কবি আল মুজাহিদী ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়েছেন উভয় বাংলায়



সাঈদ চৌধুরী
কবি আল মুজাহিদী

কবি আল মুজাহিদী

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা ভাষায় আমার পছন্দের লেখকদের একজন কবি আল মুজাহিদী। তিনি একজন বিশুদ্ধ লেখক ও গবেষক। শিল্প-সাহিত্যের সর্বাঙ্গ স্পর্শ করেছেন সমান দক্ষতায়। কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ। তার লেখা আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে। তিন দশকেরও অধিক কাল তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন পরে সহকারী সম্পাদক হলেন। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হয়েছেন।

দশক বিবেচনায় আল মুজাহিদী ষাটের দশকের কবি। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও কথাশিল্পী আল মাহমুদের পর কবি আল মুজাহিদী ও কবি আসাদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এই সৌভাগ্য কবি শামসুর রহমান সহ সমকালীন অনেকের হয়নি।

আল মুজাহিদী সমাজ বিকাশে সামনের কাতারের সৈনিক। কাল ও সমাজ সচেতন বিশ্ববীক্ষণের কবি। স্বভূমি, স্বদেশ এই সমতটের লোকায়িত ঐতিহ্য বন্দিশে আত্মমগ্ন তিনি। ৬০ এর দশকে ছিলেন ছাত্র রাজনীতির অন্যতম পুরোধা পুরুষ। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে রাজবন্দী হয়েছেন। সশস্ত্র এবং বুদ্ধিভিত্তিক সংগ্রাম করেছেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাজ্ঞ তাত্ত্বিক হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।

আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনা, স্বাধীনতা ও মানবিকতা আল মুজাহিদীর কবিতায় নানা ভাবে উচ্চারিত, উচ্চকিত হয়েছে। প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল এই কবির চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা স্বতন্ত্র ধারায় বহমান। বিস্ময়কর জাগরণের, আবিস্কারের, উদ্ভাবনের জন্য তিনি অগ্রসর পাঠকের হৃদয় ছুয়েছেন।

কবি আল মুজাহিদী

সমাজমনস্ক ও স্বদেশ-আত্মার মানুষ আল মুজাহিদী লেখক হিসেবে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়েছেন উভয় বাংলায়। অসম্ভব শক্তিশালি তার কল্পনার জগৎ। পৃথিবীর শুভতর, অধুনাতন বার্তা বয়ে বেড়ান তিনি। মানব সম্প্রীতির সমুজ্জ্বল সম্ভাষে স্ফুর্ত। যুদ্ধ বিরোধী, ভালোবাসা, জীবন ও মৃত্তিকা তার কবিতার মূল বিষয়। নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরে ক্রমবিবর্তন ধারায় এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছেন। কলকাতায় কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা আমি প্রগাঢ় ভাবে লক্ষ্য করেছি। এমনকি বিলেতেও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের মধ্যে তার বইয়ের কদর রয়েছে।

কবি আল মুজাহিদী সর্ব অঙ্গে কবি। তার শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের প্রাগ্রসর পাঠকের কাছে আনন্দের সংবাদ। মৃত্তিকা এবং মৃত্তিকার মর্মন্তলে চলে যান সাবধানী সন্ধানীর মতো। কবিতার পঙ্ক্তি মালা যেন তার জীবনেরই অঙ্গ। ’হেমলকের পেয়ালা’, ’ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ’দূত পারাবত’, ’মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা’, ’সমুদ্র মেখলা’, ’কালের বন্দিশে’, ’কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’, ’যুদ্ধ নাস্তি’, ’ঈভের হ্যামলেট’, ’সহস্র দিবস সহস্র রজনী’ ’যুদ্ধ বিরোধী কবিতা ও অন্যন্য’ ইত্যাদি গ্রন্থের মাধ্যমে স্পর্শ করেছেন উজ্জ্বল কাব্য রবি। ’ইস্টিশানে হুইসেল’, ’সোনার মাটি রূপোর মাটি’, ’পালকি চলে দুলকি তালে’ কিশোর কবিতার পাশাপাশি ’হালুম হুলুম’ ও ’তালপাতার সেপাই’ ছড়ার বই পাঠকমন জয় করেছে।

কবি আল মুজাহিদী

‘অন্ধকার হয়ে গেল পৃথিবীটা‘ কবিতাটি আল মুজাহিদীর সেই শক্তিশালী জ্যোতির্ময় কাব্যসত্তার প্রতিনিধিত্ব করছে। ’অন্ধকার হয়ে গেলো/ অন্ধকার হয়ে গেলো পৃথিবীটা/ এই গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেলো মানুষের মুখ/ তবুও উন্মুখ আলোকণা জন্ম নেয়- এই মৃত ভস্মাধারে।/ আগুনের ঝাঁজরা পোড়া মানুষের করোটি-রা/ পড়ে থাকে প্রদোষের নিচে/ এখনো দিগন্ত লাল/ বেলাভূমে ছায়া নামে/ ‘নিসিকি’ সী-বীচে।/ হিরোশিমা কাঁপে। কেঁপে ওঠে/ বারবার। সভ্যতাও ফ্যালে অশ্রুজল;/ নায়াগ্রার প্রপাতের/ চেয়ে, আহা! আরো বেশি অবিশ্রান্ত/ এ শোক প্রবাহি!/ তবু থেমে নেই গান-/ মানুষের পদপাতে/ প্রগতির পথের নির্মাণ;/ তুমি কি আসবে কাল?/ হেসে ক্ষণকাল?/ ভাঙবে এ অন্তরাল?/ দিনের প্রথম আলো হাতে/ দাঁড়াবে উঠোনে/ ধ্বংস্তূপ পড়ে থাক দূরে, বহুদূরে/ আলোকণা আছে আরও এই অন্তপুরে/ প্রিয় প্রকৃতিকা,/ কোথাও যেও না আর ‘অসুর-সংঘাতে’।/ আমি জানি, পৃথিবীতে/ প্রতিদিন সূর্যমুখী ফোটে/ তোমার সূর্যও আশায় আশায়/ জাগে। শুধু জেগে ওঠে। ’

‘আগুন নেভেনি, আগুন নেভেনা ‘ আল মুজাহিদীর হৃদয়স্পর্শী কালজয়ী কবিতা

‘আগুন নেভেনি, আগুন নেভেনা ‘ আল মুজাহিদীর হৃদয়স্পর্শী কালজয়ী কবিতা। ’শান্তিবাদী বললেন, ‘শান্তিই যুদ্ধ থামাতে পারে।’/ যুদ্ধংদেহী দানব বললে, ‘শান্তি নিস্ক্রিয় নিদানপত্র।’/ কবি বললেন, ‘শান্তি একটা ইমেজ।’/ তুমি বললে, ‘শান্তি একটি প্রতিমা।’/ আমরা সকলে ভাঙতে ও গড়তে পারি।/ শিশুরা বললে, ‘তোমরা আগুন নেভাও,/ আমরা ভুল করে আগুনে হাত দিতে পারি।’/ কতিপয় কাপালিক ভীষণ দ্রংষ্টাঘাত করলো/ শিশুটির কোমল শরীরে।/ ঘরে-ঘরে, ভেতর-বাইরে, পৃথিবীর প্রতিটি উনুনে/ হিরোশিমায়, ফিলিস্তিন, কসোভায় আগুন জ্বলছে। / আগুন নেভেনি ব্যাবিলনে।/ আগুন নেভেনা। / আণবিক চুল্লি জ্বলে দিনরাত / ধিকিধিকি।’

’নাগাসাকি সভ্যতার শেষকৃত্যে’ আল মুজাহিদী অসাধারণ সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন। ‘আমরা কি সূর্যকে আবার বলতে পারবো, ‘আমরা এখনও সেই নরকের জ্বলন্ত অঙ্গারে জেগে আছি।’/ মানুষের মড়ার খুলিতে ধ্বংসের আগুন/ আমাদের করোটিতে দজ্জালের খড়গ তুলে ধরা/ আমাদের হৃৎপিণ্ডে দানব বাজাচ্ছে যুদ্ধের দামামা/ তুমি কিন্তু এখনও জ্বলছো মাথার উপর আগের মতোই/ সভ্যতার শেষকৃত্যে তুমি এখনও জ্বলছো।/ প্রেয়সীর পোড়ানো শরীরে কিংবা স্তনবৃন্তে ঝরে পড়েছিলো/ তোমার শেষ রশ্মি। আমি শুধু তোমার আলোর চিহ্ন থেকে চিনে নিতে/ পেরেছিলাম আমার প্রিয়তমার আদল।

সূর্য, আমরা কি তোমাকে আবার বলতে পারবো, ‘আমরা এখনও/ সেই নরকের জ্বলন্ত অঙ্গারে জেগে আছি।’/ আমাদের নির্বাক করোটি/ আমাদের অসহায় হৃৎপিণ্ড/ আমাদের নির্বাসিত স্বাধীনতা/ পৃথিবীর ঘরে ঘরে নিসর্গের লোকালয়ে/ একেকটি মমির মতো জেগে আছে। নাগাসাকি,/তুমি আমার আত্মার ফলক চিহ্নিত সেনোটাফ/ আমাদের শোক আমাদের দুঃখ জেগে থাকে এখানেই/ শোকের মর্মরে নির্মিত এ ম্যুসলিয়াম।/ পৃথিবী, আজ দেখছি তোমার নিজের মঙ্গল চেতনায় তুমি মগ্ন/ আর আমি? প্রেয়সীর জন্য বিলাপ করছি/ আর আমার পিতৃপুরুষের ফসিলের জন্য।/ নাগাসাকি, তুমি বাংলার মৃত্তিকা থেকে কুড়িয়ে নাও/ শতাব্দীর ঝরাপাতা/ এলিজিগুচ্ছ।’

কবি আল মুজাহিদী

সাম্য ও মানবতার জয়গানে বিদ্রোহী কবি নজরুলের চেতনায় আল মুজাহিদী নতুন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। যুদ্ধ বিগ্রহের বিরুদ্ধে তিনি এবং আধুনিক বাংলা কবিতার আরেক দিকপাল শহীদ কাদরী ছিলেন বজ্রকন্ঠ। আল মুজাহিদী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রক্তঝরা সংঘাতের সহৃদয় ব্যাখ্যাদাতাও। তার কবিতা পাঠকের মানস দিগন্তে নতুন আলোর উদ্ভাস। মানবপ্রেমীদের হৃদয়ে তার এই পঙিক্তিমালা বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।

যুদ্ধ বিরোধী কবিতা প্রসঙ্গে কবি আল মুজাহিদী বলেন, হিরোশিমা নাগাসাকি এই শব্দযুগল আমার কৈশোর স্মৃতির অন্তর্গত। ষাটের দশকের ফেরারি সময় থেকেই বিশ্বযুদ্ধের বর্বরোচিত ধ্বংস ও রক্তযজ্ঞ সম্পর্কে আমি সচেতন হয়ে উঠতে থাকি। ঐ সময় রাজনৈতিক কারাবাসের মূহুর্তে ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কবিতাটি রচনা করি। কারামুক্তির পর যুদ্ধের ইমেজের ওপর আরও কবিতা লিখতে শুরু করি। এমনি করে অনেক ক'টা বছরে অনেক ক'টা কবিতা লেখা হয়ে গেলো। ঐ যে বলছিলাম, রাজনৈতিক ফেরারি সময়ে লেখাগুলো খোয়া যায়। আবারও প্রচেষ্টা করি একটি পূর্ণাঙ্গ পান্ডুলিপি তৈরি করতে। উনিশ শ’ একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী আমার টাঙ্গাইলের বাসভবন তছনছ করে দেয়।

আর পান্ডুলিপিটি আবার পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। ধ্বংস্তুপ থেকে আর কোনো কিছুই উদ্ধার করা সম্ভবপর হয়নি তখন। এ সহস্রাব্দের শুরুতেই পান্ডুলিপিটির কাজ শেষ করতে সমর্থ হই। আগেই বলেছি, হিরোশিমা নাগাসাকি আমার মানসপটভূমিতে আলোড়ন তোলে। জীবনের প্রায় প্রতি পদক্ষেপেই। বাইরের বস্তুবিশ্বের থেকে কবির জগত কি আলাদা? কখনোই নয়। চেতনা, অবচেতনা নিয়েই কবির জগত। আত্মার অনন্ত নির্দেশেই কবির জীবনযাত্রা। কবি এই পৃথিবীর ভিতরই আরেক পৃথিবী নির্মাণ করেন। নান্দনিক, সুন্দরতর, শুভতর পৃথিবীলোক। কবি সে উজ্জ্বল প্রজ্বল পটদিগন্তলোকের বাসিন্দা করতে চান পৃথিবীবাসিদেরও। প্রতিটি মানুষই যেন নিজ নিজ পৃথিবীর সৃষ্টির স্রষ্টা। আর সেই সঙ্গে এর বাসিন্দাও।

জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, এই মনের ও মহাপ্রাণনের পৃথিবীর অস্তিত্ব তাদের কাব্যের ভিতর। আমরা বাস্তব বিশ্ব ও সমাজ পরিসর থেকে বিমুখ হতে পারিনা। বস্তুপুঞ্জ ও সময়ের মুখোমুখি আমরা সকলেই নিরন্তর। পৃথিবীর অন্ধকার যেমন আচ্ছন্ন করে, পৃথিবীর আলো আভা, উজ্জ্বলতাও তেমনি উচ্চকিত করে আমাদের। দৈশিক ও বৈশ্বিক অবক্ষয়, ধ্বংস, বিনাশ আক্রান্ত করে। এ গ্রহে, এ মর্ত্যজীবনে সুন্দর ও শুভতাই তো প্রার্থিত, আকাঙ্ক্ষিত।

পৃথিবীর ঘনঘটাঘোর অন্ধকার ও অশুভ অসুরের বিরোধাভাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়- অখণ্ড, অবিভাজ্য মানবতার রক্ষা করার তাগিদে। অসমাপ্ত সুদীর্ঘ বর্বরতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হয়। দাঁড়াতেই হবে শান্তি, সভ্যতা ও প্রগতির নামে। অনিঃশেষ উজ্জ্বল মানবতা ও মানবিকতার স্পন্দন তুলতে হবে। পৃথিবীর মানুষের শিরায় শিরায়, অস্থি মজ্জায়, রক্ত মাংসে। এই অখণ্ড অনুভব থেকেই আমার এই বিনীত প্রয়াস। হিরোশিমা নাগাসাকি ধ্বংসের নৃশংসতায় এ আমার প্রতিবাদ।

সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা ও বর্বরতার বিবর কোটর থেকে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার অনুভব মাত্র এটা। এ আমার কাব্যিক অনুভূতি ও অভিব্যক্তি। পারমানবিক বোমা ফাটানোর বিরুদ্ধে অসন্তোষবহ্নি। ভিতরের কৃষ্ণাগ্নি বলা যেতে পারে। পারমাণবিক, আণবিক অনিশ্চয়তার বিপরীত মেরুতে আমরা দাঁড়াবো চিরদিন, চিরকাল। হিরোশিমার অন্ধকার নাগাসাকির অভ্রভেদী আর্তির পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো হয়না। পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীর স্থায়ী শান্তি ও অবস্থানের আকাঙ্খায় আবার প্রাণিত হবো আমরা। যুদ্ধের বর্বরতা বন্ধ করতে অটল হিমাচল হবো আমরা। আমরা মা শিশু সহোদর সহোদররা স্বপ্ন ও সান্নিধ্য অনুভব করবো। মনুষ্যত্বের অমরতার জয়গান গাইবো। একত্রে, একই কণ্ঠে।

আল মুজাহিদী একজন সফল কথাসাহিত্যিক। ’প্রপঞ্চের পাখ’ ও ’বাতাবরণ’ গল্প গ্রন্থে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন। ‘মানব বসতি’, ’সনেট’, ’আর্কিওপটেরিক্স’, ’সোনাটা স্যোনাটা ও সিলুএট’ এবং ’কালমিতি’ উপন্যাস লিখে কথা সাহিত্যের সব পথই করেছেন মসৃণ। ‘লালবাড়ির হরিণ’ আর টু’পুনের ডায়েরি’র মত কিশোর উপন্যাস নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছে। ’কালের করোটি’, ’মেরুমৈত্রী’, ’যুগান্তরের যাত্রী’, ’নৈতিকতা ও নান্দনিকতা’ প্রবন্ধ গ্রন্থের মাধ্যমে পাঠককে অনায়াসে চেতনার গভীরে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

যৌবন ও পৌরুষ শাসিত অভিজ্ঞতার কথা সমুদ্র শঙ্খের মত বেজে ওঠে আল মুজাহিদীর কাব্যে এবং গদ্য রচনার পরতে পরতে। ’নৈতিকতা ও নান্দনিকতা’ প্রবন্ধ গন্থে সেই স্বাক্ষর ভাস্বর। বাংলা গদ্য সাহিত্যে এসবই অনন্য সংযোজন।

কবি ও কথাসাহিত্যিক আল মুজাহিদী সাহিত্যের সব শাখাতেই অঘোষিত সম্রাট। সব্যসাচী লেখক হিসেবে সময়কে ধারণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে লিখেছেন। দলবাজি তার লেখায় প্রাধান্য পায়নি কখনো। ইতিহাস-নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। বরং বোধের জগতে নাড়া দিয়েছে।

কবি আল মুজাহিদী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তার দীপ্ত তারুণ্যেই। ১৯৬৯ সালের প্রাদেশিক সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে বাংলা ছাত্রলীগে রূপান্তরিত করেন। বাংলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আল মুজাহিদী আইয়ুবের কালো দশকে কারাবরণ করেন বহুবার। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

ভ্রমণপ্রিয় আল মুজাহিদী পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছেন। তিনি যুদ্ধ বিরোধী শান্তি সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। যদিও দেশভ্রমণও তার প্রিয় বিষয়। বহু ভাষায় অভিজ্ঞ আল মুজাহিদীর ব্যক্তিগত শখ বিভিন্ন ভাষা শেখা। উর্দু, ফার্সি, হিন্দি, নেপালি এসব ভাষা তিনি চর্চা করেন নিয়মিত।

কবি আল মুজাহিদী জাতীয়ভাবে বহু পুরষ্কার অর্জন করেছেন। ২০০৩ সালে একুশে পদক ও ২০১৮ সালে বাসাসপ কাব্যরত্ন পদক লাভ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন, জীবনানন্দ দাশ একাডেমী পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমী পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমী পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার, জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার।

কবি আল মুজাহিদী ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুল হালিম জামালী ও মাতা সাখিনা খান জামালী।

আল মুজাহিদী ১৯৭৩ সালের ২২ জুলাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী পলিন পারভীন। পুত্র শাবিব জামালী আল মুজাহিদী ও কন্যা মারিয়ামা জীবান আল মুজাহিদীকে নিয়ে তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন।

ছাত্র জীবনে কবি আল মুজাহিদী নারুচি ফ্রি বোর্ড প্রাইমারী স্কুলে পড়েছেন। তারপর টাংগাইল বিন্দুবাসিনী গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ও সিরাজগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাইস্কুলে। কলেজ জীবনে করটিয়া সাদৎ কলেজ, ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়ন করেছেন। সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ও সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কবি আল মুজাহিদী বর্তমানে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দৈনিক আ্যডর পত্রিকার আঞ্চলিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অংশগ্রহণকারী কবিদের মতামতের ভিত্তিতে কবিতা বাংলাদেশের সভাপতি মনোনীত হয়েছেন।

কবি আল মুজাহিদী লিখে যাচ্ছেন অবিরাম। তার ভাষায়, আমি লিখছি আর ভাবছি। পৃথিবীজুড়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে এতো নির্যাতন কেন? কী তাদের অপরাধ? আমি লিখছি আর জেগে উঠছি বারবার। হে নবীন, জেগে উঠার সময় এসেছে, নাও হাতে কলম, লিখো মানবতার গান।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী। সময় সম্পাদক। কবি ও কথা সাহিত্যিক।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;