সে এক অচিন পাথর



রাহনুমা খান কোয়েল
গ্রাফিক্স: নাছরিন আক্তার উর্মি

গ্রাফিক্স: নাছরিন আক্তার উর্মি

  • Font increase
  • Font Decrease

কলিং বেজ বাজছে। এই অবেলায় কে আসতে পারে সেটা ভাবতে থাকে মধুরিমা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো সে। কলিং বেল বেজেই চলছে। দরজা খুলতেই বাসার গেটকিপার মিজান অস্থিরভাবে জানালো একটা পার্সেল আছে তার নামে। ডেলিভারি ম্যান নিয়ে এসেছে। কিন্তু মধুরিমা কোনকিছুর অর্ডার করেনি। তাহলে পার্সেল কিসের? মিজানের অতো কিছু বোঝার সময় নেই। সে পার্সেলটি মধুরিমার হাতে দিয়েই নীচে নেমে গেল। যাবার সময় শুধু জানিয়ে গেল পার্সেলের পেমেন্ট নাকি আগেই করা আছে।

কে পার্সেল পাঠালো? তাহলে কি আকাশ তাকে কোন সারপ্রাইজ দেবার জন্য কোন অর্ডার করেছে? কিন্তু আজ তো কোন বিশেষ দিনও না। আজ বিবাহ বার্ষিকী না, মধুরিমার জন্মদিন না, এমনকি তাদের প্রথম দেখার দিনও না। একটা পাগল ছেলে আকাশ। মাঝে মাঝেই সে এমন কাণ্ড করে। মধুরিমার জন্মদিনে অফিস থেকে ফুল পাঠিয়ে একবার অবাক করে দিয়েছিল আকাশ। এমনিতে গম্ভীর হয়ে থাকে, তবে মধুরিমার প্রতি তার অগাধ ভালবাসা। বছর তিনেক হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। প্রেমের বিয়ে। মান-অভিমানে ভরা ছোট্ট সুন্দর তাদের সংসার। আকাশের পাগলামির কথা ভাবতে ভাবতে পার্সেলটি খুলে ফেলল মধুরিমা। পার্সেলের ভেতর খুব সুন্দর র্যাপিং পেপারে মোড়ানো ছোট্ট একটা বাক্স। এ নিশ্চয় আকাশেরই কাজ। চমৎকার র্যাপিং পেপার আকাশের খুব পছন্দ। আস্তে আস্তে র্যাপিং পেপারটি খুলে ফেলল মধুরিমা। খুলতেই বাক্সের ভেতর থেকে বের হয়ে আসলো অদ্ভুত এক পাথর। খুবই হালকা অথচ মোহময় আলোর বিচ্ছুরণ হতে থাকলো পাথরটি থেকে।

পাথরটি হাতে নিয়েই কেমন যেন মায়া লাগলো মধুরিমার। ছোট্ট তুলতুলে শিশু দেখলে যেমন মায়া লাগে, ঠিক তেমন। পাথরটি থেকে নানা রং এর বিচ্ছুরণ হতে থাকলো। খুবই মোলায়েম আলোর বিচ্ছুরণ। তারপরও চারপাশ কেমন যেন সুন্দর হয়ে গেল। দিনভর পাথরটি নিয়েই ব্যস্ত থাকলো মধুরিমা। সন্ধ্যেবেলায় আকাশ অফিস থেকে ফিরলো ক্লান্ত হয়ে। দরজা খুলেই মধুরিমা মিটিমিটি হাসতে লাগলো। অফিসের পোশাক পাল্টে স্নান শেষে আকাশ বসার ঘরে আসলো। দু’কাপ চা নিয়ে মধুরিমা আকাশের পাশে বসলো। আকাশ মধুরিমার দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলো। মধুকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। অপরূপ স্নিগ্ধতায় ভরা। আকাশের মুগ্ধচোখের দিকে তাকিয়ে মধুরিমা জিজ্ঞেস করলো, ‘পাথরটি কোথায় পেয়েছ?’ মধুর প্রশ্ন শুনে আকাশ বেশ অবাক হয়েই পাল্টা প্রশ্ন করলো ‘পাথর? কিসের পাথর?’ তখন মধুরিমা ছদ্ম অভিমানের সুরে বললো, ‘থাক আর নাটক করতে হবেনা, পাথরটি যে তুমিই পার্সেল করেছ, সে কি আমি জানিনা?’ এইবার বেশ একটু বিরক্তির স্বরেই আকাশ জানতে চাইলো কি বিষয়, কিসের পাথর। মধুরিমা দুপুরে পার্সেলের ঘটনা খুলে বললো। কনফার্ম না হয়ে কেন পার্সেলটি গ্রহণ করলো সেই কারণে মধুকে হালকা একটু বকাও দিল সে। কোন বিপদও তো হতে পারতো, সেটা কেন মধুর মাথায় আসলো না। যাই হোক, কথা শেষে পাথরটি দেখতে চাইলো আকাশ। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো কোথাও কোন ভুল পার্সেল ডেলিভারি হয়ে গেল কিনা। মধুরিমা খুব উৎসাহ নিয়েই পাথরটি তার বেডরুম থেকে আনতে গেল।

পাথরটি দেখতে আসলেই খুবই অদ্ভুত সুন্দর। মোহময় তার আলো। হাতে করে মধু যখন নিয়ে আসছিল, তখন মধুর মুখেও সেই আলোর ছটা লেগেছিল। অপরূপ দেখাচ্ছিল মধুরিমা কে। নিজের প্রেমময় আর শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে আবারও কৃতজ্ঞতা জানালো। পাথরটি হাতে নিল আকাশ। হাতে নিতেই শিরদাঁড়ায় একটা অস্বস্তি অনুভব করলো। মনে হলো কেউ যেন বরফ-ঠান্ডা হাত দিয়ে স্পর্শ করলো। পাথরটির দিকে তাকাতেই আকাশের মুখ কালো হয়ে গেল। এক ঝটকায় পাথরটিকে দূরে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল আকাশ। খুবই ভীত সন্ত্রস্ত দেখালো তাকে। আকাশের এই আকস্মিক ব্যবহারে মধুরিমা ভীষণ অবাক হলো। কি এমন হলো যে আকাশের মুখ এমন কালো, এত ভয়ক্রান্ত হয়ে গেল। পাথরটিকেই কেন বা সে ওভাবে ছুঁড়ে মারলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশ রীতিমতো মধুকে তিরস্কার করতে শুরু করলো কেন এই পাথরটি সে নিলো তা নিয়ে। কে দিয়েছে, কেন দিয়েছে, কোন বাজে উদ্দেশ্য আছে কিনা এই নিয়ে রাগারাগি করা শুরু করলো। মধুরিমার খুবই অভিমান হলো তাতে। সামান্য এক পাথরই তো। ভুলও যদি হয়ে থাকে, তাহলেই বা কি এমন পাপ করে ফেলেছে সে। রাতে কিছুই খেল না আকাশ। কোন কথাও বললো না তেমন। সামান্য এক পাথরের জন্য এত অশান্তি ভাবতে ভাবতে মন খারাপ করে ঘুমাতে গেল মধুরিমা। সকালে উঠেই পাথরটি সে কোথাও ফেলে দিয়ে আসবে বলে মনস্থির করলো।

আকাশ প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। এত ভয় সে কোনদিনই পায়নি। কিন্তু পাথরটি হাতে নিয়েই ছয় বছর আগের এক স্মৃতি, এক পাপের কথা মনে হলো তার। হ্যাঁ পাপই। ভীষণ বড় পাপ। কারণ পাথরের ভিতরে সে স্পষ্ট এক কিশোরীর মুখ দেখতে পেয়েছে। হাসিখুশি মায়াময় এক কিশোরীর মুখ। মেয়েটির নাম অন্তরা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় হাত খরচের জন্য আকাশ কয়েকটি টিউশনি করতো। অন্তরা ছিল তার তেমনই এক ছাত্রী। খুবই চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। কথায় কথায় হেসে উঠতো। অনেক বকবক করতো অন্তরা। একদিন পড়ানোর সময় হঠাৎ করে আকাশ মেয়েটির বুকে হাত রাখে। অন্তরা একটু ঘাবড়ে যায়, শক্ত হয়ে যায়। মাথা নিচু করে থাকে। যাবার সময় আকাশ বার বার অন্তরা যেন কাউকে কিছু না বলে সেটা অনুরোধ করে। তারপর বেশ কয়েকদিন সে অন্তরাকে পড়াতে যায়নি। একদিন অন্তরার মায়ের ফোন পেয়ে সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়। বুঝতে পারে, অন্তরা কাউকে কিছু বলেনি। সে আবার অন্তরাকে পড়ানো শুরু করে। কিন্তু অন্তরা ঠিক আগের মতো নেই। তার চেহারায় একটা ভয় দেখতে পায় আকাশ। এই ভয়টাকে সে বেশ এনজয় করা শুরু করে। মাঝে মাঝেই সে অন্তরার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করতে থাকে। এমনকি একদিন বাসা খালি পেয়ে সে অন্তরাকে ......... নাহ আর কিছু মনে করতে চায়না আকাশ। অন্তরা একটু বেশিই ভীতু ছিল, তা না হলে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসার ছাদ থেকে লাফ দেয়। বোকা মেয়ে একটা। কেন যে এসব আবার মনে পড়লো আকাশের। এই পাথরটাই সকল নষ্টের মূল। কোথা থেকে এই পাথর নিয়ে আসলো মধুরিমা কে জানে। এখন মধুর ওপরও রাগ হচ্ছে। পাথরটার দিকে তাকাতেই বা কেন তার ছয় বছর আগের কথা মনে পরে গেল। এক্ষুণি পাথরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই তবে আকাশের শান্তি। যেই ভাবা সেই কাজ। মধুরিমা সকাল সকাল ঘুমিয়ে গেছে দেখে পাথরটি হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে আকাশ ছাদে গেল। সকালে উঠে মধু পাথরটি খুঁজলে সেও মধুর সাথে পাথরটি খোঁজার ভান করলেই হবে। এখন আপদ বিদায় হোক আগে। ছাদে উঠেই আকাশ রেলিং এর ধারে দাঁড়িয়ে পাথরটির দিকে শেষবারের মতো তাকালো।

আবারও সেই মুখ। আবারও সেই হাসি। হাসি মিলিয়ে এখন আবার ভয়ার্ত চেহারা। তীব্র ভয়ে আকাশ পাথরটি ছুঁড়ে দিতে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে পাথরটি থেকে একটি নরম কোমল হাত বের হয়ে এলো। সেই হাতটি শক্ত করে ধরে থাকলো আকাশের হাত। তীব্র প্রচেষ্টা স্বত্ত্বে আকাশের সেই হাতের ডাক উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ভোরবেলা রাস্তায় হাঁটতে বের হওয়া মানুষজন আকাশের মৃতদেহ পরে থাকতে দেখে বাসার দেয়ালের পাশে। কিন্তু পাথরটিকে কোথাও দেখা গেলনা। যাবেই বা কি করে। ভোরবেলা রিকশা নিয়ে বের হওয়া আমির আলী গলির মোড়ে একটা সুন্দর পাথর দেখে সেটা মুছে নিয়ে সে তার লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজে রাখে। বাসায় গিয়ে ময়নার মাকে উপহার হিসেবে দিবে। কয়দিন ধরেই ময়নার মা’কে সে বেশ চিন্তিত দেখছে। পাথরটা পেলে হয়তো তার মন ভালো হবে।

 

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;