লকডাউন



আন্দালিব রাশদী
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

হাজার পঞ্চাশ স্কোয়ার ফিট মেঝের ওপর যদি তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্ট হয়, তাতে যদি দুটো বাথরুম কিচেন ডাইনিং-ড্রইং স্পেসও থাকে তাহলে অনুমান করা যায় এককটা রুমে ডাবল খাট ফেলার পর ওয়ার্ডরোব ঢোকালে পা চালানোই মুশকিল। মাস্টার বেডে আবার বইয়ের আরমারি ঢুকানো হয়েছে। চুমকি বই পড়ে। ইংরেজি-বাংলা দুই ভাষার বই-ই।

কম কথা বলে, রাগ হলে মাথা ঝিমঝিম করে, পিরিয়ডের প্রথম দুটো দিন মেজাজ খারাপ থাকে, সবুজ রঙের কোনো কাপড় দুচক্ষে দেখতে পারে না, যেখানে ছোট বোন রুমকির সাথেই এক বিছানায় থাকতে ইচ্ছে করত না সেখানে একজন ব্যাটাছেলের সাথে ঘুমোতে হবে এটা ভাবতেই গাটা কেমন যেন করে ওঠে—এসব কথা আমাকে বিয়ের আগেই শুনিয়েছে। আমাদের বিয়ের আগে ঠিক প্রেম নয়—কথাটা বলার এই পর্বটি মাত্র চুয়াল্লিশ দিনের। তখনও সম্পর্কের ধরনটা আপনি সম্বোধন নির্ভর ছিল। বিয়ের ঠিক আগের দিন আমরা একই সঙ্গে তুমিতে নেমে আসি টেলিফোন আলাপের মাধ্যমে। ঢাকা শহরে আমার তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজন না থাকায় কেবল ছবি তোলার জন্য তাদেরই বিল্ডিংয়ের ছাদে চুমকির একটা নামমাত্র গায়ে হলুদ হয়েছে।

বিয়ের পর তিনটা বছর আমাদের ভালো যায়নি। প্রথম বছরই আমরা দুজনই বুঝি ভুল হয়ে গেছে। চুমকি রাখঢাক না করে বলেছে যার ইন্টেলেকচুয়াল কোনো ডেপথ নেই তাকে বিয়ে করা আর মিরপুর চিড়িয়াখানার একটা শিং ভাঙা মহিষকে বিয়ে করা একই কথা।

মিরপুর চিড়িয়াখানায় শিং ভাঙা কোনো মহিষ আছে কিনা তাও আমি জানি না। তিন বছর কোনোভাবে কাটলেও পরের দুটা মাস আমাদের দুজনের জন্যই ছিল ভয়ঙ্কর। চুমকি বলল, তোমার লজ্জা করে না শ্বশুর বাড়িতে থাকো?

অবশ্যই করার কথা। সে জন্যই তো আমি আমার দেড় রুমের ভাড়া বাসা ছেড়ে আসতে চাইনি। বলেছি চালো আপাতত, এখানেই উঠি তারপর দেখেশুনে দু রুমের একটা বাসা নেব। ঘরজামাই থেকে আমার বাবাকেও যথেষ্ট লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। আমি এর মধ্যে নেই। কেউ কিছু না বললেও আমার মনে হতো নিশ্চয়ই আমাকে কিছু একটা বলছে। মনে করে দেখো তুমি কী বলেছিলে।
কী বলেছিলাম?

বলেছিলে অ্যাপর্টমেন্টটা তো তোমার শ্বশুরের নয় যে তোমার ঘরজামাই ঘরজামাই লাগবে। বাবা দিলেও এটা আমার নামেই পাকাপাকি রেজিস্ট্রি করা। স্ত্রীর সম্পত্তি থাকলে ঘরজামাই বলার কোনো সুযোগই নেই।

তুমিই একটা পিকআপ ভ্যান নিয়ে আমার যা যা ছিল সব এনে তুললে তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। জায়গা ছিল না বলে আমার প্রায় সব জিনিসপত্র রাখলে তোমাদের নামে বরাদ্দ গ্যারেজের জায়গাটিতে। তোমাদের গাড়ি ছিল না গ্যারেজ ছিল। কেবল আমার একটি ছোট্ট টেবিল আর রিভলভিং চেয়ারটা সিমকি তার রুমে ঢুকিয়েছে। তোমার ভাবি তোমার মাকে পছন্দ করতেন না বলে তিনি রয়ে গেলেন তোমার সাথে—মানে আমাদের সাথে। রুমকির অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিয়েছে। তোমার মা আর সিমকির যৌথভাবে একটি অ্যাপার্টমেন্ট সেখানে থেকেও ভাড়া আসে। ব্যবস্থা এমনভাবেই করা হয়েছে যেন তোমার মায়ের মৃত্যুর পর কেউ মায়ের সম্পত্তির ভাগ না চায়—এটা পেয়ে যাবে সিমকি।

এতসব কথা আমি বলিনি; এমনিই বিড়বিড় করেছি।
যা আমি স্পষ্ট করে বলেছি তা হচ্ছে বেশ আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

আরো আগে বেরোনো উচিত ছিল। ডিভোর্স আমিই দিচ্ছি, কাগজটা নিয়ে তবে যেয়ো। তুমি আমাকে ডিভোর্স করেছো এই অহঙ্কার করার সুযোগ চুমকি তোমাকে দেবে না।

তোমার সাথে থাকার প্রশ্নই আসে না।

সিমকি আটকাল, বলল, ফর গডস সেইক দুলাভাই যাবেন না। আমি মার রুমে চলে যাচ্ছি, তুমি এ রুমে থাকবে, তাহলে চুমকির সাথে থাকা হবে না। আমি তোমাকে মিস করতে চাই না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চুমকির অফিসের গাড়ি এসে পড়ে কাঁধে চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে এক হাতে খাবারের হটপট অন্যহাতে শাওমি স্মার্ট ফোন নিয়ে বেরিয়ে যায়। সিমকি বলল, চুমকির রুমের চাবি দাও তোমার জিনিসপত্রগুলো এখানে শিফট করি।

কিচেন একটা বাথরুম আর চুমকির মায়ের রুমটা ছাড়া সবগুলো লক করা থাকে। মাস্টারবেড, একটা চাবি আমার কাছেই থাকে। আমি রুম খুলে দিয়ে বেরিয়ে যাই। সিমকির দক্ষতা সম্পর্কে আমার সামান্য সন্দেহও নেই, অফিস থেকে ফিরে যখন এ রুমটাতে ঢুকব, এমনভাবে রুমটা গোছানো থাকবে যে এটাকে আমার রুমই মনে হবে। আমার অফিস দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের মধ্যে। চুমকির গাড়িতে চল্লিশ মিনিট ফেরার সময় জ্যামে আটকা পড়লে আড়াই ঘণ্টাও লেগে যায়। আমি খাবার নিই না, অফিসের ক্যাফেটেরিয়াতে ভর্তুকি দামে পঁচিশ টাকায় ভরপেট খাওয়া যায়।

আমি স্থানান্তরিত হই ১৯ মার্চ রাতে। সিমকি সবই এনেছে পেস্ট-টুথব্রাশ, জিলেট শেভিং ফোম ও রেজর, ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশন, স্যান্ডেল, প্যান্টের বেল্ট প্যারাসিটামল ট্যাবলেট—যাতে আমাকে চুমকির ঘরের দরজায় ঢুকতে টোকা দিতে না হয়। তবুও বলল, অ্যাটাচডকাম নেই, তোমার কষ্ট হবে।

পরদিন শুক্রবার চুমকির সারাদিন বাসায় থাকার কথা, তার সাথে দেখা হয়ে যাওয়া এড়াতে নাস্তার আগেই বেরিয়ে যাই। বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস সদরঘাট যাচ্ছে, আমি উঠে পড়ি। লঞ্চঘাটের কাছাকাছি একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে তন্দুর রুটি এবং খাসির পায়ার নেহারিতে একটি জবরদস্ত নাস্তা করি। টার্মিনালের ভেতর ঢুকে দূরগামী লঞ্চ দেখি, একবার ভাবি উঠে পড়ি কিন্তু শনিবার আমাকে অফিস করতে হয়।

মহসিন হলের আমার রুমমেট আবদুল হান্নানকে প্রায় চার মাস পর ফোন দিই, বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরায় তার বাড়ি ও কসমেটিক্সের কারখানা। কারখানাটা বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডের প্রসাধনদ্রব্য এখানে তৈরি হয়। শুধু বিদেশি খালি কৌটা পেলেই চলে। ফোন ধরতেই বললাম, সদরঘাটে আছি নদী পেরিয়ে তোর বাড়িতে আসছি।

হান্নান বলল, ফিরে আয়, স্কোয়ার হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার সামনে হাঁটাহাটি করছি, নার্গিসের জোড়া বাচ্চা হবে, বুঝলি দোস্ত দেলাইয়া দিলাম দুইটাই মই। তোর মতো আঙ্গুল চুষলে আঙ্গুল ক্ষয় হবে, বাচ্চা বের হবে না।

সুতরাং জিঞ্জিরা যাওয়া হলো না। এখানে আধঘণ্টা ওখানে পৌনে এক এমন করতে করতে ‘সাবলেট চাই’-র অন্তত দশটি বিজ্ঞাপন দেখে—ছয়টি সরেজমিনে দেখে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরি। সিমকি বলল, চুমকি ফোনে কোনো এক উকিলের সাথে কথা বলেছে। তাতে তার ডিভোর্স কেইসটা শক্ত করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে কয়েকটা পয়েন্ট দাঁড় করাচ্ছে।

১. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছো।
২. যৌতুকের জন্য মারধোর করেছো।
৩. স্ত্রীর ভরণপোষণ দিচ্ছো না।
৪. স্ত্রীর শারীরিক চাহিদা মেটানোর যে হক তা আদায় করছো না।
৫. সন্তানের আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও তাকে গর্ভবর্তী বানাতে পারোনি।

আমি বললাম, আসল পয়েন্ট তো বাদ পড়ে গেছে তার স্বামীর চরিত্র খারাপ অন্য নারীতে আসক্ত। উদাহরণ হিসেবে সিমকির নাম উল্লেখ করতে পারত।

সিমকি বলল, তাহলে তার মনে করিয়ে দেবার দরকার নেই। কোনো কারণে কথাটা রাশেদের কানে গেলে ২৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানটা ভেস্তে যাবে।

সিমকির বিয়ে ২৭ এপ্রিল রাশেদের সাথে। ২৩ এপ্রিল কানাডার কুইবেক থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছাবে ২৫ তারিখ ঈদ করবে ২৭ তারিখ বিয়ে করবে, ৩০ তারিখে আবার চলে যাবে। রাশেদ কানাডার নাগরিকত্ব পেয়েছে মাত্র ছ’ মাস আগে। আমার সাথে ফোনে কথা হয়েছে, নিজে থেকেই বলেছে, দিনের বেলা কিছু পড়াশোনা করি, ফ্রেঞ্চ ভাষাটা ভালো করে শিখেছি বলে ওখানকার স্যোশাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট ইন্টারসেক্টর হিসেবে ডাকে, সন্ধ্যা ছ’টা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত ক্যাব চালাই। সিমকিকে নিয়ে আসার পর টাইমটা আবার অ্যাডজাস্ট করে নেব। ফ্রেঞ্চটা সিমকিও কমবেশি শিখে নেবে। টরন্টো, আটায়া ও দিকটাতে ইংলিশ চলে, কিন্তু বাঙালি বেশি আমি বাঙালিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই।

রুমকির শাশুড়ির মৃত্যুশয্যায় শেষ দেখার জন্য রুমকি তার স্বামী রইস আহমেদ, তিন বছর বয়সী ছেলে ভিঞ্চি সাত দিনের জন্য ফ্রোরেন্স থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে সোজা চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ নামের গ্রামে। তৃতয়ি দিনেই তার মৃত্যু হয়, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের রাতে আবার তারা ফিরে যাবে ২৪ তারিখ সন্ধ্যায় চুমকি কিংবা সিমকিদের বাড়িতেই এসে হাজির, এখানে দু রাত পরের রাত তো উড়োজাহাজেই। যে রুমে আমার আশ্রয় হয়েছিল সেই রুমটিই ছেড়ে দিতে হলো।

তাহলে আমার রাতের আশ্রয় হবে কোথায়? একটাতে চুমকি, একটাতে রুমকি ও রইস আহমেদ এবং তাদের ভিঞ্চি। একটাতে আমার শাশুড়ি যার একটি বড় সময় শুয়েই কাটে, সাথে সিমকি। আমি কোথায়?

আমি ফিসফিস করে সিমকিকে বলি, আমি কোনো এক বন্ধুর বাসায় চলে যাচ্ছি, চিন্তা করো না যোগাযোগ রাখব।

ভয়ঙ্কর দুঃসাহসী একটি কথা বলে বসল সিমকি। বলল, বেশ তুমি চুমকির সাথে ঘুমাবে না, এই তো। আমি মাকে চুমকির রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমার সাথে ঘুমাবে। আমি হেসে উঠি এবং বলি, পাগলামির একটা সীমা থাকা চাই, কি রকম লঙ্কাকাণ্ড ঘটবে ভেবে দেখ।

সিমকি তখনই ঢুকল চুমকির রুমে, কী বলল আমি শুনিনি। কিন্তু দুতিন মিনিটের মধ্যেই চুমকি বেরিয়ে এসে আমার হাত ধরে প্রায় হেঁচকা টানে তার ঘরে নিয়ে বলল, কী নাটক শুরু করলে? রুমকির বরের সামনে এই বাহাদুরিটা না দেখালে হয় না?

পরের পাঁচ মিনিটের মধ্যে টুথপেস্ট ব্রাশ রেজার শেভিং ফোম, স্যান্ডেল সব এনে চুমকির রুমে আগে যেখানে যেটা যেভাবে ছিল রেখে আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে গুড নাইট বলে সিমকি বেরিয়ে গেল।

চুমকি বলল, অসুবিধে নেই, আমি আগেই সুইচ অফ করে দেব।

আমি বললাম, আলো থাকলে আমার সমস্যা হবে না যখন তোমার কাজ শেষ হবে তখনই অফ করো।

কাজ মানে উপন্যাস পড়া। ইংরেজি বাংলা দুই-ই। এক নজরে দেখলাম তার বইটার নাম লাভ স্টোরি। ওই এমনই হয়, নিজের জীবনে প্রেম না থাকলে লাভ স্টোরিই পড়তে হয়। এক সময় দেয়ালমুখো হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে নাস্তার সময় রইস আহমেদ বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার তো চাকরি নিয়ে টানাটানি লেগে যাবে। টার্কিশ এয়ারওয়েজ—আসা বা ঢাকা থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।

রুমকি বলল, মানে? আমাদের টিকেট তো টার্কিশ এয়ারের।

তিনি বললেন ম্যাসেজ তো আগেই দিয়েছে, কিন্তু ওয়াইফাই জোনে না থাকায় দেখিনি, একটু আগে সিমকির কাছ থেকে তোমাদের বাড়ির পাসওয়ার্ড নিয়ে লগ-ইন করতেই একডজন ম্যাসেজ এলো। করোনা ভাইরাসকে প্যানডেমিক ডিক্লেয়ার করেছে। সার্সও তো প্যানডেমিক তখন তো এত ফ্লাইট ক্যানসেল হয়নি। এয়ারপোর্টে এটা-ওটা পরীক্ষা হয়েছে। রুমকি বলল, তোমার সিস্টেম ছাড়, অন্য যে এয়ারলাইনের টিকেট পাও সেটাই কেনো।

নাস্তার টেবিলে বসেই ফোন করলেন, কাকে করলেন তিনিই জানেন। কিন্তু এটা শুনলাম বার বার বলছেন, সর্বনাশ সর্বনাশ তাহলে কেমন করে যাব।

রুমকি বলল, মানে?

কোনো এয়ারলাইন্সই অপারেশনে নেই। ২৬ তারিখ থেকে টোটাল লকডাউন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টও বন্ধ।

এ বাড়িতে টেলিভিশন আছে। কিন্তু কেউ এমনকি হিন্দি সিরিয়ালও দেখে না। চুমকি একটু অবসর পেলে বই নিয়ে বসে, সিমকির হাতের মোবাইল ফেইসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ভাইবার চলছেই, আমার শাশুড়ি বসে থাকলে ভার্টিগোতে পড়েন, এখন টিভির সামনেই আসেন না। পৃথিবী দেশ এসব নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি ভাবছি সাবলেটই ভালো, কিছু বাড়তি টাকা দিলে দুবেলা অফিসের খাবার ছ’ দিন তো আছেই, শুক্রবার দুপুরে বাইরে কোথাও মেরে দেবে। না খেলেও সমস্যা নেই। রাতে ভাত একটু বেশি টানবে।

রুমকি রিমোট কন্ট্রোল খুঁজে বের করে টিভি সার্ফ করতে শুরু করল। করোনা নিইে সবার কথা সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, বাংলাদেশ চ্যানেল বলছে ছাব্বিশ তারিখের পর থেকে সব অফিস আদালত বন্ধ। দেশে কমপ্লিট লক ডাউন। বাসা থেকেও কেউ বেরোতে পারবে না। বাসা থেকে বেরোনো ঠেকাতে পুলিশ র‌্যাব সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

রুমকি বলে, পৃথিবীটা কোন দিকে যাচ্ছে? আমি তো কখনো উহানের নাম শুনিনি। কেয়ামত এসে গেছে নাকি?

রাতের বেলা রুমকি বলল, ঐ দেখো টিভিতে চীনের বাংলাদেশিরা ফেরার জন্য কান্নাকাটি করছে, সরকার ব্যবস্থা করতে দেরি করছে বলে অভিশাপ দিচ্ছে। আরো দুটো খবর দিল রুমকি ইতালি আর আমেরিকার অবস্থা খারাপ। ও বাবা, এটা কি প্লেগ নাকি? ব্ল্যাক ডেথ?

সিমকি একটু পড়াশোনা করে বলল, শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে। সিমটম হচ্ছে জ্বর গলাব্যথা কাশি।

রুমকি বলল, ওহ মাই গড, আমার তো গলা ব্যথা, গত রাতে একটু জ্বরও ছিল। প্যারাসিটামল খেয়ে সামলেছি। করোনার নাকি কোনো ঔষধ নেই? আমি মরে গেলে ভিঞ্চির কী হবে?

রইস আহমেদ বললেন, চিন্তা করো না, তুমি মরে গেলে ভিঞ্চির কিন্ডারগার্টেনের অ্যাটেন্ডেন্ট ফ্রান্সেসকাকে বিয়ে করব, মেয়েটা ভিঞ্চির খুব টেইক কেয়ার করে।

হঠাৎ রুমকি খেপে গেল, গ্লাস ভর্তি পানি ছুঁড়ে মারল ভিঞ্চির বাবার ওপর। বলল, তোমার চোখের তারা কাকে দেখলে নেচে উঠে আমি কি সেটা জানি না? তুমি বিয়ে করবে ঐ প্রস্টিটিউটটাকে। ভিঞ্চির সেকেন্ড শিফটের বুয়া। অ্যাটেন্ডেন্ট আবার কী? বুয়া বলতে পারো না। তোমার রুচি কখনো বুয়ার উপর উঠেছে? পরিবারিক প্রস্তাবে রাশেদের সাথে সিমকির বিয়ে যোগাযোগটা রাখছেন সিমকিদের ছোটমামি হাফসা। রাশেদ হাফসার ক্লাসমেট, নিষেধাজ্ঞা হাফসারই। সিমকি রাশেদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিল। হাফসা বলেছে, প্রশ্নই আসে না। তাহলে সিমকির দাম কমে যাবে। বিয়ের পর কথা বলবে, তার আগে দু পক্ষের যত কথা সব হাফসাই বলবে। সিমকি রুমকিকে বলল, ভালোই হয়েছে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ নই যে প্লেনভাড়া দিয়ে আমার বিয়েতে আসবে। আটকা যখন পড়েছোই বিয়েটা অ্যাটেন্ড করে যাও। আজ তো এপ্রিলের ছয়, আর একুশ দিন।

রইস আহমেদ বলল, বিয়ে কি কাজী সাহেবকে করবে না পাত্রকে? কেন? কাজীকে কেন বিয়ে করব? পাত্র কি ঘাস কাটবে?

এছাড়া কোনো উপায় নেই। ওসব দেশে ঘাস অনেক বড় হয়। দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর না রাখলে হবে কেমন করে? দেখো ফেডারেল এভিয়েশন অথোরিটি কী বলছে—জুনের আগে উত্তর আমেরিকার কোনো এয়ারপোর্ট থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা নেই। একজন এভিয়েশন জার্নালিস্টের ভিডিও করা খবরটি দেখায়। হঠাৎ সিমকি মলিন হয়ে যায়।

রুমকি বলে, মন খারাপ করিস না। হেঁটে কিংবা রিকশায় কিংবা টেম্পোতে তো আর কুইবেক থেকে আসতে পারবে না। প্লেনে চড়তে হবে। রইস আহমেদ একটা বিকল্প পথ দেখায়। বিয়ের দিনই ভিডিও কনফারেন্স করে কাজীকে নিয়ে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে পার। তারপর যখন আকাশে প্লেন উড়বে জামাই চলে আসবে।

সিমকি বলল, তাই হবে, আমি ছোটমামিকে বলছি।

এপ্রিলের ২১ তারিখ সিমকিদের ছোট মামা কান-হাতে গ্লাভস, মুখে ক্লিনিক্যাল মুখোশ পরে এলো। বলল, ফোনে বললে পারতাম, কিন্তু বিশ্বাস করাটা কষ্টকর হতো।

রুমকি জিজ্ঞেস করল, ছোট মামা কোনটা বিশ্বাস করতে বলছো? কানাডার লোকটার সাথে সিমকির বিয়ে হবে না। হতে পারে না। সে হচ্ছে হাফসার বয়ফ্রেন্ড। সিমকির বিয়ের নাম করে প্রত্যেকদিন তার সাথে দেড় দু ঘণ্টা কথা বলে, এদ্দিন পাত্তা দিইনি, কাল কিছুক্ষণ কান পেতে যা শুনলাম! আফসা তার সাথে থ্রি এক্স স্টাইলে কথা বলেছে পুরো পথ।

সিমকি বলল, তুমি এসব কী বলছো ছোট মামা? হাফসা যা বলছে তার একশ ভাগের একভাগও বলিনি। বলেছে সিমকিকে টাচ করার আগে হাফসার সাথে তার ঘুমোতে হবে, সব সুযোগ যেন তৈরি করে দেয়।

এই বিষয়ে প্রথম মুখ খুলল চুমকি। বলল, তুমি যে এসব জেনেছো ছোটমামি কি তা জানে?

জানবে তিন চারদিন পর। আমি এখন মুখে যা বলব সব অস্বীকার করবে, এমনকি আমাকে বলতে পারে মানসিক ডাক্তার দেখাও। এটা তোমার অবসেশন। আমি আজই সিক্রেট ভয়েস রেকর্ডার আমার এন্ড্রয়েড ফোনে ডাউনলোড করছি। ফোনটা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে বেডরুমে কোথাও লুকিয়ে রাখব। আমি টিভি দেখার নাম করে চলে আসব। এভাবে তিনদিনের কথা রেকর্ড করে নিজে শুনে সিমকিকে এবং তোমাদের শুনিয়ে তারপর হাফসাফে বলব। যদি শুভ্র আর রুদ্র না থাকত আজই হতো হাফসার সাথে আমার শেষ দিন।

চুমকি বলল, ছোটমামা তুমি আসলেই মেন্টাল কেইস নয় তো?

চারদিন পর ডকুমেন্টসহ আসছি।

ছোটমামা সিমকিকে জিজ্ঞেস করল হেয়াট ইজ ইয়োর ডিসিশন?

সিমকি বলল, বিয়ে যেহেতু আমি ঠিক করিনি, তোমরা ঠিক করেছো, বিয়ের তারিখও তোমাদের ঠিক করা। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন?

ছোট মামা বেরোবার আধঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব চুমিকদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। মাইকে জোর গলায় বলল, এই ভবনে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে। এই বাড়ি সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। কেউ বেরোতে চেষ্টা করলে গ্রেফতার করা হবে। হ্যান্ডমাইকে আরো ঘোষণা করা হলো, এটি একটি প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে রোগ। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর নাম মোদাব্বের হোসেন বয়স সত্তরের উপরে, তিনি এই বিল্ডিংয়ের চারতলার ডানপাশের ফ্লাটে থাকতেন। এই ফ্লাটের বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ যদি তার সংস্পর্শে এসে থাকেন তিনিও বিপদজনক ভাইরাস বহন করে থাকতে পারেন। অবিলম্বে তাকে সনাক্ত করুন এবং আমাদের কাছে হস্তান্তর করুন।

মোদাব্বের হোসেন দূরের কেউ নন, সিমকিদের একমাত্র ভাই রাতুলের শ্বশুর, ডায়নার বাবা। নভোচারীর মতো পোশাক পরা লোকজন মোদাব্বের হোসেনকে চারতলা থেকে নামিয়ে এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে তিনি চিৎকার করছিলেন, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।

ডায়না ভাবির সাথে তার শ্বাশুড়ির খারাপ সম্পর্ক থাকলেও ডায়নার বাবা আসার পর তিনি তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। আবার মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমিয়েছে সিমকি। চুমকি এবার চড়াও হলো মা ও বোনের ওপর, তোমরা কোয়ারেন্টাইনে চলে যাও। চৌদ্দ দিনের আইসোলেশনের পর যদি সুস্থ থাকো তবেই কথাবার্তা হবে নতুবা এই-ই শেষ। আল বিদা।

তারপর রুমকির সামনে করোনাভাইরাস কত ভয়ঙ্কর রোগ, শ্বাসকষ্টে কেমন দুঃষহ মৃত্যু ঘটে তার একটি বর্ণনা দিল। ভয়ঙ্কর এক ধমক দিল আমাকে সাবধান রুম থেকে বেরোবে না, তুমি অনেক অশান্তি আমাকে দিয়েছো, দয়া করে এইবার মা আর সিমকির কাছ থেকে করোনাভাইরাস এনে আমাকে দিয়ো না।

রুমকি তার স্বামীকে বলল, যেভাবেই হোক ভিঞ্চিকে বাঁচাতে হবে, একটা ট্যাক্সিক্যাব ডাকো, আমরা আবার চুয়াডাঙ্গা চলে যাব। সমস্ত নষ্টের মূল হচ্ছে আমার মা। কী দরকার ছিল ঐ ঘাটের মরাটাকে দেখতে যাবার?

রইস আহমেদ বলল, লকডাউন মানে বোঝো? প্লেন যেমন বন্ধ ট্যাক্সিক্যাবও। তাছাড়া কাল দেখোনি টিভিতে রাস্তায় বেরোলে পুলিশ কান ধরে উঠবস করাচ্ছে।

হঠাৎ আমাদেরটা ফ্ল্যাটটা ভুতুরে ফ্লাট হয়ে উঠল।

টোকা দিলে শুধুমাত্র রুমকি আর ভিঞ্চির জন্য আমাদরে রুমের দরজা খোলা হয়, দুজন আমাদের বাথরুম শেয়ার করে।

রুমকি যখনই ঢোকে তখনই একটা না একটা মৃত্যুসংবাদ দেয়। ইতালির মিশানে মারা গেছে রইসের বড়মামা কামাল আহমেদ, নিউ ইয়র্কে রুমকির বন্ধবীর বড়বোন ও তার খালা শাশুড়ি।

সিমকির বিয়ে নিয় আলোচনা হঠাৎ থেমে গেছে। আমাকে ডিভোর্স করার নোটিশের ড্রাফট চূড়ান্ত হয়ে আছে। অনেকদিন ধরেই, করোনাভাইরাসের প্রকোপ হবার আগে থেকেই আমি ও চুমকি বিছানাতেও স্যোশাল ডিসট্যান্স রক্ষা করে চলেছি। এখন তো আরো স্ট্রিক্ট হতে হচ্ছে। আমি দেয়ালের দিকে মুখ করেই ঘুমোই সকালে ঘুম ভাঙলে দেখি চোখের সামনে দেয়াল। চুমকি দেখে চোখের সামনে জানালা।

জ্বরটা হঠাৎ করেই এলো, বাড়লও খুব দ্রুত। মাঝরাত কি তার পরে আমি কাঁপতে শুরু করলাম। আমার লেপ দরকার কিন্তু এত রাতে কাকে বলি—চুমকির সাথে এক বিছানায় থাকলেও আমাদের টকিং টার্ম নেই। আমি দেয়ালের দিক থেকে চাদরসহ তোশকটা টেনে নিজেকে এর ভেতর সেঁটিয়ে দিই। কিন্তু তাতে আমাকে বিছানার প্রায় মাঝামাঝি চলে আসতে হয় তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে আমার হাত চুমকির ওপর পড়েছে না চুমকির হাত আমার ওপর বলতে পারব না, কিন্তু ঘুমটা, যখন ভাঙে বুঝতে পারি আমরা দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে আছি। তারপর বহু যুগের অভুক্ত নরনারীর বেলায় যেমন হয়, পরস্পরের শরীরে এখানে ওখানে ধরতে ধরতে আমাদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল।

তারপর চুমকি বলল শরীর এত গরম কেনো? করোনাভাইরাস ঢোকেনি তো? আমাকে আবার ইনফেকটেড করছো না তো?

আমাদের পুরো ব্যাপারটাই অন্ধকারে ঘটে। নীলাভ ডিমলাইটের সুইচ অন করে চুমকি দুটো প্যারাসিটামল বের করে আনে। পানিসহ ট্যাবলেট এগিয়ে দেয়। বলে, আগে টেম্পারেচার কন্ট্রোলে আসুক।

সকালে যখন ঘুম ভাঙে, অনেক অনেকদিন পর আবিস্কার করি আমরা মুখোমুখি শুয়ে আছি।

দুই.
চৌদ্দ দিন পর সিমকি এবং তার মা আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়। ডায়ানার বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেননি। সরকারের পিপিই পরা লোকজন তাকে খিলগাওয়ে কোনো একটি কবরস্থানে সমাহিত করেছে। সিমকি মুক্ত হবার তিন কি চারদিন পর ছোটমামি হাফসা মাস্ক গ্লাভস এসব পরে বাসায় এসে সবাইকে শুনেয়েই বলে, আল্লাহর রহমতের শেষ নেই। যদি এই ভাইরাসটার কারণে লকডাউন না থাকত সিমকি তোর অনেক ভোগান্তি হতো। ভাগ্যিস এয়ারপোর্ট বন্ধ। বুঝলি রাশেদের কথায় আমার খুব সন্দেহ হচ্ছিল এজন্য কদিন ধরে পটিয়ে পটিয়ে বের করলাম তার একটা বউ আছে, বউয়ের নাম পেনিলোপ ক্রুজ। আমি মুখের উপর বলে দিয়েছি, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ, নো ফারদার টক। সিমকিকে তোমার মতো বদমাশের কাছে বিয়ে দেব না।

সে রাতেই ছোটমামা ফোন করে বললেন, একচুয়ালি হাফসা নিজেই প্রতারিত বোধ করে আনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছে।

২৫ মে ঈদ উল ফিতরের সকালে চুমকি বলল, দিলে তো আমাকে ফাঁসিয়ে। পিরিয়ড মিস হলো। ভাবলাম যে কোনো সময় শুরু হবে। এখন ইউরিনে স্ট্রিপ চুবিয়ে দেখি পজিটিভ—এই দেখো, টেস্ট লাইনের রঙটা দেখো। আমি এখন কোনটা সামলাব—প্রেগন্যান্সি না ডিভোর্স?

টুয়েন্টি টুয়েন্টির করোনাভাইরাস সংক্রমণকালের লকডাউনে শেষ পর্যন্ত আমি ও চুমকি সোশাল ডিস্ট্যান্স বজায় রাখতে পারিনি। চুমকির পিরিয়ড মিসের সূত্র ধরে আমরা একটি বাবুর জন্মের অপেক্ষায় আছি।

আমাদের অনিবার্য তালাক অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে গেছে।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;