শর্টলিস্ট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, ৩ নভেম্বর ‘ম্যান বুকার‘ পুরস্কার ঘোষণা



সাঈদ চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২১ সালের বুকার প্রাইজ় নিয়ে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। নোবেল পুরস্কারের পরই ’বুকার প্রাইজ ফর ফিকশন’ সবচেয়ে আলোচিত এবং সম্মানীত। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে যথার্থ যাচাই-বাছাই এবং অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

বৃটেন সহ দুনিয়াব্যাপী লেখক-পাঠকরা কারো কারো নাম প্রস্তাব করে থাকেন। জনগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমূহ থেকে প্রথমে লংলিস্ট এবং পরে শর্টলিস্ট হয়। সবশেষে নির্বাচকদের বিচারে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষিত হয়। আগামী ৩ নভেম্বর জানা যাবে কে হলেন বুকারজয়ী সৌভাগ্যবান।

প্রতি বছরের মত এবারো কর্তৃপক্ষ অসংখ্য বই থেকে বাছাই করে একটি তালিকা তৈরী করেন। এবার ১৩টি বই নিয়ে ‘লংলিস্ট’ বা দীর্ঘ তালিকা হয়। তারা আরো অনেক যাচাই-বাছাই শেষে এখন শর্টলিস্ট বা সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছেন। ছ’টি উপন্যাস আছে এই শর্টলিস্টে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ঘোষিত লিস্ট মোতাবেক কাঙ্ক্ষিত প্রাইজের জন্য লড়াই হয় ১৩ জন লেখকের ১৩টি বই। এরমধ্যে ২০১৭ সালে সাহিত্য নোবেল এবং ১৯৮৯ সালে বুকার পুরস্কার বিজয়ী জাপানি লেখক স্যার কাজুও ইশিগুরো ছিলেন দীর্ঘ তালিকায়। তার ‘ক্লারা এন্ড দ্য সান’ বইটি ছিল বিশেষ বিবেচনায়। ২০১৯ সালে পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী আমেরিকান লেখক রিচার্ড পাওয়ার্স-এর ‘বিউইল্ডারমেন্ট’ রয়েছে পুরস্কারের তালিকায়। তিনি ১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা বই পুরস্কার অর্জন করেন।

 ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক সঞ্জীব সাহোতার ‘চায়না রুম’ দীর্ঘ তালিকায় জায়গা করে নেয়। তার ‘দ্য ইয়ার অব দ্য রানআওয়েজ’ ২০১৫ সালের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। কানাডীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক র্যাচেল কাস্কের ‘সেকেন্ড প্লেস’ এবারের দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০০৫ সালে তার ‘ইন দ্য ফোল্ড’ এই তালিকায় ছিল।

শ্রীলংকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট তামিল ঔপন্যাসিক অনুক অরুদপরগসম-এর ‘আ প্যাসেজ নর্থ’ বইটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনি দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের ডিএসসি পুরস্কার জিতেছেন। ব্রিটিশ-সোমালি লেখক নাদিফা মোহামেদের ‘দ্য ফরচুনম্যান’, আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও কবি প্যাট্রিকা লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’, মার্কিন লেখক ম্যাগি শিপস্টিডের ‘গ্রেট সার্কেল’, দক্ষিণ আফ্রিকার ডেমন গ্যালগাট এর ‘দ্য প্রমিস’ তালিকায় আছে। ২০০৩ সালে তার ‘দ্য গুড ডক্টর’ এবং ২০১০ সালে ‘ইন এ স্ট্র্যাঞ্জ রুম’ সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। 

কানাডীয় উপন্যাসিক ম্যারি লসনের ‘দ্য টাউন কল্ড সোলাস’ এবার দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০০৬ সালে তার ‘দ্য আদার সাইড অব দ্য ব্রিজ’ দীর্ঘ তালিকায় ছিল। এই তালিকায় আরো আছে মার্কিন লেখক নাথান হ্যারিসের ‘দ্য সুইটনেস অব ওয়াটার’, দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ক্যারেন জ্যানিংসের ‘অ্যান আইল্যান্ড’, এবং ব্রিটিশ লেখক ফ্রান্সিস স্পাফর্ডের ‘লাইট পার্পেচুয়াল’।

অবশেষে ছ’টি উপন্যাস শর্টলিস্ট হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার সাহিত্যিক ড্যামন গ্যালগাট-এর দ্য প্রমিস, আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও কবি প্যাট্রিসিয়া লকউড-এর নো ওয়ান ইজ় টকিং আবাউট দিস, আমেরিকান ঔপন্যাসিক রিচার্ড পাওয়ার্স-এর বিউইল্ডারমেন্ট, শ্রীলঙ্কার অনুক অরূদপ্রগসম-এর আ প্যাসেজ নর্থ, ব্রিটিশ-সোমালি সাহিত্যিক নাদিফা মোহামেদ-এর দ্য ফরচুন মেন এবং আমেরিকান ঔপন্যাসিক ম্যাগি শিপস্টেড-এর গ্রেট সার্কেল।

এবছরের বিচারক কমিটির প্রধান হয়েছেন ইতিহাসবিদ মায়া জেসনফ। বুকার বিজয়ী পাবেন ৫০ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশী হিসেবে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা।

‘ম্যান বুকার‘ বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদা সম্পন্ন পুরস্কার। বিগত এক বছরে প্রকাশিত পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের উপন্যাস থেকে বাছাই করা শ্রেষ্ঠটি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। ১৯৬৯ সাল থেকে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এক সময় শুধুমাত্র কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ এবং আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৫ সাল থেকে এই পুরস্কার আন্তর্জাতিক ভাবে বিশ্বময় সম্প্রসারিত হয়েছে। 

৫২তম বুকার পুরস্কার বিজয়ীর নাম ১৯ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ঘোষণা হল। সেরা হাসি হাসলেন স্কটিশ-আমেরিকান লেখক ডগলাস স্টুয়ার্ট। বিশ্ব সাহিত্যে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হল। তার ‘ শুগি বাইন‘ সেরা হিসেবে বেছে নিলেন বুকার পুরস্কার কমিটির বিচারক মন্ডলী। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি এই মর্যাদা সম্পন্ন পুরস্কার পেলেন। বিজয়ী ঘোষণার পর তার হাতে স্মারক তুলে দেন প্রধান বিচারক মার্গারেট বাসবি। প্রদান করা হয় ৫০ হাজার ইউরোর অর্থমূল্য। বারাক ওবামা, মার্গারেট অ্যাটউড সহ বিশ্ব বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা শুভেচ্ছা পাঠান স্টুয়ার্টের উদ্দেশ্যে।

২০২০ বুকার পুরস্কারের মনোনয়নের তালিকায় ছিল- দ্য নিউ ওয়াইল্ডারনেসের জন্যে ডায়ান কুক, এই মরনোয়ল বডির জন্যে সিৎসি ডাঙ্গারেমবাগা, বার্ন সুগার‘র জন্যে অবনী দোশি, হু দে ওয়াজ‘র জন্য গ্যাব্রিয়েল ক্রাউজে, মিরর এবং দ্য লাইট‘র জন্যে হিলারি মন্টেল, অ্যাপিরোগন‘র জন্য কলম ম্যাকক্যান, শ্যাডো কিং এর জন্যে মাজা মেনগিস্টের, সাচ আ ফান এজ‘র জন্যে কাইলি রেইড, রিয়েল লাইফ‘র জন্যে ব্র্যান্ডন টেইলার, রেডহেড বাই দ্য সাইড অফ দ্য রোড‘র জন্যে অ্যানি টেলার, শুগি বাইন‘র জন্যে ডগলাস স্টুয়ার্ট, লাভ অ্যান্ড আদার থট এক্সপেরিমেন্ট‘র জন্যে সোফি ওয়ার্ড, হাউ মাচ অফ দিজ হিলস ইস গোল্ড‘র জন্যে সি পাম জাং।

পুরস্কার জেতার পর স্টুয়ার্ট মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নিজের মাকে প্রাণময় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, উপন্যাসের পরতে পরতে মা সম্পর্কে আমি পরিষ্কার করে বলেছি। তাকে ছাড়া এখানে আসতে পারতাম না। আমার কাজ কোন ভাবেই এখানে পৌঁছাত না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাতৃ বিচ্ছেদের যন্ত্রনাকে অনুভব করেছিলেন স্টুয়ার্ট। অকালে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া মাকেই নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন এই স্কটিশ লেখক। মা-ই ছিলেন তার সব থেকে কাছের মানুষ। মায়ের মাদকাসক্তি বেড়েই চলেছিল দিনের পর দিন। বার বার বুঝিয়েও লাভ হয়নি কোনো। ভেতর ভেতর অ্যালকোহল তাকে নিশ্চুপেই ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। ‘শুগি বাইন‘ উপন্যাসে ওঠে এসেছে তার বেড়ে ওঠা আর নিজের জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। মিশে আছে মায়ের মৃত্যু যন্ত্রণা, তার মূল্যবোধ, সামাজিক বেড়াজাল, উত্থান-পতনের কথা। রয়েছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক হৃদয়ভেদী আখ্যান। 

গ্লাসগোতে বেড়ে ওঠা স্টুয়ার্ট তার জন্মভূমি স্কটল্যান্ডবাসীকেও ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে গ্লাসগোর অধিবাসীদের। তিনি বলেন, গ্লাসগোবাসী মানুষের সহানুভূতি, রসবোধ, প্রেম ও সংগ্রাম এই বইয়ে মূল কেন্দ্রবিন্দু। গ্লাসগো স্কটল্যান্ডের বৃহত্তম এবং যুক্তরাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এটি গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপের উত্তর দিকের এক তৃতীয়াংশে অবস্থিত। এর দক্ষিণ-পূর্বে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ৯৬ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত, উত্তর ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তর-পূর্বে উত্তর সাগর এবং দক্ষিণে আইরিশ সাগর অবস্থিত। মূল ভূখন্ড ছাড়াও দেশটির অনেক দ্বীপ রয়েছে। এক সময়কার বিশ্বের নেতৃস্থানীয় শিল্প শহর ছিল। স্কটিশ পানি সীমা উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর সাগর বেষ্টিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বৃহত্তম তেল মজুদ এরিয়া। এজন্যই গ্লাসগো ও অ্যাবরদিনকে স্কটল্যান্ড তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং ইউরোপের তেল রাজধানী বলা হয়।

ম্যান বুকার বিজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্ট ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে এখন নিউইয়র্কে বসবাস করেন। গত দুই দশকে তিনি কাজ করেছেন কেলভিন ক্লেইন, বানানা রিপাবলিক, জ্যাক স্পেড প্রভৃতি বহুজাতিক সংস্থায়। রয়্যাল আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক করার পরই তিনি পাড়ি দিয়ে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২৪ বছর বয়স থেকেই থাকেন নিউইয়র্ক শহর। এ বছরেই তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘লক অ’ শেষ করেছেন, যার পটভূমি গ্লাসগো ঘিরেই গড়ে উঠেছে। 

এ পর্যন্ত ম্যান বুকার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত অনেক লেখক। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যের পি. এইচ. নিউবি - সামথিং টু আনসার ফর উপন্যাস, ১৯৭০ সালে যুক্তরাজ্যের বার্নিস রুবেনস- দ্য ইলেক্টেড মেম্বার উপন্যাস, ১৯৭১ সালে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ভি এস নাইপল- ইন অ্যা ফ্রি স্টেট ছোটগল্প, ১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যের জন বার্গার- জি উপন্যাস, ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের জেমস গর্ডন ফারেল- দ্য সেইজ অফ কৃষ্ণপুর উপন্যাস, ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাডিন গর্ডিমার- দ্য কনজারভেশনিস্ট উপন্যাস ও যুক্তরাজ্যের স্ট্যানলি মিডলটন- হলিডে উপন্যাস, ১৯৭৫ সালে যুক্তরাজ্যের রুথ প্রয়ার ইয়াবভালা- হিট অ্যান্ড ডাস্ট  উপন্যাস , ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যের  ডেভিড স্টোরি- স্যাভাইল উপন্যাস,  ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের পল স্কট- স্টেয়িং অন উপন্যাস, ১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যের আইরিশ মুরডক- দ্য সী, দ্য সী উপন্যাস।

১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যের পেনেলোপে ফিটজেরাল্ড- অফশোর দর্শনতাত্ত্বিক উপন্যাস, ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যের উইলিয়াম গোল্ডিং- রায়টস অফ পেসেজ উপন্যাস, ১৯৮১ সালে ভারতের সালমান রুশদি- মিডনাইট চিলড্রেন উপন্যাস, ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার  থমাস কেনিলি- শিন্ডলার্স আর্ক জীবনী উপন্যাস,  ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার  জন ম্যাক্সওয়েল কুতসি লাইফ অ্যান্ড টাইম অফ মাইকেল কে উপন্যাস, ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যের আনিতা ব্রুকনার- হোটেল ডু লাক উপন্যাস, ১৯৮৫ সালে নিউজিল্যান্ডের  কেরি হুম- দ্য বোন পিপল রহস্য উপন্যাস, ১৯৮৬  কিংস্লে অ্যামিস- দ্য ওল্ড ডেভিলস্ কমিক উপন্যাস, ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের পেনেলোপে লাইভলি- মুন টাইগার উপন্যাস, ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার  পিটার কেরি- অস্কার অ্যান্ড লুসিন্ডা ঐতিহাসিক উপন্যাস।

১৯৮৯ সালে যুক্তরাজ্যের জাপানী কাজুও ইশিগুরো- দ্য রিমেইনস অফ দ্য ডে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যের এ. এস. বায়াত- পজেসন: অ্যা রোমান্স ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯১ সালে নাইজেরিয়ান বেন ওকরি- দ্য ফ্যামিস্ড রোড উপন্যাস, ১৯৯২ সালে কানাডার মাইকেল ওন্ডাৎজি- দ্য ইংলিশ পেশেন্ট ও  যুক্তরাজ্যের        ব্যারি উন্সওর্থ- স্যাক্রেড হাঙ্গার ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের রডি ডয়েল- প্যাডি ক্লার্ক হা হা হা উপন্যাস,  ১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্যের জেমস কেলম্যান- হাউ লেট ইট ওয়াজ, হাউ লেট উপন্যাস, ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের প্যাট বার্কার- দ্য গোস্ট রোড যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের গ্রাহাম সুইফট লাস্ট অর্ডারস্ উপন্যাস, ১৯৯৭ সালে ভারতের অরুন্ধতী রায়- দ্য গড অফ স্মল থিংস উপন্যাস, ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যের ইয়ান ম্যাক্ইউয়ান- অ্যামস্টারডাম উপন্যাস।

১৯৯৯ সালে  দক্ষিণ আফ্রিকার জন ম্যাক্সওয়েল কুতসি- ডিসগ্রেস উপন্যাস, ২০০০ সালে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড- দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের পিটার কেরি- ট্রু হিস্ট্রি অফ দ্য কেলি গ্যাং ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০২ সালে কানাডার ইয়ান মার্টেল- লাইফ অফ পাই রোমাঞ্চকর উপন্যাস, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ডিবিসি পিঁয়ের- ভার্নন গড লিটল ব্ল্যাক কমেডি, ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যালান হলিংঘার্স্ট- দ্য লাইন অফ বিউটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের জন ব্যানভিল- দ্য সী উপন্যাস, ২০০৬ সালে ভারতের কিরণ দেশাই- দ্য ইনহেরিটেন্স অফ লস উপন্যাস, ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের অ্যান এনরাইট- দ্য গেদারিং উপন্যাস, ২০০৮ সালে ভারতের অরবিন্দ আদিগা- দ্য হোয়াইট টাইগার উপন্যাস।

২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের হিলারি ম্যান্টেল- উলফ হল ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের হাওয়ার্ড জ্যাকবসন- দ্য ফিঙ্কলার কোশ্চেন উপন্যাস, ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের জুলিয়ান বার্নস- দ্য সেন্স অফ অ্যান এন্ডিং উপন্যাস, ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের হিলারি ম্যান্টেল- ব্রিং আপ দ্য বডিজ উপন্যাস, ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের এলিয়ানর ক্যাটন- দ্য লুমিনারিজ উপন্যাস, ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড ফ্লানাগান- দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ উপন্যাস, ২০১৫ সালে জ্যামাইকার মারলন জেমস- অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ সেভেন কিলিং উপন্যাস, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পল বিটি- দ্য সেলআউট ব্যঙ্গধর্মী উপন্যাস, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ সান্ডার্স- লিংকন ইন দ্য বার্ডো ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যানা বার্নস- মিল্কম্যান উপন্যাস, ২০১৯ সালে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড- দ্য টেস্টামেন্টস উপন্যাস ও যুক্তরাজ্যের বার্নার্ডাইন এভারিস্টো- গার্ল, উইমেন, আদার উপন্যাস।

বাংলাদেশী পাঠকের কাছে ‘ম্যান বুকার‘ পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচিতদের মধ্যে রয়েছেন, ২০০১ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত লেখক স্যার ভিএস নাইপল। ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ এর জন্য তিনি ম্যান অব বুকার অর্জন করেন। পিস অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে ডেভিড গ্রুসম্যানকে সবাই চিনে। ব্যতিক্রমী একটি উপন্যাস লিখে ২০১৭ সালে বুকার প্রাইজ লাভ করেন তিনি।  ২০১০ সালে ফিলিস্তিনি এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান ও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশের হাতে মারও খেয়েছেন ইসরায়েলের লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড গ্রুসম্যান।

অরুন্ধতী রায় ভারতীয় ঔপন্যাসিক, বুদ্ধিজীবী এবং পিস অ্যাকটিভিস্ট। তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে আছেন তার উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এর জন্য। ১৯৯৭ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী হৈচৈ পড়ে যায়। ১৯৯৮ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন উপন্যাসটির জন্য। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি পরিবেশগত সংশ্লিষ্টতা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও কাজ করেন। ভারতের আসাম রাজ্যের শিলংয়ে অরুন্ধতী জন্মগ্রহণ করেন।

সালমান রুশদি একজন ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তার দ্বিতীয় উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন ১৯৮১ সালে বুকার প্রাইজ অর্জন করে। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার লেখা জঘন্য বিতর্কিত বই স্যাটানিক ভার্সেস বিশ্বের অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। বইটি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। এর প্রতিবাদ হয় বিশ্বের সকল মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে সহ বিভিন্ন দেমে বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

আরব বিশ্বের প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে ২০১৯ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছেন জোখা আলহারথি। মাতৃভূমি ওমানের রূপান্তর বিষয়ক উপন্যাস ‘সেলেস্টিয়াল বডিস’র জন্য এই পুরস্কার লাভ করেন তিনি। বৈচিত্র্যময় আরব সংস্কৃতির নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে এই উপন্যাসে। বিচারকরা আলহারথির ঐশ্বর্যময় কল্পনাশক্তি, লেখার চিত্তাকর্ষক শৈলি এবং কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টির প্রশংসা করেন। উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে আল-আওয়াফি গ্রামকে ঘিরে। একটি সনাতনী সমাজ থেকে ঔপনিবেশ-উত্তর যুগে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল ওমান, তিন বোনের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ওমানিরা কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে তা দেখাতে চেয়েছেন জোখা আলহারথি।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

গল্প 'ব্রহ্মপুত্রের ঘাট': মাহফুজ পারভেজ



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও বলা যাবে না। যাত্রাপথ সাকুল্যে পয়তাল্লিশ মিনিটের। কোনও বিভ্রাট হলে প্লাস-মাইনাস পাঁচ থেকে দশ মিনিট। যাত্রার সময়ের মতো পথের রেখাও ঝকঝকে, স্পষ্ট। কিশোরগঞ্জ থেকে নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে ডানে গৌরীপুর, নেত্রকোনা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট রেখে শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। ট্রেনে এলেও মোটামুটি একই সময় লাগে আর অভিন্ন জনপদগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। পূর্ব ময়মনসিংহের এই চিরায়ত ভূগোলে সড়ক আর রেলপথ বলতে গেছে সমান্তরালে চলেছে। 

শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুরের ঘাটের চিত্রটিও আদি আর অকৃত্রিম গুদারা ঘাটের বর্ধিত সংস্করণ মাত্র। পারস্যের বহু ফারসি শব্দের মতো গুদারা শব্দটিও দিব্যি টিকে আছে বাংলা অভিধানে। ঘাটে গিজগিজ করছে পূর্ব ও উত্তর ময়মনসিংহের বাসগুলো। গুদারা নৌকায় অপর পাড়ে ময়মনসিংহ শহর। সেখানেও অনেকগুলো ঘাট: থানা ঘাট, এসকে হাসপাতাল ঘাট, পাটগুদাম ঘাট। যার যেদিকে কাজ, সেদিকের গুদারা নৌকায় যাচ্ছে। নদীর অবিরাম স্রোতের মতো নৌকা ও মানুষের ছুটে চলা যেন চলছেই অনাদিকাল থেকে। মূক ব্রহ্মপুত্র যার সাক্ষী।   

কনক বাস থেকে নেমে নদী ও ওপারের ল্যান্ডস্কেপে আবছা শহরের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়। প্রলম্বিত গ্রীষ্মের তেজি ভাব নেই নদী তীরের জলমগ্ন পরিবেশে। বাতাসে হাল্কা সুখের পরশ ভাদুরে গুমোট গরমকে  কিছুটা পরাজিত করেছে। নদী যে কতটা স্বস্তি ও আরামের, তীরে এলে টের পাওয়া যায়।

কনকের ভাগ্যে প্রাকৃতিক মোলায়েম পরশ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আসা-যাওয়ার বাসগুলোর মধ্যে ঢুকছে আরও নানা রকমের যানবাহন, যাত্রী ও পথচারী। থেমে থেমে শুরু হয়েছে যন্ত্রদানবের পৈশাচিক হর্নের মর্মন্তুদ উল্লাস। কালো ধূম্রকুণ্ডলী পাগলা মোঘের মতো খোলা আকাশ ও মুক্ত বাতাসকে হনন করছে। ঘাটের কুখ্যাত যানজট, শব্দ ও বায়ু দূষণ, বিশৃঙ্খলার উৎপাত থেকে কিছুটা দূরে সরে কনক একটা অস্থায়ী গোছের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে।

একমুখ হাসিতে মাঝবয়েসী দোকানি আমন্ত্রণের গলায় বলল, ‘চা আর একটু হাওয়া খেয়ে নৌকায় উঠে পড়ুন। এখনও রোদ কড়া হয় নি, আরামে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’

দোকানির কথায় কনক সৌজন্যে মাথা ঝাঁকিয়ে একই সঙ্গে সম্মতি ও চায়ের অর্ডার দেয়।

ঘাটের এদিকে বিশেষ ভিড় নেই। জন কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, হর্ন ও ভিড়ের প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম। অদূরে ধনুকের মতো উত্তর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যেতে। চোখে পড়লো, নদীতে ব্রিজের কাজ চলছে। পিলার বসছে মাঝ বরাবর।

কনক ব্রিজের চলমান কাজকর্মের দিকে অনেকক্ষণ স্থির চোখ আকিয়ে আছে দেখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে দোকানি কথা বলে, ‘ব্রিজ হলে তো ঘাট থাকবে না। গুদারা, মাঝি, আমাদের মতো দোকানদারদের বিপদ হবে।’

কথাগুলো ঠিক কনককে উদ্দেশ্য করে বলা হয় নি। স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত। কনক চুপ করে শোনে। কোনও উত্তর দেয় না। চা শেষ করে ঘড়ি দেখে কনক। প্রায়-আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনও জ্যোতি আসে নি। অথচ আজকে জ্যোতির আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইচ্ছে করলেই সে নৌকা ধরে ময়মনসিংহ শহরে চলে যেতে পারে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটবে না। তাদের মধ্যে ঠিক করা আছে, এক সপ্তাহে কনক ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে শহরে আসবে। পরের সপ্তাহে জ্যোতি আসবে নদী পেরিয়ে শম্ভুগঞ্জে। মফস্বল শহরের ছোট্ট পরিসরে সবাই মুখচেনা লোক। নিয়মিত এক জায়গায় দেখা-সাক্ষাত হলে লোকমুখে সেটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।

একবার শহরের জনবহুল গাঙিনার পাড়ে কনক ও জ্যোতিকে একসঙ্গে দেখে পাড়ার এক বড় ভাই কটমটে চোখে তাকিয়ে ছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় জেরা-জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে যায়। আরেক বার রেল স্টেশেনের কাছে তাজমহল রেস্টুরেন্টে চা খেতে গিয়ে প্রায় হাতেনাতে ধরাই পড়ে গিয়েছিল কলেজের মহেশ স্যারের কাছে। সেবারও ভাগ্যের জোরে সটকে পড়েছিল দুজনে। তারপর থেকে পরিকল্পনা বদলে ফেলে তারা। এক সপ্তাহে কনক শহরে গিয়ে দেখা করে। দেখার জায়গাও তারা বদল করে নিয়মিত। কখনও ছায়াবাণী, পূবরী বা অলকা সিনেমা হলের সামনে। কখনও সার্কিট হাউসের আশোপাশে। কখনও নদীর তীর-ঘেঁষা পার্ক ও রাস্তায় সন্তর্পণে কিছুটা সময় কাটায় তারা।

জ্যোতি শহরের বাইরে এলে শম্ভুগঞ্জের আশেপাশে নদীর তীর ধরে নির্বিঘ্নে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় দুজনে।

এই সপ্তাহে হিসাব মতো জ্যোতি আসবে শম্ভুগঞ্জে। সে রকমই কথা হয়ে আছে। জ্যোতি জরুরি কিছু কথা বলার বিষয়েও আগাম জানিয়ে রেখেছে  । কনকেরও বলার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জমে আছে। শুধু কথা নয়, দুজনের ভাগ্যও পাশের ব্রহ্মপুত্রের মতো বাঁক বদল করতে চলেছে। কনক পড়তে চলে যাবে পাহাড় ও সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্যোতি চান্স পেয়েছে উত্তরের মতিহার ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রকে সাক্ষী রেখে তাদের আসা-যাওয়া আর মেলামেশাও ইতি ঘটতে চলেছে। তাদের হৃদয়ে মিলনের আকুতি সুতীব্র হলেও দুজনের জীবনগতির সামনেই অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চিত টান। এই সপ্তাহে দুজনের দেখা হওয়া তাই খুবই জরুরি। এ কথা কনক যেমন জানে, জ্যোতিও জানে।

কনক যথারীতি উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিকে না দেখে সে চিন্তিত এবং কিছুটা বিস্মিত ও শঙ্কিত। জ্যোতি তো কথার হেরফের করার মেয়ে নয়। তাহলে কেন এই বিলম্ব? মাথায় এই আস্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে কনক চা দোকানের বেঞ্চিতে অপেক্ষায় থাকে।

কোন ফাঁকে অপেক্ষার মাঝ দিয়ে কয়েক কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, কনক টের পায় না। টের পেলো যখন প্রতীক্ষার টেনশনে ও কয়েক কাপ চায়ের দ্রব্য গুণে পেটে অম্বলের চাপ তৈরি হলো, তখন। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে তবু জ্যোতি আসে নি। আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কনক আলতো পায়ে মন খারাপ করে নদীর দিকে পা বাড়ায়। ওপার থেকে আসা নৌকাগুলোর দিকে চোখ রেখে রেখে সে তীরে পায়চারি করতে থাকে।

কনক দেখে কত রঙ-বেরঙের মানুষ নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের এপার-ওপার করছে। বিচিত্র তাদের বয়স, পেশা, ব্যক্তিত্ব। ছাত্র, ব্যবসায়ী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, কুলি, কামলা, হকার রোগি, নারী, পুরুষের অভাবনীয় এক জগৎ তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে। এখানেই একদিন জ্যোতির সঙ্গে কনকেরও দেখা হয়ে গিয়েছিল। এক অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে কনক নেমেছিল শম্ভুগঞ্জের ঘাটে। গুদারা নৌকায় চেপে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে অস্থির ও ব্যাকুল কনককে দেখছিল সহযাত্রীরা। কনক আগে ময়মনসিংহ শহরে আসে নি। সে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিচ্ছে জীবনে প্রথম বারের মতো। তা-ও একা এবং একজন সঙ্কটাপন্ন মানুষকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। পাশের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চেয়ে বিশেষ লাভ হয় নি তার।

অকস্ম্যাৎ উদ্বিগ্ন কনক অবাক হয় একটি তরুণীর কণ্ঠস্বরে, ‘চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেবো।’

‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমাকে পথঘাট বলে দিলেই আমি পারবো।’

`আমার কষ্ট হবে না। আমি ওদিকেই থাকি।’

মাঝ নদীতে কনক যে মেয়েটির কথায় আশার দ্বীপ খুঁজে পায়, তার নাম জ্যোতি। জ্যোতির কারণে নতুন শহরে আগন্তুকের মতো একেলা ও অসহায় কনক স্বচ্ছন্দ্যে সব কাজ করতে পারে। রোগি ভর্তি থেকে চিকিৎসার যাবতীয় কাজে না বললেও জ্যোতি পাশে থাকে। রুটিন করে দিনে দুইবার হাসপাতালে চলে আসে জ্যোতি। বারণ করলে   বলে, ‘ঐ যে আমাদের বাসা দেখা যায়। দুই মিনিটের পথ। বার বার এলেও আমার কোনও অসুবিধা হবে না।’

হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দিন জ্যোতি সারাক্ষণ পাশে থাকে। শহরের প্রান্তস্পর্শী ব্রহ্মপুত্রের ঘাট পর্যন্ত সঙ্গে আসে। নৌকায় বসে কনক দেখে পাড়ে তখনও দাঁড়িয়ে জ্যোতি। হঠাৎ নিজের ভেতরে অকস্ম্যাৎ পরিচিতি মেয়েটির জন্য অজানা-অচেনা কেমন একটা টান অনুভব করে কনক। মনে হয় ব্রহ্মপুত্রের  সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সে একটি স্বল্প পরিচিত তরুণী সঙ্গে যৌথ সাঁতারে। নৌকা ছাড়ার আগে কনক হঠাৎ চিৎকার করে বলে, ‘শুক্রবার আমি আবার আসবো তোমার কাছে।’ হাল্কা মাথা নাড়িয়ে সলাজ মুখ লুকায় তীরে দাঁড়ানো জ্যোতি।

সেই শুরু। তারপর দেখতে দেখতে দুই বছর হয়ে গেছে। বিশেষ কারণ ছাড়া কোনও সপ্তাহেই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাদ যায় নি। আজকে জ্যোতির দেখা না পেয়ে পুরনো কথাগুলো মনে হয় তার। জ্যোতির দেখা না-পেয়ে কনকের মনে হলো, উত্তরের গারো পাহাড় কাছে চলে এসে বেদনার প্রচণ্ড ভারে তাকে চেপে ধরেছে।

কনক ঠিক বুঝতে পারে না, কেন জ্যোতি আসে নি? এমন তো কখনও হয় নি। বিশেষ করে, এবারের দেখাটা অনেক জরুরি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তাদের মধ্যে হওয়া দরকার।

কনক দেখে দুপুরের সূর্য মাথার উপর গনগন করছে। ব্রহ্মপুত্রের জলজ বুকে রুদ্রদিনের দাবদাহে বাষ্পের আবছা ছায়া দৃষ্টিতে বিভ্রম ছড়াচ্ছে। সে নিজেও কম বিভ্রান্ত নয়। তার বুকেও চলছে আগুনের হল্কা। কনক স্থির করতে পারে না, তার কি চলে যাওয়া উচিত? নাকি ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে যাওয়া দরকার জ্যোতির কাছে?

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নৌকা ধরে শহরে চলে আসে কনক। বেশ খিদেও পেয়েছে তার। তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে সে চলে আসে সেহরা, আকুয়া পেরিয়ে জ্যোতির বাসার কাছাকাছি। জ্যোতির বাসা চিনলেও কোনও দিন সেখানে তার যাওয়া হয় নি। একবার শুধু বড় রাস্তা থেকে জ্যোতি দেখিয়েছিল তাদের হলুদ বাড়িটি। আন্দাজে খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক সময় কাটিয়ে বিকেলের মুখে কনক জ্যোতিদের বাড়ির ঠিক সামনে পৌঁছে যায়। পুরো আবাসিক এলাকায় সারিবদ্ধ বাড়িগুলো দেখতে পায় সে। কোন দোকান-পাট নেই যে দাঁড়িয়ে দেখবে বা কিছু খোঁজ-খবর করবে। জ্যোতির বাসার পাশে তার চোখে পড়ে গেটের ভেতরে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়ানো। লোকজনও চলাচল করছে। অন্য বাড়িগুলোর মতো নিশ্চুপ ঝিমুচ্ছে না জ্যোতিদের বাসা। বাসার আরেক পাশে একটি ল্যাম্পপোস্টের তলায় তিনটি ছেলে জটলা করছে। কনক ধীর পায়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সে স্পষ্ট শুনতে পায় তাদের কথোকথন, ‘খুব ভালো বিয়ে হয়েছে জ্যোতির। যদিও কাজটা হয়েছে ওর অসম্মতিতে জোর-জবরদস্তি করে।’

চট করে এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়ায় কনক। পেছন ফিরে ছেলেগুলোর মাথার উপর দিয়ে তীর্যক দেখতে পায় জ্যোতিদের বাড়িটি যেন নিমেষে কারাগার হয়ে গেছে। সামনের দিকে ফিরে পা বাড়ানোর আগে কনক শুনতে পায় ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজনের গলা, ‘জ্যোতিকে আর দেখতে পাবো না। কালই বরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে সে।’

যন্ত্রের মতো কখন যে কনক প্রাচীন ময়মনসিংহ শহরের অলি-গলি পেরিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে চলে আসে, বুঝতেও পারে না। বোধশক্তিহীন মানুষ এখন সে। অভ্যাসের বশে সে চিনতে পারে ঘাট, গুদারা, নৌকা, ব্রহ্মপুত্র, জ্যোতির মুখের স্মৃতি। চিনলেও সে যেন কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেকে তার মনে হয় খুবই একা ও অচেনা এবং পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষের মতো সঙ্গীহীন। নদীর তীর থেকে কেউ একজন তাকে ধরে নৌকায় বসিয়ে

দেয়। চরাচর জুড়ে প্রদোষের আবির রঙা বেদনায় কনক ব্রহ্মপুত্রে জলে তাকিয়ে চমকে উঠে। কনক দেখে, ব্রহ্মপুত্র নিজের চেহারা লুকিয়ে জলের কল্লোলে তার নিজের চেহারাই বিম্বিত করেছে। নদীর দিকে তাকিয়ে কনক বুঝতে পারে, তার আর জ্যোতির জীবন প্রবাহ যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

পুরনো নদীর বুকে জন্ম নেওয়া একেকটি বালুচর পেরিয়ে কনকের নৌকা শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ফিরে আসার সময় তার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এইসব বালুচরের ওপর শুয়ে স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর কথা ব্রহ্মপুত্র মনে রাখবে? তাদের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যাগুলো মনে রাখবে শম্ভুগঞ্জের ঘাট?

কোনও এক অনিন্দ্য ভোরে হঠাৎ শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসে একদিন কনক জেনে নেবে এইসব প্রশ্নের উত্তর।

পাদটীকা: ব্রহ্মপুত্র নদ প্রেমে পড়েছে। সে প্রেমে পড়েছে সুন্দরী নদী গঙ্গার। গঙ্গার রূপের গল্প শুনে সে অস্থির হয়ে পড়েছে। যে করেই হোক, গঙ্গাকে তার চাই। ব্রহ্মপুত্র সিদ্ধান্ত নিলো সে গঙ্গাকে বিয়ে করবে। যে-ই ভাবা সে-ই কাজ। গঙ্গাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হতে থাকলো সে। ওদিকে গঙ্গাও ব্রহ্মপুত্রকে পছন্দ করেছে। কিন্তু পছন্দ করলেই তো হবে না। ব্রহ্মপুত্র কি সত্যি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, সেটা যাচাই করে দেখাও দরকার। তাই গঙ্গা এক অভিনব বুদ্ধি বের করলো। সে তার রূপবতী অবয়বে বৃদ্ধার সাঁজ নিলো। বৃদ্ধা গঙ্গা অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা একার এগিয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্রের দিকে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র তার দীর্ঘ যাত্রা শেষে গঙ্গার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বৃদ্ধা গঙ্গাকে চিনতেই পারলো না। চিনবেই বা কেমন করে, গঙ্গা তো তখন ছদ্মবেশী বুড়িগঙ্গা। কৌত‚হলী ব্রহ্মপুত্র বুড়িগঙ্গাকে শুধালো, ‘মা, গঙ্গা কোথায়?’ বুড়িগঙ্গা এই প্রশ্নে ক্রোধান্বিত হয়ে গেলেন। গঙ্গাকে চিনতে না পারার মাশুল দিতে হলো ব্রহ্মপুত্রকে। গঙ্গা তাকে ফিরিয়ে দিলো। ব্রহ্মপুত্র তারপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেলো। নাম আড়াল করে গঙ্গাও মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে সাগরে হারিয়ে গেলো। একই সাগরে মিলেমিশেও কেউ আর কাউকেই চিনতে পারলো না।

'ভারত বিচিত্রা'র সৌজন্যে।

;

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;