দারাশিকোহ: যিনি হতে পারতেন মুঘল সম্রাট



ড. মাহফুজ পারভেজ,অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ইতিহাস নিয়ে গভীর অধ্যয়ন ও ব্যাপক চর্চার ইচ্ছা ও আগ্রহ সকলের হবে, এমন আশা করা যায় না। মোটা মোটা বই, সন, তারিখ, কালপঞ্জি ধরে ধরে ইতিহাসের অলিন্দে প্রবেশ করার সুযোগ ও সময় সবার না হওয়ারই কথা। কিন্তু ইতিহাসের মূল-কাহিনীটির প্রতি প্রায়-সকল মানুষের আকর্ষণই দুর্নিবার। যে কারণে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র, উপাখ্যান, গল্প, নাটক মানুষকে চুম্বকের মতো টানে এবং এর আবেদন শেষ হয় না।

একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো ভারতবর্ষে কয়েক শত বছর শাসনকারী মুঘল সাম্রাজ্য। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বহু-বিচিত্র কাহিনী। ১৯৬০ সালে নির্মিত স্মরণকালে সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’ থেকে অতি-সম্প্রতি ‘যোধা-আকবর’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে মুঘলদের নিয়ে ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মুঘলদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবনের সমান্তরালে প্রেম, প্রণয়, হিংসা, হত্যাকা-, শিল্প, সাহিত্য, কবিতা, স্থাপত্য, রন্ধনকলা, উদ্যানচর্চার অসংখ্য কাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক মুঘল সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, যুবরাজ ও যুবরাজ্ঞীকে নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য ও গল্পের শেষ নেই।

দারাশিকোহ তেমনই এক উল্লেখযোগ্য মুঘল, যার সম্রাট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি তা হতে পারেন নি। বরং তিনি হয়েছেন মুঘল ইতিহাসে একজন ট্র্যাজিক হিরো। আবার রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েও তিনিই দর্শনচর্চা ও মননশীলতায় বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন ইতিহাসর পাতায়। ভাগ্য ও রাজনীতির রণাঙ্গনে বিপর্যস্ত জীবনপ্রবাহের নিরিখে দারাশিকোহর উত্থান ও পতনের  সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরাই এ রচনার উদ্দেশ্য। মূল কাহিনী ও ঘটনাক্রমের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাসের জটিল ও বিক্ষুব্ধ অধ্যায়কে তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যসূত্র ও অন্যান্য রেফারেন্সের যান্ত্রিক উল্লেখের মাধ্যমে রচনাকে রাশভারি করা হয় নি। তবে শেষে সহায়ক গ্রন্থগুলোর তালিকা দেওয়া আছে।         

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত তিন শতাব্দীরও অধিককাল ভারতবর্ষে শাসনকারী মুঘল সাম্রারাজ্যের ইতিহাসে মুহাম্মদ দারাশিকোহ (২০ মার্চ ১৬১৫-৩০ আগস্ট ১৬৫৯) এমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি হতে পারতেন দিল্লির সম্রাট। কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও সামরিক পরাজয় তাকে বিয়োগান্ত পরিণতিতে ঠেলে দেয়। তথাপি সম্রাট না হয়েও তিনি অন্যান্য সম্রাটদের মতোই আলোচিত। পঞ্চম মুঘল সম্রাট নাসিরউদ্দিন শাহজাহানের (৫ জানুয়ারি ১৫৯২-২২ জানুয়ারি ১৬৬৬) জ্যেষ্ঠপুত্র, চার পুত্রের মধ্যে নয়নে মণি এবং সিংহাসনের ঘোষিত সম্ভাব্য উত্তারাধিকারী ছিলেন তিনি। সম্রাট পিতা প্রিয় পুত্রকে রাজদরবারে পাশে পাশে রাখতেন সব সময়। অন্য পুত্রদের বিভিন্ন প্রদেশে ও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেও দারা ছিলেন রাজধানীতে পিতার নিত্যসঙ্গী। শিক্ষা-দীক্ষা, রুচি ও সংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বলতম। সব কিছু অনুকূলে থাকার পরেও দারা মুঘল সিংহাসনে বসতে পারেন নি। ক্ষমতার জন্য প্রচ- ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে প্রাণ হারান তিনি। এবং পরিশেষে চিত্রিত হন মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো রূপে।

মুঘল রাজধানীতে বসবাসকারী দারাশিকোহ সাধারণত রাজদরবারেই সময় কাটান বেশি। তিনি কবি, দার্শনিক ও ধর্মবেত্তাদের অধিক ঘনিষ্ট ছিলেন। দারাশিকোহ যখন কলম ও অধ্যয়নে ব্যস্ত, অন্য ভাইরা তখন সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে তরবারি চালনায় নিজেদের সুদক্ষ করছেন। অথচ দারাই ছিলেন সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্ধারিত মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তার উপাধিযুক্ত নাম ছিল পাদশাজাদা বুজুর্গ মারতাবা, জালাল উল কবির, সুলতান মুহাম্মদ দারাশিকোহ, শাহ-ই-বুলন্দ ইকবাল। এতো পদ-পদবির পরেও কিন্তু সিংহাসন নয়, ফেরারি জীবন কাটে তার পালিয়ে পালিয়ে। মৃত্যুর পর তার মন্তক ব্যাতিত দেহ সমাহিত হয় দিল্লিতে দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কবরগাহে আর মু-ু সমাহিত হয় আগ্রায় তাজমহল প্রাঙ্গণে, মাতা মমতাজ মহলের কবরের সন্নিকটে। সম্রাট শাহজাহান যে প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতিতে বিশ্বের বিস্ময় ও ভালোবাসার প্রতীক তাজমহল নির্মাণ করেন, সেখানেই বেদনার চিহ্ন হয়ে তার প্রিয়তম জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহজাদা দারাশিকোহর দেহহীন মস্তকও সমাহিত। শেষ বয়সে অপর পুত্র ও পরবর্তী সম্রাট আওরঙ্গজেব (৩ নভেম্বর ১৬১৮-৩ মার্চ ১৭০৭) কর্তৃক বন্দি সম্রাট শাহজাহান অশ্রুসজল চোখে তাজের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন পুত্র দারার নির্মম পরিণতি।  

সম্রাট না হওয়া সত্ত্বেও দারা দর্শনচর্চা, শিল্পপ্রেম ও নানামুখী নান্দনিক গুণের জন্য সমাদৃত। মুঘল সম্রাটদের তালিকায় তিনিই একমাত্র যুবরাজ, যাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে সর্বাধিক। সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দুর্বলতার কারণে ক্ষমতা হারানোর জন্য যেমন তিনি সমালোচিত, তেমনি শিল্প-সংস্কৃতি-দর্শন-চিত্রকলার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য স্বীকৃত। ঐতিহাসিকদের অনেকে দারার মৃত্যুর সাড়ে তিনশ বছর পরেও মনে করেন, তিনি মহামতি মুঘল সম্রাট আকবরের পর ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের প্রতীক। যদিও আকবর রাজনৈতিকভাবে সফল আর দারা ব্যর্থ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতি বছরই দারার জীবন ও কর্ম নিয়ে নতুন নতুন গবেষণায় উন্মোচিত হচ্ছে অনেক অজানা তথ্য, যার অধিকাংশই বাংলা ভাষায় অনুল্লেখিত। সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দারার একটি সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক জীবনেতিহাসের প্রচেষ্টা এই রচনা। যারা এ বিষয়ে অধিকতর গবেষণা করতে আগ্রহী, তারা রচনার শেষে সংযুক্ত সহাযক গ্রন্থ তালিকা থেকে সাহায্য পেতে পারেন।

শুষ্ক ও যান্ত্রিক ঐতিহাসিক বর্ণনার বদলে সরল উপস্থাপনায় মুঘল ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য চরিত্রের নানা দিক উপস্থাপনের সময় প্রাসঙ্গিত ভাবে এসেছে তৎকালের অপরাপর চরিত্রের কথাও। যার মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং সম্রাট শাহজাহান, আওরঙ্গজেব এবং দারার অন্যান্য ভ্রাতৃ ও ভগ্নিগণ। আলোচিত হয়েছে সে আমলের আর্থ-সামজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও।

‘যিনি হতে পারতেন সম্রাট কিন্তু হতে পারেন নি’, এমন একটি চরিত্রকে দোষে-গুণে দেখার সময় প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বহু প্রাসঙ্গিক বিষয়কেও পর্যালোচনা করতে হয়েছে। কেন তিনি সম্রাট হওয়ার সকল সম্ভাবনা ও সুযোগ পেয়েও সিংহাসনে বসতে পারেন নি এবং ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হয়ে করুণ মৃত্যুর মাধ্যমে বিয়োগান্ত পরিণতির সম্মুখীন হন, তা অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা। তদুপরি, সিংহাসনে না বসেও কেন তিনি আজ পর্যন্ত আলোচিত হচ্ছেন, এটিও বেশ চিত্তাকর্ষক একটি প্রশ্ন। ইতিহাস তাকে নানা ভাবে মূল্যায়ন করেছে। তার জীবন ও কর্মের বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও করা হয়েছে।

সব কিছু মিলিয়েই এক মুঘল ট্র্যাজিক হিরো তিান। শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ যেমন ‘প্রিন্স অব ডেনমার্ক’-এর ট্র্যাজেডি, তেমনি দারাশিকোহও মুঘল সাম্রাজ্যের একজন বিয়োগান্ত চরিত্র, যাকে বাদ দিয়ে তৎকালীন ইতিহাসের অনেকটুকু অংশ আলোচনা করাই অসম্ভব। ‘প্রিন্স অব ডেনমার্ক’ ছাড়া যেমন ‘হ্যামলেট’ হয় না, তেমনি দারা ছাড়া মুঘল ইতিহাস রচনা করাও সম্ভবপর হয় না। আবার দারার আলোচনা আওরঙ্গজেবের আলোচনা ছাড়া অসম্ভব এবং আওরঙ্গজেবের আলোচনাও দারাকে ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। দারাশিকোহ এমনই এক ট্র্যাজিক হিরো হলেও ভারতবর্ষের ঐশ্বর্যশালী মুঘল ইতিহাসের তেমনই এক অপরিহার্য ও বর্ণময় চরিত্র।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;