নগর বাহিরিরে ডোম্বি



আহসান ইমাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ যে কাজ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে তাই পেশা বা বৃত্তি। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে পেশার উদ্ভব ও বিকাশ, যা চলমান উত্তরণের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের সমাজে পরিবর্তনের এই ধারা একরূপ নয়, বাংলাদেশের অনেক পেশা দীর্ঘদিনের লালিত। সমাজ পরিবর্তন বা আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি বংশ পরম্পরায়। একইভাবে নির্দিষ্ট পেশাকে অবলম্বন করে তাদের দিন চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেথর, ঝাড়–দার, ডোম, মুচি, নাপিত প্রভৃতি পেশাজীবী। বাংলাদেশের সমাজ-জীবনের পেশাগত পদবি এবং বর্ণ বিভাজন ও বৃত্তিগত শ্রেণিভেদ আমরা প্রাচীনকাল থেকে লক্ষ করি। বাংলায় ডোমদের অস্তিত্বও প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। নৃতত্ত্ববিদগণ বাঙালির দৈহিক গঠন পরীক্ষা করে অভিমত পোষণ করেন যে,  বাংলার আদিম অধিবাসীগণের বংশধর কোল, শবর, পুলিন্দ, হাড়ি, ডোম, চ-াল প্রভৃতি জাতি। এরা নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় এবং অন্ত্যজ অস্পৃশ্য পর্যায়ভুক্ত।

৬৫০ থেকে ১২০০ শতকের মধ্যে রচিত প্রাচীন সাহিত্য চর্যাপদের প্রতিফলিত বাংলার জীবন ও সমাজচিত্রে বিভিন্ন পেশাজীবীর পরিচয় বিধৃত। চর্যাকার কাহ্নপা বলেন-

‘নগর বাহিরি রে ডোম্বি তাহরী কুড়িয়া,

ছোই ছোই জাসি বামহণ নাড়িয়া।’

একইভাবে ভুসুকু বলেন-

‘আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী

নিঅ ঘরিণী চ-ালে লেলী।’

ডোম সম্প্রদায়ের বা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের পরিবেশ দেখে এমন মনে হয়েছে যে ডোমরা ঝাড়– দেয়, পয়ঃপরিষ্কার, শবদেহ উত্তোলন, লাশ কাটা, লাশ সেলাই, মৃত পশু সরানো, পঁচালাশ তোলা, পুনরায় কবর দেয়া, শশ্মানে মৃত দেহ পোড়ানের মত কাজসহ শুকর পালন, বাঁশের কুলা, ডালা, চাটাই, চালনা, ঢোল ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। যারা এধরনের পেশায় নিয়োজিত থেকে আমাদের ঝকঝকে, সুন্দর ভাল থাকতে সাহায্য করছে তারা প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান আধুনিক সমাজেও অপরিহার্য। তবু আমাদের ভদ্র সমাজে এখনো তারা অস্পৃশ্য, ঘৃণিত। এরাই সমাজ সভ্যতার বাইরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বা এশিয়া উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে। বলতে হয় ডোমরা শুধু এ সমস্ত কাজই করতো না, প্রাচীন বাংলার প্রধানত বাহন নৌকা খেয়া পারাপারের কাজও তারা করতো।

সাভার ঐতিহ্যপূর্ণ প্রাচীন জনপদ। নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতি। জাতিতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালির রক্ত তাই একক কোন জাতি বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যকে বহন করে না।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মত বংশপরম্পরায় লালিত পেশাকে ধারণ করে দীর্ঘদিন থেকে ডোম সম্প্রদায় সাভার অঞ্চলে বাস করছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অতি আধুনিককালে এদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে জানতে, সম্প্রতি কথা হয়েছে সুজন, লক্ষ্মী রাণী হেলানী, চন্দনা, দুলাল, ভিকু প্রমুখের সাথে। হরিজন হিসেবে পৌরসভা কর্তৃক বরাদ্দ সাভার অঞ্চলে বিভিন্ন সুইপার পল্লীতে তারা বসবাস করছে। আমাকে দেখে অনেকে অতি-উৎসাহে প্রশ্ন করে, “আপনি কোন এনজিও থেকে এসেছেন?” বললাম কোন এনজিও থেকে আসিনি। আপনাদের সাথে কথা বলবো। অনেকে বলে উঠে তারপর কী পত্রিকায় লিখবেন? বললাম লিখব। অনেকে তাৎক্ষণিক আবদার করে বসে, আমাদের কিন্তু পত্রিকা দিবেন। কেউ আবার প্রশ্ন করে, “আমাদের কথা পত্রিকায় লিখে কি হবে? আমাদের অবস্থার উন্নতি হবে?” উত্তর দিতে পারিনি। একটুখানি চুপ থেকে বললাম ‘জানি না। অন্য একজন মুখ বাঁকা করে বলল, “তাহলে লিখে কী হবে?” কথা শুনে খারাপ লাগলো সত্যিই তো কি হবে? তবু কথা বললাম। বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বললাম আপনাদের সম্পর্কে আমরা জানতে চাই। আপনারা সমাজের অপরিহার্য অংশ। আপনারা ময়লা কেটে পরিষ্কার করেন বলেই তো আমরা এত সুন্দর চলতে পারছি। নাপিত মানুষকে সুন্দর করে, সে নরসুন্দর। কেউ পরে তেমন কোন প্রশ্ন করে না তবে বুঝতে পারি, একটা ক্ষোভ ওদের মনে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম ডোম সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে- ক. ভুঁইমালী, খ. হেলানি জাতি, গ. বাঙালি হাড়ি জাতি, ঘ. টম বাঁশফোড় (বাজফল) ও ঙ. পাটনী ইত্যাদি।

ডোমদের পূর্বের জীবনযাপনের সঙ্গে বর্তমান জীবনযাপনের কতটুকু উন্নতি বা উত্তরণ হয়েছে জানতে চাইলে তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি বলে জানান। আমি বলি, কেন পৌরসভা থেকে থাকার ব্যবস্থা, ছেলে-মেয়েদের আলাদা প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা এগুলো সুবিধা দেয়া তো হয়েছে। তাই না? হ্যাঁ, সমস্বরে সবাই বলল। এও জানালো পৌরসভা থেকে একটি করে ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যে ঘরে ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর। উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাও দাবি করে। অনেক অভিযোগের মধ্যে একটি অভিযোগ, হাসপাতালে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বড় বড় বাবুরা টাকা নিয়ে মুসলমানদের চাকরি দিচ্ছে। ফলে বেকারদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অনেকে এটাও বললেন, নিচু জাত বলে আমাদের মানুষ ঘেন্না করে। আমরা সব জায়গায় যেতে পারি না। সবার সঙ্গে মিশতে পারি না। অন্য সব কাজ আমাদের দেয়া হয় না। আমাদের ঘরে কেউ খেতে চায় না। আমাদের চাকরি যদি অন্যরা নিয়ে নেয় তাহলে আমরা কী করবো। ভারতচন্দ্র  অন্নদামঙ্গলকাব্যে ‘ঈশ্বরী পাটনীর’ কথা উল্লেখ করেছিলেন। খেয়া পারাপারকারী এই মাঝি পাটনীদের এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকতার ফরে, মাটি ভরাট করে নদীমাতৃক বাংলাদেশের রূপ যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি ইংরেজ শাসনের বদৌলতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুৎসুদ্দি তথা দালালি অর্থনীতি। তাই এদের নিশ্চিহ্ন করে ঘাটের মালিক বা জলের মহাজন, যারা খাজনা আদায়ের ইজারাদার হয়ে বসেছে। অধিকাংশ মুসলমান ইজারাদার মুসলমান মাঝিদের দাপটে খেয়া ঘাটে পাটনীদের আর দেখা যায় না। প্রচণ্ড ঝড়ে এরা শক্ত হাতে বৈঠা ধরতে পারলেও স্তরবিশিষ্ট দুঃসহ সমাজ ব্যবস্থাকে ভাঙতে পারে না। আর পারে না বলেই নিজেদের সামাজিক সমতায়, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এরা অক্ষম। সাভার শহরের বিভিন্ন এলাকার সুইপারপল্লীতে প্রায় আড়াইশত পরিবার বাস করছে এবং এর বাইরেও রয়েছে অনেকে। দু’একটি পরিবার ছাড়া অধিকাংশ পরিবারের অবস্থা খুব একটা ভাল না। অনেকেই কাজ পায় না।

এরা খুব কষ্ট সহ্য করতে পারে এবং অল্পেই সন্তুষ্ট থাকে। এজন্য এদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কম। ডোমরা অল্প শিক্ষিত বা অক্ষর জ্ঞানহীন হলেও সময়, সমাজ, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মোটেই অসচেতন নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ওরা খুবই শঙ্কিত। ফেরার সময় অনেকে আবেদন জানালো ‘ভাই আমাদের কথা সরকারকে জানাবেন।’ বিদেশের মেথর, ঝাড়–দাররা তো আমাদের মত কষ্ট করে না। ওদের নাকি অনেক বেতন? মেশিন দিয়ে কাজ করে। কেউ ওদের ঘৃণার চোখে দেখে না।’ আশ্বাস দিতে পারলাম না ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সময়েও।

আহসান ইমাম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;