Barta24

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের সুশি বার

সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের সুশি বার
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

ইস্পাতের চকচকে ট্রলিতে ক্যারিঅন লাগেজের ভারী ব্যাকপ্যাক ও ব্রিফকেস চাপিয়ে উঠে আসি সানফ্রানসিসকো শহরের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ডিপারচার লাউঞ্জে। একটু আগে ওয়াশিংটন ডিসি’র ড্যালাস থেকে এখানে উড়ে এসেছি। লাউঞ্জে সিংগাপুর এয়ার লাইন্সের কাউন্টার বন্ধ, খুলবে তা রাত ন’টার পর। আমার ফ্লাইট বারোটা পাঁচ মিনিটে। সানফ্রানসিসকো এয়ারপোর্টের ট্রানজিটে ঘণ্টা পাঁচেক কাটানোর কথা ভেবে হাই তুলতে তুলতে প্রসারিত ছাদের দিকে তাকাই। কাচের স্বচ্ছ কাঠামো ভেদ করে রুপালি ইস্পাতে তৈরি বিশাল এক মাছের প্রতীক সূর্যের অস্তরাগে ঝলসাচ্ছে রঙধনুর আভায়। অনেকক্ষণ একাকী বসে থাকা—তারপর এক নাগাড়ে ঘণ্টা ষোলো সিংগাপুর অব্দি উড়ে যাওয়ার কথা ভেবে আমার ভেতরে উৎসাহের আলো মরে যেতে থাকে সূর্যাস্তের ম্রিয়মাণ আভায়।

আজ খুব ভোরে মেক্সিকো সিটি থেকে বিমানে চেপেছি। ড্যালাসের ট্রানজিটেও খামোকা বসেছিলাম ঘণ্টাকয়েক। আমেরিকান এয়ার লাইন্সগুলো হালফিল আর যাত্রীদের খাবার দাবার কিছু সরবরাহ করে না। ড্যালাসেও মাইক্রোওয়েভ অভেনে গরম করা পিৎসা ভিন্ন বিশেষ কিছু জোটেনি। খানিক স্ন্যাক্সের সাথে একটু কফি পেলে ভালো হয়। একটি রেস্তোরাঁর তল্লাশে ট্রলি চালাতে গিয়ে দেখি, কাচের বিশাল সব কাসকেটে ডিসপ্লে করা হচ্ছে তালেভেরা নামক মেক্সিকোর সিরামিকে তৈরি তৈজসপত্র। এসব বাসন কোসন, ফুলদানী আর সোপ-ডিশ প্রভৃতি তৈরি হয় মেক্সিকোর পুয়েব্লা শহরে। ওখানে আমি বার দুয়েক গিয়েছিও। স্থানীয় আর্টিসানরা এসব পণ্য ফুটপাতে সাজিয়ে বসে থাকে পর্যটকদের অপেক্ষায়। একটু অবাক লাগে পুয়েব্লাতে যা ফুটপাতের পণ্য—সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তা পরিণত হয়েছে প্রদর্শনযোগ্য শিল্প সামগ্রীতে। আমি মেক্সিকো একেবারে ছেড়ে এসেছি, আর হয়তো কখনো পুয়েব্লাতে যাওয়া হবে না ভেবে শূন্য লাগে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890364000.jpg
তালেভেরা সিরামিকের ডিসপ্লে

তালেভেরার বাসন কোসনের প্রদর্শনী পেরিয়ে আসতেই ফুডকোর্ট। স্টেইক্ হাউস, চীনা খাবার, হ্যামবার্গার ও ফ্রেঞ্চ-ফ্রাইয়ের ছবি সাঁটা পানশালা পেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ে, জাপানি কেতার একটি সুশি বার। কালচে ধূসর পাথরে তৈরি তার নির্জন কাউন্টার। ছাদ থেকে ঝুলছে রুপালিতে কমলালেবু রঙের ছোপ দেওয়া দুটি তাজা মাছ। এদিকে কেউ নেই, তবে অন্যদিকের আরেকটি কাউন্টারে রাখা সতেজ ফুলের ইকেবানায় সাজানো উজ্জ্বল পরিবেশ। এদিকে খদ্দেরদের বেশ ভিড়। সবগুলো টেবিলেই খাবার নিয়ে বসে আছে কেউ না কেউ। ইকেবানার ওপাশে কিমানো পরা একটি মেয়ে সিরামিকের ছোট্ট ছোট্ট ডিশে সয়ি সচ্ ঢেলে তাদের পাশে পাশে রাখছে বাঁশপাতার ছবি আঁকা চপস্টিক। আমি দাঁড়াতেই সে যেন দেবতাকে পূজার নৈবেদ্য দিচ্ছে, এরকম নিবেদিত ভঙ্গিতে আমার হাতে তুলে দেয় খাবারের মেনু। আমি কিছুক্ষণ তা খুঁটিয়ে দেখে, তাজা টুনা মাছ কিংবা কাঁচা স্যামন মাছের বিষয়টি এভয়েড করে অর্ডার দিই নিগিরি জুশি বলে এক ধরনের ভাঁপে রান্না করা সুশি।

বসার জন্য টেবিল খুঁজে পেতে একটু সমস্যা হয়। চোখ মিরমির করা মলিন চেহারার এক আধবুড়ো আমেরিকান সাহেব বসে আছেন বড়সড় এক গোলটেবিল ঘিরে—ঘোড়ার নালের মতো দেখতে চামড়ায় মোড়া বেঞ্চে। তার পাশে বসে বছর তিন চারেকের একটি জাপানি শিশু স্যুপ-বউল থেকে চপস্টিকে খুঁটে খাচ্ছে স্প্রাউট বা শিম-বিচির তাজা আংকুর। সাহেব হাতের ইশারায় আমাকে তাদের টেবিলে বসতে বলেন। ছোট মেয়েটি নড়েচড়ে ফিক করে হেসে আমার দিকে ড্রাগনের পাপেট ঠেলে দিলে ন্যাপকিনে ছলকে পড়ে কিছু স্যুপ। মেয়েটিকে জাপানি স্যুপ কিনে দিয়ে পাশে বসে সাহেব কেন জানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যামবার্গারে কামড় দেন। চেহারা সুরত দেখে মনে হয় ভদ্রলোক আর্থিকভাবে দরিদ্র। হয়তো কোনো রোগশোকেও ভুগছেন। তার ফ্যাকাশে চোখেমুখে ছাইবর্ণের অস্বাস্থ্যকর আভা। আর মিরমিরে চোখের পাতার উপর বেশ কটি হলুদাভ ছোট ছোট গোটা। তিনি স্ফোটকগুলো কাঁপিয়ে আমার দিকে চেয়ে বেজায় ম্লান হয়ে হাসেন। জাপানি বাচ্চাটিকে তবে কি তিনি দত্তক নিয়েছেন—এ কথা ভাবতে ভাবতে আমি ড্রাগনের পাপেটে হাত দিতেই, মেয়েটি তা ঝপ করে সরিয়ে নিয়ে তাকে কানে কানে, ‘লিসেন ড্যাডি, আই অ্যাম ফুল। ইউ ইট দ্যা স্যুপ’, বলে খাবলা দিয়ে তুলে নেয় তার পাত থেকে কয়েকটি ফ্রেঞ্চ-ফ্রাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890653954.jpg
সুশি বারের নির্জন কাউন্টার

সুশি বারটি তাজা মাছের টুকরা, সামুদ্রিক গুল্ম ও ফুলপাতা, পাথর ছড়ানো ইকেবানা এবং সিরামিকের তৈজসপত্রে এমনভাবে সাজানো যে, তাকে দেবতাকে উপাচার দেওয়া পূজাপাঠের বেদির মতো তকতকে পবিত্র মনে হয়। একদিকে সিরামিকের বিশাল খুঞ্চাতে সিফুডের উপাচার সাজাতে সাজাতে কিমানো পরা তরুণীটি আড়চোখে আমাকে দেখে। জাপানি বাচ্চা মেয়েটি কী কারণে খিলখিল করে হেসে টেবিল নাড়িয়ে আবার কিছু স্যুপ ছলকে দিয়ে ছুটে যায় সুশি বারের দিকে। চোখ মিরমিরিয়ে সাহেব উঠে তার পেছন পেছন ছোটেন। কাউন্টারের কাছে পিলার ঘিরে খানিক লুকোচুরি খেলতে খেলতে বাচ্চাটি ট্রে হাতে কিমানো পরা ওয়েট্রস মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যায় লাউঞ্জের অন্যদিকে।

টেবিলের উপর আমার জন্য আনা নিগিরি জুশি নামের ওসাবি সচের সাথে আঁটালো ভাতের ভেতর শশার টুকরা ও খোসা ছড়ানো চিংড়ি মাছ দেওয়া সুশির চিত্রিত ট্রে রাখতে রাখতে মেয়েটি যেন স্বপ্নের ঘোরে আমার দিকে তাকায়। আমি ধন্যবাদ দিতে গেলে সে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় ‘সুশি এটিকেট’ লেখা একখানা কাগজ। কাগজখানা পড়ে কিভাবে সুশি খেতে হয় সে বিষয়ে বেশ খানিকটা অবগত হই। চপস্টিক দিয়ে এক খণ্ড সুশি তুলে নিয়ে সয়ি সচে ডিপ্ দিয়ে তা চিবিয়ে মুখে পুরি জিনজারের পাতলা পরত।

কাঁপতে কাঁপতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ফিরে আসেন মলিন চেহারার সাহেব। না, তিনি বাচ্চা মেয়েটিকে ক্যাচ্ করতে পারেন নি। তা, সে গেল কোথায়? তার সন্ধানে আমিও এদিক ওদিক তাকাই। ক্লান্ত সাহেব স্ট্রো দিয়ে একটু কোক্ খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বাচ্চা-কাচ্চা লালন পালন করতে হয় কম বয়সে। আই অ্যাম এপ্রোচিং সিক্সটি সেভেন। এই বয়সে আর ছোটাছুটি ভালো লাগে না।’ আমি তাকে ‘ডোন্ট ওয়ারি’, বলে আশ্বস্ত করে বাচ্চাটির খোঁজে এবার উঠে পড়ি। তাকে পাওয়া যায় তালেবেরা সিরামিকের বাসন কোসনের ডিসপ্লে কাউন্টারের পেছনে। কিন্তু সে আমার সাথে আসবে না। আমি ফিরে এসে সাহেবকে তার সুলুক সন্ধান দিলে—তিনি উঠতে উঠতে যেন জনান্তিকে বলেন, ‘হোয়েন আই ওয়াজ ইয়াং, আমার যা চেহারা-সুরত তাতে বাচ্চা দূরে থাক ফিমেল পার্টনারই জুটাতে পারলাম না.. ..আর এ বয়সে এডাপ্ট করেও হয়েছে মুশকিল, আই ডোন্ট নো হাউ টু রেইজ দিস হাইপার এক্টিভ গার্ল।’

জাপানি বাচ্চাটির সন্ধানে গিয়ে সাহেব আর ফিরে আসেন না। ওয়েট্রেস তরুণীটি এসে টেবিল পরিস্কার করে। তার কব্জিতে জড়ানো জপমালা। আমি মনে মনে অপেক্ষা করি, কিন্তু সে এবার ফিরেও তাকায় না। তার গলায় ঝুলছে সামুদ্রিক কোনো মাছের দাঁতে তৈরি লকেট। ন্যাপকিন দিয়ে টেবিল মুছতে গেলে আমি তাতে এনগ্রেইব করে আঁকা পদ্মাসনরত বুদ্ধের মুখ দেখতে পাই। তার ঠোঁট নড়ে—মনে হয় সে বুঝি জপছে ত্রিপিটকের কোনো সূত্র।

আমাকে আরো অনেক সময় কাটাতে হবে। কিন্তু সুশি বার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা হয় না। সে বছর খানেক আগে—প্রথম যে বার মেক্সিকোর পুয়েব্লা শহরে যাই, সে কথা মনে পড়ে। ফুটপাতে আর্টিসানরা তালেভেরার বর্ণাঢ্য সব সিরামিকের বাসন কোসন নিয়ে বসেছেন। এক আর্টিসানের কাছ থেকে শুনি যে—তাদের পূর্বপুরুষ ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেনের তালেভেরা বলে এক স্থান থেকে এসে এ শহরে বসতি শুরু করেন। সে থেকে তারা মাটি পুড়িয়ে সিরামিকের শিল্পদ্রব্য তৈরি করছেন। কথা বলতে বলতে পিঞ্জিরা থেকে বেরিয়ে একটি পাখি উড়ে এসে আমার বাহুতে বসেছিল। তাতে ফুটপাতের আর্টিসানরা সকলে হেসে উঠেছিল জোরেসোরে। তখনও স্প্যানিশ ভাষা আমার সড়গড় হয়ে আসেনি। ঠিক বুঝতে পারিনি—খেচরের এ আচরণের কোনো প্রতীকী তাৎপর্য আছে কি না। তালেভেরার একটি চিত্রিত ওয়াল প্লেট কিনেছিলাম। কাকে দেবো, কার কথা ভেবে কিনেছিলাম, এখন আর ঠিক মনেও পড়ে না।

সুশি এটিকেট লেখা কাগজটি এবার মনোযোগ দিয়ে পড়ি। জাপানি কিছু প্রতিশব্দের ধ্বনি আমার ভালো লাগে। জাপানে যাওয়ার আমার কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশটি অত্যন্ত এক্সপেনসিভ, ওখানে পর্যটন আমার সাধ্যেও কুলাবে বলে মনে হয় না। তারপরও কিছু শব্দ যেমন জাপানি ভাষায় জিনজারকে বলা হয় ‘গারি’, চিংড়ি মাছকে ‘এবি’, আর ভাতকে বলা হয় ‘গহান’ ইত্যাদি নোটবুকে টুকে রাখি। কিমানো পরা ওয়েট্রেস কী কারণে যেন কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে ছাদের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে জপমালা টিপে। আমি তার কাছে গিয়ে ‘আগারি’ বা এক পেয়ালা গ্রিনটি চাইলে—আমি যে সবুজ চায়ের জাপানি প্রতিশব্দ ব্যবহার করছি, তাতে সে অবাক হয় না এক বিন্দু। আমার দিকে—যেন মন্দিরে পূরাকালের কষ্টিপাথরে তৈনি কোনো মূর্তি দেখছে—এমন এক নির্মোহ দৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে চলে যায় চা করতে।

পোড়ামাটির টি-পট থেকে আমি নিসর্গ আঁকা বাটিতে সবুজ চা ঢালি। প্রজাপতির মতো শেইপ দেওয়া মস্ত একটি উড্ডীন বেলুনের পেছন পেছন জোরেশোরে কথাবার্তায় হাসিঠাট্টায় হই হই করে স্টেইক্ হাউসের দিক থেকে সুশি বারে এসে উপস্থিত হয় আস্ত একটি পারিবার। তাদের সামনে গাব্দাগোব্দা গোছের একটি কিশোরী সুতোয় টেনে টেনে প্রজাপতিকে নিয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। আর হুইলচেয়ারে বসা—বোধ করি তার বোন, বয়সে এক বছরের ছোট কিংবা বড় হবে; খুব মায়া মাখানো মুখের এ মেয়েটি হুইলচেয়ার চালিয়ে এঁকেবেঁকে স্পর্শ করতে চাচ্ছে বাটারফ্লাই শেপের বেলুনটি। হুইলচেয়ার মৃদু ধাক্কায় গার্বেজের ট্র্যাশবিন একদিকে হেলিয়ে দিলে সারা পরিবার হেসে ওঠে রইরই করে। তার পিতা—থুতনিতে সজারুর কাঁটার মতো কিছু দড়ো দাড়ি, কুংফু পালোয়ানের বিক্রমে ট্র্যাশবিনের ঘেঁটি ধরে তা বসিয়ে দেন ঠিক জায়গায়। গাব্দাগোব্দা কিশোরীটি খুবই দুষ্টু, সে বড়শি লাগা মাছকে খেলানোর মতো করে প্রজাপতিকে টেনে খেলাচ্ছে। হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটিও ছাড়বে না। যান্ত্রিক চেয়ারটি এঁকেবেঁকে গেলে, তার পরনের উজ্জ্বল বর্ণের স্কার্টে তার শরীরের রেখা ব্লার হয়ে আমার চোখে যেন ভিজ্যুয়েল ইল্যুশন সৃষ্টি করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890792320.JPG
সিরামিকের ডিশে সি-ফুড

নরোম সরোম চেহারার মা এ পরিবারের আরো দুটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে পাশের টেবিলে বসে তাদের চুল আঁচড়িয়ে ক্লিপ ও রিবন পরিয়ে দিচ্ছেন। তুলনামূলকভাবে শান্ত স্বভাবের মেয়ে দুটিকে চেহারাসুরতে যমজ মনে হয়। বাবা সুশি বার থেকে গ্রিলড্ ফিস্, সুশি, মিসো স্যুপ, সিউইড ও সেসমি সিড দেওয়া ভাত ইত্যাদি মিলিয়ে প্রচুর পরিমাণে খাবার নিয়ে টেবিলে আসেন। এদের চেহারা স্পষ্টত মঙ্গোলিয়ান। কিন্তু পিতামাতার কালো গাত্রবর্ণের জন্য ঠিক জাপানি বলেও মনে হয় না। তারা খেতে খেতে যে ভাষায় কথা বলছে, তার এক বর্ণও আমি বুঝতে পারি না; তাই ভাবি—তবে কি এ পরিবার কোরিয়ান? খেতে খেতে থেকে থেকে তারা কী কারণে যেন হেসে হইচই করে ওঠে।

আমি সবুজ চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাদের অবজার্ভ করি। বাবা-মা ও বড় মেয়েটির গাত্র বর্ণ কালো হলেও যমজ দুটি ও হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটির শরীর থেকে যেন গোলাপি বর্ণের দ্যুতি ছড়ায়। তবে কি এদের এ পরিবারে দত্তক নেওয়া হয়েছে?  হুইলচেয়ারটি খুবই দামী ও ভারী। সুতরাং আন্দাজ করি—বালিকাটির শরীরিক অক্ষমতা পার্মানেন্ট। সে এখন টেবিলে ম্যাগনেটিক দাবার সেট পেতে তার কিশোরী বোনের সাথে খেলতে খেলতে চপস্টিকে তুলে সুশি খাচ্ছে। যমজ দুটি খাবার দাবারে মোটেই নজর দিচ্ছে না। তারা পরস্পরের হাতে হাতে তালি বাজিয়ে বোধ করি ছড়া কাটছে। আর বাতাসে আওয়ারা ভেসে ভেসে বেলুনের প্রজাপতিটি দেখছে গোলাপি-কালো বর্ণের পরিবারের আনন্দ উচ্ছল পারস্পরিক ইন্টারেকশন।

দাবার গুটি চালতে গিয়ে হুইলচেয়ারে বসা মেয়েটি বোধ করি তার বোনকে মাত করে দিয়ে খিলখিল করে আমার দিকে মুখ ফেরালে, আমি দেখি তার মুখখানা বেজায় বাঁকানো। তবে কি তার স্ট্রোক হয়ে লুপ্ত হয়েছে শরীরের চলৎশক্তি? তার বোন তার দিকে কপট ক্রোধে তেড়ে আসলে, সে তড়িৎ গতিতে হুইল চেয়ার চালিয়ে পিছিয়ে যায়। তখন আমি বুঝতে পারি, তার সমস্ত শরীর আধখানা হয়ে বেঁকে আছে। হাসতে হাসতে হুইলচেয়ারের আরেকটি ধাক্কায় সে ফিরে যায় দাবার বোর্ডে। তাতে তার শরীরের রেখা আবারও আমার চোখে ব্লার হয়ে আসে। চকিতে পিকাসোর আঁকা কিউবিস্ট ছাদের একটি পোর্ট্রেটের কথা মনে পড়ে—যেখানে মুখচ্ছবি বাঁকা হয়ে ভেঙে যেন হয়ে গেছে দুটি মুখচ্ছবি।

আমি আরো কয়েকটি জাপানি প্রতিশব্দ নোটবুকে টুকি। কিমানো পরা ওয়েট্রেসটি গেল কোথায়? কিছুক্ষণের জন্য সুশি বারের কাউন্টারে কাউকে দেখা যায় না। একটু পর হামানদিস্তায় কিছু কুটতে কুটতে কাউন্টারে এসে দাঁড়ায় আরেকটি মেয়ে। তার কানে গাঁথা আইপডের মাইক্রোফোন জাতীয় সাদা বোতাম। সে কিছু শুনতে শুনতে একা একা হাসে। তার টপের বৃত্তাকার স্ফীতিতে আঁকা নিসর্গের খণ্ড চিত্রটি অবিকল সবুজ চায়ের বাটির ছবির মতো। সে মৃদু হাসতে হাসতে রাইসক্রেকার চিবায়। ঘটাৎকচের মতো স্থূলকায় মাথা মুড়ানো এপ্রোন পরা শেফ এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত নাড়িয়ে খুব এনিমেটেড্ হয়ে কিছু বলে। আমি দূর থেকে তার বচন কিছু শুনি না। কিন্তু তার হাতের নড়াচড়ায় মনে হয় সে সমুদ্রে হারপুন দিয়ে তিমি মাছ শিকারের দৃশ্য আঁকছে। মেয়েটি কান থেকে আইপডের মাইক্রোফোন খুলে নিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলে, শেফ এপ্রোনে হাত মুছে তার খোঁপা থেকে খুলে নেয় একটি চপস্টিক। তাতে ঘাড় অব্দি নেমে আসে কালোচুলের রাশ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/10/1533890875108.JPG
ডিশে সাজানো সুশি

ডার্কস্যুটে আস্তিনে রুপালি কাফলিং পরা ধুপদুরূস্থ এক জাপানি জেন্টোলম্যান এসে কাউন্টারের কাছে দাঁড়ান। তার পেছনে ওয়াকারে ভর দিয়ে থুরথুরিয়ে কাঁপছেন খুব বৃদ্ধ এক মহিলা। তারা একটু পর সুশি ও স্যুপের ট্রে নিয়ে বসার জন্য চারদিকে তাকিয়ে টেবিল খোঁজেন। আমার টেবিলে বিস্তর খালি জায়গা। তাই আমি তাদের এখানে এসে বসতে আহ্বান জানাই।

বৃদ্ধার দাঁত বলতে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। স্যুপের দিকে তাকিয়ে তার হাত ও মুখের পেশী কেবলই কাঁপে। সঙ্গী তার ছেলে মহিলার গলায় বিভ জাতীয় বড়সড় রুমাল বেঁধে দিয়ে মাকে চামচ দিয়ে স্যুপ খাওয়ান। তাদের সাথে টুকটাক কথাবার্তাও হয়। জাপানি কোনো কর্পোরেটের কর্তা ছেলে মাকে নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে এসেছিলেন চেরী ফুলের শোভা দেখাতে। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পর জাপানের সম্রাট যুক্তরাষ্ট্রে উপহার হিসাবে পাঠান অনেকগুলো চেরী ফুলের চারা। চারাগুলো লাগানো হয় ওয়াশিংটন ডিসির একটি সরোবরের চারপাশে। বৃদ্ধার বাবা জাপ সম্রাটের নার্সারিতে চারাগুলোর যত্ন নিতেন। তিনি স্বয়ং ওয়াশিংটনে এসেছিলেন গাছগুলো লাগিয়ে দেয়ার জন্য। সে ছোটবেলা থেকে মহিলার ইচ্ছা একবার ওয়াশিংটন আসেন, তার বাবার লাগানো চেরী ফুলের গোলাপি সজ্জা দেখতে। কিন্তু জীবন যাপনের নানা ধান্দায় সে অবকাশ আর হয়ে ওঠেনি এতদিন। এখন তো বৃদ্ধা জীবনের প্রান্তিকে এসে পৌঁছেছেন, তাই ছেলে মাকে নিয়ে এসেছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে চেরী ফুলে ঘেরা সরোবর দেখাতে।

মাইক্রোফোনে একটি ঘোষণা শুনে আমি চমকে উঠি। ভালো করে দ্বিতীয়বার আমার নাম শুনে আমি জাপ মা-পুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়ি। মাইক্রোফোনে এবার স্প্যানিশ ভাষায় বলা হচ্ছে—আমার জন্য একটি জরুরি ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে সিংগাপুর এয়ালাইন্সের কাউন্টারে। একটু নার্ভসনেসের সাথে আমি ওই দিকে দ্রুত হাঁটি।

আপনার মতামত লিখুন :

সবিনয়ে গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি

সবিনয়ে  গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

যে বাতাস চেনে তোমার কার্বনশ্বাস

তোমার অমর্জিতে নামা সন্ধ্যারে পাশ কাটায়ে
আলিসার কোনায় গিয়া বসো
—ভর করা বাতাসে হেলান দিয়া।
করুণার মতো কইরা তাকাও
তবু যে পাখি ঘরে ফিরতাছে না ঠিক সময়ে—তার দিকে,
যেন কোনো নিদান নাই,
কোনো সময় তৈয়ার হয় নাই তখনও
অসময়ের ভেতর-বাহিরে,
এমন তো হরহামেশাই ঘটে বইলা চোখ ফিরাও নাই অ-দৃশ্যের থিকা,
যেন তারা থাকে এইসব দৃশ্যাবলিরে জড়ায়ে।
তুমি তবু অহেতুক পাখির মন ভাবো নিজেরে নিদারুণ নির্জনে।

কেমন কষ্ট!

এমন অনেক কিছু নিয়াই চলি প্রতিদিন, চলতে হয় তাই।
চাবি, মোবাইল, মানিব্যাগ, খুচরা কয়েন, গত মাসে ব্যাংকে ১০ ডলার জমা দেয়ার রসিদ,
ব্যবহৃত ডাকটিকেট, দেশলাই, সিগারেট, মেট্রোকার্ড,
চুইংগামের খোসা, বাজারের-ফর্দসহ বিবিধ আপঝাপ জিনিস থাকে হাতে পকেটে।
তার মাঝে যেইটা নিয়া চলতে সবচেয়ে কষ্ট হয় “তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট”
ওগো মা আমার—মাতৃভূমি—
তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট
এক পৃথিবীতে যত মানুষ থাকে তত পৃথিবী সমান।

অসুখ

এইসব নিয়া বইসা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হইলে
নদীটা ডুবতে থাকে,
যেন—অনেক উঁচা থাইকা পালক খইসা পড়ে হেইলা দুইলা,
—যেন আলগোছে কেউ রাখল ঢেউ সিথানে, তেমন একটা পাতা
গন্ধকের মতো রটে
আলোকে সালোকে সংশ্লেষণে—
অথচ একটা সুর মরতে গেলে
পাখির দায় নিয়া ঘুমাইতে চায় সহজ উদ্ভিদ,
পাখনার পাশে মেলে ধরে—
পিঠে পিঠ বেয়ে উঠা জরাক্লান্ত স্বেদ, বাতাসের কনিকা,
একটা সবুজ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি চারা গাছের কংকাল,
আমাদের হীমবাহিত জলজ অসুখেরা
এবং
সবিনয়ে
গাছ নুয়ে
আসার স্মৃতি।

ঘনঘোর

মিল্কিওয়ে যখন তার একান্ত সূর্যদের নিয়া পৃথিবী সমেত পার হইতাছিল ছায়াপথ—
আমি তখন আরো ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন পৃথিবী হইতে
পৃথক কোনো উপগ্রহের ছায়ায় নিজেরে আরো একটু সরায়ে নিয়া তাকাইলাম—
দেখি দূর আরো দূর কোনো মহাকাশ স্টেশন,
যেখানে আমার যাইতে হবে,
যেন সেই স্টেশন ওত পাইতা থাকবে পৃথিবী—মিল্কিওয়ে যাওয়ার পথে।
সেই স্টেশনে থামলে পরে আমি উঠব পৃথিবীতে,
যেন ভ্রমণ করার ছলে দেইখা যাব আমার বিগত পৃথিবী,
যেখানে আমি ছিলাম, নাকি ছিলাম না?
কোনো কালে কি সেখানে থাকতে যাব আমি?
যাই হোক, এমন ভাবনা আমি ভাবতেই পারি কী ছিলাম কী ছিলাম না,
তাতে সেই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে থাইকা যাওয়ার বাসনা ঘোরে রূপ নিতে থাকলে—
আমি নাইমা আসব, স্টেশনে, যেন আমি স্টেশনের, যেন আমিই স্টেশন।
যেন একটা স্টেশন অপেক্ষা করে স্টেশনে অন্য একটা স্টেশনের।
আসলে আমরা সবাই এক একটা স্টেশনের অপেক্ষায় আছি।
পৃথিবী হইল সেই সব স্টেশনে যাইবার এক্সপ্রেস ট্রেইন,
বাসনার ঘোরে নাইমা গেলে অপেক্ষা অনন্তের।

আবাল প্রজা

এখন দেখো ভীষণ রৌদ্র, জ্বলো
এখন আষাঢ় ভাদ্র কিংবা ফাগুন
তোমার বুকে জ্বলছে করুণ আগুন
বাতাসে কি দারুণ ঘূর্ণি ধুলো।

এখন প্রজার নেইকো কিছু বলার
এখন প্রজা মুখ বুজে সব সয়
রাজ্যে এখন কম্পিউটিক শান্তি
বললে রাজা হাসতে সবার হয়।

রাজা বললে দিনটি হবে রাত
বললে সে তো তালগাছটিও তোমার
কিন্তু বেটার বুদ্ধি ভর্তি জামার
সেলাই করে প্রজার কঠিন হাত।

সেই হাতে নেই শাবল গাইতি কোনো
সেই হাত আজ করছে মালিশ তেল
আমরা সবাই মাতাল রকম ন্যাড়া
মাথার উপর ঝুলছে পাকা বেল।

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র