মাসুদ খানের প্রিয় কবিতা



মাসুদ খান, অতিথি লেখক
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

পারাপার  

কথা ছিল, দেব যৌথসাঁতার। অথচ কথা ভেঙে
একক ডুবসাঁতারে একা চলে এলাম এ-লোকান্তরে 
তোমাকে ছাড়াই, ওগো সহসাঁতারিনী। 

অনেক তো হলো পরলোকে!
এইবার সাঙ্গ করি পরপারলীলা
দিই আরো একটি অন্তিম ডুব। 

ভেঙে দিয়ে এপার-ওপার ভুয়া ভেদরেখা
এক ডুবে ছুটে আসব পরলোক থেকে
সোজা ইহলোকেই আবার।  
তোমাকে দেখার কী যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমার!

গিয়ে দেখে আসি-- ওহে মুক্তকেশী,
আজ কোন লকলকে লাউডগা সাপে
বেঁধেছ তোমার
শিথিল চুলের রাশি।

 

উচ্চতর বাস্তবতা

মায়েরা মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে চলে যান দূরের বিদেহপুরে।
তারপর প্রতিদিন ওই ব্যস্ত বিদেহনগর থেকে এসে
ঘুরে ঘুরে দেখে যান যার-যার ছেড়ে-যাওয়া সোনার সংসার।
অন্তত প্রথম ত্রিশ দিন। 

কী করছে আহা সোনামণিরা তাদের,
কেমনই-বা কাটছে তাদের দিন, মাতৃহীন
বিষাদবাতাস, বাষ্পঘন দীর্ঘশ্বাস
ফাঁকা-ফাঁকা ঘরদোর, আশপাশ
মায়ের অভাবে উঠানের কোণে বিষণ্ন দাঁড়ানো জবাগাছ। 

নবমৃত মায়েদের কি-জানি কেবলই মনে হতে থাকে
বেঁচেই আছেন তারা সংসারে, হয়তো

সংসারেরই ভিন্ন কোনো সম্প্রসারে, ঘুমঘোরে,
অন্যতর মায়ায়, আবেশে।
যেমন জন্মের অব্যবহিত পরের দিনগুলি...
নবজাতকের কাছে
বোধ হতে থাকে যেন সে রয়েছে তখনো মায়েরই গর্ভকোষে। 

উপমান  

তোমার মুখের ওপর ঝেঁপে নেমে আসছে বেসামাল কেশদাম, খেয়ালি হাওয়ায়।
তারই ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে এক লালচে নির্জন দুষ্টব্রণ, গণ্ডদেশে তোমার-
যেন পুঞ্জাক্ষ আনারসের ঝোপে ছোট্ট এক রূপদক্ষ গিরগিটি...
অতিদূর অতীত থেকে ভেসে আসে দূরগামী তূর্ণ ট্রেনের সিটি।

 

অলুক, অনশ্বর 

তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?  
যে যেখান থেকে যে-যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে। 

সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় চৌদ্দ শ কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই।      
অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান—
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।
জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারী অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়...
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে...কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে...         

সাড়ে চার শ কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।  

 

অপ্রাকৃত 

ছোট্ট একটি ট্রেন— কিশোরী-বয়সী। অসুস্থ, অর্ধবিকল।
পরিত্যক্ত লোকোশেড ছেড়ে
নিশীথে বেরিয়ে পড়ে একা, নিশ্চালক। 
সারারাত কোথায়-কোথায় কোন পথে ও বিপথে ঘুরে বেড়ায়...
কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে... 

রেললাইন ছেড়ে নেমে যায় মাঠে। চলতে থাকে মাঠের ভেতর
পৌষের শূন্য শীতার্ত মাঠ...
সুখী মানুষেরা ঘুমে। অসুখীরা নির্ঘুম, ঊনপ্রাকৃতিক—
দীর্ঘনিশ্বাসের আতসবাতাসে একাকার তাদের ঐহিক-পারত্রিক। 

ঘুমে-ঢুলুঢুলু স্টেশনের বিধ্বস্ত কোণে
কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি সোল্লাসে মেতেছে সম্মিলিত স্বমেহনে।
পথ থেকে এক পথকিশোরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিচ্ছে দুই সমকামী
সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে পালাচ্ছে এক শবাহারী।
কাঁপতে কাঁপতে এগুচ্ছে চোখবাঁধা এক হতভাগা,
ক্রমে ক্রসফায়ারের দিকে।
তা দেখতে পিছু নিয়েছে দুই রোঁয়া-ওঠা ঘেয়ো ক্ষুধার্ত কুকুর
আর রাজ-রহমতে সদ্য-ছাড়া-পাওয়া এক মৃত্যুসাজাপ্রাপ্ত খুনি।
বাসায় বাসায় বন্দি, নির্যাতিতা শিশু পরিচারিকাদের স্ফুট-অস্ফুট কান্না...

এসব কোন অ্যাবসার্ড নাটকের নিষ্ঠুর নাট্যায়ন, ঘূর্ণ্যমান নাটমঞ্চে!
শেষ অঙ্ক থেকে পিচকারির বেগে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সমাপ্তিসংগীত— 
পরাজিত মানুষের শোচনা ও খুনির নৈশ নিভৃত অনুশোচনা
এ-দুয়ের মিশ্ররাগে জেগে-ওঠা এক নিষ্করুণ গান।

প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের ভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া সব দৃশ্যনাট্য
ঠেলে উজিয়ে চলেছে সেই পালিয়ে-বেড়ানো ট্রেনটি।

কেউ কি দেখেছে ট্রেনটিকে?
—কেউ না।
শুধু পরান মল্লিকের চির-রোগা রাতজাগা ছেলেটি বারবার বলে যাচ্ছে—
“অনেক রাতে জানালা খুলে দেখি-কি,
আগাগোড়া ফিনফিনে কুয়াশা-কালারের হিজাবে মোড়া
নূপুর-পরা এক ঘরপালানো গৃহবধূ
ত্রস্তপায়ে ঝুমঝুম শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দূরে  
আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।" 

কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না তার কথা।


সাবান
গাছ

নদী দিয়ে কত কী যে ভেসে আসে! আমাদের নদী দিয়ে।
নানান দেশের ওপর দিয়ে বয়ে আসা আমাদের নদী। 

একবার উজান দেশের এক ভূমিকম্পে ভেসে এসেছিল শয়ে শয়ে শালগাছ...
সেগুলি ধরে ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দমাদম বানিয়ে নিয়েছে
বাস্তুঘরের খুঁটি। এখনো টিকে আছে।
একবার ভেসে যাওয়া এক শালপ্রাংশু মরদেহ ধরে এনে
পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। কিছুই গজায়নি। 
আরও আসে ভেসে জলজ্যান্ত মানুষ-মানুষী-
সাপে-কাটা, অজ্ঞান, মাকড়ে-কাটা, গুম-হওয়া, ঘুম-পাওয়া, আর
মাঝে মাঝে ঘুমন্ত মানুষ।
ওই যে আমাদের ছোটকাকি, হলদে পাখি হয়ে উড়ছেন এঘর ওঘর,
একদিন তিনিও এসেছিলেন ভেসে, ভেলায় ঘুমন্ত শিশু, আমাদের নদী দিয়ে। 

ওই যে রাজপুরুষের মতো উপচানো ঢেউ-জাগানো মেজফুফা,
তিনিও তো নদী-ভাসা, তাকেও তো পাই এই নদীটি থেকেই...
নদীতে মানুষ পাই আর ধরে এনে জুড়ে দিয়ে সংসারে লাগাই। 

আর ভেসে আসে বিচিত্র সব ফল ও বীজ।
একবার এক অচেনা বীজ এনে পুঁতে দিলেন আমার বাবা।
ভেবেছিলেন, হবে হয়তো কোনো সুমিষ্ট ফল, বিরল জাতের। 

বীজ ফুটে গজায় গাছ। গাছ বাড়ে দিনে দিনে।
ফল হয়। পাকে। পাকা ফল থেকে,
এ কী! সাবানের ফেনার মতো শুধু ফেনা!
কোথায় সুমিষ্ট ফল, কোথায় কী!
বৃক্ষ, তোমার নাম?
-ফল-এ পরিচয়।
ফলে, গাছটির নাম হলো সাবানগাছ। 

কাক যখন দ্যাখে যে, কী! তারই বাসার ডিম থেকে ফোটা বাচ্চারা
দিনে দিনে হয়ে উঠছে কেমন ভিন্ন আদলের, কণ্ঠে ফলছে ভিন্নরকম স্বর,
তখন যে বিরক্তি, বিস্ময়, ও অসহায়ত্ব নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাদের দিকে--

বাবাও সেরকম তাকিয়ে থাকতেন ওই সাবানতরু আর সাবানফলের দিকে
বহুদিন, বহুবছর। আবার গুনগুন করে গাইতেনও-
‘বাঞ্ছা করি সুমিষ্ট ফল পুঁতলাম সাধের গাছ
ফাঁকি দিয়া সে গাছ আমায় ঝরায় দীর্ঘশ্বাস
মনে দুঃখ বারোমাস...’ 

তারপর একদিন তো তিনি নিজেই গত হলেন;
নদী থেকে পাওয়া সেই অদ্ভুত ফলের গাছ
একদিন নদীই ভাসিয়ে নিয়ে গেল। 

তবে ওই সাবানফলেরা বহুবছর ধরে আমার বাবার ময়লা সন্তানদের
ততোধিক ময়লা পোশাকগুলিকে ঋতুতে ঋতুতে কিছুটা হলেও
ফর্সা ও উজ্জ্বল করে দিয়ে আসছিল...

 

ব্লিজার্ড 

আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।

অজস্র কার্পাস ঝরছে

লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।  
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।

আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি  
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।


প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল

(রামকৃষ্ণ পরমহংস...) 

রামশরণ ব্যাধ গিয়েছিল শিকার করতে, প্রহ্লাদপুরের জঙ্গলে। শিকার মিলেছে প্রচুর। শিয়াল, শজারু, শকুন, গোধিকা, গন্ধগোকুল, ফেজান্ট, কাছিম...। মেলেনি কেবল কাক আর বক; ওদেরকে তো আগেই ভস্ম করে দিয়েছে তপস্বী। দুপুরের দিকে পশুপাখিগুলিকে কেটেকুটে মাংসের ভাগা দিয়ে বসেছে ব্যাধ, পাকুড় গাছের নিচে। সাতমিশালি মাংস, বিক্রি হচ্ছে খুব। শব হয়ে শুয়ে আছে শিব। কালী লীলা করছে তার বুকের ওপর, যেভাবে প্রকৃতি লীলা করে পুরুষের ওপর; জীব, পরমের। বালিতে মেশানো চিনি, নিত্য-র সাথে অনিত্য যেমন। এসো পিঁপড়া দলে-দলে, সিরিজে-সিরিজে, বালি রেখে চিনি বেছে খাও...

ফেরার পথে একটি ঘাসখেকো বাঘের শাবকও সাথে করে এনেছে রামশরণ। জন্মের পরপরই মেষেদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল আলাভোলা ব্যাঘ্রশিশু। সে এখন ঘাস খায় বটে, কিন্তু রাগ আছে ঠিকই, ক্ষাত্রতেজ অব্যাহত...ঠাস-ঠাস করে থাপড়ায়, দাবড়ায় বড়-বড় নিরীহ ভেড়াদের।

 

হর্ষতরঙ্গ 

সরো সরো, ঈশান থেকে তিরের বেগে ওই নেমে পড়ছে হংসবাহিনী— উঠানে, অঙ্গনে, ধানখেতে, নয়ানজুলিতে। আর নৈর্ঋত থেকে ছুটে আসছে দস্যি বাচ্চারা। এসেই দুই ডানা পাকড়ে ধরে উঠে পড়ছে রাজহাঁসের পিঠে। তা-ই দেখে ঘাস থেকে মুখ তুলে মুচকি হাসছে খরগোশ, প্রশাখাজালের আড়াল থেকে কাঠবিড়ালি।

এক হোঁদলকুতকুতে, দুষ্টের চূড়ামণি, এমনিতেই লেট লতিফ, তদুপরি পিছিয়ে পড়ছে বারবার, কুকুরছানার কান মলে দিয়ে, পোষা শজারুর শলাকা ধরে টান মেরে, খুচরা নটাংকি সেরে, দুই কাঁধে দুই অস্থির গুঞ্জরণরত বাচ্চা বসন্তবাউরিকে বসিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে শেষ হংসবাহনের দিকে। হাঁসটি তখনো নয়ানজুলির জলীয় রানওয়েতে। উড়ালে উন্মুখ। বাচ্চাটি জলকাদা মাড়িয়ে এসে আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে কোনোমতে হাঁকুচ-পাঁকুচ করে উঠে পড়ছে সর্বশেষ হংস-ফ্লাইটে। পেছন পেছন আলপথে হেলেদুলে আসছে কান-মলা-খাওয়া নাদুসনুদুস কুকুরছানাটিও।                 

তুলাপ্রসূ সব শিমুলের গাছ, ফলপ্রসূ সব আম ও আমড়া বাগান। তাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে হংসবাহিনী। এক-একটি হাঁসের পিঠে এক-একটি শিশু। উড়ে যেতে যেতে উৎফুল্ল বাচ্চারা ভূমণ্ডলের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেবার মুদ্রায় ফুঁ দিচ্ছে হাতের তালুতে। একবার ডান হাত, আরেকবার বাম। দুই দিকে জেগে উঠছে ছোট-ছোট হাওয়াহিল্লোল। আর সেই হিল্লোলের হালকা ধাক্কাতেই সঙ্গে-সঙ্গে নিচে আগুন ধরে যাচ্ছে হুলুস্থুল কৃষ্ণ- ও রাধাচূড়ায়, আর আমের পাতারা খিলখিল আহ্লাদে ঢলে পড়ছে প্রতিবেশী আমড়ার পাতাপল্লবের ওপর।    

আজ আগুনে-বাতাসে গুলতানি, পলাশে-শিমুলে শয়তানি,
আমে-আমড়ায় দুষ্টামি একটানা 
আর সাগর দুলছে পাহাড় ঢুলছে আকাশ ঝুলছে মাথার ওপর উড়াল শহর
ভোলাভালারা ভুলছে, লহরি তুলছে, ধীরে ঊর্ণা খুলছে মেঘের বহর...   

 
কৌতুকবিলাস

ঈশ্বর ছুড়েছে ঢিল ঈশ্বরীর দিকে, কৌতুকবিলাসে।

গ্রহটিকে মাটির ঢেলা বানিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে
ক্ষেপণ করেছে ভগবান, অন্য প্রান্তে থাকা ভগবতীর প্রতি। 

মহাকাশ জুড়ে প্রসারিত মহাহিম শূন্যতা, লক্ষ-ডিগ্রি নিস্তব্ধতা—
তারই মধ্য দিয়ে একপিণ্ড ছোট্ট শ্যামল কোলাহল হয়ে
ধেয়ে যাচ্ছে এই ঢিল। 

ঢিল নয়, মহামিসাইল—
মহাকাশের জোনাক-জ্বলা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে
একের পর এক যমজাঙাল পেরিয়ে মিথ্যা-ইথারে অস্থির

ঢেউ তুলে ছুটছে ঢিল অহেতু আহ্লাদে
গোঁয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একদিকে টাল হয়ে চক্কর খেতে খেতে
ঘোর-লাগা লাটিমঘূর্ণনে

আহ্নিকে বার্ষিকে ধোঁয়াজট বেগব্যঞ্জনায়—  
যে বেগ উদ্ভ্রান্ত, যেই গতি একইসঙ্গে ঋজুরেখ বক্র চক্রাকার
ঘূর্ণ্যমান নাটকীয় একরোখা দুর্ধর্ষ ও ওলটপালট... 

ছুটতে ছুটতে হয়রান ঢিলখানি।
ওদিকে ঈশ্বরী, ওই রাঘবরহস্যে-ঘেরা উত্তুঙ্গ রহস্যরাজ্ঞী,
সর্বনাশা এক ভাব-আলেয়ার ভাব ধ’রে অজ্ঞাত স্থানকালাঙ্কে ব’সে 
থেকে-থেকে ছিনালি-হাতছানি একটু দিয়েই সরে যাচ্ছে দূরে। 

মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে মহাকাশ।
বেঁকে-যাওয়া, বাঁকতে-থাকা, ক্রমপ্রসারিত
এক দেশকালের ভেতর দিয়ে ঘটতে থাকে
ঢেলাটির উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ ছুটে-চলা। আর
ছিটকে পড়ার ভয়ে ভয়ার্ত শিশুর মতো ছুটন্ত ঢেলার গা আঁকড়ে ধ’রে
চাম-উকুনের মতো চিমসা দিয়ে পড়ে থাকে প্রাণপণ
তটস্থ ও অসহায় প্রাণিকুল। 

খেলা করে ভগবান ভগবতী— বিপজ্জনক ঢিল-ক্ষেপণের খেলা। 
আর রোমাঞ্চে ও ত্রাসে শিউরে-শিউরে কেঁপে ওঠে তাদের শিশুরা।

 

ফাতনা

সরল ছিপের এক প্রান্তে মাছশিকারি, চুপচাপ,
অন্য প্রান্তে মাছ। 

মাঝখানে নিরীহ ফাতনা— ভাসে নিরুপায়, মধ্যপক্ষরূপে।
তাকায় চঞ্চল শিকারের দিকে একবার, পরক্ষণে ধূর্ত শিকারির প্রতি।

জগতের প্রত্যেকটি ঘটনার তীব্র, তুঙ্গ মুহূর্তে হাজির থাকে
তৃতীয় একটি পক্ষ। থাকে এক সুদর্শন মাছরাঙা—
বড়শির বিবেকের মতো বাঁকা, রঙিন, আকর্ষণীয়।

আর এই সমস্তকিছুর মৌনী মধ্যস্থতা আকারে ভাসতে থাকে
একা এক শোলার ফাতনা। 

 

নিঃসঙ্গ 

লক্ষ-লক্ষ মাইল উঁচুতে, মহাকাশে,
জনমানববিহীন ভাসমান একটি স্পেস-স্টেশনে পোস্টিং পেয়ে
এসে জয়েন করেছে এক স্টেশনমাস্টার।

একদিন একটি রকেট এসে প্রচুর বোঁচকা-বুঁচকিসহ তাকে নামিয়ে দিয়ে,
ফুয়েল-টুয়েল নিয়ে কোথায় যে চলে গেল কোন আসমানের ওপারে...
সে-ও কতদিন আগে! 

মৃত্যুরও অধিক হিম আর নির্জনতা...
মানুষটি একা-একা থাকে, খায়, ঘুমায়— ওজনহীন, নিঃসাড়, নির্ভার...
মাঝে মাঝে নভোপোশাক পরে বাইরে সাঁতার কেটে আসে শূন্যে,
তখন সে বাঁধা থাকে ধাতুরাংতারচিত এক লম্বা লাঙুলে, স্টেশনের মাস্তুলের সঙ্গে। 

কাছে-দূরে কোত্থাও কেউ নেই,
কোনো প্রেত-প্রেতিনী, অথবা কোনো যম-যমী, জিন-পরি, ভগবান-ভগবতী,
ফেরেশতা-ইবলিশ কাঁহা কিচ্ছু নাই, কেউই ঘেঁষে না কাছে, যে,
তার সঙ্গে একটু কথা বলবে, কফি খাবে...
এমনকি মানুষটা যে একটু ভয় পাবে, তারও উপায় নেই...
নিজের সঙ্গেই তাই নিজেরই মিথুন ও মৈথুন, খুনসুটি, হাসাহাসি, সাপলুডো খেলা...   

কেবল রজনীস্পর্শা, ভীষণবর্ণা এক গন্ধরাজ্ঞী ফুটে থাকে অবাধ, অনন্তরায়...
বহুকাল দূরে...

 

অ-বশ্য 

পাশ দিয়ে দ্রুত ছুটে যাবার সময়
কেশর খামচে ধরে কোনোক্রমে উঠে পড়েছে
দুর্ধর্ষ সিংহের পিঠে
আরোহণশাস্ত্রে অজ্ঞ, অধিকারহীন এক অশিষ্ট বালক।
এখন সে না-পারছে নামতে, না-পারছে থাকতে সওয়ার।
উঠে পড়া যতটা সহজ, নেমে যাওয়া ততটা নয় আর।  

অর্বাচীনে চেনে না সুইচ, ব্রেক, ব্যাটারি, গিয়ার সিলেকটর...
জানে না সিংহ-চালানোর কায়দাকানুন।
অনুমানে, স্রেফ অনুমানে, একটার বদলে অন্যটা
অপারেট করে যাচ্ছে বেদিশার মতো একে-একে।
একে তো ভুল বশীকরণের ছুরা, তা আবার উল্টা করে পড়ে ফুঁ দিচ্ছে
সিংহের কেশরে, একনাগাড়ে।
যেখানেই গিয়ে লাগছে সেই ফুঁ,
সেখানেই অঙ্কুরিত হচ্ছে আহ্লাদিনী অনূঢ়া আগুন।
বিন্দু-বিন্দু বহ্নিচিহ্ন, গোঁফ আর কেশরের আগায় ডগায়।  

জ্বালানি জ্বলছে খুব অন্তর্দাহ সিংহের ইঞ্জিনে
পিস্টনের আজগবি ওঠানামা সিলিন্ডারে গহ্বরে সুড়ঙ্গপথে
সরাসরি অস্বীকার কারনট চক্রের অনুজ্ঞা...
একমুখী ভালভের ভৌতিক কেরামতি
ঘনঘন বাতকর্মে বায়ুদোষে মিথেনে মনোক্সাইডে মুহুর্মুহু মিসফায়ারে
এলোমেলো লুব্রিকেশনে, থেকে-থেকে ফুয়েলের নিবাত দহনে
দুঃশব্দ ও দুর্গন্ধদূষণে প্রাণ-জেরবার আরোহী ও আরোহবাহন।

বেদম নাকাল চারপাশ, নাজেহাল লোকালয়
আরোহণ যতটা সহজ, অবরোহণ ততটা নয়।

 

দমকল

উন্মাদ উঠেছে গাছে, তরতর করে, ছাড়া পেয়ে পাগলাগারদ।

নামে না সে কিছুতেই, যতক্ষণ-না ওই বেঁটেখাটো নার্সটি এসে
মিনতি করে না-নামায় তাকে। 

নার্স আসে দ্রুত, দমকলের মতন
কী-কী যেন বলে হাত নেড়ে নেড়ে,
তাতে খুশি হয়ে নেমে আসে উঁচু ডাল থেকে বিমুগ্ধ পাগল-  
ঝোলের উল্লাসসহ নেমে আসে যেইভাবে কইমাছ পাতে
কানকো টেনে টেনে  
ক্রমিক সংখ্যার মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে।

ঝিলমিল করে বয়ে যায়, সেবিকার বোধে, পাগলের বিকল বিবেক।

উন্মাদ আবার ফিরে যাবে আজ উন্মাদ-আশ্রমে
ধর্মগণ্ডিকায় মাথা রেখে নির্বিকার নিয়ে নেবে
তেরোটি ইলেকট্রিক শক
তেরোবার স্বীকারোক্তি, স্বাস্থ্যযাজকের শান্ত সুধীর নির্দেশে।

 

চিত্রকল্প

কেরোসিন খেয়ে মাতাল হয়েছে মাঝি
গলা ছেড়ে গান ধরেছে মাঝনদীতে
দাহ্য তরলে গোসল সেরেছে বউও
মেতেছে দুজনে নেশায়, নৈশ গীতে।

দুটি প্রাণী এই ঘোর অমাবস্যায়
জড়িয়ে ধরেছে যেই-না আশ্লেষায়,
উগ্র দাহ্য তরলের মৌতাতে
ঘর্ষ-আতশ জ্বলে ওঠে সাথে সাথে। 

জ্বলে ওঠা ওই মাঝি-মাঝিনীর
মিথুনমূর্তি দেখে
ভীতবিহ্বল নৌকাখানিও
নিজেকে পোড়াতে শেখে।

জ্বলছে মাঝিটি, সেই সাথে মাঝিনীও
মধ্যনদীতে জ্বলছে নৌকাটিও।

নৌকা জ্বলছে, নদীও জ্বলছে,
জ্বলছে প্রতিমাযুগ
পালক পুড়ছে, খোলস পুড়ছে
আর যা পোড়ে পুড়ুক।

মাঝি ও মাঝিনী আর ডিঙাখানি
এই তিন বাহু, আর
নদী ঢেউ স্রোত এই তিনে মিলে
চিতা ছয় মাত্রার।

জ্বলন্ত ওই যুগল মূর্তি
দাঁড়ানো লম্বাকার
ষড়ভুজ চিতা জ্বলছে নদীতে
হু-হু হাওয়া, হাহাকার। 

বহুদূর থেকে কূটাগারে বসে
দৃশ্য দেখছি এই
অন্ধ ক্ষুব্ধ নদীকে হয়তোঃ
মানায় এই রূপেই।

জ্বলন্ত ফুলে ফুটে-থাকা দুই
জ্বলন্ত মৌমাছি
বিস্ফোরিত এ চিত্রকল্পে
স্তম্ভিত হয়ে আছি।

লেখক: কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, পিতার কর্মস্থল জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। প্রকাশিত বই : কবিতা— পাখিতীর্থদিনে (নদী, ১৯৯৩) নদীকূলে করি বাস (একুশে, ২০০১) সরাইখানা ও হারানো মানুষ (একুশে, ২০০৬) আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (ভাষাচিত্র, ২০১১) এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (আড়িয়াল, ২০১৪) গদ্য— দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (চৈতন্য, ২০১৫) প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (চৈতন্য, ২০১৬) ই-মেইল : [email protected]

মাসুদ খানের পোট্রেট: শিল্পী সুনীল কুমার পথিক

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;