দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

লোকটাকে সবাই ঘিরে ধরেছিল আর কেউ-কেউ বলছিল, বিদেশি-বিদেশি! কিন্তু কোন বিদেশের সেটা তার চেহারা দেখে আঁচ করা মুশকিল। হতে পারে ইউরোপীয় কিংবা মার্কিন, এমনকি ইরানি বা কাশ্মিরি ব্রাক্ষণও হওয়া সম্ভব। তখন কিছুকাল আগেকার কথা সুবর্ণদ্বীপের লোকেদের মনে পড়ে। দূর থেকে একটা লোককে দেখে তারা চিৎকার করেছিল বিদেশি-বিদেশি বলে। আবার অনেকেই চেঁচাতে থাকে ‘খিরিস্টান খিরিস্টান’ বলে। তারপর যখন দুপুর সকলের মাথার ওপরে হেলে পড়তে থাকে, লোকটা পকেট থেকে একটা গোলাকার টুপি বের করে মাথায় লাগিয়ে পশ্চিমমুখী নামাজ পড়তে শুরু করলে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। শেষে জানা গেল লোকটা এসেছিল চেচনিয়া নামের একটা দেশ থেকে। চেচনিয়া বললেই আগে লোকে চিনতো না। কিন্তু দ্বীপের অনেকেই শিক্ষিত আর বিশ্ব এখন যখন সকলের হাতের মুঠোয় তারা জানে চেচনিয় নামের লোকেরা এককালের বিশাল এক সাম্রজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ভয়ংকরভাবে। তাই তারা অপেক্ষা করে। তবে এই লোকটা ঠিক চেচনিয়টার মত নয়। সে বাংলা ভাষা জানে। অন্তত কাজ চালাবার মত কিছু শব্দ ও বাক্য তার জানা থাকায় সে তাকে ঘিরে ধরা লোকেদের স্মিত বলে, স্লামালেকুম, আপনাদের সকলের ওপর শান্তি বরষিত হউক। শ্মশ্রুমণ্ডিত মাঝবয়েসি বিদেশি লোকের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে সুবর্ণদ্বীপের লোকেদের মনে হতে থাকে, লোকটা তাদের আত্মীয় না হলেও নিকটজন। যদি তা না-ই হবে সে দূরত্বকে ভাষা দিয়ে এতটা নিকটে আসবার কষ্টটুকু স্বীকার করতো না।

সুবর্ণদ্বীপে নদী বলতে ঐ একটাই কিন্তু তার নামোল্লেখ করা সহজ নয়। নদীর নাম বলাই যায়। ধরা যাক ধলেশ্বরী, ডাকাতিয়া, মেঘনা, পদ্মা, কর্ণফুলি, সোমেশ্বরী, কুশিয়ারা, গোমতী, গড়াই, খোয়াই, মুহুরি এরকম নদীর নাম। সেক্ষেত্রে নামোল্লেখের সঙ্গে-সঙ্গেই একটা জায়গা ভেসে উঠবে- একটা আয়তন তার মধ্যকার লোকজন তার প্রাচীন ও বর্তমান এইসব সঙ্গ-অনুষঙ্গ। ফলে, আমরা যে-শুরু করতে চাই সেই শুরুটা আর নিরেট শুরুতে স্থিত থাকবে না। নদী তো নদীই, চলমান। তা-ও সেই চলতে থাকা প্রবাহ তার দুই তীরে ভাঙনের ইতিহাস সত্ত্বেও পলি বা মাটির মত স্তূপ করে রেখে যায় কথা যে-কথা আবার হয়ে যায় কাহিনি। তাই নদীর নাম হোক রেণুকা। হ্যাঁ, এই নামের আড়ালে হয়তো পরিচিত নদীকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। হয়তো বাস্তবে তা-ই ঘটে। কিন্তু তাতে করে এটা অন্তত নিশ্চিত হওয়া গেল যে এই নদীর সূত্রে কোন বিশেষ অঞ্চল বা জায়গা ও তার মধ্যে নিহিত মানুষজন সম্পর্কে কারও পক্ষে কোন পূর্বধারণার আঁচ সম্ভব নয়। কিন্তু আড়াল কী আসলে করা যায়। হয়তো সংকীর্ণতাকেই আড়াল করা গেল নদীর নাম পাল্টে দিয়ে। এরই ফলে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতটাই বরং প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কেননা, দ্বীপ এবং নদী বলতেই অরণ্য ও পাহাড় পটভূমি থেকে দূরে সরে গেল। লোকেরা ঠিকই দ্বীপ শব্দটিকে ধরে-ধরে একসময় বলবে, আপনি নদীর নাম বানিয়ে দিলেই কী আমাদের চোখে ধূলো দিতে পারেন, রেণুকা নদীর প্রকৃত নাম হলো এই!

এক অর্থে সব নদীর নামই তো দেওয়া নাম। নদী যদি তার নিজের নামকরণ নিজে করতে পারতো তবে কর্ণফুলি হয়তো কর্ণফুলি না হয়ে হতো নটরাজ কিংবা বুড়িগঙ্গা হতো রূপগঙ্গা। যে-নদীর নাম আমরা রেণুকা দিয়েছি, হতে পারে তার তীরের দীর্ঘ রেখাপথ ধরে গাছে-গাছে ফুটে থাকা ফুলের রেণু উড়তে থাকা হাওয়ায় ভাসমান সুবাস আর এই নদীর জলীয় গন্ধ মিলেমিশে এক আশ্চর্য উদ্ভাসন ঘটায়। সুবর্ণদ্বীপের লোকেরা যখন লোকটাকে ঘিরে ধরে তখন তার চেহারার ফর্সা রংটা কেমন পোড়া-পোড়া আর লালচে দেখায়। সেই লাল ঠিক সুস্থ লাল নয়, মনে হয় যেন অনির্ধারিত রক্ত এসে লোকটাকে লাল করে দিযেছে। অনবরত হাঁচি আর কাশি দিতে-দিতে লোকটার প্রাণান্তকর অবস্থা। দেখে অনেকেই ভয় পেয়ে যায়। মানুষ হাঁচি দেয়, কাশি দেয়, সুবর্ণদ্বীপের লোকেরাও দেয় হাঁচি-কাশি। কিন্তু এমন অনিঃশেষ হাঁচি-কাশির দৃশ্যের সঙ্গে তারা পরিচিত নয়। বিদেশি লোকটা তখন তার লালচে চেহারার লালচে চোখে নিকটের নদীর দিকে তাকায়। নদীর তীর ধরে একটানা গাছগুলিতে ফুটে রয়েছে ফুল। সেই ফুলেরাই আসলে তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে সে আরও অসহায় বোধ করতে থাকে। এত-এত ফুল গাছেদের হত্যা করা মানে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। দেরিতে বুঝলেও হে-ফিভারের কবলে পড়া লোকটা তার সঙ্গে থাকা চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকের বাক্সে রাখা ট্যাবলেট গিলে খেয়ে নেয় ফ্লাক্স থেকে পানি ঢেলে নিয়ে। অল্পক্ষণের মধ্যে তার চেহারার অতিরিক্ত রক্তাক্ত ভাবটা কেটে গিয়ে মূল শ্বেত বর্ণ প্রকাশ্যে ফিরে এলে তাকে ঘিরে থাকা লোকেদের মধ্যেও একটা স্বস্তির ভাব ফিরে আসে। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা লোকের আকস্মিক হাঁচি-কাশি তাদেরকে লোকটার প্রতি কেন সহানুভূতিশীল করে তোলে সে-প্রশ্ন করে না কেউ। এদেরই কেউ হয়তো একটু আগে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করতে-করতে মেয়েমানুষটির মৃত্যু কামনা করে এসেছে। কিন্তু এখন তার মনে কত সহজেই জেগে উঠেছে সহমর্মিতার বোধ।

লোকটা বলে, তার নাম লুইগি, লুইগি পালোমার। যারা নামের চরিত্র সম্পর্কে খানিকটা ওয়াকিবহাল তারা হয়তো বলতো, লোকটা ইতালিয়, কিন্তু সে এসেছে মার্কিন দেশ থেকে যদিও ফ্রান্সের একটি ঔষধ কোম্পানিতে সে কাটিয়েছিল প্রায় এক দশককাল। সে যে ঠিক কোন্ দেশের নাগরিক সেটা তার পাসপোর্ট না দেখলে বা সে নিজে থেকে না বললে বোঝা দুরূহ। সেটা দেখেছে দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার। সে এবং তাদের কেউ-কেউ জানে, লুইগি পালোমার আসলে কোন্ দেশের নাগরিক। লোকেরা তাকে ঘিরে ধরলেও তার গন্তব্য সম্পর্কে তারা সকলেই মোটামুটি নিশ্চিত হওয়াতে তাদের উৎসাহ-ঔৎসুক্য সীমা ছাড়িয়ে যায় না। সবাই লুইগিকে সাদরে প্রহণ করে। প্রথম দিকে যখন এরকম বিদেশিরা আসতো তখন তাদের ঘিরে-ধরা লোকেরা আচমকা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতো, এট্টা ডলার দ্যান্ না বাবা! আগতর পকেটে আসলেই ডলার আছে কিনা, নাকি সব ডলারকে সে টাকায় পরিণত করে ফেলেছে সে-বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই তারা হামলে পড়ে ডলার কামনা করতো। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। আগে ওদের একটুখানি স্থিত হতে দাও। আসুক ওরা, এসে ধাতস্থ হয়ে বসুক। থাকবার জন্যেই ওদের আসা। থাকলে তখন বলা যাবে, টাকা দাও কি ডলার দাও বা এটা দাও ওটা দাও। লুইগি আসলে একা আসে না। তার সঙ্গে থাকে সুবর্ণদ্বীপেরই এক লোক। লুইগি যখন চমৎকার নদীর তীরটা দেখবার জন্যে আগ বাড়ায় ততক্ষণে গোলাম কবির নামের সেই লোক বিস্কিট মুড়ি চানাচুর এরকম বেশকিছু শুকনো খাবার কিনে এনেছে প্যাকেটে ঝুলিয়ে। ততক্ষণে লুইগির হাঁচি-কাশির ভাবটাও আর নেই। দৌড়ে আসতে আসতে কবির বলে, কোন সমস্যা? সে তা বলে লুইগিকে কিন্তু বলবার সময় তাকায় লোকেদের দিকে। ফলে, লুইগি পালোমার এবং আগুয়ান লোকেরা প্রায় সমস্বরে উত্তর দেয়, না, না, কোন সমস্যা নাই।

যে-সুবর্ণদ্বীপে এত লোক এমনকি বিদেশিরও আনাগোনা সেটা কিছুকাল আগেও ছিল জনশূন্য। এর সব জমিই ছিল আবাদী এবং অনাবাদীও। আবাদ করবার মত লোকই তখন ছিল না কোথাও। সাগরের বুক থেকে একটু-একটু করে মুখ তুলে প্রথমটায় সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখলো অনেক দিন। আইসবার্গের ইশারার মত দেখতে অংশটুকু কালক্রমে পরিষ্কার মাটির রূপ নিতে থাকলে তার কর্দমাক্ত অবয়ব রোদে পুড়ে মোটামুটি শক্তসমর্থ অবস্থানে এলে লোকেরা অধৈর্য্য হয়ে পড়ে। আশেপাশের গ্রাম আর জেলাগুলি থেকে একা বা দলবেঁধে স্বয়ং বা সপরিবারে লোকেরা এসে ডেরা বাঁধলো এবং তাদের যৌথ তৎপরতায় ছেটানো ধান এমন সোনার রূপ নিলো যে দ্বীপটির জন্যে সুবর্ণ বিশেষণটাই হয়ে পড়লো অনিবার্যভাবে আবশ্যিক। তবে লোকেরা যে খুব নিশ্চিতভাবে বা আস্থাসহকারে কাল কাটাতো তা নয়। রোজ তারা ঘূমাতে যেতো একটা আশঙ্কা আর ক্ষেত্রবিশেষে আতঙ্কের ভাব মাথায় নিয়ে। দ্বীপটি যেমন করে জেগে উঠেছিল ঠিক তেমন করে যদি আচমকা ডুবে যায়! ভয়ে অনেকেরই ঘুম হয় না। আবার অনেকেই কাগজে ধর্মীয় মন্ত্র লিখে সেটা মাদুলিতে ভরে তাদের ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে দিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমায়।

চলবে...

২য় পূর্ব পড়ুন আগামী শুক্রবার

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;