বাবা



হাসিন মাহবুব চেরী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আজ বাবা দিবস নয় , আমার বাবার মৃত্যুদিবসও নয়।  আজ বছরের বাকি ৩৬৪ দিনের মতোই একটি দিন, যে দিনের কোনো একটা সময় আমার মন খারাপ হয়ে যায় আমার বাবার কথা মনে করে, অথবা বাবার দেয়া নিঃসার্থ ভালোবাসার স্মৃতি মনে করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠে।  
 
পৃথিবীতে সবাই মাকে নিয়ে কত কথা লিখে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত আছে বলেও মানে।  আমার ক্ষেত্রে ঘটনাটা ভিন্ন।  আমি আজকে যা কিছু, তার সিংহভাগ অবদানই আমার বাবার।  আমার বাবা প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহবুব উল্লাহ, যিনি  আমাকে শিখিয়েছেন এই নারীবিদ্বেষী সমাজে কিভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কিভাবে নিজের আত্মমর্যাদাকে সবার আগে স্থান দিতে হয়, কিভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্যে যুদ্ধ করতে হয়।  
 
যেহেতু আমার মা একটা বিদেশী এন জি ও'র ডিরেক্টর-এর দায়িত্বে ছিলেন, তাই তাকে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকতে হতো, এবং অফিসের কাজে প্রায়ই অনেক ট্রাভেল করতে হতো।  আর একারণেই আমার বাবার সাথেই আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে অনেক বেশি।  আর তাছাড়া আমার ছোট বোনের সাথে আমার বয়সের ব্যবধান ১০ বছরের হওয়ায় সেই সময় থেকেই আমি পরিবারের সব কিছুতেই প্রাধান্য পেয়ে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। 
 
শুধুমাত্র আমাকে ছেড়ে থাকতে হবে, এজন্যে আমার বাবা কানাডা'র মেনিটোবা  বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল স্কলারশিপ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পিএইচ ডি করার ডিসিশন নিলেন। তাঁর পি এইচ ডি কালীন ছূটির অনেকটাই কেটেছে আমার পেছনে।  
 
আমার এখনো মনে আছে ছোট্টবেলায় সকাল শুরু হতো আমার বাবার নিজের হাতে তৈরি এক বিশাল গ্লাসে আনারসের জুস দিয়ে।  তারপর স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি করে দেয়ার জন্যে চুল আঁচড়ানো থেকে শুরু করে জুতার ফিতে বাঁধা সবটাই আমার বাবা করতেন অতি আনন্দ সহকারে। 
 
ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ও আমার বাবা আমাকে রাতে ঘুম পাড়াতেন কোলে নিয়ে বারান্দায় হেঁটে। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন আমার রিউম্যাটিক ফিভার ধরা পড়লো আর তার ট্রিটমেন্ট হলো প্রতিমাসে একটা করে পেনিসিলিন ইনজেকশন, যেটা দেয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল আমার সেই ছোট্ট শরীরের জন্যে।  আমার এই কষ্ট কমানোর জন্যে আমার বাবা প্রতিবার ইনজেকশন দেবার আগে খেলনার দোকানে নিয়ে যেতেন আর আমার পছন্দের খেলনা কিনে দিতেন যেন আমার মনটা খুশি থাকে।  আমি ছোটবেলা থেকে  খেলাধূলায়  খুব খারাপ ছিলাম, সুতরাং স্কুলের বার্ষিক স্পোর্টস কম্পেটিশনে আমি কখনোই জিততে পারতাম না।  আর তারপর শুরু হয়ে যেত আমার কান্নাকাটি।  এই কান্নাকাটি থেকে বাঁচানোর জন্যে আমার বাবা আগে থেকেই খেলনা কিনে নিয়ে যেতেন সাথে করে আর সবাই যখন প্রথম দ্বিতীয় হবার জন্যে পুরস্কার পেতো, আমি পেতাম বাবার কাছে লুকোনো আমার জন্যে আনা খেলনা।  আর সেটা পেয়ে মুহূর্তেই আমার সব দুঃখ দূর হয়ে যেত।  খুশিতে নাচতে নাচতে বাবার হাত ধরে আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায় চলে আসতাম।  
 
ছোটকালে দাঁত পড়া খুব একটা সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু আমার বাবা তো সাধারণ বাবা নন।  তিনি তাই এই সাধারণ নড়বড়ে দাঁত  ফেলার জন্যে প্রতিবার আমাকে চিটাগাং এর সবচেয়ে ভালো দাঁতের ডাক্তার ডাঃ সালাহ উদ্দিনের কাছে নিয়ে যেতেন আর সালাহ উদ্দিন আঙ্কেল দাঁত ফেলা শেষে আইসক্রিমের প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে আমাকে বলতেন 'মামণি তোর বাবার কি টাকা ফেলার জায়গা নাই রে! আসছিসই যখন একটা প্রেসক্রিপশন তো লিখতেই হয় তাই যা আইসক্রিম লিখে দিলাম।'
 
ঈদের সময় দোকানে নিয়ে আমার বাবা বলতেন মামণি তুমি কোনটা কোনটা কিনতে চাও? আমার মনে আছে আমি কমপক্ষে ৫ টার  কম জামা দিয়ে কখনো ঈদ করিনি। কর্মসূত্রে বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত থাকার পরেও আমার জন্যে বাবার সময়ের কোনো অভাব আমি কোনোদিন দেখিনি। এস এস সি এবং এইচ এস সি পরীক্ষার সময় বাবা আমাকে হলে ঢুকিয়ে দিয়ে পুরো তিনটা ঘন্টা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যদি মেয়ের কোনো কারণে কোনো সমস্যা হয় সেই চিন্তায়।  আমার এস এস সি রেজাল্টের পরে আমার বাবা আমাকে একটা ডেকসেট কিনে দিয়েছিলেন আর সেটা ছিলো আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। আমার অনার্স এবং মাস্টার্স পরীক্ষার সময় বাসা থেকে বের হবার আগে বাবার হাতে ভাত খেয়ে বের হতাম।  যাবার পথে গাড়িতে আমি পড়া রিভিশন দিতে থাকতাম আর বাবা কমলার কোয়া মুখে ঢুকিয়ে দিতেন।  
 
আমার অনেক বন্ধু-বান্ধবই বলতো যে তোকে আমাদের হিংসা হয় তোর আদর দেখলে। আমার বাবা কোনোদিন আমার সাথে গলা উঁচু করে একটা কথা বলেননি।  আত্মীয় স্বজন অনেকেই বলতেন যে মেয়েকে এতো আদর দিয়ে মাথায় না উঠিয়ে বিয়ে দিয়ে দেন, নাহলে পরে পস্তাতে হবে।  আমার বাবার এক উত্তর সবার জন্যে, আমার মেয়েকে আমি চিনি আর তার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে, সুতরাং আমার মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছুই করবো না। 
 
বাবার এরকম স্ট্রং সাপোর্ট না থাকলে পেশাগত জীবনে এটুকু আসা আমার পক্ষে কোনো ভাবেই হয়তো সম্ভব  হতো না।   বিদেশে আসার পর যতবার দেশে গিয়েছি প্লেন থেকে বের হওয়া মাত্র কাঁচের ওপারে বাবার হাসিমাখা মুখ দেখা যেত আর ফিরে আসার সময় প্লেনে ওঠার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমার বাবা ছলছল চোখে কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকতেন আমার জন্যে।  বিদেশে থাকাকালীন সময়ে আমার ঘুম ভাঙতো বাবার ফোনে আর সন্ধ্যার সময় বাবা নিজে ঘুমাতে যাবার আগে আবার ফোন দিতেন। বাবার মৃত্যুর পর আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে এই সন্ধ্যার সময়  যখন আমি দেখতাম ওই সময়ে আমাকে আর কেউ কল করছেনা, তখন মনে হতো আমার পুরো পৃথিবী আধার হয়ে আসছে।  
 
একবারের কথা মনে আছে , আমি লন্ডন গিয়েছিলাম সেবার প্রথম এবং আমার ফিরে আসার ট্রেন ছিল বাংলাদেশ  টাইম রাত ৩ টা বাজে।  আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আমার বাবা আমার ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত জেগে রইলেন এবং ট্রেন ছেড়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর ঘুমাতে গেলেন। বাবার অফিসের টেবিলের কাঁচের  নিচে সব আমার মেয়ের ছবি, আর কেউ গেলেই অতি উৎসাহ সহকারে তাদের ছবিগুলো দেখাতেন।  
 
আমার অনেক সৌভাগ্য যে বিদেশে থাকার পরেও আমার বাবার মৃত্যুর আগের দিন সারাদিন আমি আমার বাবার সাথে অনেক আনন্দের একটি দিন কাটাতে পেরেছি, সারাদিন এলিফ্যান্ট রোডে গিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটের জন্যে টাইলস কেনা হয়েছিল, বিকেলে  হাতিল আর গুলশান মার্কেটে গিয়ে বাসার জন্যে ফার্নিচার চয়েস করা হলো, কারণ আব্বু সব বন্ধ করে রেখেছিলেন আমার জন্যে। আমার পছন্দ ছাড়া কিছুই করবেন না তাই। তারপর  রাতের বেলা তার সাথে বাইরে খেয়ে বাসায় ফিরে তার হাতের ছোলানো লিচুও খেয়েছি। 
 
এরকম কত সহস্র স্মৃতি আমার বাবাকে ঘিরে।  আসলে যখন কেউ চলে যায়, কোনো কিছুই থেমে থাকে না, কিন্তু অনেক কিছুই বদলে যায়।  এই বদলানো পার্মানেন্ট, এই হারানোর কোনো রিপ্লেসমেন্ট নেই যে ! এই বিশাল শূন্যতা প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয় যে কষ্ট দেখা যায় না , কোনো ওষুধ দিয়ে সারানোও যায় না, শুধু মনটাকেই মেরে ফেলে।  প্রচন্ড আনন্দের কোনো উপলক্ষ্যও অপূর্ণ মনে হয় বাবার উপস্থিতি নেই বলে, আবার কষ্টের দিনগুলোতে মনে হয়  আজকে বাবা নেই বলেই হয়তো এমনটা হচ্ছে। তবুও জীবন চলে জীবনের গতিতে, চলতে হয়...।