চিলারায় গড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব



ড. রূপ কুমার বর্মণ
চিলারায় গড়ে স্থাপিত চিলারায়ের মূর্তি

চিলারায় গড়ে স্থাপিত চিলারায়ের মূর্তি

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় একশ বছর পূর্বে সিন্ধু অববাহিকার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক সুপ্রাচীন সভ্যতার সন্ধান দিয়েছিল। তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর এই সভ্যতা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, ঐতিহাসিক গবেষণা ও তর্ক-​বিতর্কের ধারাবাহিকতা পাকিস্তান ও ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের পুনঃনির্মাণের সহায়ক হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার ফলে সিন্ধু, বালুচিস্তান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটে আবিষ্কৃত হয়েছে বহু প্রত্নক্ষেত্রের। পরিত্যক্ত ঢিবি ও ঝোপ-জঙ্গলে আচ্ছাদিত ধ্বংসস্তূপের খননকার্য যে প্রাচীন সভ্যতার ও সংস্কৃতির ইতিহাস নির্মাণের সহায়ক হবে, সে বিষয়ে গবেষকদের মনে সন্দেহ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সংস্থা স্থাপন, প্রত্নসমীক্ষা ও খননকার্য চালানোর সঙ্গে সঙ্গে এই দেশগুলি তাদের প্রত্নসামগ্রী ও প্রত্নক্ষেত্রগুলিকে রক্ষা করার জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম বা মানুষের অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও অদূরদর্শিতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বহু সম্ভাবনাময় প্রত্নক্ষেত্র ও ধ্বংসাবশেষের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। কোথাও কোথাও অবহেলায় পড়ে আছে বহু প্রত্নক্ষেত্র।

দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ বিশেষ করে ভুটান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত এমনই একটি অবহেলিত কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র হলো চিলারায় গড় (চিলারায় কোট বা চিলারায় দূর্গ)।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার (পূর্বতন দেশীয় রাজ্য) তুফানগঞ্জ শহর সংলগ্ন চিলারায় গড় তৈরি করেছিলেন কোচ রাজা নর নারায়ণ (১৫৪০-১৫৮১) ও কোচ সেনাপতি চিলারায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, কোচ রাজ্যের মূলস্থপতি বিশ্বসিংহ (১৫১৫-১৫৪০) তৎকালীন তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন তাকে রক্ষা করার জন্য তাঁর নিজ ভ্রাতা শিষ্যসিংহকে তাঁর রাজ্যের পশ্চিমাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলা এবং বাংলাদেশের পঞ্চগড় ও নীলফামারী) দান করেছিলেন। শিষ্যসিংহ নিয়োজিত হয়েছিলেন কোচ রাজ্যের রক্ষক বা ‘রায়কত’ হিসেবে। বিশ্বসিংহ পশ্চিম আসামের ‘চিকিনা’ অঞ্চল ছেড়ে প্রথমে হিঙ্গুলাবাসে (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলার মহাকালগুড়ি) রাজধানী স্থাপন করেন ও পরে কামতাপুরে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

বিশ্বসিংহের মতই নর নারায়ণ ও তাঁর ভ্রাতা চিলারায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের উত্তরাংশ সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কোচ রাজ্যের সীমানা বিস্তার লাভ করেছিল। উত্তরদিকে ভুটান, পূর্বে অহোম রাজ্য ও দক্ষিণে বাংলার মুঘল শক্তির দ্বারা পরিবেষ্টিত কোচ রাজ্যের সুরক্ষার জন্য নর নারায়ণ (মল্লদেব) ও চিলারায় (শুক্লধ্বজ) বেশ কয়েকটি দূর্গ তৈরি করেছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চিলাপাতার (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলার চিলাপাতার জঙ্গল) নররাজার গড় (নর নারায়ণ গড়/নলরাজার গড়) ও ফুলবাড়ির (বর্তমান তুফানগঞ্জ) চিলারায় গড়।

ভুটান ও অহোম রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করা ও উত্তর-পূর্ব ভারতে রাজ্য বিস্তারের সুরক্ষিত সামরিক দূর্গ হিসেবে চিলারায় গড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রায়ডাক নদীর সঙ্গে খালের (খোড়া) দ্বারা সরাসরি যুক্ত চিলারায় গড় কোচ নৌবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবেও গুরুত্ব অর্জন করেছিল। নদীপথে এই দূর্গ থেকে কুড়িগ্রাম, পাঙ্গা, উত্তরকূল, দক্ষিণকূল, ধুবরী ও গোয়ালপাড়ার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষিত হয়। আবার চিলারায় গড়ের পাশ দিয়েই নির্মিত হয়েছিল ‘গোহাই কমল মহাপথ’ (‘গোহাই কমল আলি’ বা বর্তমানে ভারতের ৩১এ জাতীয় সড়ক)। ফলে রাজ্যবিস্তার ও কোচ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে তৎকালীন ফুলবাড়ির চিলারায় গড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

সেনাপতি চিলারায়ের মৃত্যুর পর নর নারায়ণ ও চিলারায়-পুত্র রঘুদেব নারায়ণের মধ্যে কোচ রাজ্য বিভক্ত হয়ে গেলেও (১৫৮১) চিলারায় দূর্গ কোচবিহারের মূলকেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহারাজা প্রাণ নারায়ণের (১৬৩২-১৬৬৫) পরবর্তীকালে উত্তর দিক থেকে ভুটানের আক্রমণ, পূর্ব দিক থেকে অহোম রাজাদের প্রতিপত্তির বিস্তার ও দক্ষিণ দিক থেকে মুঘল আক্রমণের ফলে কোচ রাজ্যের সীমা সংকুচিত হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সামরিক দুর্বলতার প্রকটের সঙ্গে সঙ্গে চিলাপাতার নররাজার গড় ও ফুলবাড়ির চিলারায় গড়, উভয়ই ধ্বংস হতে থাকে। একই সঙ্গে রায়ডাক নদীর গতিপথের পরিবর্তন চিলারায় গড়ের গুরুত্ব হ্রাস করেছিলো। বিশ শতকের গোড়ায় চিলারায় গড় একটি পরিত্যক্ত ঢিবিতে পরিণত হয়।

১৯৪৭ এর ভারত বিভাজন ও ১৯৪৯ সালে কোচবিহার রাজ্যের ভারত-ভুক্তির পরবর্তীকালে চিলারায় গড় অঞ্চলে জনবিন্যাসের বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। পূর্ববাংলা থেকে আগত সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তুদের এখানে সরকারি উদ্যোগে পুর্নবাসন দেওয়া হয়েছিল। উদ্বাস্তু উপনিবেশ স্থাপনের ফলে পরিত্যক্ত গড়ের একটা অংশ ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া গড়ের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রকল্প। স্বাভাবিকভাবেই একটি বিশাল গড় আজ সংকুচিত হতে হতে একটি ছোট্ট উঁচু মাঠে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান রায়ডাক নদী থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে অবস্থিত চিলারায় গড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত জলের ধারা আজও বর্ষাকালে কানায় কানায় ভর্তি হয়ে ওঠে। বাড়িঘর তৈরি বা গড়ের বসতির রাস্তা নির্মাণের সময় মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে বিশেষ ধরনের ইট ও খোদাই-করা পাথর। ‘পদ্মছাপ’ যুক্ত বিশেষ ধরনের ইট ও গড় নির্মাণে ব্যবহৃত বিশাল আকৃতির পাথরের চাঁই গড়ের আশে পাশে এখনও দেখতে পাওয়া যায়। ইতিহাস চেতনার অভাবে এই মূল্যবান প্রত্নসামগ্রীগুলো অবহেলায় ও অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে গড়ের উত্তর-পশ্চিম কোণায় স্থাপিত হয়েছে চিলারায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ মূর্তি। এই মূর্তি চিলারায়, নর নারায়ণ ও পূর্বতন কোচবিহার রাজ্য সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের জনস্মৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাই আশা করা যায় গবেষকদের অনুসন্ধিৎসা বৃদ্ধি পেলে ভুটান, বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসের নির্মাণে চিলারায় গড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকৃতি পাবে।

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ক্ষেত্র সমীক্ষার ব্যয়ভার বহনের জন্য লেখক ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ (নয়াদিল্লি)’ এর কাছে ঋণী।)

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;