চিলারায় গড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব



ড. রূপ কুমার বর্মণ
চিলারায় গড়ে স্থাপিত চিলারায়ের মূর্তি

চিলারায় গড়ে স্থাপিত চিলারায়ের মূর্তি

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় একশ বছর পূর্বে সিন্ধু অববাহিকার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক সুপ্রাচীন সভ্যতার সন্ধান দিয়েছিল। তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর এই সভ্যতা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, ঐতিহাসিক গবেষণা ও তর্ক-​বিতর্কের ধারাবাহিকতা পাকিস্তান ও ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের পুনঃনির্মাণের সহায়ক হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার ফলে সিন্ধু, বালুচিস্তান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটে আবিষ্কৃত হয়েছে বহু প্রত্নক্ষেত্রের। পরিত্যক্ত ঢিবি ও ঝোপ-জঙ্গলে আচ্ছাদিত ধ্বংসস্তূপের খননকার্য যে প্রাচীন সভ্যতার ও সংস্কৃতির ইতিহাস নির্মাণের সহায়ক হবে, সে বিষয়ে গবেষকদের মনে সন্দেহ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সংস্থা স্থাপন, প্রত্নসমীক্ষা ও খননকার্য চালানোর সঙ্গে সঙ্গে এই দেশগুলি তাদের প্রত্নসামগ্রী ও প্রত্নক্ষেত্রগুলিকে রক্ষা করার জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম বা মানুষের অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও অদূরদর্শিতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বহু সম্ভাবনাময় প্রত্নক্ষেত্র ও ধ্বংসাবশেষের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। কোথাও কোথাও অবহেলায় পড়ে আছে বহু প্রত্নক্ষেত্র।

দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ বিশেষ করে ভুটান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত এমনই একটি অবহেলিত কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র হলো চিলারায় গড় (চিলারায় কোট বা চিলারায় দূর্গ)।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার (পূর্বতন দেশীয় রাজ্য) তুফানগঞ্জ শহর সংলগ্ন চিলারায় গড় তৈরি করেছিলেন কোচ রাজা নর নারায়ণ (১৫৪০-১৫৮১) ও কোচ সেনাপতি চিলারায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, কোচ রাজ্যের মূলস্থপতি বিশ্বসিংহ (১৫১৫-১৫৪০) তৎকালীন তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন তাকে রক্ষা করার জন্য তাঁর নিজ ভ্রাতা শিষ্যসিংহকে তাঁর রাজ্যের পশ্চিমাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলা এবং বাংলাদেশের পঞ্চগড় ও নীলফামারী) দান করেছিলেন। শিষ্যসিংহ নিয়োজিত হয়েছিলেন কোচ রাজ্যের রক্ষক বা ‘রায়কত’ হিসেবে। বিশ্বসিংহ পশ্চিম আসামের ‘চিকিনা’ অঞ্চল ছেড়ে প্রথমে হিঙ্গুলাবাসে (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলার মহাকালগুড়ি) রাজধানী স্থাপন করেন ও পরে কামতাপুরে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

বিশ্বসিংহের মতই নর নারায়ণ ও তাঁর ভ্রাতা চিলারায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের উত্তরাংশ সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কোচ রাজ্যের সীমানা বিস্তার লাভ করেছিল। উত্তরদিকে ভুটান, পূর্বে অহোম রাজ্য ও দক্ষিণে বাংলার মুঘল শক্তির দ্বারা পরিবেষ্টিত কোচ রাজ্যের সুরক্ষার জন্য নর নারায়ণ (মল্লদেব) ও চিলারায় (শুক্লধ্বজ) বেশ কয়েকটি দূর্গ তৈরি করেছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চিলাপাতার (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলার চিলাপাতার জঙ্গল) নররাজার গড় (নর নারায়ণ গড়/নলরাজার গড়) ও ফুলবাড়ির (বর্তমান তুফানগঞ্জ) চিলারায় গড়।

ভুটান ও অহোম রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করা ও উত্তর-পূর্ব ভারতে রাজ্য বিস্তারের সুরক্ষিত সামরিক দূর্গ হিসেবে চিলারায় গড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রায়ডাক নদীর সঙ্গে খালের (খোড়া) দ্বারা সরাসরি যুক্ত চিলারায় গড় কোচ নৌবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবেও গুরুত্ব অর্জন করেছিল। নদীপথে এই দূর্গ থেকে কুড়িগ্রাম, পাঙ্গা, উত্তরকূল, দক্ষিণকূল, ধুবরী ও গোয়ালপাড়ার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষিত হয়। আবার চিলারায় গড়ের পাশ দিয়েই নির্মিত হয়েছিল ‘গোহাই কমল মহাপথ’ (‘গোহাই কমল আলি’ বা বর্তমানে ভারতের ৩১এ জাতীয় সড়ক)। ফলে রাজ্যবিস্তার ও কোচ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে তৎকালীন ফুলবাড়ির চিলারায় গড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

সেনাপতি চিলারায়ের মৃত্যুর পর নর নারায়ণ ও চিলারায়-পুত্র রঘুদেব নারায়ণের মধ্যে কোচ রাজ্য বিভক্ত হয়ে গেলেও (১৫৮১) চিলারায় দূর্গ কোচবিহারের মূলকেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহারাজা প্রাণ নারায়ণের (১৬৩২-১৬৬৫) পরবর্তীকালে উত্তর দিক থেকে ভুটানের আক্রমণ, পূর্ব দিক থেকে অহোম রাজাদের প্রতিপত্তির বিস্তার ও দক্ষিণ দিক থেকে মুঘল আক্রমণের ফলে কোচ রাজ্যের সীমা সংকুচিত হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সামরিক দুর্বলতার প্রকটের সঙ্গে সঙ্গে চিলাপাতার নররাজার গড় ও ফুলবাড়ির চিলারায় গড়, উভয়ই ধ্বংস হতে থাকে। একই সঙ্গে রায়ডাক নদীর গতিপথের পরিবর্তন চিলারায় গড়ের গুরুত্ব হ্রাস করেছিলো। বিশ শতকের গোড়ায় চিলারায় গড় একটি পরিত্যক্ত ঢিবিতে পরিণত হয়।

১৯৪৭ এর ভারত বিভাজন ও ১৯৪৯ সালে কোচবিহার রাজ্যের ভারত-ভুক্তির পরবর্তীকালে চিলারায় গড় অঞ্চলে জনবিন্যাসের বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। পূর্ববাংলা থেকে আগত সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তুদের এখানে সরকারি উদ্যোগে পুর্নবাসন দেওয়া হয়েছিল। উদ্বাস্তু উপনিবেশ স্থাপনের ফলে পরিত্যক্ত গড়ের একটা অংশ ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া গড়ের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রকল্প। স্বাভাবিকভাবেই একটি বিশাল গড় আজ সংকুচিত হতে হতে একটি ছোট্ট উঁচু মাঠে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান রায়ডাক নদী থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে অবস্থিত চিলারায় গড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত জলের ধারা আজও বর্ষাকালে কানায় কানায় ভর্তি হয়ে ওঠে। বাড়িঘর তৈরি বা গড়ের বসতির রাস্তা নির্মাণের সময় মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে বিশেষ ধরনের ইট ও খোদাই-করা পাথর। ‘পদ্মছাপ’ যুক্ত বিশেষ ধরনের ইট ও গড় নির্মাণে ব্যবহৃত বিশাল আকৃতির পাথরের চাঁই গড়ের আশে পাশে এখনও দেখতে পাওয়া যায়। ইতিহাস চেতনার অভাবে এই মূল্যবান প্রত্নসামগ্রীগুলো অবহেলায় ও অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে গড়ের উত্তর-পশ্চিম কোণায় স্থাপিত হয়েছে চিলারায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ মূর্তি। এই মূর্তি চিলারায়, নর নারায়ণ ও পূর্বতন কোচবিহার রাজ্য সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের জনস্মৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাই আশা করা যায় গবেষকদের অনুসন্ধিৎসা বৃদ্ধি পেলে ভুটান, বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসের নির্মাণে চিলারায় গড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকৃতি পাবে।

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ক্ষেত্র সমীক্ষার ব্যয়ভার বহনের জন্য লেখক ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ (নয়াদিল্লি)’ এর কাছে ঋণী।)

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;