কবিতাই মহাদেব সাহার সুখ-দুঃখের সঙ্গী 



ইজাজ আহমেদ মিলন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাদেব সাহা। কবি, কবি এবং কবিই। কবিতার সঙ্গেই কেটে গেছে জীবনের প্রায় পুরো অংশ। কবিতায় তিনি মন্ত্রের সন্ধান করেছেন, দর্শন-আধুনিকতারও। কোথাও সমর্পণও করেছেন কোনো এক মহাশক্তির কাছে। বেদনায় ভরা একটি জীবন যাপন করেছেন মহাদেব সাহা। দুঃখ, কষ্ট যাতনা-সব আছে এর ভেতরে। কবি অকপটে স্বীকারও করেছেন সে কথা। এক সাক্ষাৎকারে মহাদেব সাহা বলেছেন ‘ভুল জীবন কাটানোর জন্যই জীবন কাটিয়ে গেলাম। দুঃখই আসলে মানুষের জীবন। আমার আর কী দুঃখ আছে! রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- দুঃখের তপস্যাই জীবন। গীতবিতানের প্রতিটি পাতাই ভেজা। দুঃখ কবিতা। মানুষের যতো দুঃখ সেই দুঃখ আমি কবিতায় লিখতে পারি নাই। মানুষ যদি সত্যিকারে নিজেকে চেনে তাহলে সে না কেঁদে থাকতে পারে না। হাসি হচ্ছে তার অহংকার।’

৫ আগস্ট কবি মহাদেব সাহার ৭৮তম জন্মবার্ষিকী। এদিন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন সিরাজগঞ্জের ধানঘড়া গ্রামে। বঙ্গবন্ধু একবার মহাদেব সাহার কণ্ঠে নিজের লেখা কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে পরম মমতায় তার কপালে চুম্বন করেছিলেন। তখন কবির বয়স মাত্র এগারো বার বছর। কবিতাটি ছিল এরকম ‘ তুমি আসিয়াছো ছায়া ঘেরা আমাদের এই গ্রামে/ পাতার তোরণ গড়েছি আমরা মুজিব তোমার নামে।’ সিরাজগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্যে ভূয়সী প্রশসংসা করেছিলেন মহাদেব সাহার। প্রত্যাশা করেছিলেন কিশোর মহাদেব একদিন অনেক বড় কবি হবে।

তারপর প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে। বিধাতা নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর সে আর্শীবাদ অপূর্ণ রাখেননি। মহাদেব সাহা কবি হয়েছেন। এবং বড় কবি। শুধু বড় কবিই নন, দেশ বরেণ্য কবি। অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর এই এতো বড় কবি হয়ে উঠার পেছনে হয়তো বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই দায়ভারটাই কাজ করেছে সবচেয়ে বেশি। তাঁর কাব্য প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’১৯৭২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়।  কাব্য সাধনায় মহাদেব সাহা জীবনের প্রায় পুরোটা অংশই বিনিয়োগ করেছেন। সফলতার শিখরে আরোহন করেছেন বহু আগেই। কবি মহাদেব সাহার কবিতা পড়ে কত পাঠকের হৃদয়ে যে প্রেম জন্মেছে, হাবুডুবু খেয়েছেন ভালোবাসার গভীর জলে। এই কবির কবিতা পড়ে নিরাশা দূরে ঠেলে দিয়ে পাঠক আশায় বুক বেধেছেন। তার কবিতায় যে ছন্দময়তা, কাব্যের যে ব্যবহার, চিন্তার গভীরতা দেখে কখনো কখনো পুলকিত হই। অবাক হই। কল্পনার জগতে এই কবিকে মুকুটহীন সম্রাট বললেও অক্ত্যুক্তি হবে না।

এদেশের মাটি, জল আর প্রকৃতি তাকে কবি হতে উৎসাহিত করেছে। রক্ত মাংস, শিরা উপশিরা, হৃদয় এবং হৃদপিন্ড থেকে উৎসারিত নানা সৌরভে ভরপুর মহাদেব সাহার সব কবিতা। তিনি প্রেমের কবি, প্রকৃতির কবি, একাকিত্বের কবি। মহাদেব সাহা ফুল,বৃক্ষ আকাশ, মেঘ, নদী, ঢেউ, ভালোবাসা, দুঃখ কষ্ট আর যাতনাকে সাবলিল ভাষায় পরম দরদ দিয়ে চমৎকার সব চিত্রকল্প ব্যবহার করে বিনিমার্ণ করেছেন একেকটি কবিতা। কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার দেখে মনে হয় তিনি চরম বাস্তবতাকে চন্দময় ভঙ্গিমায় পাঠককে উপহার দিচ্ছেন নতুন সব কবিতা। মহাদেব সাহার মতো এতো চিত্রকল্প অন্য কোন কবির কবিতায় খুব কমই পাওয়া যায়।

কাব্য বির্নিমাণে তাঁর যে দরদ আর মমতা সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন পড়ি ‘বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন, ‘আবুল হাসানের জন্য এলিজি’, ‘মানব তোমার কাছে যেতে চাই’, ‘দেশপ্রেম, ’ফিরে আসা গ্রাম’ কিংবা ‘ চিঠি দিও’, বা আজীবন একই চিঠি’, ইত্যাদি কবিতা। কবি মহাদেব সাহার কবিতায় নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য আছে। কোন কবিতার আগে বা পরে কবির নাম না উল্লেখ করলেও যদি মহাদেব সাহার কবিতা থাকে তাহলে তার পাঠকরা নিশ্চিত করে বলে দিতে পারবেন যে এটা মহাদেবের কবিতা। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে প্রেম, দ্রোহ, শান্তি , আশা আর মানবতার জয় গান গেয়েছেন তিনি। 

কবি মহাদেব সাহা বারবার আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু কখনো তাকে নিরাশা নামক ব্যাধি গ্রাস করতে পারেনি। তিনি নৈরাশ্যবাদীর দল নন। আশাবাদী দলভুক্ত কবি মহাদেব সাহা আমাদের পরিবেশ ধবংস এবং সমাজে বিভক্তের অমানবিক প্রবণতা দেখে প্রবলভাবে আঘাত প্রাপ্ত হন। মহাদেব অসম্ভব আবেগ দিয়ে শক্তিশালী দুর্বিনীত অনুভূতি উচ্চারণ করে সৃষ্টি করেন হৃদয়গ্রাহী পঙক্তিমালা। তাঁর সৃষ্টি প্রতিটি পঙক্তিই যেন দেশের জন্য, মানব জাতির জন্য এমনকি পৃথিবীর জন্য একেকটি গুরুত্বপূর্ণ বেদবাক্য। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি মহাদেব সাহা সকল ধর্ম বর্ণের মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করেছেন তাঁর কবিতায়। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন যখন মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করেছে ঠিক তখন আপাদমস্তক এই কবি তার সম্মোহনী কবিতার পঙক্তি দিয়ে কাব্য প্রেমিক পাঠককে ফিরিয়ে এনেছেন কবিতার টেবিলে। রক্তপাত, সংঘাত আর কোন রকম নিষ্ঠুরতা অসহনীয়। বিশ্ব শান্তি আর মানবতার জন্য তার কলম সব সময় রেখেছেন সচল।

নিমগ্ন চৈতন্যের কবি মহাদেব সাহা তার পুরোটা জীবন তাঁর নীতি থেকে বিন্দুমাত্রও সরে দাঁড়াননি। ইচ্ছে করলে তিনি প্রচুর বিত্ত বৈভবের মালিক হতে পারতেন। বিশাল অট্টালিকা, বিলাশবহুল গাড়ি কিংবা শহরের বুকে নিজস্ব কোন শপিংমল তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু কাব্যের ভালোবাসায় আসক্ত হয়ে এসব ত্যাগ করেছেন নির্দ্বিধায়। মহাদেব সাহা কবিতাকেই চির আরাধ্য ভেবেছেন, জেনেছেন। কবিতাই তার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। মহাদেব সাহার কবিতার প্রতিটি স্তবক থেকে যেন ভেসে আসে সুগন্ধি ফুলের সৌরভ। মাতৃভূমিতে কৃষকের ফলানো সুস্বাদু কোন ফলের রসালো স্বাদ যেন পাওয়া যায় কবিতার গভীরে অবগাহন করলে। অকারণ দূর্বোধ্য শব্দ দিয়ে বাক্য সৃষ্টি করে কবিতা লেখার পক্ষে নন তিনি। তার কবিতা সহজ সরল ভাষাশৈলিতে নির্মিত। অথচ কত হৃদয়গ্রাহী। কত ভাবাবেগ ফুটে উঠে কবিতার স্তবকে স্তবকে।

লেখক: ইজাজ আহমেদ মিলন, মোবাইল: ০১৭১৯০৮০১৯১

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;