অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস' 



ড. রূপকুমার বর্মণ
অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস'র জার্নাল 'ভাসমান'।

অদ্বৈত-চর্চায় 'এমবেকস'র জার্নাল 'ভাসমান'।

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা সাহিত্য জগতের অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪-১৯৫১) নামের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। অবিভক্ত বঙ্গদেশের পূর্ববাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় এসে (১৯৩৪) তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি যেসমস্ত সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তার অনেকগুলিই তাঁর জীবদ্বশায় প্রকাশিত হয়নি। ভারতবর্ষ, নবশক্তি, মোহাম্মদি, দেশ ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর অনেক রচনাই কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল। তবে অদ্বৈতের বন্ধু ও অনুরাগীদের প্রচেষ্টায় তাঁর অনেক অপ্রকাশিত রচনার প্রকাশ যেমন সম্ভব হয়েছে তেমনি হারিয়ে যাওয়া অনেক গল্প ও কবিতার পুনর্মুদ্রণও ঘটেছে।

অদ্বৈতের ভাবনা ও সৃষ্টিকে দেশ-বিদেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে যেসব সংগঠন নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল কলকাতার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি’ [Adwaita Malla Barman Educational and Cultural Society (AMBECS) বা এমবেকস্‌]

১৯৯৪ সালের (১৫ই মে) অদ্বৈত মল্লবর্মণের নামের সঙ্গে যুক্ত এই সংগঠনটি স্থাপন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন মালো বুদ্ধিজীবী। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন  সুশান্ত  হালদার, রণবীর সিংহ বর্মণ,  খগেন্দ্রনাথ হালদার, অরুণ কুমার সরকার, সুবল চন্দ্র হালদার, নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, পংকজ কান্তি দাস, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ বর্মণ, প্রমুখ।

মালোদের মতো পিছিয়ে পড়া সামাজিক গোষ্ঠী রসার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থাপিত এমবেকস্‌-এর প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল ১৯৯০ এর দশকে ভারতে ‘দলিত আন্দোলন’ ও ‘দলিত প্রতর্কের’ বিকাশ। 

প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯০-এর দশকের ভারতের বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ‘দলিত প্রতর্কের’ বিকাশের পক্ষে সহায়ক হয়েছিল। প্রথমটি ছিল তাঁর জন্ম শতবর্ষে ড. বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকরকে (১৮৯১-১৯৫৬) ‘ভারতরত্ন’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া। তাঁর জীবদ্দশায়, এমনকি তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর (ড. আম্বেদকর) প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান প্রদর্শনে  অ-দলিত মননে অনীহা থাকলেও  ১৯৯০-এর দশকে সেই অনীহা সম্মতিতে রূপান্তরিত হয়। এর সঙ্গে তপশিলি জাতি থেকে ভারতের নবম উপরাষ্ট্রপতি (১৯৯২-১৯৯৭) ও দশম রাষ্ট্রপতিরূপে (১৯৯৭-২০০২) ড. কে. আর. নারায়ননের নির্বাচন দলিত প্রতর্ক বিকাশের সদর্থক পরিবেশ তৈরি করেছিল। তৃতীয়ত, মন্ডল কমিশনের সুপারিশ (১৯৭৮-৮০) মেনে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে সুপ্রীম কোর্টের স্বীকৃতি (১৯৯৩) সারা ভারতে দলিত আন্দোলনের মূল দাবি ও বক্তব্যকে উদ্দীপিত করে তোলে। একইসঙ্গে জাতপাতে বিভাজিত উত্তর প্রদেশে কুমারী মায়াবতীর নেতৃত্বে বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সরকার গঠন দলিতবাদকে আশাবাদী করে তুলেছিল।

ফলত: দলিতবাদ সম্পর্কিত রচনা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ধারা দক্ষিণ ভারতের দলিত খ্রিস্টানদের হাতে শক্তিশালী রূপ ধারন করে। দলিতদের প্রতিবাদগুলোর অপব্যাখ্যার প্রবণতাকে প্রতিহত করার জন্য সেগুলো সচেষ্ট হয়।ঁরা শব্দ চয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতে দলিতবাদ বিকাশের এরকম পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের দলিত লেখক ও চিন্তাবিদগণ অদ্বৈত মল্লবর্মণকে তাঁদের প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থার’ পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মালো বুদ্ধিজীবীদের অদম্য উৎসাহে গড়ে ওঠে এমবেকস্‌ এর মতো সংস্থা।

বাংলার মালোরা অবশ্য এর আগেও কয়েকটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ঝল্লমল্ল ক্ষত্রিয় সমিতি’ (১৯১৩) ও ‘বঙ্গীয় মল্ল ক্ষত্রিয় সমাজ উন্নয়ন সভা’ (১৯৩২)। ঝল্লমল্ল ক্ষত্রিয় সমিতির মূল কেন্দ্র ছিল পাবনাতে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ সহ পূর্ববঙ্গ/বাংলাদেশ ও আসামের সর্বত্র এর শাখা তৈরি হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় সংগঠনটি কলকাতা ও ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই দুটি সংগঠন মালোদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উপর অধিক মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছিল। এমনকি এই সংগঠন দুটির সক্রিয় সহযোগিতায় মালো সমাজের দুজন বিধায়ক (কংগ্রেসের প্রার্থীরূপে) ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৬ সালে ভারতের সংবিধান সভায় (The Constituent Assembly) প্রবেশের সময় ড. বি. আর. আম্বেদকর পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) আরোও তিনজন বিধায়কের সঙ্গে এই দুজন মালো বিধায়কের (ড. ভোলানাথ বিশ্বাস ও  হারান চন্দ্র বর্মন) সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে বাংলা বিভাজনের (১৯৪৭) পরবর্তীকালে পূর্বোক্ত সংগঠনগুলি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে।

তাই ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের মালোরা গড়ে তোলেন ‘পশ্চিমবঙ্গ মৎস্যজীবী সমিতি’। এই মৎস্যজীবী সমিতি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে প্রচারের আলোকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। 'লাঙ্গল যার জমি তার' এর আদলে এই সমিতি 'জাল যার জলা তাঁর' নীতি কার্যকর করার জন্য এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার (১৯৭৭-২০১১) প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের স্বার্থে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মৎস্যজীবীদের 'জাল যার জলা তাঁর' মর্মে দাবির প্রতি কোনও আগ্রহ দেখায়নি।

স্বাভাবিকভাবেই মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের সংগঠক ও বুদ্ধিজীবীগণ বামফ্রন্ট সরকারের দিকে খানিকটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মনকে সামনে রেখে গড়ে তুললেন এমবেকস্‌।

সূচনা লগ্ন থেকেই এমবেকস্‌ অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা পুনঃপ্রকাশের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে চলেছে। এই সংগঠনের মুখপত্র ‘ভাসমান’-এ অদ্বৈত মল্লবর্মণের অনেকগুলি অপ্রকাশিত কবিতা প্রকাশ করে অদ্বৈতচর্চায় নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। সুশান্ত হালদার, খগেন্দ্রনাথ হালদার, রণবীর সিংহ বর্মণ ও দ্বিগেন বর্মণের সম্পাদনায় ‘ভাসমান’ পত্রিকা অদ্বৈত মল্লবর্মণের বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি ছোটগল্প পুনঃপ্রকাশ করে অদ্বৈতচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

১৯৯৭ এর ১লা জানুয়ারি 'অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন ও সাহিত্য' বিষয়ক আলোচনা সভায় অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) ও সুধী প্রধানের (১৯১২-১৯৯৭) উজ্জ্বল উপস্থিতিতে এমবেকস্‌ অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্মৃতিরক্ষা ও তাঁর সৃষ্টির প্রচারের জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছিল। এগুলি হলো:

১. প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সমস্ত লেখা সংগ্রহ করে ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণের গ্রন্থাবলী” নামে অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রাপ্ত সমস্ত রচনার প্রকাশনা এবং তার যথাযোগ্য প্রচারের ব্যবস্থা করা।

২. অদ্বৈত মল্লবর্মণের সব উপন্যাস ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা ইংরেজী সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করা।

৩. অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও তাঁর সঙ্গে সংযুক্ত বিষয়ের চর্চার জন্য ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করা। 

৪. ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত 'তিতাস একটি নদীর নাম' চলচ্চিত্রের প্রদর্শন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।

এই ঘোষণাগুলির সবগুলি বাস্তবায়িত না হলেও এমবেক্‌সের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সমূহের পুনঃপ্রকাশ সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও এমবেক্‌স মালো সমাজের দরিদ্র অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহনের জন্য 'বাসন্তী স্কলারশিপ ফান্ড' [Basanti Scholarship Fund] ও সাধারণ স্কলারশিপ ফান্ড তৈরি করেছে। এমবেক্‌স এর বর্তমান সভাপতি ও সম্পাদক (যথাক্রমে মৃণাল কান্তি বর্মণ ও কাঞ্চন বর্মণ) ও কার্যকরি সমিতির অন্যান্য সদস্যগণ তাঁদের ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

লেখক: ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;