মন জিনিসটা কী



টোকন ঠাকুর, কবি
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

‘পিজারোর মন যত না বাইবেলের দিকে, তার চেয়ে বেশি সোনার খনির দিকে।’-এটি প্রায় প্রবাদ আজ। এক রাজনৈতিক ভাষণে সেইন্ট কাস্ত্রো পিজারো সম্পর্কে এ কথা বললেন। বাঙালি পাঠক মাত্রই কি পিজারোকে চিনতে পারছেন? তা মনে হয় না।

পিজারো হচ্ছেন একজন স্প্যানিশ যাজক। তার হাতে বাইবেল। একদিন তিনি পৌঁছলেন ল্যাতিনো দেশের মাচ্চুপিচ্চুতে। মাচ্চুপিচ্চুর স্থানীয় আদিবাসীরা গভীর কৌতূহল নিয়ে পিজারোকে দেখতে থাকে। পিজারো মহান যিশুর ঐশী বাণী ছড়াতে ব্যস্ত হলেন। মাচ্চুপিচ্চুবাসীরা সে বাণী মুগ্ধ হয়ে শোনায় মনোযোগ দিল। পিজারো বাইবেল থেকে অনুবাদপূর্বক উচ্চারণ করে চললেন, ... হে মেষপালক, দ্যাখো, আকাশ কত নীল। অথচ নীল হচ্ছে নিছক দৃষ্টি সীমানার মরমি শূন্যতা, আর সমস্ত শূন্যতা জুড়ে থাকি আমি। আমাকে তুমি কোথায় খুঁজবে, বলো? শূন্য থেকে ক্রমাগত শূন্যতার অভিযাত্রায় দ্যাখো আমি তোমাকেই দেখা দেব বলে দীর্ঘকাল নীল হয়ে আছি, আকাশ হয়ে আছি। কত মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে কথা হয়ে, কত পাখি উড়ে যাচ্ছে সুরধ্বনি তুলে, কত রোদ ঝরে ঝরে পড়ছে গান হয়ে, কত প্রেম ঘনীভূত হচ্ছে কবিতা হয়ে...

যাজকের জলদ-গম্ভীর গলা শুনতে শুনতে মাচ্চুপিচ্চুবাসীদের চোখে ঘুম এসে যায়। তারা ঘুমিয়ে পড়ে নবনির্মিত চার্চের বারান্দায়, তারা ঘুমিয়ে পড়ে নক্ষত্রের পাশে। তাদের ঘুমন্ত শিয়রে ধবধবে ছায়া ফেলে রেখে হেঁটে বেড়ান যাজক পিজারো। ঘুম ভাঙলে তারা দ্যাখে, তাদের সোনার খনি লুট হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের মাথার কাছে বাইবেল, তাদের হাতে হাতে বাইবেল। এরপর ইতিহাসের কালো পৃষ্ঠায় বহু রক্ত, গ্রন্থাগারের তাকে তাকে মাচ্চুপিচ্চুবাসীদের সারি সারি লাশ। তাদের সোনার খনি লুট হয়ে গেছে। পিজারোর মুখে ঐশী আভা, দিগবিজয়ীর চার্চীয় হাসি। একদিন কুব্যার রাজনৈতিক সেইন্ট ফিদেল কাস্ত্রো তার এক ভাষণে বললেন, ‘পিজারোর মন যত না বাইবেলের দিকে, তার চেয়ে বেশি সোনার খনির দিকে।’

দৃশ্যত, হাতে বাইবেল, কিন্তু লুট হয়ে গেল সোনার খনি- তাহলে মন কী জিনিস? মনের মধ্যে কত রাজনীতি! মনের মধ্যে কত যুদ্ধ, রক্তপাত? মনের মধ্যে কত ইতিহাস, গাথা, গান, কবিতা কিংবা ছটফটানি! মনের মধ্যে কত প্রেম, বিরহ, জ্বালা, অসুখ এবং উপশম! মন নিয়ে কত ছিনিমিনি। মন নিয়ে কত বাড়াবাড়ি, কত ভাব-অভাব! মনের কী প্রভাব! মনের কথা লিখে প্রকাশ, কীরূপে সম্ভব, হরি? মন কি কথা শোনে? মন কি বারণ শোনে? মন কি শোনে আদৌ? তবে কি মন বোবা-কালা-বধির? মনের কথা ভাষায় লেখা আর পানের দোকানদারের পক্ষে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সভাপতি হওয়া একই রকম দুরহ ব্যাপার।


ঠিক এ কারণেই হয়তো লিখে রেখেছি, ‘ভাষার সমস্যা আছে। সব কথা সে প্রকাশে সমর্থ নয়। যতই পণ্ডিতি করি, সান্ধ্য সুর ধরি, ঠিক যেন হলো না- মনের কী বলার ছিল? কী বলার মধ্যে আমি কী ভাব বোঝাতে চেয়েও, শেষ পর্যন্ত বাক্য যেন বাগে এলো না, বরং মহা বিট্রে করে বসল। কুয়োর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া চৈত্র মাসের মহাজোছনা যেন আমি আর তুলে আনতে পারলাম না। ভাষায় আমি জোছনা দেখাতে পারছি না, সূর্যাস্ত দেখাতে পারছি না, যুদ্ধ দেখাতে পারছি না, রক্ত কতটা লাল দেখাতে পারছি না, বাতাসের বেয়াদপ আচরণ দেখাতে পারছি না। এমনকি আমার মন কতখানি অবাধ্য যে, সে আমার ঘরেই থাকে না, প্রত্যেকদিন একই রাস্তায় একই দিকে যায়- মনোগমনের এ বর্ণনা লিখে বোঝানো অসম্ভব! অ্যাবসার্ড! কারণ, ভাষা শিল্পকে যতটা সমর্থন করে বা শিল্পীকেও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে পারে কিন্তু শিল্প ও শিল্পীর মধ্যে যেটুকু প্রচ্ছন্ন দূরত্ব, যতটা লৌহবেদনা- ভাষা তা কখনোই স্পর্শ করতে পারে না। কতটা নির্মম, দুর্ভাগ্যপীড়িত, যদি বলো, এই ভাষাতেই আমাকে লিখে জানাতে হবে সেই প্রচ্ছন্ন দূরত্বের গল্প, লৌহবেদনার ইতিকথা! মন-আনমনা, বাক্য যেন ভাব বুঝল না, বাক্য মহা বিট্রে করে বসল। অথচ কুয়োর মধ্যে চৈত্র মাসের মহাজোছনা গড়াগড়ি যায়...’

কিন্তু মন যতই আনমনা হোক, মন যতই পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে চাক না কেন, এত সহজে আমরা মনকে ছেড়ে দিতে পারি না। মন নিয়ে যথেষ্ট মনোযোগ আমাদের দিতেই হবে। মনের সঙ্গে বা মনের কাছে হেরে গেলে চলবে না।

মন কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যে তার হুকুম মেনে চলতে হবে? মন কি পুলিশ, যে তেড়ে আসবে যখন-তখন? পুলিশের কথাই যখন এলো, তখন বলব, মন কি বিডিআর, বিদ্রোহ করেছে? মনের বিদ্রোহ দমন হয় একসময়, মনের নাম পাল্টে যায়। মন সীমান্ত প্রহরী হয়ে যায়। মন বর্ডার গার্ড দেয়। মন যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তার মানে মন সেনাবাহিনীও? মনকে কোথায় রাখি?

দেশে আজ মন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হারানো মন অনুসন্ধান কমিটিও কাজ করে চলেছে। মন সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বাজেটে বরাদ্দ আছে। মন কী চায়, তার ওপরে রিসার্চ-ফেলো চলছে। মনোসমীক্ষকের আনাগোনা বাড়ছে। মন ঢুকে পড়ছে গানে গানে, কবিতায়। মন অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে নো-ম্যানস-ল্যান্ড ছাড়িয়ে পররাষ্ট্রের উঠোন বাড়িতে। মনকে কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না। মন যা চাচ্ছে, তা কিছুতেই মিলছে না। মন যা চাচ্ছে না, তাও কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না। দিনে দিনে মন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হয়ে উঠছে। ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে, সর্বদা অদৃশ্য, মন। গগন হরকরা মনের মানুষ খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হয়ে গেলেন, লালন ‘মনোবেড়ি’ দিতে চাইলেন, র. ঠাকুর মনের ওপর জমিদারিও দেখালেন, তবু মন কি কারও আয়ত্তে এলো? মনের কথা আমি কাকে বলব? কারে জানাব মনের দুঃখ গো, আমি কারে জানাব জ্বালা? আমার মনের ঘরে তালা।

দেখলাম, স্মরণ করতে পারি, সেই প্রথম, কিংবা তারও আগে ঘটে থাকতে পারে কিন্তু মনে পড়ছে সেই এক প্রথমেষু, আমার তাজা মন ভেঙে গেল। মনভাঙা কাকে বলে, জানা হলো। কারণ কী? মামাবাড়ির ইশকুলেই প্রথম ভর্তি হই, সেখানে বনভোজন হবে, তখনও আমি জানি না, বনভোজন জিনিসটি কী? তো পঞ্চাশ পয়সার চাঁদায় সেই ইশকুলের বনভোজনে আমার নাম লেখা হলো। আমার মন খুশিতে নেচে উঠল। বনভোজন হবে শনিবার। কিন্তু মামাবাড়ি থেকে বনভোজনের তিনদিন আগেই, কী কারণে যেন আমাকে দাদাবাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। তখন আমি পড়ি হয়তো ওয়ানে। দাদাবাড়িতে যাওয়ার দু`দিন পর, বনভোজনের আগের দিন আমার মন খারাপ হলো। সন্ধ্যায় মন আরও খারাপ হতে লাগল। রাত পোহালেই শনিবার, মামাবাড়ির ইশকুলে বনভোজন। মামাবাড়ির ইশকুলের পেছনে সত্যি সত্যি একটা বড় বাগান ছিল। বনভোজন হবে সেই বাগানে।

তো মন আমার যতই খারাপ হোক, বাড়ির বড়রা তা তেমন আমলে নিল না। রাতে আমার ঘুম হলো না। ভাবলাম, সকালে আমাকে ঠিকই নিয়ে যাওয়া হবে মামাবাড়িতে। তারপর আমিও যোগদান করব বনভোজনে। যাই হোক, সকাল হলো। আমার মন খারাপ আরও বাড়ল। আশা করলাম, আমার মন খারাপ দেখে কেউ আমাকে ঠিকই নিয়ে যাবে জোড়াদহে, ভায়নায়। কিন্তু সে রকম কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে আমি কান্না শুরু করলাম। আমি জোরে জোরে কাঁদতে লাগলাম। আমি কাঁদতে কাঁদতে উঠোনে গড়াগড়ি দিলাম। আমার কান্নায় বাড়ির কারও মন গলল না। ফলে আমার মন ভেঙে গেল। ভীষণ মন ভেঙে গেল। সেটাই কি আমার প্রথম মনভাঙা? এর কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।

দাদাবাড়ির ইশকুলে, মধুপুরের পাশে গাড়াগঞ্জে পাকাপাকিভাবে চলে আসার পর, ক্লাস টুতেই ভালো লেগে গেল ঊর্মিকে। ঊর্মিরা একদিন বদলি হয়ে চলে গেল। খুব মন খারাপ হলো। এক রাতে, বাড়ি থেকে পালিয়ে বাজারে আসা কমলা সার্কাসের তেলেসমাতি খেলা দেখতে গেলাম। যাবার পথে, কোথাও যেন এক ছাতিম ফুলের ঘ্রাণে, সেই জোছনা রাতে, রূপোলি আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। মন কেমন করে ওঠা রাত। মন হুহু করে যাওয়া রাত। মন পু পু করে যাওয়া জোছনা। মন ধু ধু করে যাওয়া ছাতিমের আগ্রাসী ঘ্রাণ, ঘ্রাণজুড়ে চরাচর কিংবা চরাচর জুড়ে ঘ্রাণ- সেই ঘ্রাণে মন কেমন করে? সে বয়সে, একটি ঘটনা খুব মনকে নাড়া দিয়ে গেল। আমাদের ইশকুলেরই নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী কাকে যেন ভালোবেসে শেষে ধানগাছে দেওয়া ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করল।

সেই মেয়েটির নাম কী? ভুলে গেছি। কিন্তু তার কবর দেখতে গিয়েছিলাম। তার জন্য যে কী পরিমাণ মন খারাপ হয়েছিল সেসময় কিছুদিন, আমি জানতাম, সেই মন খারাপ থেকে আমি আর বেরুতে পারব না। সেই মেয়েটির নাম আমার ডায়েরিতে লেখা আছে। কিন্তু সে সময়ের ডায়েরি আর আমার এ সময়ের ইতিহাস কত বিস্তর ফারাক। আমি ডায়েরি লিখতাম।


আমার সে সময়েরই কোনো এক ডায়েরিতে পাওয়া যাবে আরও এক মেয়ের নাম, যে মেয়েটিও একদিন পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করল এক সীমান্ত-মালামাল পাচারকারীকে। তাতেই মন খারাপ হলো। খুব মন খারাপ হলো। একদিন তাদের ঘরে একটি সন্তান এলো। একদিন সেই পালিয়ে যাওয়া মেয়েটিকে তার ঘরেই ফ্যানে ঝুলন্ত পাওয়া গেল। তার স্বামীকে পুলিশ জেলে নিয়ে গেল। একদিন জেল থেকে বেরিয়েও এলো সে। বারবার মন খারাপ হলো। কিছুই করার থাকল না।

মন ছমছম করে গেল। পৌর শ্মশানে সারারাত সাহস-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে গিয়ে, আমি আর আমার বন্ধু রাজু ঝুঁকি নিয়ে শ্মশানেই কাটিয়ে দিলাম। ফাঁকা মাঠের মধ্যে গিয়ে হঠাৎ চৌদিকে তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই। লোকালয় কত দূরে। সন্ধ্যা আসন্ন। মন নিঃসঙ্গ হয়ে গেল। মন খুব লোনলিনেসে আক্রান্ত হলো। মন কাগজের নৌকা হয়ে ভেসে চলল। মন ভেসে গেল ভরা বর্ষায়, উঠোনের জমে যাওয়া জলে।

মন ভায়নার কালীতলার পুজোর মেলায় বুড়ো বটগাছের শিকড়ে বসে থাকল। মন ঝিনেদার দেবদারু এভিনিউতে কত কত সন্ধ্যা, বিকেল, রাত বসে বসে নবগঙ্গার জলে তালের ডিঙি হয়ে গেল। মন ভেসে চলল মুরারীদহের দিকে। মন পরিত্যক্ত রাজবাড়ির চিলেকোঠায় হারিয়ে যাওয়া গল্পের পেছনে ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে শতবর্ষ পূর্বের এক সন্ধ্যায় পৌঁছে গেল। মন সেখানে যুবরাজ, মনের সামনে যুদ্ধ, মন যুদ্ধে যুদ্ধে ক্লান্ত হলো। তবু মন ক্লান্ত হয় না। মন আবার উঠে দাঁড়ায়। মন রায়মঙ্গলা নদীতীরের জোছনায়, জোয়ারের ঢেউয়ে ঢেউয়ে কল্লোল তুলে গেল। মন চন্দ্রবিন্দুর হাওয়ায় কুড়িয়ে ফের হাওয়ায় হারিয়ে ফেললাম। মাতাল রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মন চাঁদে পৌঁছে গেল। সেখানে চাঁদের দেশে, দলছুট শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী মন নিয়ে গান-সুর বেঁধে চলেছেন। মন দিয়ে শুনি সেই গান...

একবার রুমাবাজার থেকে পায়ে হাঁটা ঝিরিপথে বগা লেক হয়ে পরদিন কেওক্রাডংয়ের চূড়োয় উঠলাম, সুন্দরবনের ভেতরে লালকমল-নীলকমল গিয়েছি, সেন্টমার্টিন দ্বীপাঞ্চল চষে বেড়িয়েছি, কেন? সম্ভবত, হারিয়ে যাওয়া মনটার খোঁজে। কান্তজীর মন্দিরে গিয়ে মন হারিয়ে এসেছি। স্মরণীয়া নদীর ঢেউয়ে মন খুইয়ে ফেলেছি। শীতের কুয়াশায় ছদ্মবেশে মেঘ নেমে এসেছিল একবার, সেবার মনটাও হারালাম সেই ছদ্মবেশী কুয়াশায় আবছায়া নৈঃশব্দ্যে। দেখেছি, নিঃশব্দেই মন রক্তাক্ত হয়ে গেছে। অথচ মনের কোনো আকার-প্রকার নেই। মন অনেকটা ঈশ্বরগোত্রীয়। দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না কিন্তু প্রভাব ক্রিয়াশীল।

কাগজে প্রথম কবিতা ছাপা হওয়ার ফল কী দাঁড়িয়েছিল? মন কতখানি উৎফুল্ল হতে পারে, এর আগে সে ধারণা ছিল? নিজের লেখা, নিজের নাম বর্ণমালায় ছাপানো দেখার সেই কয়েকটা দিন মন আর মন ছিল না। মন হয়ে পড়েছিল অন্য কিছু। অন্য কিছুটা কী? প্রথম পথ ভুল করে অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম, প্রথম রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলাম, প্রথম আত্মরতি করেছিলাম, প্রথম ভেঙে পড়েছিলাম, প্রথম পাখির মতো আকাশে উড়েছিলাম, প্রথম মাছের মতো মরে ভেসে উঠেছিলাম- কবে? সে-সব আর মনে নেই। তাই ‘ব্ল্যাকআউট’ নামে একটা ছবি তৈরি করলাম, বাংলা নাম দিলাম ‘মনে নেই’। কী মনে নেই, যা আমার মনে নেই। যা-টা কী? তা তো মনেই নেই।

মনের অজান্তে’ বলে একটা কথা আছে। তার মানে মন যা জানে না বা জানত না, তাই? কী কী ঘটে গেল মনের অজান্তে? কী কী সায় ছিল মনের? কী কীতে ছিল না? মাঝে মধ্যেই ভাবি, আমার মনের বয়স কত? দুই কুড়ি চার? নাকি তিন নং সাতাশ? কত কবিতায় মন ঢুকে ঘাপটি মেরে আছে। ছাপার অক্ষরে মন লুকিয়ে আছে। আঁকানো রঙে মন রাঙা হয়ে আছে। নির্মিত দৃশ্যে মন সৃজিত হয়ে আছে। তবু মন কি কোথাও আছে, আদৌ? মন জিনিসটা কী?

মনের সঙ্গে আর কত কথা বলব? মনকেও আর কত কথা শোনাব? কত ছবি আঁকলাম, মনে মনে। কত কবিতা লিখলাম, মনে মনে। কত উড়াল দিলাম, পাখির মতো, মনে মনে। কত সাবমেরিন হলাম, জলের গভীরে, মনে মনে। কত না পারাকে পারলাম, মনে মনে। মনে মনে আমি খুনও করেছি। ভালোবেসেছি, মনে মনে। তবু মনের ঠিকানা খুঁজে পাইনি। খোঁজ পাইনি, জানিও না, মন কোথায় থাকে? মন কি খায়? মন কী ঘুমায়, ক্লান্ত হলে? মনের মৃত্যু হলে কবর হয় কোথায়? মনকে কি পোড়ানো হয়? শেষ হবে না। শেষ হয়ও না। তাই শেষ কথা বলি?

‘সিয়েনা শহর পুড়ে গেছে।

সেই পোড়া শহরের কালারই হচ্ছে বার্নটাসিয়েনা। যারা ছবি আঁকে, তাদের কেউ কেউ এই কালারটা পছন্দ করে বটে। হঠাৎ রোদ মিষ্টি লাগে। হঠাৎ চৌচির করে দিয়ে যায় বখাটে হাওয়া। ঠেকানো যায় না, এমন দুর্বার, এমন মাতাল। এমনকি কী নেই কী নেই বলে বুকের মধ্যে উষ্ণজলের গুড়গুড়ি বেজে ওঠে, খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে, স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে একা বসে থাকি। একটা শালিক আরেকটা বালিকা শালিকের খোঁজে ছটফট করতে থাকে। তখন, রোদ মিষ্টি, হাওয়া চৌচির। হঠাৎ ভালোবাসার আঁচে, আভায়, লাভায় মন পুড়ে যায়।


কৃষ্ণচূড়ার ফুল কিংবা ভার্মিলিয়ন রেড ঝুপঝাপ ঝরে পড়ে শূন্যপটে। কুয়াশার আধিক্য এমন যে, এক হাত সামনে-পেছনেও কিছু দেখা যায় না। যথেষ্ট বিভ্রম ছড়ানো পথে বাড়ি ফেরা দায় হয়ে যায়। পুরো শীতকাল ভালোবাসা শিশির হয়ে ঝরে। ভোরবেলা হাঁটতে গেলেই মাথা ভিজে যায়। পা ভিজে যায়। সমস্ত শরীর ভিজে ওঠে। এরপর আসে বসন্ত। কুয়াশা তখনও কিছু অবশিষ্ট উঁকি মারে আর তলে তলে মন বেলেসিঁদুরে লেপ্টে যায়। এক কথায়, ভালোবাসা সন্ত্রাস ঘটাতে চায়।

বনে বনে অর্কেস্ট্রা বাজে। খুব ভালো লাগে, লাগে বলেই হঠাৎ ভালোবাসা রিভার্স হয়, তখন আর মোটেই ভালো লাগে না। লোনলি লোনলি লাগে। ভালোবাসার ফর্ম চেঞ্জ হয়ে যায়। পোড়াশহর, পোড়ামনের আলাদা-আলাদা কালার ফুটে ওঠে। তখন হয়তো কবিতা লেখা হয়, সেই কবিতা ছাপাখানায় যায়। তারপর সেই কবিতা কেউ হয়তো পড়ে, পুড়ে যাওয়ার আশায়, ঘৃণায়, ভালোবাসায়।

মন এমন, কদিন ধরেই ঘুঁই ঘুঁই করছে, সে আমাকে দিয়ে বলিয়ে দিতে চাচ্ছে, তোমাকে খুব ভাল্লাগছে। তোমাকে আমার ভালোবাসতেও ভাল্লাগবে...

অলংকরণে ব্যবহৃত ছবি: রকি হকিন্স, আমেরিকান চিত্রকর

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;