ইনতেজার হুসেইনের গল্প : সহযাত্রী

অনুবাদ: সালেহ ফুয়াদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সে যে ভুল বাসে চড়ে বসেছে তা কিছুটা দেরিতে টের পেল। ছোট্ট একটি সুটকেস নিয়ে এ স্টপেজ থেকেই ওঠা সামনের সিটের একহারা গড়নের ছেলেটি কিছুটা বিচলিত। চারপাশের যাত্রীদের বোকা বোকা চোখে দেখে নিয়ে ছেলেটি জিজ্ঞেস করে—এ বাস মডেল টাউনে যাবে?
হ্যাঁ, তুমি যাবে কোথায়?
মডেল টাউন, জি ব্লক... যাবে তো?
যাবে—মুখোমুখি বসা টাকমাথার রাশভারি চেহারার বৃদ্ধ ভ্রুক্ষেপ না করেই উত্তর দিয়ে চশমাটা ঠিক করে আবারো খবরের কাগজে ডুবে যায়।

এ বাস তাহলে মডেল টাউনগামী, এটায় কেন চড়ে বসলাম? কিছুটা তাড়াহুড়ো আর কিছুটা অন্ধকারের জন্য সে বাসের নম্বরটা ঠিক খেয়াল করেনি। দূর থেকে দেখল বাস দাঁড়িয়ে আছে। দিল দৌড়। কাছাকাছি পৌঁছতেই কন্ডাক্টর দরজা বন্ধ করে বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছিল। আগপাছ না ভেবে লাফ মেরে চলন্ত বাসের ফুটবোর্ডে ঝুলে যায়। তারপর দরজা খুলে বহু কসরতে পথ তৈরি করে ভেতরে পৌঁছে। পরের স্টপেজে যাত্রী নামলে একটা সিট খালি পেয়ে দ্রুত দখলে নেয়। এখন জানা গেল সে ভুল বাসে চড়েছে।

যাক, মাত্র তো সাত পয়সার মামলা। সামনের স্টপেজে নেমে গেলেই হলো। পরের স্টপেজে নামা এবং ওখানে দাঁড়িয়ে আবারও বাসের অপেক্ষা করার কথা ভাবতে কিছুটা কষ্ট তো অবশ্যই হয়েছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করার তার রয়েছে বাজে অভিজ্ঞতা। যতবার স্টপেজে দাঁড়িয়েছে ততবারই দেখেছে নানা রুটের রাজ্যের বাস আসে আর যায়, শুধু তার বাসটাই আসে না। আজব হলো, বাড়ি থেকে শহরে যাওয়ার জন্য স্টপেজে দাঁড়ালে কিছুক্ষণ পর পর শহরফেরতা বাস আসত আর যেত। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও শহরমুখী কোনো বাস আসত না। আবার শহর থেকে বাড়ি ফেরার জন্য স্টপেজে এলে একটার পর একটা শহরগামী বাস আসত আর যেত। শহরগামী বাসের লাইন পড়ে যেত। অন্যদিকে বাড়ির দিককার স্টপেজ শূন্য পড়ে থাকত। বহু দূর পর্যন্ত বাসের কোনো নামনিশানা চোখে পড়ত না। হ্যাঁ, এমনটা আকসার হয়েছে—স্টপেজ থেকে খানিকটা দূরে থাকতেই কাঙ্ক্ষিত বাস তার সামনে দিয়ে শাঁ শাঁ করে চলে গেছে। তারপর আবারও সেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পড়া এবং টলতে শুরু করা। আজ সঙ্গে সঙ্গে বাস পেয়ে যাওয়ায় মনে মনে বেশ খুশি হয়েছিল। কিন্তু এখন জানা গেল এ যে ভুল বাস!

পরের স্টপেজে এসে আচ্ছা মুসিবতে পড়া গেল, সে নামবে কি নামবে না ঠিক বুঝতে পারে না। একবার ভাবে এ তো সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। এখানে তার রুটের বাস কোথায় পাবে। পায়ে হেঁটে পেছনের স্টপেজে পৌঁছতে হবে এবং সেখানে গিয়ে আবারও সেই বাসের অপেক্ষা করতে হবে। নামার জন্য দাঁড়িয়েও আবার বসে পড়ে। কিন্তু আমি এ পথ ধরে সামনেই বা কেন যাচ্ছি। এভাবে তো আমি আমার পথ থেকে আরো দূরে সরে যাব। আবারও নেমে পড়তে চায়। কিন্তু দাঁড়ানোর আগেই বাস ছেড়ে দেয়। সেও উঠতে উঠতে বসে পড়ে। বাসের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হতে থাকে যে, নিজের পথ ছেড়ে সে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। এ ভুল বাস আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে। খালিদের কথা মনে পড়ে। খালিদ মডেল টাউনে বাস করত। ও থাকলে কোনো ভয় ছিল না। তার বাসায় আনন্দে রাতটা কেটে যেত। খালিদ, নাইম পাথার, শরিফ কালিয়া; তার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুগ্রুপের কথা মনে পড়ে। সবাই এক নতুন বিশ্বের খোঁজে পাকিস্তান ত্যাগ করেছে। সবার শেষে গিয়েছে খালিদ। নাইম আর শরিফ দুই মহামূর্খ স্কলারশিপ যোগাড় করে এখন আমেরিকায় আছে। খালিদ বলেছিল, দোস্ত, স্কলারশিপ না হোক কিছু টাকা পেলেই লন্ডন চলে যাব। এখানে কিছু হবে না। হোটেলে থালাবাসন পরিষ্কার করতে হলে তাও করব। তবু এখান থেকে তো বেরুতে পারব। তার বুঝে আসত না খালিদ এখান থেকে বেরুনোর জন্য এত উতলা কেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে খালিদ ঠিক কাজটাই করেছে। এখানে তো বাসে যাতায়াত করাটাও মহাফ্যাসাদের।

বাসে ভয়ঙ্কর রকমের ভিড়। দরজার কাছে এত যাত্রী দাঁড়ানো যে, সামান্য জায়গার জন্য একজন আরেকজনকে ধাক্কাচ্ছে। একেকজনের গা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। জামা থেকে পচা গন্ধ ভদভদিয়ে বেরুচ্ছে। কিছুটা ভর পাওয়ার জন্য গায়েবি কিছু খুঁজে পেতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে হাতগুলো। রাগে মুখগুলো সঙ্কুচিত, কারো মুখেই হাসি নেই।

টাকমাথার রাশভারি চেহারার বৃদ্ধ মনোযোগের সাথে খবরের কাগজে ডুবে ছিল। কিন্তু সে বেচারাও কাগজ গুটিয়ে তা দিয়ে হাতপাখা চালানো শুরু করল। একহারা গড়নের ছেলেটি আগের মতোই বিচলিত রয়েছে। প্রতিটা স্টপেজেই জেনে নিত—এটা মডেল টাউন কিনা। না-বাচক উত্তর পেয়ে কিছু সময়ের জন্য নিশ্চিন্ত হতো। কিন্তু পরের স্টপেজ আসতে না আসতেই অস্থিরতা বেড়ে যেত। পাশের সিটে বসা ময়লা জামাপরা যে লোকটা অনেকক্ষণ ধরে ঝিমুচ্ছিল এবার বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে সে অবাক হলো। এত শোরগোল আর চেঁচামেচির ভেতরেও লোকটা কী আরামসে ঘুমোচ্ছে, আশ্চর্য!
বাসের গতি বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটা স্টপেজ ফেলে এসেছে। এখান থেকে কি কোনো যাত্রী ওঠানোর ছিল না? উদ্বিগ্ন হয়ে দেখল পরের স্টপেজে খুঁটির নিচের আলোয় একদল মানুষ দাঁড়িয়ে; যেন ঘরদোরহারা উদ্বাস্তুক্যাম্প। সবার চোখ বাসের দিকে। বাসের গতি কিছুটা কমেছিল, কিন্তু কন্ডাক্টরের ‘আ-গে চলিয়ে উস্তাদ’ বলামাত্র আবার বেড়ে গেল। সে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে থাকে এতগুলো মুখের সমাবেশে কতটা দ্রুত আশা প্রাণ পেয়েছিল আর কতটা দ্রুতই সে আশায় গুড়েবালি পড়েছে। কতটা দ্রুত মুখগুলো নৈরাশ্যে ঢেকে গেছে, কতটা দ্রুততায় ক্রোধ ছড়িয়ে পড়েছে মুখগুলোয়। কেউ কেউ মনখারাপ করে পায়ে হাঁটা শুরু করেছে। এদেরই একজন লাফ মেরে ফুটবোর্ডে ঝুলে যায়। তারপর জোর করেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে। গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে-থাকা যাত্রীদের বেজায় রাগ হয়। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। কন্ডাক্টর বাঁশি ফুঁকলে বাস থেমে গেল। ‘বাবু উতর যা, মেঁ কাহতা হুঁ উতর যা’। ভেতরে প্রবেশকারী লোকটা বিষঢালা চোখে একবার কন্ডাক্টরের দিকে আরেকবার মজমার দিকে তাকায়। তারপর রাগে ঠোঁট কামড়ে নিচে নেমে পড়ে।

সে ভাবে, তারও নেমে পড়া উচিত। নিশ্চিত সে ভুল বাসে সওয়ার হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে বাস ছুটতে শুরু করেছে। তাছাড়া দরজাটাও প্রচুর লোক ঘিরে রেখেছে। আর সিটের সামনে তো এক মানবপ্রাচীর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এদের সবার বিরুদ্ধে তার ভেতরে ঘৃণা সৃষ্টি হতে থাকে। চিল্লাচিল্লি-ধাক্কাধাক্কি করে ঘামে ডুবন্ত এ নোংরা লোকগুলোকে তার মনে হয়, মনুষ্যত্বহারা প্রাণী। সে এদের প্রতি এতটাই ঘৃণা পোষণ করছিল যে, তার বাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে এখুনি দরজা খুলে লাফ দিত। ঘুমন্ত লোকটির মাথা তার কাঁধে ঢলে পড়েছিল। একরাশ ঘৃণা নিয়ে ওই ময়লা মাথা আর ঘামে ডুবন্ত কালো ঘাড়টাকে দেখে সে। আধো জেগে লোকটা নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিক হয়ে বসে। কিন্তু অল্প সময় পরেই আবারও বেচারার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। লোকটার বুজে-আসা চোখ আর টক্কর-খাওয়া মাথা দেখে তার ঘেন্না লাগে। মনে হয় লোকটা আবারও তার কাঁধে মাথা রাখতে চাইছে। সে মুচকি হেসে একেবারে জানালা ঘেঁষে সরে বসে। ঘুমন্ত লোকটা মাথা রাখার ভর না পেয়ে অল্প সময়ের জন্য জেগে ওঠে। মুহূর্তেই আবারও লোকটার চোখ বুজে আসে। ফের সেই ময়লা মাথা এবং ঘামে ডুবন্ত সেই কালো ঘাড় তার দিকে তেড়ে আসে। মনে হয়, গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা এ যাত্রীদল, প্রচণ্ড এ ভিড় এখনই তার ওপর ভেঙে পড়বে। দম বন্ধ হয়ে আসে। সুখে থাকুক সেই বন্ধুরা যারা এই দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। খালিদ, নাইম পাথার এবং শরিফ কালিয়ার প্রতি তার ঈর্ষা হয়। এরা সবাই দেশভাগের সময় ভারত ছেড়ে তার সঙ্গে ‘স্পেশাল ট্রেনের’ যাত্রী হয়েছিল। একই রকমের ভয় অতিক্রম করে সবাই একই অবস্থায় পাকিস্তানে পৌঁছেছিল। আর এখন তাদের পথ কতটা আলাদা। তার দশা যেন এ লক্করঝক্কর বাসের মতোই, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঝপথে কোথাও গরগর করে অচল হয়ে পড়ে। সমস্ত যাত্রী নেমে গিয়ে নানারকম যানবাহনে চড়ে নানা জায়গায় পৌঁছে যায়।
এটা মডেল টাউন?
না—রাশভারী চেহারার লোকটা আবারও ভ্রুক্ষেপ না করেই উত্তর দিল। বাস আবার চলতে শুরু করেছে। অদ্ভুত কন্ডাক্টর, একবারও এ-মুখো হয়নি। একবার ভাবে নিজেই ডাক দিয়ে কন্ডাক্টরের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কিন্তু আবার এও ভাবল এটা তো কন্ডাক্টরের কাজ, তারই তো এসে টিকিট কেটে যাওয়ার কথা। কন্ডাক্টর যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে বারবার ঘুরছিল। শেষমেশ সামনের মহিলা আসনের দিকে এগিয়ে যায়। বেশ সময় নিয়ে তাদের টিকিট কাটে। দীর্ঘ ব্লাউজ পরা ভারী নিতম্বের লম্বা মেয়েটি এখন আর দৃষ্টিসীমার ভেতর নেই। রোগা ছেলেটির সামনের আসনটি সে পেয়ে গেছে। যখন মেয়েটির দাঁড়িয়ে থাকাটা তার কাছে উপভোগ্য ছিল তখন বসার জন্য আসন পাওয়াটা তার কাছে আনন্দের হতে পারে না। এখন শুধু মেয়েটির উজ্জ্বল গ্রীবা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু রোগা ছেলেটি অস্থির হয়ে বারবার এদিক-ওদিক তাকাতাকি করে তার মনোযোগ ভেঙে দিচ্ছে। ছেলেটার ওপর ভীষণ রাগ হয়। কন্ডাক্টরকে এদিকে আসতে দেখে রোগা ছেলে আর ভারী নিতম্বের অধিকারিণীকে কিছু সময়ের জন্য সে ভুলে যায়। ঠিক তখনই তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়, সে চাইলেই অনায়াসে সাতটি পয়সা বাঁচাতে পারে। কন্ডাক্টরের তো আর চার চোখ নেই যে, সে কোত্থেকে উঠেছে তাও দেখতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে আবার নিজেই নিজেকে তিরষ্কার করে; মাত্র সাত পয়সার জন্য সে বেইমানি করবে? খুব নিকৃষ্ট কাজ। অল্প সময় পর আবারও চিন্তাটা তার ভেতর তাকত নিয়ে ফিরে আসে; আরে সাত পয়সাই বা কম কিসে। দোটানায় পড়ে গেল। লোভ আর সততা তার ভেতর এক সঙ্কটের সৃষ্টি করে। সাতটা পয়সা বেঁচে যাবে। তার বেকারত্বের কথা মনে পড়ে। পকেটে হাত দিয়ে ভাবে সাত পয়সা তো অনেক কাজে লাগতে পারে। আবার ভাবে—নাহ, বেইমানি করতে পারব না। বেইমানি আত্মাকে খোকলা করে দেয়। মনে মনে সে যখন একটি নৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছে তখন কন্ডাক্টর তার মাথার উপর এসে দাঁড়িয়েছে। পকেটে হাত দিয়ে প্রথমে সাড়ে চার আনা হাতে নিল, পকেটেই সে চার আনা রেখে দিয়ে পুরো এক টাকা বের করে কন্ডক্টরের হাতে ধরিয়ে দিল।
মডেল টাউন?
হ্যাঁ।
কন্ডাক্টর তিন আনার টিকিট কেটে বাকি পয়সা তাকে ফেরত দেয়। সে টিকিট এবং বাকি পয়সা কিছুটা ইতস্ততার সঙ্গে হাতে নেয়। এ তো দেখি একবারো পুঁছলো না কোথা থেকে উঠেছি। সে আড়চোখে একবার আশেপাশের যাত্রীদের দেখে নেয়। সহযাত্রীকে ঘুমন্ত দেখে কিছুটা স্বস্তি পায়। পয়সা আর টিকিট পকেটে রেখে দেয়।

ঘুমন্ত লোকটার মাথা ফের কাঁধে এসে ঠেকেছে। আবারও লোকটার উপর বেজায় বিরক্ত হয়। তার বেশি রাগ হচ্ছিল সেই একহারা ছেলেটির ওপর, এখনো নতুন স্টপেজ এলেই অস্থির হয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছে এ স্টপেজ মডেল টাউনের নয় ততক্ষণ শান্ত হচ্ছে না।

সাহেব, আজ দাতা-দরবারে [দাতা গঞ্জেবখস লাহোরি র. এর দরগা] বহু লোক সমাগম ছিল—পাশেই দাঁড়ানো ময়লা কোট পরা লিকলিকে গড়নের একটি লোক সেই গম্ভীর প্রকৃতির বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ করছিল। আলাপ শুনে তার মনে পড়ল আজ বৃহস্পতিবার। এই লাস্ট বাসে এত ভিড় হওয়ার কারণটাও এতক্ষণে বুঝে এলো। এরা তাহলে ‘দাতা-দরবার’ থেকে আসছে।
আমি যেতে পারিনি—রাশভারী গম্ভীর লোকটি লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল। এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, নিয়মিত যেতে পারি না। মাঝে মাঝে মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে যাই।
প্রথম বৃহস্পতিবারের কথা বলছেন, শুনুন—ময়লা আচকানপরা লোকটি বলে, ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার দরবারে যেতে ভুলি না। কিছুটা থেমে আবারও বলে, খান সাহেব, গত মাসে এক আজব ঘটনা ঘটেছে। শুধু ভাবুন একবার, সারা রাত ধরে... লোকটার গলার স্বর ফ্যাসফেসে শুনায়, একটি বিড়াল, বড়, কালো ও লালচোখু বিড়াল... আমি ভয় পেয়ে যাই। বিড়ালটা মাজারের পেছনে চলে যায়। কিছুটা স্বস্তি মেলে। ...কিন্তু অল্প সময় পরেই আবারও ফিরে আসে। আমার ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়। মানুষের পায়ের নিচ দিয়ে এটি আবারও মাজারের পেছনে চলে যায়। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। কিন্তু কী মুশকিল, ফের কিছু সময়ের ভেতরেই ওটা ফিরে আসে। মনে মনে বলি, ব্যাপারটা কী। সাহেব, গভীরভাবে অনুসন্ধান করে যা দেখলাম তাতে তো আমি হতবাক... আদতে বিড়ালটি মাজারের তাওয়াফ করছিল! ভোর পর্যন্ত তাওয়াফ করেই যাচ্ছিল। আজান হলে কিছুটা কেঁপে উঠলাম। তারপর কী হলো জানেন? চেয়ে দেখি বিড়ালটা গায়েব!
তাই নাকি!—গম্ভীর ভদ্রলোক বিস্মিত হয়।
জি, বিড়াল উধাও!

আশেপাশের যাত্রীরা ময়লা আচকানপরা লোকটার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। রাশভারী ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে ফেলে।
আসল কথা হলো—ময়লা আচকানপরা লোকটি বলে, বৃহস্পতিবারে জিনরা দাতাকে সম্মান জানাতে আসে।

নিশ্চুপ যাত্রীদের চোখে বিস্ময় আরো বেড়ে যায়। দীর্ঘ গোঁফ বিশিষ্ট পেশিবহুল এক ব্যক্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এটা দাতা সাহেবের কেরামত। শ্রদ্ধায় লোকটার মাথা নত হয়ে আসে।

আমি বিশ্বাস করি না—কোণার সিট থেকে একটি আওয়াজ এলে মুহূর্তের মধ্যে সবার চোখ স্যুটপরা এক ব্যক্তির ওপর নিবদ্ধ হয়।

আপনি দাতা সাহেবকে বিশ্বাস করেন না?—সেই পেশিবহুল ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয়ে তার বাঁজখাই গলায় জিজ্ঞেস করে।
দাতা সাহেবকে বিশ্বাস করি, কিন্তু...
কিন্তু?
কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে...
কোনো কিন্তুটিন্তু বুঝি না, সোজাসাপ্টা জানতে চাই, দাতা সাহেবে বিশ্বাস করেন নাকি করেন না?
ভাই, ইনি আধুনিক মানুষ, যুক্তিহীন কথায় বিশ্বাস করেন না—গম্ভীর লোকটি নরম সুরে বলে। এরপর স্যুটপরা লোকটাকে সম্বোধন করে বলে—কিন্তু মিস্টার, আপনি যে মাত্রই বললেন দাতা সাহেবকে মানেন?
হ্যাঁ, তাকে আমি মানি। বুজুর্গ মানুষ ছিলেন।
তাকে যদি শ্রদ্ধেয় বলে মানেন তবে এ কথাও নিশ্চয় বিশ্বাস করবেন যে, তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না। তো মিস্টার, আপনি তার বই পড়ে ফেলুন। এতে তিনি নিজেই এ ধরনের ঘটনার কথা লিখে গেছেন—বলতে বলতে গম্ভীর প্রকৃতির লোকটি চারপাশের যাত্রীদের একবার দেখে নেয়। তার প্রমাণ দেওয়ার ভঙ্গি অনেকটা বর্ণনাত্মক হয়ে ওঠে। দাতা সাহেব একবার সফরে বের হলেন। তিনি একটার পর একটা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একটা জায়গা অতিক্রম করতে গিয়ে দেখলেন পাহাড়ে আগুন লেগেছে। পাহাড়টায় অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ছিল। আর সে পাহাড়েই ছিল একটা ইঁদুর। ইঁদুরটা সেই আগুনের পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করছিল। জীবিত ছিল। এরপর সেই ইঁদুরটা ব্যাকুল হয়ে আগুন থেকে বেরিয়ে এলো। আর বেরুনো মাত্রই মরে গেল। গম্ভীর লোকটা খানিক দম নিয়ে আবার বলে, এবার কী বলবেন? যুক্তি তো এটাকে মানে না।

দাতা সাহেব সঠিক বলেছেন—একজন দাঁড়িওয়ালা ব্যক্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে। এরপর লোকটার গলা ভেঙে আসে—দাতা সাহেব সঠিক বলেছেন, মানুষ বড় ক্ষুদ্র প্রাণী, আর এ পৃথিবী...। আগুনের পেটে জ্বলা পাহাড়... নিঃসন্দেহে সত্য, নিঃসন্দেহে সত্য। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।

স্টপেজ কি আর আসবেই না নাকি? কেচ্ছা শুনে বিরক্ত হয়ে ভাবে সে। আচমকা তার মনে হয় স্টপেজ যদি ইতোমধ্যে ফেলে আসে তাহলে? তাহলে আর কী, সে তো ভুল বাসের যাত্রী। এ সময় তার মনে পড়ে সে মডেল টাউনের টিকিট কেটেছে। তার মানে আমি মডেল টাউনে যাচ্ছি, কিন্তু কেন? বাস যেন প্রবল রাগে দৌড়ে চলেছে। তার হাড়হাড্ডি এমন খটমট করতে লাগল যে সে ভয় পেতে লাগল। যাত্রীদের প্রতি লক্ষ করল। দেখল যারা তখন পর্যন্ত সামান্য জায়গার জন্য লড়ে যাচ্ছিল সে সমস্ত যাত্রীরা এখন চুপচাপ। তাদের মুখের ওপর বাতাস উড়ছে। তার আগের মনখারাপ ভাবটা এবার মায়ায় বদলে গেল। মন চাইছে দাঁড়িয়ে ওদেরকে বলে, বন্ধুরা আমরা ভুল বাসে চড়ে বসেছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, এমনটা বললে সবাই তাকে বেওকুফ মনে করবে। ভুল বাসে তো শুধু সে চড়েছে, বাকি সবাই সঠিক যাত্রী। তার মানে একই বাস একই সময়ে সঠিক হতে পারে, ভুলও হতে পারে? একই বাস ভুল পথে চলে আবার সঠিক পথেও চলে? ব্যাপারটা তার কাছে বড় অদ্ভুত ঠেকে। বিষয়টা তার ভেতর একটি বিশেষ ও অস্বাভাবিক জিজ্ঞাসা হয়ে দেখা দেয়। এরপর এই গিট্টুকে এই বলে খুলে যে, বাসের কোনো ভুল নেই। বাসের রুট, স্টপেজ এবং টার্মিনাল তো নির্ধারিত। সব বাস স্ব স্ব পথে ছুটে চলে। ভুল বা সঠিক হয় যাত্রী।

ঘুমন্ত লোকটার মাথার ভারে তার কাঁধ ভেঙে পড়ছিল। তবু এবার সে লোকটার দিকে মায়াভরা চোখে তাকায়। সন্দিগ্ধ হয়ে ভাবে, আমার ঘুমন্ত সহযাত্রী আরামে আছে তো। সহযাত্রী? তার তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে, সে নিজে তো ভুল বাসে আছে, আর সঙ্গী আছে সঠিক বাসে। তারপরও দুজন সহযাত্রী হয় কিভাবে? সে বাসের সকল যাত্রীর ওপর চোখ বুলায়। আমার তাহলে কোনো সহযাত্রী নেই?

তারপর সে জানালার বাইরে চেয়ে থাকে। একটা খুঁটির কাছে কিছুটা আলো-অন্ধকারে একটি যাত্রীহীন বাস কিছুটা সড়কে আর কিছুটা সড়কের বাইরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। চাকাহীন একটি খালি টাঙ্গা আকাশমুখী হয়ে পড়ে আছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে হয়তো। এরপর এভাবেই ঘাড় বের করে বাসের পেছনের দিকটা দেখল। পেছন দিক থেকে প্রচুর কালো ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। বাসে যদি আগুন লেগে থাকে? কিন্তু আগুন তো লেগেই ছিল। এটা ভেবেই তার চোখ ওই জানালায় পড়ল যার গায়ে লেখা ‘স্রেফ খতরনাক অবস্থায় খুলুন’। সে বাসের ভেতরটার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে চমকে গেল। বিশ্রী রঙের বাল্বের আলোয় সমস্ত মুখগুলো হলদে-ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পুরোটা বাস মানুষে ঠাসাঠাসি; তবু বনের অন্ধকারে আটকে পড়া গবাদি পশুর দলের একে অন্যের মুখ দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার মতো নিঃশব্দ-নীরব। দাঁড়িওয়ালা লোকটার চোখ বন্ধ। গম্ভীর ব্যক্তি আসন আঁকড়ে নীরব বসে আছে। পেশিবহুল গোঁফওয়ালা লোকটা হাতলকে শক্ত করে মুঠোয় ধরে কোনো অজানা চিন্তায় হারিয়ে গেছে। ময়লা আচকানপরা লোকটা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এবার সে অন্য কারো মুখোমুখি হয়ে আছে। আর ঘুমন্ত ব্যক্তি? ঘুমন্ত লোকটির দোলায়িত কাঁধের পুরোটা ভার এবার তার ঘাড়ে। সে এতটা আলগা হয়ে ওই মাথার নিচে ঢাকা পড়া বাহুর দিকে তাকাল যেন এটি তার দেহ থেকে আলাদা কোন চিজ। এখানে কেবল ঘুমন্ত মানুষটিই সুখে আছে।

যাত্রীদের হুড়মুড় করে নামতে দেখে বুঝতে চেষ্টা করল এটা কোন স্টপেজ। সবাই এমনভাবে পড়িমরি করে বেহুঁশ হয়ে নামছে যেন কোনো বড় আগুনের হাত থেকে পালাচ্ছে। এ তো দেখছি পুরো বাসটাই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। নেমে যাওয়ার পর নতুন কিছু লোক সওয়ারও হয়েছে। কিন্তু বাস ছাড়ার পর কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে। সে অবাক হলো, এক স্টপেজেই কত কত লোক নেমে পড়েছে। সামনের স্টপেজে বাকি যাত্রীরাও যদি নেমে পড়ে? এটা ভেবে কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। আশ্বস্ত হতে সে সমস্ত পরিচিত মুখগুলো খুঁজে ফেরে যাদেরকে যাত্রার শুরু থেকে দেখে আসছিল; যেন ওদেরকে সে হাজার বছর ধরে চেনে। স্যুটওয়ালাকে তো সে নিজেই নেমে যেতে দেখেছে। ময়লা আচকানপরা লোকটা এখনো আছে। লোকটা এবার সিট ভাগাভাগি না করে গা ঢেলে বসেছে। রাশভারী গম্ভীর লোক আবারও খবরের কাগজ খুলে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করেছে। আর একহারা গড়নের সেই বালক! কোথায়? নেমে পড়েছে নাকি? এই সেরেছে! আজব ছেলে, মডেল টাউন আসার আগেই নেমে গেছে। তার অনুতাপ হচ্ছে, বিচলিত ছেলেটাকে অকারণে সে সহ্য করতে পারছিল না। যদি ছেলেটাকে বুঝিয়ে দিত, মডেল টাউন কতটা দূরে এবং কোন সড়ক অতিক্রমের পর মডেল টাউন আসবে তাহলে হয়তো বেচারা আর ভুলটা করত না। কিন্তু তার এই অনুতাপ-উপলব্ধি খুব দ্রুতই কেটে যায়। তার চোখ সামনের সিটে বসা ভারী নিতম্বের মেয়েটির ওপর আটকে যায়। মেয়েটির উজ্জ্বল ঘাড় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের দেয়াল দূর হয়ে গিয়েছে। সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

থামো, থামো—এক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়।

বাবু মশাই এতক্ষণ কি ঘুমিয়ে ছিলেন নাকি? এখন আর পরের স্টপেজে থামবে। কন্ডাক্টর সবার থেকে দূরের সিটে গিয়ে বসে।

হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানো ব্যক্তি অগত্যা চুপচাপ বসে পড়ে। যেভাবে হঠাৎ উত্তেজনা ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেভাবেই হতাশা তাকে ভেজা আটার মতো জমিয়ে দিয়েছে। লোকটার আচমকা জেগে ওঠা এবং সঙ্গে সঙ্গে দপ করে নিভে যাওয়া দুটোই তার কাছে অদ্ভুত ঠেকে। কেন জানি আবারও তার মডেল টাউন আসার আগেই নেমে পড়া সেই রোগা ছেলেটার কথা মনে পড়ে। যে তার নির্ধারিত স্টপেজের আগেই নেমে পড়েছে, যে তার নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়িয়ে সামনে চলেছে এবং সে নিজে; যে একটা ভুল বাসে চড়ে বসেছে, যে ব্যক্তি বাসে পা রাখার জায়গা পাচ্ছিল না এবং যাকে বাসে উঠেও নেমে পড়তে হয়েছিল—সবার কথা মনে পড়ে। বাসে ভ্রমণকারীরা কোনো না কোনোভাবে ফ্যাসাদে অবশ্যই পড়বে। কিন্তু আমি যাচ্ছি কোথায়? তার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, বাস তো এখন মডেল টাউনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সামান্য অসতর্কতার কারণে সে কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছে। এত রাতে মডেল টাউনে গিয়ে আবার ফিরে আসা কতটা আচ্ছা মসিবতের কাজ। আবারও খালিদের কথা মনে পড়ে। ও এখানে থাকলে আজ কতটা সহজে সে উতরে যেত। খালিদ, নাইম পাথার এবং শরিফ কালিয়ার সঙ্গে কত রাত জেগে পার করেছে। সে রাতগুলো তো রাত নয়, ছিল দিন। ঘরে না ফেরার ছুঁতোয় কত অজানা গলি কত নাম না জানা বাজার চষে বেড়িয়েছে। কত জলদি তাদের দলটা ভেঙে গেল। একেকজন কোথায় কোথায় হারিয়ে গেছে। তার কাছে রাত এখন পাহাড়সমান, এ রাতে পথ ছেড়ে সামান্য বেপথু হলেই কেয়ামত সামনে এসে দাঁড়ায়।

চৌধুরী সাহেব, ওটা কিসের বিল্ডিং হচ্ছে?—ময়লা আচকানপরা লোকটা জানালার বাইরে তাকিয়ে পেশিবহুল লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।
কারখানা।
সাহেব, এ সড়কের পাশে অনেক বড় বড় বিল্ডিং উঠেছে এখন—গম্ভীর লোকটি বলে, এ-সমস্ত জায়গা আগে পতিত ছিল।
খান সাহেব, পাকিস্তানের আগে তো আপনি দেখেননি—পেশিবহুল লোক বলে, এসব জঙ্গল ছিল। পথচারীরা শুধু দিনের বেলা চলাচল করত। কিন্তু একবার এখানে দুজন ইংরেজ এলো শিকার করতে। অনেকক্ষণ ধরে গুলাগুলি করতে থাকে। শিকার বারবার ফসকে যায়। দুই ছোকরা মজা দেখছিল। ছোকরা দুইটা ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওদের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে ঠাস ঠাস করে ফায়ার করে ফটাফট দুইটা হরিণ ফেলে দেয়। এরপর ছোকরার দল কী বুঝল কে জানে, যৌবনের ঢেউয়ে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে ইংরেজদের দিকে তাক করে বসে। ইংরেজ দুটো মাথার উপর পা তুলে পালাল।
উত্তম কাজ করেছে ভাই—ময়লা আচকানওয়ালা দাদাগিরির ভঙ্গিতে বলে।
উত্তম কাজ হয়নি মশাই—পেশিবহুল লোকটা দুঃখভরা গলায় বলে।
ইংরেজ দুটো বড় সাহেব ছিল। পরের দিন বহু ফিরিঙ্গি সৈন্য এলো। পুরো জঙ্গল তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছোকরা দুটোকে আর পেল না। রাগে জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দিল। তিন দিন ধরে বন পুড়ল। যে ভেতরে রইল পুড়ে ছাই হলো, যে বাইরে বেরুল গুলির মুখে পড়ল। অনেক ঘন জঙ্গল ছিল। বহু পুরনো পুরনো গাছ ছিল। সব জ্বলেপুড়ে উজাড় হয়ে গেল। ময়লা আচকানপরা লোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গাছ পুড়ে গেলে ভালো হয় না। আর হলোও না, দীর্ঘ দিন ধরে এ জায়গা বিরাণ পড়ে রইল। দিনেও আসতে ভয় করত।
তুমি দেখেছিলে?—ময়লা আচকানওয়ালা জিজ্ঞেস করে।
না।
আমি দেখেছি। দুশমন ইংরেজরা এই শহরটাকেও খুব জ্বালিয়েছে। হজরত আউলিয়ার দরগার আশপাশটা খুবই নীরব জায়গা। রাতের বেলা ওই পথ দিয়ে কেউ যেতেই পারে না। কিন্তু ভাই সাহেব আমরা, হ্যাঁ, ওই জেন্টলম্যান সাহেব গিয়েছেন; স্যুটপরা লোকটার খালি সিটটার দিকে তাকিয়ে বলে। মশাই, দুপাতা ইংরেজি পড়লে সব কিছুতেই একটা ‘কিন্তু’ জুড়ে দেওয়ার রোগটা বেড়ে যায়। ওরা এখানেও ‘কিন্তু’ লাগায়। তো আমি কী যেন বলছিলাম; হ্যাঁ, বৃহস্পতিবার, রাত প্রায় অর্ধেক, রাস্তাঘাট সুনশান, নীরব। দেখি আমার আগে আগে একটি ছাগল হাঁটছে। ডোরাকাটা স্তনভারী ছাগল। ভাবলাম, ধরে বাড়ি নিয়ে যাই। যেই ধরতে গেলাম অমনি হরিণের মতো লম্ফঝম্ফ শুরু করল। এরপর চেয়ে দেখি কী—ওমা এ তো বিরাট বড় কুকুর! ভয়ে আমার জান বেরিয়ে যায়। কিন্তু মশাই আমি হাল ছাড়িনি। পিছু পিছু চলতে থাকি। এবার দেখি কুকুর গায়েব! দেখি একটা চিত্রা খরগোশ আমার আগে আগে দৌড়ছে। এরপর পলকের মধ্যে তাও দুম করে উধাও। এরপর মনে হলো, কে যেন আমার পেছনে পেছনে আসছে। মনে মনে বললাম, উস্তাদ এইবার মরেছ। কিন্তু আগের মতোই হাঁটতে থাকলাম। ভাবলাম, যা হবার হবে, একবার তো দেখি আসলে পেছনে কে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখি কি, ওটাই পেছনে পেছনে আসছে!
কোনটা?
ছাগল।
ছাগল?
খোদার কসম, হুবহু সেই ডোরাকাটা ছাগল। আরে মিয়া, স্টপেজে গাড়িটা একটু থামাও না!

হর্ন বাজতেই বাস থামল। ময়লা আচকানপরা লোকটা লাফ মেরে নেমে গেল।

ভাই, সামনের স্টপেজেও থামতে হবে—গম্ভীর লোকটি বলল।
সবাই নেমে পড়বে। সে পুরো বাসটায় একবার চোখ ঘুরিয়ে নিল। শক্তপেশিবহুল লোক, গম্ভীর বৃদ্ধ, ঘুমানো ব্যক্তি, বাস তো সত্যি সত্যি খালি হয়ে গেছে। যারা সামান্য স্থানের জন্য পরস্পর ধাক্কাধাক্কি-লড়াই করছিল কী হলো সে সমস্ত মানুষগুলোর। আর সে ভারী ভারী নিতম্বের মেয়েটি? তার সিটটা শূন্য পড়ে আছে। পুরো বাসটাকে তখন তার বিরাণ ও পরিত্যক্ত মনে হলো। বাসযাত্রা কত সংক্ষিপ্ত হয়। তার হৃদয় চাইছে সব লোক আবার ফিরে আসুক। সেই একজন আরেকজনকে মারমুখো হয়ে ধাক্কা মারা লোক, তার ওই লোকটার বিষেভরা চোখ মনে পড়ে যাকে বাসে উঠেও নেমে পড়তে হয়েছিল। লোকটা এ মুহূর্তে কোথায় আছে? সে মানুষটি যে নেমে গেছে, সে ব্যক্তি যে বাসে উঠতেই পারেনি, অথবা যে উঠেও পা রাখার জায়গা না পেয়ে নেমে পড়েছিল—অসংখ্য মুখ তার সামনে ভাসতে থাকে। তার এই অদ্ভুত অবস্থা দেখে নিজেরই হাসি পায়, বাস ভরা থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে আবার খালি হলে ভয় ঘিরে ধরে। কিন্তু আমি এখন যাচ্ছি কোথায়?

এই যে ভাই, ফিরতি বাস পাওয়া যাবে?
পাওয়া গেলেই কী আর না গেলেই কী। সময় তো শেষ হয়ে গেছে।

সময় তাহলে শেষ হয়ে গেছে? সে হিম্মত হারাচ্ছে। আস্তে আস্তে একটা ভয় তাকে ঘিরে ধরছে। পরের স্টপেজে বাস থামলে সে মনে মনে দৃঢ় সঙ্কল্প হয়, গম্ভীর লোকটার পেছনে পেছনে সেও নেমে পড়বে। নেমে ফিরতি বাসের অপেক্ষা করবে। বাইরে ঘোর অন্ধকার। বিল্ডিংগুলো গাছের মতো নিশ্চুপ-নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে সে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়।

পরের স্টপেজে পেশিবহুল শক্তপোক্ত লোকটা নেমে যায়, তাকে অল্প দূর পর্যন্ত খুঁটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারপর অন্ধকার। পরের স্টপেজে দাঁড়িওয়ালা ভদ্রলোকও নেমে গেল এবং একইভাবে সামান্য দূর পর্যন্ত আলোতে দেখা যাবার পর আলো কমে আসে। সুনশান ফাঁকা স্টপেজে এক এক করে মুসাফির নেমে যায় আর তার মন পড়ে থাকে সে সমস্ত ফেলে আসা স্টপেজে যেখানে যাত্রীরা মুসাফির কাফেলার মতো দলবেঁধে নেমে মৌমাছির মতো ছড়িয়ে পড়ে।

এতক্ষণে বাস প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল। স্টপেজে যেখানে-সেখানে একলা মুসাফির নামছিল। অল্প দূর পর্যন্ত আলোয় দেখা যাওয়ার পর পথহারা ভেড়ার মতো অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল। স্টপেজ যখন শূন্য হয়ে পড়ে, মুসাফিরকে যখন একা নামতে হয় এবং তার ছেড়ে যাওয়া সিট কোনো নতুন মুসাফির এসে বুঝে নেয় না তখন বাসের যাত্রা শেষ হয়ে যায়। সে প্রথমে ফাঁকা বাসটাকে দেখে, তারপর আপন ক্লান্ত কাঁধের দিকে থাকায় যেখানে ঘুমানো মানুষটার মাথা ঠেকানো। লোকটার ব্যাপারে প্রথমে তার মনে কৌতুহলের সৃষ্টি হয়—এই মানুষটা যাচ্ছে কোথায়? তারপর সন্দেহ হয়, এ লোকটাও ভুল বাসে চড়ে বসেনি তো! এই ময়লা-ময়লা মাথাটাকে, ঘামে ভেজা ঘাড়টাকে সে আরেকবার দেখে এবং জানতে পারে, ঘুমন্ত ব্যক্তি তার ক্লান্ত কাঁধেরই অংশ। সে মনে মনে বলে, আমি বাসের শেষ গন্তব্য পর্যন্ত যাব।


ইনতেজার হুসেইন
কথাসাহিত্যিক ইনতেজার হুসেইনকে তুলনা করা হয় প্রখ্যাত উর্দু ছোটগল্পকার সাদত হাসান মান্টোর সঙ্গে। কেউ কেউ তাকে মান্টোর চেয়েও শক্তিশালী গল্পকার বলে দাবি করেন। মান্টোপরবর্তী উর্দু ছোটগল্পের সবচেয়ে শক্তিমান স্রষ্টা ইনতেজার হুসেইন প্রথম কোনো পাকিস্তানি লেখক হিসেবে ম্যানবুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। বিখ্যাত উপন্যাস ‘বাস্তি’-র জন্য ২০১৩ সালে ম্যানবুকার শর্টলিস্টের চতুর্থ নামটি ছিল তার। পৌরাণিক আখ্যান, এরাবিয়ান নাইটস্ ও কাফকাকে ছেনে সৃষ্টি করেছেন ছোটগল্পের নিজস্ব ভূবন। তার গল্পের প্লট, চরিত্র কিংবা ভাষা সবই প্রতীকী। এ ছাড়াও দেশভাগের সময় ভারত ছেড়ে আসা এই লেখকের লেখায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে নস্টালজিয়া।

ইনতেজার হুসেইন উর্দু ছাড়াও ইংরেজিতে লেখালেখি করেছেন। পেশাজীবনে পাকিস্তানের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ডন-এ কাজ করেছেন। অনুবাদ করেছেন চেখভসহ বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নানা লেখাজোখা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষের এই কথাসাহিত্যিক আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও লিখেছেন একাধিক অসাধারণ ছোটগল্প। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার বিখ্যাত দুটি ছোটগল্প হচ্ছে, ‘স্লিপ’ এবং ‘সিটি অব সরো’। এ ছাড়াও তার বিখ্যাত উপন্যাস বাস্তি-র একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে সাতচল্লিশ, উনসত্তর এবং একাত্তরের দিল্লি, ঢাকা এবং লাহোর। ২০১৬ সালের দুসরা ফেব্রুয়ারি উর্দু সাহিত্যের এই শক্তিমান লেখক মারা যান।

‘সহযাত্রী’ গল্পটি ইনতেজার হুসেইনের ‘হামসফর’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি সরাসরি উর্দু থেকে অনূদিত।


সালেহ ফুয়াদ
প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক সালেহ ফুয়াদের জন্ম সুনামগঞ্জে। বেড়ে উঠেছেন সিলেটে। তিনি আরবি, উর্দু ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে থাকেন। পদ্মভূষণপ্রাপ্ত বিখ্যাত ভারতীয় পণ্ডিত মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খানের ‘সালমান রুশদি ও মিছিলের রাজনীতি’ (চৈতন্য, বইমেলা-২০১৭) উর্দু থেকে অনূদিত তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ২০১৮ সালের একুশে বইমেলায় ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার অনূদিত দ্বিতীয়গ্রন্থ ‘ইনতেজার হুসেইনের শ্রেষ্ঠগল্প’। অনুবাদ করেছেন ইনতেজার হুসেইনের ম্যানবুকার শর্টলিস্টেড উপন্যাস ‘বাস্তি’ ও বিখ্যাত উর্দু ছোটগল্পকার সাদত হাসান মান্টোর ‘স্যাম চাচাকে লেখা মান্টোর চিঠি’।

আপনার মতামত লিখুন :