Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

নাইপল : অর্জন করেছেন যিনি নাইটহুড, নোবেল প্রাইজ ও দুশমনি

নাইপল : অর্জন করেছেন যিনি নাইটহুড, নোবেল প্রাইজ ও দুশমনি
আলফ্রেড কনোফ


  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষান্তর মঈনুস সুলতান

লেখক পরিচিতি বিদ্যাধর সূর্যপ্রাসাদ নাইপলের জন্ম ১৯৩২ সালে ক্যারিবিয়ানের ত্রিনিদাদ নামক একটি দেশের চাগুয়ানাস বলে অখ্যাত এক শহরে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত দুনিয়া জোড়া সুনামধন্য এ লেখকের পিতামহ উত্তর প্রদেশের গোরখপুর থেকে শ্রমিক হিসাবে ত্রিনিদাদে অভিবাসি হন। অনেকগুলো সফল উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ ইত্যাদি ছাড়াও নাইপল একাধিক ভ্রমণ কাহিনীর রচয়িতা। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে তিনি তৃতীয় বিশ্বের যে বসবাস-অনুপযোগী চালচিত্র এঁকেছেন তা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তাঁর কিছু লেখায় ইসলাম ধর্মকেও উপস্থাপন করেছেন নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর ‘হিন্দুত্ববাদ’ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন, এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে ‘ক্রিয়েটিভ প্যাসন’ বা সৃজনশীল আবেগ বলে অভিহিত করে তিনি অত্যন্ত বিতর্কিত হন।

যদিও নাইপল বেশ কয়েকবার ভারতে ফিরে এসে গোরখপুরের কাছাকাছি তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটা সনাক্ত করতে চেষ্টা করেন—তারপরও তাঁর ভারতকে নিয়ে লেখা গ্রন্থ, ‘এন এরিয়া অব্ ডার্কনেস্’ তার পিতৃপুরুষের স্বদেশ সম্পর্কে বিষোদগারে পূর্ণ।

ব্যক্তিগত জীবনে একসময় নাইপল প্যাটরিসিয়া হেইল বলে এক ইংরেজ শিক্ষয়িত্রীর সাথে ৪১ বৎসর বিবাহিত ছিলেন। এ মহিলার সাথে বিবাহিত থাকাবস্থায় নাইপল মার্গারেট মারি বলে বিবাহিতা আরেক এ্যংলো-আর্জেন্টিনিয়ান নারীর সাথে ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। নাইপল তাঁর বইগুলো রচনার জন্য তাঁর স্ত্রী প্যাটরিসিয়া হেইলের সক্রিয় সহায়তার ওপর ছিলেন নির্ভরশীল। তবে প্রায়শ তিনি মার্গারেট মারির প্রতি তাঁর ভালোবাসার উল্লেখ করে, এমনকি রূপজীবীদের প্রতি তার যৌন মিলনের কথা বাগাড়ম্বর করে বলে বেড়িয়ে প্যাটরিশিয়াকে মানসিকভাবে পীড়া দিতে পছন্দ করতেন। ব্রেস্ট ক্যানসারে প্যাটরিসিয়া হেইলের মৃত্যুর দু’মাস পর নাইপল দু’বার তালাকপ্রাপ্ত পাকিস্তানী সাংবাদিক নাদিরা খানুম আলভীকে বিবাহ করেন। ২০১৮ সালের ১২ অগাস্ট, লন্ডনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (অনুবাদক)

১৯৯৮ সালে পল থেরেক্স ‘স্যার ভিবিয়া’স্ শ্যোডো’ বলে ত্রিনিদাদে জন্ম গ্রহণকারী লেখক ভি, এস নাইপলকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনের বন্ধুত্বের সূত্রে একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। নাইপলের চরিত্রে মজ্জাগত বর্ণবাদ, অহমিকা ও কিপ্টেমি এবং তাঁর প্রথমা স্ত্রীর প্রতি নির্মমতা প্রভৃতি রকমারি বিষয়ের উন্মোচনের কারণে সমঝদার মহলে এ বইটির আইসকিউব দেওয়া সাবধানে মিশ্রিত ককটেল বলে পরিচিতি রয়েছে। এ গ্রন্থ প্রকাশের পাক্কা এক দশক পর বাজারে আসলো প্যাটরিক ফেঞ্চের ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড এ্যাজ ইট্ ইজ্’ নামক নাইপলের জীবনীগ্রন্থ। খোদ নাইপলের অনুমোদিত এ জীবনী গ্রন্থের সুদর্শন ভলিয়মটির জ্যাকেট রুপালি ও কৃষ্ণ বর্ণে রঞ্জিত; যার মলাটে দন্তহীন নাইপল ফোকলা হাসিতে জুতার ফিতা বাঁধছেন। এ বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টালেই পাঠক মোকাবেলা করবেন—নাইপলের এক কালের জানি দুশমন থেরেক্স সাহেবের জবানী থেকে উদ্ধৃতি, ‘এ সব কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কিছু কি আমার জানতে বাকি আছে?’ এবং এ মন্তব্যের সাথে সাথেই শুরু হয় অনভিপ্রেত অর্গানের বাদ্য ঝংকার। পাঠক ভাবেন, ৫৫০ পৃষ্ঠার নুতন জীবনী গ্রন্থের কেচ্ছার কিসতি বেয়ে তারা সাবলীলভাবে পাড়ি দেবেন এ লেখকের সমাজ বিচ্ছিন্ন, কখনো কুৎসিত জীবন যাপনের প্রবাহমান দরিয়া। সুসংবাদ হচ্ছে যে, তরুণ ব্রিটিশ সাংবাদিক ফ্রেঞ্চ সাহেব তাঁর রচনায় উদ্দিষ্টের জীবনের কুৎসিত তথ্যসমূহ প্রকাশে মোটেই পিছপা হননি। কিন্তু আরো জাঁকালো খবর হচ্ছে—এ বইটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অত্যন্ত কৌতূহলী ৭৬ বৎসর বয়স্ক একজন নামজাদা জিন্দা লেখকের জীবন-তথ্য; অনেক দিন পর বাজারে এ ধরনের বই আসলো কিন্তু।

যেসব লেখক সচরাচর জীবনী রচনা করে থাকেন তাদের মধ্যে প্যাটরিক ফেঞ্চ সাহেবকে একজন বিরল প্রতিভা বলে মান্যগণ্য করা হয়ে থাকে। তাঁর নো-ননসেন্স টাইপের খাঁটি লেখক বলে পরিচিতি আছে। তাঁর বর্ণনা এ্যয়সা প্রাণবন্ত যে—এখানে নাইপলের সম্পাদক ফ্রান্সিস উইন্ডহাম সম্পর্কে তাঁর এবারতের একটি নজির পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। “লোক নন্দিত, নির্জনতাপ্রিয় ও বেয়াড়া স্বভাবের উইন্ডহাম বাস করেন তার জননীর সাথে। তার মা ভারী কাচের চশমা চোখে স্থূল পাছায় বিচিত্র বর্ণের—সম্ভবত ছালার টাটে তৈরি ট্রাউজার্স জড়িয়ে যখন থড়বড়িয়ে হাঁটেন, তখন মনে হয়, তার শরীর রূপান্তরিত হচ্ছে জল ও স্থল উভয় ভূভাগে বিচরণকারী বৃহৎ ব্যাঙে।”

এ গ্রন্থের অস্তিত্বের জন্য অবশ্যই নাইপলের তারিফ করতে হয়। ফেঞ্চ সাহেবের ভাষ্যানুযায়ী—নাইপল সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, ‘লিখতে হলে অতি অবশ্যই লেখা উচিৎ সত্যিকারের সৎ জীবনী।’ ‘এবং জীবদ্দশায় এ ধরনের খোলামেলা রাখঢাকহীন জীবনী প্রকাশের অনুমতি দিয়ে তিনি একই সাথে বিনয় ও নার্সিসাস প্রবণ আত্মপ্রেমের প্রর্দশনী করেছেন।’ ভি, এস নাইপল ফেঞ্চ সাহেবকে এ গ্রন্থ মুসাবিদা করার জন্য ব্যক্তিগত মোহাফেজখানা ব্যবহারের অধিকার দিয়েছেন। এমনকি তাঁকে পড়তে দিয়েছেন তাঁর পয়লা স্ত্রীর সংগ্রহ করা জার্নালগুলো—যা তিনি কখনো নিজেও পড়ে দেখেননি। এ বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হলে পর ভি, এস নাইপলকে সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পড়ে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়; তিনি কোনো প্রকারের অদল বদলের জন্য চাপ দেননি। এ বই লেখার আগেভাগেই ফ্রেঞ্চ সাহেব ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে—তিনি ছেলেখেলায় মাতেন নি। এ বইয়ের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় নানা রকমের আন্তর্জাতিক সব সামাজিক ইস্যুতে নাইপলের মতামতকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় তাঁর বরাত দিয়ে লিখেছেন যে, “আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ইসলাম ধর্ম হচ্ছে বিপর্যয়ের সামিল, ফরাসিরা জাতি হিসাবে ধাপ্পাবাজ এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিকরা বাদরের তূল্য।” সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের তারিফ করার পরিবর্তে নাইপল এ মতবাদকে সচরাচর তফাৎ যেতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর চেয়ে চেহারা-সুরতে কালো মানুষদের গাত্রবর্ণ নিয়ে ঠাট্টা মশকরাও করে থাকেন। এমনকি যেসব জাতি অতীতে উপনিবেশবাদীদের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছে, তিনি তাদের বর্তমানে ব্যর্থতার জন্য দোষারোপ করতেও পিছপা হন না। এসব বিষয়ে ফেঞ্চ সাহেবের মতামত হচ্ছে ‘একজন সফল অভিবাসি লেখক হিসাবে নাইপলের এ ধরনের মতামতকে অনেক পাঠকই বেঈমানী হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন।’

এসব তথ্য প্রকাশ করে সাথে সাথে ফেঞ্চ সাহেব কিন্তু পাঠককে নাইপলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ব্যাপক দৃষ্টিকোণ থেকে। অত্যন্ত জটিল এ ব্যক্তিত্ব ১৯৯০ সালে নাইটহুড খেতাবে ভূষিত হন। তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটে ২০০১ সালে। অসাধারণ কিছু গ্রন্থ রচনার সাথে সাথে এ একাকিত্ব বিলাসী জিনিয়াস, যৌনভাবে অসংযত, উস্কানীমূলক চরিত্রের অধিকারী, বিতর্কিত এ চিন্তাবিদ কিভাবে উপনিবেশবাদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল মতামতকে আঁকড়ে ধরে থাকেন, ফেঞ্চ সাহেব তারও খানিক হাদিস দলিল পাঠকের দরবারে হাজির করেন।

বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপলের জন্ম হয় ১৯৩২ সালে ত্রিনিদাদের অত্যন্ত দরিদ্র এক ভারতীয় পরিবারে। তিনি যখন ১৯৬১ সালে ‘অ্যা হাউস র্ফ মিঃ বিসওয়াস্’ লিখেন, তখন তাঁর অসহায় পিতা সাইনবোর্ডের সস্তা চিত্রকর—আধখিচড়ে সাংবাদিক মশাই ছিলেন তাঁর প্রেরণার উৎস। তবে পরবর্তী জীবনে তাঁর অত্যন্ত সপ্রতিভ জননী নাইপলের ‘উজ্জ্বল, নিশ্চিত, জবরদস্ত ও খানিকটা ঠাট্টা মশকরায় উচ্ছল’ সাহিত্য-স্বরকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। ১৮ বৎসর বয়সে বৃত্তি পেয়ে নাইপল অক্সফোর্ডের ইউনিভারসিটি কলেজে পাড়ি জমান। সে থেকে তিনি কিন্তু আজ অব্দি বাস করছেন বিলাতে। ১৯৫৭ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা মিস্টিক ম্যাসুর’ প্রকাশিত হয়। ফেঞ্চ সাহেবের ভাষায় “যেভাবে বাঘের বাচ্চা তার প্রথম শিকারকে নিয়ে আসে গুহায়—সেভাবে নাইপল তাবৎ রিভিউ ঘেঁটে প্রশংসাগুলোর সংক্ষিপ্তসার কপি করে পাঠান তার জননীর কাছে।” এ বইয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে নারীদের সাথে নাইপলের সহবৎ ও সুরত লীলার বৃত্তান্ত। তাঁর কিছু কিছু এবারত এ্যয়সা রগরগে যে, পড়তে পড়তে পাঠকের ইচ্ছা হয় হাত দিয়ে চোখের পাতা ঢাকতে। নজির স্বরূপ—প্যাটরিসিয়া হেইল বলে এক কালের এক তরুণী নায়িকার সাথে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি হাজির করা যেতে পারে। দৈহিক স্পর্শের উষ্ণতায় উত্তপ্ত যৌন সংযোগের পরপর নাইপল তাকে প্রস্তাব দেন। যদিও তাঁদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর, জটিল ও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু—তাঁরা আইনত বিবাহিত থাকেন ১৯৯৬ সাল অব্দি। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নাইপল প্যাটরিসিয়ার সমালোচনা করতেন নির্দয়ভাবে; এবং হর হামেশা পতিতাদের সান্নিধ্যে সময় কাটাতেন। এ সময় তিনি মার্গারেট মারি বলে এক যুবতীর সাথে দীর্ঘস্থায়ী দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। মাঝে মধ্যে মার্গারেটকে তিনি বেদমভাবে প্রহারও করতেন। মার্গারেট কখনো সখনো নাইপলকে আনন্দ দেওয়ার জন্য ডাকযোগে পাঠাতেন—“লেবু রঙের কাউবয় হ্যাট্ কিংবা নীল রোদ চশমা পরা উত্থিত শিশ্নের বিশাল সব ড্রয়িং।” নাইপল যখন তাঁর ভ্রমণকাহিনী সমূহের জন্য নানা দেশে গবেষণা করে বেড়ান; তখন অভিসার প্রবণ মার্গারেট প্রায়শ তাঁর সন্নিধ্যে আসতেন। তবে প্যাটরিসিয়া যেন ভেসে থাকতেন ছায়ামূর্তির মতো সমস্ত কিছুর আবডালে। নাইপল কখনো কিন্তু তাঁর কথা কোথাও ঘূণাক্ষরেও উল্লেখ করেননি। পরবর্তী জীবনে প্যাটরিসিয়া যখন ব্রেস্ট ক্যানসারে মৃত্যু পথযাত্রী, নাইপল ক্রোধান্বিত হন মহিলার দ্রুত মৃত্যু হচ্ছে না দেখে। ততদিনে তিনি যে তাঁর বর্তমানের স্ত্রী নাদিরাকে বিয়ে করার জন্য উস্কে আছেন।

নাইপল তাঁর মানসে ধারণ করেন তীব্র বর্ণবাদ; এবং তাঁর সাহিত্যিক সফলতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য লেখকদেরও এ মতবাদে উৎসাহিত করে। নাইপলের সাথে নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ক্যারিবিয়ান কবি ড্রেক ওয়ালকটের কাজিয়া বিবাদ ও দুশমনীর বিষয়টি ফেঞ্চ সাহেব সবিস্তারে বয়ান করেন। কৃষ্ণাঙ্গ কবি ওয়ালকট একবার সওয়াল করেছিলেন—নাইপল যে কালো গাত্রবর্ণের মানুষদের বিরুদ্ধে নোংরা সব বিষোদগার করে বহাল তবিয়তে ভাসছেন সুনামের জোয়ারে—তাঁর কি হিম্মত হবে ইহুদিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মন্তব্য করতে?

এ বইয়ের শেষ অধ্যায়গুলো নাইপলের বিচিত্র ব্যবহারের বর্ণনায় ভরপুর। পাঠক জানতে পারেন—তিনি কিভাবে একবার বিলাতের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে মার্গারেট থ্যাচারের সাথে ভোজসভায় প্রথাবিরুদ্ধ চক্রবক্রা পোশাকে হাজির হয়েছিলেন, অথবা অত্যন্ত উন্নাসিকভাবে পরিবেশিত খাদ্যদ্রব্য নাপছন্দ্ করে বিষিয়ে তুলেছিলেন বিলাতের প্রধান মন্ত্রীর দফতরের পরিবেশ।

‘মোদ্দা কথা হচ্ছে—একজন লেখককে কিন্তু তাঁর গ্রন্থে খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই, তিনি মূলত বেঁচে থাকেন তাঁর কিংবদন্তীতে।’ ভি, এস নাইপল তাঁর জটিল জীবনের কিংবদন্তী প্রকাশ করে অবশ্যই হিম্মতের পরিচয় দিয়েছেন। এ জীবনীগ্রন্থ একজন পাঠককে তাঁর রচিত চমৎকার সব বইগুলো সত্ত্বর পড়ে ফেলতে অনুপ্রাণিত করে। সাথে সাথে পাঠক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে—নাইপল তার প্রতিবেশী, বন্ধু বা বাড়িওয়ালা নন বলে। আর শেষ কথা হচ্ছে—অনেক কুৎসিত কদাকার চরিত্রের লোকও কিন্ত চমৎকার সব বই পুস্তক লিখে থাকতে পারেন। এ প্রসঙ্গে খোদ নাইপলের বক্তব্য হচ্ছে, ‘মানুষ আমাকে নিয়ে কী ভাবে—এসব ব্যাপারে আমি তেমন একটা পরোয়া করি না।’

* লেখাটি নিউইয়র্ক টাইমসের ১৮ নভেম্বর, ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র