অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস' 



ড. রূপকুমার বর্মণ
অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস'র জার্নাল 'ভাসমান'।

অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস'র জার্নাল 'ভাসমান'।

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা সাহিত্য জগতের অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪-১৯৫১) নামের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। অবিভক্ত বঙ্গদেশের পূর্ববাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় এসে (১৯৩৪) তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি যেসমস্ত সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তার অনেকগুলিই তাঁর জীবদ্বশায় প্রকাশিত হয়নি। ভারতবর্ষ, নবশক্তি, মোহাম্মদি, দেশ ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর অনেক রচনাই কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল। তবে অদ্বৈতের বন্ধু ও অনুরাগীদের প্রচেষ্টায় তাঁর অনেক অপ্রকাশিত রচনার প্রকাশ যেমন সম্ভব হয়েছে তেমনি হারিয়ে যাওয়া অনেক গল্প ও কবিতার পুনর্মুদ্রণও ঘটেছে।

অদ্বৈতের ভাবনা ও সৃষ্টিকে দেশ-বিদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে যেসব সংগঠন নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল কলকাতার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি’ [Adwaita Malla Barman Educational and Cultural Society (AMBECS) বা এমবেকস্‌]

১৯৯৪ সালের (১৫ই মে) অদ্বৈত মল্লবর্মণের নামের সঙ্গে যুক্ত এই সংগঠনটি স্থাপন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন মালো বুদ্ধিজীবী। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন  সুশান্ত  হালদার, রণবীর সিংহ বর্মণ,  খগেন্দ্রনাথ হালদার, অরুণ কুমার সরকার, সুবল চন্দ্র হালদার, নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, পংকজ কান্তি দাস, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ বর্মণ, প্রমুখ।

মালোদের মতো পিছিয়ে পড়া সামাজিক গোষ্ঠী রসার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থাপিত এমবেকস্‌-এর প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল ১৯৯০ এর দশকে ভারতে ‘দলিত আন্দোলন’ ও ‘দলিত প্রতর্কের’ বিকাশ। 

প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯০-এর দশকের ভারতের বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ‘দলিত প্রতর্কের’ বিকাশের পক্ষে সহায়ক হয়েছিল। প্রথমটি ছিল তাঁর জন্ম শতবর্ষে ড. বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকরকে (১৮৯১-১৯৫৬) ‘ভারতরত্ন’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া। তাঁর জীবদ্দশায়, এমনকি তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর (ড. আম্বেদকর) প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান প্রদর্শনে  অ-দলিত মননে অনীহা থাকলেও  ১৯৯০-এর দশকে সেই অনীহা সম্মতিতে রূপান্তরিত হয়। এর সঙ্গে তপশিলি জাতি থেকে ভারতের নবম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৯২-১৯৯৭) ও দশম রাষ্ট্রপতিরূপে (১৯৯৭-২০০২) ড. কে. আর. নারায়ননের নির্বাচন দলিত প্রতর্ক বিকাশের সদর্থক পরিবেশ তৈরি করেছিল। তৃতীয়ত, মন্ডল কমিশনের সুপারিশ (১৯৭৮-৮০) মেনে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে সুপ্রীম কোর্টের স্বীকৃতি (১৯৯৩) সারা ভারতে দলিত আন্দোলনের মূল দাবি ও বক্তব্যকে উদ্দীপিত করে তোলে। একইসঙ্গে জাতপাতে বিভাজিত উত্তর প্রদেশে কুমারী মায়াবতীর নেতৃত্বে বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সরকার গঠন দলিতবাদকে আশাবাদী করে তুলেছিল।

ফলত: দলিতবাদ সম্পর্কিত রচনা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ধারা দক্ষিণ ভারতের দলিত খ্রিস্টানদের হাতে শক্তিশালী রূপ ধারন করে। দলিতদের প্রতিবাদগুলোর অপব্যাখ্যার প্রবণতাকে প্রতিহত করার জন্য সেগুলো সচেষ্ট হয়।ঁরা শব্দ চয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতে দলিতবাদ বিকাশের এরকম পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের দলিত লেখক ও চিন্তাবিদগণ অদ্বৈত মল্লবর্মণকে তাঁদের প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থার’ পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মালো বুদ্ধিজীবীদের অদম্য উৎসাহে গড়ে ওঠে এমবেকস্‌ এর মতো সংস্থা।

বাংলার মালোরা অবশ্য এর আগেও কয়েকটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ঝল্লমল্ল ক্ষত্রিয় সমিতি’ (১৯১৩) ও ‘বঙ্গীয় মল্ল ক্ষত্রিয় সমাজ উন্নয়ন সভা’ (১৯৩২)। ঝল্লমল্ল ক্ষত্রিয় সমিতির মূল কেন্দ্র ছিল পাবনাতে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ সহ পূর্ববঙ্গ/বাংলাদেশ ও আসামের সর্বত্র এর শাখা তৈরি হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় সংগঠনটি কলকাতা ও ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই দুটি সংগঠন মালোদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উপর অধিক মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছিল। এমনকি এই সংগঠন দুটির সক্রিয় সহযোগিতায় মালো সমাজের দুজন বিধায়ক (কংগ্রেসের প্রার্থীরূপে) ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৬ সালে ভারতের সংবিধান সভায় (The Constituent Assembly) প্রবেশের সময় ড. বি. আর. আম্বেদকর পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) আরোও তিনজন বিধায়কের সঙ্গে এই দুজন মালো বিধায়কের (ড. ভোলানাথ বিশ্বাস ও  হারান চন্দ্র বর্মন) সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে বাংলা বিভাজনের (১৯৪৭) পরবর্তীকালে পূর্বোক্ত সংগঠনগুলি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে।

তাই ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের মালোরা গড়ে তোলেন ‘পশ্চিমবঙ্গ মৎস্যজীবী সমিতি’। এই মৎস্যজীবী সমিতি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে প্রচারের আলোকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। 'লাঙ্গল যার জমি তার' এর আদলে এই সমিতি 'জাল যার জলা তাঁর' নীতি কার্যকর করার জন্য এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার (১৯৭৭-২০১১) প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের স্বার্থে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মৎস্যজীবীদের 'জাল যার জলা তাঁর' মর্মে দাবির প্রতি কোনও আগ্রহ দেখায়নি।

স্বাভাবিকভাবেই মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের সংগঠক ও বুদ্ধিজীবীগণ বামফ্রন্ট সরকারের দিকে খানিকটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মনকে সামনে রেখে গড়ে তুললেন এমবেকস্‌।

সূচনা লগ্ন থেকেই এমবেকস্‌ অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা পুনঃপ্রকাশের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে চলেছে। এই সংগঠনের মুখপত্র ‘ভাসমান’-এ অদ্বৈত মল্লবর্মণের অনেকগুলি অপ্রকাশিত কবিতা প্রকাশ করে অদ্বৈতচর্চায় নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। সুশান্ত হালদার, খগেন্দ্রনাথ হালদার, রণবীর সিংহ বর্মণ ও দ্বিগেন বর্মণের সম্পাদনায় ‘ভাসমান’ পত্রিকা অদ্বৈত মল্লবর্মণের বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি ছোটগল্প পুনঃপ্রকাশ করে অদ্বৈতচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

১৯৯৭ এর ১লা জানুয়ারি 'অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন ও সাহিত্য' বিষয়ক আলোচনা সভায় অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) ও সুধী প্রধানের (১৯১২-১৯৯৭) উজ্জ্বল উপস্থিতিতে এমবেকস্‌ অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্মৃতিরক্ষা ও তাঁর সৃষ্টির প্রচারের জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছিল। এগুলি হলো:

১. প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সমস্ত লেখা সংগ্রহ করে ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণের গ্রন্থাবলী” নামে অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রাপ্ত সমস্ত রচনার প্রকাশনা এবং তার যথাযোগ্য প্রচারের ব্যবস্থা করা।

২. অদ্বৈত মল্লবর্মণের সব উপন্যাস ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা ইংরেজী সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা।

৩. অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও তাঁর সঙ্গে সংযুক্ত বিষয়ের চর্চার জন্য ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করা। 

৪. ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত 'তিতাস একটি নদীর নাম' চলচ্চিত্রের প্রদর্শন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।

এই ঘোষণাগুলির সবগুলি বাস্তবায়িত না হলেও এমবেক্‌সের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সমূহের পুনঃপ্রকাশ সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও এমবেক্‌স মালো সমাজের দরিদ্র অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহনের জন্য 'বাসন্তী স্কলারশিপ ফান্ড' [Basanti Scholarship Fund] ও সাধারণ স্কলারশিপ ফান্ড তৈরি করেছে। এমবেক্‌স এর বর্তমান সভাপতি ও সম্পাদক (যথাক্রমে মৃণাল কান্তি বর্মণ ও কাঞ্চন বর্মণ) ও কার্যকরি সমিতির অন্যান্য সদস্যগণ তাঁদের ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

লেখক: ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ।