ভাসা ভাষা



আফরিনা ওয়াশিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

উপমহাদেশের বিখ্যাত পণ্ডিত কালিদাসের অনিচ্ছা শর্তেও কিছু পণ্ডিত প্রায় জোরপূর্বক আতিথেয়তা গ্রহণ করলেন। অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হল, কালিদাস কখনও কাওকে তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন করেন না। আদোতে কালিদাস কিপ্টে নন। তিনি তার পরিবারের অজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে চিন্তিত, কিভাবে করবে তারা বিজ্ঞ অতিথিদের আপ্যায়ন? তাই তিনি তার বাবার সামনে পুঁথি ধরিয়ে দিয়ে তা পাঠ করতে বসালেন। যেহেতু বাবা এই বিষয়ে অজ্ঞ, কালিদাস তাঁকে অনুরোধ করলেন ভগবান, কৃষ্ণ এবং রাম নাম জপতে। পুত্রের কথা মতো বাবা এক নাগাড়ে নাম জপতে আরম্ভ করলেন, “ভগবানকৃষ্ণরাম…… ভগবানকৃষ্ণরাম…।“ একপর্যায়ে সব গুলিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো , “ভকর…ভকর…ভকর…ভকর…”। বিজ্ঞ অতিথিগণ জপের আদ্যপান্ত কিছু না বুঝে কালিদাসকে প্রশ্ন করলেন । উত্তরে কালিদাস জানালেন, এটি ভগবান, কৃষ্ণ ও রাম এঁর সংক্ষিপ্ত রূপ। উপস্থিত বিজ্ঞজন স্বভাবতই ধারণা করে নিলেন কালিদাস বংশগতই জ্ঞানী বটে।

গল্পটি কোথায় শুনেছিলাম মনে নেই। রেফারেন্স দেয়ার ভয়েই হয়তো স্বীকার করে নিলাম। তবে গল্পটি একারণেই বললাম, শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের দৌড়ও ভকর…ভকর… জ্ঞানের মতোই। তা সে পাঠ্য বই হোক কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থ। ভাষাই বুঝি না আর বই পড়ে বুঝবো কি? তাই বলে আমি আমাদের সব শিক্ষককে কালিদাসের বাবার ভূমিকায় দাঁড় করাচ্ছি এমনটিও নয়। কিন্তু ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষক যখন বলেন, “ইংরেজি বলতে হলে, ইংরেজিতেই চিন্তা করতে হবে”। তখন আমার মতো অনেকেরই হয়তো না ঘারকা, না ঘাটকা অবস্থায় পড়তে হয়।

ভার্সিটিতে কোন এক ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় আমি বাংলা বিষয়ে ফেল করেছিলাম। সবাই ভীষণ হেসেছিল। আমি নিজেও যে দাঁতে বাতাস লাগাইনি তা নয়। কারণ ইংরেজিতে যথেষ্ট ভাল নম্বর পেয়ে পাস করেছি। আমার এই লজ্জাহীনতার পেছনেরও একটা ঘটনা আছে। আমার স্বর্গীয় মাতামহ একবার আমেরিকা ঘুরে এসে জানালেন, সেখানে ছোট ছোট বাচ্চারাও ইংরেজি বলতে পারে। বিষয়টি ছোট বয়সেই আমাকে খুব মর্মাহত করেছিল। এরপর থেকে আদা জল খেয়ে ইংরেজির পেছনে লেগে পড়লাম। ইংরেজির পেছনে লেগে না আমি তার আগে যেতে পেরেছি, না মাঝে। ঠিক পেছনেই আছি। ততদিনে আমার বাংলা ব্যাকরণ বই উইপোকাতে খেয়ে নিয়েছে। বাংলা না বুঝেই ইংরেজি শিখবো কি করে? কবির ভাষায় আমার এই অভাগা দশা ঠিক এমন-

“ওরে বাছা মাতৃ কোষে রতনের রাজি,

এ ভিখারী দশা কেন তোর আজি?”

শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল মানুষের পূর্ণ বিকাশ ঘটানো। যা পড়ছি তা যদি আর আচার আচরণ বা অভ্যাসেই না আসে তাহলে সমাজ বিবর্তনের কথা বলেই বা কি লাভ। শিক্ষার ভাষা সহজতর হলে তবেই না তা অভ্যাসে রূপ নিবে। মানুষ তার অভ্যাসের সাথে যতটা নিরাপদ, চাপিয়ে দেয়া বিষয়ে ঠিক ততোটাই আনাড়ি এবং ভীতু।

একথা স্বীকার করতে সংকোচ নেই ভারতবর্ষে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজির হাত ধরেই এসেছিল। কিন্তু ভারতীয় স্থানীয় বিজ্ঞ সমাজ প্রথমেই বুঝেছিলেন ইংরেজি শিক্ষা তৎকালীন ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থাকে নিজের গতি থেকে আলাদা করতে চাইছে। তাই তারা নিজের ভাষা ও শিল্প সংস্কৃতিকে বাঁচাতেই সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে তাদের হয়ে তাদের ভাষায় বই লেখা শুরু করলেন। অথচ শখানেক বছর পরে এসেও বাংলা ভাষাভাষি লেখক-পাঠক সম্পর্ক ঠিক তেমন সহজ নেই। লেখকের অবস্থাও আমার মতো আনাড়ি ছাত্রের মতো। না সে বাংলা সাহিত্যানুরাগী না অন্যকোন সাহিত্যে যথেষ্ট পারদর্শী। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধর্মশালার নামে মুষ্টি চাল আদায়ের মতো সব সাহিত্য ঘেটে যতটা কঠিন লিখছেন, ততোটাই যেনো পাণ্ডিত্য জাহির হয়। লেখক পাঠকের বিনিসুতার বাঁধনের কষাঘাতে ভাষা হল বলির পাঠা। ভাল বাংলা বই পড়ছি না, ভাল বাংলা জানছি না। তবে খারাপ বাংলা কি তাতেও আমাদের পরিপক্ক দক্ষতা আছে কিনা প্রশ্নের বিষয়। জুবার্টের ভাষায় বলতে হয়, “এককালে পৃথিবী বইয়ের উপর কাজ করতো, এখন বই পৃথিবীর উপর কাজ করে. ‘’ সাথেসাথে পাঠকের কান চিলে নিয়ে যায় ক,দিনের জন্য। এরপর যখন কান ফেরত আসে, তখন তা আর কান থাকে না। রীতিমত ইংরেজি শব্দ “ফান” হয়ে যায়। সুতরাং লেখক যে শুধু পাঠককে বোকা বানাচ্ছেন তা-ই নয়, বোকা বনে যায় সমগ্র বাংলা ভাষাভাষি পাঠক সমাজ।

এতোসব দুর্গতির দায় কেবল লেখক একা নিতে বাধ্য নন। কারণ বুদ্ধিজীবী মহল তার আগেই সুবিধা জনক অবস্থায় শেয়ালের মতো গর্তে লেজ ঢুকিয়ে বসে আছেন। কাঁকড়ার টান লাগলেই গর্ত থেকে লেজ আপনা আপনিই বেরিয়ে আসবে। কাঁকড়াটিকে করমর করে চিবিয়ে খাবেন। কিন্তু পাশে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জানান দেবেন না, “যতোটা টাকা ফেলবেন, ততোটাই বলে দেবো আপনার হয়ে।‘’ হর্তাকর্তাদের টেবিলে নোট পড়লে আপনিই হয়ে উঠতে পারেন লেখক, গায়ক বা শিল্পী হিসেবে লেটেস্ট কিংবা ফিটেস্ট।

ধর্ম গ্রন্থের জন্য তো সমাজ বদল বা শিক্ষার অভ্যাস কোনদিনই বদলায় না । কুরআনে বর্ণিত আছে, “ ধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরিত পুরুষ কেবল নিজ গোত্রের মানুষদের ভাষায় কথা বলেন, যাতে করে তিনি সহজ এবং স্পষ্ট ভাবে ধর্মের বাণী প্রচার করতে পারেন।”( ১৪ আব্রাহাম, ৪)। আমাদের কতজন ধর্মীয় প্রতিনিধি এই বিষয়টিকে আমলে নিয়ে সামনে এনেছেন। কতজন ধর্মবিদ ওয়াজ মাহফিলে বলেছেন মাতৃভাষায় কুরআন পাঠে করলেও পুণ্য আসে। পুণ্যের ঘর শূন্য রেখেই নিজের শেখা আরবিকে আরও কতোটা দূর্বোধ্য ভাবে প্রদর্শন করে মাদ্রাসা বোর্ডকে মহান ঘোষণা করা যায় সেই তালেই থাকেন।

তালে তাল মিলিয়েছেন পন্ডিত মশাইও। বৈদিক ছন্দোমঞ্জরীতে বর্ণিত আছে, "মননাৎ ত্রায়তে যস্মাৎ তস্মাৎ মন্ত্র উদাহৃতঃ।" অর্থাৎ যা মন,চিন্তা ও ধ্যানের দ্বারা সংসারের সকল দুঃখ-কষ্টের হাত থেকে পরিত্রাণ দেয় তাই মন্ত্র। প্রায় একই কথাকে পরিশ্রমের সাথে যুক্ত করে মধযযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বলছেন- “মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন ।” মন্ত্র বিষয়টাই এমন বার বার পাঠ করার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ কষ্ট করলে কেষ্ট মিলবে। বুঝলাম, আপনাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা আমাদের বাংলা ভাষারই পূর্ব রূপ। তাই বলে তা সহজ বাংলায় অনুবাদ করলে অন্যরা পড়লে আপনার জাতটা চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে কি? ধর্ম আর রাজনীতির প্রধান অস্ত্র যদি হয়ে থাকে ভাষা তাহলে আর আমরা আলাদা হলাম কি করে। সেই তো ইংরেজদের মতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট রেফারির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছের মায়ের পুত্র শোক করছি।

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ডগুলো ভাষার স্বতন্ত্রতাকে কোন পর্যায়েই নিরপেক্ষ থাকতে দিতে চাইছে না। বৈদিক সমাজের শ্রেণিভেদের মতোই ভাষার জাত নির্ধারণ হচ্ছে। যা সাজালে এমন দাঁড়ায়- ইংরেজি মাধ্যম ব্রাক্ষ্মণ শ্রেণী, বাংলা মাধ্যম ক্ষত্রিয়, মাদ্রাসা বোর্ড বৈশ্য আর বাকী বিভিন্ন আদিবাসীদের শিক্ষা মাধ্যমগুলো শূদ্র। ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রটি বাঙালি হয়েও বাংলা জানবে না, এটা ইদানীং গর্বের কারণ । কিন্তু বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কেনো শুদ্ধ বাংলা জানে না এই কথাটা আলোচনায় কতবার এসেছে? পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ইংরেজি ভাষা চর্চা করে বলে তো এই না, তারা নিজের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়েছে বা সিলেবাসে গণ্য হিসেবে স্থান দিয়েছে। গ্রামের একটি ছোট ছেলে হন্তদন্ত হয়ে তার বদরাগী কৃষক চাচার কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানালো তার ফসলের ক্ষেতে কারা যেনো মল ত্যাগ করছে। চাচা লাঠি নিয়ে ছুটলো ক্ষেতের দিকে। পুরুষালী কণ্ঠে চিৎকার করে বললো, “ কে হাগোছে আমার জমিতে?” হঠাৎ করে একজন আর্মি সদস্যকে উঠে দাঁড়াতে দেখে চাচা মেনী বিড়াল সেজে গেলেন। সে আঙুল তুলে তার সব ক্ষেত দেখিয়ে বললো, “ এটা আমার জমি, ওটা আমার জমি। হাগেন, হাগেন। আপনারা হাগবেন না, তো কারা হাগবে।” আমাদের অবস্থাও অনেকটা চাচার মতই। ইংরেজি জানলে জগতের সব সুবিধা আমাদের। তাই ওটাই আগে। তাহলে প্রশ্ন আসে , জাপান, চীন, জার্মানিদের কি চাচার প্রয়োজন হয় না?

এতকিছু বলার পেছনে ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে অস্বীকার করা কিংবা ছোট করে দেখানোর কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইচ্ছা নেই আমার। কেবল এটাই বলতে চাইছি, শুধু ইংরেজি বা অন্য ভাষায় দক্ষতা আছে বলে আমি আমার নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করবো এটা ঠিক হবে না। শেষমেষ অস্তিত্বের গোড়া না নড়বরে হয়ে যায়। নিজের ভাষায় সঠিক ভাবে আয়ত্ত থাকলে অন্য যে কোন ভাষা আরও স্বল্প সময়ে আয়ত্তে আনা সম্ভব। কারণ সুন্দর বাক্য তৈরি করাতেই ভাষার আর্ট। ব্যক্তির মুখ যদি হয় তুলি, ভাষা তাতে রঙ। যেভাবে সাজাবেন, সেভাবেই সাজবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রথম বর্ষেই আমি আবিষ্কার করেছিলাম আমার পাঠ্য বইয়ের প্রায় সবই ইংরেজি ভাষায় রচিত। বাংলাদেশ বলতে আমরা যারা এখনও যারা ঢাকা বুঝি তাদের মফস্বল কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা নেই বললেই চলে। সেই জায়গা থেকেই আসা আমার জন্য বাংলা বই খোঁজাটা খুব একটা হাস্যকর চোখে না দেখার অনুরোধ রইলো। কারণটা বলি, অনেক খোঁজাখুঁজির পর কিছু ইংরেজি অনুবাদকৃত বাংলা বই পেলেও তা যে ইংরেজির চেয়েও ভয়াবহ রকমের কঠিন এটা কেবল আমরাই জানি। যার ফলে বাংলা বই পড়ার ইচ্ছাটাকে ছেঁড়া ঝুলিতে রেখেই ইংরেজিকে গুরু মেনে এগিয়ে যেতে হয়। এতে করে কি আমাদের অজ্ঞতা ঢাকা সম্ভব হলো? জৈনক অনুবাদক বেচারার যে বাঙলার দাঁতের গোঁড়া এখনও নড়ছে সেটা উনি না স্বীকার করলেও বাঙলার ছেঁড়া ঝুলিটি দামি কাপড়ের নিচে থেকেও উঁকি মেরে জানান দেয়। সুতরাং যে ছেলেটি বা মেয়েটি গণিতে ভাল, বিজ্ঞানে ভাল, কেবলমাত্র ইংরেজি জানে না বলে তাঁর ভেতরের আবিষ্কারককে আমরা ইচ্ছা করেই গলা টিপে হত্যা করি। খুব বেশি হলে তাঁকে নিয়ে বিজ্ঞ সমাজ দুচারটা হাস্যকর উক্তি লিখতে পারেন। কিন্তু সহজবোধ্য অনুবাদ লিখে দিতে বললে উটের মতো গর্তে মাথা লুকিয়ে রাখবেন। ভুললে চলবে না গীতাঞ্জলী অনুবাদ হয়ে “সং অফারিংস” হয়েছিল বলে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নিশ্চয়ই মাতৃভাষার পূর্ণ দক্ষতা ছিল জন্যই অনুবাদ করতে গিয়ে পান্ডিত্য দেখাতে কঠিন কঠিন শব্দ না লিখে অভ্যাস সুলভ সরল শব্দ লিখেই সর্বজনগ্রাহী করেছিলেন। অনুবাদ সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হল ভাষার কাছে আত্মসমর্পণ করা। মোটেও পাণ্ডিত্য জাহির করা নয়।

নেলসন ম্যান্ডেলা হয়তো তাঁর নিজের অতীতকে স্মরণ করেই বলেছিলেন, “ যদি তুমি কারো সাথে তোমার ভাষায় কথা বলো, তাঁর কাছে যেতে পারবে; যদি তাঁর ভাষায় কথা বলো, তার হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারবে।“ আমাদের ভারতবর্ষে এই উদাহরণ আমরা কমই দেখেছি। মুখের ভাষা আর পরনের কাপড় দিয়ে মানুষকে বিবেচনা করি। ঠিক যেমন মুখে স্বাদ লাগলেই খাবার অযোগ্য হলেও খাই। যেমন আদিবাসী কোটার ব্যবস্থা করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছি বটে। কিন্তু ক্লাসে এলে তার বুলি নিয়েই বুলিং করছি। আমাদের শিক্ষকরাও যে তাদের হয়ে বা তাদের মতো করে শেখাচ্ছেন তাও নয়। ভারতীয় ইতিহাসে গুরুশিষ্য পরম্পরা যে সুখকর না তার প্রমাণ বারবার সামন আসে। দ্রোণাচার্য যেমন ভাল ছাত্র অর্জুনকে নিয়ে গর্ব করতে করতে একলব্যের মত প্রকৃত বীরকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদের শিক্ষকরাও তেমন একচোখা ভাবেই যারা এগিয়ে তাদেরকেই এগিয়ে নিয়ে যান। ওইসকল আদিবাসী ভাষাভাষীর শিক্ষার্থীদের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার সময় কই তাদের। এমনই অভাগা জাতি আমরা, বেশির ভাগ মানুষই জানি না আদিবাসী ভাষাগুলোতেও শিক্ষার প্রচলন আছে বা আরও প্রচলিত হতে পারে। আমার কেন কেবল মনে হয় আদিবাসী শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলে, যেচে গিয়ে ডেকে এনে এইসকল নিরীহ মানুষদের জাতিসত্ত্বাকে আঘাত করছি আমরা।

চীনা কবি লু চি বলেছিলেন, “লেখকের আনন্দই সব জ্ঞানীলোকের আনন্দ। প্রাণ না থাকলে ঘটে প্রাণের জন্ম ,নিরবতার বাইরে কবি দেন গানের জন্ম।” মানুষ ভাষা সৃষ্টি করেছে। সুতরাং বর্ণ, শব্দলিপি, প্রতিলিপিও মানুষেরই তৈরি। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। কিন্তু দুচারটা ভাষা ভুল বললে বা লিখলেই আমাদের অগ্রজরা যেভাবে তেড়ে আসেন এবং সমালোচনা করেন, তাতে করে মনে হয় ভুল করার চেয়ে না বলা, না লেখাই ভাল ছিল।

আমারা বাঙালীরা গোঁড়া থেকেই উদার মনভাবের। কিন্তু একটা বিষয়ে আমরা ভীষণ গোঁয়ার। যে কোন পরিবর্তনকে আমরা মানতে চাই না সহজে। কখনোবা দেরীতে মানি। যেমন ইওরোপীয় পরাবাস্তববাদ আমরা মহাজ্ঞানীর মতো ধারণ করেছি। কিন্তু নিজের দেশের অল্প বয়সী একজন লেখকের ভাষায় সামান্য মেটাফোর মানতে পারি না। শুধু লেখকের ভাষাই বলছি কেন। শিল্পের ভাষাতেও একই অবস্থা। সিনেমা হলে গেলে শোনা যায়, “ আই সে গেট আউট, আমি বলছি তুমি বেরিয়ে যাও”। যেনো ইংরেজির সাথে এর বাংলা অর্থ না বলে দিলে আমরা কিছু বুঝতাম না। কিন্তু এখনকার একজন তরুণ নির্মাতা যদি দেখান, একজনের চোখে রাগ, হিংস্রতা দেখে অপরজন মাথা নিচু করে প্রস্থান করলো, তাহলেই বিপত্তি শুরু। কেন ডায়লগ দিয়ে দর্শককে গুলিয়ে খাওয়ানো হলো না। চোখের ভাষা আর মুখের ভাষা কোন ভাষা নিয়েই আমরা ভাবছি না এবং দর্শক ও পাঠককুলকেও দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে সুযোগ করে দিচ্ছি না। না ভাবলে তো ভাষা গতি থেমে যাবে। সাহিত্য হবে না , গান হবে না। আমাদের অগ্রজরা যদি আমাদের এই ভাবনার জগতকে কিছুটা স্বাধীন করে দেন, তাহলেই ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে।

মাতৃভাষা একটি বড়সড় ঢালের মতো। পৃথিবীর ইতিহাসে যত রাজা বা শাসক এসেছেন সবারই প্রথম রীতি ছিল নিজের মাতৃভাষাকে রাজ ভাষার মর্যাদা দেয়া। এতে করে তাদের জন্য শাসন ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো সহজ হতো। এতোটা দূরে গিয়ে উদাহরণ না টেনে আমাদের ভাষা আন্দোলনের কথাই ধরা যাক। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী আমাদেরকে শাসন করার জন্যই নিজেদের সুবিধা মতো ঊর্দূকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে চেয়েছিল। আমরা তাদের হা তে হা মেলালেই যে তারা আমাদেরকে শাসন করা বন্ধ করতো তেমনটি নয়। বরং বাংলা জানি বলেই আমরা নিজেদের ভাষাভাষির মানুষদের খুব কম সময়েই একত্র করে জনঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম। সুতরাং মাতৃভাষা কেবল একটি ভাষাই নয়, বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাঁচার প্রতীকী কৌশলও বটে।

পাকিস্তানের ঊর্দুকে আমরা মেনে নিইনি তা ঠিক। তবে উপনিবেশিক শাসনের দিন এখনও শেষ হয়নি তা বেশ বোঝা যায় সর্বত্র ইংরেজির রাজত্ব দেখে। এই বিষয়টিকে হয়তো আমরা জেনে কিংবা নিজের অজান্তেই মেনে নিয়েছি। ভাষা হিসেবে ইংরেজি খুব সহজ তাও না। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা প্রবন্ধে লিখেছেন, “একে তো ইংরেজি ভাষা অতিমাত্রায় বিজাতীয় ভাষা। শব্দ বিন্যাস,পদ বিন্যাস সম্বন্ধে আমাদের ভাষার সহিত তাহার কোন প্রকার মিল নাই। তাহার পরে আবার ভাব বিন্যাস এবং বিষয় প্রসঙ্গও বিদেশী। আগাগোঁড়া কিছুই পরিচিত নহে, সুতরাং ধারণা করিবার পূর্বেই মুখস্থ করিতে হয়। তাহাতে না চিবাইয়া গিলিয়া খাইবার ফল হয়।”

বাংলাকে অবজ্ঞা করে ভকর…ভকর… করে ইংরেজি পড়লেও ভাষা না জানার যে আক্ষেপ থাকবে তাতে হয়তোবা জীবনের অনেক কথা, ভাব, অভিব্যক্তি না জানিয়েই পৃথিবী ছাড়তে হবে। আবারও কবির ভাষাতেই ইতি টানছি – ‘এ যেন রে অভিশপ্ত প্রেতের পিপাসা — সলিল রয়েছে প’ড়ে, শুধু দেহ নাই।” বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে চাইলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা জানতে হবে। কিন্তু নিজের মাতৃভাষাক শুধুমাত্র একটি পাঠ্য বিষয় না ভেবে মুখ্য স্থানটি দেয়ার পর ইংরেজি জানা মঙ্গলকর।

মহাভারতে দ্রৌপদীর জন্য নীলপদ্ম তুলতে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের ভাইয়েরা একের পর এক যক্ষের হাতে নিহত হয়েছিল। তাদের পুনঃজীবনীর জন্য যুধিষ্ঠিরকে যক্ষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। একটি প্রশ্ন ছিল, সুখীজন কে? যুধিষ্ঠির উত্তর দেয়- “দিবসাস্যাষ্টমে ভাগে শাকং পচতি যো নরঃ অনুনী চাপ্রবাসে চ স বারিচর মোদতে।” এর অর্থ দাঁড়ায়, সন্ধ্যাবেলা যে লোক শাক রান্না করে, যার কোন ঋণ নেই আর যে বিদেশ থাকে না তাকেই সুখী বলা হয়।“ অথচ নিজের ভাষা থাকতেও আমরা যেনো নিজ দেশেই রিফিউজির মতো আশ্রিত। মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জন করা আমাদের জন্মগত অধিকার। কিন্তু অপসংস্কৃতি আমাদের ঘারে এতটাই জেঁকে বসেছে, মাতৃভাষার পূর্ণ সম্মানটাও আমরা দিচ্ছি না। মাতৃভাষায় শিক্ষার সহজ মাধ্যম গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। একমাত্র বাংলা ভাষাই পারে বাংলাদেশের সকল শিক্ষার মাধ্যমকে এক করতে। পারে সব কাতারের মানুষকে এক কাতারে এনে দাঁড় করাতে। কথার চেয়ে বড় মরণাস্ত্র নেই, মাতৃভাষার চেয়ে বড় কোন ঢাল নেই।

৩১.০১.২০২১

আফরিনা ওশিন,শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;