আনকাবূত: বৈচিত্র্যময় দৃশ্যপটের অংকন



শাহাদাত জামান
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘আনকাবূত’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় নিখুঁত ভাস্করের মতো পাথর কেটে অপরূপ সুন্দর মূর্তি নির্মাণ করেছেন কবি আদিল মাহমুদ। সেই সাথে ভাব, ভাষা, বিষয় ও প্রকাশ-নৈপুণ্যের দিক দিয়ে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উজ্জ্বল কবি মনে হয়েছে তাকে। কাব্যের বিভিন্ন রূপরীতি ও প্রকরণে তিনি তার বৈচিত্র্যময় অবদানে বাংলা কাব্যের ভান্ডারকে সুসমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন বলে বুঝা যাচ্ছে। এজন্য গদ্য-পদ্য উভয় রীতিতে তিনি পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন তার কাব্যগ্রন্থে।

কবিতায় আদিল মাহমুদের শব্দচয়নের বৈচিত্র্য, উপমার ঔজ্জ্বল্য আর ছন্দোত্থিত সংগীতময়তা অভিনব ও তুলনারহিত। ভাবের দোলায় নৃত্যচপল ভঙ্গিতে সুর ও সঙ্গীতের টানে শব্দের মিছিল দেখেছি তার কবিতায়। আনকাবূতে তিনি সহজ সুন্দর সাবলীল ভাষায় বৈচিত্র্যময় দৃশ্যপট অংকন করেছেন একের পর এক। প্রেমের কবিতায় প্রথাগত আবেগকাতরতা পরিহার করে জ্বলজ্বলে পাড় খুলে কেবল সুন্দরের ছবি এঁকেছেন। কেননা সৌন্দর্যই প্রেমের সবচেয়ে প্রধান উদ্দীপক, শিল্পের প্রধান আরাধ্য। কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো—

১. ধ্রুপদী মরণ দেশে তুমি জীয়নকাঠি/তোমার পরশ পেলেই আমি নতুন জীবনে জেগে ওঠি। [পরশ]

২. সর্বনাশ জেনেও দেহ সঁপে/ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু দিয়ে/রূহ নিয়ে পালিয়েছে মেয়ে। [রূহ নিয়ে পালিয়েছে মেয়ে]

৩. পৃথিবী থেকে পবিত্রশুচিতায় শুভ্র প্রেম হারিয়ে গেছে/মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে ভুলে গেছে। [মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে]

৪. প্রেমের ধর্ম স্থায়ীত্ব, কিন্তু বিবর্তন হয়ে যায়/যেমনটা আমার চাঁদমুখের ক্ষেত্রে হয়েছে। [ চাঁদমুখ]

৫. আমি আর তুমি মুখোমুখি হলে/প্রেম হাতছানি দেয় চোখে চোখে। [প্রেমের গন্ধ পেলে]

৬. তোকে জড়িয়ে আলোকময় হোক জীবন/আমাকে জ্বালিয়ে দে, পুড়িয়ে দে/অমর করে দে আরো ভালোবেসে! [দয়িতা]

৭. ছেলেটা বড় বোকা,প্রেম করে মরলো! হাতের কাছে অনেক বিষ ছিল/একটু খেলেই পারতো। [বোকা ছেলে]

৮. মানুষ কখনোই কারো প্রেমে পড়ে না/পড়ে নিজের প্রেমে/ভালোবাসে নফসকে/নিজেকে। [ধুম্রজাল]

নিঃসঙ্গতা এবং সময়ের অস্থিরতা স্বত্বেও আদিল মাহমুদের কবিতায় আছে এক ধরনের নম্রতার আবরণ। সমৃদ্ধ চিত্রকল্প, ব্যতিক্রমী শব্দপ্রয়োগ, পরোক্ষভাষণ, অপ্রচল উপমা এবং কূটাভাসদীপ্তি তার কবিতার বড় সম্পদ। খুব গভীর আর অন্তস্রোতের মতো মনোজগতে ধাক্কা দিতে থাকে তার কবিতা। তিনি জাগতিক বিপন্নতা থেকে কোন এক মহাজাগতিক আশ্রয়চেতনার দিকে হেঁটে চলছেন একা। আর উন্মোচন করছেন নৃত্যনন্দন আচ্ছন্নতার জাদুবলয়। যেমন- [পাপ] ‘সিগারেট হাতে আমার দিকে তাকিয়ে/পুরানো পাপ হাসতে থাকে। যেমন ধারালো দা রক্ত মেখে হাসে!’ [হারিয়ে যাওয়া দিন] ‘আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো যখন তখন মনে পড়ে। মৃত অথচ নড়েচড়ে!’ [স্মৃতিকথা] ‘আমার স্মৃতিগুলো কেন আসে স্বপ্নে জাগরণে/সবসময় খোঁচাতে চায় উতলা অশৃঙ্খলমনে!’ [গুনাহ] ‘মাটিতে পা রেখেছি বলে আমার পিছু ছাড়লো না! তার থেকে চাই ক্ষমা।’ [মৃত্যু] ‘মাটির বুকে ফুলের ঝরে পড়ার মত তুমিও একদিন অনায়াসে ঝরে পড়বে। মাটিতেই মাটি হবে।’

মায়ের স্পর্শেই সন্তান ধীরে ধীরে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সব ধর্মেই মায়ের মর্যাদাকে উচ্চাসীন করেছে। মা, আম্মা, আম্মি, মাম্মি সন্তানেরা যে যেভাবে ডাকুক; এই শান্তির ডাক শতকিছুর বিনিময়েও অন্য কোনো শব্দের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তাই তো আনকাবূতে 'আম্মা ও মা' বলে পৃথিবীর সব মায়া, মমতা, অকৃত্রিম স্নেহ, আদর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সুখের কথা লিখেছেন আদিল মাহমুদ। তার কবিতা পড়ে বুঝেছি মা আর ছেলের মাঝে অজানা একটি বাঁধন থাকে। যে বাঁধনের কারণে মা তার ছেলের কথা কোন মাধ্যম ছাড়াই শুনতে পায়। উদাহরণ স্বরূপ কিছু চরণ  উদ্ধৃত হলো—

ক. আম্মা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেননি। মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণাও নেই। পড়েছেন মাত্র দশম শ্রেণি পর্যন্ত। তবুও আমি যত পড়ালেখা করি, আম্মা তারচেয়েও বেশি জ্ঞানী কিভাবে হয়ে যান জানি। [মুখোশ খসে পড়া আমি]

খ.ঝাপসা চোখে দেখি মা জেগে আছেন পাশে/আমার মাথা তার কোলে/নরম হাতে বিলি কাটছেন চুলে/মায়ের হাত থেকে মায়া পড়ছে গলে গলে/আমার চোখে, ঠোঁটে গালে। [পৃথিবী ও জান্নাত মা]

গ. মিষ্টি সুরের তালে, কিচিরমিচির পাখির গানে, মা এসেছে শৈশব ঘরে। নাড়িছেঁড়া ধনদের সঙ্গে নিয়ে। ম ম ভাসে শিউলি গন্ধ স্বপনে। [মা এসেছে শৈশব ঘরে]

ঘ. আম্মা/ছুটি না নিয়ে/আমার রূহ বারবার পালিয়ে যায়/বাড়ির গোলাপ বনে/তোমার চুলের ঘ্রাণ শুষে নিতে/শাড়ির গন্ধের মাদকতা পেতে/তোমাকে দেখতে হাসতে হাসতে। [আমাকে কেন পাঠালে শহরে]

ঙ. আম্মার কোলে মাথা রাখি/অনুচ্চ স্বরে তাকে পড়ি/জিকির করি, ইবাদত করি/মৌন সেজদায় নত থাকি। আম্মা আম্মা বলে চ্যাঁচাই/তিনি চুপ থাকেন/কিংবা কি বলে ওঠেন/তাকিয়ে মিষ্টি হাসেন, আমাকে দেখেন। আমিও জোছনাকে দেখি। [জোছনা]

জীবনকে নানা কৌণিক দিক দিয়ে দেখার চোখ আদিল মাহমুদ রপ্ত করেছেন তার বোধের বিস্তৃত কাব্যরুচি দিয়েই। যার জন্য আনকাবূতে তিনি প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্য, সমাজচিত্র সবকিছু নিয়েই কবিতা লিখে অনুপম সব পঙক্তির আয়োজন করেছেন। তিনি কবিতাগুলো চিত্রায়িত করেছেন একরকম মাদকতায়। যা পাঠে ক্লান্তি আসে না, অস্বস্তির অনুভূতি হয় না, বরং সুখপাঠ্য মনে হয়। তার পাঠক প্রিয়তা বাড়–ক, কবিতার জীবন সুন্দর হোক।