মৃত্যুনীল নদের আখ্যান, পর্ব- ১



তাশরিক-ই-হাবিব (অনূদিত)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রেনিসেব নীল নদের ওপারে তাকিয়ে ছিল।

খানিকটা দূরে অস্পষ্ট থেকে ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠা তার  দুই ভাই ইয়ামোস ও সোবেকের কথা সে শুনতে পাচ্ছিল। খেতের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় বাঁধ আরো শক্ত করা দরকার কি না সে ব্যাপারে তারা কথা বলছিল। বরাবরের মতো এখনও সোবেকের কণ্ঠস্বর ছিল গনগনে ও আত্মবিশ্বাসী।  সে সবসময় সহজে অথচ জোরালোভাবে নিজের মতামত প্রকাশে অভ্যস্ত ছিল। ইয়ামোসের কণ্ঠস্বর নিচু ধরনের ও দোদুল্যমান শোনাচ্ছিল, যাতে সন্দেহ ও উদ্বেগ প্রবল হয়ে উঠেছিল। তার চরিত্রে সবসময়ই এক ধরনের উৎকণ্ঠা বা অস্থিরতার আভাস পাওয়া যেত। সে ছিল পরিবারের বড় ছেলে এবং বাবার অনুপস্থিতিতে উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোর মালিকানাধীনগুলোতে কৃষি জমিগুলো তদারকির ক্ষমতা তার আয়ত্তে থাকত। ইয়ামোস ছিল ধীরস্থির, বিচক্ষণ এবং কোনো কাজের ব্যাপারে বাধা না থাকলেও তা খুঁজে দেখা তার স্বভাবে ছিল। সে ছিল ভারিক্কি গড়নের ধীরগতির মানুষ, যার কিছুই সোবেকের সুদর্শন চেহারা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিলত না।

রেনিসেব বেশ মনে করতে পারে যে ছোটবেলা থেকেই সে তার বড় ভাইদের এ ধরনের তর্ক করতে শুনত। এ স্মৃতি হুট করেই তার মনে একধরনের নিরাপত্তা জাগিয়ে তুলত- সে নিজের বাড়িতে আবার এসেছে। হ্যা, সে বাড়িতে এসেছে...

যদিও সে আরেকবার শীর্ণ ঝলমলে নীল নদের দিকে তাকিয়েছিল, তার বিদ্রোহ ও বেদনা আবারও বেড়েছিল। কেয়, তার তরুণ সুদর্শন স্বামী মারা গিয়েছিল ...  হাসিভরা মুখ ও বলিষ্ঠ কাঁধজোড়ার অধিকারী কেয়ের ছবি রেনিসেবের মনে ভাসছিল। সে মৃতের রাজ্যে দেবতা অসিরিসের কাছে চলে গিয়েছিল। আর সে, কেয়ের প্রিয় ও ভালোবাসার স্ত্রী রেনিসেব একাই রয়ে গিয়েছিল। তারা আট বছর সংসার করেছে- যখন রেনিসেব কেয়ের কাছে যায় বিয়ের পর, সে প্রায় বাচ্চা মেয়ে- আর এখন সে বিধবা হয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছে কেয়ের বাচ্চা টেটিকে নিয়ে।

এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন এ জায়গা ছেড়ে কখনো কোথাও যায়নি...

সে সেই ভাবনায় মগ্ন হয়েছিল...

সে ঐ আট বছরের কথা ভুলে যাবে- যা অচিন্তনীয় সুখ আর প্রবল বেদনা ও ক্ষতিতে মোড়ানো।

হ্যা, ভুলে যাবে, তার মনে এসব ভাবনা আর জায়গা পাবে না।  সে আবার হয়ে সমাধিসৌধের পুরোহিত ইমহোটেপের চিন্তামুক্ত, নির্মল মেয়ে। স্বামী ও ভাইয়ের ভালোবাসা আসলে নির্দয়তার ব্যাপার, মধুরতার আড়ালে যা তাকে শুধু প্রতারিতই করেছে। তার মনে পড়ে তামাটে রঙের বলিষ্ঠ কাঁধজোড়ার অধিকারী হাসিমাখা মুখের সেই মানুষটিকে- মাদুলি বেঁধে সুরক্ষিত করে, ব্যান্ডেজে মুড়ে যাকে কবর দেয়া হয়েছে অন্য এক ভুবনে যাত্রার জন্য। কেয় আর এ জগতে নেই- নীলনদে নৌকা চালাতে এবং মাছ ধরতে এবং  রোদের মধ্যে হাসতে, যখন রেনিসেব  নৌকার ভেতর ছোট টেটিকে নিজের কোলের ভাঁজে জড়িয়ে সামনের দিকে বসাত আর তার দিকে পেছনে ফিরে হাসত ...

রেনিসেব ভাবছিল:

আমি এসব নিয়ে আর চিন্তা করব না। আমি বাড়িতে এসেছি। সবকিছু আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। এখন আমাকেও আগের মতোই হতে হবে। সব আবার আগের মতো হবে। টেটি ইতোমধ্যে সেসব ভুলেও গেছে। সে এখানকার অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে হাসছে, খেলছে।

রেনিসেব  হঠাৎ করে ঘুরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল,  তখন বোঝা বহনকারী কয়েকটি গাধাকে নদীতীরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে শস্যক্ষেত ও সংলগ্ন বাড়িঘর পেরিয়ে প্রবেশপথ দিয়ে উঠোনে চলে এল। উঠোনটি ছিল বেশ আরামদায়ক। সেখানে কৃত্রিম লেক ছিল, যার চারপাশ করবী ও জুঁই ফুলের গাছে শোভিত আর এর পাড় সারি সারি ডুমুরগাছের ছায়ায় ঢাকা ছিল। টেটি ও অন্য বাচ্চারা সেখানে খেলছিল, তাদের গলার আওয়াজ বেশ জোরে স্পষ্টভাবে তার কানে এল। লেকের একদিকে আলাদা সীমানাচিহ্নিত  ছোট একটি জায়গা ছিল। বাচ্চারা এর ভেতরে-বাইরে বারবার আসা-যাওয়া করছিল। রেনিসেব খেয়াল করেছিল যে টেটি কাঠের একটি সিংহ নিয়ে খেলছিল, যেটির মুখ দড়ি দিয়ে টানলে খোলে ও বন্ধ হয়। এটি এমন একটি খেলনা, যেটি সে ছোটবেলায় ভালোবাসত।  সে আবারো নিশ্চিন্তমনে ভাবল “আমি বাড়িতে এসেছি ...” এখানকার কিছুই বদলায়নি; আগে যেমন ছিল সব এখনো তেমনই আছে। এখানে জীবন নিরাপদ, আগের মতোই প্রাণবস্ত। টেটি এখন বাচ্চা এবং সে  এ বাড়ির অন্য মায়েদের একজন যারা ঘরের দেয়ালের ঘেরাটোপে বন্দী, কিন্তু  সবটা মিলে এ জায়গাটি আগের মতোই রয়ে গেছে।

একটি বাচ্চা যে বলটি নিয়ে খেলছিল, সেটি তার পায়ের কাছে গড়িয়ে এল। রেনিসেব সেটি তুলে নিয়ে হাসিমুখে তার দিকে ছুঁড়ে দিল।

রেনিসেব উজ্জ্বল রঙা থামঘেরা বারান্দা দিয়ে ঢুকে বাড়ির ভেতরে যায় ঠিক মাঝের বিশাল ঘরটি পেরিয়ে, যেটির দেয়ালজোড়া পর্দাগুলো পদ্মফুল ও পপি ফুলের সাজে শোভিত ছিল। এটি পেরিয়ে তবেই বাড়ির অন্দরমহল।

ক্রমে জোরালো হতে থাকা কণ্ঠস্বরগুলো তার কানে ধাক্কা খাচ্ছিল আর তাই সে আবার থেমে গিয়েছিল, আনন্দের আভাস সেসব গলার স্বরে যেন মিশে গিয়েছিল। সাতিপি ও কাইট বরাবরের মতোই তর্ক করছিল। সাতিপির চড়া ও কর্কশ ধরনের হুমকিদায়ক গলা কি কখনো ভোলা যায়! সাতিপি রেনিসেবের বড়ভাই ইয়ামোসের স্ত্রী, লম্বা ও বলশালী, উচ্চকণ্ঠের মহিলা, যার চেহারায় কমনীয়তা প্রায় ছিলই না আর যে আদেশ দিতেই বরাবর অভ্যস্ত! সে প্রচলিত নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাগুলি দেখাতে ওস্তাদ ছিল, চাকরবাকরদের নাস্তানাবুদ করত, সবকিছুতেই দোষ খুঁজত, কড়া মেজাজ আর হুমকি ধামকির পাশাপাশি জাঁকালো ব্যক্তিত্ব ফলিয়ে অসম্ভবকেও সে সম্ভব করে তুলত। সবাই তার খরজিভকে ভয় পেত বিধায় তার আদেশ দৌড়ে পালন করত। ইয়ামোসের যদিও তার দৃঢ়চেতা ও জেদি স্বভাবের স্ত্রীর প্রতি ভালোলাগা ছিলই, তবু সে স্ত্রীর গালাগাল শুনতে এতটাই প্রস্তুত ছিল, যা রেনিসেবকেও  প্রায়ই ক্ষিপ্ত করত।

সাতিপির উচ্চকণ্ঠে বলে চলা বাক্যবাণের বিরতি ঘটলে শুধু তবেই কাইটের বাধাপ্রাপ্ত শান্ত গলা শোনা যেত। সুদর্শন সোবেকের স্ত্রী কাইট দেখতে চওড়া গড়নের সাদাসিধা ধরনের মহিলা ছিল। নিজের ছেলেমেয়েকে নিয়েই যেন তার দিনদুনিয়া গুজরান হতো, অন্য কোনো বিষয়ে বা আলাপে তার আগ্রহ কখনো প্রকাশিত হত না। কাইট জা সাতিপির সঙ্গে নিত্যদিনের তর্কে বেশ সহজেই  বুঝিয়ে দিত সে কোন দিকটির প্রতি গুরুত্ব দিতে চাইছে। সে তার আচরণে ভালোবাসা বা ঘৃণা কোনোটাই প্রকাশ করত না, নিজেকে ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে মাথা ঘামাতো না।  সোবেকের সঙ্গে তার স্ত্রীর বোঝাপড়া নিবিড় ছিল এবং সে তার যাবতীয় বিষয়াদি নিয়েই কাইটের সঙ্গে অনায়াসে আলাপ করত। সে বুঝতে পারত যে তার স্ত্রী আলাপের জন্য প্রস্তুত, তাদের বোঝাপড়ায় সম্মতি ও মতবিরোধ দুটোই ছিল এবং তাতে তাদের কোনো অসুবিধা হত না। কেননা কাইটের  মনে ছেলেমেয়েদের ভালোমন্দ ও তাদের দেখাশোনার ব্যাপারে একধরনের উৎকণ্ঠা সবসময়ই বিরাজ করত।

“এটা একধরনের জুলুম, আমাকে তা বলতেই হবে,” সাতিপি খেঁকিয়ে ওঠে। “যদি ইয়ামোসের একটি ইঁদুরের সাহসও থাকে, সে তা এক মুহূর্তের জন্য বরদাস্ত করবে না! কে এখন এ বাড়ির কর্তা, ইমহোটেপের অনুপস্থিতিতে? ইয়ামোস! কাজেই ইয়ামোসের স্ত্রী হিসেবে ভালো মাদুর ও বালিশগুলো বেছে নেয়ার প্রথম সুযোগ আমারই প্রাপ্য! ঐ জলহস্তীমুখো কালো চাকরটাকে অবশ্যই আমি দেখে নেবো ...”

কাইটের ভারী, উদ্বিগ্ন গলা শোনা যায়:

“না, না, আমার সোনামাণিক, তোমার পুতুলের চুলগুলো খেয়ো না। দেখো, এখানে এর চেয়েও ভালো কিছু আছে - একটি মিষ্টি- বাহ, কত মজা ...”

“দেখ কাইট, তোমার দেখছি ভদ্রতা বলে কিছুই জানা নেই; এমনকি আমি কি বলছি তাও তুমি কানে তুলছো না - জবাবে কিছু বলছো না - তোমার ব্যবহার আসলেই অসভ্যদের মতো।”

“ঐ নীল বালিশটা সবসময় আমারই ছিল ... আহা, ছোট আঙ্কের দিকে দেখো, সে হাঁটতে চেষ্টা করছে ...”

“তুমি তোমার বাচ্চাদের মতোই নির্বোধ, কাইট। এবং সেটা একটা ভালো ব্যাপার! কিন্তু তুমি সেটি চাইলেই পাবে না। এটা আমারই হবে, তোমাকে স্পষ্ট বলছি।”

 রেনিসেব কারো পায়ের মৃদু আওয়াজ তার পেছনে শুনতে পায়। সে চটজলদি ঘুরেই পেছনে বাড়ির পুরনো পরিচারিকা হেনেটকে দেখে বিরক্ত হয়। হেনেটের পাতলা গড়নের মুখে বরাবরের মতো অর্ধহাসির ভঙ্গিটি লেপ্টে ছিল।

”কিছুই তেমন বদলায়নি, তুমি নিশ্চয়ই এমন কিছু ভাবছ, রেনিসেব, সে বলল। “আমরা কীভাবে যে সাতিপির ঐ হেঁড়ে গলা সহ্য করি,  জানি না! কাইট অবশ্যই পরে এর জবাব দিতে পারে। আমরা কেউই তেমন ভাগ্যবান নই। আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে জানি, তোমার বাবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই, এ বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের পাশাপাশি খাওয়া পড়ার বন্দোবস্ত করার জন্য। আহ! তোমার বাবা সত্যিই একজন ভালো মানুষ। এবং আমিও সেজন্য যা করা উচিত, সাধ্যমতো তা করতে চেষ্টা করি। আমি সবসময় কাজেই ব্যস্ত থাকি - কখনো এখানে, কখনো ওখানে - এর বিনিময়ে আমি কখনো ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করি না। তোমার স্নেহময়ী মা আজ বেঁচে থাকলে ব্যাপারটা অন্যরকম হত। তিনি আমার প্রশংসা করতেন। যেন বোনের মতোই আপন ছিলাম আমরা! তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি এবং তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেছি ‘বাচ্চাদের দেখে রেখো, হেনেট ’, মৃত্যুকালে তিনি বলেছিলেন। আর আমিও তাকে যে কথা দিয়েছিলাম, তা এখনও পালন করে চলেছি, তোমাদের সবার দেখাশোনার জন্যই, এবং বিনিময়ে ধন্যবাদটুকুও চাইনি। সেজন্য প্রশ্নও তুলিনি এমনকি তা পাইওনি! আমি শুধু সবাইকে সাহায্য করতেই চেয়েছি আর তা-ই যথেষ্ট ছিল। সে রেনিসেবের বগলের নিচ দিয়ে প্রায় পিছলেই যেন ভেতরের কামরায় ঢুকে পড়ে।

“ঐ বালিশগুলো সম্পর্কে, আমাকে কিছু বলতেই হবে সাতিপি কিছু মনে করো না। আমি শুনেছিলাম সোবেক বলছিল-” রেনিসেব সরে যায় সেখান থেকে। হেনেটের প্রতি তার পুরনো বিরক্তি আবার মাথা চাড়া দিচ্ছিল। এটা খুবই পরিতাপের ব্যাপার যে বাড়ির সবাই হেনেটকে অপছন্দ করে। ঘ্যানঘ্যানে গলায় নিজের অনর্গল প্রশংসা এবং একের কথা অন্যকে লাগিয়ে তাদের মধ্যে বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে সে কদর্য পরিতৃপ্তি পেত।

“যা হোক, ভালোই,” রেনিসেব ভাবছিল, “কেন নয়?” এটাই সে ভেবেছিল, এভাবেই হেনেট মজা পেতে চায়! তার জন্য জীবন তবে উপভোগ্য - এটা ঠিক যে সে যেন সব কাজ থেকে ছিটকে পড়েছিল আর এবং কেউই তার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল না। তুমি কখনোই হেনেটের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারো না- রেনিসেব নিজের বিবেচনার প্রতি নিবিড় মনোযোগ সহকারে এটাই ভাবছিল যে এর ফলে তার মনে উদারতা অনুভূত হচ্ছিল। সে ভাবছিল, হেনেট হচ্ছে সেসব মানুষের একজন যাদের নিয়তিই নির্দিষ্ট থাকে অন্যদের প্রতি সমর্পণে এবং তাদের প্রতি কেউ নিবেদিত নয়। সে দেখতে কুশ্রী ও স্বভাবে নির্বোধ ধরনের হলেও বেশ ভালোই জানত যে বাড়িতে কখন কী ঘটে চলেছে। নিঃশব্দে তার পা ফেলে হাঁটা, তার অতি খাড়া কানজোড়া এবং দ্রুত ঘুরিয়ে ফেলা চোখজোড়া মিলেমিশে এমন অবস্থা সৃষ্টি করত যে  কেউই তার কাছ থেকে বেশিক্ষণ কোনো কিছু আড়াল করতে পারত না।

কখনো বা সে নিজের এই পটুতায় নিজেই অভিভূত হত -অন্য সময়ে সে একজন থেকে দ্রুত আরেকজনের কাছে গিয়ে ফিসফিস করত এবং আনন্দের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তার লাগানো কথার ফল খুঁটিয়ে পরখ করত।

বাড়ির লোকজন বারবার ইমহোটেপের কাছে গিয়ে হেনেটকে বাড়িছাড়া করার অনুনয় জানালেও সে এসব ব্যাপারে কখনো কর্ণপাত করত না। বাড়িতে সেই ছিল একমাত্র ব্যক্তি, যে হেনেটকে পছন্দ করত। ইমহোটেপের পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিদান হেনেট এতটা বিশ্বস্তভাবে পরিশোধ করত যে পরিবারটির অন্য সকলের কাছে তা সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছিল।

রেনিসেব সেখানে অনিশ্চিতভাবে অল্পক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, তার ভাবীদের তীব্র কোলাহল তার কানে বাজছিল, যা হেনেটের দৌরাত্ম্যে আগুনের মতো গনগনে আঁচ ছড়াচ্ছিল। কাজেই রেনিসেব সেই জায়গা ছেড়ে তার দাদীমা এশার ছোট কামরায় ধীর পায়ে হাজির হয়েছিল। সেখানে এশার পাশে অল্পবয়সী কালো দুটি দাসীও ছিল। তারা তাকে লিনেনের জামাকাপড় দেখাচ্ছিল আর সে সেগুলো দেখে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাদেরকে মৃদু বকাঝকা করছিল।

হ্যা, এসবই আগের মতো আছে। রেনিসেব সবই দেখছিল, শুনছিল। বৃদ্ধা এশা খানিকটা বুড়িয়ে গিয়েছিল, এটুকুই তার কাছে নতুন মনে হয়েছিল। কিন্তু এশার কণ্ঠস্বর এবং কথা বলার ভঙ্গি আগের মতোই রয়েছে, একের পর এক ঠিক সেভাবেই, যেভাবে আট বছর আগে এ বাড়ি ছেড়ে রেনিসেব চলে যাবার আগেও এশা বলত...

রেনিসেব সেখান থেকেও সরে এল। বৃদ্ধা দাদী বা দাসী দুটি তাকে খেয়াল করেনি। অল্প সময় নিয়ে সে রান্নাঘরের খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সেখানে হাঁস ঝলসানোর ঘ্রাণ, হরদম আলাপ, হাসাহাসি, বকাঝকা-টিপ্পনির আমেজ যথারীতি ছিল, সবজি রান্না করার প্রস্তুতিও যথারীতি চলছিল।

রেনিসেব চোখজোড়া অর্ধেক বন্ধ রেখে সেখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এখান থেকে সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল বাড়ির কোথায় কী হচ্ছে! রান্নাঘরের হট্টগোল, বৃদ্ধা এশার তীক্ষ্ম গলা, সাতিপির বাঁজখাই কণ্ঠ এবং কাইটের অস্পষ্ট ও মৃদুস্বরের পাল্টা জবাব। সবকিছু মিলে যেন নারীকণ্ঠের অদ্ভুত জগাখিচুড়ি - আলাপ, হাসিঠাট্টা, অভিযোগ, বকাঝকা, উল্লাসে ফেটে পড়া...

এবং হঠাৎ করেই রেনিসেবের এ পরিবেশটা যেন গুমোট লাগছিল, চারপাশটা যেন নারীদের খবরদারিতে বড্ড আঁটোসাঁটো। নারীরা স্বভাবে বরাবর কোলাহলমুখরা! তারা অন্তঃপুরের বাসিন্দা - কখনোই শান্ত ও স্থির নয়, সর্বদাই বকবক করছে, উচ্চকণ্ঠে চেঁচাচ্ছে, - অন্য কিছুই যেন তাদের করার নেই!

এবং কেয় নৌকায় বসা অবস্থায় মাছের দিকে নীরবে লক্ষ্য রাখছিল হাতে বর্শা ধরে...

এই অবিচ্ছিন্ন হট্টগোলের লেশমাত্র সেই স্মৃতিতে ছিল না।

রেনিসেব দ্রুত বাড়ির বাইরে আবার চলে গেল, যদিও সেখানে ছিল স্পষ্ট নীরবতা। সে ফসলের মাঠ থেকে সোবেককে ফিরতে দেখে। ইয়ামোসকে দূর থেকে সমাধিসৌধের দিকে যেতে দেখা গেল।

সে ঘুরে দাঁড়িয়ে চুনাপাথরের টিলাসংলগ্ন পথটি ধরে এগিয়ে যায় সমাধিসৌধের দিকে। এটি ছিল মহান মেরিপাথার সমাধি, যেটি দেখাশোনার ভার ছিল তার বাবা ইমহোটেপের। সমাধিসৌধটি দেখাশোনার জন্য যা অনুগ্রহপূর্বক দান করা হয়েছে, সবই এ জমিদারি ও কৃষি জমির অংশ। ইমহোটেপ কোথাও গেলে সমাধিসৌধ দেখাশোনার ভার ইয়ামোসের ওপর বর্তায়।

যখন রেনিসেব ধীরে ধীরে খাড়া পথ বেয়ে ওপরের দিকে উঠছিল, ইয়ামোসের সঙ্গে হোরিকে পরামর্শ করতে দেখা গেল। হোরি হলো তার বাবার ব্যবসায়িক বন্দোবস্তের হিসাবরক্ষক। সমাধিসৌধ সংলগ্ন যে গুহায় উপহার নিবেদন করা হয়, তার পাশের ছোট একটি পাথুরে গুহায় তারা বসেছিল।

হোরির হাঁটুর ওপর একটি প্যাপিরাস বিছানো ছিল এবং দুজনেই এটির ওপর ঝুঁকে ছিল।

দুজনই রেনিসেবকে সেখানে দেখে মৃদু হাসল।  সে তাদের পাশেই ছায়ায় বসল। রেনিসেব বরাবর ইয়ামোসের ভক্ত। ইয়ামোস স্বভাবে শান্ত, রেনিসেবের প্রতি মমতা তার মনে প্রবল। হোরিও ছোট রেনিসেবকে আপনজনের মতো দয়ালুভাবে দেখত, কখনো বা তাকে খেলনা বানিয়ে দিত।  কিশোরী বয়সে যখন সংবেদনশীল ও লম্বা আঙুলের অধিকারী  রেনিসেব বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে গেল বিয়ের পর, হোরি তখন ধীরস্থির এক যুবক। রেনিসেব এতদিন পর তাকে এখানে দেখে ভাবছিল, যদিও হোরির বয়স বেড়েছে, তবু সে দেখতে প্রায় আগের মতোই আছে। যে স্মিত হাসিটি সে রেনিসেবকে উপহার দিল, তাও তার স্মৃতিতে আগের মতোই মনে হয়েছিল।

ইয়ামোসে ও হোরি নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল:

“ছোট ভাই আইপির সঙ্গে তিয়াত্তর বস্তা বার্লি ...”

“তাহলে মোট দুইশত ত্রিশ বস্তাা আর এর মধ্যে একশ বিশ হলো বার্লি।”

“হ্যা, কিন্তু এখানের কাঠের দাম রয়েছে, এবং তেলের বিনিময়ে ফসল পরিশোধ করা হয়েছে ...

তাদের আলাপ চলছিল। রেনিসেব তন্দ্র্াচ্ছন্নভাবে সেখানে বসে থাকলেও তাদের অস্পষ্ট আলাপ তার কানে আসছিল। একটু পর ইয়ামোস প্যাপিরাসের টুকরোটি গোলাকারভাবে মুড়িয়ে হোরির হাতে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

রেনিসেব নীরবতাকে সঙ্গী করে সেখানে বসে রইল।

এবার সে গোলাকারভাবে মোড়ানো একটি প্যাপিরাস হাতে নিয়ে জানতে চাইল, “এটা কি আমার বাবা পাঠিয়েছে?”

হোরি মাথা ঝাঁকায়।

“কী লেখা আছে এতে?” সে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।

রেনিসেব প্যাপিরাসটি মেলে ধরে এবং এতে দাগানো চিহ্নগুলো তার নিষ্পন্দ চোখজোড়ায় অর্থহীন মনে হয়।

মৃদু হেসে হোরি তার কাঁধ ঝুঁকিয়ে প্যাপিরাসের লেখায় আঙুল ছুঁয়ে তা পড়তে থাকে। এ চিঠিটি পেশাদার চিঠি লেখক হেরাক্লোপোলিশের চিঠি লেখার অলংকরণ অনুসরণে বিন্যস্ত হয়েছে:

“এই জমিদারির তদারককারী, পুরোহিত ইমহোটেপ বলছি: যারা বহুকাল যাবত স্বস্তিতে বেঁচে থাকে, তোমাদের অবস্থাও তেমনই হোক। প্রভু হেরিসাফ, হেরাক্লোপোলিশের প্রভু এবং ও অন্য সব দেবতা তোমাদের মঙ্গল করুন। দেবতা পিতাহ তোমাদের হৃদয় আনন্দে ভরিয়ে দিন, যারা দীর্ঘদিন বাঁচে তাদের মতো। ছেলে তার মাকে বলছে, পুরোহিত তার মা এশাকে বলছে. তুমি কেমন আছো? নিরাপদ ও সুস্থ আছো তো? গার্হস্থ্য জীবন উপভোগ করছ তো? আমার ছেলে ইয়ামোস, তুমি জীবনের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যময় প্রাচুর্যে ভরপুর তো?  আমার জমি যথাসাধ্য কাজে লাগাবে। জমির কাছ থেকে যতটা সম্ভব কশে আদায় করো, প্রয়োজনে জমি খনন কনে কাজের ভেতর আকণ্ঠ ডুবে থাকো। যদি জানতে পারি যে তুমি কঠোর পরিশ্রমী, তবে তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হব প্রভুর কাছে।” রেনিসেব হাসে।

“বেচারা ইয়ামোস! সে কঠোর পরিশ্রম করে, তাতে আমার মোটেই সন্দেহ নেই।”

বাবার উৎসাহব্যঞ্জক প্রাণবন্ত ভাবটি যেন রেনিসেবের চোখের সামনে ভেসে ওঠে- এর পাশাপাশি ইমহোটেপের জমকালো, খানিকটা উচ্ছৃঙ্খল, অবিরাম নির্দেশনাসম্বলিত চেহারাটিও পাশেই ছিল।

হোরি উঠে দাঁড়ায়:

“আমার ছেলে আইপির দিকে খেয়াল রাখবে। আমার কানে এসেছে, সে নাকি অসন্তুষ্ট। আরো খেয়াল রাখবে, সাতিপি যেন হেনেটের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। শণ ও তেল সম্পর্কে চিঠি লিখে জানাতে ভুলবে না। আমার জমির উৎপাদিত ফসল নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করবে। আমার বিষয়াদি ভালোভাবে দেখাশোনা করবে কারণ এজন্য তোমাকেই আমি দায়ী করব। আমার জমি বানে ভাসলে তোমার ও সোবেকের কপালে শনি আছে।”

“বাবা আগের মতোই আছে” রেনিসেব সুখী গলায় বলে। “সবসময় ভাবে যে সে না থাকলে কিছুই ঠিকঠাক চলবে না।”

সে প্যাপিরাসটি গোলাকারভাবে গুছিয়ে বলতে থাকে:

“সবকিছুই আগের মতো আছে ...”

হোরি জবাব দেয় না।

সে এক টুকরো প্যাপিরাস নিয়ে লিখতে শুরু করে। রেনিসেব অলস ভঙ্গিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। সে পড়তে খুব আগ্রহী ছিল।

স্বপ্নের ঘোরে সে বলে চলেছিল:

“এটা জানা বেশ মজার মনে হয়, কীভাবে প্যাপিরাসে লিখতে হয়। কেন সবাই লিখতে শেখে না?”

“এর প্রয়োজন নেই।”

“প্রয়োজনীয় নয়, সম্ভবত, কিন্তু এটা শেখা আনন্দের হবে।”

“তোমার তাই মনে হয়, রেনিসেব কী এমন ভিন্নতা ঘটবে তোমার ক্ষেত্রে?”

 রেনিসেব অল্প সময় নিল এর জবাব দিতে। তারপর ধীরে বলল:

“তুমি যখন এ প্রশ্ন কর, এর জবাবে কী বলতে হবে আমার সত্যিই জানা নেই, হোরি”

হোরি বলে, “এখন আসলে অল্প সংখ্যক লেখককে দিয়েই একটি বড় প্রদেশের কাজ দিব্যি চলে যাচ্ছে। কিন্তু সামনে এমন দিন আসবে, যখন সারা মিশরে লেখকদের বিরাট বাহিনী থাকবে। আমরা মিশরের স্বর্ণোজ্জ্বল আমলের শুরুর দিকে আছি।”

“এটা নিশ্চয়ই ভালো ব্যাপার” রেনিসেব বলে।

হোরি ধীরে বলে, “আমি নিশ্চিত নই।”

“কেন তুমি নিশ্চিত নও?”

“কারণ রেনিসেব এটা খুব সহজ বা তেমন পরিশ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার নয় - দশ বস্তা বার্লির বা একশ গবাদি পশুর বা দশটি ক্ষেতের ফসলের হিসাব লিখে রাখা - এবং যখন এসব লেখা হবে, তখন হয়ত মনে হতে পারে যে সব তো ঠিকই আছে। কাজেই তখন হিসাব লেখকরা ও কেরানিরা যখন ঐসব জমির চাষাদের কাছে আসে এবং যারা জমিতে বার্লি বোনে এবং গবাদি পশু চড়ায়, তাদের কাছে এলে হিসাব লেখকদের মনে হতে পারে যে কৃষি জমি ও উৎপাদিত বার্লি এবং গবাদি পশু  সবই বাস্তবে আছে - এগুলো প্যাপিরাসের ওপর নিছক কালির চিহ্ন নয়। এবং যখন সব দলিল-দস্তাবেজ এবং হিসাব লেখা প্যাপিরাস নষ্ট হয়ে যাবে, হিসাব লেখকরা শঙ্কিত নাও হতে পারে এজন্য যে চাষারা জমিতে কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলায় ও কাটে, তারা বিতাড়িত হলেও মিশর দিব্যি বাঁচবে। কারণ জমি, ফসল ও গবাদি পশু থেকে যাবে।”

রেনিসেব গভীর মনোযোগ দিয়ে হোরির কথা শুনছিল। সে এবার ধীরগলায় বলে “আমি এবার বুঝতে পারছি, তুমি কি বলতে চাও। তুমি যা চোখে দেখো ও ছুঁতে পারো, সেগুলোই প্রকৃত বস্তু ... লেখার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন যে ‘আমার দুইশত চল্লিশ বস্তা বার্লি আছে’ মানে তোমার এর চেয়ে কম পরিমাণ বার্লি নেই। তার মানে একজন চাইলেই মিথ্যা লিখতে পারে।”

হোরি রেনিসেবের গুরুগম্ভীর মুখের দিকে তাকায়। সে হঠাৎই বলে ওঠে:

“তুমি আমার খেলনা সিংহটা মেরামত করে দিয়েছিলে, অনেক আগে। মনে পড়ে?”

“হ্যা, দিব্যি মনে আছে, রেনিসেব।”

“টেটি এখন ওটা দিয়ে খেলে ... সেই সিংহটাই”।

খানিক থেমে সে আবার বলে,

“কেয় যখন অসিরিসের কাছে চলে যায়, আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি আবার বাড়িতে ফিরে এসেছি এবং আমি আবার সুখী হব এবং কষ্টের সেই স্মৃতি ভুলে যাব - কারণ এখানে সবকিছুই আগের মতো আছে। কিছুই যেন বদলে যায়নি।”

“তুমি সত্যিই তাই মনে কর?”

রেনিসেব সতর্কভাবে তার দিকে তাকায়।

“তুমি কি বলতে চাও, হোরি?”

“আমার মনে হয় সবসময়ই বদল ঘটছে। আট বছর আদতে আট বছরই।

“কিছই বদলায়নি এখানে।” রেনিসেব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে।

“তাহলে পরিবর্তন তো হতেই হবে।”

রেনিসেব সতর্কভাবে বলে ওঠে

“না, না, আমি চাই সবকিছু আগের মতোই থাকুক।”

“কিন্তু তুমি নিজেই তো আগের সেই রেনিসেব আর নও, যে তার স্বামী কেয়ের কাছে চলে গিয়েছিলে।”

“হ্যা, আমি আগের মতোই আছি। আর যদি তা না-ও হয়, তবে আবার আগের মতোই হব।”

হোরি মাথা নাড়ে।

“তুমি পেছনে ফিরে যেতে পারো না, রেনিসেব। এটা অনেকটা আমার দেয়া হিসাবের মতো। যেমন - আমি একটা কিছুর অর্ধেক নিচ্ছি, এর সঙ্গে সিকিভাগ যোগ করছি, তারপর দশ ভাগের এক ভাগ এবং তারপর বিশ ভাগের চার ভাগ - এবং সবশেষে, তুমি দেখতোই পাচ্ছো, এটা পরিমাপে অন্য কিছু হবে, সবমিলিয়ে।”

“কিন্তু আমি আগের সেই রেনিসেবই।”

“কিন্তু রেনিসেব ইতোমধ্যে সময়ের ¯্রােতে ভেসে আরো নতুন কিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তাই সে সবসময়ই আরো ভিন্ন মানুষ।”

“না, না। তুমি আগের সেই হোরিই আছো।”

“তুমি তা ভাবতে পারো। কিন্তু ব্যাপারটা আদতে তা নয়।”

“হ্যা, তাই। ইয়ামোস আগের মতোই যেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তেমনি উদ্বিগ্ন। সাতিপি তাকে আগের মতোই একইভাবে গালমন্দ করছে এবং সাতিপির সঙ্গে কাইটের মাদুর বা বিছানা নিয়ে কথা কাটাকাটি আগের মতোই যথারীতি চলছে। আমি যখন ফিরে যাব, দেখব যে তারা যথারীতি হাসাহাসি করছে, যেন সবচেয়ে ভালো বন্ধু! হেনেট এখনো চুপিসারে কান পেতে অন্যের কথা শোনে এবং তার হাহাকার ও ভক্তি আগের মতোই আছে এবং আমার দাদীও তার ছোট দাসীটিকে বকাঝকা করে, লিনেনের জামাকাপড় তদারকির ব্যাপারে। এসবই আগে থেকে দেখা আর বাবা বাড়ি ফিরে এলে যথারীতি হৈচৈ হবে এবং তিনিও অভিযোগ করবেন, “তুমি এটা এখনো করোনি কেন?” এবং “তোমার এটা করা উচিত ছিল”। তখন ইয়ামোসে উদ্বিগ্ন হবে এবং সোবেক হাসবে আর গর্ব করবে এবং বাবার উস্কানিতে সে ইচড়ে পাকা হবে। তার বয়স মাত্র ষোল আর আট বছর থেকেই সে আস্কারা পেয়ে বিগড়াতে শুরু করেছে। এসব কিছুই আগের মতো যথারীতি চলছে, কিছুই বদলাবে না!” একনাগাড়ে গড়গড় করে বলা কথা সে থামায়।

হোরি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদুভাবে বলে:

“তুমি বুঝতে পারছ না, রেনিসেব। একটি শয়তান বাইরে থেকে এসে আক্রমণ করলে সারা পৃথিবী তা দেখে। কিন্তু অন্য ধরনের পচনও আছে, যা ভেতর থেকে সংক্রমণ ঘটায়, যার কোনো লক্ষণ বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এটা দিনের পর দিন অল্প অল্প করে বাড়ে, শেষ পর্যন্ত ফলটি পচে যায় -  খেলে রোগ হয়।”

রেনিসেব তার দিকে তাকায়। সে প্রায় আনমনেই বলে যায়, যেন সে রেনিসেবকে নয়, বরং বিড়বিড় করে নিজেকেই বলছিল।

রেনিসেব আর্তনাদ করে ওঠে:

“ তুমি এসব কী  বলছ, হোরি? তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ।”

“আমি নিজেই ভীত।”

“কিন্তু তুমি কী বোঝাতে চাও? কোন শয়তানের ব্যাপারে তুমি বললে?”

হোরি রেনিসেবের দিকে তাকায় এবং হঠাৎকরেই হাসে।

“বাদ দাও রেনিসেব, আমি কী বলেছি সেসব! যেসব রোগ শস্যখেতে হানা দেয়, সেগুলো নিয়েই ভাবছিলাম।”

রেনিসেব এতক্ষণে মুক্তি পায়।

“আমি আনন্দিত। আমি ভাবছিলাম - আমি জানি না আসলে কী ভাছিলাম”

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;