Barta24

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

English

জুতোর বাক্সে ভালোবাসা

জুতোর বাক্সে ভালোবাসা
সঞ্জয় দে


  • Font increase
  • Font Decrease

‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি, বেলা সত্যি’-র মতো সান ডিয়েগো শহরে একটা পেটে-ভাতে চাকরি জুগিয়ে ফেলেছি কয়েক মাস হলো; তবে এখন পর্যন্ত একটা চার চাকার যান কেনবার মতো পয়সা জুগিয়ে উঠতে পারিনি। ওদিকে এ-শহরে গাড়ি না থাকার মানে হচ্ছে হাত-পা গুটিয়ে বস্তাবন্দি হয়ে থাকা। ট্রাম-ট্রেন দূরে থাক, বাস টেম্পোরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আমার কিন্তু সে-অর্থে তেমন কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। হাউসমেট মিস্টার ব্রুস ওয়াং প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে আমাকে অফিস নেওয়া আর সপ্তাহান্তে কাছের এক ভিয়েতনামিজ দোকান ভিন হুং-এ নেবার কাজটি করে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী আর তিন কন্যা থাকে টরেন্টোতে। আকালের বাজারে আমাকে শেষ মুহূর্তে পেয়ে বাড়িতে এনে তুলেছেন ভাড়া শেয়ার করার জন্যে। সাথে কথা দিয়েছেন, আমার যাতায়াতের ব্যাপারটি দেখবেন বলে। ভদ্রলোক যুবাকালে বেইজিং-এর কলেজ থেকে পাশ করার পর পরই দীর্ঘদিনের প্রণয়িনীর গলায় মালা পরান; আর তার পরের বছরই ওয়াং পত্নীর কোল জুড়ে আসে প্রথম কন্যাসন্তান। চীনে তখন চলছে ‘এক সন্তান, সুখী পরিবার’ নীতি। এই নীতি কিন্তু মিসেস ওয়াংকে সুখী করতে পারেনি। পরের বছরই তার সাধ হয় আরেকটি সন্তানের। কিন্তু চীনে বাস করে তেমন ইচ্ছে ফলালে জেল জরিমানার সম্ভাবনা প্রবল। অগত্যা ওয়াং শুধুমাত্র স্ত্রীর ইচ্ছে চরিতার্থের জন্যে পাড়ি জমালেন কানাডায়। সেখানে একটি নয়, আরো দু দুটি সন্তানের জন্ম হলো। এরপর তাঁদের মাথায় এলো ভিন্ন এক খায়েশ। তিন তিনটে সন্তান তো হলো, এবারে একটি সামনে-পেছনে উঠোনওয়ালা বিশাল বাড়ি চাই। টরেন্টোতে ওয়াং যে টাকা কামান, ও দিয়ে ওই আক্রার বাজারে বিশাল বাড়ি কেনা সম্ভব নয়। এবারে ওয়াংপত্নী তার পশ্চাৎদেশে খেজুরের কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে বলতে লাগলেন, ‘তুমি না হয় এবারে আমেরিকায় একটা চাকরির চেষ্টা করো। শুনেছি, আমেরিকায় নাকি মেলা টাকা; আমেরিকা মানেই বিশাল গাড়ি, বিশাল বাড়ি।’ বৌয়ের এই অভিলাষে ত্যাক্ত হয়ে ওয়াং একদিন সত্যি সত্যি চাকরি নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। তবে যে বৌয়ের ধাক্কায় তার এই আমেরিকা অবধি ছুটে আসা, সেই বৌকেই এখন পর্যন্ত এখানে আনতে পারেননি কী এক ভিসাপত্রের ঝামেলায়। মি. ওয়াং এখন খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমাচ্ছেন; শুনছি, সামনের বসন্তে ওয়াংপত্নী বালবাচ্চা আর লোটা কম্বলসহ একেবারে ক্যানাডার পাট চুকিয়ে এখানে আসবেন। ততদিন পর্যন্ত এই ভাড়া ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত গুমটিঘরটি নিশ্চিতভাবেই আমার নিবাস।

ওয়াংয়ের বাড়ির খুব কাছেই একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি। সেখানে হেঁটেই যাওয়া যায়। আমি শনিবারের বিকেলগুলোতে সেখানে মাঝেসাঝে যাই। ঠিক বই পড়তে যাই, তেমন নয়। ওখানে বেশ কিছু ভালো ডিভিডির কালেকশন আছে। এইতো কিছুদিন আগে নিয়ে এলাম দ্যা সোভিয়েত স্টোরি আর দ্যা কোল্ড ওয়ার নামক দুটো ডকুমেন্টারির ডিভিডি। তো সেই লাইব্রেরিতেই একদিন একটি পোস্টার আমার নজরে আসে। করিডরের বাঁ-দিকের একটি দরজায় সাঁটা। সেখানে লেখা রয়েছে, নামমাত্র দক্ষিণার বিনিময়ে লাইব্রেরির একটি ঘরে নাচ শেখানো হবে। আগ্রহীরা সত্তর যোগাযোগ করুন। ভেবে দেখলাম, হাতে যেহেতু বেশ খানিকটা সময় আছে আর এটা যেহেতু হাঁটা পথের মাঝেই—নাচের ক্লাসে কয়েকদিন ঢুঁ মারলে মন্দ হয় না। ঢাকায় ধানমন্ডি লেকের ধারে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একসময় সালসা শিখেছিলাম। আমি হয়তো তাই পুরোপুরি আনাড়ি ছাত্র নই, হাতেখড়ি আছে আমার। তো সাহস করে একদিন পৌঁছে গেলাম নাচের ক্লাসে। শুরুতেই কিছুটা হতোদ্যম হতে হলো। ক্লাসের যারা ছাত্র ছাত্রী, তাঁদের প্রায় সকলেরই বয়স সত্তরের কোঠায়। অবসর জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোঁচাতে নাচের ক্লাসে মজেছেন। বুড়োরা ঝকমকে বাটিকের শার্ট আর বুড়িরা চড়া মেকআপ লাগিয়ে বাহুলগ্না হয়ে তুমুল ছন্দে নাচছেন। এতসব মানুষের মাঝে কেবল মাত্র দুজন রমণীর বয়স হয়তো ত্রিশের কোঠায়। চেহারা সুরতে মনে হলো দুজনেই হিস্পানিক। এঁদের একজনের গা দিয়ে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে পেঁয়াজের গন্ধ। সে গন্ধ এতটাই প্রবল যে, তিনি আমাকে নাচের জন্যে জাপটে ধরলেও আমাকে পাশ কাটাতে হয়। সুতরাং রইল বাকি এক। এই যে একজন, ওর নাম ভেনেসা। আশপাশেই নাকি থাকে, আর কাজ করে একটি কোম্পানির কেরানি পদে। এ শহরে ভেনাসাও আমার মতোই নবাগত।  এতকাল ও ছিল ভেনচুরা কাউন্টি নামক শহরে। সেখানেই ওর পরিবার।

/uploads/files/ftwFm6xeBiG5wbihqODWF2ta782PpFUhCsRVBs9C.jpeg
নাচের ক্লাসে একই জনের সাথে বহুক্ষণ নাচা যায় না। কারণ, কিছুক্ষণ পর পরই নাচের মাস্টারের রব ভেসে ওঠে—‘জেন্টলম্যান রোটেট, রোটেট প্লিজ।’ মানে হলো, সঙ্গী বদল করে আর কাউকে ধরুন। একজনের সাথেই আঠার মতো লেগে থাকলে মন হয়তো নাচের ছন্দ থেকে পথ খুঁজে নেবে সঙ্গীর কোমরসন্ধিতে। যদিও এই রোটেশনের ব্যাপারটাতে আমার চরম অনীহা। আমি চেষ্টা করি, ঘুরে ফিরে ওই ভেনেসাতেই আটকে থাকতে। ওভাবেই ‘স্লো, স্লো, কুইক কুইক, স্লো’—এই রিদমের মাঝে সেরে নিই টুকটাক আলাপ। তৈরি হয় কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা।

ভেনেসা একটি ছাই রঙের মাজদা গাড়ি চালায়। গাড়ির ছাদের ওপর মেছতা রোগীর মতো কালশিটে দাগ। আর সিটবেল্টের যে ধরন, ও থেকে অনুমান করা যায় গাড়িটি কম করে হলেও বিশ বছরের পুরনো। প্যাসেঞ্জার সিটের পায়ের কাছটায় কিছু দুমড়ানো মুচড়ানো কাগজের টুকরো। তা থেকে দু একটা উঁকি দেওয়া কাগজ জানান দেয়, তারা টেলিফোন কিংবা বিদ্যুতের বিল। মোটামুটি ভাগাড়ের মতো এই গাড়িটির সওয়ারি আজ আমি। গত সপ্তাহেই ভেনেসা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওর এই বাহনে চড়ে সান ডিয়েগোর হারবার এলাকায় যাবার। ঠিক বেড়াতে নয়। ওখানে ওর এক গাতক বন্ধুদল আসবে নানা বাদ্যযন্ত্রসহ। ভেনেসা ওখানে যাবে তাঁদেরকে কিছুটা সঙ্গ দিতে। আমাকে সে-কথা জানিয়ে সহযাত্রী হবার প্রস্তাব দিলে আমি এক কথায় লুফে নিই। ছুটির দিনে আমার তো আর করার মতো তেমন কিছু নেই! মি ওয়াং এই সময়টায় গম্ভীর মুখে চীনে সওদার দোকান থেকে আনা ফ্রি পত্রিকায় চীনে ভাষার পাজল মেলান। ও সময়ে তাঁর সাথে খেজুরে আলাপ করা যায় না। বাড়িতে বসে তাই অলস হাওয়া না খেয়ে যদি হারবারের  নোনা বাতাস খাওয়া যায়, তবে হয়তো মন্দ হয় না।

ভেনেসার পরনে আজ ফ্রি-কাট সাদা ধবধবে প্যান্ট, আর ঊর্ধ্বাঙ্গে সিল্কের টপস। হারবারে ঠিক এমনতর রক্ষণশীল পোশাকে খুব কম লোকেই যায়। এর পেছনে অবশ্য একটা ব্যাখ্যা আছে। কিছুদিন আগে কথায় কথায় জানিয়েছিল, ওর পরিবার কট্টর ক্যাথলিক। বড় ভাইটি স্থানীয় গির্জার প্যাস্টর। ক্যাথলিক মতে জন্মনিয়ন্ত্রণকে ‘না’ বলায় এখন পর্যন্ত পাঁচ পাঁচটি সন্তান তাঁর। তবে আর্থিক সঙ্গতি নাকি তেমন নয়। এ কথাগুলো ভেনেসার কাছ থেকে জেনেছি একদিন নাচের ক্লাসে ঢোকার আগে। সেদিন নিজের মায়ের সাথে করিডরে দাঁড়িয়ে বেশ চড়া গলায় বাৎচিত করছিল। টেলিফোন রাখার পর আমি কাছে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এনিথিং রং?’ তাতে করে ও হড়বড়িয়ে মায়ের ওপর ঝাল ঝরিয়ে যা বলল তার সারাংশ হলো এই—ভেনেসার মা-বাবা ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা চালাত। সেই ব্যবসা লাটে ওঠায় ভেনেসা প্রতি মাসে মা-বাবাকে কিছু পয়সা পাঠায়। কিন্তু বুড়োবুড়ি সেগুলো নিজেদের পেছনে খরচ না করে সব ঢালে এই বড় ভাইয়ের পাঁচ সন্তানকে এটা-সেটা কিনে দেবার কাজে। ক্রোধে রাঙামুখী হয়ে ভেনেসা বলে, ‘দে আর জাস্ট এক্সপ্লয়েটিং মাই প্যারেন্ট’স ইমোশন। সঙ্গতি না থাকার পরও একের পর এক বাচ্চা নেওয়ায় ওদের সংসারে অভাব লেগেই আছে। সেসব জানিয়ে আমার মা-বাপের কাছে এসে যখন ঘ্যান-ঘ্যান করে, তখন তাঁরাও নাতি পুতির মুখের দিকে তাকিয়ে সব টাকা খরচ করে ফেলে। ওদিকে সেই টাকাটা কিন্তু আমার পাঠানো টাকা। বোঝো অবস্থাটা।’ তো সেইসব আলাপের মাঝেই উঠে আসে ওর পরিবারের কিছু গোঁড়ামির কথা। ওর মায়ের নাকি ফতোয়া আছে, নন-ক্যাথলিকদের সাথে বন্ধুত্ব করাটাও এক ধরনের পাপ। যদিও পরিহাসের ব্যাপার হলো, ভেনেসার ছোট বোন, যে কিনা এই মুহূর্তে থাকে সান ফ্রানসিস্কোতে, সে কিন্তু চুটিয়ে এক সৌদি যুবকের সাথে লিভ টুগেদার করছে। সে কথা জানলে হয়তো ওর মায়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে।

/uploads/files/pEy3FTXkOhpCyiJS9962bkBj1qmGCNawwOd72EFY.png
হারবারে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করা নিয়ে বিরাট এক ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। আজ তো শনিবার। রাজ্যের লোক যেন ভেঙে পড়েছে এখানে। পথের পাশের মিটার পার্কিংগুলো সব দখল। বেশ কয়েকবার ঘুরপাক খাবার পর নিতান্তই ভাগ্যবশে একটি জায়গা আমাদের মেলে। সেখানে স্যাত করে গাড়িটি পার্কিং করে ভেনেসা মিটারে পয়সা ভরতে যায়। আমি সেই ফাঁকে নেমে আশেপাশে নজর বুলাই। উল্টোদিকের ফুটপাথে দেখি, এক ভবঘুরে শপিং মলের কার্টে নিজেদের যাবতীয় সংসারটিকে ঠেলেঠুলে বসিয়ে পাশে বসে ঝিমুচ্ছেন। সামনে শিপিংবক্স থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো কাগজে লেখা, ‘মিথ্যে কেন বলব? বিয়ার খাবার জন্যেই কিছু পয়সা চাইছি।’ এর সামনে দিয়ে সে মুহূর্তে পাঁচ-দশটি ছোট কুকুরের দল নিয়ে হেঁটে যায় বাঁ-হাতে ফুল লতাপাতার উল্কি আঁকা এক যুবতী। দলের একেবারে শেষ কুকুরটির পেছনের পায়ে বাঁধা একটি হুইল। বাকিগুলো হাঁটছে কিছুটা খুঁড়িয়ে। মেয়েটি খুব সম্ভবত কোনো পঙ্গু কুকুর সেবা কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক। সবগুলো কুকুরের গলায় বাঁধা চেনের প্রান্তকে নিজের মুঠিতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মেয়েটি ফুরফুরে মেজাজে সামনে এগিয়ে যায়।

মিটারে পয়সা ভরে ভেনেসা ফিরে আসে। আমরা হাঁটতে থাকি কংক্রিটে বাঁধানো পথ ধরে। খুব কাছেই এসে একটি রিকশা হার্ড ব্রেক করে। এ সেই বঙ্গদেশের রিকশা নয়। বরং ও ধরনের কিছু একটা। এঁদের অনুমতি আছে কেবল এই হারবারের আশপাশে লোকেদের নিয়ে ঘুরবার। রিক্সার পাদানির জায়গাটি থাকা টেপরেকর্ডার থেকে ভেসে আসছে আরবি গান। যানটি চালাচ্ছে ফ্যাশন দুরস্ত এক যুবা। জেল দিয়ে পেছনে ব্যাকব্রাশ করা চুল। হাতের কবজিতে বেঁধে রাখা কয়েকটি মালা। আমরা তো আর এখানে প্রমোদ ভ্রমণে আসিনি, তাই গাঁটের টাকা খরচ করে রিকশায় চড়বার মানে হয় না; আর ও জিনিসে তো এ জীবনে কম চড়িনি!

হারবারের ডান দিকে বিশাল এক যুদ্ধজাহাজ। নানা যুদ্ধ শেষ করে অবসর নিয়ে এটি এখন ডেরা বেঁধেছে এই হারবারের কোণে। কম পয়সায় খাটবার মতো লোক নিয়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প এদেশে গড়ে ওঠেনি, ওদিকে দৈত্যের মতো এমন এক জাহাজকে ডুবিয়েও দেওয়া যায় না। তাই একসময় ঠিক হলো, জাহাজটিকে যদি এই হারবারে বেঁধে রেখে একটা জাদুঘর মতন করা যায়, তবে হয়তো জাহাজটি মরে গিয়েও বেঁচে যায়। সেটাই হলো পরে। লোকে এখন পয়সা খরচ করে ভেতরে গিয়ে দেখে আসে নাবিকদের থাকার স্থল আর যুদ্ধ বিমানের কংকালগুলো। এই জাহাজের পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ে নিজেকে হস্তীর সম্মুখে পিপীলিকাসম মনে হয়। হয়তো সেসব নিয়েই ভাবছিলাম কয়েক মুহূর্ত। কোন সময়ে যে একজন চৈনিক ভদ্রলোক হাতে একখানা লিফলেট গুঁজে দিয়ে গেছে টের পাইনি। এখন সম্বিত ফিরে পেয়ে তাতে নজর বুলিয়ে যা বুঝলাম—এঁরা ফালুন গং নামক চীন দেশের এক সাধক সম্প্রদায়। তা চীনের বর্তমান কম্যুনিস্ট সরকার এঁদের ওপর ব্যাপক নাখোশ। সুযোগ পেলেই পাইকারি হারে ঢুকিয়ে দেয় জেলে। সেটুকুও হয়তো মেনে নেয়া যেত। কিন্তু ফালুন গং গ্রুপ জেল থেকে পলাতক কয়েক সদস্যের মাধ্যমে জেনেছে—জেলে অন্তরিন বাকি সদস্যদের শরীর থেকে অনেক সময়েই সরিয়ে ফেলা হয় কিডনির মতো মূল্যবান প্রত্যঙ্গ। আর সেজন্যেই এই দল চাচ্ছে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ঘটনাটিকে বিশ্ববাসীর নজরে আনতে।

/uploads/files/1deJKH6VHifKemIs4JlwnP0l5VpioCwmSVuoZuAH.jpeg
ভেনেসা ততক্ষণে সরে গেছে কিছুটা ডান দিকের কোণে। সেখানে চার জনে মিলে বসিয়ে ফেলেছে গানের জমজমাট আসর। তাঁদের হাতে বেহালা, গিটার, একর্ডিয়ান আর চেলো। যিনি লিড গায়ক তার গায়ে একটি ছাই রঙের টি শার্ট। মাথায় প্রথাগত মেক্সিকান খড়ের টুপি। বিশাল সেই টুপির চাতালে ঢাকা পড়েছে মুখের একাংশ। পাশেই রাখা সাউন্ডবক্স থেকে ঝুলে থাকা মাইক্রোফোনটি আঁকড়ে ধরে ভদ্রলোক দুলে দুলে গান করেন; আর গানের মাঝে সকল দর্শকের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ভেনেসার দিকে তাকিয়ে হাসেন। সেই অর্থপূর্ণ হাসি দেখে আন্দাজ করি, এ-ই হয়তো ওর সেই গাতক বন্ধুদল।  দলের সামনে পেতে রাখা গিটারের শূন্য বাক্স। লোকে দু চার মিনিট গান শুনে সেখানে রেখে যাচ্ছে কয়েকটি কয়েন।

আমি স্প্যানিশ বুঝি না। ভেনেসা তাই তর্জমা করে গানের কয়েকটি লাইন আমাকে শোনায়—‘আই ডু নট নো হোয়াট টু ডু, আই ফেল ইন লাভ উইথ ইউ ইন এ ডে, এন্ড ডু নট নো হোয়াই, ইউ মেইড মাই লাইফ রিবর্ন।’ সে তো বুঝলাম, কিন্তু একদিনের মাঝেই হাবুডুবু প্রেমে পড়া কি আদৌ সম্ভব?—মুচকি হেসে ভেনেসাকে জিজ্ঞেস করি। আমার কথার জবাব দেবার মতো কোনো ব্যাগ্রতা ওর মাঝে ক্রিয়া করে না, বরং ওর দৃষ্টি ব্যস্ত থাকে লিড গায়কের সাথে অদৃশ্য তরঙ্গ স্থাপনে। আমি তাই ওকে কিছুটা স্পেস ছেড়ে দিয়ে বাঁ-পাশে আরো কিছুটা দূরে এক ভাস্কর্যের দিকে হেঁটে যাই। এটির সামনে প্রচুর মানুষের জটলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর জাহাজে করে নৌ সেনারা যখন নিউ ইয়র্কে ফিরে এলো, তখন তাঁরা যুদ্ধ জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, প্রজ্জ্বল; তাঁদেরকে এক নজর দেখতে আর ফুল ছুঁড়ে দিতে বন্দরে সমবেত হলো হাজারও নারী। সেই নৌ সেনাদের মাঝে একজন তেমনই এক যুবতীকে ঠেসে ধরে ওষ্ঠাধরে প্রগাঢ় চুম্বনের প্রলেপ এঁকে দিলো। সেই মুহূর্তটিকে ক্যামেরায় বন্দি করে নিল টাইমস ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক। পরে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির যে আনন্দ, তার সমার্থক হয়ে গেল টাইমের কভার পেইজে ছাপা সেই ছবিটি। আরো পরে সেই ছবিটিকে সম্বল করেই গড়া হলো বিশাল ভাস্কর্য। নিয়ম হয়ে গেল, ভাস্কর্যটি কয়েক বছর করে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে থাকবে। সেই ঘূর্ণনের সাথী হয়ে ভাস্কর্যটি এ-মুহূর্তে এ শহরের হারবারে। লোকে তাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এর সামনে ছবি তোলার জন্যে। অনেকে আবার প্রেয়সীকে জাপটে ধরে সেই ভাস্কর্যের নাবিকের ভঙ্গিমাতেই ছবি তুলছে। পত্রবিহীন কোরাল গাছের তলে দাঁড়িয়ে যখন এসব তামাশা দেখছি, তখন হঠাৎ পেছন থেকে ভেনেসার কণ্ঠ শুনতে পাই—‘ইসনট ইট এ লাভলি স্ট্যাচু?’ আমি মাথা দোলাই। তারপর দূরের গানের দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলি, ‘তুমি চাইলে ওদিকটায় আরো কিছু সময় কাটাতে পারো। আমি আছি এখানে।’ ‘দ্যাটস ওকে, চলো আমরা এই ট্রেইলে কিছুটা দূর হাঁটি। ওরা ওখানে বহুক্ষণ গান করবে। ফিরে আসার পথে না হয় আবার থামা যাবে।’

ডান পাশের এক ফিশ রেস্তোরাঁ থেকে তাজা মাছ ভাজার চনমনে গন্ধ ভেসে আসছে। তার সামনে খদ্দেরদের লাইন। আমরা সেটিকে পেরিয়ে আরো কিছুটা দূর হেঁটে গেলে এক কাকাতুয়া পাখিওয়ালা আমাকে হাত নেড়ে ডাকেন। তার আদরের পাখিটি নাকি আমার হাতে কিছুক্ষণের জন্যে বিশ্রাম নিতে চায়। অগত্যা সেই পাখিটিকে ডান কবজিতে আশ্রয় দিতে হলো। সেটি দেবার বিনিময়ে আমাকে খোয়াতে হলো জামার সবচেয়ে উপরের বোতামটি। সেয়ানা কাকাতুয়া কোন সময়ে যে ঠোকর দিয়ে বোতামখানি খেয়ে ফেলেছে টেরই পাইনি। দেখি, ভেনেসা খিক খিক করে হাসছে আমার দশা দেখে। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পাখিটিকে মূল মালিকের হাওলায় ছেড়ে এসে পাশের এক দূর্বা ঘাসের জমিনে ধপ করে বসে পড়ি।

/uploads/files/rCFdf4gX5jRTfbo4jBLZ0i13EeFg9maFxDOyKxKV.jpeg
অনতিদূরে খাড়ির মাঝে বেঁধে রাখা কয়েকটি নৌকো। ঢেউয়ের আঘাতে তারা প্রবলভাবে দুলছে। আর তীরের কাছটায় নোটিশ টানিয়ে লেখা, ‘এখানে সাঁতার কাটা কিংবা মাছ ধরা নিষিদ্ধ।’ আমার থেকে একটু দূরে ঘাসের মাঝেই হঠাৎ মাথা ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে গেছে বিশাল আরবান ট্রি। তার তলে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে সুতো টেনে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে দু যুবক-যুবতী। যেন আকাশের দিকে তুলি টেনে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা। ভেনেসার নাকের অগ্রভাগে বিন্দু বিন্দু স্বেদ। সাগরের নীল জলের প্রতিফলন সেই বিন্দুতে সমাপতিত হয়ে সৃষ্টি করে উজ্জ্বল আলোকস্ফটিক। আমি ঘাসের ওপর শুয়ে ভেনেসার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘সো দিস সিঙ্গার গাই, ইজ হি জাস্ট এ ফ্রেন্ড অফ ইওরস?’ কামরাঙার কোয়ার মতো ঠোঁটটিকে উলটে কৌতুকপূর্ণ স্বরে ও জবাব দেয়, ‘কেন তুমি কি ভেবেছিলে ও আমার নাগর?’ এ বলে ভেনেসা খলখলিয়ে হেসে ওঠে। তারপর বহু দূরের অস্পষ্ট করোনাড দ্বীপের সেতুর দিকে তাকিয়ে সেই লিড গায়ক আর ওর জীবনের কিছু যোগবিন্দুকে আমার সামনে তুলে ধরে।

ভেনেসার পরিবার ওর খুব ছোটবেলায় মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় চলে এলেও ও রয়ে গিয়েছিল দিদার কাছে গুয়াদেলরাহা শহরে। সেই শহরের হাইস্কুলে ওর সহপাঠী ছিল এই লিড গায়ক, আলবার্তো। বলা চলে, ও ছিল আলবার্তোর হাইস্কুল সুইটহার্ট। তবে এর মাঝেই জীবন অন্য দিকে মোড় নেয়। আলবার্তোর মায়ের তখন এক অদ্ভুত মানসিক রোগ ছিল। ছেলেকে সে সহ্য করতে পারত না। কারণে-অকারণে বেধড়ক পেটাত। মায়ের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে হাইস্কুলের গণ্ডি পেরুবার আগেই একদিন আলবার্তো ঘর ছেড়ে ফেরারি হয়। ওদিকে ভেনেসা এর কয়েক বছর পর মা-বাপের কাছে আমেরিকায় চলে আসে। আলবার্তো ওর জীবন থেকে বেমালুম হারিয়ে যায়। ভেনেসার জীবনও নানা চোরাগলিতে ঘুরপাক খায় এতটা বছর। তারপর এই দু বছর আগে মেক্সিকোতে নিজ শহরে বেড়াতে গিয়ে ভেনেসা যায় গির্জার রবিবাসরীয় প্রার্থনায়। সেখানে গিয়ে দেখে, যুবা বয়েসী যাজকদের একজনকে বড্ড যেন চেনা চেনা লাগে।

আলবার্তোর মায়ের পরে পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। কী করে যেন আলবার্তোর কানে ঠিকই পৌঁছে যায় মায়ের এই অন্তিম দশার কথা। যেই মায়ের কারণে তাঁকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, সেই মাকেই শেষ সময়টায় আলবার্তো প্রাণ সঁপে দিলো। কিন্তু ভদ্রমহিলা শেষতক বাঁচলেন না। জীবনের এই লুকোচুরি খেলায় শ্রান্ত হয়ে আলবার্তো শরণ নিল যীশুর। গুয়াদেলরাহার সেই সমুদ্রমুখী গির্জাতে সেভাবেই ভেনেসার সাথে আলবার্তোর পুনর্মিলন।

শৈশবের সেই কুসুম কুসুম রোমান্টিকতা এখন আর নেই। তার বদলে এখন দু জনের মাঝে যা আছে, সেটি নিখাদ বন্ধুত্বপূর্ণ মমতা। আর সেই মমতা এক সময় খুঁজে পায় সমধারা। আলবার্তো গির্জার অধীনে কাজ করছিল স্থানীয় দরিদ্র শিশুদের নিয়ে। ওদিকে প্রথম যৌবনে ঘটানো একটি গর্ভপাতের পর ভেনেসার আর কোনোদিন মা হয়ে ওঠা হয়নি। তাই পথশিশুদের নিয়ে কিছু একটা করার উদগ্র বাসনা তার মাঝেও ছিল। ভেনেসা আলবার্তোকে প্রস্তাব দেয়, এই শিশুদের জন্যে আমেরিকা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য উত্তোলন করলে কেমন হয়? আলবার্তো তো এমনিতেই ওর সেই ভবঘুরে জীবনে গিটার বাজিয়ে পয়সা তুলত। এবারেও না হয় তেমন কিছু করুক ক’টা দিন আমেরিকায় এসে। তারপর যে টাকা পাওয়া যাবে তা নিয়ে ভেনেসা আলবার্তোর দলের সাথে পৌঁছে যাবে গুয়াদেলরাহায়। ওখানে বাচ্চাদের জন্যে খেলনা কেনা হবে। স্থানীয় এক জুতোর দোকানদার বলেছেন, বিনা মূল্যে তিনি কিছু জুতোর বাক্স দেবেন। তারপর সেই বাক্সে খেলনা ভরে বিলানো হবে শহরের প্রায় কয়েকশো দরিদ্র শিশুর মাঝে।

/uploads/files/E9MegAiKnkSqvFEYywFIyrMhu0yMzyRtZpHqAaP2.jpeg
ভেনেসার বয়ানটি শেষ হলে আমি আকাশে উড়তে থাকা বাহারি ঘুড়িগুলোর দিকে তাকাই। সেই মুহূর্তে একটি ঘুড়ি আরেকটির হাতে ধরাশায়ী হয়ে সুতো ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে দূর সমুদ্রের দিকে। তবে সেটিকে কেউ তাড়া করছে না। বরং ঘাসের চাদরে শুয়ে থাকা ঘুড়ির মালিক বেশ আমোদ নিয়ে দৃশ্যটি দেখছেন। পাশেই রোদ চশমা পরে পা ভাঁজ করে বসে থাকা প্রেয়সী কিছুটা যেন সরে আসে তার দিকে। তারপর ভালোবাসা অনিবার্য পথ খুঁজে নেয় তাঁদের দ্বৈত ওষ্ঠাধরে।

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র