কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৯)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

পুনর্মিলন ও পূর্বাভাস

[পূর্ব প্রকাশের পর] লিন ও আমি, আমাদের বন্ধুদের দেখতে ও তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চেয়েছিলাম। খুব সাবধানে আমরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাই, তাদের গল্প শুনি, অভিজ্ঞতা বিনিময় করি, প্রার্থনা করি এবং ঈশ্বর তাদের বিপদমুক্ত রেখেছেন বলে উল্লাস করি। প্রথমদিকেই আমরা গিয়েছিলাম আমাদের রবিবারের স্কুলের কিশোরী ছাত্রীদের বাড়িতে। ঈশ্বর আমাদের যাওয়ার এই সময়টাকে একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথম-বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দেখি, একটি ছাত্রীর মা গুরুতরভাবে অসুস্থ। তাঁর রক্তচাপ ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে আমরা একটা জটিল গর্ভধারণের আলামত হিসাবে সন্দেহ করি। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার তক্ষুনি। তাঁর সাত বাচ্চার প্রত্যেকেই বাড়িতে জন্মেছে, তাই পরিবারটি তাঁকে কোনো অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি, আর যদি তারা তা ভাবতোও, সেটা করার সঙ্গতি তাদের ছিল না। আমরা দ্রুত তার ব্যবস্থা করি এবং তাঁকে চন্দ্রঘোনায় ব্রিটিশ ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিই।

হাসপাতালে যাবার পথে, সেই মা আমাদেরকে বলেন, তিনি এই গোলযোগের সময়ে তাঁর বড় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই চিন্তিত। আমরা তাঁকে নিশ্চয়তা দিই যে, ঈশ্বর তাঁর মেয়েদের রক্ষা করবেন। তারপর ঈশ্বর আমাদেরকে নির্বাচন করেন এবং মনে করিয়ে দেন যে, তিনি তাঁর ইচ্ছা চরিতার্থ করার নিমিত্তে মানুষকেই বাহন করার কথা ঠিক করেছেন। একটি ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে নিয়ে মা চন্দ্রঘোনা থেকে ফেরার একটু পরেই ষোল বছরের লুসি আমাদের সঙ্গে থাকতে আসে।

আরেক বিকালে আমরা যখন একঘরের একটি বাড়িতে, রাস্তার দিকে মুখ করা বিছানায় বসে ছিলাম তখন উর্দি পরা দুজন লোককে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখি। তাদের একজন খুবই বাচাল প্রকৃতির ছিল এবং আমাদের দিকে অশোভনভাবে তাকাচ্ছিল।

“তোমরা কী?”
“তোমরা বাঙালি?”
“তোমরা সাহেব?”

তার সহযোগীকে মনে হয় সংলাপ দ্রুত শেষ করে সামনে এগুতে ইচ্ছুক, কিন্তু মুখপাত্র বলেই চলে, “তোমরা কী করো?”

আমরা আমাদের ব্যাখ্যায় কোথাও এগুতে না পারায়, একজন বৃদ্ধা তার সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতে শুরু করেন। “এটা একটা খ্রিস্টান পাড়া। এরা আমাদের সঙ্গে প্রার্থনা করতে এসেছেন।”
“ওহ।” আলো দেখা দিলে, সে উত্তরে জানায়, “তোমরা তাহলে দেবী!”

নৈরাজ্যপূর্ণ চট্টগ্রামে ক্যাথলিক হিসাবে আমরা প্রতিদিনই ঈশ্বরের উপস্থিতি ও তাঁর নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন হতাম, কিন্তু আমরা এও বিশ্বাস করি যে, পিতা আসলে প্রতিটি দেশি বিশ্বাসীর চোখেই একটা শক্তি হিসাবে প্রতিভাত করছিলেন নিজেকে।

এখানে একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পুরুষ ও তাঁর স্ত্রী, তাঁদের পরিত্রাণের এমন এক ঘটনা বর্ণনা করেন, যাকে কেবল অলৌকিকতা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। নিচের লেখাগুলো ছিল মি. জিমি রজার্স ও তাঁর পত্নীর নিজের হাতে লেখা সত্যি ঘটনার বিবরণ।

“জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯৭১ সালের তেসরা মার্চে ডাকা জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে বানচাল না করে দিলে আমার এই গল্পটা বলা হতো না।”

“ছয় বছর বয়সে অনাথ হয়ে, হিমালয়ের পাদদেশে প্রয়াত ডা: জে এ গ্রাহাম কর্তৃক স্থাপিত বিখ্যাত অনাথাশ্রমে ভর্তি হই আমি। আমাদের গোটা জীবনটাই রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিনিয়ত বদলে-যাওয়া মুখাবয়ব দ্বারা আচ্ছন্ন থাকত। অনাথাশ্রমটি ছিল একটি খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমি কেবল খুব ভালো শিক্ষাই কেবল পাই না, স্বয়ং খ্রিস্টকে আমার ত্রাতা হিসাবেও পাই, এবং বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনার অভ্যাস গড়ে তুলি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নৌবাহিনীতে ঢুকে আমার প্রথম জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাই। যুদ্ধ একজনকে ঈশ্বর কিংবা শয়তানের নিকটবর্তী করে তুলতে পারে, বিশ্বাসের গভীরতা ও বন্ধুসঙ্গের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। বিশ্বাস থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি আমার ক্ষেত্রে একটু ধীর ছিল; প্রথমে মদ্যপান, তারপর জুয়া খেলা, তারও পর যিশু থেকে ক্রমে দূর থেকে দূরে ছিটকে পড়া; খুন ছাড়া, আইনের চোখে এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা আমি করিনি।”

“শেষ পর্যন্ত নিজের ধ্বংসের কাছে এসে এবং নিজেকে একটি ডাকাতির অভিযোগে মিথ্যেভাবে অভিযুক্ত হতে দেখে আমি ঈশ্বরের শরণাপন্ন হই। এক মুহূর্তে আমার জীবন ছিল অন্ধকার ও অবসাদে আচ্ছন্ন, আর পরের মুহূর্তেই আলো, শক্তি ও আশ্বাস। অনেক বছর পেরিয়ে যায়—নিয়মিত চাকরি, পদোন্নতি সবই ঘটে। আমাদের যেহেতু কোনো সন্তান ছিল না, আমার স্ত্রী ও আমি দুটো বাঙালি মেয়েকে দত্তক নিই।”

“আমাদের আরামদায়ক জীবন ছিল এবং মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিলাম আমরা। তারপর হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে পড়ে। আমি চাকরি হারাই এবং বিভিন্ন খুচরো কাজ করি তার পরের ছয়মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি ঢাকায় কাজ করছিলাম। আমার স্ত্রী ও দুই কন্যা, তখন বয়স তিন ও চার, ১৭৫ মাইল দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহরে থাকত। আমাদের বাসাটি বিহারি অধ্যুষিত এলাকা থেকে মাত্র আধমাইল দূরে একটি মিলিশিয়া ক্যাম্পের পাশেই ছিল। সেটা খুব নির্জন এলাকা, যার কাছাকাছি মাত্র আর একটা বাড়িই ছিল।”

“ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে আমি যখন ক্রিসমাসের জন্য বাড়ি এসেছিলাম, তখন আমার মনে একটা জোর বিশ্বাস জেগেছিল যে, আমি হয়তো আমার বাড়িটা আর দেখব না। এই অনুভূতিটা এমন জোরালোভাবে আমার মনে গেঁথে থাকে যে, আমি আমার এক মিশনারি বন্ধু জিন গুর্‌গানসকে চট্টগ্রামে চিঠি লিখে সেই ভয়ের কথা খুলে বলি এবং আমার পরিবারের দেখভাল করার অনুরোধ করি।”

“মার্চের ১ তারিখ শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানিরা জাতীয় সংসদ অধিবেশন বানচাল করার জন্য যেসব বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করছিল তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য বাঙালিদের ডাক দেন। গোটা পূর্ব বাংলা তাঁর ডাকে জেগে ওঠে। মার্চের ১ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত অবস্থা খুব উৎকণ্ঠাময় ছিল এবং নানা দাঙ্গাহাঙ্গামাও হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি একটা সর্বাত্মক অভিযান শুরু করল বাঙালিদেরকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাতে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল বলা চলে।

ঢাকাকে রাতারাতি দমন করা গেলেও চট্টগ্রামে যুদ্ধ আরো কুড়ি দিনের মতো চলে। ২৫ মার্চ রাত দশটায় ঢাকা শহরে গোলাগুলি ও বোমাবাজি শুরু হয়। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। রাত দুটোর দিকে মিলিটারি সারা শহর ঘুরে লাউডস্পিকারে লোকদের সাবধান করতে থাকে এই বলে যে, আগামীকাল ২৬ মার্চ সারাদিন র্কাফ্যু থাকবে। বাড়ি থেকে কেউ বার হলেই তাকে গুলি করে মারা হবে।”

“বিকালের মধ্যে আমি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই সাহস করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খাদ্যের সন্ধান করতে থাকি। আমি একটা ছোট্ট ঘুপচিঘর দেখি যার একটি ছোট্ট জানালার ভেতর দিয়ে চা বিক্রি করা হচ্ছিল। আমি এক বোতল চা ভর্তি করে নিই, কেননা আমার সেই অভিযানে আমি এই একটি মাত্র খাদ্যের খোঁজ পেয়েছিলাম। পরদিন আমি একই দোকান থেকে একটি বাসি রুটি এবং আরো কিছু চায়ের ব্যবস্থা করতে পারি। চারটি বাঙালি পরিবার আমার ঘরে আশ্রয় নেয়। আমি একটি ১০ বাই ১০ ফুট ঘরে থাকতাম, ফলে আপনারা বুঝতেই পারছেন কী অসুবিধাই না হচ্ছিল সবার।”

“মার্চের ২৮ তারিখ আমি চট্টগ্রামে আমার পরিবারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমি দুবার ক্যান্টনমেন্টে যাই একটা বিমানের টিকিটের অনুমতির জন্য, কিন্তু তারা আমাকে মুখের ওপর না করে দেয়। এপ্রিলের ৩ তারিখ আমি আমাকে সাহায্য করার জন্য একজন বন্ধুকে যোগাড় করি, যে কিনা উর্দু বলতে পারে। সে আমাকে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে বিশাল বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে। সে তখন আমাকে অনুরোধ করে, তার সঙ্গে সেই মিলিটারি অফিসারের কাছে যেতে, যে-এই অনুমতিটি প্রদান করছিল। আমি আসার পর আমাকে বলা হয়, আমার বন্ধু আমার নাম ব্যবহার করেছে বিমানের টিকিটের জন্য। তাকে গুলি করার সমূহ ইচ্ছা ছিল তাদের, কিন্তু আমি আমার বন্ধুকে কোনোমতে সেই দুর্দশা থেকে উদ্ধার করে আনতে পারি। সে বলে যে, তাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল গুলি করার জন্য, কিন্তু সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে। সে যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দু বলতে পারত, সেহেতু তাকে এই সুযোগ দেওয়া হয় যেন আমি এসে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করি। অবশ্যই আমি সেদিন কোনো বিমানযাত্রার অনুমতি পাইনি। বাকি সারা সপ্তাহ আমি লাইনে দাঁড়িয়ে সেই চেষ্টা করে যাই কিন্তু আমাকে প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ আমি যে পাকিস্তানি তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারছিলাম না। পাঁচটি ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে ৬ই মে-র একটি উড়ানের অনুমতি দেওয়া হয় আমাকে।”

“আমার বিমানযাত্রার আগের রাতে, আমি একটা টেলিগ্রাম পাই যে, আমার স্ত্রী ও কন্যারা নিরাপদে আছে এবং তারা বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে আছে। এটা আমাকে রীতিমতো বিস্মিত করে। আমি তখনই বুঝতে পারি, আমার বাড়ির কিছু একটা হয়েছে, তা নাহলে আমার স্ত্রী কিছুতেই বাড়ি ত্যাগ করত না। কিন্তু আমি সেই টেলিগ্রাম আসার সময়টাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব? আমি এর আগে বিমানযাত্রার অনুমতি পেলে, সরাসরি বাড়ি চলে গিয়ে বাড়ির এই হাল দেখে ধরে নিতাম যে, আমার স্ত্রী কন্যাদের হত্যা করা হয়েছে। ওই সময়ে টেলিগ্রামটা পাওয়াতে আমি সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ও বুকের যন্ত্রণা, বেদনা থেকে অব্যাহতি পাই। এই খবর পেয়ে আমি সরাসরি বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে যাই এবং আমার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হই। দিন গড়িয়ে যায় এবং আমি আমার স্ত্রীর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারি। আমি তাকেই সেসব বর্ণনা করতে বলব।” [চলবে]

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৯)
পুনর্মিলন ও পূর্বাভাস
জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ

[পূর্ব প্রকাশের পর] লিন ও আমি, আমাদের বন্ধুদের দেখতে ও তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চেয়েছিলাম। খুব সাবধানে আমরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাই, তাদের গল্প শুনি, অভিজ্ঞতা বিনিময় করি, প্রার্থনা করি এবং ঈশ্বর তাদের বিপদমুক্ত রেখেছেন বলে উল্লাস করি। প্রথমদিকেই আমরা গিয়েছিলাম আমাদের রবিবারের স্কুলের কিশোরী ছাত্রীদের বাড়িতে। ঈশ্বর আমাদের যাওয়ার এই সময়টাকে একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথম-বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দেখি, একটি ছাত্রীর মা গুরুতরভাবে অসুস্থ। তাঁর রক্তচাপ ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে আমরা একটা জটিল গর্ভধারণের আলামত হিসাবে সন্দেহ করি। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার তক্ষুনি। তাঁর সাত বাচ্চার প্রত্যেকেই বাড়িতে জন্মেছে, তাই পরিবারটি তাঁকে কোনো অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি, আর যদি তারা তা ভাবতোও, সেটা করার সঙ্গতি তাদের ছিল না। আমরা দ্রুত তার ব্যবস্থা করি এবং তাঁকে চন্দ্রঘোনায় ব্রিটিশ ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিই।

হাসপাতালে যাবার পথে, সেই মা আমাদেরকে বলেন, তিনি এই গোলযোগের সময়ে তাঁর বড় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই চিন্তিত। আমরা তাঁকে নিশ্চয়তা দিই যে, ঈশ্বর তাঁর মেয়েদের রক্ষা করবেন। তারপর ঈশ্বর আমাদেরকে নির্বাচন করেন এবং মনে করিয়ে দেন যে, তিনি তাঁর ইচ্ছা চরিতার্থ করার নিমিত্তে মানুষকেই বাহন করার কথা ঠিক করেছেন। একটি ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে নিয়ে মা চন্দ্রঘোনা থেকে ফেরার একটু পরেই ষোল বছরের লুসি আমাদের সঙ্গে থাকতে আসে।

আরেক বিকালে আমরা যখন একঘরের একটি বাড়িতে, রাস্তার দিকে মুখ করা বিছানায় বসে ছিলাম তখন উর্দি পরা দুজন লোককে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখি। তাদের একজন খুবই বাচাল প্রকৃতির ছিল এবং আমাদের দিকে অশোভনভাবে তাকাচ্ছিল।

“তোমরা কী?”
“তোমরা বাঙালি?”
“তোমরা সাহেব?”

তার সহযোগীকে মনে হয় সংলাপ দ্রুত শেষ করে সামনে এগুতে ইচ্ছুক, কিন্তু মুখপাত্র বলেই চলে, “তোমরা কী করো?”

আমরা আমাদের ব্যাখ্যায় কোথাও এগুতে না পারায়, একজন বৃদ্ধা তার সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতে শুরু করেন। “এটা একটা খ্রিস্টান পাড়া। এরা আমাদের সঙ্গে প্রার্থনা করতে এসেছেন।”
“ওহ।” আলো দেখা দিলে, সে উত্তরে জানায়, “তোমরা তাহলে দেবী!”

নৈরাজ্যপূর্ণ চট্টগ্রামে ক্যাথলিক হিসাবে আমরা প্রতিদিনই ঈশ্বরের উপস্থিতি ও তাঁর নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন হতাম, কিন্তু আমরা এও বিশ্বাস করি যে, পিতা আসলে প্রতিটি দেশি বিশ্বাসীর চোখেই একটা শক্তি হিসাবে প্রতিভাত করছিলেন নিজেকে।

এখানে একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পুরুষ ও তাঁর স্ত্রী, তাঁদের পরিত্রাণের এমন এক ঘটনা বর্ণনা করেন, যাকে কেবল অলৌকিকতা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। নিচের লেখাগুলো ছিল মি. জিমি রজার্স ও তাঁর পত্নীর নিজের হাতে লেখা সত্যি ঘটনার বিবরণ।

“জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯৭১ সালের তেসরা মার্চে ডাকা জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে বানচাল না করে দিলে আমার এই গল্পটা বলা হতো না।”

“ছয় বছর বয়সে অনাথ হয়ে, হিমালয়ের পাদদেশে প্রয়াত ডা: জে এ গ্রাহাম কর্তৃক স্থাপিত বিখ্যাত অনাথাশ্রমে ভর্তি হই আমি। আমাদের গোটা জীবনটাই রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিনিয়ত বদলে-যাওয়া মুখাবয়ব দ্বারা আচ্ছন্ন থাকত। অনাথাশ্রমটি ছিল একটি খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমি কেবল খুব ভালো শিক্ষাই কেবল পাই না, স্বয়ং খ্রিস্টকে আমার ত্রাতা হিসাবেও পাই, এবং বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনার অভ্যাস গড়ে তুলি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নৌবাহিনীতে ঢুকে আমার প্রথম জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাই। যুদ্ধ একজনকে ঈশ্বর কিংবা শয়তানের নিকটবর্তী করে তুলতে পারে, বিশ্বাসের গভীরতা ও বন্ধুসঙ্গের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। বিশ্বাস থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি আমার ক্ষেত্রে একটু ধীর ছিল; প্রথমে মদ্যপান, তারপর জুয়া খেলা, তারও পর যিশু থেকে ক্রমে দূর থেকে দূরে ছিটকে পড়া; খুন ছাড়া, আইনের চোখে এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা আমি করিনি।”

“শেষ পর্যন্ত নিজের ধ্বংসের কাছে এসে এবং নিজেকে একটি ডাকাতির অভিযোগে মিথ্যেভাবে অভিযুক্ত হতে দেখে আমি ঈশ্বরের শরণাপন্ন হই। এক মুহূর্তে আমার জীবন ছিল অন্ধকার ও অবসাদে আচ্ছন্ন, আর পরের মুহূর্তেই আলো, শক্তি ও আশ্বাস। অনেক বছর পেরিয়ে যায়—নিয়মিত চাকরি, পদোন্নতি সবই ঘটে। আমাদের যেহেতু কোনো সন্তান ছিল না, আমার স্ত্রী ও আমি দুটো বাঙালি মেয়েকে দত্তক নিই।”

“আমাদের আরামদায়ক জীবন ছিল এবং মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিলাম আমরা। তারপর হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে পড়ে। আমি চাকরি হারাই এবং বিভিন্ন খুচরো কাজ করি তার পরের ছয়মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি ঢাকায় কাজ করছিলাম। আমার স্ত্রী ও দুই কন্যা, তখন বয়স তিন ও চার, ১৭৫ মাইল দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহরে থাকত। আমাদের বাসাটি বিহারি অধ্যুষিত এলাকা থেকে মাত্র আধমাইল দূরে একটি মিলিশিয়া ক্যাম্পের পাশেই ছিল। সেটা খুব নির্জন এলাকা, যার কাছাকাছি মাত্র আর একটা বাড়িই ছিল।”

“ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে আমি যখন ক্রিসমাসের জন্য বাড়ি এসেছিলাম, তখন আমার মনে একটা জোর বিশ্বাস জেগেছিল যে, আমি হয়তো আমার বাড়িটা আর দেখব না। এই অনুভূতিটা এমন জোরালোভাবে আমার মনে গেঁথে থাকে যে, আমি আমার এক মিশনারি বন্ধু জিন গুর্‌গানসকে চট্টগ্রামে চিঠি লিখে সেই ভয়ের কথা খুলে বলি এবং আমার পরিবারের দেখভাল করার অনুরোধ করি।”

“মার্চের ১ তারিখ শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানিরা জাতীয় সংসদ অধিবেশন বানচাল করার জন্য যেসব বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করছিল তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য বাঙালিদের ডাক দেন। গোটা পূর্ব বাংলা তাঁর ডাকে জেগে ওঠে। মার্চের ১ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত অবস্থা খুব উৎকণ্ঠাময় ছিল এবং নানা দাঙ্গাহাঙ্গামাও হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি একটা সর্বাত্মক অভিযান শুরু করল বাঙালিদেরকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাতে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল বলা চলে।

ঢাকাকে রাতারাতি দমন করা গেলেও চট্টগ্রামে যুদ্ধ আরো কুড়ি দিনের মতো চলে। ২৫ মার্চ রাত দশটায় ঢাকা শহরে গোলাগুলি ও বোমাবাজি শুরু হয়। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। রাত দুটোর দিকে মিলিটারি সারা শহর ঘুরে লাউডস্পিকারে লোকদের সাবধান করতে থাকে এই বলে যে, আগামীকাল ২৬ মার্চ সারাদিন র্কাফ্যু থাকবে। বাড়ি থেকে কেউ বার হলেই তাকে গুলি করে মারা হবে।”

“বিকালের মধ্যে আমি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই সাহস করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খাদ্যের সন্ধান করতে থাকি। আমি একটা ছোট্ট ঘুপচিঘর দেখি যার একটি ছোট্ট জানালার ভেতর দিয়ে চা বিক্রি করা হচ্ছিল। আমি এক বোতল চা ভর্তি করে নিই, কেননা আমার সেই অভিযানে আমি এই একটি মাত্র খাদ্যের খোঁজ পেয়েছিলাম। পরদিন আমি একই দোকান থেকে একটি বাসি রুটি এবং আরো কিছু চায়ের ব্যবস্থা করতে পারি। চারটি বাঙালি পরিবার আমার ঘরে আশ্রয় নেয়। আমি একটি ১০ বাই ১০ ফুট ঘরে থাকতাম, ফলে আপনারা বুঝতেই পারছেন কী অসুবিধাই না হচ্ছিল সবার।”

“মার্চের ২৮ তারিখ আমি চট্টগ্রামে আমার পরিবারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমি দুবার ক্যান্টনমেন্টে যাই একটা বিমানের টিকিটের অনুমতির জন্য, কিন্তু তারা আমাকে মুখের ওপর না করে দেয়। এপ্রিলের ৩ তারিখ আমি আমাকে সাহায্য করার জন্য একজন বন্ধুকে যোগাড় করি, যে কিনা উর্দু বলতে পারে। সে আমাকে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে বিশাল বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে। সে তখন আমাকে অনুরোধ করে, তার সঙ্গে সেই মিলিটারি অফিসারের কাছে যেতে, যে-এই অনুমতিটি প্রদান করছিল। আমি আসার পর আমাকে বলা হয়, আমার বন্ধু আমার নাম ব্যবহার করেছে বিমানের টিকিটের জন্য। তাকে গুলি করার সমূহ ইচ্ছা ছিল তাদের, কিন্তু আমি আমার বন্ধুকে কোনোমতে সেই দুর্দশা থেকে উদ্ধার করে আনতে পারি। সে বলে যে, তাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল গুলি করার জন্য, কিন্তু সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে। সে যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দু বলতে পারত, সেহেতু তাকে এই সুযোগ দেওয়া হয় যেন আমি এসে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করি। অবশ্যই আমি সেদিন কোনো বিমানযাত্রার অনুমতি পাইনি। বাকি সারা সপ্তাহ আমি লাইনে দাঁড়িয়ে সেই চেষ্টা করে যাই কিন্তু আমাকে প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ আমি যে পাকিস্তানি তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারছিলাম না। পাঁচটি ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে ৬ই মে-র একটি উড়ানের অনুমতি দেওয়া হয় আমাকে।”

“আমার বিমানযাত্রার আগের রাতে, আমি একটা টেলিগ্রাম পাই যে, আমার স্ত্রী ও কন্যারা নিরাপদে আছে এবং তারা বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে আছে। এটা আমাকে রীতিমতো বিস্মিত করে। আমি তখনই বুঝতে পারি, আমার বাড়ির কিছু একটা হয়েছে, তা নাহলে আমার স্ত্রী কিছুতেই বাড়ি ত্যাগ করত না। কিন্তু আমি সেই টেলিগ্রাম আসার সময়টাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব? আমি এর আগে বিমানযাত্রার অনুমতি পেলে, সরাসরি বাড়ি চলে গিয়ে বাড়ির এই হাল দেখে ধরে নিতাম যে, আমার স্ত্রী কন্যাদের হত্যা করা হয়েছে। ওই সময়ে টেলিগ্রামটা পাওয়াতে আমি সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ও বুকের যন্ত্রণা, বেদনা থেকে অব্যাহতি পাই। এই খবর পেয়ে আমি সরাসরি বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে যাই এবং আমার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হই। দিন গড়িয়ে যায় এবং আমি আমার স্ত্রীর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারি। আমি তাকেই সেসব বর্ণনা করতে বলব।” [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৮)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৭)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;