Barta24

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

English

হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ইসলাম

হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ইসলাম
ফজল হাসান


  • Font increase
  • Font Decrease

এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যর্থ নায়ক হিটলার। ভাগ্যিস, হিটলার ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং তিনি অভিসন্ধি কামাল করতে পারেননি। নইলে তামাম দুনিয়ায় ইহুদি নিধনের পরে মুসলমানদের যে কী হতো, তা বলা মুশকিল। তবে মন্দ হওয়ার আশঙ্কাই ছিল বেশি। সে বিষয়ে আলোচনার আগে ইসলাম এবং মুসলমান সম্পর্কে হিটলারের মনোভাব এবং অভিসন্ধি কী ও কেমন ছিল, তা নিয়ে খানিকটা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

শুরুতেই ইসলাম এবং মুসলমান সম্পর্কে হিটলারের একটা প্রচলিত মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখ করছি। তিনি বলেছিলেন, ‘একমাত্র ধর্ম হিসাবে আমি ইসলামকে সম্মান করি। একমাত্র পয়গম্বর যাকে আমি শ্রদ্ধা করি এবং যার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করি, তিনি নবী মোহাম্মদ’ (সাঃ)। হিটলারের এই মন্তব্যের আড়ালে তিনটি প্রশ্ন নিহিত আছে। প্রথমত হিটলারের উপরোক্ত মন্তব্য কি সত্যি? দ্বিতীয়ত তিনি যা বলেছেন (আদৌ যদি বলে থকেন), তা কি আসলেই বিশ্বাস করতেন? এবং তৃতীয়ত যুদ্ধের কৌশল এবং অধ্যুষিত দেশ থেকে, বিশেষ করে তুরস্ক, সৈন্যবাহিনীর সাহায্য ও সহযোগিতা পাওয়ার গোপন চক্রান্ত ছিল? তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই হিটলার এবং ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে একটা প্রশ্ন চাউর হয়ে আছে। তা হলো—হিটলার কি ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি তার মনোভাব কেমন ছিল? মুসলমানদের সঙ্গে হিটলারের আঁতাত এবং হিটলারের সঙ্গে মুসলমানদের সহযোগিতার মূল কারণ জানতে হলে এক ধাপ পেছনে ফিরে যেতে হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533471381786.png
১৩তম এসএস ডিভিশনের এক সৈন্য ইসলাম ও ইহুদিবাদ বিষয়ক পুস্তিকা হাতে

নাৎসি বাহিনীর ‘ব্যাপক গণহত্যা’ (হল্যাকাস্ট) এবং ইসলাম ও মুসলমান প্রসঙ্গে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত ‘ব্যাপক গণহত্যা’ চলার সময় মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, এবং দ্বিতীয়ত যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, এমনকি বর্তমান সময় পর্যন্ত, ‘ব্যাপক গণহত্যা’ সম্পর্কে মুসলমানদের ধারণা কী এবং কেমন আছে।

দু’খণ্ডে প্রকাশিত হিটলারের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Mein Kampf পড়লে বোঝা যায় যে, আসলে শুরু থেকেই ইসলাম এবং মুসলমানের প্রতি তাঁর মনের ভেতর অন্যরকম অভিসন্ধি ছিল। যেমন (১) হিটলারের প্রয়োজন ছিল অটোম্যান (তুর্কি) শাসকের সর্বাঙ্গীন সহযোগিতা এবং তাদের কুখ্যাত সাঁজোয়া বাহিনীর সাহায্য, (২) হিটলার দুটি বিশেষ কারণে সৌদি রাজতন্ত্রকে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করতেন। এগুলো ছিল—মিত্র বাহিনীর দেশগুলো সমস্ত তেল নিত সৌদি আরব থেকে এবং সৌদি আরব ছিল মিত্র বাহিনীর হাতের পুতুল, অর্থাৎ ‘পাপেট’। এছাড়া ইসলামের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে সৌদি আরব স্বীকৃত, (৩) ইরাকের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। তার প্রধান কারণ ছিল রাশিয়ার কাছাকাছি ইরাকি সীমান্তে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা, (৪) হিটলার বিশ্বাস করতেন তিনি আর্য (ইন্দো-ইউরোপিয়ান) জাতির উত্তরসূরী, এবং (৫) হিটলারের শত্রু ছিল ইহুদি, যারা মুসলমানদেরও শত্রু। তাই এসব কারণে হয়তো তিনি তেল উৎপাদনকারী মুসলমান রাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। হিটলারের এসব অভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য নাৎসি বাহিনী বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং কর্মসূচি নিয়েছিল। এখানে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে হিটলার তার সেনাপতিদের বলেছিলেন, ‘আমরা দূর-প্রাচ্যে (ফার ইস্ট) এবং আরবে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে রাখব। আমরা নিজেদের মানুষ ভাবব এবং ওদেরকে মনে করব অর্ধেক উল্লুক (হাফ এপস্), যারা চাবুকের আঘাত পাওয়ার যোগ্য।’ হিটলারের এই মন্তব্যের পেছনে তাঁর নাক-উঁচু ভাব কাজ করেছে। তিনি এবং নাৎসি বাহিনীর সামরিক বাহিনীর সকল উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা মনে করতেন জার্মান হলো মানব বিবর্তনের শ্রেষ্ঠ জাতি। তাই তাদের নৈতিক কর্তব্য দুনিয়া থেকে অন্য ধর্মাম্বলীদের সমূলে নির্মূল করা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533471588322.jpg
মুফতি হাজি মোহাম্মেদ আল-হোসেইনি (বামে)

সন্দেহ নেই, সমগ্র মুসলিম জাহানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়েছিল। জাপানি সৈন্যদের দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা, বলকান এলাকা এবং ক্রিমিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে ইতালিয়ান ও জার্মান সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী আক্রমণের জন্য মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলো প্রথম সারির যুদ্ধ-এলাকায় পরিণত হয়েছিল। এছাড়া একই সময়ে ব্রিটিশ, ফরাসি এবং ডাচ সাম্রাজ্য অথবা সোভিয়েত শাসিত দেশগুলোতে অগণিত মুসলমান যুদ্ধের আওতায় পড়ে। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে বার্লিনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তাদের জন্য রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে ইসলাম, তথা মুসলমানের সাহায্য এবং সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে নাৎসি বাহিনী ব্রিটিশ রাজতন্ত্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য মুসলমান অধ্যুষিত দেশের সঙ্গে আঁতাত করে। এছাড়া মুসলমানদের মন জয় করার জন্য নাৎসি জার্মানরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন এবং কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সেগুলোর মধ্যে বার্লিন থেকে শর্ট ওয়েভ রেডিওতে আরবি এবং ফারসি ভাষায় বিভিন্ন প্রচারণামূলক অনু্ষ্ঠান সম্প্রসারণ ছিল অন্যতম। তবে নাৎসি বাহিনীর প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থনের চেয়ে অধিকাংশ মুসলমানের ভেতর গড়ে উঠেছিল মূলত ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব। যাহোক, মুসলমানদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করে নাৎসি বাহিনী দুটি আলাদা ডিভিশন তৈরি করেছিল। এগুলো ছিল আলবেনিয়ার মুসলমানদের নিয়ে স্ক্যান্ডারবার্গ ডিভিশন এবং বসনিয়ার মুসলমানদের নিয়ে হ্যানশার ডিভিশন। তবে চেচনিয়া থেকে উজবেকিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক মুসলমান সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করেছিল। এসব মুসলমান সৈন্যরা স্তালিনগ্রাদ, ওয়ারশ, মিলান এবং বার্লিন রক্ষার জন্য নিয়োজিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নাৎসি বাহিনী অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, সোভিয়েত এবং বলকান এলাকার মুসলমান সৈন্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহী ছিল না। পরে নাৎসি বাহিনী হ্যানশার ডিভিশন বিলুপ্ত করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533470053684.png
নাৎসি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত হ্যানশার ডিভিশন প্রদর্শনকালে মুফতি আল-হোসেইনি

যুদ্ধকালীন জার্মান সরকার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় বিপুল সংখ্যক মসজিদ এবং মাদ্রাসা পুনরায় নির্মাণের আদেশ জারি করে, যা সোভিয়েত সৈন্য বাহিনী ভেঙে ফেলেছিল। সেইসব এলাকার অনেক মুসলমানকে জার্মান সৈন্য বাহিনী নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এছাড়া মুসলমানেরা যাতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে, তার জন্য অনুকূল পরিবেশ এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা, যেমন হালাল খাবার-দাবারের আয়োজন করা, সৃষ্টি করেছিল। কোরানশরিফ এবং ইসলামের অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ‘জিহাদ’ হিসাবে ব্যবহার করে। এসব সুযোগ দেওয়ার যুক্তি হিসাবে নাৎসি বাহিনীর জেনারেল হাইনরিখ হিমলার বলেছিল, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তাদেরকে সহজে বেহেশতে পাওয়ার উপায় হিসাবে আমার দল উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। মুসলমান সৈনিকদের জন্য এটাই হলো বাস্তব এবং উত্তম পন্থা।’ এছাড়া ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকার মরুভূমিতে লিফলেট বিতরণ করে। সেখানে লেখা ছিল, ‘ইসলামের প্রধান শত্রু ইংরেজ, আমেরিকাবাসি, ইহুদি এবং তাদের মিত্ররা। যুদ্ধে জার্মান জিতবে, ইনশাআল্লাহ্।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533469901177.jpg
হিটলারের সাথে নাৎসি বাহিনীর জেনারেল হাইনরিখ হিমলার (ডানে)

নাৎসি বাহিনীর আরেক পন্থা ছিল হিটলারের সঙ্গে জেরুজালেমের (আল কুদস্) তৎকালীন মুফতি হাজি মোহাম্মেদ আল-হোসেইনির মধ্য সরাসরি সাক্ষাৎ এবং আলোচনার ব্যবস্থা করা, যা ১৯৪১ সালের ২১ নভেম্বর ঘটেছিল [প্রচ্ছদ ছবিতে সেদিনের মিটিং]। সেই আলোচনার পরে মুফতি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, সমগ্র আরব জাতি জার্মানির বন্ধু। বিনিময়ে হিটলার অভয় দিয়েছিলেন, জার্মান সৈনিকেরা যখন ককেশাসের দক্ষিণাঞ্চল দখল করবে, তখন ব্রিটিশদের কবল থেকে আরবরা স্বাধীনতা অর্জন করবে। উল্লেখ্য, বসনিয়ার মুসলমানদের নিয়ে গঠিত সৈন্য বাহিনী গড়ার পেছনে মুফতি আল-হোসেইনির ভূমিকা ছিল সর্বাগ্রে। তবে মুফতির প্রধান কাজ ছিল নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে সোভিয়েত এবং বলকান এলাকায় আরব মুসলমানদের সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এসব প্রচারণার জন্য তিনি নাৎসি বাহিনীর রেডিও স্টেশন ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছিলেন। মুফতি আল-হোসেইনি ছাড়াও আরেকজন আরব রাজনীতিবিদ নাৎসি বাহিনীর মদদ যুগিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অ্যাঙ্গলো-ইরাকি যুদ্ধের অন্যতম সমর নায়ক এবং পরবর্তীতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী রশীদ আলী আল-গিলানী। তিনি ব্রিটিশ-সমর্থিত আবদুল্লাহকে সেনা বিদ্রোহের মধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা লাভ করেন। হিটলারকে পূর্ণ সমর্থন করে তিনি ১৯৪১ সালের ২৩ মে এক বিবৃতি প্রদান করেন এবং সেখনে তিনি বলেছেন, ‘ইংরেজদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আরব স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের স্বাভাবিক মৈত্রীবন্ধন।’ এসব ক্ষমতাসীন মুসলমান নেতারা নাৎসি বাহিনীর দর্শন ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে নিজেরা অলৌকিকভাবে লাভবান হয়েছিলেন। ‘বাথ পার্টি’ (কঠিনভাবে সেক্যুলার, কিন্তু উৎপত্তি হয়েছিল মুসলমান অধ্যুষিত পরিবেশে) উজ্জ্বল উদাহরণ। নাৎসিদের প্ররোচনায় এই ‘বাথ পার্টি’ আত্মপ্রকাশ করেছিল এবং কট্টর ইসলামিক মিলিট্যান্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533470343029.png
হিটলারের সাথে রশীদ আলী আল-গিলানী (ডানে)

উল্টোদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উত্তর আফ্রিকা, ভারত এবং অখণ্ড সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অনেক মুসলমান সৈনিক মিত্র শক্তির পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা বিভিন্ন রণক্ষেত্রে, বিশেষ করে এল-আলামিন, মন্টে ক্যাসিনো, ফ্রান্সের প্রভেন্স উপকূল এলাকা এবং স্তালিনগ্রাদে, অংশগ্রহণ করে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছিলেন। এছাড়া মুসলমানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অনেক মুসলমান নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইহুদিদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। মিত্র বাহিনীকে সাহায্য এবং সহযোগিতা করার প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গুপ্তচর রানী হিসাবে সমগ্র বিশ্বে পরিচিত নূর ইনায়েত খানের কথা উল্লেখ না করলেই নয় । তিনি (মৃত্যু ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪) ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং টিপু সুলতানের বংশধর। নূর ইনায়েত খান ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে অধিকৃত ফ্রান্সে রেডিও অপারেটর হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। একসময় জার্মান গেস্টাপো তাঁকে অনুসরণ করে। সেই সময় ফরাসি সেনা কর্মকর্তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। অবশেষে গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে তিনি নাৎসি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে তাঁর ফাঁসি হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/05/1533470548273.jpeg
টিপু সুলতানের বংশধর নূর ইনায়েত খানকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলায় নাৎসি বাহিনী

যদিও নাৎসি জার্মানির শাসনামলে (১৯৩৩-১৯৪৫) আরব বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে নাৎসিদের সম্পর্ক ছিল অবজ্ঞা, অপপ্রচার, সহযোগিতা এবং অনেক সময় আরবদের তুলনায় নিজেদের উপরে তোলার প্রবণতা, কিন্তু এসব অম্ল-মধুর সম্পর্ক থাকার পরেও দুই মেরুর মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।  তবে অনেক পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদ মনে করেন, হিটলার ইসলাম ও মুসলমানদের তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। আবার অন্যদিকে অনেকে আরেক ধাপ এগিয়ে আছে। তারা মনে করে, হিটলার পরাজিত না হলে ইহুদিদের খতম করে মুসলমানদের ধরতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার পরাজিত না হলে কী হতো, এখন তা এখন হলফ করে বলা মুশকিল। তবে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে মোটামুটি অনুমান করা যেতে পারে। হিটলারের অভিসন্ধির সত্যিটা কখনোই থলের বিড়াল হয়ে বেরিয়ে আসবে না। বরং অধরাই থেকে যাবে।

[লেখকঅস্ট্রেলিয়ার অভিবাসি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা]

আপনার মতামত লিখুন :

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী

রেমব্রান্ট ও ভারমিয়ার : সপ্তদশ শতকের দুই ডাচ শিল্পী
ইউহানেস ভারমিয়ার┇রেমব্রান্ট

রেমব্রান্ট
১৬০৬-১৬৬৯

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114164805.jpg
◤ রেমব্রান্ট ◢


ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু—প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা হয়েছে যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে।

চিত্র-সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট বলেছেন, পেইন্টিং নাকে শুকবার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর কথা : যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্পষ্ট করে দেবে তুমি কী জানো না। যে সব বড় শিল্পীর সাথে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয় তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114291988.jpg

◤ মিনার্ভা ◢


 ১৬০৬ : জন্ম ১৫ জুলাই, লেইডেনে। বাবামার দশ সন্তানের অষ্টম। পুরো নাম রেমব্রান্ট হার্মেনসুন ভ্যান রিইন।
১৬১৩ : ল্যাটিন স্কুলে ভর্তি।
১৬২০ : ১৪তম জন্মদিনের ২ মাস আগে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, তখনও ল্যাটিন স্কুলের পাঠ অব্যাহত।
১৬২৪ : ইতিহাস, অলঙ্কার-শাস্ত্র অধ্যয়ন।
১৬২৫ : লেইডেনে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন, দ্য স্টোনিং অব স্টেপেন অঙ্কন
১৬২৯ : প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কন।
১৬৩৪ : সাস্কিয়া উইলেনবার্গকে বিয়ে।
১৬৪২ : সাস্কিয়ার মৃত্যু, শিশুপুত্র টাইটাসের জন্য গির্জে ডির্কসকে আয়া নিয়োগ; নাইট ওয়াচ অঙ্কন।
১৬৪৭-১৬৫০ : ডির্কসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক, বিরোধ, সাস্কিয়ার অলঙ্কার বন্ধক দেওয়ার কারণে রেমব্রান্টের চেষ্টায় তাকে সংশোধনাগারে প্রেরণ।
১৬৫৪ : নতুন হাউসমেইড হেন্ডরিক স্টোফেলস-এর সাথে সম্পর্ক, কন্যা সন্তান কর্নেলিয়ার জন্ম, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ অঙ্কন।
১৬৫৬ : দেওলিয়া ঘোষণা, ক্রোক পরোয়ানা জারি।
১৬৫৮ : বাড়ি বেচে ভাড়া বাড়িতে গমন।
১৬৬৯ : মৃত্যু ২ নভেম্বর। ওয়েস্টরকার্ক সিমেট্রিতে ভাড়া করা অজানা কবরে সমাহিত। 」

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114473772.jpg

◤ আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস ◢


চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর তারা খুব ভালোভাবেই জানেন সপ্তদশ শতকের ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সকলে সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবিটির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। ছবির বিষয় রাতের প্রহরা, অর্থের বিনিময়ে যাদের জন্য এটি আঁকতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা কেউই রেমব্রান্টের কাজটি পছন্দ করেননি।

এই ছবিতে আলো পড়েছে ঠিক মাঝখানে, দুজন অফিসারের উপর আর বর্ষাধারী রক্ষীরা সব আঁধারে অস্পষ্ট। ফরমায়েশটা তাদেরই, অথচ তাদের ভালো করে দেখা যাবে না আর তারা চাঁদা তুলে শিল্পীর টাকা দেবে এটা তো হতে পারে না। খুব বদনাম হলো শিল্পীর। ছবি আঁকার ফরমায়েশ পাওয়া মারাত্মক হ্রাস পেল। স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এই শিল্পী দেওলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাঁকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হতে তা গবেষণার বিষয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114622015.jpg
◤ দ্য নাইট ওয়াচ ◢


রেমব্রান্টের স্মরণীয় উক্তি : ওরা আমাকে নিয়ে যেভাবে ছবি আঁকাতে চায় আমি সেভাবে আঁকতে পারি না, এটা ওরাও জানে।

শিল্পীদের বিশ্বাস নেই
রেমব্রান্ট জেনোয়া থেকে দুটি ছবির ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন ভিভিয়ানো দরদাম এবং সরবরাহের তারিখ ঠিক করেন। তিনি এসে দেখেন কাজ শেষ হয়নি, অধিকন্তু শিল্পী বেশি দাম হাঁকছেন। ক্যাপ্টেন পোর্ট অব আমস্টার্ডাম থেকে ক্রেতাকে লিখলেন : কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর, শিল্পীরা সাধারণত তাই করে থাকে, তাছাড়া এই লোকটির বিশ্বাস নেই। এখন দুটি ছবির জন্য ৩০০০ গিল্ডার চাইছেন, অথচ আমার সাথে দর ঠিক হয়েছিল ১২০০ ডলার। তার উপর ভরসা রাখা যায় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114664684.jpg

◤ বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ ◢


রেমব্রান্টের ছবির ওপর চোরের নজর, গবেষকেরও
১৬৩০-এ আঁকা রেমব্রান্টের বাবার পোর্টেট—‘পোর্ট্রেট অব দ্য ফাদার’ ২০০৬ সালে জাদুঘর থেকে চুরি হয়; সাত বছর পর সার্বিয়ার একটি গির্জায় ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে একবার চুরি হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে, উদ্ধার হয় স্পেনে।

রেমব্রান্টের মাস্টারপিস ‘ওল্ডম্যান ইন মিলিটারি কস্টিউম’ ছবিটির ওপর ইনফ্রারেড আলো, নিউট্রন ও এক্স-রে প্রয়োগ করে গবেষণা ২০১৩ সালে নিশ্চিত হয়েছে অন্য একটি ছবি রঙ দিয়ে ঢেকে রেমব্রান্ট এটি এঁকেছেন। নিচের ছবিটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114702139.jpg

◤ দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প ◢


বার্ধক্য ও যৌবন
রেমব্রান্ট ৬৩ বছর বেঁচে ছিলেন। বার্ধক্যের সঙ্কট তিনি মোকাবেলা করেছেন, তবুও বলেছেন : বার্ধক্য সৃজনশীলতার অন্তরায় কিন্তু বার্ধক্য আমার যৌবন-স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।

কয়েকটি সেরা ছবি : সেল্ফ পোর্ট্রেট সিরিজ, দ্য নাইট ওয়াচ, দ্য রিটার্ন অব দ্য প্রডিগাল সান, দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ডক্টর নিকোলাস টাল্প, দ্য জুইশ ব্রাইড, দ্য স্টর্ম অব দ্য সি অব গ্যালিলি, মিনার্ভা, আব্রহাম’স স্যাক্রিফাইস, বেলথাজার্স ফিস্ট, ডায়ানা, ফিলোসোফার ইন মেডিটেশন, বাথশেইবা অ্যাট হার বাথ, দ্য ব্লাইডিং অব স্যামসন, দ্য কন্সপিরেসি অব ক্লডিয়াস সিভিল, লুক্রেশিয়া।

 ✨

ইউহানেস ভারমিয়ার
১৬৩২-১৬৭৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114784531.jpg
◤ ইউহানেস ভারমিয়ার ◢


‘যে প্রভাতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়, তখন ঈশ্বরের সামনে নিশ্চয়ই ভারমিয়ারের শিল্পকর্মগুলো ছিল’—ফ্রেডেরিক সোমার এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডাচ চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগের শিল্পী ইউহানেস ভারমিয়ারকে। অথচ এই শিল্পীর কাজের খবর তাঁর জীবদ্দশায় নিজ শহর ডেলফট-এর বাইরে কোথাও পৌঁছেনি। তিনি ইয়ান বা ইউহান ভারমিয়ার নামেও পরিচিত। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা কোনো শিল্পগুরুর কাছে শিক্ষালাভ করার সুযোগ হয়নি, তিনি নিজেও কোনো স্কুল খোলেননি বা নিজ হাতে অনুগত আঁকিয়ে শিষ্যও তৈরি করেননি। অন্যদিকে তাঁর ছবিগুলো কেবল একজন ক্রেতাই নিজ সংগ্রহে রাখায় শিল্প-সমঝদারদের অন্য কেউ তাঁর সম্পর্কে জানতেও পারেননি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114892303.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং ◢


১৬৩২ : অক্টোবরে জন্ম, ৩১ অক্টোবর ব্যাপটাইজড।
১৬৫২ : বাবার মৃত্যু।
১৬৫৩ : ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে এপ্রিলে; বিয়ের আগে ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা গ্রহণ; চিত্রশিল্পী সংসদে যোগদান।
১৬৫৭ : পিটার ভ্যান রুভেন নামক একজন প্যাট্রন লাভ।
১৬৬১ : পেইন্টার্স গিল্ডের সভাপতি নির্বাচিত ; ১৬৬৩ ১৬৭০, ১৬৭১-এ পুনর্নির্বাচিত।
১৬৭২ : কিছু ইতালীয় চিত্রকলার যথার্থতা সনাক্ত করতে হেগ গমন।
১৬৭৫ : আর্থিক দুরবস্থা কাটাতে ১০০০ গিল্ডার ধার গ্রহণ, সে বছরই মৃত্যু। ১৫ ডিসেম্বর ওল্ড চার্চে সমাহিত। 」

গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং
গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং-কানে মুক্তোর দুল পরিহিত এ ছবিটি ভারমিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। সপ্তদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ছবিকে বলা হয় ‘দ্য মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ কিংবা ‘ডাচ মোনালিসা’। কারো ফরমায়েশে তিনি এ ছবিটি এঁকেছেন বা নিজস্ব কোনো নারীকে চিত্রায়িত করেছেন তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১৮৮১ সালে হেগে অনুষ্ঠিত একটি নিলামে মাত্র দুই গিল্ডার ৩০ সেন্টে ছবিটি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতার কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় শেষ পর্যন্ত আজকের এ বিশ্বখ্যাত ছবিটি ১৯০২ সালে মরিতসুইস জাদুঘরে দান করে দেওয়া হয়।

ট্র্যাসি ক্যাভেনিয়র এ ছবিটিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেন গার্ল উইথ এ পার্ল ইয়াররিং (১৯৯৯) নামে। ২০০৩ সালে চলচ্চিত্রায়িত হলে তা গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গার্ল উইথ এ রেড হ্যাট-লাল টুপি পরা এই মেয়েটিও এখন শিল্পরসিকদের কাছে পরিচিত মুখ। ভারমিয়ারের ছোট আকৃতির তেলচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এই লাল টুপির মেয়ে। উনবিংশ শতকেই অল্প কটি ছবির শিল্পী হলেও ভারমিয়ারের প্রভাব নবীন শিল্পীদের ওপর পড়তে শুরু করে।

সালভাদর দালি ভারমিয়ারের দ্য লেসমেকার নিজের মতো করে এঁকেছেন। দালির ১৯৩৪ সালের একটি অমর কাজ-‘ভারমিয়ারের প্রেতাত্মা, যা টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’

অঙ্কনই জীবনের ব্রত
অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি প্লেগ এবং ছবি আঁকার পেছনে ব্যয়—পনের সন্তানের জনক ভারমিয়ারের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও তিনি সেকালের সবচেয়ে দামি রঙ কিনে ছবি আঁকতেন। দারিদ্র্য জর্জরিত অবস্থায় মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যু, তবুও তিনি বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাঁর শাশুড়ির বাড়িতে দুটি কক্ষে ছবিগুলো পড়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লেডরিখ ভাগান ও থিওফাইল থোর-বার্জার তাঁকে পুনরাবিষ্কার করেন এবং ৬৬টি ছবি সনাক্ত করেন। তবে এর মধ্যে ৩৪টি ছবি নিয়ে সার্বজনীন সম্মতি রয়েছে যে এগুলো তাঁরই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566114986807.jpg

◤ দ্য মিল্কমেইড ◢


২০০ বছর পর
তখনকার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুল্লিখিত ও উপেক্ষিত রয়ে যান। মৃত্যুর ২০০ বছর পর ভারমিয়ারের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং শিল্পবোদ্ধারা স্বীকার করেন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। গুস্তাফ ফ্রেডরিখ ভাগান এবং থিউফাইল থোরে-বার্জার পুনরাবিষ্কৃত ভারমিয়ারের ওপর প্রবন্ধ রচনা করেন। তখন থেকেই ভারমিয়ার পুনর্মূল্যায়িত হতে শুরু করেন এবং কার্যত তাঁর পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচ স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

তাঁর প্রায় সব ছবিই ক্যানভাসে তৈল রঙ। অত্যন্ত দামি ল্যাপিস লাজুলাই, প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এবং অ্যম্বর রঙ ব্যবহার করতেন। সপ্তদশ শতকের কোনো শিল্পী রঙের পেছনে এত ব্যয় করতেন না, তাঁর দারিদ্র্যের সাথে এটা মেলানো যায় না। রঙের ঔজ্জ্বল্য তাঁর ছবি চিনিয়ে দেয়।

লক্ষীমন্ত নারী ক্যাথরিনা বোলনেসকে বিয়ে করেন। তাদের চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে দশজন বেঁচে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাথরিনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের বাড়ি ওঠেন। সে বাড়িরই দোতলার সামনের একটি কক্ষ হয়ে ওঠে ভারমিয়ারের স্টুডিও। সেই বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষা একটি চার্চও ছিল, তাঁর ল্যান্ডস্কেপে চার্চের উপস্থিতি দেখা যায়। ভারমিয়ারের কেবল তিনটি ছবিতে অঙ্কনের সময়কাল লেখা হয়েছে : দ্য প্রোকিউরেস (১৬৫৮), দ্য অ্যাস্ট্রোনোমার (১৬৮৮) এবং দ্য জিওগ্রাফার (১৬৬৯)।

দারিদ্র্যের ভার
দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি রাতভর সরাইখানাও চালিয়েছেন, কিন্তু দারিদ্র্য ঘোচেনি। সন্তানদের ভার ও দারিদ্র্যের চাপ তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। স্ত্রী ক্যাথরিনা বলেছেন, অর্থকষ্টের চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় দিনের প্রচণ্ড উন্মত্ত আচরণের পর তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। সে সময় ক্যাথরিনা ও তাঁর মায়ের দখলে এসে যায় তার ১৯টি ছবি। এর মধ্যে দুটো ছবি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয়।

‘ভারমিয়ারের মতো আর কেউ নেই’—জোনাথান রিচম্যানের এই গানটি সংগীত প্রেমিকদের কাছে একজন চিত্রশিল্পীকে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রান্সট্রোমারের কবিতাও ভারমিয়ারকে নতুন করে চিনিয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566115170809.jpg

◤ গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট ◢


কয়েকটি সেরা ছবি : ডিউ ফ্রম ডেলফ্ট, দ্য ক্যাপটিভ, গার্ল উইথ অ্যা ইয়ার রিং, গার্ল ইন অ্যান্টিক কস্টিউম, গার্ল উইথ অ্যা রেড হ্যাট, দ্য গিটার প্লেয়ার, ওমেন রিডিং, অ্যা লেটার, ডায়ানা অ্যান্ড হার নিম্ফস, ইয়াং ওমেন উইথ অ্যা পিচার, দ্য লাভ লেটার, দ্য মিল্কমেইড।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র