এও বললাম, আবার মেয়ে দেখতে গেলে আমি বাসা থিকা চইলা যাব। আর কখনো বাসায় ফিরব না। কথা বলতে বলতে আমি কাঁদতে ছিলাম। গলা বন্ধ হইয়া আসতেছিল। হাত-পা ঠান্ডা হইয়া যাইতেছিল। বইসা যেন ঠিকমতো বুঝায়ে বলতে পারতেছিলাম না। তাই দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে কথা বললাম। বাবা দাদিকে আমার সামনে মেয়ে দেখতে মানা করল। মানা করায় দাদি নিষ্ঠুরভাবে হাসলেন। তার হাসি দেইখা আমি আমার সামনে থাকা ফ্লোয়ার ভ্যাস ছুইড়া মারলাম মেঝেতে। সেইটা ভাইঙা কয়েক টুকরা হইল। বাবা কিছু বলল না। ঘর থিকা বের হইয়া গেল।

আমি দরজা আটকাইয়া অনেকক্ষণ কানলাম। মা’র ছবি বাইর কইরা দেখতে শুরু করলাম। সব ছবিতে মা হাসতেছে। আমার চোখের পানি অ্যালবামের ওপর টপাটপ পড়তে লাগল। মা’র মুখের ভঙ্গি তারপরেও একই রকম থাকতেছে। অথচ গতদিন, এই গতদিনও আমি কানলে মা’র চোখ ছলছল করত।

খালা বাসায় আইসা ডাকাডাকি করল। দরজা খুললাম। জড়ায়ে ধরলাম। কানলাম।

“খালার গা থিকা মা’র মতো গন্ধ আসে”—এইটা জানা থাকার জন্য কি-না জানি না, তবে মা’র গা’র গন্ধই পাইতেছিলাম। আমার ঘুম আসলো গন্ধে। আমি খালার কাঁধের ওপরই ঘুমায়ে পড়লাম।

দাদি এরপর সত্যিই মেয়ে দেখা বন্ধ রাখছিলেন। আমার সাথে আমার ফুফাত বোন থাকত। আমার চেয়ে সাত-আট বছরের বড়। মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করছে, আর পড়াশোনা করবে না, তাই সে আইসা থাকত। আমারে স্কুলে নিয়া যাইত, নিয়া আসত। ভাত খাওয়ায় দিত, গোসল করায় দিত, ঘুম পাড়ায় দিত। দাদি অন্য রুমে থাকতেন। সারাদিন তজবি জপতেন, আমারে দেখলে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতেন। দীর্ঘনিঃশ্বাস শুনলে আমার গা জ্বইলা যাইত। তখন চোখমুখ এক কইরা চুপচাপ বইসা থাকতাম।

মা মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে কোচিংয়ে যাওয়া শুরু করছিলাম। কোচিংয়ে নতুন এক ম্যাডাম আসছেন। একটু পর দেখলাম, সবাই তারে ঝর্ণা ম্যাডাম বইলা ডাকতেছে। আমার মা’র নামও ঝর্ণা। ম্যাডামের মুখের দিকে তাকাইতে আমার মন খারাপ হইল। ম্যাডাম সব জানতেন, এবং পুরো ক্লাস আমার পাশে বইসা রইলেন। মাঝেমধ্যে মাথায় হাত বুলাইতে ছিলেন। আমি চেষ্টা করতেছিলাম না কাঁদার জন্য। কিন্তু ম্যাডাম যখন বললেন, “থাক মা, মন খারাপ করে না”, তখন মুখ স্বাভাবিকের চেয়ে আরো নিচু কইরা ফেললাম। ক্লাসের সবাই তখন লেখা রাইখা আমার দিকে তাকায়ে আছে, কেউ কেউ কাঁদতেছে।

বাবা বিয়ে করল মা মারা যাওয়ার নয় মাস পর। এই নয় মাস প্রায় প্রতিদিন দাদির সাথে বিভিন্ন ব্যাপারে ঝামেলা হইত। বাবার চাকরি পটুয়াখালী, পটুয়াখালী থাকতে হয় তার। বৃহস্পতিবার রাত্তিরে বাসায় আসে, শুক্র শনিবার থাকে, রবিবার সকালে আবার চইলা যায়। দিনে আমি বাসায় থাকায় দাদি আমার ব্যাপারে বাবারে নালিশ করতে পারত না। তাই সে রাতে নালিশ করত। রাত তিনটা চারটার দিকে। আমি বাবা আসলে বাবার সাথে ঘুমাই। দাদি আর আপু অন্য রুমে। এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভাইঙা গেল। লাইট জ্বলতেছে দেখলাম। দেখে চোখ বুজলাম। বুঝলাম দাদি বইসা আছে খাটের সামনে, সোফায়। বাবা তার পাশে। আমি রাগ দেখাই, ভাঙচুর করি, শুধু খালার কথা শুনি, তাদের কথা শুনি না—এসব বলতেছিলেন। বাবা শুইনা গেল। কিছু বলল না।

দাদির সাথে সমস্যা শুরু হইছিল মা’র তিনদিনের মিলাদের দিন। মিলাদের আগে দাদি মা’র ব্যাপারে ঠেস দিয়া কথা বলতেছিলেন। ঘর ভর্তি মানুষ ছিল সামনে। আমি শুনলাম শুধু। বাবাকে এই কথা পরে বলছি, সেও কিছু বলে নাই। বাবার কিছু না বলাতে আমার ভীষণ রাগ হইছে, এবং তার পর থিকা আমি দাদিকে একদম পছন্দ করি না।

আমি ফোরে ওঠার পর আপু আমাদের বাসা থিকা চইলা গেল। তার বিয়ে ঠিক হইছিল।

আপু ছাড়া বাসার কাজকর্ম করার কেউ নাই যেহেতু, বাসা ছাড়া হইল। মালপত্র পটুয়াখালী নিয়া গেল। আমি খালার কাছে রইলাম। বরিশালে। খালার ছেলেমেয়েদের বিয়ে হইয়া গেছে, সে একলা থাকে বিধায় ঝামেলা নাই।

খালা মাঝেমধ্যে আমারে বুঝাইত। বাবার বিয়ের ব্যাপারে। সে নিজেও মেয়ে দেখত। পছন্দ হইলে বাবারে জানাইত।

কিছুদিন পর একটা মেয়ে বাবার পছন্দ হইল। আমারে তখন সকাল-বিকাল নিয়ম কইরা বোঝানো হয়। দূরের আত্মীয়স্বজনরা ফোন কইরা বুঝান। আমি মাথা ঝাঁকাই, হু হু বলি। কান্নাকাটি করি। ছাদে গিয়া একলা বইসা থাকি। খালা আমারে ভূতের ভয় দেখাইত। ছাদে একলা থাকলে ভূত নাকি নিয়া যায়। আমি এইসব ভয়ের ধার ধারতাম না। আমি হুট কইরা ছোট থিকা বড় হয়ে গেছি। অনেক বড়, কখনো কখনো আমার আশপাশের সবার চেয়ে বড়।

কোচিং থিকা বাসায় ফেরার পথে আমি অনেক রাস্তা ঘুইরা হাঁইটা আসতাম। ব্যাগে রিকশাভাড়া জমা থাকত। জ্বর হইলে একলা ডাক্তার দেখাইতাম। ডাক্তার যখন দেখেন থ্রি কোয়ার্টার, ফতুয়া পরা, কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়া একটা মেয়ে একা আসছে তখন তার চোখেমুখে অবাক হওয়া ভাব থাকে। আমার তা ভালো লাগে। আমার মতো কেউ নাই আমার ক্লাসে। সবাই একলা রাস্তায় হাঁটতে ভয় পায়। রাস্তা পার হইতে ভয় পায়। আর একলা ডাক্তার দেখানো, হিহি, তা তো ভাবতেই পারে না। আমি ডায়েরি লিখতাম প্রতিদিন। কী-কী হইতেছে সব লিখে রাখতাম।

বাবার বিয়ের ব্যাপারে পাকা কথা হওয়ার পর একদিন আমাকে মেয়ের বাসায় নিয়া যাওয়া হইল। সাথে আমার খালা আর কাকা ছিলেন। আমি এই হবু মা’কে কী ডাকব বুঝতেছিলাম না। তার ওপর রাগ হইতেছে খানিক। কিন্তু সে দেখলাম খুব সহজ ব্যবহার করল। আমি হাত দিয়া খাইতে পারি না জানত। আমাকে খাওয়ায় দিলো। কথা বলল।

জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার পড়াশোনা শেষ?”

“অনার্স শেষ। আরো অনেক আগে।”

“কী সাব্জেক্ট?”

“ফিজিক্স।”

“মানে অংক?”

“না। অংক না। তবে অংক আছে।”

কথা বইলা আমার ভাল্লাগল। বাসায় ফেরার পর আমার মতামত জানতে চাওয়া হইল। আমি সংক্ষেপে ‘হ্যাঁ’ বইলা প্রত্যেককে বিদায় দিলাম।

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯।

আমার বয়স দশ।

খালার বাসায় লম্বা বারান্দা আছে। কোনায় একটা ইজিচেয়ার থাকে। আমি বইসা রইলাম সারা সকাল। মা কিভাবে চইলা গেল ভাবতেছি। গায়ে একটা হলুদ রঙের তাঁতের জামা ছিল। কুয়াকাটা থেকে কেনা। কতবার আমরা কুয়াকাটা গেছি, মা’র পাশে হাত ধইরা বালিতে হাঁইটা বেড়াইছি বা হাঁটছি ঝাউ গাছের পাশে। কতবার কত কম দুঃখে সারা দুপুর জড়ায়ে, পারলে কলিজার ভেতর ঢুইকা ঘুমাইছি। অথচ আজকের দিনটা কত দুঃখের, কত বিষণ্ণ।

২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহ হইছে। নিউজ চ্যানেলে বলতেছে কী-কী যেন। বাবা টিভি দেখতেছে। পাশে ছোট কাকা। আমি ঘুইরা আসলাম তাদের সামনে থেকে। কারো সাথে কোনো কথা হয় নাই।

ছোট কাকা ঢাকা থিকা আসছে, বাবার বিয়ে উপলক্ষে। আজকে বাবার বিয়ে। সবাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি স্বাভাবিক। হবু মামা ইয়োলো একটা জামা পাঠাইছেন আমার জন্য। এইটা পইরা যাব, যেহেতু একদম নতুন।

খালার রুমে পালঙ্ক আছে। তার শ্বশুরের আমলের। পালঙ্কের মাথার কাছে বিশাল একটা মূর্তি। চোখ বন্ধ কইরা আছে। যেন সে পৃথিবীর ঘটমান কিছুই দেখতে চায় না; আমার মতো। আমি অনেকক্ষণ বইসা মূর্তিটা দেখি। দেখতে দেখতে আমার কাঁদতে ইচ্ছা করে। পাশের রাস্তায় জোরে গাড়ির হর্ণ পড়লে কাঁদার ইচ্ছা কমে।

দুপুরে বিয়ে হবে। আমরা একটার দিকে যাব। খুব অল্প মানুষ। আমার দাদাবাড়ির দিকের ছোট কাকা ছাড়া কেউ নাই। আর আমার আপন খালা, মামা, খালাত বোনেরা আছে।

কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে হয় নাই। মানুষজন কম যেহেতু, বাসাতেই বিয়ে হইছে। বাসায় আমার হবু মা’র মা, ভাই, ভাইয়ের বউ, বোন, বোনের জামাই আর তাদের বাচ্চাকাচ্চারা আছে। বিয়ে পড়ানোর পর দাদির সাথে বাবার ফোনে কথা হইছে। দাদি হয়তো এই বিয়েতে খুশি হন নাই। কারণ তার পছন্দে বিয়ে হয় নাই।

সিগনেচার-টিগনেচার হইয়া যাবার পর খালাত বোন আইসা তার চোখমুখ উজ্জ্বল কইরা আমাকে বলল, বিয়ে হয়ে গেছে।

সে সম্ভবত দেখতে চাইতেছিল আমি কী বলি বা কী করি।

আমি তারে বললাম, “এই বাসার বড় মামি মাটন চাপটা অনেক ভালো বানায়। আজকে খাইয়া দেইখো। আমি আগেও খাইছি।”

আপুর উৎসাহে ভাটা পড়ায় চেহারা বিমর্ষ হইল। সে চেয়ার টাইনা আমার থিকা দূরে গিয়া বসল।

আমার তখন আমার চারপাশের সবার মতো সবটা স্বাভাবিক মনে হইতেছে।

আমরা পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দিছি বিকাল চারটায়। মাইক্রোর সামনে ড্রাইভারের পাশে বাবা বসছে। পেছনে আমি আর মা।

একটু পর মা’কে বললাম, আপনাকে সুন্দর লাগতেছে।

“থ্যাংক ইউ! মা’কে কেউ আপনি কইরা বলে নাকি! ‘তুমি’ বলবা।”

“আচ্ছা।”

মা’র খুব বেশি জার্নির অভ্যাস নাই। ভাঙা রাস্তার ঝাঁকাঝাঁকিতে বমি করল কয়েকবার। বমি করার আগে আমাকে বইলা নিলো, “তুমি সইরা বসো। আমার দিকে তাকায়ো না। বমি করতে দেখলে তোমারও বমি আসবে।”

আমি অন্যদিকে তাকায় থাকলাম। থাকতে থাকতে ঘুমায় গেলাম। পটুয়াখালী গিয়া যখন মা ডাক দিলো, তখন বুঝলাম ঘুমাইয়া গেছিলাম মা’র কাঁধের ওপর।

তারপর ঘুমজেগে অনেকদিন আর অনেকরাত পার করছি। এইসব দিনরাত্রিতে মা এক রাতে বলছিল, আমি বড় হইলে পরে অনেক গল্প হবে। এইটুক কথা বলতে মা কাঁদছিল সেই রাতে।

আমাদের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, একটা কথা, একটা ডাক, আমাদের পিছু ডাকে সবসময়। আমি আমার আপন মা’র থিকা বেশি সময় ধরে তারে মা ডাকতেছি। মা’রেও আমার আগে কেউ মা ডাকে নাই। এই ব্যাপারগুলি আমাদের বাঁইধা রাখে। মাঝে ভালো দিন, কথা বন্ধের দিন, মুখে ভাত তুইলা খাওয়ায়ে দেওয়া দিন, হাসিঠাট্টার দিন, বিষণ্ণ দিন—কতদিন নদীর মতো বয়ে গেছে। আমি টের পাই না। দেখতে পাই ফ্রেমে থাকা আমাদের দিনগুলি; ভালো দিনগুলি নিয়ে যেসব বাঁধায়ে রাখছিলাম।

গ্রন্থমেলায় জিয়াউল জিয়ার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ছড়া’



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২৩-এ প্রকাশিত হয়েছে ছড়াকার জিয়াউল জিয়ার দ্বিতীয় ছড়া-কবিতা গ্রন্থ ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ছড়া’। বইটি বাজারে এনেছে ইচ্ছে প্রকাশ। বইমেলায় পরিবেশক পরিবার পাবলিকেশনের ৪২০-৪২১ নাম্বার স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বইটি। বই বেচাকেনার অনলাইন প্লাটফর্ম রকমারিতেও পাওয়া যাচ্ছে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ছড়া’।

বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন মিজান মাহমুধ। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হয়েছে ১২০ টাকা।

বইটি প্রসঙ্গে জিয়াউল জিয়া বলেন, ‘জৈবিক চাহিদা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এটিকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। আর চাহিদা মেটাতে গিয়েও তৈরি হয় অনেক গল্প। সেসব গল্পই ছন্দে বাঁধার চেষ্টা করেছি আমি।’

জিয়াউল জিয়ার জন্ম খুলনার খালিশপুরে। বর্তমানে তিনি দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশে সহ-সম্পাদক পদে কর্মরত। লেখালেখি তার শখের যায়গা। তার এরকম আরেকটি শখের জায়গা হলো নাটক নির্মাণ।

;

সৈয়দ ইফতেখার-এর সেরা ছড়াগুলো নিয়ে বই



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৩-এ প্রকাশিত হয়েছে লেখক, সাংবাদিক, উপস্থাপক সৈয়দ ইফতেখার-এর প্রথম বই, ‘ছড়ার দেশে, যাচ্ছি ভেসে, হেসে হেসে’।

মেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাচ্ছে ইন্তামিন প্রকাশনের স্টলে। স্টল নম্বর ২৫৯-২৬০-২৬১ (অন্যপ্রকাশ প্যাভিলিয়নের পাশে)। মূল্য মাত্র ১৫০ টাকা। এছাড়া বইটি মিলবে অনলাইনে বই বিক্রির কেন্দ্র রকমারিতে।

ছন্দময় ছড়াগুলো ইতোমধ্যে পাঠক মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক আর অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সেরা ছড়াগুলো নিয়ে বইটি সাজানো।

বইটির প্রচ্ছদের তথ্য অনুযায়ী, ছোট-বড় সবার জন্য এই বই। সহজ-সরল ভাষায় লেখা। দেড় দশকের শ্রেষ্ঠ ছড়াগুলো এখানে সন্নিবেশিত। পড়ে ফেলা সম্ভব এক নিঃশ্বাসে। লেখালেখির চর্চা যাদের আছে, তাদের জন্যও কার্যকরী বইটি। একটা সময় মানুষের মুখে মুখে ছড়ার বুলি ছিল, এখন আর সে দিন নেই। আবেদন হারাচ্ছে ছড়াও। কিন্তু বাঙালি হিসেবে ছড়া পড়া আমাদের ঐহিত্য নয় কি?

সৈয়দ ইফতেখার টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। সংবাদ, অনুষ্ঠান ও টকশো উপস্থাপনা করছেন বহু বছর ধরে। এছাড়া কাজ করে যাচ্ছেন বার্তাকক্ষে, সামলাচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিভাগের দায়িত্ব। করেছেন নাটক, টেলিফিল্মে অভিনয়ও। এর আগে সৈয়দ ইফতেখার-এর দুটি যৌথ গ্রন্থ প্রকাশ পায়, যার একটি কবিতা ও একটি ছড়া।

ছড়ার মাধ্যমে ২০০৬ সাল থেকে জাতীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন সৈয়দ ইফতেখার। ধীরে ধীরে কলম, কি-বোর্ডের সীমানা বিস্তৃত করেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ফিচার ও কলামে। পড়াশোনা সম্পন্ন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগে। পরে আরও উচ্চ শিক্ষা নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফিতে। সাংবাদিকতার খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। নিতান্তই শখের বসে নির্মাতা হিসেবে তৈরি করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ও শর্ট ফিল্ম।

তরুণ বয়সে ২০০৭ সালে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি একুশে টেলিভিশনে। পরে কয়েকটি পত্রিকা ও অনলাইনে কাজ করেন প্রতিবেদক পদে। ২০১৪ সালে যুক্ত হন বসুন্ধরা গ্রুপের অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলানিউজে। বার্তাকক্ষে কাজের পাশাপাশি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করে কাটে বছর চারেক। সেখান থেকে যোগ দেন শীর্ষ সংবাদভিত্তিক চ্যানেল সময় টেলিভিশনে। ২০২১ সালের শেষে আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন দেশের প্রথম বিজনেস চ্যানেল 'এখন টেলিভিশনে' (সিটি গ্রুপের স্পাইস টেলিভিশন লিমিটেড)।

সৈয়দ ইফতেখার ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে তরুণ লেখক হিসেবে সম্মাননায় ভূষিত হন ২০১৬ সালে। তার পুরো নাম সৈয়দ ইফতেখার আলম। জন্ম, ১৪ই আগস্ট, ৩০শে শ্রাবণ, ঢাকায়, বেড়ে ওঠাও এ শহরে। পৈতৃক ভিটা উত্তরবঙ্গে।

;

রবিউল কমলের উপন্যাস রূপকথা



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
রবিউল কমলের উপন্যাস রূপকথা

রবিউল কমলের উপন্যাস রূপকথা

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে রবিউল কমলের প্রথম উপন্যাস রূপকথা।

লেখক জানান, রূপকথা ভিন্নধর্মী উপন্যাস। বিরল রোগে আক্রান্ত ১০ বছরের একটি শিশু এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। রূপকথার অসুখটি বৃদ্ধদের মতো, দিনদিন সে বৃদ্ধদের মতো হয়ে যাচ্ছে। তার দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে। তাকে প্রায়ই হাসপাতালের আইসিইউতে থাকতে হয়। বিরল রোগে আক্রান্ত সন্তানকে ‍সুস্থ করতে ৮ বছর ধরে চেষ্টা করছেন রূপকথার বাবা-মা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত কী হবে তা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।

বইটিতে সমাজের মানুষের চিরাচরিত ‍দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাবে। কারণ, রূপকথার অসুস্থতা ও তার জমজ বোনের ছয় মাস বয়সে মৃত্যুর জন্য বাবা-মায়ের বিয়ের আগের প্রেমকে দায়ী করে করে তারা। পুরো বইটিতে একটি অসহায় শিশু ও তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের লড়াইয়ের গল্প ফুটে উঠেছে।

বইটি প্রকাশ করেছে দেশ পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী।

;

দ্বিশত জন্মবর্ষে মাইকেল মধুসূদন দত্ত



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

দ্বিশতবর্ষে পদার্পণ করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪ – ২৯ জুন, ১৮৭৩), যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও প্রথম সার্থক নাট্যকার, বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলা সনেট আর আধুনিক মহাকাব্যেরও জনক।

দুইশত বছর আগে ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক জমিদার বংশে মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। মধুসূদন দত্তের পিতা রাজনারায়ণ দত্ত এবং মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। পিতা কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল ছিলেন আর তাই তাকে বেশির ভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকতে হতো। পিতা ব্যস্ত থাকলেও মাতার তত্ত্বাবধানে মধুসূদনের শিক্ষারম্ভ হয়।

মধুসূদন দত্ত প্রথমে সাগরদাঁড়ির পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। সাত বছর বয়সে মধুসূদন দত্ত কলকাতা যান এবং সেখানে খিদিরপুর স্কুলে দুই বছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালেই মধুসূদনের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮৩৪ সালে মধুসূদন দত্ত কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের মনে জায়গা করে নেন।

হিন্দু কলেজে মধুসূদন দত্তের যে সকল সহপাঠী ছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন— ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ; এঁদের প্রত্যেকেই স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তবে মধুসূদন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন। এ সময় ‘নারীশিক্ষা’ বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৮৪৪ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিশপ্স কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৪৭ পর্যন্ত ওই কলেজে অধ্যয়ন করেন। বিশপ্স কলেজে মধুসূদন ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান। পরবর্তীতে বিলেতে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন।

খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ ও ব্যক্তিজীবনে তার প্রভাব ছিল মধুসূদন দত্ত উপর। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি টান থেকেই তিনি ফেব্রুয়ারি ৯, ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেই থেকেই তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়।

হিন্দু কলেজে খ্রিষ্টানদের অধ্যয়ন নিষিদ্ধ ছিল, আর তাই মধুসূদনকে কলেজ ত্যাগ করতে হয়। ১৮৪৪ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিশপ্স কলেজে ভর্তি হন। এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতাও এক সময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। অগত্যা মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন। মাদ্রাজে মধুসূদন দত্ত সাংবাদিকতা, সম্পাদনায় যুক্ত হওয়া, সাহিত্যচর্চা, বিয়ে ও বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।

খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ফলে স্বজনরা মাইকেল মধুসূদন দত্তকে দূরে ঠেলে দেয়। আর তাই নিজের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে মধুসূদন মাদ্রাজ গেলে সেখানে মধুসূদনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটে। মাদ্রাজে বসবাসের সময় থেকেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত Eurasion (পরে Eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle ও Hindu Chronicle পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং Madras Spectator-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (১৮৪৮-১৮৫৬)।

মাদ্রাজে অবস্থানকালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘Timothy Penpoem’ ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘The Captive Ladie’ (১৮৪৮) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘Visions of the Past’ লেখেন।

মাদ্রাজে অবস্থানকালেই মাইকেল মধুসূদন প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম রেবেকা ও দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম হেনরিয়েটা। মাদ্রাজে বসেই তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন।

পিতা ও মাতার মৃত্যুর পেয়ে ১৮৫৬ সালে মধুসূদন দত্ত দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে কলকাতায় ফেরেন। কলকাতায় আসার পরে প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানি এবং পরে দোভাষীর কাজ করেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেও তিনি প্রচুর অর্থোপার্জন করেন।

সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিকাশ ছাত্রাবস্থায় হয়। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়েই মধুসূদন কাব্যচর্চা শুরু করেন। তখন তাঁর কবিতা জ্ঞানান্বেষণ, Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।

মধুসূদন দত্ত মনে করতেন যে, বিলেতে গেলেই বড়ো মানের কবি হওয়া সম্ভব। আর তাই তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্র থাকা সময় থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাওয়ার। তিনি বিখ্যাত ইংরেজি কবি হতে চেয়েছিলেন, আর তাই শুরুর দিকে ইংরেজিতেই সাহিত্যচর্চা করতেন। যদিও ইংরেজিতে তিনি প্রবন্ধ লিখতেন বেশি। কিন্তু তাঁর বন্ধুবান্ধবরা তাঁকে বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে অনুরোধ জানান এবং তিনি নিজেও ভেতর থেকে এরূপ একটি তাগিদ অনুভব করেন। এই তাগিদ থেকেই তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন

বাংলায় উপযুক্ত নাটকের অভাববোধ মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর বন্ধুবান্ধব বা কাছের মানুষদের অনুরোধে বাংলা ভাষায় লেখার প্রতি আগ্রহী হন। আবার তিনি নিজেও বাংলায় লেখার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী (১৮৫৮) নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করেন তখন তিনি বুঝতে পারেন যে, বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব রয়েছে; এখান থেকেই তাঁর মধ্যে বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প জাগে ও তিনি পাশ্চাত্য রীতিতে ‘শর্মিষ্ঠা’ রচনা করেন।

বাংলা নাটক লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এমন একটি পরিস্থিতিতে নাট্যকার হিসেবেই মধুসূদনের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ ঘটে। ১৮৫৮ সালে মধুসূদন দত্ত মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক।

‘শর্মিষ্ঠা’ হলো প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক এবং একই অর্থে মধুসূদনও বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাট্যকার। অর্থাৎ, বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম প্রকৃত মৌলিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রথম মৌলিক নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ‘শর্মিষ্ঠা’ প্রকাশিত হওয়ার পরের বছর অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে মধুসূদন রচনা করেন দুইটি প্রহসন— ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’।

‘একেই কি বলে সভ্যতা’ নাটকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং-বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রেও মধুসূদন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচিত প্রহসন দুইটি কাহিনী, সংলাপ ও চরিত্রসৃষ্টির দিক থেকে আজও অতুলনীয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব শুধু প্রথম সার্থক নাটক কিংবা প্রহসন রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি যা কিছু রচনা করেছেন তাতেই নতুনত্ব এনেছেন। মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন।

১৮৬০ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’ নাটক। এ ‘পদ্মাবতী’ নাটকেই মধুসূদন দত্ত প্রথম ও পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন।

বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে। ১৮৬০ সালেই অমিত্রাক্ষর ছন্দে মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুনরায় রচনা করেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’।

অমিত্রাক্ষর ছন্দেই মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ অমিত্রাক্ষর ছন্দে কাব্য রচনা করে বিভিন্ন মহলে প্রশংসা পেয়ে ১৮৬১ সালে আরেক মহাকাব্য ‘রামায়ণ‘ অবলম্বনে একই ছন্দে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’।

জন্মের দ্বিশত আর মৃত্যুর ১৪৪ বছর পরেও মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবি ও ব্যক্তি হিসেবে বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মতোই তার মৃত্যুও ছিলো গভীর বেদনা।

মধুসূদনের শেষ জীবনের সাথী হতভাগিনী হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট মনে হয় টের পেয়ে গিয়েছিলেন, এ জীবন আর নয়! ফুরিয়েছে জীবনের মধু। অমিতচার, অভাব ও রোগে ভোগে সত্যি সত্যিই মাইকেল মধুসূদন জীর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে।

কবিতা তাকে যশ দিয়েছিল; অন্ন ও প্রতিষ্ঠা দেয়নি। মাইকেলের মৃত্যুকালীন পরিস্থিতির আলোচনায় জানা যাবে একজন অগ্রণী কবির জীবন সায়াহ্নের ব্যথিত দিনলিপি।

১৮৭৩ সালের মার্চ মাস নাগাদ মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ে। তখন তার অবস্থা বয়সের বেশি বার্ধক্য-কবলিত। স্ত্রী হেনরিয়েটার স্বাস্থ্যও নাজুক অবস্থার সম্মুখীন হয়। অপরিমিত মদ্যপান, চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় ছেদ, অমিতচারীতার ফল শরীর সইতে পারেনি। উত্তরপাড়া লাইব্রেরির ওপর তলায় আশ্রয় পেলেন কবি। রইলেন ছয় সপ্তাহ। উত্তরপাড়ায় কবির শরীর-স্বাস্থ্য ও কার্যকলাপের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে তার উচিত ছিলো, পাঠগৃহে নয়, চিকিৎসাস্থল আলিপুরের জেনারেল হাসপাতালে যাওয়া। কারণ, এ সময়ে তিনি এবং হেনরিয়েটা, উভয়েই খুব অসুস্থ ছিলেন। কে বেশি অসুস্থ বলা মুশকিল হলেও সুস্থ্যতা দু’জনের ধারে কাছেও ছিলো না।

এই সঙ্কুল সময়ে মাইকেল আরাম কেদায় বসে চোখ বুজে পড়ে থাকতেন। দেখলে মনে হতো, যেনো একটি কঠিন হিসাব মেলাতে চেষ্টা করছেন। হায়! কী আশা করেছিলেন আর কী অর্জন করেছিলেন! সম্ভবত এ কারণেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের একমাত্র প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থের নাম তার জীবনেরই মতো এবং তার কবিতার উদ্ধৃতির মাধ্যমে বিধৃত: ‘আশার ছলনে ভুলি’।

মাইকেল যখন নিদারুণ অসহায় অবস্থায় উত্তরপাড়ায় বসবাস করছেন, তখন হাওড়ায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি হয়ে আসেন মাইকেল-বন্ধু গৌরদাস বসাক। তিনি এ সময়ে একাধিকবার উত্তরপাড়ায় গিয়ে মাইকেলকে দেখে আসেন। শেষ বার সেখানে তিনি যে দৃশ্য দেখতে পান, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার বিবরণ দিয়েছেন: “মধুকে দেখতে যখন শেষ বার উত্তরপাড়া সাধারণ পাঠাগারের কক্ষে যাই, তখন আমি যে মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখতে পাই, তা কখনো ভুলতে পারবো না। সে সেখানে গিয়েছিলো হাওয়া বদল করতে। সে তখন বিছানায় তার রোগযন্ত্রণায় হাঁপাচ্ছিলো। মুখ দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছিলো। আর তার স্ত্রী তখন দারুণ জ্বরে মেঝেতে পড়েছিলো। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মধু একটুখানি উঠে বসলো। কেঁদে ফেললো তারপর। তার স্ত্রীর করুণ অবস্থা তার পৌরুষকে আহত করেছিলো। তার নিজের কষ্ট এবং বেদনা সে তোয়াক্কা করেনি। সে যা বললো, তা হলো: ‘afflictions in battalions.’ আমি নুয়ে তার স্ত্রীর নাড়ী এবং কপালে হাত দিয়ে তাঁর উত্তাপ দেখলাম। তিনি তাঁর আঙুল দিয়ে তাঁর স্বামীকে দেখিয়ে দিলেন। তারপর গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিম্নকণ্ঠে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন: ‘আমাকে দেখতে হবে না, ওঁকে দেখুন, ওঁর পরিচর্যা করুন। মৃত্যুকে আমি পরোয়া করিনে’। ”

বাল্যবন্ধুর অন্তিম দশা দেখে গৌরদাস স্বভাবতই বিচলিত বোধ করেন। তিনি তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইলেন। জানা গেলো, পরের দিন, ২০ কিংবা ২১ জুন (১৮৭৩), মধু নিজেই কলকাতা ফেরার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সপরিবারে কবি বজরায় করে নৌপথে নির্ধারিত দিনে অসুস্থ শরীরে নিজ উদ্যোগেই কলকাতা যাত্রা করলেন।

কলকাতায় হেনরিয়েটাকে ওঠানো হলো তার জামাতা উইলিয়াম ওয়াল্টার এভান্স ফ্লয়েডের বাড়িতে, ১১ নম্বর লিন্ডসে স্ট্রিটে; ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়া লিন্ডসে স্ট্রিট চৌরঙ্গি রোডের সঙ্গে সংযুক্ত। স্ত্রীর সংস্থান হলেও মাইকেলের নিজের ওঠার মতো কোনও জায়গা ছিলো না। উত্তরপাড়ায় যাওয়ার আগেই তিনি তার এন্টালির বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন। অগত্যা মাইকেল ঠাঁই নিলেন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে।

সে আমলে দেশীয় ভদ্রলোকরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে কালাপানি পার হওয়ার মতো শাস্ত্রবিরুদ্ধ একটি অসাধারণ ব্যাপার বলে বিবেচনা করতেন। ফলে এই হাসপাতালটি ছিলো মূলত বিদেশী এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত। কিছু বিশিষ্টজনের তদবিরে এবং মাইকেলের নিজের সাহেবী পরিচয়ের জন্য তিনি অবশেষে এ হাসপাতালে ভর্তির অনুমতি পেলেন। হাসপাতালে আসার পর প্রথম দিকে শুশ্রুষা এবং ওষুধপত্রের দরুণ তার রোগ লক্ষণের খানিকটা উপশম হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তার স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে এগিয়ে যায়। যকৃৎ, প্লীহা এবং গলার অসুখে তার দেহ অনেক দিন থেকেই জীর্ণ হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় তার যকৃতের সিরোসিস থেকে দেখা দিয়েছিল উদরী রোগ। সেই সঙ্গে হৃদরোগের লক্ষণও স্পষ্ট দেখা দেয়। সব মিলিয়ে তার শরীর শেষ অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছিল।

বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বে একজন ‘সাহেব-কবি’ অকৃপণভাবে মধুভাণ্ডার তৈরি করেছিলেন, যার স্বাদ পুরোপুরিভাবে তার স্বজাতি গ্রহণ করতে অক্ষম হয়েছিল। বরং অবজ্ঞা ও সমালোচনায় ‘জাত-ত্যাগী’ কবিকে ভর্ৎসনা করেছিল। সেই মধুনির্মাতা মধুকবি মারা যাচ্ছেন শুনে আলিপুর হাসপাতালে অনেকের ভিড় দেখা যায়। তার চরম দুরবস্থার খবর শুনেও এতোদিন যারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল, তারাও এসে হাজির। রক্তের আত্মীয়তা সত্ত্বেও যারা একদা তাকে ত্যাগ করেছিল, তাদের মনেও হয়তো করুণা বা লোকলজ্জা হানা দিয়েছিল; তারাও এলেন।

কবি তখন ভালো করেই অনুভব করতে পারছিলেন যে, তিনি মারা যাচ্ছেন; তবে ভালো হয়ে উঠবেন, এই স্বপ্নও তিনি দেখছিলেন। এরূপ বিপন্ন অবস্থাতেও তিনি বেহিসাবী স্বভাবের প্রভাবমুক্ত হতে পারেননি। ধার করে হলেও ব্যয় করার এবং বদান্যতা দেখানোর প্রবণতা তিনি এ সময়েও ত্যাগ করতে পারেননি। হাসপাতালে তার সঙ্গে একদিন দেখা করতে এসেছিলেন তার এক সময়ের মুন্সি মনিরউদ্দিন। কবির কাছে তার চারশো টাকা পাওনা ছিলো। তারপরেও উল্টো কবি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো টাকা পয়সা আছে কি-না? মনিরউদ্দিন তার কাছে মাত্র দেড় টাকা আছে বলে জানালেন। সেই পয়সাই তিনি চাইলেন। তারপর তা বকশিস হিসাবে দান করলেন তার শুশ্রুষাকারিণী নার্সকে। মৃত্যুকালেও ধার করে বকশিশ দেওয়ার এই আচরণ সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ তার সারা জীবনের অভ্যাসের সঙ্গে।

কবি হাসপাতালে ছিলেন সাত অথবা আট দিন। এ সময়ে কিছু চিকিৎসা ও সেবা-যত্ন পেলেও কবি খুব একটা মানসিক শান্তিতে ছিলেন না। পরিবার সম্পর্কে তার দুশ্চিন্তা এবং হেনরিয়েটার স্বাস্থ্য সম্পর্কে তার উদ্বেগ তাকে বিচলিত করে। এরই মাঝে হাসপাতালের শয্যায় শায়িত চরম অসুস্থ কবি এক পুরনো কর্মচারীর মাধ্যমে ২৬ জুন (১৮৭৩) একটি মর্মান্তিক বেদনার খবর পেলেন, স্ত্রী হেনরিয়াটার মৃত্যুর সংবাদ। মাত্র ৩৭ বছর তিন মাস ১৭ দিন বয়সে হেনরিয়েটা মারা গেলেন। হেনরিয়েটা বয়ঃসন্ধিকালে মা মারা যাওয়ার পর থেকে সুখের মুখ কমই দেখেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিত পরিবেশ ত্যাগ করে তিনি মাদ্রাজ থেকে কলকাতা এসেছিলেন মাইকেলের ভালোবাসার টানে। চার্চে গিয়ে সেই ভালোবাসার কোনো স্বীকৃতি পর্যন্ত তিনি আদায় করেননি। এমন প্রেয়সীর মৃত্যু সংবাদ কবির কাছে প্রচণ্ড আঘাত হয়ে এসেছিল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাইকেলের মুখ থেকে প্রথম যে কথাটি বের হয়: “বিধাতঃ, তুমি একই সঙ্গে আমাদের দুজনকে নিলে না কেন?” হেনরিয়েটার শর্তহীন ভালোবাসা এবং নীরব ত্যাগের কথা অন্য সবার চেয়ে মাইকেলই ভালো করে জানতেন। সুতরাং যতো অনিবার্য হোক না কেন, হেনরিয়েটার প্রয়াণে মৃত্যুপথযাত্রী কবি খুবই মর্মাহত ও বিষণ্ণ হয়েছিলেন। এর ফলে তার অসহায়ত্ব ও যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি খুবই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন হেনরিয়েটার শেষকৃত্যের ব্যাপারে। এর জন্যে যে অর্থ, যোগাড়-যন্ত্র লাগবে, তা কোথা থেকে আসবে? তিনি সঞ্চয়ী লোক ছিলেন না। কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্ত্রীর মৃত্যুতে মাইকেল তখন নিজেও মৃত্যু পথযাত্রী।

এই দিনই অথবা পরের দিন হাসপাতালে শয্যাগত মাইকেলের কাছে স্বজন মনোমোহন ঘোষ আসেন তার সঙ্গে দেখা করতে ও সান্তনা দিতে। কবি তাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন, ঠিকমতো হেনরিয়েটার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছে কিনা। মনোমোহন জানালেন, সবই যথারীতি হয়েছে। মাইকেল জানতে চান, বিদ্যাসাগর ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এসেছিলেন কিনা। মনোমোহন জানালেন, তাদের খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি।

স্ত্রী বিয়োগের ফলে অসহায় কবির সামনে আরেকটি মারাত্মক উদ্বেগের কারণ এসে উপস্থিত হয়: দুই পুত্রের ভবিষ্যৎ চিন্তা। তার পুত্রদের একটির বয়স তখন মাত্র বারো এবং অন্যটির মোটে ছয়। মনোমোহন এই অবস্থায় কবিকে আশ্বস্ত করে বলেন, তার সন্তানরা খেতে-পরতে পারলে কবির পুত্ররাও পারবে। এ প্রতিশ্রুতি মনোমোহন পরে যথাসম্ভব পালন করেছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত ধর্ম, বিধি, শাস্ত্র, প্রথা-এর কোনোটিই মান্য করেননি। ধর্মান্তরিত হলেও ধর্মনিষ্ঠ হননি কখনই। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলো না। এমনকি, অসহায় অবস্থায় নিজের মৃত্যুশয্যায় শুয়ে মৃত-স্ত্রীর করুণ-স্মৃতি আর নাবালক সন্তানদের অন্ধকার-ভবিষ্যতকে সামনে নিয়েও মাইকেল ধর্মের প্রতি আস্থাহীনতা প্রদর্শন করলেন। অবস্থা এমন ছিলো যে, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় এবং রেভারেন্ড চন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বরং কবির পারলৌকিক মঙ্গল নিয়ে কবির চেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। বিশেষত চন্দ্রনাথ কবিকে এ সময়ে বার বার নাকি পরম ত্রাতা যীশু খ্রিস্টের কথা মনে করিয়ে দেন। মাইকেল জীবনীকার গোলাম মুরশিদ লেখেন: “পারলৌকিক মঙ্গলের ব্যাপারে তাদের এই উৎকণ্ঠা দিয়ে নিজেদের অজ্ঞাতে তারা কবির প্রতি যথেষ্ট নিষ্ঠুরতা করেন বলেই মনে হয়। ”

২৮ জুন তারিখে সমস্ত আশা-ভরসাহীন, রোগকাতর, বিষণ্ণ কবি যখন কেবলমাত্র মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে আছেন, তেমন সময়ে চন্দ্রনাথের সঙ্গে এসে যুক্ত হন কৃষ্ণমোহন। উদ্দেশ্য: খ্রিস্ট ধর্ম অনুযায়ী কবির শেষ স্বীকারোক্তি আদায় করা। কবি কোনো পাপের কথা স্বীকার করে বিধাতার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, এমন তথ্য কেউ জানেন না। জীবনকে যিনি নিজের ইচ্ছায় যদ্দুর সম্ভব উপভোগ ও অপচয় করেছিলেন, আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে তিনি আকুল হননি। প্রথাগত চিন্তায় এর চেয়ে অধার্মিকতা আর কিছুই হতে পারে না। প্রাচ্যদেশের ধর্মে জীবনভর পাপ করে শেষজীবনে অনুতাপের যে ধারা প্রচলিত রয়েছে, মাইকেল সেটাকেও অস্বীকার করলেন। ধর্মগত বিশ্বাস ও আচরণের এহেন পরিস্থিতিতে কৃষ্ণমোহন এবং চন্দ্রনাথ আশঙ্কা প্রকাশ করে কবিকে জানান যে, তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং তাকে কোথায় সমাধিস্থ করা হবে, তা নিয়ে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। এমন আস্থাহীন অবস্থায় মাইকেলের নির্ভীক উত্তর ছিলো: “মানুষের তৈরি চার্চের আমি ধার ধারিনে। আমি আমার স্রষ্টার কাছে ফিরে যাচ্ছি। তিনিই আমাকে তাঁর সর্বোত্তম বিশ্রামস্থলে লুকিয়ে রাখবেন। আপনারা যেখানে খুশি আমাকে সমাধিস্থ করতে পারেন; আপনাদের দরজার সামনে অথবা গাছ তলায়। আমার কঙ্কালগুলোর শান্তি কেউ যেন ভঙ্গ না করে। আমার কবরের ওপর যেন গজিয়ে ওঠে সবুজ ঘাস। ”

২৯ জুন ১৮৭৩, রোববার, মাইকেলের অন্তিম অবস্থা ঘনিয়ে এলো। তার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং সন্তানারা এলেন তাকে শেষ বারের মতো দেখতে। এমন কি, তার যে জ্ঞাতিরা হিন্দু ধর্ম ত্যাগের কারণে তার সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকে মাত্র একজন এসেছিলেন তাকে দেখতে। জীবনের শেষ দুই বছর কবির নিদারুণ দুর্দশায় সহায়তার হাত প্রসারিত না করলেও, শেষ মুহূর্তে মৃত্যুপথযাত্রী কবিকে দেখে অনেকেই করুণায় বিগলিত হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্রামহীন, আঘাতে-উদ্বেগে-পীড়ায় জর্জরিত এবং রোগশীর্ণ দেহ কবি আর ধরে রাখতে পারলেন না। বেলা দুইটার সময়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনের জন্যে।

মাইকেলের ক্ষেত্রে মৃত্যুপরবর্তী ধর্মীয় কাজের সমস্যাজনিত আশঙ্কা প্রবলভাবে সত্যে পরিণত হলো। তার মৃত্যুর পর সত্যি সত্যিই তার শেষকৃত্য নিয়ে প্রচণ্ড সমস্যা দেখা দিলো। যদিও মৃত্যুর শেষ বিদায়ে থাকার কথা ক্ষমা ও প্রার্থনা, মাইকেলকে সেটা থেকেও বঞ্চিত করা হলো। কলকাতার তৎকালীন খ্রিস্টান সমাজ তার দীক্ষার ঘটনা নিয়ে ঠিক তিরিশ বছর আগে একদিন মহা হৈচৈ করলেও, মৃত্যুর পর তাকে মাত্র ছয় ফুট জায়গা ছেড়ে দিতেও রাজি হলো না। ইংলিশম্যানের মতো পত্রিকাগুলো তার মৃত্যুর খবর পর্যন্ত ছাপলো না। যদিও সে সপ্তাহে কলকাতায় মোট কয়জন দেশীয় ও খ্রিস্টান মারা যান এবং আগের সপ্তাহের তুলনায় তা বেশি, না কম, সে পরিসংখ্যান নিয়েও পত্রিকাটি আলোচনা করে। মিশনারিদের কাগজ ফেন্ড অব ইন্ডিয়া খুবই সংক্ষেপে তার মৃত্যু সংবাদ ছাপালো। সংবাদটি তার কবি-কৃতীর ধারে-কাছে দিয়েও গেলো না, পত্রিকাটি গুরুত্বের সঙ্গে যা ছাপালো, তা হলো, তার জীবন-যাপনের অভ্যাসগুলো ছিলো অনিয়মে ভরা আর তিনি তার পৈত্রিক সম্পত্তি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আরেকটি প্রসঙ্গ এ পত্রিকায় উল্লেখ ছিলো, ‘তিনি তার তিনটি সন্তানের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। ’

নবদীক্ষিত খ্রিস্টান মাইকেলের প্রতি খ্রিস্টান সমাজ যে মনোভাব দেখায়, তা দুঃখজনক এবং তার পূর্বতন স্বজাতি হিন্দু সমাজের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের সঙ্গে তুলনীয়। তবে মৃত্যুকালীন আচরণ অভাবনীয় কঠোরতা আর ক্ষুদ্রতার পরিচয় বহন করে। কেননা, মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতি এ রকমের রোষের ঘটনা ক্বচিৎ দেখা যায়। যার সঙ্গে মাইকেলের কবিতার মিল না থাকলেও, ব্যক্তিগত জীবনে অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়, সেই শার্ল বোদলেয়ারের মৃত্যুর পরেও তার প্রতি অনেকের আক্রোশ প্রকাশ পেয়েছিল। তার স্বীকারোক্তি-বক্তব্য নিয়ে, তার কবি-কৃতী নিয়ে অনেকে বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যসাধকদের বেশিরভাগই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আসেননি। কিন্তু ফরাসি সমাজ তার মৃতদেহ সৎকারের ঘটনা নিয়ে এমন অমানবিক আচরণ করেনি, যেমনটি করা হয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্ষেত্রে।

জুনের শেষ পাদে দারুণ গ্রীষ্মের সময়ে মাইকেলের মৃত্যু হলেও, খ্রিস্টান সমাজের সৃষ্টি-ছাড়া রোষের দরুণ সেদিন এবং সেদিন রাতে তার মরদেহ পড়ে থাকলো দুর্গন্ধ-ভরা নোংরা মর্গে। কৃষ্ণমোহন ছিলেন কলকাতার খ্রিস্ট ধর্মযাজকদের মধ্যে একজন প্রবীণ সদস্য, যদিও তিনি এ সময়ের অনেক আগে থেকেই সরাসরি ধর্মযাজকের কাজ ছেড়ে দিয়ে বিশপস কলেজে অধ্যাপনা করছিলেন এবং মাইকেল মারা যাওয়ার আগের সময়কালে অধ্যাপনা থেকেও অবসর নিয়েছিলেন, তিনি উদ্বিগ্ন চিত্তে নিজে ছুটে গিয়ে তদবির করলেন লর্ড বিশপ রবার্ট মিলম্যানের কাছে। মিলম্যান এর ছয় বছর আগে বিশপ হয়ে কলকাতায় আসেন। দেশীয়দের এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো। তিনি বাংলাসহ বেশ কয়েকটি দেশীয় ভাষাও শিখে নিয়েছিলেন। এমনকি, তিনি নিজে দুই খণ্ডে মাইকেলের প্রিয় কবি ত্যাসোর জীবনীও লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি তার ধর্মযাজকদের ‘বিতর্কিত’ বিষয়ে যোগদানে বাধা দিতেন। এহেন লর্ড বিশপ রবার্ট মিলম্যান মাইকেলের মৃত্যুর পরের দিন সকালেও কবির মৃতদেহ খ্রিস্টানদের গোরস্থানে সমাহিত করার অনুমতি দিলেন না! অন্যদিকে, মাইকেলের স্বদেশবাসী ও ধর্মগোষ্ঠীর হিন্দু সমাজও তাকে গঙ্গার ঘাটে পোড়াতে আগ্রহী হলো না। সুতরাং আষাঢ় মাসের ভেপসা গরমের মধ্যে মাইকেলের অসহায় মরদেহ মর্গেই পচতে থাকে। স্বধর্ম ও স্বজাতির কাছে ‘সিদ্ধান্তহীন ও আগ্রহরহিত’ মাইকেলের নিঃসঙ্গ ও অভিভাবকহীন মরদেহ তৎকালীন কলিকাতার বাঙালি হিন্দু ও খ্রিস্ট সমাজের কাছে কলঙ্কচি‎হ্নস্বরূপ অপাঙতেয় ছিলো, যদিও সেই ঐতিহাসিক মৃতদেহটি বস্তুতপক্ষে বাঙালি হিন্দু ও খ্রিস্ট সমাজের তৎকালীন নানা পশ্চাৎপদতা ও কুসংস্কারের প্রতি তীব্র কটাক্ষই করছিল।

অবশেষে মাইকেল-মৃতদেহ-সমস্যার সমাধান হলো, যখন সাহস নিয়ে এগিয়ে আসেন একজন ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজক। তিনি কবির মরদেহ সমাধিস্থ করার সংকল্প প্রকাশ করেন। প্রায় একই সময়ে অ্যাংলিকান চার্চের একজন সিনিয়র চ্যাপেলেইন, যার নাম রেভারেন্ড পিটার জন জার্বো, বিশপের অনুমতি ছাড়াই তার মৃতদেহ সমাধিস্থ করার উদ্যোগ নেন।

৩০ জুন বিকেলে, মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টারও পরে, কবির মৃতদেহ নিয়ে তার ভক্ত এবং বন্ধু-বান্ধবসহ প্রায় হাজার খানেক মানুষ এগিয়ে যান লোয়ার সার্কুলার রোডের খ্রিস্টান গোরস্থানের দিকে। সেকালের বিবেচনায় এই লোক সংখ্যা খুব কম নয়। শবানুগমনে কলকাতার বাইরের বহু লোক অংশ নেন; অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। তবে একদা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ নিজের গ্রন্থ উৎসর্গ করে কবি যাদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত করেছিলেন, তাদের কেউ এই ভিড়ের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন না। মাইকেল যেখানে চলেছেন, সেই লোয়ার সার্কুলার রোডের গোরস্থানে মাত্র চার দিন আগে কবিপত্নী হেনরিয়েটাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কবির জন্যে কবর খোঁড়া হয় স্ত্রীর কবরের পাশে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যখন নিশ্চিতভাবে হতে চলেছে, তেমন সময়ে লর্ড বিশপের অনুমতি এসে পেছন-পেছন হাজির হলো। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো নামকরা পাদ্রী বা ধর্মীয় নেতা তার শেষকৃত্যে এসেছিলেন বলে জানা যায় নি। এমন কি, কৃষ্ণমোহনও নন। অনেক পাদ্রী বরং তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন। রেভারেন্ড পিটার জন জার্বোই কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করেন। চার্চের ব্যুরিয়াল রেজিস্টারে তার নাম পর্যন্ত ওঠানো হলো না। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে রক্ষিত চার্চের রেজিস্টারে কবিকে এবং তার স্ত্রী হেনরিয়েটাকে সমাধিস্থ করার কোনো তথ্য নেই।

কলকাতার যে ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ বাস করতো, তাদের মধ্যে নীতি, নৈতিকতা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার দৃষ্টান্ত থেকে আরম্ভ করে পরপীড়ন, ব্যভিচার, ধর্মহীনতার দৃষ্টান্ত কিছু কম ছিলো না। বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ হেনরি পিটার ফরস্টার অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে এক দশকের বেশি ঘর করেছিলেন। তার সন্তানরা সবাই এই পরস্ত্রীর গর্ভে জন্মেছিল। আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও শিষ্টাচারে তার সামান্যতম আস্থা ছিলো, এমন কোনো প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও, মাইকেলের প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আরও অনাধুনিক ও গোড়া সমাজ পরিস্থিতিতে ১৮১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি যখন মারা যান, তখন তাকে সমাধিস্থ করার প্রশ্ন নিয়ে কোনো মতান্তর দেখা যায়নি। খুনী, ধর্ষণকারী, অজাচারী, অধর্মাচারী, অবিশ্বাসী ইত্যাকার কাউকে সমাধিস্থ করার জন্য কখনই লর্ড বিশপের কাছে ধরনা দিতে হয়নি।

মৃত্যুর মতোই পেশাজীবনেও মাইকেল আক্রান্ত হয়েছিলেন। ব্যারিস্টারি পাশ করার পর, তিনি যখন আইন-ব্যবসা শুরু করার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেন, তখন তাকে গ্রহণ না করার জন্য বিচারকদের মধ্যে প্রবল মনোভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজে নিশ্চয় আরও শত শত লোক ছিলেন, যারা এই বিচারকদের মতো তার প্রতি সমান অথবা আরও বেশি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। মাইকেল মদ্যপান করে মাঝেমাঝে বেসামাল হয়ে পড়তেন, তিনি কখনও কখনও রূঢ় আচরণ করেন, বিচারকরা মাইকেলের বিরুদ্ধে তাদের গোপন রিপোর্টে এ কথা লিখেছিলেন। কলকাতার হাজার হাজার ইংরেজ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্পর্কেও কি এই মন্তব্য করা যেতো না? তা হলে মাইকেল সম্পর্কে শ্বেতাঙ্গদের এ রকমের বিরূপতার মূল কারণটা কী? বর্ণবাদ? বিদ্বেষ? হিংসা?

মাইকেল-জীবনীকার ও বিশেষজ্ঞ গোলাম মুরশিদের গবেষণায় শ্বেতাঙ্গদের মাইকেল-বিদ্বেষের কিছু কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গোলাম মুরশিদের ধারণা, মাইকেলের বিরুদ্ধে অন্য যেসব অভিযোগই থাক না কেন, তিনি যে শ্বেতাঙ্গিনী বিয়ে করেছিলেন অথবা শ্বেতাঙ্গিনীকে নিয়ে ঘর করেছিলেন, এটাকে শ্বেতাঙ্গরা বিবেচনা করতেন তার অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে। তৎকালে শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে কেউ কেউ দেশীয় মহিলাদের বিয়ে করেছিলেন অথবা উপপত্নী রেখেছিলেন। এটা সহ্য করা হলেও, একজন শ্বেতাঙ্গিনীর পাণিপীড়ন করবে এক কালো আদমী, এটা তারা একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। মিশনারিরা, তাদের মতে, দেশীয়/স্থানীয়/কৃষ্ণকায়দের অন্তহীন আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর-কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ধরে নেওয়া যেতে পারে, তারা অন্তত বর্ণবিদ্বেষী হবেন না। কিন্তু বিশপস কলেজে থাকার সময়েও মাইকেল যথেষ্ট বর্ণবিদ্বেষ লক্ষ্য করেছিলেন। বিশপস কলেজের কাগজপত্রে তার নাম একটি বারও মাইকেল বলে লিখিত হয়নি। সর্বত্র তিনি শুধু মধুসূদন ডাট। একজন কৃষ্ণাঙ্গের একটি ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ নাম তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। লন্ডনে থাকার সময়ে মাইকেল সেখানে যে তীব্র বর্ণবিদ্বেষ লক্ষ্য করেছিলেন, তার অন্যতম কারণ ছিল হেনরিয়েটা। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গকে বিবাহ করে, তারপর তাকে পরিত্যাগ করে অন্য একজন শ্বেতাঙ্গিনীকে নিয়ে ঘর করছিলেন, এটাকে লন্ডন বা কলকাতার শ্বেতাঙ্গ বা আধা-শ্বেতাঙ্গ সমাজ আদৌ মেনে নিতে পারেনি; অনুমোদনের তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তাই বলে মরদেহের প্রতিও বিদ্বেষ? মৃতদেহের প্রতি কি কারও বিদ্বেষ থাকে? না থাকাই উচিত এবং স্বাভাবিক। কিন্তু কবির মরদেহের প্রতি তারা যে অসাধারণ বিদ্বেষ দেখিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যায়, জীবিত মাইকেলকে তারা আন্তরিকভাবে কতোটা ঘৃণা করতেন। তদুপরি, ঘটনাটি এতো তীব্র আকার ধারণ করে শেষকৃত্যের দায়িত্বে নিয়োজিত পুরোহিতদের জন্য। যে লোকটি চিরজীবনেও চার্চে যাননি, বরং চার্চের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন, তাকে শায়েস্তা করা সুযোগ তারা সহজে হাতছাড়া করতে চাননি।

মাইকেল তার সমকালের দেশীয় সমাজে যাদের চারপাশে বসবাস করতেন, তাদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন ও প্রতিভাবান। জনারণ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে তাকে চোখে পড়ার মতো গুণাবলী তিনি প্রচুর পরিমাণে আয়ত্ত করেছিলেন কর্ম, কীর্তি ও জীবন-যাপনের মাধ্যমে। বাংলা সাহিত্যকে তিনি একা যতোটা এগিয়ে দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ছাড়া অন্য কেউ তা করতে পারেননি। বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তিনি সত্যিকারভাবে সেই সমাজের আপন হতে পারেননি। জীবনের শেষ দুই-তিন বছরে তিনি ঈর্ষার অযোগ্য যে করুণ পরিণতি লাভ করেছিলেন এবং তাকে সমাধিস্থ করার ঘটনা নিয়ে যে কুৎসিত নোংরামি দেখা দিয়েছিল, তা থেকে তার বিচ্ছিন্নতার, নিঃসঙ্গতার অভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এটাও সত্য যে, যতোদিন মাইকেল সচ্ছল ছিলেন, ভোজ দিতেন, মদ্যপান করাতেন, বিনে পয়সায় মামলা লড়ে দিতেন, ততোদিন সমাজে তাকে খাতির করার লোকের অভাব হয়নি। কিন্তু তিনি যখন নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে মৃত্যুর দিন গুনেছেন, তখন খুব কম লোকই তার খবর নিয়েছেন, সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।

মাইকেলের আমলের সমাজ চরিত্র এবং তার মৃত্যুকালীন চিত্র শতবর্ষ পরেও আমাদের পীড়িত ও তাপিত করে মধুকবির জন্য পুঞ্জিভূত বেদনায়। কবির দ্বিশত জন্মবর্ষেও প্রতিধ্বনিত্ব করে বিষাদের ইতিবৃত্ত।

(লেখকের 'দ্বিশত জন্মবর্ষে মাইকেল মধুসূদন' গ্রন্থের অংশবিশেষ)

;