শামসুর রাহমানের শবযাত্রায়



সৈয়দ কামরুল হাসান
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

শহীদ মিনার, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০০৬, বেলা ১০-৩০ মি :

মানুষের এই দীর্ঘ সারিতে সবাই এসে দাঁড়িয়েছেন। যুবক, যুবতী, শিশু-কিশোর, মাঝবয়সী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও। হুইল চেয়ারে বসে প্রতিবন্ধীও লাইনে শামিল। কারো হাতে ফুল, কারুর বা মালা। যারা যুথবদ্ধ তারা ফুলের ডালি সাজিয়েছেন। শরতের ফিনফিনে নীল আকাশের নিচে ভাদ্রের উত্তপ্ত রৌদ্র শহীদ মিনারটায় আছড়ে পড়লেও তাকে কেউই আমলে নিচ্ছেন না। শহীদ মিনারটার একপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছিলাম এই মৌন জনস্রোত। ভাবছিলাম মানুষের এই মিছিল যেন শামসুর রাহমানের রচিত কোনো এলিজি, হতে পারত তাঁরই কবিতার কোনো বিষয়বস্তু, যেখানে নিজেই তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন : ‘আমরা সবাই এখানে এসেছি কেন?/ এখানে কী কাজ আমাদের?’ মিছিল ধীরে এগিয়ে যায়। একসময় আমারো পালা আসে। রজনীগন্ধার ডাঁটাটি তাঁর পাশ দিয়ে শুইয়ে দিই। ফর্সা, ধবধবে কফিনে-মোড়ানো অবয়ব থেকে একটা জ্যোতির্ময় আভা যেন ঠিকরে পড়ছে। কবি নয়, শুয়ে আছেন যেন এক সন্তপুরুষ, মৃত নয় জীবন্ত যেন বা পুস্পকুণ্ডের ঘেরাটোপ থেকে তাকিয়ে আছেন তিনি। চারদিকে ছড়িয়ে-পড়া টিভি চ্যানেলের যত মাতামাতি, মাইকে কবির কবিতার পংক্তিমালায় নানান স্বরের ওঠানামা, শোকপুস্তকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মানুষের দীর্ঘ সারিতে দু’চরণ লেখার আকুতি—এ-সবকিছু তাঁর সামনে দিয়ে মেঘের মত ভেসে যায়। এক সফেদ শূন্যতায় শুয়ে আছেন কবি, যেন তাঁর ঠোঁট নড়ছে আর ঝরে পড়ছে উজ্জল পংক্তিমালা : “এখানে দরজা ছিল, দরজার ওপর মাধবী-লতার একান্ত শোভা।/ এখন এখানে কিছু নেই, কিচ্ছু নেই।/ শুধু এক বেকুব দেয়াল, শেল-খাওয়া, কেমন দাঁড়ানো, একা।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে তাঁর জানাজা হবে। জানাজা পড়ার উদ্দেশ্যে মিনারের বেদী থেকে নেমে এবার আমরা মিছিল নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়ালাম। শামসুর রাহমানের শবযাত্রার মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মাঝ দিয়ে টিএসসিকে ডানে রেখে এগিয়ে চলল। এই পথ দিয়ে অনেক হেঁটেছেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়, বটতলা, লাইব্রেরী, মধুর ক্যান্টিন, চারুকলা, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (রেসকোর্স), হাকিম চত্বর তাঁর পদস্পর্শের স্মৃতিতে এখনো সজীব। ওইতো টিএসসি কিংবা হাকিম চত্বর। এখানে জাতীয় কবিতা পরিষদের অনেক অনুষ্ঠানই উদ্বোধন করেছেন তিনি। কবিতা পড়েছেন দূর মফস্বল থেকে আসা অচেনা একেবারে অতি তরুণদের সাথে বসে একই মঞ্চে। তাদের পাশে থেকে অভয় দিয়েছেন রাজপথের গনগনে রোদ্দুরে, বর্ষায়, প্রতিবাদী মিছিলে। রাজপথের সেই তরুণটিকে তিনি এঁকেছেন তাঁর কবিতায়; ‘ছেলেটা পাগল নাকি ?’— প্রতিবেশী বুড়ো বললেন খনখনে কণ্ঠে তাঁর।/ ‘পাগল নিশ্চয় , নইলে ঘরের নির্জনে কেন দেয়নি সে ধরা’ ভাবেন লাঠিতে ভর দিয়ে বুড়ো,/ ‘নইলে কেউ বুঝি মিটিং-মিছিলে যায় যখন তখন? সব পুঁজি খোয়ায়, ঘরের খেয়ে তাড়ায় বনের মোষ?/ জীবনের সকালবেলায় গোলাপের মতো প্রাণ জনপথে হারায় হেলায়?’

সেই রাজপথে পা ফেলতেই পথ আমাকে টেনে নিয়ে গেল আরো পেছনের দিনগুলোতে।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা যারা মফস্বল শহরের নবীন লিখিয়ে আধুনিক কবিতার খোঁজখবর করতে শুরু করেছি, চাঁদা তুলে ছাপছি একুশের সংকলন, হাতে লিখে বের করছি দেয়াল পত্রিকা—সেসকল দিনে একদা ছোট্ট কিশোরগঞ্জ শহরে ঈশা খাঁর উত্তর পুরুষদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত পাবলিক লাইব্রেরীর বিপুল সংগ্রহশালায় খুঁজে পাই শামসুর রাহমানের দু’টি কবিতার বই ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে,’ এবং ‘রৌদ্র করোটিতে’। পরে জেনেছি এ দুটি কবির প্রথম প্রকাশিত বই। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ওপর হাসান হাফিজুর রহমানের বিখ্যাত আলোচনা পড়ে ফেলেছি, কিন্তু এত প্রশংসা যে শামসুর রাহমানকে নিয়ে তাকেই পড়া হয়নি। তখনও পড়িনি আল মাহমুদ কিংবা শহীদ কাদরী। শামসুর রাহমানের ওই দুটি বই পড়ার পর মনে হলো একেবারে নতুন স্বাদের কবিতা ভিন্ন এক কাব্য ভাষায়। কেমন একটা ঘোর-লাগা জগত্— মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের অনুষঙ্গে কাব্যময় সেই জগত্—যেখানে নিয়ত খেলা করে রোদ ও জ্যোছনা, পার্কের নি:সঙ্গ বেঞ্চ, সেখানে ভাগাভাগি করে ঘুমায় এক নি:সঙ্গ খঞ্জ, রোঁওয়া-ওঠা-কুকুর আর ঝরাপাতা। মাথা থেকে কিছুতেই তাড়াতে পারি না যে দৃশ্যাবলী এঁকেছেন তিনি কবিতায়; ‘রোয়াওঠা কুকুরের সাহচর্য্যে গ্রীষ্মের গোধূলি হয়তো লাগবে ভালো / রাত্রি এলে চাঁদ হয়তো অদ্ভুত স্বপ্ন দেবে তার সত্তার মাটিতে / বিষাদের ঘরে কেউ জাগাবেনা তাকে/ পার্কের নি:সঙ্গ খঞ্জটাকে।’ মনের মধ্যে আজো দাগ কেটে বসে আছে রৌদ্র করোটির সেই বিখ্যাত চরণ; ‘আমাদের বারান্দায় ঘরের চৌকাঠে / কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর খাটে/ দু:খ তার লেখে নাম’। শামসুর রাহমানের ওই দুটি কাব্যগ্রন্থ পড়ার সুবাদে একালের কবিতার প্রাসাদে উঠবার একটা সিঁড়ি পেয়ে গেলাম, তিনি যেন অঙ্গুলি নির্দেশে দেখিয়ে দিলেন আধুনিক কবিতার যাত্রাপথটা। একে একে তাঁর বইগুলি পড়তে থাকি— ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘ইকারুসের আকাশ’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘মাতাল ঋত্তিক’, ‘উদভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’—যা কিছু প্রকাশ পাচ্ছে তার সবকিছু। পড়লাম তাঁর লেখা অনবদ্য স্মৃতিগদ্য—‘স্মৃতির শহর’, এমনকি বই হয়ে বাজারে আসার আগেই কোনো এক ঈদসংখ্যায় পড়ে ফেললাম তাঁর উপন্যাস ‘অক্টোপাস’। ততদিনে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কলাভবনের করিডোরে আমাদের প্রথম যৌবন উচ্চকিত উন্মাদনায় নতুন নতুন ব্যঞ্জনায় শামসুর রাহমানকে আবিষ্কার করছে। হরতাল, মিছিল, দাবী-দাওয়া, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভরা শামসুর রাহমানের কবিতা। ২-৪ টে নয়, অসংখ্য উজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালা তাঁর হাতে কবিতার দুর্লভ লালিত্যে ধরা দিয়েছে। তিনি যেন আমাদের নেরুদা, আমাদের নাজিম হিকমত। বর্ণমালা, আমার দু:খিনী বর্ণমালায় তিনি বর্ণমালাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন : ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে কী থাকে আমার ?’ মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ দিনে ‘বন্দি শিবির থেকে’ সেই শব্দকে তিনি দেখেছেন: ‘আমার প্রতিটি শব্দ পিষ্ট ফৌজি ট্রাকের তলায়,/ প্রতিটি অক্ষরে গোলা বারুদের/ গাড়ির ঘর্ঘর,/ দাঁতের তুমুল ঘষ্টানি,/ প্রতিটি পঙ্ক্তিতে শব্দে প্রতিটি অক্ষরে/ কর্কশ সবুজ ট্যাঙ্ক চরে, যেনবা ডাইনোসর।’ তাঁর চারপাশের সে-সময়কার চিত্র তিনি যেভাবে এঁকেছেন, তা হয়ে উঠেছে নৃশংস নরহত্যার অমোচনীয় ছবি : ‘সমস্ত শহরে সৈন্যেরা টহল দিচ্ছে,/ যথেচ্ছ করছে গুলি, দাগছে কামান/ এবং চালাচ্ছে ট্যাংক যত্রতত্র। মরছে মানুষ,/ পথে ঘাটে ঘরে, যেন প্লেগবিদ্ধ রক্তাক্ত ইঁদুর।’ কিন্তু যে কোনো মহৎ কবির মত তিনি মানুষের আত্মাহুতিতে দেখেছেন অবিনশ্বর প্রেরণার আভাস। তিনিইতো ‘আসাদের শার্র্ট’-এ লিখেছেন—‘ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত / মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট/ শহরের প্রধান সড়কে/ কারখানার চিমনি-চূড়োয়/ গমগমে এভেন্যুর আনাচে-কানাচে/ উড়ছে, উড়ছে অবিরাম।’ আর স্বাধীনতা নিয়ে এতদঞ্চলের মানুষের হাজার বছরের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে একদা নজরুল ‘বিদ্রোহী’ লিখেছিলেন, সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাসাহিত্যের সেরা আধুনিক কবিতাটি তো তারঁই হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। পাঠকের পক্ষে (কিংবা স্বাধীনতাকামী যে কারুর পক্ষেই) এই দীর্ঘ কবিতার মোহ অগ্রাহ্য করা কঠিন: ‘স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন/ স্বাধীনতা তুমি উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন,/ স্বাধীনতা তুমি বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদির রঙ।… স্বাধীনতা তুমি বাগানের ঘর, কোকিলের গান/ বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/ যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।’

কবির সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতের সুযোগ ঘটলো এর পরপরই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায়ই অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে (গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত) সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার সুবাদে একেবারে যেন সংস্কৃতির বৈঠকখানায় এসে পা রাখলাম। সেখানে এসে সবাইকে পাওয়া গেলো শওকত ওসমান কি পটুয়া কামরুল হাসান; কে নেই সেখানে? দেখলাম সেখানেও দিব্যি আলো ছড়িয়ে আছেন এই রাজসিক কবি। হ্যাঁ সন্ধানীর বিশেষ সংখ্যার জন্য লেখা সংগ্রহের ছুতোয় তাঁর ওখানে যাওয়ার সুযোগ ঘটলো প্রথম, দৈনিক বাংলায় তাঁর বিশাল সম্পাদকীয় কক্ষে। চেহারা ছবি তো মুখস্থই ছিল, কিন্তু তাঁর অপূর্ব গৌরকান্তি, রুচিশীল পরিপাটি বেশভূষা আর নম্র, সুরেলা কাঁপা কাঁপা গলার আওয়াজ কাছ থেকে উপভোগ করলাম। নির্ধারিত তারিখে লেখা দিয়ে দিয়েছেন তিনি, কখনোই তারিখ ভুল হয়নি তাঁর। পরে সাক্ষাৎকারও নিয়েছি পুরনো ঢাকায় সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনের বাসায় গিয়ে। একদিন তাঁর শ্যামলীর বাসায়ও গিয়েছিলাম। পিজি হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের দিনগুলিতে দেশবাসীর মতো আমিও কাটিয়েছি উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় ভরা প্রতিটি প্রহর। কে জানে শেষ শয্যায় তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিলো কিনা! তিনিই তো লিখেছিলেন : ‘কবির অশ্রুর চেয়ে দামি মায়াময় অন্য কিছু আছে কি জগতে?’

শবযাত্রার মিছিলটি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে এসে শেষ হলো। বিশাল মসজিদ উপচানো মুসল্লীরা সবুজ লন ছাপিয়ে রাস্তায়, জানাজায় শরীক। তাঁর কফিনের ফুলবাহী বিশাল ট্রাকবহর মিছিলের পিছু পিছু এসেছে। জানাজা শেষে বনানী যাবে, মায়ের পাশে কবির শেষ শয্যায়।

অপরাহ্নের আলো এসে তীর্যক হয়ে ছুঁয়েছে জনাকীর্ণ শাহবাগের রাজপথ। সে আলোয় জনস্রোতে নিজেকে মিশিয়ে দিই। ঘোর-লাগা চেতনায় টাপুর টুপুর ঝরে পড়ে কবির অমর পংক্তিমালা : ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/ কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা/ একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা/ শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপূর।’ ফিসফিসিয়ে বললাম—‘বিদায় রাহমান ভাই’।

[আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র, স্বাধীনতা ও মুক্তি চেতনার কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে পিজি হাসপাতালে দীর্ঘ ১২ দিন তিনি কোমায় ছিলেন। পরদিন ১৮ আগস্ট বেলা ১০টায় তাঁর মরদেহ সর্বসাধারণের জন্য শহীদ মিনারে আনা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা শেষে বনানী গোরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেদিন শহীদ মিনার ছিল লোকে লোকারণ্য, শবমিছিলে মানুষের ঢল নেমেছিলো। অন্যান্যদের সাথে লেখক ছিলেন সেই শবযাত্রায়। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে এই স্মৃতিচারণা। ]

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;