ফরিদপুরে ছাত্র সম্মেলন: কবি নজরুল ও বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ



বাবু মল্লিক
কবি নজরুলের জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর ফুলেল শুভেচ্ছা

কবি নজরুলের জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর ফুলেল শুভেচ্ছা

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলমের সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পরিচয় ঘটেছিল নিজের জেলা সদর ফরিদপুরের এক সম্মেলনে, ১৯৪১ সালে। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম সাহিত্য সাধনার উন্মেষকাল ১৯২৫ সাল থেকে সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবনে ১৯৪১ শেষ পর্যন্ত অন্তত বৃহত্তর ফরিদপুরের কয়েকটি স্থানে অন্তত আটবার ভ্রমণ করেছেন তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কবির ফরিদপুর ভ্রমণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ রাজশক্তি প্রতিফলিত হয়েছিল। কবি নজরুল বৃটিশ রাজশক্তির তোয়াক্কা না করে বারবার এসেছেন ফরিদপুরের মাটিতে। নজরুল মানস চরিত্রে তাই ফরিদপুরের সফরগুলো আরেক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। মুসলিম স্টুডেন্ট কনফারেন্স ছাড়াও কবি একাধিকবার ফরিদপুর জেলা সদরে এসেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সুস্থ জীবনের শেষ পর্যায়ে কবি নজরুল আরো একবার ফরিদপুর গিয়েছিলেন। গবেষক আবুল হোসেন মল্লিকের মতে, সেবার কবির সাথে ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা ও শিল্লী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। 

বঙ্গবন্ধুর স্কুল ছাত্রাবস্থায়, ১৯৪১ সাল মধ্যে নজরুলের ফরিদপুরের শেষ সফরের আগেরবার এসেছিলেন ১৯৩৬ সালে, ছাত্রদের একটি অনুষ্ঠানে- জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের চতুর্থ অধিবশনে সভাপতিত্ব করতে। সে সম্মেলনে প্রদত্ত কবির অভিভাষণটি ‘বাংলার মুসলিমকে বাঁচাও’ নামে পরিচিত। ভাষণে পদত্ত প্রবন্ধটি পাওয়া গেলেও নজরুলের সে সফরের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। নজরুলের ফরিদপুর প্রথম ভ্রমণটিও ছিল ছাত্র সমাজ এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে, ১৯২৫ সালে তিন দিনের টেপাকোলা মাঠে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। কবি নজরুল ছাড়াও সেবার ফরিদপুরে এসেছিলেন মহাত্মাগান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের (৫.১১.১৮৭০-১৬.৬.১৯২৫), নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু (২৩.১.১৮৯৭-১৯.৮১৯৪৫), সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯), মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-২২.২.১৯৫৮) যোগ দিয়ে বক্তৃতা করেন। কবি নজরুল সাথে একজন বামপন্থী নেতাসহ চারজনের একটি দলে ওই সম্মেলনে যোগ দিতে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতে ওঠেন।

বঙ্গবন্ধু’র অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে, ১৯৩৬ সালে তাঁর পিতা গোপালগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে গেলে মাদারীপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন কিশোর মুজিব। সেখানে চোখে গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। ফিরে এসে ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে গিয়ে মিশন হাইস্কুলে ভর্তি হন, পিতা শেখ লুৎফর রহমানও তখন গোপালগঞ্জেই ফিরে এসেছিলেন আবার বদলি নিয়ে। সেখানে মিশন স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই মুজিবের রাজননৈতিক সংশ্রব ঘটে ১৯৪০ সালে, নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। এরপর বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন শেখ মুজিব। ফরিদপুরে সে সময়ে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক রাজনীতি শুরু হয়নি। কংগ্রেসের নেতৃতে সেখানে ছিলেন নীলকান্ত ঘোষ, রায় বাহাদুর শরৎচন্দ্র বল, রমেশ চন্দ্র সেন, গোপালচন্দ্র মুখার্জি, যতীন্দ্রনাথ বাগচী, সতীশচন্দ্র হীরা প্রমুখ।

১৯৩৬ সালে কবি নজরুলের  অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ছাত্র সম্মেলনে শেখ মুজিব অংশ নিয়েছিলেন কী না তা পরিষ্কার করে বলা যায় না। কবি নজরুলের সঙ্গে যখন ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যোগাযোগ ঘটল তখন তিনি ২১ বছরের পরিপূর্ণ যুবক, ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে তখন তিনি স্কুল ফাইনাল দিয়েছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশের পর সম্প্রতি জানা যাচ্ছে যে, কবি নজরুলের আতিথ্য সম্মৃদ্ধ সেই সম্মেলনের অন্যতম অংশগ্রহণকারী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তখন সবে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে ইতোমধ্যেই তিনি নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র মধ্যে তখন মনোমালিন্য চলছিল।

ফরিদপুরের ওই ছাত্রসভায় ব্রিটিশের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় শেষে হুমায়ুন কবিরের বাড়িতে কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হল। শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন-

‘১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দ্বিতীয় বিভাগের মার্কস পেয়েছি। মন ভেঙে গেল।

তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে। সভা করি বক্তৃতা করি খেলার দিকে মন নাই। শুধু মুসলিম  লীগ আর ছাত্রলীগ। ....পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় যাই। সভা-সমাবেশে যোগদান করি। মাদারীপুর যেয়ে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করি। ....এই সময় ফজলুল হক সাহেবের সাথে জিন্নাহ সাহেবের মনোমালিন্য হয়। হক সাহেব জিন্নাহ সাহেবের হুকুম মানতে রাজী না হওয়ায় তিনি মুসলিম লীগ ত্যাগ করে নয়া মন্ত্রিসভা গঠন করলেন শ্যামা মুখার্জির সাথে।.....’

১৯৪১ সালের সেই ফরিদপুর সম্মেলন প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন কবির নামটি। সম্মেলন ১৪৪ ধারার কারণে হুমায়ুন কবিরের বাড়িতে গিয়ে ওঠে, কবি নজরুল সেখানে গান গেয়ে শোনান। আর কোন রাজনৈতিক আলোচনা হতে দেন নি তরুণ মুজিব। শিক্ষা ও ছাত্রদের কর্তব্য বিষয়ে আলাপ আলোচনা ও বক্তৃতা চলে সেখানে। ফলে দলাদলি হয়ে দু’দলে ভাগ হয়ে যায় ছাত্ররা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন সেকথা-

‘একটা ঘটনার দিন-তারিখ আমার মনে নাই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজি নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহিম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। কাজি নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন। আমরা বললাম, এই কনফারেন্সে রাজনীতির আলোচনা হবে না। শিক্ষা ও ছাত্রদের কর্তব্য সম্মন্ধে বক্তৃতা হবে। ছাত্রদের মধ্যেও দুইটা দল হয়ে গেল।’[ অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শেখ মুজিবুর রহমান, পৃঃ ১৬ ]

১৯৪১ সালে ফরিদপুর সম্মেলনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও উপস্থিত হয়ে ছিলেন প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খাঁ। তিনি তাঁর বক্তৃতায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল গঠনের উপায় নাই এবং ছাত্র সমাজের রাজনৈতিক চিন্তা ও প্রত্যক্ষ দলীয় আনুগত্যের কোন প্রয়োজন নেই বলে মত প্রকাশ করেছিলেন। সে প্রসঙ্গে আহম্মদ কাফিল লিখেছেন-

‘১৯৪১ সালে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশনে ইব্রাহিম খাঁ ছাত্রদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গ মন্তব্য করেন-সত্য বটে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, দেশে রাজনৈতিক দল গঠন ছাড়া উপায় নাই।....কিন্তু ছাত্র সমাজের রাজনৈতিক চিন্তা ও আলোচনায় এরূপ দলের প্রকাশ্য এবং প্রত্যক্ষ আনুগত্যের কোন অনিবার্য প্রয়োজন নেই।’ [ দ্রঃ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ স্মৃতিগ্রন্থ: আহমাদ কাফিল, ঝিঙেফুল-ঢাকা। প্রথম প্রকাশ-বইমেলা’২০০৬। 

ফরিদপুর সম্মেলনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল সে সময়ের আজাদ পত্রিকায়। ১৯৪১ সালে আজাদের ওই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, ছাত্রদের যে সম্মেলনে সভাপতিত্ব করতে কবি নজরুল ইসলাম ফরিদপুর গিয়েছিলেন, ১৪৪ ধারা জারি হওয়ায় তা পণ্ড হয়ে গেলে কবি নজরুল ইসলাম একটি ধর্মসভায় যোগ দেন। তবে সে ধর্মসভাটি কোথায় বা কার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা জানা যায় না। আজাদ পত্রিকায় (২৮ শ্রাবণ, ১৩৪৮/ ১৩ আগস্ট, ১৯৪১) প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘ফরিদপুরে ছাত্র সম্মেলন/১৪৪ ধারা জারি করায় পণ্ড। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক ধর্মসভায় বক্তৃতা।’

সে রিপোর্টে আরও জানা যায়, রিপোর্ট প্রকাশের দিনে জেলা মোসলেম ছাত্র সম্মেলনের অধিবেশন হবার কথা ছিল। নজরুল ছাড়াও সম্মেলন উপলক্ষে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা হলেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, মুহম্মদ হাবীবুল্লাহ, শামসুল হুদা চৌধুরী ও আব্দুর রউফ। এছাড়াও এসেছিলেন অধ্যাপক হুমায়ুন কবির যিনি ততদিনে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য। কিন্তু ১৪৪ ধারা জারি হওয়ায় সে সম্মেলন আর হয়নি।

ফরিদপুর প্রেক্ষাপটে কবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের সম্ববত ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির উত্তাল সময়ে ‘ফরিদপুরে ছাত্র সম্মেলন/১৪৪ ধারা জারি করায় পণ্ড’ হওয়ার ভেতর দিয়েই পরিচয় সম্পন্ন হয়। 

লেখক: বাবু মল্লিক, সাংবাদিক ও সম্পাদক-সাপ্তাহিক অনুসন্ধান। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ‘মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ’ রচনা প্রকল্পের রাজবাড়ী জেলা অংশের লেখক, গবেষক ও সম্পাদক

 

 

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;