ডেরেক ওয়ালকটের কবিতা : উড়াল জাহাজ



অনুবাদ: বর্ণালী সাহা
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

‘দ্য স্কুনার ফ্লাইট’ ডেরেক ওয়ালকটের একটি দীর্ঘ কবিতা। বর্ণসংকর এক নাবিক, যে আবার কবিও—এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তার সমুদ্রযাত্রা নিয়ে রচিত এই কবিতা, যেখানে উঠে এসেছে ওই অঞ্চলটির জাতিবৈরিতা এবং ইতিহাসের পরতে পরতে লুকোনো লাঞ্ছনা, প্রত্যাখানের আখ্যান। মূল চরিত্রটি বর্ণসংকর হওয়ার কারণে না কৃষ্ণাঙ্গ না শ্বেতাঙ্গ কোনো গোষ্ঠীতেই তার স্থান হয় না। কালোদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার আগে সে যেমন শ্বেতাঙ্গদের কাছে পরমানুষ ছিল, ক্ষমতা বদলের পর কালোদের কাছেও যথেষ্ট কালো না হওয়ার দরুণ সে বহিরাগত। আর এর মাঝে প্রেমিকা মারিয়া, সমুদ্র আর আকাশের তারার চেয়েও বিশালসংখ্যক দ্বীপপুঞ্জ তাকে ঘুরিয়ে মারে। তার অতীতচারণা আর বর্তমানের ঘটনাবলী পাঠকদেরকে শুধুমাত্র ক্যারিবিয়ার ইতিহাস আর বর্ণবৈষম্যের সাথেই নয় পরিচয় করিয়ে দেয় সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা সৃষ্ট গভীর-গহন ক্ষতের সাথে। সাম্রাজ্যবাদ যে বর্ণবৈষম্যের ধারণাটি শাদাদের মতোই কালোদের মধ্যেও রোপণ করে দিয়েছে—তার সাক্ষাৎ দলিল ওয়ালকটের এই অমর চরিত্রটি। এই কবিতাটি ডেরেক ওয়ালকটের মহাকাব্য ওমেরস-এর পূর্বে লিখিত। তাই এটি ওমেরসের ভাবনাবলয় সৃষ্টিতেও ওয়ালকটকে সাহায্য করেছে যথেষ্ট পরিমাণে। কবিতাটির সমুদ্রযাত্রা যেন এক মহাকাব্যের সূচনা কিংবা অন্যভাবে মহাকাব্যিক কাঠামোতে লিখিত একটি গীতিকবিতা। কবিতাটি ডেরেক ওয়ালকটের নির্বাচিত কবিতা ১৯৪৮-১৯৮৪ থেকে নেওয়া হয়েছে। - বিভাগীয় সম্পাদক


*
১ বিদায়, কারেনাজ, জলযানশোধনের ঘাট!

অলস আগস্টমাসে যখন সমুদ্র কোমল হয়ে ছিল,
আর এই ক্যারিবিয়ানের কিনারার
সাথে সেঁটে ছিল খয়েরি দ্বীপগুলি
গাছের পাতার মতো, তখন আমি
উড়াল নামের সেই জাহাজে নাবিক হয়ে চড়ব বলে
ফুৎকারে নিভিয়ে দিলাম বাতিখানি—
মারিয়া কনসেপশিওনের নিঃস্বপ্ন মুখের কাছেই যেটা জ্বলতেছিল।
আঙিনাটা পাংশুটে হয়ে যাচ্ছিল, আলো ফুটছিল যেই,
ওইখানে দাঁড়ালাম পাথরের মতো
আর বাকি সবকিছু অনড়, স্থবির,
শীতল সাগর ছোট তরঙ্গ ভাঙছিল, যেন ঢেউটিন,
আকাশের ছাদে গাঁথা পেরেকের ছিদ্রের মতো লাগছিল আকাশের তারাদের,
ততক্ষণে একটা বাতাস এসে গাছেদের সাথে কেমন
গায়ে-পড়া ভাব শুরু করে।
নিজের উঠান ঝাঁট দিচ্ছিল প্রতিবেশিনী,
রসকষ নাই মোটে তার, তাকে পার হয়ে ঢাল ধরে নেমে যেতে যেতে আমি প্রায়
বলেই বসছিলাম, “আস্তে ঝাঁট দে, শালি! ওর ঘুম পাতলা অনেক,”
তবুও সেই মাগি তাকাল আমার দিকে এমনভাবে,
যেন আমি নাই, যেন আমি মরা লাশ।
রুটের ট্যাক্সি এসে থামল, তখনো হেডলাইট জ্বলছিল।
ড্রাইভার ব্যাটা দেখি আমার ব্যাগের আগাপাশতলা দেখল হাসি-হাসি মুখে,
দাঁত ক’টা বের করে বলল, “এবার বুঝি, হাইব্রিড, সত্যই ভাগতেছ তুমি!”
গাধার বাচ্চাটাকে জবাব দিলাম না,
কেবল কোনোরকমে উঠে বসলাম আমি পিছনের সিটে।
ঘুলঘুলি বস্তির ঠিক উপরে
দেখলাম আকাশটা পুড়ছে অরুণিমায় গোলাপি হয়ে,
এমন গোলাপি যেন ঘুমের ম্যাক্সি তার, ঘুমের ভিতর যাকে ফেলে এসেছি।
রিয়ারভিউয়ের আয়নার দিকে চেয়ে দেখলাম,
সেখানে একটা লোক, দেখতে সে হুবহু আমার মতোই,
হাপুসনয়নে কাঁদছিল লোকটা
বাড়িগুলি, পথগুলি,
বালের দ্বীপটা জুড়ে যা আছে সকলই,
সকল কিছুরই জন্য।

যা কিছু ঘুমন্ত,
তা সবে রহম করো পরওয়ারদিগার!
রাইটসন রোডে যেই কুকুরটা পচতেছিল তারে দিয়ে শুরু ক’রে
আমারেও দয়া করো প্রভু,
আমিও তো এইসব রাস্তার কুকুর ছিলাম;
এই দ্বীপপুঞ্জরে ভালবাসবার বোঝা বহন করাই যদি আমার নিয়তি
হয় তবে আমার আত্মাপাখি উড়ে যাক পচনের থেকে।
কিন্তু জান কি, ওরা আমার আত্মাটাতে বিষ ঢালা শুরু করেছিল
ওদের বড় বড় বাড়ি আর গাড়ি আর বড় বড় অঙ্কের লুটপাট দিয়ে,
কুলি আর কালা আর সিরীয় কি ফরাসী দোআঁশলায় গুলজার,
তাই আমি ফেলে যাই এই সবকিছু
ওদের তরে, আর ওদের তামাশা-মোচ্ছবের তরে—
এই করে নিলাম আমি সাগরে গোসল,
এই চললাম পথ ধরে।
এই দ্বীপগুলিরে তো চিনি হাড়হদ্দ
দক্ষিণে মনস থেকে উত্তরের নাসাউ দ্বীপতক,
মগজে মরচে-ধরা নাবিক আমি,
নীলাভ সবুজ চোখ, হাইব্রিড বলে ওরা ডাকে আমাকে,
ভদ্রভাষায় লাল পিঁপড়া বলে যাকে; আমি, হাইব্রিড,
দেখেছি কেমন এই বস্তির মতো সাম্রাজ্যসকল
এককালে বেহেশত ছিল।
আমি এক সামান্য লাল পিঁপড়াই যার সাগর ভাল লাগে,
বিলাতি শিক্ষা ছিল দড়,
আমার মধ্যে আছে একাধারে ডাচ, কাউলা এবং ইংরেজ,
হয় আমি কেউ নই, নয়তো আমিই এক জাতি।

মারিয়া কনসেপশিওন তবু ছিল মোর ভাবনার সমস্তটাই,
সাগরের স্পন্দন, সাগরের ওঠানামা দেখতে দেখতে
জেলেদের ডিঙি আর পালতোলা জাহাজ আর প্রমোদের নাও-
ভেড়া বন্দর যেথা নবীন ছবিতে আঁকা সূর্যের তুলির টানে,
স্বাক্ষর করা তারই নাম সূর্যের প্রত্যেকটা প্রতিচ্ছায়া দিয়ে;
আঁধারের কালো এলোচুল নিয়ে সন্ধ্যা যখন
সূর্যাস্ত-রঙের উজ্জ্বল সিল্ক যেটা মারিয়ার ছিল,
সেটা গায়ে দিত,
আর ভাঁজ করে নিয়ে সমুদ্রটাকে
লুকিয়ে পড়ত চাদরের নিচে মারিয়ার সেই
বিখ্যাত তারা-ঝিলমিল হাসি হেসে,
আমি জানতাম আমি বিরাম পাবো নাকো, ভুলে যাওয়া আর হবে না।
কবরের পাশে বসে মৃতের স্বজনেরা বিলাপ করছে ধর, তখন যদি
পুনর্জন্মের কথা কেউ বলে ওদের কাছে,
ওরা তো চাইবে মৃত মানুষ বেঁচে উঠুক, ঠিক কিনা বল?
আগাগলুইয়ের কাছি খুলে গিয়ে উড়াল যখন
দোলবাজি দিয়ে দরিয়ার মুখে চলে যায়, তখন আমি নিজমনে হাসি:
“সাগরে জাল ছড়ালে মাছের অভাব হয় না—এই কথা
বারবার বলে লাভ কী?
আমি চাই না তাকে অসম্ভোগবিদ্ধা,
ভূষিত চাই না তাকে ফেরেশতানিন্দিত নূরে,
পর্ণমৃগের মতো বর্তুল ওই দু’টি কালো চোখ চাই,
ঘামে ভেজা রবিবার দুপুরে পিঠের ‘পরে নখাঘাতে সুড়সুড়ি দিত যে আঙুল,
ভেজা বালিকে শূলানো কাঁকড়ার মতো,
সে আঙুল চাই ততদিন
যতদিনে না আমি একটু হেলান দেবো, একটু হাসতে পাবো নির্ভাবনায়।”
এই যে কাজের মাঝে দেখছি সমুদ্রকে রেশমের মতো চিরে দিচ্ছে
আগাগলুইয়ের কাঁচি, তাকে পার হয়ে হু-হু ক’রে বাজে-বকা ঢেউ ছুটে আসতেছে,
তোমাদের বলি শোনো কসম খেয়ে –
মায়ের দুধের কিরা, রাত্রির চুল্লির থেকে আজ যত তারা
উড়বে, দোহাই তাদেরও—
ঠিকই ভালোবেসেছিলাম আমি
আমার ছেলেমেয়েকে, আমার বউকে আর ঘরকে আমার;
যেমন কবিরা ভালোবাসে সেই কবিতাকে, যে কবিতা কবিদেরই প্রাণনাশ করে,
যে নাবিক ডুবে মরে—সে যেমন ভালোবাসে সমুদ্রকে।

কখনো কি একাকী সাগরতটে চোখ তুলে
দেখেছ তুমি সুদূরে একটা জাহাজ?
এই যে কবিতাখানি লিখছি, আমার শব্দেরা সব সপসপে নুনে ভিজে যাচ্ছে;
তবে আমি যাই,
টেনে ধরি আর টাইট ক’রে গিঁট দিয়ে বাঁধি একএকটা লাইন এই মাস্তুলে-পালে;
সরল বয়ানে মোর সাধারণ ভাষা হোক পালের বাতাস,
কাগজের পাতা আজ পাল হোক তবে
উড়াল জাহাজের।
আগে তবে বলি শোনো কেমন করে এ কারবার শুরু হলো।

*

২ চরমানন্দ, অতলম্‌!

ও’হারার জন্য স্কচের বোতল কিছু পাচার করেছিলাম, বড় সরকারী চাঁই সে,
দারূবৃক্ষের দ্বীপ সেডরোজ থেকে মেইনল্যান্ডখণ্ডে, তাই
উপকূলরক্ষীরা ধরতে পারেনি আমাদের,
স্প্যানিশ কিশ্‌তি-কোশাগুলির সঙ্গে বরাবর আপস-রফাই হতো,
তবু একটা কণ্ঠ আমায় বলে যেত:
“দ্যাখ্‌ হাইব্রিড, এই ব্যবসাটা কীরকম বোম্বেটেগিরির!”
নিয়তির কথন, সে গেল নাকো খণ্ডানো! সমস্ত কারবার ধসে পড়ল। আর
আমি ধসে পড়লাম একজন নারীর কারণে,
তার ফিতা, জরি, সিল্কের কারণে,
মারিয়া কনসেপশিওন তার নাম।
আর হায়, এরপরই শুনলাম
তদন্ত কমিশন বসবে বিরাট অনুসন্ধানকল্পে, মজার ব্যাপার
হলো ও’হারা নিজেই চেয়ারম্যান হয়ে
অবৈধ মদ পাচারের কেস তদন্ত করবে নিজের।
আমার ভালই জানা ছিল গোয়ামারাটা কে খাবে,
হাঙরের চামড়ায় ঢাকা ওই হাঙরটা নয়, তার সঙ্গের ফেউমাছটা—
তোমার-আমার মতো খাকি প্যান্ট-পরা সাধারণ লাল পিঁপড়াই ছিল সে।
এর চেয়ে আরো বাজে ছিল, মারিয়ার সাথে আমার ঝগড়া চলছিল,
প্লেট-গ্লাস ছোঁড়াছুঁড়ি, জঘন্য, তাই আমি প্রতিজ্ঞা করি: “আর নয়!”
আমার বাড়ির লোক, আমার ফ্যামিলিটাকে চুরে-মেরে শেষ করে দিচ্ছিলাম আমি।
এমনই ফকির আমি হয়ে গেছিলাম,
সানগেলাস একখান আর একখানা শুধু মদের গেলাস
হলেই আমার চলে যেত,
অথবা চারটা করে গেলাস এবং সানগেলাস (যেমন
নাজাত পাওয়ার তরে ধর্মবিশ্বাসীর লাগে),
তাই নিয়ে বসে যাব চার-গেলাসীর রাজধানী শহরে;
পয়সা বলতে মোর ছিল শুধু সাগরের রুপালি কয়েন।

মন্ত্রীদেরকে নিশ্চয়ই দেখেছ আজকের বার্তা পত্রিকায়,
গরিবের বাপমা উনারা—ওদের পিঠের
উপর একটা হাত রাখা উনাদের,
আর একখানা পুলিশের দল রাখা
শুধু উনাদের বাড়ি পাহারা দিতেই,
স্কচের নহর বয়ে যাচ্ছে সেই বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে।
এখন আসা যাক সেই মন্ত্রী নামধারী পিশাচের কথায়–
মদ চোরাচালানের হোতা ছিল যে,
শালা আধা-সিরিয়ান গিরগিটি, ওর মুখটা
পুরু পাউডারে মাখানো,
আঁচিলগুলি আর পাথর চোখের পাতাগুলি দেখে মনে হতো
অনাদিকালের কোনো পচাগলা পাঁক চুয়ে চুয়ে
পিণ্ড জমাট বেঁধে গেছে;
ধনদৌলতে চুবিয়ে রাখা সে মুখটা
যখন আমি দেখলাম ঠাডা-পড়া, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের নিকটে,
গায়ে জ্বালা ধরে গেল মোর।
বলে উঠলাম আমি, “হাইব্রিড, বুঝলানি, কী বালের এইসব!”,
তাতে ব্যাটা কাকে যেন ডেকে
লাথ মেরে ভাগাল আমারে,
বিদায় করাল তার অফিসের থেকে যেন আমি কোনো ভ্যাগাবন্ড আর্টিস্ট।
হারামির গুমোর কত!
সিংহাসনের থেকে নিচে নেমে এসে
নিজের পা লাগিয়ে লাথিটাও দেন না উনি।
এমন সব জিনিস চোখে দেখেছি,
যেসব দেখলে কেনা বান্দির পোলাদেরও বমি আসবে,
এই ত্রিনিদাদে, এই রক্ত-গন্ধশোঁকা ডালকুত্তাদের
মহাজনপদে।

মাথার ভিতর থেকে সাগরের কোলাহল ঝেড়ে ফেলে দিতে পারলাম না,
কর্ণলতির শঙ্খ শুধুই গাইছিল মারিয়া কনসেপশিওন,
তাই আমি কাজ শুরু করি
এক পাগলাচোদা আইরিশের সাথে উদ্ধারজাহাজের ডুবুরি হিসাবে,
লোকটার নাম ছিল ও’শনেসি, আর
ব্রিটিশ একটা মাল ছিল ‘হেড’ নামে;
কিন্তু এ ক্যারিবিয়ানের জল এমনই
রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে লাশে,
যেই না গলে-গলে মিশে যেতাম আমি পান্নাপানিতে,
মাথার উপরে জলছাদ ঢেউ তুলত
যেন কোনো রেশমের তাঁবু,
দেখতে পেতাম আমি প্রবালের দল: কেউ মগজ, কেউ আগুন, সাগরপাখা,
কেউ মরা মানুষের আঙ্গুল যেন,
আর তারপর, সাক্ষাৎ মরা মানুষ আমি দেখতে পেতাম।
সেনেগাল থেকে সালভাদর পর্যন্ত গুঁড়া-গুঁড়া পাউডার বালি
ওই মরা মানুষের হাড্ডি-চূর্ণ যেন, শাদা গুঁড়া করে রাখা আছে।
তিনডুবে গিয়ে আমি আতঙ্কে ভেসে উঠলাম,
একমাস নৌজীবী-হোস্টেলে থাকলাম। মাছের পাতলা ঝোল, সুরা-নসিহত।
যখনই মনে হতো, বউটারে আমার কী দুঃখ দিয়েছি,
যখনই নিজের যন্ত্রণা দেখতাম ওই অন্য মেয়েলোকটা নিয়ে,
সাগরজলের নিচে কানতাম আমি,
লবণে লবণ মিশায়ে,
রূপ তার তলোয়ার হয়ে পড়েছে এমনই আমার উপরে,
কোপ দিয়ে আলাদা তা করে দিয়েছে আমারে আমার সন্তানের থেকে,
মাংসের ভেতরেরও মাংস ওরা আমার; বাছারা আমার!

সেন্ট ভিনসেন্ট দ্বীপ থেকে আসা একখানা বজরা ছিল, যদিও সেটা
এতই গভীর ছিল, ভাসানো যেত না তাকে আর।
যখন আমরা মদ খেতাম, ব্রিটিশটা
পেরেশান হয়ে যেত ঘ্যানঘেনে কান্নায় মোর,
মারিয়া কনসেপশিওনের জন্য আমি এত কানতাম।
ব্যাটা বলত সে নাকি গাঁটের ব্যথায় ভুগতেছে—
গ্যাসবুদবুদ জমে ডুবুরির দেহে যেটা হয়।
কপাল ভাল ব্যাটার! মারিয়া কনসেপশিওনের জন্য মোর পরানে যে ব্যথা,
যে ব্যথা দিয়েছি আমি বউ আর ছেলেমেয়েদের,
তার চেয়ে ভাল গাঁটে ব্যথা হয়ে মরা।
জলের গভীরে যেই পুলক-সমাধি,
সেখানে এমন কোনো শিলা ছিল না,
যেটার ফাটলে আমি আমার আত্মামণি লুকিয়ে রাখতে পারতাম,
যেমন লুকিয়ে পড়ে উদোপাখি প্রতি গোধুলিতে,
এমন আলোর বালুতট কোনো ছিল না কোথাও,
যেখানে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া যেত, চিতিঠুঁটি পাখিরাও সেটা জানে,
তাই একবার আমি সমাধি নিলাম, আর খোদাকে দেখলাম
কোঁচবেঁধা বোল মাছ যেন, খুনআলুদা রক্তাক্ত শরীর,
দূরের কণ্ঠ এক গুমগুম নির্ঘোষে বলল আমায়, “হাইব্রিড যদি তুই
তারে ছেড়ে যাস যদি তারে ছেড়ে যাস,
তোর হাতে তুলে দেবো ভোরের তারা।”
যখন সে পাগলাগারদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম,
ভিন্ন মেয়েলোকের স্বাদ নিতে গেছি, তবু একবার কাপড় খুলত ওরা যেই,
ওদের ছুঁচালো মাঙ সিন্ধুসজারুর ডিমের মতন
লোমকাঁটা দিয়ে দাঁড়িয়ে যেত, তাই আমি
ডুব দিতে পারি নাই আর।
ইমাম সাহেবও এসে ঘুরে গেলেন। আমি পাত্তা দিলাম না।
কোথা আছে বিশ্রামশালা মোর, হায় খোদা? কোথায় আমার বন্দর?
কোথায় বালিশ যার ‘পরে মাথা রাখতে মূল্য চুকাতে লাগবে না?
আর সেই জানালা কোথায়, যার চৌকাঠ জীবনের কাঠামো হয়ে থাকবে,
যেই জানালার থেকে বাইরে তাকিয়ে র’ব আমি?

*
৩ হাইব্রিড ছেড়ে যায় মহাজনপদ

এখন আমার
আর কোনো দেশ নাই কল্পনা ছাড়া।
এখন তো ক্ষমতা কালাদের দিকেই ঝুঁকেছে,
ক্ষমতার দোলাচল ঘটার আগে
যেমন শাদারা চাইত না,
কালারাও একইভাবে চায় না আমাকে।
প্রথমজন এসে আমার হাতদুটোকে শেকলে বাঁধল আর মাফ চেয়ে বলল,
“ইতিহাস”;
দ্বিতীয়জন এসে বলল আমাকে আমি যথেষ্ট কালো নই,
জাতিগৌরবের যোগ্য হতে যতটা কালো হওয়া লাগে।
আচ্ছা বল দেখি,
কিসের কী ক্ষমতা-টমতা এই অচিন প্রস্তরের ভুঁয়ে—
পিচকারি-প্লেনওলা বিমানবাহিনী আর ফায়ার ব্রিগেড,
লাল ক্রস, পাইক রেজিমেন্ট,
দুইটা কি তিনটা পুলিশ-কুকুর
তোমার সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে
যতক্ষণ না তুমি হাঁক পেড়ে সারো,
“প্যারেড, সাবধান!”?
ইতিহাস সাহেবের সাথে একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল,
যদিও আমাকে উনি চিনতে পারেন নাই, পার্চমেন্ট—মানে
পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি কাগজ হয় যেমন, তেমন উনি
শাদা সেটেলারজাত শাদা ক্যারিবীয়,
শরীরে বৃদ্ধ এক সিন্ধুবোতলের
মতো ছিল অজস্র আঁচিল,
কাঁকড়ার মতো গুড়ি দিয়ে চলছিলেন
গ্রিল থেকে ছায়া যেই জালের মতন পড়ে বারান্দাতে, সেই জালের ফাঁকে।
ক্রিমরঙা লিনেনের কাপড়জামা, হ্যাট একই রঙ, লেফাফাদুরস্ত।
তাঁর মুখোমুখি হয়ে হেঁকে বললাম, “হুজুর, আমি হাইব্রিড!
ওরা বলে আমি আপনার নাতি। আপনার কি মনে আছে
আমার দাদীকে একটুও, আপনার
রাঁধুনি ছিল, জাতে কালো?”
হারামিটা খক্‌ করে থুতু ফেলল।
এরকম এক থুতু অগণন কথার সমান।
হারামজাদারা তবু আমাদের জন্য
বাকি রেখেছে তো শুধু ওই:
কথা আর কথা।

আমি আর বিপ্লবে বিশ্বাস করতাম নাকো।
নিজের মানবী বলে যাকে জানতাম তার ভালবাসার থেকে
বিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল।
আলেক্সান্দর ব্লককে পড়েছি, তাঁর ‘ওরা বারো জন’ কবিতায়
ওই মুহূর্তটাকে পষ্ট করেই দেখিয়েছেন।
এক রবিবার দুপুরে,
মেরিন পুলিশ ব্রাঞ্চ আর ভেনেজুয়েলানা হোটেলের মাঝে আমি ছিলাম।
জোয়ান ছেলের দল ওদের গায়ের শার্ট খুলে পতাকা বানিয়েছিল,
ওদের বুক খোলা—বিদীর্ণ হয়ে যাবে সে অপেক্ষায়।
পাহাড়ের ভিতর এগিয়ে যাচ্ছিল ওরা দুর্বার, আর
যেই না সমুদ্রের ফেনা উঠে গেঁথে গেল বালির মর্মস্থলে,
ওদের কলধ্বনি থেমে গেল, আর
বৃষ্টির মতো ডুবে গেল তারা উজ্জ্বল পাহাড়ে,
প্রত্যেকে নিজ-নিজ বাদলা মেঘ সমেত ঝরে গেল, আর
রাস্তায় ফেলে গেল গায়ের জামা,
এবং ক্ষমতার প্রতিধ্বনি
রেখে গেল সরণির শেষ মাথাতে।
বেঁটে পাখাওলা ফ্যান ঘোরে সংসদীয় উচ্চসভার উপরে;
বিচাপতিরা নাকি, দুর্মুখে এও বলে, এখনো ঝরান
রঞ্জক-কেমিক্যাল মেশা লাল ঘাম,
ফ্রেডরিক সরণিতে গোঁফখেজুরের দল মিছিলযাত্রা করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চল,
নতুন বাজেট আসে, পাতা ওল্টাও এবে। সাড়ে বারোটার
সিনেমা দেখতে গিয়ে হলের প্রোজেক্টর নষ্ট না-হলেই বাঁচোয়া,
নইলে বিকল্প আছে: গিয়ে বিপ্লব দেখ!
পর্দার সামনের তৃতীয় সারিতে
আলেক্সান্দর ব্লক এসে বসে যান চকলেট কোন খেতে খেতে,
স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবি শুরু হবে একটু পরেই, ক্লিন্ট ইস্টউড
আছে এই ছবিতে; নামভূমিকায় আছে লী ভ্যান ক্লিফ।

*
৪ উড়াল পেরোয় রজকিনী গ্রাম

গোধূলিবেলা।
উড়াল পেরিয়ে যায় রজকিনী গ্রাম।
চাকার মতন যত সমুদ্রচিল।
আবার বন্দুকের ঘায়ে ফেনা শাদা থেকে বাদামী স্ফটিকরঙা হয়,
আকাশের তারাগুলি লাইটহাউজের সাথে শুরু করে দোস্তি জমানো,
প্রতিটি সাগরতটে এসে শেষ হয়ে যায় সুদীর্ঘ দিন,
সেখানে, বালির সেই বিস্তারে, তার শেষভাগে
একটি রিক্ত সৈকতে যেথা আলো ছাড়া আর কিছু নাই,
কার যেন গাঢ় হাত কালো সমুদ্রটার জালের খেপ ধরে টানা শুরু করে,
টেনে নিয়ে যেতে চায় তারে
গভীর, গভীর স্থলভাগে।

*
৫ (আদিদাস পন্থের) মজঝিম পাথারের মুখোমুখি হাইব্রিড

তার পরদিন ভোরে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেলাম আমি, কিছু তাড়া ছিল,
একটু কফি বানাতে হবে;
সাগরের থেকে কুয়াশার কুণ্ডলী উপরের দিকে উঠছিল
ধোঁয়া বের হওয়া কেটলিখানার মতো,
কেটলিটাকে নামিয়ে রাখলাম ধীরে, অতিধীরে,
কারণ নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না:
দিগন্ত যেইখানে রুপালি এক অবচ্ছায়া হয়ে ছিল,
কুয়াশা সেইখানে পাক খেয়ে, ফুলে গিয়ে, হয়ে উঠেছিল
নৌবহরের পাল, এত কাছে যে
চাক্ষুষ দেখলাম ওইগুলি নৌকার পালই ছিল বটে,
চুল খাড়া হয়ে গেল, খামচে ধরল মোর খুলি,
কী যে ভয়ঙ্কর সেটা, তবু যে কী সুন্দর!
জাহাজের বহর তো নয় যেন মর্মর-পাতার জঙ্গল,
পালগুলি শুকনা কাগজ,
তারই মাঝ দিয়ে ভেসে গেলাম আমরা,
কাচের এপার থেকে দেখি আমি ওখানে মানুষ—
মরিচাধরা ওদের চোখের গর্ত,
কামানের খোলের মতন,
অর্ধ-উলঙ্গ ওই নাবিকেরা
সূর্যকে পাড়ি দিল যেই—
সূর্যের রশ্মিতে তুলে ধরা পাতা যেমন দেখা যায়—
ঠাহর করলে তুমি তেমনই দেখতে পেতে নাবিকগুলির হাড়গোড়
চামড়ার কলা ভেদ করে;
ফ্রিগেট, বার্কেনটিন—বিখ্যাত জাহাজ এসব—উজানের ঢেউ ক্রমশ তাদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
দেখলাম ডেকের উপর
বড় বড় নৌসেনাপ্রধানেরা উদ্ধত দাঁড়িয়ে আছে,
রডনি, নেলসন, ডে গ্রাস প্রমুখ,
হুকুম করছে ওরা বাজখাঁই গলায় ওই জাহাজের হাইব্রিডদের,
জঙ্গলের মতো সেই মাস্তুলের ঝাড়
উড়ালকে ভেদ করে ভেসে চলে গেল, তারপর
জমিন ঘেঁষে বাতাস বয়ে গেলে পরে ঘাস শনশন করে যেরকম,
সেরকম অশরীরী শব্দ উঠল ঢেউয়ে, আর জাহাজের পাছাড়িতে
জড়ানো জলজ আগাছাগুলি
হিসহিস করল
ঢেউ যেই ওগুলিকে হিঁচড়ে নিয়ে গেল,
আর কিছু শোনা গেল না;
ঢেউগুলি ভেঙে ধীরে দোলা দিয়ে চলে গেল পুব থেকে পশ্চিম দিকে,
যেন এই গোলাকার পৃথিবীটা কোনো
হাতল-ঘোরানো এক জলচাকা কল,
কাঠের ছেঁওতি-বালতির মতো যেন তায় প্রতিটা জাহাজ—
অঝোরে ঢালছে জল, অতল তলের থেকে সেঁচা;
আমার অতীতস্মৃতি ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার অগ্রজ
সকল নাবিককে কেন্দ্র করে,
তারপর সূর্য দিগ্বলয়ের অঙ্গুরিটাকে তাতিয়ে তুলল আর
বাষ্প হয়ে গেল ওরা।

এরপর পার হই বাণিজ্যতরী—ক্রীতদাস চালান দেওয়ার।
সব জাতিরাষ্ট্রের পতাকাখচিত,
পাটাতনের এত গভীরে সেঁধিয়ে আছে আমাদের পিতা-পিতামহেরা,
আমাদের হাঁকডাক শুনবে না মনে হয়। হাঁকডাক আমরা থামাই তাই।
কে জানে কে কার দাদা? নাম জানা সে তো আরো দূরের কথা।
কাল আমাদের গন্তব্যস্থল হবে বারবাডোজের তটরেখা।

*
৬ নাবিক ঝাউগাছকে গানের জবাব দেয় গানে

উনাদের দেখা যায় বারবাডোজের নিচু পাহাড়ের গায়ে
বাতাসেরে ঠেকা দিতে জড়া বেঁধে থাকেন,
ঝড়ে ফোলা বাতাসের মুখে তাঁরা এক একটা সুঁই,
সার বেঁধে ঢাল বেয়ে নেমে যান, ঠিক মাস্তুলের চেহারা,
আশেপাশে ছেঁড়া মেঘগুলি ছেঁড়া পালের মতন;
উনাদের মতো আমি সবুজ ছিলাম একদিন, সেসময়ে ভাবতাম
সাইপ্রেস বলে ডাকে যাঁরে,
সাগরের গায়ে হেলে পড়া যেই গাছগুলি সাগরের কোলাহল উর্ধ্বশাখায় বয়ে নেন,
আসলে সে গাছগুলি সাইপ্রেস নন, উনারা ঝাউগাছ।
কাপ্তান দেখি ক্যানেডিয়ান সেডার নামে ডাকে।
সেডার কি সাইপ্রেস কিবা ঝাউগাছ
যারা এইসব নামকরণ করেছিল, তারা জেনেবুঝেই করেছিল,
হয়তো দেখেছে তারা নুয়ে পড়া গাছেদের দেহ
হুহু ক’রে নারীদের মতো হাহাকার করে উঠছে ঝড়ের পরে—
হয়তো কোনো জাহাজ ঘরে ফিরেছে
আর সাথে নিয়ে এসেছে
আরো একজন নাবিকের ডুবে মরার সংবাদ।
একটা সময় “সাইপ্রেস” শুনতেই বেশি লাগসই মনে হতো সবুজ “ঝাউগাছ” এর চেয়ে,
যদিও বাতাসের
কাছে বেশকম নাই, যে শোকেই মূহ্যমান হয়ে তাঁরা নুয়ে পড়ে থাকুন না কেন,
যেহেতু উনারা তো গাছই মাত্র,
বেহেশতি ঝাঁপ আর কবর পাহারা দেওয়া ছাড়া
কী নিয়েই বা ভাবতে হয় উনাদের?
নামে তাই কী বা আসে যায়?
তবু দেখ, অবিকল তেমনই হয় জীবন—নাম যেরকম হয়ে থাকে।
বাঁচতে হবে তোমাকে বহিরাগত কোনো প্রভুর নিচে
বুঝতে হয় যদি নামের তফাত কত প্রকার ও কী কী,
জানতে হয় যদি কোন্‌ সে বেদনা ইতিহাসের যা শব্দেরা বহন করে,
বাসতে হয় যদি ভাল ওই বৃক্ষগুলিরে
হীনতর ভালবাসা দিয়ে, হয় যদি
বিশ্বাস করতে যে: “ওই ঝাউগাছেরা সাইপ্রেস গাছেদের মতো নুয়ে পড়েন,
নাবিকের বউদের মতো উনাদের চুল বৃষ্টিতে নিচে ঝুলে পড়ে।
বিশুদ্ধ বৃক্ষ উনারা, আর আমরা,
আমরা যদি কেবল আমাদের প্রভুগণ খুশি হয়ে যে নাম দিয়েছেন,
সেই নাম মোতাবেক বেঁচে থাকি, সাবধানে কপি করে যাই,
মানুষ হওয়ার কিছু চান্স তাতে আমাদের থাকলেও থাকতে পারে বটে।”

*
৭ উড়াল নোঙর ফেলে ক্যাস্ট্রিজ বন্দরে

যখন ক্যাস্ট্রিজের উপরে ছেয়ে থাকা তারাগুলি ছিলেন তরুণ,
শুধু তোমারেই আমি ভালোবেসেছিলাম আর ভালোবেসেছিলাম আমি সমস্ত ভুবন।
আমাদের দু’জনের আলাদা জীবন, তাতে কী বা আসে যায়?
আলাদা আলাদা সন্তান আমাদের, তাই তাদের ভালবাসার দায়ভার আছে?
যখন ভাবি তোমার বাতাসে বিধৌত
কাঁচা ঢলোঢলো মুখখানি,
তোমার গলার স্বর—সাগরের করাঘাত লেগে, আহা, সেই মধুহাসি?
সব বাতি নিভে গেছে লা টক-এর সিঁড়ি-অন্তরীপ জনপদে,
শুধু হাসপাতালের বাতিটা জ্বলছে।
ওদিকে ভিজির তটে প্রমোদতরণীদের ঘাটে
বাতিগুলি পাহারা দিচ্ছে। আমি কথা রেখেছি,
নিজের সম্পত্তি একটাই মোর,
তোমারেই সেটা দিয়ে যাই—
আমার কবিতা— তোমারেই,
সকলের আগে ভালোবেসেছি যারে।
আমরা এখানে শুধু একরাত আছি।
উড়াল আগামীকাল বিদায় নেবে।

*
৮ জাহাজে দাঙ্গা-ফাসাদ

এক হারামি ছিল জাহাজে, সে আমাকে নিশানা বানিয়েছিল—
জাহাজের কুক। চুতিয়াটা ছিল গ্রেনাডার মাল।
চামড়াটা ছিল যেন খইয়া বাবলা,
খসে খসে পড়া লাল গাছের বাকল,
ঝাপসা আবিল নীল চোখ; সে আমাকে একটুও তিষ্ঠাতে দিত না,
ভাবখানা যেন উনি শাদা মহাজন।
একটা খাতা ছিল আমার, এই যে এই খাতাটাই, যেটায় কবিতা লিখতাম,
তো একদিন এই শালা আমার হাত থেকে কেড়ে নিল সেটা,
ডানে-বাঁয়ে লোফালুফি শুরু করল সে,
অন্য নাবিকদের দিকে চিৎকার করে ছুঁড়ে দিয়ে বলল সে, “ধর্‌!”
ঠমক-লচক দিয়ে আমার হাঁটা দেখাল যেন আমি একটা মুরগি,
শুধু কবিতা লেখার দোষে।
কিছু কেস ঘুষির লায়েক,
দাঁড়ের গোঁজটা দিয়ে দু’ঘা দিলে কিছু কেস চুকেবুকে যায়,
কিছু কেস আছে যাতে ছুরি দরকার হয়ে পড়ে—
এইটা তেমনই কেস ছিল। আমি প্রথমে তো মিনতি করেছি,
বলেছি ফেরত দিতে খাতা, দিল নাকো,
উল্টো সে খাতা খুলে পড়তে লাগল, “অয়ি অর্ধাঙ্গিনী! মম সন্তানসন্ততি!”
আবার রঙ্গ করে কান্নার ভং ধরল সে যাতে নাবিকেরা হাসে;
হঠাৎ কী চলে গেল উড়ুক্কু মাছের মতন?
রুপার ছুরি আমার, ইস্পাতের ফলা
হামলা করল তার উপর, তার পায়ের ডিমের নধর মাংসটা বরাবর,
ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেল শালা, আর শাদা হয়ে গেল,
যতটুক শাদা সে নিজেকে ভেবেছিল তার চেয়ে বেশি শাদা।
আমি বাপু মনে করি মানুষে-মানুষে এইসমস্ত হওয়া প্রয়োজন।
ন্যায্য না, তবু যেটা যেমন, সেটা তেমনই। যন্ত্রণা পায়নি ততটা,
কেবল প্রচুর রক্ত,
ভিন্সি আর আমি ধরো খাস দোস্তো,
তবু আর কোনোদিন ওদের মধ্যে কেউ আমার কবিতা নিয়ে চুদুর বুদুর করবে না।

*
৯ মারিয়া কনসেপশিওন আর খোয়াবনামা

উড়ালের উপর যে ফাটা-বাঁশ বিমানটা চিল্লাচ্ছিল,
অতীতের একখানা পর্দা সে খুলে দিচ্ছিল।
“ঐ দেখা যায় ডমিনিকা!”
“এখনো ওখানে আদিবাসী পাবা।”
“একদিন আসবে যেদিন শুধু বিমান থাকবে, কোনো নৌকা রবে না।”
“আল্লাহ্‌ কি আকাশে উড়ার লেগে আদমেরে বানাইয়েছে, ভিন্স?”
“উন্নয়ন, হাইব্রিড, উন্নয়ন।
উন্নয়নই তো মূল কথা।
উন্নয়ন পিছে ফেলে যায় আমাদের মতো ছোট-দ্বীপ শরিকেরে।”
জাহাজ চালাচ্ছিলাম আমি, ভিন্স পাশে বসে ছিল
বর্শায় মাছ ধরছিল আর বাজে বকছিল।
শীতশুখা, চনমনে দিন আর চঞ্চল সাগর।
“উন্নয়ন কী জিনিস ঐ আদিবাসীদের জিজ্ঞেস কর।
ওদের তো ধরে ধরে নিকেশ করেছে লাখে লাখে, কিছু যুদ্ধে মরেছে,
বাদবাকি কিছু গেছে বেগার খাটুনি খেটে খনির ভিতর
রুপা খুঁজে খুঁজে,
তারপর কালাদের পালা; ল্যাও, আরো উন্নয়ন।
যতদিন না-দেখব সুস্পষ্ট প্রমাণ,
মানবজাতি যে বদলাবে, ভিন্স, এই কথা আমাকে বলো না।
উন্নয়ন—সে তো
হলো ইতিহাসের এক নোংরা তামাশা।
ঐ দেখো কাছে আসে দ্বীপের সীমানা, কী বিষণ্ণ সবুজ, তাকে জিজ্ঞেস কর।”
সবুজ দ্বীপগুলি দেখতে এমন যেন ফিটকিরিতে জারানো আমের ফালি,
এমন কড়া লবণে আমার ক্ষতরও কিছু উপশম হোক,
সমুদ্রনাবিক আমি, সতেজতা স্বভাবে আমার।
আকাশ ঝলকেছিল বরফের মতো সেই রাতে, এক আগুনে।
আদিবাসী যেন আমি, ছুটলাম ডমিনিকাময়,
নাকের রন্ধ্র মোর আটকে উঠল ধোঁয়াধূমার স্মৃতিতে;
আগুনে পুড়ছিল যে শিশুরা আমার,
আহারে, ওদের চিৎকার কানে শুনতে পেলাম,
খেয়েছি ব্যাঙের ছাতা (মগজের মতো) আর ছত্রাক নামই যার ‘শয়তানের ছাতা’
কুষ্ঠরোগে পচন ধরেছে এমন শাদা পাথরের তলে সেই ছাতা জন্মায়;
সকালের খানা ছিল আধাপচা পাতা
তলাফুটো ভেজা জঙ্গলে,
পাতাগুলি তার ইয়া বড়—মানচিত্র মাফিক,
যেই শুনি সৈন্যসামন্তের হইচই
এগিয়ে আসছে ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে, উঠে দিই ছুট
লালকাঁটা গাছের ফলকদের মাঝখান দিয়ে
(বর্শার চে’ও বেশি ধার),
যদিও কলিজা ফেটে যাচ্ছিল মোর;
শরীরে আমার স্বজাতির রক্ত বয়, তাই নিয়ে
ছুটলাম আমি, ভাই রে, ছুটলাম যেন পটে আঁকা পাখি
ক্ষিপ্র পায়ের তলা শ্যাওলা-ত্বরিত;
তারপরে আমি পড়ে যাই, তবে পড়ি এক বরফঝোরার পাশে যেটা
ছিল সুশীতল এক ফার্নের ঝরনার নিচে। দেখি এক টিয়াপাখি,
চিৎকার দিতে দিতে গাছের শুকনা ডাল পাকড়ে ধরে সে আর আমি শেষমেশ
ধোঁয়ার গোটাকয়েক পেল্লায় আছড়ানো ঢেউয়ে ডুবে যাই;
যখন সেই কালো ধোঁয়ার সেই মহাসাগর সরে যায়,
আর আকাশ শাদা হয়ে যায়,
তখন সেখানে উন্নয়ন ব্যতিত আর কিছুই ছিল না,
যদি বা উন্নয়ন বলতে আমরা বুঝি একটা গোসাপ,
সূর্যের আলোপড়া কচি পাতার মতন প্রশান্ত স্থির।
মারিয়া এবং ওর খোয়াবনামার তরে হাউমাউ করে কাঁদি আমি।

ওর ঘুমে নোঙ্গর ফেলত খোয়াবনামা-বই,
অনিদ্রারোগীর বাইবেল,
ময়লা পুস্তিকা এক কমলা রঙের, ডমিনিক প্রজাতন্ত্র থেকে এ,
মাঝখানে একচক্ষু দানবের চোখ। খরখরে পাতাগুলি
যথারীতি কালো হয়ে ছিল ফালনামা আর ভবিষ্যবচনে,
উচ্চকিত স্প্যানিশে;
খোলা এক হাতের তালুও ছিল, ভাবী
সময়ের রায় দিতে, বিভাজিত, সংখ্যাচিহ্ন আঁকা
কসাইয়ের দোকানে
পশুর ছবি যেমন থাকে।
এক রাতে; জ্বরগায়ে, অসুখে জ্যোতির্ময়ী বলে উঠল সে,
“বইখানা নিয়ে আস, কেয়ামত এসে পড়েছে।”
বলে “স্বপ্নে দেখেছি ঝড় আর কতগুলি তিমি,”
কিন্তু সে স্বপ্নের অর্থ সে বইয়ে ছিল না।
পরে এক রাতে দেখি তিন বুড়ি স্বপ্নে,
রেশমপোকার মতো অবয়বহীন, তারা সেলাই করতেছিল ভাগ্য আমার,
চিৎকার করে আমি বাড়ির থেকে ওদের ভাগাতে গেলাম,
ঝাঁটা দিয়ে মেরে খেদিয়ে দিতেও চাইলাম,
কিন্তু তারা যতই বেরিয়ে যাচ্ছিল,
ততই আবার বুকে হেঁটে ফিরে আসছিল,
ততক্ষণে আমার চিৎকার ও কান্না শুরু হয়ে গেল,
শরীর বেয়ে বৃষ্টির মতো ঘাম ঝরতেছিল, মারিয়া
তন্নতন্ন করে ঘাঁটল সে বই স্বপ্নের অর্থের সন্ধানে;
কিছু মেলে নাই;
স্নায়ুগুলি গলে গেল মোর, জেলিফিশ ছাতাঝুরির মতন—
এই সেই সময় যখন আমি পুরোপুরি ভেঙে গেছিলাম—
ওরা খুঁজে পেয়েছিল মোরে
স্যাভানায়; তৃণমরু ঘিরে
তারস্বরে চিৎকারে রত:

আমারে তোরা সবে বাতাসের সাথে কথা বলতে দেখিস তাই,
ভেবেছিস বুঝি আমি উন্মাদ। ওরে,
এই হাইব্রিড দরিয়ার ঘোড়াদের মুখে লাগাম দিয়েছে;
তোরা তো দেখিস আমি সূর্যের দিকে চেয়ে থাকি
চোখের মণিদুটো ঝলসায় না যতক্ষণ,
তাই ধরে নিস হাইব্রিড উন্মাদ হয়ে গেছে, যত পাগলের দল!
শোনো, শোনো, তোমাদের ধারণাও নাই কত শক্তি আমার।
নারিকেল গাছগুলি দ্যাখ,
দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা আমার সৈন্য, প’রে হলদেটে খাকি,
অপেক্ষা করতেছে ওরা কবে হাইব্রিড এই দ্বীপসমুদায় দখল করবে,
ভয় কর্‌ সেদিনকে বরং, যেদিন আমি মানুষ রবো না আর, সুস্থ হয়ে যাব,
সেই ভাল হবে।
সকলের অদৃষ্ট এ আমার হাতে,
মন্ত্রী, ব্যবসাদার—হাইব্রিড সকলেরে কব্জা করেছে,
মুঠোয় ধরা বালির মতো, মামা, তোমাদের জীবনকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবো আমি,
এই আমি যার কাছে কোনো অস্ত্র নাই,
আছে শুধু কবিতা আর আছে তালগাছ
(বল্লম তরবারি ওরাই আমার)
আর আছে চকচকে ঢাল সাগরের!

*
১০ গভীরতা, আয়ত্তের বাইরে

পরদিন, সাগর আন্ধার। গোয়ার ব্যথার মতো ভোর।
“বালের বাতাস
বদলায় হুটহাট, মাইয়ালোকের মন যানি।”
ধীরে ওঠানামা ঢেউ, বড় চূড়াগুলি
বরফধবল গিরিশৃঙ্গের মতো।
“হেইও, সারেং, আসমান এত কালো!”
“আশ্বিনে এই ভাব ঠিক লাগে নাকো।”
“এই আলো অদ্ভুত, এমন ঋতুতে
আকাশ থাকার কথা মাঠের মতন ফকফকা।”

চিলশঙ্কর মাছ ডিঙদৌড় দিলো
চাবুকের মতো লেজ বাড়ি দিয়ে সমুদ্র কেটে,
লম্বা শুঁড়ের মনোয়ার মাছ উপকূলপানে ভেসে গেল
লেত্তির পাক খোলা লাটিমের মতো,
লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া তীরন্দাজির সই উড়ুক্কু মাছ
আমাদের পাশ দিয়ে ছুটে ছুটে গেল,
তুড়ুক্‌ তুড়ুক্‌!
ভিন্স বলে উঠল: “দ্যাখ্‌ মনা দ্যাখ্‌!”
কাউলা-কেশর এক তুমুল তুফান
হামলে পড়ল এসে পালের উপর
কুকুর খুবলে নেয় পায়রা যেভাবে, তারপর মটকালো ঘাড়
উড়াল জাহাজের, মাথা থেকে লেজ-অব্দি কাঁপিয়ে সে দিলো।
“খোদার কসম, কখনোই দরিয়াকে এত খেপতে দেখি নাই এত অল্প সময়ে!
ভগমান সাহেবের পিছ-পকেট থেকে এ বাতাস এসেছে!”
“কাপ্তান যায় কোথা? কানাচোদা নাকি!”
“মরার থাকলে মরবই, ভিন্স, কী বাল আসে যায়?”
“দোয়া পড়্‌, হাইব্রিড, জীবন যদি বা দোয়া না ভুলিয়ে থাকে!”

যথেষ্ট ভালোবেসেছি যাদের, তাদের ওটা ভালোবাসা নয়।
জলের পর্বতগুলির ফাঁকে উড়াল জাহাজ সই করে
শুরু হলো বৃষ্টির ঢিল-পাটকেল,
এর চেয়ে ভাল ছিল জোড়া পায়ে লাথি দেওয়া ডুবো-অগ্নিগিরির খাত।
ভয় লেগেছে কি?
পানির ফোয়ারা যেন তাঁবুর খুঁটি
হয়ে আকাশের সাথে করে কোলাকুলি,
মহাটলোমলো,
মেঘেদের সেলাই খুলে ও ছিঁড়ে যায়
আর আকাশ পানি ঢেলে ভেজায় আমাদের,
নিজের কান্না শুনি, “মারিয়ার খোয়াবনামার আমি সেই
সারেং, যে ডুবে মরে।” মনে পড়ে ছায়া-নৌযান,
প্যাঁচশূল দিয়ে বিঁধে ছিপি খুলে দিই যেন আমি সাগরের,
তলা ছেয়ে আছে যেথা সাগরের কীট,
একবাঁও দুইবাঁও, চোয়াল কঠিন হয় মুঠির মতন,
একটা জিনিসই শুধু ধরে রাখে কেঁপে-কেঁপে ওঠা এ আমারে—
নিরাপদে ঘরে আছে আমার ফ্যামিলি।
সেরকমই শক্তি এক মোরে গ্রাস করে, আর সেই শক্তি বলে:
“পিছিয়ে-পড়া জাতের মানুষ আমি,
যারা আজো খোদা-ভগবানেরে ডরায়।”
ঈশ্বর নিজে এসে কুপোকাত করুন
এ বিশাল সাগরদানোরে,
দরিয়ার তলে বিছানা পেতে যে দড়ি ফেলে দি’ছে,
ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বেঁধে তুলে ফেলে দিন এই জন্তুরে;
এই সেই বিশ্বাস শিশু থেকে যেটা ক্রমে হালকা হয়েছে,
(বাটালি গলিতে সেই মেথডিস্ট চার্চ ছিল, ক্যাস্ট্রিজ শহরে)
তিমির ঘণ্টা যেই গেয়ে গেছে প্রার্থনাগান,
তিমির দেহের মতো খাঁজকাটা বেঞ্চিতে বসে, শোকগর্বভরে,
আমরা গেয়েছি গান কীভাবে যে টিঁকে আছে আমাদের জাত
সাগরের মুখগহবরে, সেই নিয়ে,
আমাদের ইতিহাস, বিপন্নতা নিয়ে, আর এখন,
এখন প্রস্তুত আমি, মরণ যা চায় তা-ই হোক।
কিন্তু এ ঝড় যদি কোনো শক্তি ধরে,
সেই শক্তি কাপ্তানের মুখে:
দাড়িতে পুঁতির মতো পানি লেগে আছে, চোখ অশ্রুতে নোনা।
জায়গায় আটকে আছে সে ক্রুশবিদ্ধ যেন বা,
শক্ত হাতে সে ব্যাটা ধরে আছে চাকা, ক্রস যেরকম খ্রিষ্টকে ধরে ছিল,
দু’চোখে আঘাত যেন কাঁদছে দু’চোখ শুধু আমাদের তরে,
তার মুখে ঢেলে দিতে থাকি শাদা রাম,
প্রতিটা জলের চূড়া সাগরদানোর হাতে চাবুক হাঁকায়,
উড়ালকে পিছনে হটায়,
দুই ক্রিমিনাল যেন আজ যুযুধান। সারা রাত্রি, বিরামহীন, থেকে ভোরবেলার
মতো লাল চক্ষু নিয়ে আমরা দেখি যে
প্রাণান্ত ক্লেশ বুঝি ফিকে হতে থাকে,
ফিকে হয়ে যায়,
আর তারপর দেখি কোনো ঝড় নাই।
দুপুরে সমুদ্র এত শান্ত হয়,
প্রভুর রাজ্য যেন প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

*
১১ ঝড়ের পরে

যেকোনো ঝড়েরই পরে আসে এক কাঁচা আলো,
সাগর তখনো বিধ্বংসী যদিও;
জাহাজের পিছে তায় জেগে ওঠা উজ্জ্বল ফেনাতে
আমি দেখি ঘোমটায় মুখ ঢেকে মারিয়া কনসেপশিওন
দরিয়ারে বিয়ে করে দিয়েছে রওয়ানা;
স্রোতে ভেসে যায় পিছে ক্রমাগত প্রসারিত শাড়ির পাছাড়ি,
শাদা শঙ্খচিল, শাদা জলকুক্কুট মিতকনে-সখীসনে।
তারপর একেবারে গেল।
সেদিনের পরে আর কিছু চাই নাই।
মুখে মোর আড়াআড়ি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল,
সূর্যের মুখে যেবা পড়ে।
শান্ত পারাবার।

আয় ধীরে, বৃষ্টি আয়, সমুদ্রের উদগ্র মুখে
পড়্‌ ছোট মেয়েদের গোসলের মতো; এই দ্বীপগুলি ধুয়ে জ্যান্ত করে দে
হাইব্রিড এককালে যেমন দেখেছে! সব পদচিহ্ন আর সব তপ্ত পথ
থেকে আজ গন্ধ উঠুক মারিয়ার হাতে
সদ্যই ইস্তিরি করা আর জলছিটা পড়া কাপড়ের। আমি শুয়ে স্বপ্ন শেষ করি:
যা কিছু বৃষ্টিতে ভেজে আর সূর্য করে ইস্তিরি—
শাদা মেঘ, সাগর, আসমান—একটা সেলাইয়ে জোড়া
মোর নগ্নতার তরে তেমন কাপড়জামা যথেষ্টই জামা।
যদিও উড়াল মোর পার হয়না কখনো জোয়ারের ঢেউ, যেটা ওঠে
অন্তিম বাহামার সশব্দ তট ছেড়ে সসাগরা জনস্থানমধ্যে এইখানে,
মোর খেদ নাই,
যদি এই হাত কোনো জাতের বেদনারে ভাষা দিয়ে থাকে।
মানচিত্র খুলে দেখো মিয়া,
টিনের থালের ‘পরে খোরাকির দানা যতগুলি,
তারো চেয়ে বেশি দ্বীপ দুনিয়াতে আছে—
ভিন্ন ভিন্ন সাইজ,
এক বাহামাতেই তো আছে এক হাজার
পর্বতের থেকে নিয়ে প্রবালপ্রাচীরে যত টুনি গাছ-ঝাড়,
সেসবের থেকে, আর এই পাল-বেঁধে-রাখা জাহাজের নাক থেকে
সকল শহরকেই দোয়া করি আমি,
আরো দোয়া করি সেই শহরের পিছনের পাহাড়ের ধোঁয়াতে যে নীল ঘ্রাণ থাকে
তারে, আর নিচের ঘরের চালা অব্দি ধীরে চলে যাওয়া এক ছোট রাস্তারে,
কাছির মতন সেটা; আমার জীবনে সার বলতে তো শুধু আছে এই:

এই মাস্তুল, দিকচিহ্ন, এ পিপাসা,
আর এই ঝাঁপ দেওয়া হৃদয়ের ক্রিয়া—
নিশানাকে সই করে এই উড়ে যাওয়া যার লক্ষ্য কভু মোদের জানা হবে না,
শুধুশুধু খুঁজে মরা একখানা দ্বীপ যার বন্দরে গেলে নাকি সব ব্যথা সারে,
আর এক নিষ্কলুষ দিগন্তরেখা,
কাঠবাদামের গাছ যেখানে বালিকে
ছায়া ফেলে ব্যথা দেয় না।
কত কত দ্বীপ!
ততগুলি দ্বীপ আছে, রাতের গাছের ডালে যত তারা ধরে।
শাখায়িত গাছটাতে ঝাঁকি লেগে উল্কা ঝরে পড়ে,
ফলের মতন খসে পড়ে চারিধারে
উড়ালকে ঘিরে।
সবকিছুকেই তবু ঝরে যেতে হয়,
আজীবন তেমনই ঝরেছে,
এক ধারে মঙ্গল, আরেক দিকেতে শুকতারা
ঝরে আর পড়ে আর রহে এক হয়ে এই পৃথিবীও অবিকল যেমনটা এক
ছোট দ্বীপ, তারাদের দ্বীপপুঞ্জমাঝে।
আমার প্রথম বন্ধু ছিল সাগর। আর এখন সে-ই শেষের বন্ধু।
এবার কথা থামাই। কাজে যাই, কিছু পড়া করি,
মাস্তুলের সাথে গাঁথা লণ্ঠনের নিচে বসে জিরাতে জিরাতে।
ভুলে যেতে চেষ্টা করি সুখ, কী ছিল তা,
তাতেও যদি বা কাজ হয় নাকো, তারাদের দেখি।
কখনো আমিই শুধু থাকি আর থাকে ফেনা নরম-কাটারি,
ডেক ক্রমে শাদা হয়ে যায়,
চাঁদাভাই খুলে দেয় একখানা মেঘের দরোজা,
মাথার উপরে শাদা চাঁদঢালা আলোপথ, সেই পথটা আমারে বাড়ি নিয়ে যায়।
হাইব্রিড তোমাদের গান শুনিয়েছিল
সাগরের অন্তস্তল থেকে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;