সরদার ফারুকের কবিতা



সরদার ফারুক, কবি
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

নীতবর

মাঙ্গলিক আচরণ শেষে এক কোপে কেটে নেবে
ছাগমুণ্ড, বৃন্দগান হবে
তুমি কি এখানে নীতবর? তোমাকেও তাই পরিয়েছে
হরিদ্রা বসন, এরপর কোলে তুলে নিয়ে যাবে!

নিষাদ-নারীর চোখ কালো দিঘি, পুরু ঠোঁটে তাম্বুলের রস
বুকের ভেতরে কেন অসময়ে খোল বেজে ওঠে?
তুমি তো জানোই সব নিয়মের কথা
যদিও করেছ স্নান একই ধারাজলে,বাসরের অধিকার নেই!

ভ্রমণ

লাফ দিয়ে ফাঁকা বাসে উঠতেই ছোকরাটা ঝাড়ি মারে-
‘এই মিয়া,যাইবো না। নামেন,নামেন!’
আমি বলি,“গাড়ি চলতেছে, কোথাও এইটা থামবো নিশ্চয়
যেখানেই হোক, আমারে নামায়ে দিয়ো, ট্যাকাটুকা যা লাগে, লাগুক।”

তারপর নিজেকে শোনাই ‘নেতার পোলায় নেতা,এমুন হালার পিছে
ঘুরিনি কখনো। সাদা চামড়ার নাটুকে ছুঁড়ির দিকে
ফিরেও দেখিনি। যামু, তবে কার কাছে যামু?”

সিটের উপরে পা’দুটো উঠিয়ে ভাবি- কাজলে, সিঁদুরে সেজে
কেউ কি কোথাও বসে আছে? কে কোথায় রেঁধে রেখেছিল
নতুন আলুর সাথে ফুলকপি,রুইমাছ!

স্নানঘরে

কারো কারো মুখ দেখে ভাবার সাহসও উবে যায়
একে বুঝি আভিজাত্য বলে?
সাইবেরিয়ার হিম পুষে পৃথক হয়েছে,
বনভূমি নয়,যেন একলা নিষ্পত্র বৃক্ষ--
প্রান্তরের শূন্যতাকে গাঢ় করে তোলে

হয়তো কোথাও কয়লার খনি বলে পরিচিত,
হয়তো কম্বল...
নির্বাচিত স্নানঘরে কেউ গীজারের জল হয়ে ঝরে

এখন তোমাকে ভেবে
ঘুমিয়ে পড়ার একশো উপায় আছে
কাল্পনিক ভেড়া গুনে ঘুমানোর কথা
ভাবলেই হাসি পায়
ওষুধ খাওয়ার মানে অবেদন বীজ বুনে দেওয়া
চারাগুলো বড় হয়ে ঢেকে দেবে
দৃশ্যাবলী, আলোর কুহক

এখন তোমাকে ভেবে জেগে থাকা ভালো
একটানা বৃষ্টি আর হাওয়ার দাপটে
জানালার পর্দাগুলো আরও কিছুক্ষণ
ইচ্ছেমতো কোমর দোলাক!

এবারের শীতে

এবারের শীতে আমি চাই রঙিন ব্লেজার,চকচকে জুতো
ভবঘুরে চেহারায় যেখানেই যাই চেয়ার জোটে না
খাবার টেবিলে ভাত যদি মেলে,তরকারি নেই!

এই শীতে পেতে চাই সান্নিধ্যের সুখ,মডেলের মতো হেসে
তরুণীরা যেন ছবি তোলে কাঁধে হাত রেখে
বুক ভরে যাতে নিতে পারি অচেনা সৌরভ

বেতন বাড়িয়ে দাও,আমিও বিদেশে যাবো
সাগরসৈকতে বসে দেখে নেবো বিকিনি-মিছিল

লোবানের ঘ্রাণ

মৃত কিছু মানুষকে দেখি
চারপাশে জীবিতের ভাব নিয়ে ঘোরে
গোপনে ছড়িয়ে দেয় লোবানের ঘ্রাণ

আমি বলি,“মাটির নিচের ঘর থেকে
কী করে বেরোলে?
যাবার সময় হলে হাসিমুখে যাবো
ভয় দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”

একটি পদ্য

কোষের গভীরে জমে অনিদ্রার বিষ
মনে পড়ে গতজন্ম, সহস্র কুর্ণিশ?
না কি তুমি ভিক্ষু ছিলে দূর কোনো মঠে,
সাঁতারের সরোবর ছিল কি নিকটে?

বণিক ছিলে না জানি, হিসাবেও কাঁচা
শিমফুল ভালোবাসো, প্রিয় পুঁই-মাচা
কোনোদিন গিয়েছিলে বিলুপ্ত শহরে?
যেখানে তোমার মৃত্যু গোপন জহরে

বুনো ঘোড়া পোষ মানে লতার লাগামে
পাথুরে কুঠার দেখে বাইসন থামে?

কবিতা উৎসব

সচিব সাহেব কবিতা পড়ার পরে
পুলিশের বড়কর্তা গান শোনাবেন
লোকাল নেতার ছোট মেয়েটাও ভালো নাচে

তারপর শুরু হবে কিছু সাবেক কবির
কান্নাভেজা দেশপ্রেম, তুমুল বিদ্রোহ
উঠতি কবিরা আছে শেষে

কাঁপা কাঁপা গলা,উচ্চগ্রামে চেঁচানোর
বিপুল ক্ষমতা যার, সে-ই বেশি হাততালি পাবে
মঞ্চে এত ভিড় দেখে কেউ কেউ কবিতার খাতা
লুকিয়ে ফেলেছে

যে মেয়েটা ঘোষিকা সেজেছে,তাকে তো সবাই চেনে
টিকটক ভিডিয়োর জনপ্রিয় মুখ

বিদ্বেষ

আমাদেরও চোখে পড়ে পাখিদের প্রকাশ্য আদর
ক্লান্তি নেই,দ্বিধা নেই...
বিষয়বাসনা,অকারণ উদ্বেগের ছায়া
তাড়া করে ফেরে না কখনো
ডানা ঝাপটালে আবার উড়াল এসে নিয়ে যায়
আকাশের নীলাভ সাগরে

মানুষের ঠোঁটে এত ঘৃণা!চুমু খেতে গেলে
মনে পড়ে যায় অবাক্য,কুবাক্য আর
নাভি থেকে উঠে আসা গভীর বিদ্বেষ

ভালোবাসা

হাসি যেন অমলিন থাকে,চোখের তারায়
দেখি যেন বিজলির কারুকাজ
কাজলে জলের ফোঁটা ভালো নয়
ঠোঁটের আর্দ্রতা অসময়ে মুছে যাবে কেন?
সেখানে মাখতে পারো মেঘের কণিকা,
কোমল রাত্রির অদৃশ্য প্রলেপ

যতদিন ভালোবাসা আছে
ততদিন আমরা তো চারাগাছ,
মাছের নতুন পোনা,
উথলানো দুধের হাড়িতে জমে ওঠা সর!

কবি পরিচয়:

সরদার ফারুকের জন্ম ১৯৬২ সালের ৯ নভেম্বর। পৈত্রিক নিবাস বরিশালের কাশিপুর। পেশায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক। ১৯৮০ সাল থেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন। প্রকাশিত কবিতার বই—‘আনন্দ কোথায় তুমি’, ‘পড়ে আছে সমুদ্র গর্জন’, ‘উন্মাদ ভূগোল’, ‘দীপালি অপেরা’, ‘ও সুদূর বীজতলা’, ‘মঠের গম্বুজ’, ‘দূরের জংশন’, ‘অন্যদের তর্কে ঢুকে পড়ি’, ‘খেলছে একা নীল বিভঙ্গ’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘গির্জার ঘণ্টার মতো উদাসীন’, ‘সিংহাসনের ছায়া’, ‘যূথিকা নার্সারি’, ‘ওঁ মধু, ওঁ শাশ্বত পরাগ’, ‘দিন কাটে পালকের শোকে’, ‘দ্বিতীয় সংসার’, ‘দাসীর বাজারে’। একটি গল্পগ্রন্থ ‘নোনা শহর’।