ইবি শিক্ষকের কুশপুতুল দাহ করল ছাত্রলীগ



ইবি করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
শিবির উল্লেখ করে ইবি শিক্ষকের কুশপুতুল দাহ করেছে ছাত্রলীগ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

শিবির উল্লেখ করে ইবি শিক্ষকের কুশপুতুল দাহ করেছে ছাত্রলীগ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি, শিবির সংশ্লিষ্টতাসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ এনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের কুশপুতুল দাহ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা (একাংশ)।

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বরের পাশে এ কুশপুতুল দাহ করা হয়।

এর আগে, ‘শিবির মাহবুব’ নামের কুশপুতুলটি নিয়ে দলীয় টেন্ট থেকে মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডায়না চত্বরের তিন রাস্তার মোড়ে দাহ করে।

ছাত্রলীগের অভিযোগ, ড. মাহবুব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছাত্র থাকাকালীন ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন রাবি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ড. মাহবুবের শিবিরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দিয়েছেন।

তাদের দাবি, শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই তিনি ছাত্রলীগ বিরোধী হয়ে ওঠেন। এর ফলে তিনি ২০১৪ সালে পুলিশকে ছাত্রলীগের ওপর গুলি বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বাণিজ্যের মূলহোতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো প্রকারের নিয়োগ বাণিজ্যের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বরাবরের মতো আমি বলে আসছি, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের একটিও যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাব। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি সুতরাং আদালতই বিষয়টি মীমাংসা করবে।’

   

হাওরে বৃষ্টির পানিতে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন



উপজেলা করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে গত দুইদিনের বৃষ্টিতে কিছু জমিতে পানি জমেছে। ফলে কাটা ধানগুলি জমিতে স্তূপ করে রাখছে। এমনকি ধান মাড়াই করার জায়গায় পানি জমে থাকায় কাজ করা যাচ্ছে না। ধান শুকানোর পরিবর্তে সবাই এখন ধান কাটাতে বেশি মনোযোগী। কারণ বৃষ্টির পানি জমে আছে বিস্তীর্ণ মাঠে। এতে ম্লান হতে বসেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন।

সোমবার (৬ মে) সরজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন হাওরে কৃষকরা আগেভাগেই ভোর থেকেই ধান কাটার কাজ শুরু করেছেন। 

কৃষক আবুল কাশেম বলেন, আর একসপ্তাহ দিনটা ভালো থাকলে ফসল নিয়ে আসতে পারতাম। একদিন ধান কাটছি আরেকদিকে মাড়াই করছি৷ শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছি। গতকালের শিলাবৃষ্টি ভয় তৈরি করেছে। কারণ শিলাবৃষ্টিতে ধানের অনেক ক্ষতি হয়। 


কিশোরগঞ্জে রোববার (৬ মে) রাতে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। প্রায় পাঁচ মিনিট শিলাবৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। বৃষ্টির সঙ্গে ছিল তীব্র বাতাস। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে কখনো থেমে, কখনো অবিরাম বৃষ্টি হয়েছে রাত তিনটা পর্যন্ত। বৃষ্টিতে স্বস্তি এলেও দুশ্চিন্তা বেড়েছে কৃষকদের। শিলাবৃষ্টিতে শেষ মুহূর্তে ধানের ক্ষতি হলে বড় বিপর্যয় ঘটবে কৃষকদের।

এছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বৃষ্টি পড়েছে। স্বস্তির বৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে প্রশান্তি নেমে এসেছে। জেলা সদর ও আশপাশের উপজেলায় শুরু হয় ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। থেমে থেমে কয়েকদফা বৃষ্টিতে নেমে আসে স্বস্তি।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি বছর জেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যার মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর আবাদ হয়েছে হাওরে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৫ টন ধান। যা বিক্রি হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কিছু দিনের মধ্যেই বাকি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা।


কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুস সাত্তার বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘উঁচু-নিচু জমি হাওরের একটা বড় সমস্যা। অতি বৃষ্টি হলে ধান ডুবে যায়। এর ফলে কৃষকরা নিচের দিকে ধান কেটে ওপরের দিকে আসছে। আমরা আশা করছি, কিছু দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা। তাদেরকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷

 

;

‘যে দেশে নাই তরু-সেই দেশটা হয় মরু’



অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ
বন উজাড় করে অপরিকল্পিত নগরায়নে বিপন্ন প্রকৃতি এখন ভয়ালমূর্তিতে দূর্যোগের রূপে ফিরে আসছে। ছবি: নূর-এ-আলম

বন উজাড় করে অপরিকল্পিত নগরায়নে বিপন্ন প্রকৃতি এখন ভয়ালমূর্তিতে দূর্যোগের রূপে ফিরে আসছে। ছবি: নূর-এ-আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ পৃথিবীতে আসার পূর্বেই বৃক্ষের সৃষ্টি হয়। আদিকাল থেকেই মানুষ ও প্রাণীকূল তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। আধুনিক সভ্যতা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চাপ পড়েছে বৃক্ষের উপর। বিলুপ্ত হচ্ছে উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল। আর এ প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিচ্ছে, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় সহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দূর্যোগ। হুমকিতে পড়ছে আমাদের প্রতিবেশ, পরিবেশ ও মানবজাতি। বায়ুমন্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষায় যে পরিমান বৃক্ষরাজি থাকা দরকার সে পরিমাণ না থাকায় বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, মরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়ছে। আর এতে সর্বাধিক হুমকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মতো উপকূলবর্তী বদ্বীপসমূহ।

পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের দেশে বৃক্ষরাজি অনেক কম। তাই সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যেমন পরিবেশ মেলা, বৃক্ষমেলা, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি, বসতবাড়ী বনায়ন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ফলদ-বনজ-ভেষজ বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম, ফলদ বৃক্ষমেলা প্রভৃতি। এসব মেলা থেকে সবধরণের গাছের চারাই সংগ্রহ করা যায়। পাশাপাশি পাওয়া যায় বাগানের নানাবিধ উপকরণ ও সেবা।

বর্ষাকাল গাছের চারা লাগানোর উৎকৃষ্ট সময়। সাধারণত উর্বর, নিষ্কাশনযোগ্য ও উঁচু স্থানে গাছের চারা রোপণ করা উত্তম। বসতবাড়ির দক্ষিণপাশে রোদ ও আলোর জন্য ছোট এবং কম ঝোপালো গাছ যেমন সুপারি, নারিকেল, নিম, সজনে, দেবদারু, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, জাম্বুরা, ডালিম গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে উত্তরপাশে বড় ও উঁচু গাছপালা থাকলে ঝড়-তুফান প্রতিরোধ হয়। তাই এখানে আম, কাঁঠাল, জাম, মেহেগনি, সেগুন, বাঁশ ইত্যাদি গাছ রোপন করা ভালো। আবার বসতবাড়ীর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে মাঝারি উঁচু গাছ যেমন কুল, সফেদা, আম্রপালি, লিচু, খেজুর, তাল, আতা, বেল পেয়ারা প্রভৃতি লাগালে সারাদিন বসতবাড়ীর আঙ্গিনায় আলো পাওয়া যায়। বসতবাড়ীতে গাছ লাগানো নিয়ে বেশ কিছু খনার বচন প্রচলিত রয়েছে। যেমন- উঠান ভরা লাউ শশা, খনা বলে লক্ষির দশা। হাত বিশেক করি ফাঁক-আম কাঠাঁল পুতে রাখ। নারিকেল বার হাত সুপারি আট, এর থেকে ঘন হলে তখনি কাট। পূবে হাঁস-পশ্চিমে বাঁশ, উত্তরে কলা-দক্ষিণে খোলা।

 ভাওয়াল বনের সংরক্ষিত অংশেই শুধু এমন ছায়া-সুনিবিড় দৃশ্য দেখা যাবে

 

এছাড়াও বিভিন্ন অফিস, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় শোভাবর্ধনকারী ও ছায়াপ্রদানকারী গাছ যেমন-কৃষ্ণচুড়া, শিমুল, পলাশ, সোনালু, জারুল, বকুল, নাগেশ্বর, বকফুল, নারিকেল, পাম, দেবদারু, ঝাউ, প্রভৃতি গাছ লাগানো যায়। তবে হাট বাজারে ছায়াপ্রদানকারী গাছ যেমন বট-পাকুড়, কৃষ্ণচুড়া প্রভৃতি লাগানো ভালো। পতিত জমিতে যেকোন গাছই লাগানো যায়। বাঁধ, মহাসড়ক বা রেললাইনের পাশে দেবদারু, সেগুন, মেহগনি, শিশু, ইপিলইপিল, বাবলা, কড়ই, অর্জুন, হরিতকি, নিম, নারিকেল, সুপারি, খেজুর, তাল প্রভৃতি গাছ লাগানো উত্তম। নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এমন গাছ যেমন মান্দার, জারুল, হিজল, ছাতিম, বরুণ, অর্জুন, করচ, পিটালী, কদম, বাঁশ, বেঁত প্রভৃতি গাছ লাগাতে হবে। চর এলাকায় বাবলা, ঝাউ, কড়ই, জারুল, বাইন কাঁকড়া, গরান প্রভৃতি গাছ লাগানো যায়। পাহাড়ী এলাকায় গর্জন, গামারী, সেগুন, শিলকড়ই, চাপালিশ, তেলসুর, কাজুবাদাম, কমলালেবু প্রভৃতি গাছ লাগানো উত্তম।

গাছ লাগানোর জন্য সতেজ, সবল, রোগমুক্ত, সোজা, কম শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট চারা নির্বাচন করতে হবে। নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহের পর কয়েকদিন ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিয়ে চারাকে হার্ডেনিং করে নিতে হবে। এতে চারা গাছ মরে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। গাছভেদে নির্দিষ্ট দূরুত্বে চারাগাছ রোপণ করতে হবে। গাছের চারা রোপণের পূর্বে মাটি গর্ত করে জৈবসার দিয়ে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হবে। চারার পলিথিন ব্যাগ অপসারন করে আলতোভাবে গোড়ার মাটির চাকাসহ সোজা করে বসিয়ে দিতে হবে। তারপর চারার চারপাশে ফাঁকা জায়গায় প্রথমে উপরের উর্বর মাটি এবং পরে নিচের মাটি দিয়ে ভালোভাবে পূরণ করে দিতে হবে। চারা লাগিয়ে শক্ত খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। চারপাশে বাঁশের খাঁচা দিয়ে বেড়া দিতে হবে। চারার গোড়ায় প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে। মাটির আদ্রতা রক্ষায় গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করে খড় কুটো বা কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কোন কারণে চারাগাছ মারা গেলে দ্রুত নতুন চারা ঐ গর্তে রোপণ করতে হবে। সাধারণত বছরে দু’বার বর্ষার পূর্বে ও পরে গাছের গোড়ায় সুষম সার দিতে হয়। সার দেয়ার পর পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। এছাড়াও গাছের মৃত ডালপালা ছাটাই করতে হবে। এছাড়াও রোগবালাই ও পোঁকামাকড়ের আক্রমণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য দেশে মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বন প্রয়োজন হলেও আছে ১৫ শতাংশ

প্রবাদ আছে, ‘যে দেশে নাই তরু, সেই দেশটা হয় মরু’। একটি গাছ পঞ্চাশ বছরে যে উপাদান ও সেবা দিয়ে থাকে তার আর্থিকমূল্য প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা। একটি গাছ এক বছরে দশটি এসি’র সমপরিমান শীততাপ তৈরি করে, ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে, ৬০ পাউন্ড ক্ষতিকর গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। একটি বড় গাছ দিনে একশ’ গ্যালন পানি বাতাসে ছেড়ে দেয়। এক হেক্টর সবুজ ভূমির উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষন চলাকালে প্রতিদিন গড়ে নয়শ’ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং ৬৫০ কেজি অক্সিজেন দান করে। এছাড়াও বৃক্ষরাজি ৮৯-৯০ ভাগ শব্দ শোষণ করে দূষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। নিমগাছের শব্দ শোষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশী। এছাড়াও বৃক্ষরাজি আবহাওয়ার তাপমাত্রা হ্রাস করে, বাতাসে আদ্রতা বাড়ায় ও ভুমিক্ষয় রোধ করে। তাই পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর কোন বিকল্প নেই। নগরীতে বাড়ীর ছাদে পরিকল্পিতভাবে ছাদবাগান করা যায়।

এছাড়াও আপনার ঘরের ভেতরে শোভাবর্ধণকারী গাছ লাগাতে পারেন। টবে গাছ লাগিয়ে ঘরে রাখুন, জানবেন একটি জীবন্ত সাথী সর্বদা আপনাকে দেখছে। গাছের অপর নাম জীবন। গাছ আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ, জ্বালানি, অর্থ সর্বোপরি জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয়। একটি গাছ কাটার আগে একবার ভেবে দেখুন তো, এ গাছটির কতটুকু যত্ন আপনি করেছেন বা এ রকম কয়টা গাছ আপনি লাগিয়েছেন। তাই একটি গাছ কাটার আগে অন্তত তিনটি গাছের চারা রোপণ করুন।

লেখক : অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ।
Email: [email protected]

;

দেশের মৎস্য চাষে খুলবে সম্ভাবনার দ্বার

ইলিশের অন্ত্রে অনন্য প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: আইজিবিই

ছবি: আইজিবিই

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের (Tenualosa ilisha) অন্ত্রের অণুজীবসমূহের (Microbiome) গঠন ও বৈচিত্র্য উদঘাটন করে এক অনন্য প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধ্যান পেয়েছেন গবেষকরা। মেটাজিনোমিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ ইলিশের অন্ত্রে এই নতুন প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত করেন তারা। সর্বদা রোগমুক্ত মাছ হিসেবে ইলিশের যে গৌরব রয়েছে, যার প্রকৃত রহস্য এই উপকারি ব্যাকটেরিয়া-মনে করেন গবেষকরা।

বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি)-এর ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইজিবিই) এবং যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর যৌথ গবেষণায় বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের অন্ত্রে অনন্য এই প্রোবায়োটিকের সন্ধান পান গবেষকরা। ইলিশের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের এই মেটাজেনোমিক্স সিকোয়েন্সিং এবং বায়োইনফরমেটিক্স বিশ্লেষণে ব্যবহার করে করা হয় আইজিবিই-এর ইলুমিনা সিকোয়েন্সিং প্ল্যাটফর্ম। 

উদঘাটিত এই উপকারি প্রোবায়োটিক বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মৎস্য চাষে ব্যবহার করা গেলে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হবে বলে দাবি গবেষকদের। তারা মনে করেন, বর্তমানে মৎস্যচাষে রোগাক্রান্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়। আবার মাছকে রোগমুক্ত রাখতেও বিপুল পরিমাণ ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়, যা মাছকে রোগমুক্ত রাখলেও জলজ বাস্তুতন্ত্রের অনেক ক্ষতি করে। সেই জায়গায় এ ধরণের উপকারি প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার জলজ প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রেখে দেশে মৎস্য চাষে নতুন বিপ্লব আনতে পারে।

গবেষণা প্রবন্ধটি উচ্চ ইমপ্যাক্টবিশিষ্ট বিজ্ঞান সাময়িকী প্লস ওয়ান-এ (লিংক) প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা মেটাজিনোমিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ইলিশ মাছের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি বৈচিত্র্য এবং এদের আপেক্ষিক সংখ্যা নির্ণয় করেন। তারা বাংলাদেশের প্রধান প্রধান আবাসস্থল যথাক্রমে চাঁদপুর, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ ও রাজশাহীতে বসবাসকারী ইলিশ মাছের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার কৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলী এবং স্বাতন্ত্র্য বিশ্লেষণ করে ইলিশের অন্ত্রে অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু নতুন ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান।

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং এদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এটি একটি আইকনিক ফ্ল্যাগশিপ প্রজাতি হিসেবে বিখ্যাত। স্বতন্ত্র্য এবং ব্যতিক্রমী স্বাদের কারণে ইলিশ মাছের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্য এবং দেশ ও বিশ্বব্যাপী এর সর্বোচ্চ চাহিদা রয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক আন্তঃসীমান্ত প্রজাতি হিসাবে পরিচিত।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছাড়াও, ইলিশ অপরিসীম আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে। ইলিশ মাছের মোট বার্ষিক মূল্য ১৪, ৯৫০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১.১৫ শতাংশেরও বেশি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ৪ মিলিয়ন মানুষের জীবিকার উৎস এই ইলিশ মাছ। এর বাইরে আনুমানিক ২.৫ মিলিয়ন ব্যক্তি-এর বিস্তৃত ভেলুচেইনের সাথে জড়িত। এই অতি চাহিদাসম্পন্ন এবং দামি মাছটি বাংলাদেশের সামগ্রিক মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২% অবদান রাখে।

এই গবেষণা দলের প্রধান বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি)-এর ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইজিবিই)’র অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো ড. তোফাজ্জল ইসলাম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, এই গবেষণায় সনাক্তকৃত ব্যাকটেরিয়াসমূহের মধ্যে ল্যাকটোকক্কাস, মরগানেলা, এন্টেরোকক্কাস, অ্যারোমোনাস, শিওয়েনেলা, পেডিওকক্কাস, লিওকোনস্টক, স্যাক্কারোপোরা এবং ল্যাকটোব্যাসিলাস উল্লেখযোগ্য প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া হিসেবে তাৎপর্য বহন করে। এই প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াগুলি বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রে বিচরণকারী ইলিশের অনন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, স্বাদ ও ফিটনেসের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া হলো জীবদেহে বসবাসকারী অণুজীব, যা পোষকের বৃদ্ধি, উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধসহ প্রতিবেশে অভিযোজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেওয়া ড. এম. নাজমুল হক বলেন, এই গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার (সাইনোবাকা, সায়েনোকক্কাস, গেমাটা সেরেনিকক্কাস, স্যাক্কারোপলিস্পোরা এবং পলিনেলা) সনাক্তকরণ যা পূর্বে কোনো মিঠাপানি বা সামুদ্রিক মাছের প্রজাতিতে রিপোর্ট করা হয়নি। সমষ্টিগতভাবে, এই গবেষণায় রিপোর্ট করা ইলিশ মাছের ব্যাকটেরিয়োম এবং শ্রেণীবিন্যাস পর্যবেক্ষণের বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য আরও ব্যাপক গবেষণার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই ধরনের অগ্রসরমান গবেষণা ইলিশ মাছের টেকসই উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গবেষকরা জানান, সমুদ্র থেকে নদীতে বিচরণকারী ইলিশ মাছ কখনো রোগাক্রান্ত হয়েছে, এমন কোন গবেষণা প্রবন্ধ বা প্রতিবেদন নেই। সুতরাং অত্যাধুনিক মেটাজিনোমিক্স দ্বারা আবিস্কৃত অনন্য নতুন প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিায়ার সনাক্তকরণ, ইলিশের রোগপ্রতিরোধিতা এবং অন্যান্য অনন্য বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত বলে বিজ্ঞানীদল মনে করেন। এসব ব্যাকটেরিয়াকে আলাদা করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে প্রোবায়োটিক হিসেবে দেশের মৎস্য চাষে ব্যবহারে সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।

;

বার্তা২৪.কম-কে কৃষিবিদ ড. সুরজিত সাহা রায়

‘কৃষি কাজ থেকে কৃষকরা সরে এলে মুশকিল হবে’



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা অটুট রয়েছে। গত দুই বছর কোন ধান আমদানির প্রয়োজন পড়েনি। খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে কারণ কৃষকরা সব চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে চাষাবাদটা এখনও করে যাচ্ছেন। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ অন্যান্য কারণে কৃষকরা যদি কৃষি কাজ থেকে সরে আসেন তাহলে মুশকিল হবে।

বার্তা২৪.কম-কে এসব কথা বলেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক কৃষিবিদ ড. সুরজিত সাহা রায়

এই কৃষিবিদ মনে করেন, বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণে ব্যাপক প্রচেষ্টা নেওয়ায় উল্লেখযোগ্য অর্জনে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে এখন যথেষ্ট আশাবাদী হওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কৃষি পণ্যের বিপণনে কাঙ্খিত সাফল্য এখনও আসেনি। যার ফলে কৃষি খাতের প্রধান অংশীজন কৃষকরা তাঁর কষ্টার্জিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে গবেষণার মাধ্যমে এই অচলায়তন থেকে বের হওয়ার উপায় বের করা গেলে সংকট নিরসন সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ের কৃষিকর্মীদের সক্রিয় রাখার সঙ্গে স্যোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও এ সংক্রান্ত ভিডিও বার্তা ও লিফলেট প্রচার করা হচ্ছে, জানান এই কৃষিবিদ।

ড. সুরজিত সাহা রায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বার্তা২৪.কম’র পরিকল্পনা সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম

বার্তা২৪.কম: বোরোর ফলন কতটা ঘরে উঠেছে কৃষকের?

ড. সুরজিত সাহা রায়: নীচু অঞ্চল, যেমন ধরুন-হাওরাঞ্চল, সেখানে মোটামুটি কাটা শেষ। এ সপ্তাহে পুরোপুারই শেষ হয়ে যাবে। এমনকি, বাংলাদেশের চলনবিল বা অন্য নীচু এলাকা যেগুলো আছে-সেখানে কাটা হয়ে যাবে এরই মধ্যে। শুধু উত্তরবঙ্গে কিছুটা থাকবে। সেখানে ধান একটু পরে লাগায়, আলু তোলার পর। আর খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল, যেখানে ঘেরের মধ্যে চাষ করে, তারা আগাম ধান লাগায় আবার আগামই কেটে ফেলে। আমরা নির্দেশ দিয়েছি, আগামী ২ তারিখের মধ্যে নীচু এলাকার (২ মে ২০২৪) সব ধান কেটে ফেলতে। কাটা প্রায় শেষ। কারণ ইতিমধ্যেই আমরা বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়েছি। সেই বৃষ্টিতে বন্যারও আশঙ্কা করছি।

বার্তা২৪.কম: এবারের তাপদাহ নিয়ে কথা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, বাংলাদেশ বা এই অঞ্চলের দেশসমূহের জন্য এটি নতুন নয়। কৃষিতে এর প্রভাব কতটা?

ড. সুরজিত সাহা রায়: দীর্ঘ ৭৬ বছর পরে এত লম্বা সময় ধরে তীব্র তাপদাহ যাচ্ছে। পূর্বে যেটা হয়েছে-দুই দিন বা তিন দিন থেকেছে। আবার একটি বৃষ্টি হয়ে গেছে। আবার তাপ বেড়েছে। এতে করে গাছের ক্ষতিটা হয়নি। যেমন-আম ও লিচুর মুকুল আছে। এই তাপদাহে এর ক্ষতি হচ্ছে। আউস ধানের সমস্যা, পাটের সমস্যা-কিছুটা তো হচ্ছেই। তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে তখন গাছেরও ফিজিওলজিক্যাল এক্টিভিটি স্টপ হয়ে যায়।

বার্তা২৪.কম: আমরা তো এখন আম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছি। আমের ফলনে এই তাপদাহ কতটা প্রভাব পড়বে?

ড. সুরজিত সাহা রায়: এখন পর্যন্ত যা জানতে পারছি, খুব বেশি একটা প্রভাব পড়বে না। তবে আপনি জানেন যে, হাই টেম্পারেচার হলে পানি বার বার গাছের গোড়ায় দিতে হয়। পানি দিয়ে গাছের গোড়ায় ধরে রাখাটা খুব কঠিন। কৃষকরা মালচিং (আবর্জনা দিয়ে) দিয়ে চেষ্টা করছে যেন পানিটা থাকে। আর মাটির গোড়ায় পানি না থাকলে খাবার তুলতে পারবে না। তা না হলে আমও পুষ্ট হবে না। অন্যদিকে হাই টেম্পারেচার ফল পাকার জন্য খুব ভালো।

বার্তা২৪.কম: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে কিনা?

ড. সুরজিত সাহা রায়: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদেক্ষপ নিয়েছে। মাননীয় মহাপরিচালকের দিকনির্দেশনায় প্রতিদিনই এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। কৃষকদের জরুরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের কর্মীরা এবিষয়ে সচেষ্ট আছেন। আপনি জানেন, এখন তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগ। কৃষকরা যাতে সচেতন হতে পারেন এবং করণীয় ঠিক করতে পারেন, সেজন্য আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি স্যোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পরামর্শ সম্বলিত ছোট ভিডিওবার্তা, লিফলেট প্রচার করছি। এতে কৃষকরা দ্রুত মেসেজটা পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাঠে যাচ্ছেন নিয়মিত। কে যে কোন মাধ্যমে দেখবে বা শুনবে তা বলা কঠিন, সেজন্য আমরা সবগুলো মাধ্যমেই তথ্য ও কৃষি পরামর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছি।

বার্তা২৪.কম: এবারের বৈরি আবহাওয়া সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক অবস্থা কেমন মনে হচ্ছে?

ড. সুরজিত সাহা রায়: এখানে দু’ধরণের বাস্তবতা আছে। যেমন-আমরা গরমে পুড়ছি কিন্তু যাঁরা ধান চাষী তারা খুবই সন্তুষ্ট। কারণ হচ্ছে-তারা নিরাপদে ধানটা ঘরে তুলতে পারছেন। তারাও (কৃষকরা) আশা করছে, আরও ক’দিন পর যেন বৃষ্টিটা হয়। হাওরাঞ্চলে এখন তারা সুন্দর করে ধানগুলো কেটে ঘরে তুলছে। দামও পাচ্ছে ভালো। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে অতিরিক্ত খরার কারণে সেচ দিয়ে কুলাতে পারছে না। সরকারও বোরো আবাদকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুত সরবরাহ করছে। জেনে থাকবেন, গত দু’বছর এক ছটাক ধানও আমরা বাইরে থেকে কিনি নাই। এত খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও ধান কিনি নাই। আগামীতেও যাতে কিনতে না হয়, পারি যদি কিছু রপ্তানিও যাতে করা যায় আমরা সেই চেষ্টা করছি। এটা একটা ভালো অর্জন।


বার্ত২৪.কম: তার মানে বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা অটুট আছে?

ড. সুরজিত সাহা রায়: নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে। তবে আপনি বলতে পারেন, দামটা বেড়ে গেছে। দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কর্পোরেটগুলো বেশি ঝামেলা করছে বলেই মনে হচ্ছে। আমি আজ ৬৮ টাকা কেজিতে উস্তে কিনলাম। অথচ কৃষক ১৫ টাকায়ও বিক্রি করতে পারেন না। ধানের মূল্যের ক্ষেত্রেও যে ডেভিয়েশনটা হয়-কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে-আমি মনে করি মার্কেটিং বিভাগের এ নিয়ে প্রচুর কাজ করা প্রয়োজন। সিন্ডিকেটটাও ভাঙা প্রায়োজন।

বার্ত২৪.কম: মূল্যবৃদ্ধির এই যে শুভঙ্করের ফাঁকি, বিশেষ করে কৃষক তাঁর ন্যায্য দাম পান না কিন্তু ভোক্তা ঠিকই উচ্চমূল্যে কিনছেন। এই অচলায়তন কি কোন দিন ভাঙবে না?

ড. সুরজিত সাহা রায়: চেষ্টা চলছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও এটা বড় অগ্রাধিকার-দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিছু মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফায়দা লুটে, কোনভাবেই এটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা খুব জোর দিতে বলেন অনেক সময়, কিছু কাজ হচ্ছে। আমি মনে করি, এনিয়ে গবেষণারও প্রয়োজন আছে। এই অচলায়তন ভাঙতে শক্ত হাতেরও প্রয়োজন। কৃষক সমিতিগুলো, সমবায়গুলো-একটা ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উৎপাদনের ভূমিকা উৎপাদন পর্যন্তই সীমিত। মার্কেটিংয়ের বিষয়গুলো দেখে অন্য বিভাগ। আমরা জড়িত না থাকলেও যেহেতু কৃষকরা আমাদের প্রধান অংশীদার, তাই চেষ্টা করি দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কিছু ভূমিকা রাখার। জেনে থাকবেন, করোনাকালে-আমরা ম্যাঙ্গু ট্রেন চালু করেছিলাম, ক্যাটল ট্রেন চালু করা হয়েছিল। দিনাজপুর থেকে হাওরে কৃষি শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থাও আমরা করেছি, তখন সব যান চলাচল বন্ধ ছিল। যদিও অন্য বিভাগের দায়িত্ব ছিল, কিন্তু আমরা আওতার বাইরে গিয়েও তা করেছিলাম কৃষকের স্বার্থে। বিশে^র উন্নত দেশগুলো সতর্ক করে বলেছিল, খাদ্যাভাব তৈরি হতে পারে। মানুষ না খেয়ে মারা যেতে পারে। সেটাও আমরা সফলভাবে মোকাবেলা করেছি। খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে কারণ কৃষকরা সব চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে চাষাবাদটা করেছেন। কৃষকরা যাতে তাদের কাজ থেকে সরে না আসে সেটাই আমরা চেষ্টা করছি। তাঁরা সরে এলে মুশকিল হবে।


বার্তা২৪.কম: বাণিজ্যিক কৃষি কি কোনো হুমকি তৈরি করছে?

ড. সুরজিত সাহা রায়: বাণিজ্যিক কৃষি, ইমপোর্ট সাবস্টিটিউট কৃষি বা এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড কৃষিও এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে সাধারণ কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় মার্কেটিংয়েই আমাদের এখন নজর দিতে হবে। যেমন ধরুন-এবার সরিষার দাম পড়ে গেছে। দাম না পেলে কৃষকরা আর করতে চান না। সরিষার তেলটা ভোক্তারা এখনও এডিবল ওয়েল হিসবে নিতে পারিনি। এখনও আমরা এই তেলটা বিভিন্ন ভর্তা খাওয়ার মধ্যেই ব্যবহার সীমিত রেখেছি। যদিও এই তেলটা পরিমাণে কম লাগে। এর উপহার হলো, এই তেল পরিমাণে কম লাগে আবার ট্রান্সফ্যাট নেই-এতে ফ্যাটি লিভার, লিভার পাথর বা মুটিয়ে যাওয়া থেকে আমরা বাঁচতে পারি।

বার্তা২৪.কম: এই সময়ের কৃষির আর কি চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

ড. সুরজিত সাহা রায়: বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যা এক্ষেত্রে বড় সংকট। জমির পরিমাণ কম এবং ক্রমাগত কমছে। এই পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদনে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকটা ‘মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যায় আর পা ঢাকলে মাথা’ এ রকম ব্যাপার। আমরা যদি কাছাকাছি দেশের পতিত জমি দীর্ঘ মেয়াদে লিজ নিয়ে চাষাবাদ করতে পারি সেটাও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন সমাধান হতে পারে। প্রতিবেশী ভারতের আসামে প্রচুর পতিত জমি আছে। আমাদের পাহাড়ে যদিও অনেক অনাবাদী জমি আছে, কিন্তু সেখানে চাষাবাদে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আপনি জানেন, কৃষিটা প্রকৃতিনির্ভর। তারপরও আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেভাবে নতুন জাত উন্নয়ন করছে, আমরা তা সম্প্রসারণ করছি, কৃষকের মাঠে নিয়ে যাচ্ছি-তাতে একটি ভালো অর্জন আসছে। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে লবনাক্ততা একটি বড় সংকট ছিল দক্ষিণাঞ্চলে।

কিন্তু আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকগুলো জাত, যেমন ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৮ ও ব্রি ধান৬৭-এই তিনটি জাত বিরাট বিপ্লব নিয়ে এসেছে। কৃষকরা ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ চাষ করতো; আমরা এগুলো চাষে নিরুৎসাহিত করেছি। এবার সুবিধা হয়েছে-এগুলোর ফলনও ভালো, আগাম কাটাও সম্ভব। তারপরও এবার কিন্তু ব্রি ধান২৮ এ ব্লাস্টের আক্রমণটা হয়নি, কারণ বৃষ্টিটা একটু আগে হয়ে গেছে-ধানের থোর বেরুনোর আগে হয়েছে। ফুল বেরুনোর পর যদি বৃষ্টি হতো তাহলে ফলন বিপর্যয় হতো। যার ফলে ব্লাস্টের জীবাণুটা প্রথম বৃষ্টিতে মাটিতে পড়ে যায়, মাটিতে পড়ার সময় যদি সে ধানের শীষ পায় তাহলে শীষটা নষ্ট হয়ে যাবে। এবার শীষ বেরুনোর আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। সব পড়েছে মাটিতে বা পাতায়, তাই তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। এজন্য ধানের ফলন বেশ ভালো। একটু লস হচ্ছে, টেম্পারেচার যদি হাই হয় একে আমরা বলি রেসপারেশন লস, এতে ক্ষতি যেটা হয়েছে তা উল্লেখযোগ্য নয়। আবার তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় ধান আগে পেকেছে।


আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস তাতে আগামী সপ্তাহে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে ধানটা উঠে যাবে। অন্যান্য ফসলের বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না। প্রযুক্তি এখন অনেক আছে। কৃষকরা যদি প্রযুক্তিগুলো অনুসরণ করেন তাহলে আম ও লিচুর ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে পারবে। হয়তো দামটা একটু বেড়ে যাবে। যদিও এখনকার কৃষকরা খরচে খুব একটা কার্পণ্য করেন না। কারণ মার্কেট এখন খারাপ না। আমরা চাই কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পায় এবং ভোক্তাও যাতে ন্যায্য দামে কিনতে পারেন। মাঝের মধ্যসত্ত্বভোগীর দৌরাত্ম যেন কমানো যায়।

;