পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকব দেবতাদের চক্ষুশূল হয়ে

হাশিম কিয়াম
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

উর্বশীর জন্য অপেক্ষা

ইন্দ্রের শাপে নয়—গাঢ় প্রেমের টানে
আরেকবার তুমি এসো এ-মর্ত্যে...
আমার তপ্ত হৃদে তোমার জন্য
জমিয়ে রেখেছি আমি
চল্লিশ হাজার পুরুরবার প্রেম...
এখানে প্রমত্ত নদীগুলো অনেক আগেই
মরে গেছে—
বিশাল বালুসাগরের বুক চিরে বয়ে
যাওয়া কিশোরীর চুলবাঁধা ফিতার মতো
সরু কোনো এক নদীর পাড়ে বসে
পচে যাওয়া মেঘের এসিড বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
আলতো করে তোমার ভেজা চুল আমি ছুঁয়ে দেব;

এখানে নন্দকাননের ফুলের ঘ্রাণ নেই—
শাদা হাড়ের বেড়াঘেরা তামাক
ক্ষেতের আইল ধরে হেলে-দুলে
দুজনে চলব তাজা তামাক
পাতার কড়া গন্ধে পাগল হয়ে;
অথবা—
কোনো এঁদো গলি ধরে একপাড়া কঙ্কালসার
ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় ঠেলে
গলিত লাশভরা নর্দমার বদ্ধ জলে
একঝাঁক মাছির গান প্রাণ ভরে শুনব;
সমুদ্রের লোনা জলে প্লাবিত ফসলের
মাঠে পরিত্যক্ত ভাঙা ডিঙিতে বসব
তোমার সাথে,
পানিতে পা ডুবিয়ে বেলুনের মতো
গোল হাতখানি তোমার
শক্ত করে ধরে
রাতের আকাশে পৃথিবীর আগুনে
ঝলসে যাওয়া চাঁদের অপরূপ রূপ
দেখব পুলকিত বদনে দুজন;

তারপর;
পোড়ামাটি দিয়ে অতিযতনে আমি বাসর গড়ব—
যন্ত্রণাকাতর পৃথিবীর সব নিমফুলে
সাজাবো সে-বাসর,
ঘুণধরা বাঁশের মাচাতে একগাদা পপি ফুলের শয্যায়
মুখামুখি বসে তোমার চারুনেত্রের পানে চেয়ে
পোড়ামাটির পাত্রে ক্ষুদে জাউ
খাব তৃপ্তি করে,
গন্ধর্বদের বজ্রপাতে আলোকিত হবে না সে বাসর
তুমি আর আমি অনন্তকাল ধরে
পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকব
দেবতাদের চক্ষুশূল হয়ে...

গোলাপি বিলাপ

পৃথিবীর সব ছায়ায় মিশে আছে কোনো কালের
দানবীয় আঁধার,
শেরপার চোখের জলে হিমালয়চূড়া গেছে ভিজে,
কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে কথা বলে,
প্রবল স্রোতের শব্দে শুনি আদিম আহাজারি,
কেশকীটের রসালো পেট ঠাস ঠাস করে ফাটে—
পাগলীটি বকবক করে...
একটি ক্ষুধার্ত কালো বিড়াল দরোজায় কড়া নাড়ে,
ফ্ল্যাটের ফ্যানের সাথে সোনালি আঁশের ফাঁস ঝোলে,
হতাশার চোখের তারায় ময়ূরের রঙিন পেখম নাচে,
কাহার পাড়ায় কবরের নিস্তব্ধতা—
শিবিকার ফাঁকা বুকে ছারপোকার রঙিন বাসর—
সর্দারের কালশিটে পড়া কাঁধে কবেকার ব্যথার বিলাপ,
গোলাপের পাপড়ি চুমে চুমে খামারের মুর্গির
গায়ের গোলাপি গন্ধ
পুকুরের ঢেউয়ের সাথে মিতালি করে,
গাভীর ওলানের বাঁটে একঝাঁক মাছি ভনভন করে,
বুকের ভেতর হাতুড়ির নগ্ন নাচন...
পচা শামুকের সারা গা জুড়ে তাজা তাজা
রক্তের রক্তিম ছোপ,
লক্ষ্মী প্যাঁচার চোখে জ্বলে বিলুপ্তির তীব্র আগুন,
এডিস মশারা বসতি গড়েছে আদুরে
খোকার কুঁকড়ানো চুলের ভেতর,
শরীরটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে...
ডাইনোসরের শেষ চিৎকার সুনামির মাতাল বুকে
গেছে মিশে,
ঘুমের মাঝে অনন্তঘুম স্বপ্নিল ইশারায় প্রায়ই কাছে ডাকে...
সুন্দরী ঘৃতকুমারী যেন ছলনাময়ী সাপিনী—
ঝাউশাখাতে দোল খায় হায়েনার একপাটি ধারালো দাঁত,
পাহাড়চূড়ায় সুরেলা ঝর্না নিঝুম ঘুম দেয়,
নতুন কাপড়ের সাদা গন্ধ বাতাসে ভাসে...
তরমুজের খেত যেন বড় বড় ঢেলাভরা মাঠ,
ভোমরের অপলক চোখ খড়ের পালায় অভয়াশ্রয় খোঁজে,
যুবতির ভেজা চুলের গন্ধ গহিন বনের গাঢ় অন্ধকারের
সাথে উদ্যম মিলনোন্মত্ত,
তোমার হৃদয়ে শুনি নর্তকীর নূপুরের আওয়াজ অনুক্ষণ,
ইঁদুরের গর্তে মুখ ঢুকিয়ে প্রেমিকযুগল গল্পমশগুল,
আকাশের নীলের সাথে মিশে গেছে
কালনাগিনীর নীল বিষ,
চাতকের বুকে লাল পিঁপড়েরা মচ্ছপবিভোর,
আমাকে ডেকেছিলে কবে যেন তোমার গোপন ডেরায়?
গন্ধমূষকের গন্ধমাখা ঠোঁটে অবচেতন মনে দিয়েছিলাম কি চুমু?
বাঁশঝাড়ের বুকচিরে একফালি বাঁকা চাঁদ চেয়ে আছে—বড্ড
বিমর্ষ লাগে তাকে,
দুপুরের সূর্যের চোখে দেখি বিরহের লাল লেলিহান,
মাতাল সাঁতারে মেতে আছে একজোড়া
মাথাকাটা ধড়,
শকুনের রক্তে ভেজে গেছে লালসার শরীর—তবু তার
রক্তমাখা দাঁত মরণকামড়ে নিত্য ক্ষতবিক্ষত
করে সব সরল জনপদ;

সাগরের ফেনায় ভাসে বেদনার নীল চোখ—
আমাকে ডেকে ডেকে কী যেন বলতে চায়,
অবশেষে সাড়া দিয়ে সেথায় গেলাম চলে—
পড়ে থাক চিরচেনা-মায়ামাখা-প্রিয় জনপদ
নেকড়ের গর্জনে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে,
তোমার কঙ্কালের বুক ফুঁড়ে ফুটেছে
গাদাগাদা গোলাপ,
দূর হতে অবিরত সে সৌরভ আমার অসাড় নাকে লাগে...

প্রাগৈতিহাসিক দানব

প্রাগৈতিহাসিক এক দানবের গলিত শরীর
সফেন সাগরের সখা হয়ে
নারকীয় মচ্ছপবিভোর,
জনপদের পর জনপদ অনন্তকাল বিশাল
ছাইগাদার কালো গর্তে নিদ্রাতুর,
ভয়ার্ত মায়া-মমতা মরীচিকার পেটে ঢুকে
দিগন্তের নীলিমায় ক্রমশ হচ্ছে বিলীন—
রক্তিচোখের লাল আগুনের আদিম আঁচে ছিন্ন নাড়ির বাঁধন—
নাড়ি ছেঁড়া ধন ও ছেঁড়ানাড়িকে ধিক্কারে ধিক্কারে
করছে বিচলিত,
বিশাল অজগরে রূপান্তরিত হয়ে মাঝেমাঝে
একঝাঁক মৃগেল মাছের পোনা
গোগ্রাসে গিলে খায়,
বিলভরা বিকশিত ধবলোৎপলের সাদা হাসি
অজগরটির প্রকাণ্ড পেটের নিচে চাপা পড়ে
বোবা ক্রন্দনরত...
ফাঁসির দড়ির পিচ্ছল পদার্থ গলায় তার
বহুবার খেয়েছে লাল চুমু—
তথাপি, সে অদ্যাবধি অমর
শেষমেশ;
অনাদিকালের বধবাঞ্ছা পরাজিত ষাঁড়ের
পিঠে চড়ে পালছেঁড়া নাবিকের দিশেহারা
দিলের ভেতর নিরন্তর কাতর...

রূপান্তর

দিঘিটি বেশ ছিল
চারপাড়ে তার হরেক রকম গাছ
নানা রঙের পাখির প্রাণজুড়ানো কলরবে
মুখরিত হতো শাখা-প্রশাখা
মৃদু ঢেউয়ের সাথে অবিরত কূলের
কলমি লতার হতো মধুর আলিঙ্গন
ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে একদল দস্যি
মেয়ের দুরন্ত সাঁতারে শিহরিত হতো তার তপ্তহৃদয়
নরম শরীরের একদম মাঝখানে একদোলনা
পদ্মশিশুর হাসিতে বিমোহিত
হতো কত যে নিত্যস্নায়ী
নীলাম্বরেরর চোখে চোখ রেখে হতো কথা—
মিলনের-বিরহের—নানা কথা
শরতের নিস্তব্ধ এক সকালে আচমকাই দিঘিটি
বিশাল খরস্রোতা নদী হয়ে
স্বরবৃত্ত ছন্দের মতো বয়ে যেতে লাগল
রুদ্রমূর্তিতে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে শেষমেশ
সাগরে বিলীন হলো
সাগরের নোনা পানি তার মিষ্টি জলের সাথে মিশতেই
সে বুকফাটা চিৎকার করে উঠল
কেঁপে কেঁপে উঠল আকাশ
তারপর;
দাবানলে ভস্মীভূত একঅরণ্যের নিস্তব্ধতা
জল নাই
স্রোত নাই
মধুর শিহরণ নাই
একসাহারা বালু বুকে ধর্ষিত প্রেমিকার মতো
এলোকেশে শুয়ে আছে সেই কবে হতে

বেদনার হিমসাগর

অব্যক্ত ব্যথার হিমালয় কত শত শত শতাব্দী ধরে
কত যে হৃদয়ে জমে হিম হয়ে আছে
কে রাখে সে খবর?
নিভৃতে কত শত কোটি নয়নের নোনা জল
পৃথিবীর তাবৎ জল নোনা করে দেয়—
বোবা কান্না পৃথিবীর কেন্দ্রে সজোরে ঝাঁকুনি দেয়
তবু কজনের ঘুম ভাঙে বলো?
ভোরের স্নিগ্ধ সমীরণ রুদ্রমূর্তিতে কালবৈশাখীর মতো
কত যে হৃদয় ভেঙে খানখান করে দেয়
কত যে হৃদয়ের জ্যোৎস্নাস্নাত শর্বরীরে
তিমিরপুঞ্জ জবরদখল করে
সকল আদুরে জোনাকি গিলে খায়
কে বাঁচাবে তাদের বলো?
অবদমিত বাসনার বাষ্পের কালো মেঘ
সারা আকাশ ঢেকে দেয়
তবু অঝোরে বর্ষা নামে না কেন?
শত শত কোটি পিয়াসী হৃদয় তপ্ত সাহারা যেন
মরুদ্বীপহীন এক বিশাল বালু সাগর
কে দেবে বলো এক ঝিনুক জল?