ক্যামেলিয়া, তুমিই তাহলে চা!



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস।  সংগৃহীত

২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২১শে মে আন্তর্জাতিক চা দিবস। সারা বিশ্ব জুড়ে চায়ের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বোঝাতেই এই দিনটি পালন করা হয়। চা ( বৈজ্ঞানিক নাম- ক্যামেলিয়া সুনেনসিস) হলো এমন এক উদ্ভিদ, যা সাদা চা, সবুজ চা, উওলং, কালো চা, হলুদ চা এবং পু-এহের মতো চা তৈরি করে।

চীনের ইউনান অঞ্চলের কাছাকাছি সর্বপ্রথম  চা উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়েছে বলে মনে করা হয়। কামেলিয়া সিনেনসিস নামটি 'চীনা ক্যামেলিয়া '-এর ল্যাটিন নাম, যা একটি চিরহরিৎ ঝরঝরে গাছ, যা বনের এলাকায় প্রসারিত হয়। পাতাগুলো সারিবদ্ধ প্রান্ত দিয়ে একটি চকচকে সবুজ এবং একটি উপসাগরের আকৃতি ও আকারের অনুরূপ।

চা এর জন্য উদ্ভিদ দুটি প্রকারের হয়। এক) ক্যামেলিয়া সিনেনসিস সিনেনসিস (চীনা চা)। এটি চীনের নেটিভ উদ্ভিদ এবং ঠান্ডা তাপমাত্রা এবং উচ্চ উচ্চতায় উজ্জ্বল হয়ে জন্মায়। এটা সাধারণত পর্বত ঢাল উপর উত্থিত হয় এই জাতটি মিষ্টি, হালকা চা, সবুজ চা এবং সাদা চা উৎপন্ন করে। দুই) ক্যামেলিয়া সিনেনসিস আসামিকা। যা, জনপ্রিয়ভাবে আসাম চা বা ভারতীয় চা হিসাবে পরিচিত হয়। এটি উত্তর ভারতে আসাম অঞ্চল থেকে উৎপন্ন। এখানকার জলবায়ু প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং উষ্ণ তাপমাত্রার সাথে ক্রান্তীয় হওয়ায় বড় উদ্ভিদ উৎপাদক এবং কালো চা, উলং এবং পি-এহের মত শক্ত বা কড়া স্বাদের চা উৎপন্ন করে।

তবে চা এর ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় ধরণের উদ্ভিদ আছে, যা শঙ্কর জাতের। নাম ক্যামেলিয়া সিনসেথিস কম্বোডিয়েন্সস, যা 'জাভা বুশ হিসাবেও পরিচিত। এটি সাধারণত চা জন্য ব্যবহার করা হয় না, যদিও এটি ক্রসব্রেড উদ্ভিদ cultivars ব্যবহার করা হয়েছে

চায়ের জন্মপুরাকথা বা অরিজিন মিথ বলেছেন সারা রোজ নামের এক গবেষক। তার উপস্থাপিত দুটি গল্পের মধ্যে প্রথমটির সঙ্গে সম্রাট সেনঙের নাম জড়িয়ে। কথিত আছে, একটি ক্যামেলিয়া(চা-র বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া) গাছের পর্ণছায়ে বিশ্রাম করছিলেন সেনঙ, হেনকালে তার হাতে ধরা ফুটন্ত জল ভরা পাত্রে এসে পড়ল চকচকে একটা পাতা। জলের দানাগুলো পাতা থেকে আলাদা হয়ে গেলে দেখা গেল জলের মাথায় ভাসন্ত পাতা ঘিরে ফিকে সবুজ তরল তৈরি হচ্ছে। গাছ বিষয়ে যা যা জানার সেনঙ জানতেন, এই পাতা আর তরল বিষাক্ত নয়, মুহূর্তে বুঝলেন। পাতাসুদ্ধ জলে চুমুক দিয়ে দেখলেন, আহা! সুগন্ধি, ঈষৎ তিতকুটে, প্রাণদায়ী, বলবর্ধক।

গবেষক রোজ বলছেন, চীনা বৌদ্ধদের মধ্যে দ্বিতীয় এক কাহিনি প্রচলিত, যার সঙ্গে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ জড়িত। প্ৰব্রজ্যায় বেরিয়েছেন তরুণ সিদ্ধার্থ, ঘুরতে ঘুরতে এক পর্বতে পৌঁছালেন। ক্লান্ত মানুষটি গাছের তলায় বসেছেন ধ্যান করবেন বলে, মোক্ষলাভের নানা উপায় নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন। জেগে উঠে নিজের উপর চূড়ান্ত ক্রুদ্ধ হলেন, নিজের শরীর প্রতারণা করছে, চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে, এমতাবস্থায় কী করে করবেন তিনি নির্বাণ-সন্ধান? ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে নিজের ভ্রুপল্লব টেনে ছিঁড়ে ফেললেন সিদ্ধার্থ। সত্য ও আলোকলাভের পথে যাত্রায় কোনও বাধা তিনি স্বীকার করবেন না। ছিন্ন ভ্রুপল্লব ছুঁড়ে দিলেন হাওয়ায়, যেখানে যেখানে তা গিয়ে পড়ল, সুগন্ধি পুষ্পল গাছ জন্মাল, তা-ই চা। শ্রেষ্ঠ জাতের চা পাতার উল্টোপিঠে যে সূক্ষ্ম রুপালি লোম থাকে, তাকে এখনো দেখতে লাগে অবিকল ভ্রুপত্রের মতো।

রবার্ট ফরচুন নামের এক অভিযাত্রী চীন থেকে 'শিকার' করে এই চা নিয়ে এলেন ভারতবর্ষে, দার্জিলিং-এ। চা অর্থে সেই আবহমান, যা জন্ম নিচ্ছে অলৌকিকে, জন্মাবধি যাকে ঘিরে রেখেছে ইন্দ্রজাল, মায়া, রহস্য। ব্রিটিশ কোম্পানির মুনাফালোলুপ বেনিয়াসায়েবদের হাতে পড়ে চায়ের জন্মান্তর গোত্রান্তর  ঘটলো, দেবকূলোদ্ভব অথচ সর্বজনভোগ্য চা আধুনিক সময়ের লুটেরাদের হাতে পড়ে জমিজমা, লাভলোকসান, উৎপাদন আর সস্তা শ্রম লুণ্ঠনের মধ্যে ঢুকে গেল।

অবশ্য এমন নয় যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি যখন ফরচুন চীনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেটি স্বর্গরাজ্যবিশেষ ছিল, কিম্বা সেখানকার বাগানগুলো মায়াকানন। ক্ষয়িষ্ণু সামন্তশাসন, অপদার্থ নৃপতি, অপরিমিত শোষণ আর দারিদ্র, সব অর্থেই আফিম-লিপ্ত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন আর অবক্ষয়, এই হচ্ছে আঠেরো-উনিশ শতকের চীন। বিশ শতকের গোড়ায় গিয়ে যা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে এবং আসবে বিপ্লব। ফরচুন-কাহিনিতে ও সমসাময়িক বহু বিবরণে এই পচন ও অবক্ষয়ের বর্ণনা মেলে।

তবে, চা, অর্থাৎ আসল চৈনিক 'জাতের' চা, তা তখনো জন্মাত, তৈরি হত, শহুরে শাসনকেন্দ্র বা সমতল বাজারগ্রাম থেকে বহু দূরে, উঁচু উঁচু পাহাড়ের কুণ্ডলির ভিতর। সে পাহাড়ে মেঘকুয়াশার চিরস্থায়ী আবরণ, বহু গাছের চিরসবুজ ভিড়। এখনও জন্মায় হিমালয়ের ঢালে আসামে, দার্জিলিং-এ, পাহাড়ি কেরালায়, টিলাময় সিলেটে এবং চট্টগ্রামের টিকছড়ির কোনও কোনও অংশে।

মেঘমেদুর ভেজা প্রকৃতিতে ক্যামেলিয়া নামের রোমাঞ্চ লুকিয়ে চা উষ্ণ আবহে হাজির হয় পৃথিবীর দেশে দেশে, ঘরে ঘরে, টেবিলে টেবিলে, কোটি মানুষের তৃপ্তির চুমুকে। এভাবেই বিশুদ্ধ-পানির পরেই পৃথিবীর সর্বাধিক ভোগ্য-পানীয় রূপে চা নেশা ও আকর্ষণে মাতিয়ে রেখেছে কোটি কোটি বিশ্ববাসীকে।