নগর বাহিরিরে ডোম্বি



আহসান ইমাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ যে কাজ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে তাই পেশা বা বৃত্তি। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে পেশার উদ্ভব ও বিকাশ, যা চলমান উত্তরণের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের সমাজে পরিবর্তনের এই ধারা একরূপ নয়, বাংলাদেশের অনেক পেশা দীর্ঘদিনের লালিত। সমাজ পরিবর্তন বা আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি বংশ পরম্পরায়। একইভাবে নির্দিষ্ট পেশাকে অবলম্বন করে তাদের দিন চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেথর, ঝাড়–দার, ডোম, মুচি, নাপিত প্রভৃতি পেশাজীবী। বাংলাদেশের সমাজ-জীবনের পেশাগত পদবি এবং বর্ণ বিভাজন ও বৃত্তিগত শ্রেণিভেদ আমরা প্রাচীনকাল থেকে লক্ষ করি। বাংলায় ডোমদের অস্তিত্বও প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। নৃতত্ত্ববিদগণ বাঙালির দৈহিক গঠন পরীক্ষা করে অভিমত পোষণ করেন যে,  বাংলার আদিম অধিবাসীগণের বংশধর কোল, শবর, পুলিন্দ, হাড়ি, ডোম, চ-াল প্রভৃতি জাতি। এরা নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় এবং অন্ত্যজ অস্পৃশ্য পর্যায়ভুক্ত।

৬৫০ থেকে ১২০০ শতকের মধ্যে রচিত প্রাচীন সাহিত্য চর্যাপদের প্রতিফলিত বাংলার জীবন ও সমাজচিত্রে বিভিন্ন পেশাজীবীর পরিচয় বিধৃত। চর্যাকার কাহ্নপা বলেন-

‘নগর বাহিরি রে ডোম্বি তাহরী কুড়িয়া,

ছোই ছোই জাসি বামহণ নাড়িয়া।’

একইভাবে ভুসুকু বলেন-

‘আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী

নিঅ ঘরিণী চ-ালে লেলী।’

ডোম সম্প্রদায়ের বা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের পরিবেশ দেখে এমন মনে হয়েছে যে ডোমরা ঝাড়– দেয়, পয়ঃপরিষ্কার, শবদেহ উত্তোলন, লাশ কাটা, লাশ সেলাই, মৃত পশু সরানো, পঁচালাশ তোলা, পুনরায় কবর দেয়া, শশ্মানে মৃত দেহ পোড়ানের মত কাজসহ শুকর পালন, বাঁশের কুলা, ডালা, চাটাই, চালনা, ঢোল ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। যারা এধরনের পেশায় নিয়োজিত থেকে আমাদের ঝকঝকে, সুন্দর ভাল থাকতে সাহায্য করছে তারা প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান আধুনিক সমাজেও অপরিহার্য। তবু আমাদের ভদ্র সমাজে এখনো তারা অস্পৃশ্য, ঘৃণিত। এরাই সমাজ সভ্যতার বাইরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বা এশিয়া উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে। বলতে হয় ডোমরা শুধু এ সমস্ত কাজই করতো না, প্রাচীন বাংলার প্রধানত বাহন নৌকা খেয়া পারাপারের কাজও তারা করতো।

সাভার ঐতিহ্যপূর্ণ প্রাচীন জনপদ। নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতি। জাতিতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালির রক্ত তাই একক কোন জাতি বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যকে বহন করে না।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মত বংশপরম্পরায় লালিত পেশাকে ধারণ করে দীর্ঘদিন থেকে ডোম সম্প্রদায় সাভার অঞ্চলে বাস করছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অতি আধুনিককালে এদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে জানতে, সম্প্রতি কথা হয়েছে সুজন, লক্ষ্মী রাণী হেলানী, চন্দনা, দুলাল, ভিকু প্রমুখের সাথে। হরিজন হিসেবে পৌরসভা কর্তৃক বরাদ্দ সাভার অঞ্চলে বিভিন্ন সুইপার পল্লীতে তারা বসবাস করছে। আমাকে দেখে অনেকে অতি-উৎসাহে প্রশ্ন করে, “আপনি কোন এনজিও থেকে এসেছেন?” বললাম কোন এনজিও থেকে আসিনি। আপনাদের সাথে কথা বলবো। অনেকে বলে উঠে তারপর কী পত্রিকায় লিখবেন? বললাম লিখব। অনেকে তাৎক্ষণিক আবদার করে বসে, আমাদের কিন্তু পত্রিকা দিবেন। কেউ আবার প্রশ্ন করে, “আমাদের কথা পত্রিকায় লিখে কি হবে? আমাদের অবস্থার উন্নতি হবে?” উত্তর দিতে পারিনি। একটুখানি চুপ থেকে বললাম ‘জানি না। অন্য একজন মুখ বাঁকা করে বলল, “তাহলে লিখে কী হবে?” কথা শুনে খারাপ লাগলো সত্যিই তো কি হবে? তবু কথা বললাম। বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বললাম আপনাদের সম্পর্কে আমরা জানতে চাই। আপনারা সমাজের অপরিহার্য অংশ। আপনারা ময়লা কেটে পরিষ্কার করেন বলেই তো আমরা এত সুন্দর চলতে পারছি। নাপিত মানুষকে সুন্দর করে, সে নরসুন্দর। কেউ পরে তেমন কোন প্রশ্ন করে না তবে বুঝতে পারি, একটা ক্ষোভ ওদের মনে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম ডোম সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে- ক. ভুঁইমালী, খ. হেলানি জাতি, গ. বাঙালি হাড়ি জাতি, ঘ. টম বাঁশফোড় (বাজফল) ও ঙ. পাটনী ইত্যাদি।

ডোমদের পূর্বের জীবনযাপনের সঙ্গে বর্তমান জীবনযাপনের কতটুকু উন্নতি বা উত্তরণ হয়েছে জানতে চাইলে তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি বলে জানান। আমি বলি, কেন পৌরসভা থেকে থাকার ব্যবস্থা, ছেলে-মেয়েদের আলাদা প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা এগুলো সুবিধা দেয়া তো হয়েছে। তাই না? হ্যাঁ, সমস্বরে সবাই বলল। এও জানালো পৌরসভা থেকে একটি করে ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যে ঘরে ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর। উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাও দাবি করে। অনেক অভিযোগের মধ্যে একটি অভিযোগ, হাসপাতালে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বড় বড় বাবুরা টাকা নিয়ে মুসলমানদের চাকরি দিচ্ছে। ফলে বেকারদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অনেকে এটাও বললেন, নিচু জাত বলে আমাদের মানুষ ঘেন্না করে। আমরা সব জায়গায় যেতে পারি না। সবার সঙ্গে মিশতে পারি না। অন্য সব কাজ আমাদের দেয়া হয় না। আমাদের ঘরে কেউ খেতে চায় না। আমাদের চাকরি যদি অন্যরা নিয়ে নেয় তাহলে আমরা কী করবো। ভারতচন্দ্র  অন্নদামঙ্গলকাব্যে ‘ঈশ্বরী পাটনীর’ কথা উল্লেখ করেছিলেন। খেয়া পারাপারকারী এই মাঝি পাটনীদের এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকতার ফরে, মাটি ভরাট করে নদীমাতৃক বাংলাদেশের রূপ যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি ইংরেজ শাসনের বদৌলতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুৎসুদ্দি তথা দালালি অর্থনীতি। তাই এদের নিশ্চিহ্ন করে ঘাটের মালিক বা জলের মহাজন, যারা খাজনা আদায়ের ইজারাদার হয়ে বসেছে। অধিকাংশ মুসলমান ইজারাদার মুসলমান মাঝিদের দাপটে খেয়া ঘাটে পাটনীদের আর দেখা যায় না। প্রচণ্ড ঝড়ে এরা শক্ত হাতে বৈঠা ধরতে পারলেও স্তরবিশিষ্ট দুঃসহ সমাজ ব্যবস্থাকে ভাঙতে পারে না। আর পারে না বলেই নিজেদের সামাজিক সমতায়, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এরা অক্ষম। সাভার শহরের বিভিন্ন এলাকার সুইপারপল্লীতে প্রায় আড়াইশত পরিবার বাস করছে এবং এর বাইরেও রয়েছে অনেকে। দু’একটি পরিবার ছাড়া অধিকাংশ পরিবারের অবস্থা খুব একটা ভাল না। অনেকেই কাজ পায় না।

এরা খুব কষ্ট সহ্য করতে পারে এবং অল্পেই সন্তুষ্ট থাকে। এজন্য এদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কম। ডোমরা অল্প শিক্ষিত বা অক্ষর জ্ঞানহীন হলেও সময়, সমাজ, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মোটেই অসচেতন নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ওরা খুবই শঙ্কিত। ফেরার সময় অনেকে আবেদন জানালো ‘ভাই আমাদের কথা সরকারকে জানাবেন।’ বিদেশের মেথর, ঝাড়–দাররা তো আমাদের মত কষ্ট করে না। ওদের নাকি অনেক বেতন? মেশিন দিয়ে কাজ করে। কেউ ওদের ঘৃণার চোখে দেখে না।’ আশ্বাস দিতে পারলাম না ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সময়েও।

আহসান ইমাম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;