একলা একলা আকার



দেবদুলাল মুন্না, অতিথি লেখক
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

‘সাব-লেট যারা দেন তারা মাঝারি অসহায় । যারা সাব-লেট নিন তারা প্রান্তিক। ফলে এই দুই অসহায় পক্ষের মালিক বাড়িমালিক। আবার ভাড়াটে ও সাব-লেট নেনেওয়ালা না থাকলে মালিক অসহায়। এটিকে একটি স্পেসকে নিয়েও দ্বন্ধ। সপ্তদশ শতাব্দীতে প্যারিসের লুঁগে শহরে সাব-লেট সংক্রান্ত একটি মামলায় বলা হয়েছিল, ইহা আপাত স্থানসংকুলানের জন্য মানবিক মনে হলেও খুব ঝুঁকিপূর্ণ সহাবস্থান।’
-সেভেন লেটার্স ডাউন মেমোরি: মন্টেস্কু

এক

পুরোটাই খেলা। আমি দেখছিলাম ব্রা। কালো। বেশ আটসাট করে জড়ানো তাবুর শরীরে। এবার আস্তে আস্তে হাতুড়ি গাঁইতি নিয়ে এগোলাম। টুকরোগুলো খুলি। নগ্ন নারী শরীরের স্তনকে কতভাবে ভেবেছি। কিন্তু ‘বাস্তবে এই প্রথম। আচ্ছা এভাবেওতো ভাবা যায় ব একটা র-ফলা পরে আছে। গ্রেট, তার মানে এভাবে বলা যায় যে র-ফলা পরে ফেললেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে বা"- এটা তো ডিকন্সট্রাকশান এবং লিটারেল থিংকিং এর প্রথম ভাগ।

এটা একটা দেখাপদ্ধতি , আমরা কি দেখতে পারি একটা ত্রিভুজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার আকার, ত্রিভুজের সাথে ডিভোর্স তাই সে ত্রিভুজাকার নয়? ত্রিভুজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার একলা আকার... এইসবই কিন্তু র-ফলা ছাড়িয়ে নেওয়া অবিতর্কিত বা এর সন্তান... বা, আমরা কি এমন কোন দিকে যেতে পারি যেখানে র-ফলা কে ঢেউ বা তরঙ্গ’র মতো দেখি। ভাবি, বক্ষবন্ধনী থেকে তরঙ্গ খুলে নিলে দুইটি স্তনের মাঝে অপশান জেগে ওঠে।

তাবু জানতে চায়, এ আদরের সময়ও তুমি কি ভাবো ?
বলি, ধরো যদি তোমার উপরে আমি মারা যাই হঠাত, তখন কি হবে ? পুলিশ, মামলা কি করে তুমি হ্যান্ডলিং করবে বা পালাবে আমার লাশ ফেলে?
তাবুর মনে হলো বিছানাটা কেমন যেন আর্দ্র আর্দ্র লাগছে। এক ঝটকায় কাঁথাটা সরিয়ে দিতেই বিস্ফারিত চোখে সে তাকাল বেডশিটের উপর। রক্তজবার মতো লালরক্তে ভিজে আছে বিছানার মাঝখানটা। সমস্ত চাদরটা যেন দেখাচ্ছে জাপানের পতাকার মতো। রাতে তার রজস্বলা হয়েছে সে টেরই পায়নি। আজ তো ঋতুস্রাব হওয়ার কথা নয়। ধার্য তারিখ আরো দু’দিন পর। জলের স্রোতের মতো এমন রজোদর্শনে খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে তাবু।

সে জানতে চায় এ অবস্থায় আমি তার ভুবনে যেতে চাই কিনা। আমি বলি, তুমি তো আমার কাছে সাব-লেটের মতো ছিলে। মালিক ছিল তোমার স্বামী। আমি প্রেমিক। আমি তোমার মন ও শরীর ভাড়া করেছিলাম প্রেমের দেনমোহরে। কিন্তু আমারই জন্যে তোমার সংসার ভাঙবে, তুমি সত্যি ইন্দিরা রোডে একটা বাসায় সাবলেট নিয়ে একা একা থাকবে, আমি ভাবিনি কোনোদিন।

এসব বলার সময় আমি আবারও তার তলপেটে ত্রিভুজাকারের একটি কোণ দেখি। কিছু ঘাস। আর রক্তপাত। আমি তার ভেতরে যেতে যেতে ভাবি,না , আর কখনো কোথাও বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব হবে না,এখন সব যেন একলা একলা আকার। অন্যরকম খেলা। গ্র্যান্ড ম্যাটা ন্যারেটিভলেসের। তাবু তবু কিসব জানি বলতে থাকে। বসন্ত তুমি আর এসো না এটি তো বলা যায় না। বলা গেলেও সে আসবে।

পাওলো কোয়েলহোর একটা উপন্যাস আছে। নাম, ইলাভেন মিনিট। এটির গল্প তাবু আজ আসার পরই শুনিয়েছি। মুভি হয়েছে এটি। তাবু কয়েকদিন আগে দেখেছে জানালে আমার মনে পড়ে সব। সেখানে মারিয়া নামের যৌনকর্মী এক জায়গায় ভাবছে বা বলা যায় ডায়েরিতে লেখছে : আমি আবিষ্কার করেছি কী কারণে একজন পুরুষ একজন মহিলাকে টাকা দেয়। সে সুখী হতে চায়। শুধুমাত্র অর্গ্যাজম পাওয়ার জন্য সে এক হাজার ফ্রাংক দেয় না। সে সুখী হতে চায়। আমিও চাই। সবাই চায়। অথচ কেউ সুখী নয়। আমার কী হারাবার আছে, যদি কিছুক্ষণের জন্য আমি ঠিক করি আমি হব একজন ‘ ’।

তার রেগুলার কাস্টমার বা প্রেমিক র্যালফের সঙ্গে কিছু আলাপ:
মারিয়া:একজন বেশ্যার প্রেমে পড়লে কী করে?
র‌্যালফ : আমার মনে হয় এর কারণ, তোমার শরীর কোনোদিন আমার একার হবে না জেনে আমি মন দিয়েছি তোমার আত্মাকে জয় করাতে।
মারিয়া: তোমার ঈর্ষা হয় না? আমার কাছে তো অন্যরাও আসে?
র‌্যালফ : না। তুমি বসন্তকে বলতে পারো না, এখানে এসো আর যতদিন সম্ভব থাকো।
মারিয়া: মানে ?
র‌্যালফ : মানে হলো ১১ মিনিটই অসীম। তুমি তো স্থায়ী কারো না। তাই তোমাকে পাওয়ার ব্যাকুলতা। হয়তো অস্থায়ীকেই মানুষ নিজের অজান্তে বেশি ভালবাসে। ঠিক জানি না। এটাও উত্তর হতে পারে।
তাবু ওইসব আমাদের এডাল্ট সিনগুলো উপভোগ ও আমি ‘ইলেভেন মিনিট’ কাটানোর ঘোর কাটাতেই বুঝতে পারি সন্ধ্যা নামছে। তাবু ওয়াশরুমে যায়। ফ্রেশ হয়। শাড়ি পরে। আমিও সে যাহা আমি তাহা। এরপর তাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বরোড পর্যন্ত এসে একটা স্কুটারে তোলে তাবুকে বিদায় দিই।

দুই

রোজেনের সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়েছে কতোবছর আগে ঠিক মনে নেই। সেটার হিসাব রাখতেও চাই না। রোজেন মাঝেমধ্যে ফোনকল দেয়। আমিও। আমাদের এখনও যোগাযোগের কারণ সন্তান । তুণা। তুণা এ লেভেল শেষ করে চেষ্টা করছে বাইরে পড়তে যাওয়ার। রোজেন একদিন আমাকে ফোনকল দেয়, বলে, তোমার মেয়েতো ডিপ্রেসনে ভুগতেছে। তার নাকি কিচ্ছু ভাল লাগে না। হাত ব্লেড দিয়া কাটছে। এতটুকু বলে লাইন কেটে দেয়।

আমি তুণাকে ফোন করি। সে ধরে না। ওইদিনই সন্ধ্যায় আমি রোজেনদের বাসায় যাই। নিজেকে মেহমান মনে হচ্ছিল। তুণাকে বলি , তোমার সমস্যা কী ? তুণা উত্তর দেয়, সমস্যা কী ? নাই তো! আমি তাকে যেন এখুনি হারিয়ে যাবে কিন্তু হারাতে দেবো না এমন ভয়ে খুব জোরেসোরে জড়িয়ে ধরি। সে ঘটনার আকস্মিকতায় একটু অপ্রস্তুত। আমি বুঝি ঠিক হচ্ছে না, বিয়িং ইজি। ওকে ছেড়ে দিয়ে দুহাত ধরে নেইলপালিশ দেখার ভান করে বলি, বাহ, সুন্দর রঙ তো।

আসলে দেখি তার বাম হাতের ব্লেডে কাটা ধীরে ধীরে লাল থেকে কালো হতে থাকা দাগগুলো। বলি, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আসলে দেখি তার চোখ ভরা বিষন্নতা। রোজেন চাওমিন দেয়। আমি ও তুণা খাই। খাবার ফাঁকে তুণা হঠাৎ জানতে চায়, বাবা, তুমি কি এখনও মদ খাও ? ভাবি, খাইতো। কিন্তু তাকে এখন বলা ঠিক হবে কি! বলি খাই, খুব কম। মাসে এক বা দুইদিন।

এসব কথার মাঝেই তার হাউস টিউটর এলে তুণা পড়তে চলে যায় রিডিংরুমে। কিছুক্ষণ টিভি চ্যানেল সার্ফিং করি। রোজেন এলে এটা সেটা মানে দরকারি কথা বলি। এরপর কি মনে করে বলে ফেলি, তুণার জন্য আমাকে কি সাবলেট দিবে ? ওর ডিপ্রেসন কেটে গেলে বাইরে চলে গেলে আমিও চলে যাবো।’

রোজেনের এমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখি যেন বাংলা মুভির কোন সংলাপ আওড়াচ্ছি আমি। সে আমাকে বিদায় দেবার সময় এতো জোরে দরজা লাগায় সে শব্দটা চারতলা থেকে আমি নিচে নামার আগেই বাসার গেট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। আমি সিড়ি দাপিয়ে নিচে নামতে থাকি এবং আমার মাঝে সেই প্রথম ইচ্ছা জাগে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করুক। কিন্তু আমি জানি, বাস্তবতা হলো মানুষের জীবনে অপেক্ষার চেয়ে বড়ো কাজ হলো বহুপথে বারবার নিজের কাছে ফেরা।

বাসায় ফেরার পর রোজি ফোন করে জানায়, পরদিন দেখা করতে । পরদিন ধানমন্ডির সাতাশ নাম্বারের একটা রেস্তেরায় স্লাইডার ঠেলে রোজি ঢুকে । সোফার কোণে বসে ছিলাম। বসল মুখোমুখি। একটু সময় নিলো। মাঝে দুটি কফির মগ। আমি বললাম, 'দেখো রুচিবোধ চিরস্থায়ী কোনো ব্যাপার না। যার থাকে সে কুপমণ্ডুক। এটি তুমি ও না। আমি ও না। আমাদের মধ্যে অনেক কিছু হয়েছে। একটা ডিপ রিলেশন।

এটাকে কেউ প্রেম বলে। কিন্তু প্রেম বলো আর যাই বলো মানুষের রিলেশন তো স্থবিরতার শর্ত মেনে বেচেঁ থাকবে না। যদি বেচেঁ থাকে তবে সেটি ভণ্ডামি । অবশ্য জীবন একটু কপটতাকে ও এ্যালাও করে। অকপট হয়ে সমাজ সংসারে বেঁচে থাকা যায় না। এটাও তুমি জানো।'

এর বেশি কিছু বলিনি। বেরিয়ে যায় রোজি যা বোঝার সেটি বোঝে। কি বুঝেছে সেটি অবশ্যই আমার জানার কথা না। লাটিমের চক্কর। এই চক্রকে ঘিরে নাচে বাদর। মানুষের ভীড়। এরিমধ্যে হেটে যায় সবুজ টিয়া। রব উঠে, আমার নাম সুশান্ত। টিয়া যায় এগিয়ে। একটি হলুদ এনভেলাপ তোলে। ওই এনভেলাপ নেয় কারবারি। বলে যায় , ‘সুশান্ত ঘোষ, আপনার সামনে মহা বিপদ’।
এসব দেখতে দেখতে খবর পাই, রোজি আরেকজনের সঙ্গে প্রেম করছে। সরেছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। যেন ঘুরে বেড়ানোর জন্যই মন জন্মেছি আমরা। ঘুরেফিরে বলছি,‘নিঃসঙ্গতা মানে সঙ্গের অভাব নয়। নিঃসঙ্গতা আরো ব্যপ্ত এক ক্ষেত্র, এক কুয়াশাময় জগত। ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট। সেখানে ঢুকে যাওয়া সহজ, সেখান থেকে ফিরতে পারা সহজ নয়। মুখ বদলে গেলেও সঙ্গীর,থেকে যায় স্মৃতি। আই এ্যাম সিঙ্গেল বাট নট এলোন।’

রোজির সাথে আর আমার দেখা হয়নি। এখন শরতকাল। তবু বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরে বসে গান শুনি। কথাগুলো এমন,একটা কাঁচঘর। সেই কাঁচঘরে বসে তুমি ই ঢিল ছুড়ছো। ভেঙে পড়ছে তোমার চারপাশ। তুমি কি তোমার সব্বাইকে ভুলে গিয়েছ !

আসলে এসব যেনবা আমার সাজানো ফ্যান্টাসি। আমি একটা অন্যজগতে ঢুকে পড়েছি। বারবার যখন প্রেমে পরা কোনো নারীকে প্রত্যাখান করে ফিরে আসছি তখন যেন মনে হয়, রোজেন আমাকে যেভাবে ডিভোর্স দিয়ে প্রত্যাখান করেছিল সেসময়ের আমার যন্ত্রণা, বিষাদ সবটুকু সেসব নারীদের ভেতর দিয়ে আমি রোমেনকে ফেরত দিতে চাচ্ছি। এরকম খেলায় মেতে উঠা নিশ্চয়ই সুস্থতা না। অদ্ভুত একটা ব্যাপারও ঘটে, যেমন প্রেমে জড়ানোর সময় মনে হয় ঠিক ঠিক আশ্রয় চাইছি। কিন্তু কিছুকাল চলে যাওয়ার পর ওইসব প্রেমিকারাই আমার কাছে একঘেয়ে উঠে পড়ে কিনা আমি খুব ক্লিয়ার না। নাকি তুণার কথা মনে পড়ে বলে সরে আসি?

মনে হয় সেসব সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগে যেনবা তুণা আমাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনছে। আমার হাত’ পা মোটা রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা। সারা শরীরে কালো বসন্তের দাগ। একমুখ চুল দাড়ি। চোখ ঘোলাটে।বিছুটি। আমাকে কোথাও থেকে নিয়ে হেটে হেটে ফিরছে তুণা। সে সামনে। আমি পেছনে। দেখা যায় এরপরও আমি তুণার কাছ থেকে ছিটকে পড়ে ফের ভুলপথে পা বাড়াচ্ছি।

তিন

সেই ভুল পথেই পা দেওয়াতেই কী তুণা ডিপ ডিপ্রেসনে যাচ্ছে ? আমিও তো খুব ছোটবেলা থেকে খালি পালাতেই চেয়েছি। কখনো প্লেনে করে, কখনো ট্রেনে, কখনো কালিঘাটের ট্যাক্টরে, কখনো বা ঘুমের ওষুধে, মদে, আবার কখনো অচেনা মানুষদের নিজের ঘরবাড়ি ভেবে নিয়ে। এভাবে পালাতে পালাতেই তো দুদিক থেকে দুজন মানুষ জড়ো হয়েছিল রেলস্টেশনের ওয়েটিং রুমে। শ্রীমঙ্গলে। ট্রেনের দেরি। রোজেন আর আমি। এরপর আলাপ। ট্রেনে মুখোমুখি সিটে বসে যাত্রা।

ওহ আচ্ছা, রোজেন আপনার নাম? অর্থ কি? অর্থ হচ্ছে উপযুক্ত ? আধুনিক? অস্থির? নাকি আইনস্টাইনের ক্ষুদ্র বিবর ? আচ্ছা ওই ক্ষুদ্র বিবরটা কেমন ? সেই বিবর চিনতে চিনতে একসময় ঘরের মেঝেতে বিছানা। শিওরে লাল টেবিল ল্যাম্প। মাথার নিচে কার্লমার্কসের চারখন্ড ও কহলিল জিবরানের প্রফেট, এসবের ওপরে গোটা পাঁচেক ওড়না। কিন্তু তুণার জন্মের পরপরই তো পাল্টে গেল সব।

সেই তুণাই কি এখন প্রতিদিনের অন্ধকার ভেতরে নিয়েছে, অনেক ভেতরে। খুব যখন ছোট্ট ছিল, অন্ধকার ঘরে তাকে বন্ধ করে দেওয়া হত মজা দেখার জন্য। ওইটুকু মেয়ে, অন্ধকার ঘরে ভয় পায় না! কাঁদে না! যে কাঁদে না, সে কি ভয় পায় না? অনেক, অনেকদিন পর একদিন বলেছিল আমাকে, যে বলাগুলো বহুকাল ধরে গভীরে পুঁতে রাখা, শিকড় গজিয়ে গাছ হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা খুঁড়ে বের করে আনা, যে ভয় তো পেত, খুব ভয় করত। কিন্তু কাঁদত না। কাঁদতে পারত না।

আসলে, বুঝতেই পারত না যে কাঁদা উচিৎ। ওসব সে শিখেওছিল দার্জিলিং এ মাউন্ট হারম্যান বোর্ডিং ইশকুলে যখন তাকে পড়তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ওই ছোট্টবেলা থেকেই তুণার একটা ভেতরকার জগৎ ছিল। একটা অন্য মাত্রার সত্যি, যা বাস্তবের মিথ্যে রাংতা-মোড়ক ঢাকা পৃথিবীতে খুলে দেখানো যায় না। খুব ছোট্ট ছোট্ট কিছু চাহিদা ছিল তার, কিছু পুঁচকে পুঁচকে আনন্দ, যার অধিকাংশই, অন্ধকারের স্বাভাবিক নিয়মে, কারো না কারো বাস্তবের বুটজুতো থেঁতলে দিয়েছে। সেই থেঁতলানো ইচ্ছেগুলোই অপু জমিয়ে রেখেছে তাও।

সহজে সে কিছু ফেলে দিতেও পারে না। নিজের পুরনো কাপড়, ডায়েরি, বলপ্যান , টর্চলাইট সবই। মনের ভেতরে যে বিশাল দিঘীটার বাস, সেখানে সবচেয়ে গহন জায়গাটায় কৌটোয় পুরে রাখা তুণার যে প্রাণভোমরা, তা আসলে এক সমুদ্রসমান মায়া। খালি চোখে দেখা যায় না, চশমা পরেও না। আমি হয়ত দেখি। বা দেখিনা। বা ওকে ঘিরেও রয়েছে হয়তোবা আমার ফ্যান্টাসি।

চার

তাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ফেসবুকে। এরপর ঘনিষ্ঠতা। একদিন দেখাও হয়। তখন তার স্বামী আছে। সংসার আছে। ভালো চাকরি আছে। বাড়ি আছে। গাড়ি আছে। যা নেই সেটি হলো কোনো বন্ধু নেই। আর আমার, বন্ধু রাখার জায়গা নেই প্রায়। সন্ধেবেলা শিশির পড়ছে,শিল্পকলা একাডেমিতে ‘নিত্যপুরাণ’ নাটক দেখে আমি আর তাবু মাঠে বসে ছিলাম। সেদিনই প্রথম দেখা।

আমি বলি, ‘এত গল্প জমে আছে আমার কাছে, তুমি শুনতে শুনতে বোরড ফিল করবে না তো?’ সে হাসে। বলে, ‘একটু অদলবদল ছাড়া সব মানুষের আসলে একই গল্প। তুমি যেভাবেই বলো না কেন, চমকাব না। ঘোর লাগার সময় কেটে গেছে আমার। হয়তো সেজন্যই নির্বান্ধব। তড়িঘড়ি করে বলার কিছু নেই। আবার ধীরে আস্তে অনেক ভেবেও বলার কিছু নেই।’

আমি তাবু’কে মুগ্ধ করার জন্য বললাম, আচ্ছা, তোমার কি ওই গল্পটা জানা আছে যে এক বৃদ্ধ লোক নিজেকেই চিঠি লিখত ও পোস্টঅফিসে গিয়ে চিঠি পোস্ট করে চলে আসত। এরপর সেই চিঠির অপেক্ষায় থাকত। পিয়ন এসে চিঠি দিয়ে গেলে সে পড়ত। এভাবে একশো একুশটা চিঠি লিখেছিল প্রেরক ও প্রাপক হিসেবে।

তাবু বলে, জগৎ পুরনো। মানুষ নতুন। এ গল্প নতুন ভার্সন। পুরনোটা এমন, এক আদিবাসী দ্বীপে একা থাকত। কেউ কথা বলার ছিল না। তাই কাজকর্মের ফাঁকে সে দুই কণ্ঠস্বরে কথা বলত। এক নারীকণ্ঠ। অন্যটি তার। পরে একদিন তার কণ্ঠই নারীকণ্ঠের মতোন হয়ে গেল। আর আসল কণ্ঠ ফিরে পেল না।

আমি জানতে চাই, তুমি এ দুটি গল্পে কী পাও?
সে বলে, মানুষের একাকিত্ব। আসলে মায়ার সংসারে ভাষার সংসারে আমরা প্যান্টোমাইম। আমরা কতোটুকুই বা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি? পারি না। গল্পের ভাষার তো তাই ভাণ্ডার বড়ো থাকার কথা নয়। আপনি পারবেন আমার অনুভূতি অনুবাদ করতে? বা আমি আপনার?

আমার তখন সদ্য রোজেনের সাথে ডির্ভোস হয়েছে। ফলে একটা নারীসঙ্গ দরকার। কিন্তু কথা বলে বুঝতে পারি তাবু বেশ ফেমিনিস্ট। নিজেকে যতোটুকু আমি জানি সেটা হচ্ছে আমার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মেল শভিনিজম কাজ করে। কিন্তু সেটা প্রকাশিত হলে তো আর কাজ হবে না। তাই আমি তার সাথে যে কৌশলটা নিই সেটি হলো, নারীবাদ পশ্চিমা প্রেডাক্ট,বিশেষ ইস্যু, এটসেটরা এটসেটরা। যে সমাজে পুরুষই মানুষ হিসেবে মুক্ত না সেখানে কে কাকে মুক্তি দিবে।

মানে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টার ভেতর দিয়ে কৌশলে আমার মেলশেভিনিজমকে আড়াল করে তার ফেমিনিস্ট সত্ত্বাকে ভাঙতে থাকি। সে আমাকে জানায়, তার স্বামী শরীরে হাত তোলে। মাস্টারবেশন করে। পর্ণো দেখে। মানুষের সঙ্গে মিশুক চায় না। অনেকটা বোঝে না বোঝে একটা ঘোরের মধ্যেই তাবু একসময় আমার প্রেমিকা হয়ে ওঠে। আমাদের গল্প পুরনো হয়। হয় প্রাগহৈতিহাসিক।

এরপর বহুদিন পর কোভিডকালে হোম কোয়ারেন্টাইনের কোনো একদিনে আমি ফোনকল পাই তাবুর। ওপাশে সে কাঁদছে। তার কান্না যেন কুন্ডুলি পাকিয়ে আমার কানে এসে ঢুকে আমার শৈশবের কালিঘাটের তেতুল গাছের ওপরে বসে থাকা ঘুঘুর মতো। বৃষ্টির দিনে ঘুঘু ডাকে সেই প্রথম আমি জেনেছিলাম। সেই শৈশবে। তাবু জানায়, সে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছে। মনে হয়, তার বেরিয়ে পড়া যেন ট্রেন মিস করা হোটেলের বিল মিটিয়ে বেরিয়ে পড়া একটা মেয়ের নিরুপায় রিকশা নিয়ে ইতস্তত এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি।

তাবু জানায়, কোথাও উঠবে। আর স্বামীর বাসায় ফিরবে না। মনে হয়, আমি এভাবে বহুবার এখান থেকে ওখানে আশ্রয়ের জন্য ছুটেছিলাম, সেই ছুটা শেষে ফের রাস্তায় ওভারস্যাক ঝুলিয়ে দাড়িয়ে থাকা। তাবু সেই থেকে সে ইন্দিরা রোডে একটা বাসায় এক বান্ধবীর সহায়তায় সাবলেটে উঠে। এর আগে বান্ধবীর বাসায় ছিল। তাবু আমাকে ফোন করে, জানতে চায় তুণার খবর। বলি, আমি রোজেনের কাছে তুণার জন্য সাবলেট চেয়েছি। এ সাবলেটটা আমার খুব দরকার।

পাঁচ

এর দুমাসের ভেতরেই আমি রোজেন ও তুণাদের সঙ্গে নতুন কলাবাগানের বাসায় সাবলেট উঠি। তুণা বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময়ই আমার ঘরে কাটায়। আমি ও তুণা প্রায়ই খাবার খেতে একসাথে টেবিলে বসি। টিভি দেখি। আমাদের বাবা-মেয়ের সহাবস্থানের সময় পাশের রুমে বা অন্যখানে রোজেন থাকে। তার কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। টের পাই, আমার পছন্দের খাবার রান্না করতে সে ভুলে যায়নি। মাঝেমধ্যে শুনি রোজেন তুণার কাছে আমাকে নিয়ে গল্পও করে।

এই যেমন, প্যাথলজিক্যাল টেস্টের জন্য তুণাকে নিয়ে রোজেন গিয়েছিল। ব্লাড দেওয়ার সময় একটু ভয় পাচ্ছিল তুণা। ছয় টিউব রক্ত দিতে হবে শুনেই ভয় পেয়েছিল মা-মেয়ে। সেসময় রোজেনও বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। ব্লাড দেওয়ার পর রোজেন তুণাকে বলেছিল, তুমি ছোট তাকতে টিকাটুকা দেওয়ার সময় তোমার আব্বু আসত। আমি তো এসব দেখে অভ্যস্ত নই। এ ঘটনা তুণা আমাকে না বললে আমি জানতাম না।

জগতের নিয়মই তাই যে কোনোকিছুই একইরকম থাকে না। বিলীন অথবা বিস্তার। ভয় থেকে সভ্যতার শুরু। আবার সভ্যতাই ভয়েরও জন্ম দেয়। কী অবাক প্যারাডক্স। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগুলো ঠিকই কিন্তু যেন জানান দিলো একটা ধুলির চেয়েও ক্ষুদ্র অদৃশ্য ভাইরাস বা ব্যকটেরিয়া সবকিছু শেষ করে দেয়। তুণা ফিজিক্সে ভাল। সে আমাকে এসব শোনায়। আমি জানি না এমন ভাব করে সব শুনি তাকে মুগ্ধ করার জন্যে। মেটোনিমি ও মেটাফোরের ক্ষেত্রে যে সাদৃশ্য রয়েছে সেটির ব্যাখা আমাকে শোনায়। আমি শুনি আর বয় পাই। আহা তুণা অল্প বয়সে জগতের বেশিকিছু জেনে ফেলেনি তো!

সে কি রহস্যগুলোর দরজা একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে! একদিন ড্রয়িংরুমে খুব জোরে একটা ব্যালেন্ডিয়া মিউজিকের সুর শুনি। এরপরই তুণা আমাকে ডাকতে ডাকতে আমার গরে আসে। জড়িয়ে ধরে। জানায়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাই করেছিল ভর্তির জন্যে। সেখান থেকে পরীক্ষার রেজাল্ট পেয়েছে। পাস করেছে। ভর্তি হতে বলেছে। আমিও ছুটে যাই আনন্দে। রোজেন সোফায় বসেছিল। সেইপ্রথম ডিভোর্সের পর তিনজনে আড্ডায় আনন্দে মেতে উঠি।

আমি ও রোজেন তুণাকে তিন/চারটা অতীতের গল্প শোনাই যেসব অনুপ্রেরণামুলক। ফাঁকে প্রেসার কুকার বাজে। বিড়ালটা সোফার কোণ থেকে লাফ দিয়ে দেয়ালে ঝুলানো স্মার্ট টিভিতে আরেকটি বিড়ালকে দেখে ঝাপটে ধরতে যায়। রোজেন কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভিয়ে দেয় ‘চোখে বড় লাগছে’ বলে। তুণার মধ্যে কোনো ডিপ্রেসন নেই। অনেকদিন থেকেই ছিল না অবশ্য। আমি তুণা’কে বলি, কতো কতো দেশ ঘুরবে। কি আনন্দ তোমার!

তোমার ইলিনয়ের ম্যাজিক হোমে যাওয়ার খুব ইচ্ছা করত একসময় আমার। আমি তো যেতে পারিনি। তুমি যেও। সেই ম্যাজিশিয়ানের বাড়ি। কি যেন নাম, ডেভিড ক্র্যাটস। তুণা খুব আগ্রহভরে জানতে চায়। ম্যাজিক হোম নিয়ে আমিও ভালো একটা জানি না। কি বলব, মিথ্যার ধরণই এমন যে বেশিক্ষণ সে সাবলীল থাকেনা। তাই যতোটুকু জানি সেটুকুই বলতে থাকি, ম্যাজিক হোমে একসময় কলম্বাসের সঙ্গী এক ম্যাজিশিয়ান আশ্রয় নিয়েছিল। সে সারাদিন সারাসন্ধ্যা হাটত শহরময়। কারো সাথে কথা বলত না। এমনকি কখনো কখনো হেটে একশহর থেকে অন্য শহরেও যেতো। সে বেঁচে ছিল অনেকদিন। কিন্তু মরে যাওয়ার কয়েকবছর আগে তার বাড়ির বিভিন্ন ঘরবাড়ি সে বিভিন্নজনকে সাব-লেট দেয়। সন্ধ্যার পর সে একটা হলঘরের মতো রুমে সবাইকে আসতে বলত।

সবাই মিলিত হওয়ার পর সে পিয়ানো বাজিয়ে শোনাতো। এরপর মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে সে নিরুদ্দেশ হয়। তার বাড়ির সাব-লেটবাসীরা অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সে ফিরে না।এরপর একরাতে বোমা বর্ষিত হয় বাড়িতে। কারা করেছিল, কে জানে। কোনো একটা যুদ্ধে এমন হয়েছিল। মজার ব্যাপার সে ই বোমা বর্ষণে সবাই মারা যান। এর পঁচিশবছর পর একটা মানুষকে দেখা যায় সেই ভাঙা বাড়ি ঠিক করছেন। গড়ছেন। যারা ম্যাজিশিয়ানকে চিনতেন তারা দেখেন সেই ম্যাজিশিয়ান ফিরে এসেছেন। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব ! আবার এটাও তো সত্য সেই মানুষ , বয়স চেহারা , আচরণ, উচ্চতা সবদিক থেকে মিলিয়ে ওই ম্যাজিশিয়ানেরই মতোন।
এসব আনন্দমুখর দিনগুলো আমাদের কেটে যায় দ্রুতই। রোজেন, তুণা ও আমি ঘুরে ঘুরে শপিং করে তুণার জন্য। টিকেট কনফার্ম করি। এরপর একদিন সেই দিন আসে। তুণার বিমানে চড়ার। আমরা একটু আগেভাগেই যাই।

তুণা চলে যায়। একটা ট্যাক্সিক্যাবে আমি ও রোজেন নিশ্চুপ বসে বাসায় ফিরি। দুজন দুঘরে। এর সপ্তাহ খানেকের ভেতরেই রোজেন আমাকে জানায় সাব-লেটের দিন শেষ। সংসার মানে একসঙ্গে একটা প্রোডাকশন, একটা ছবি, একটা গল্প। সংসার মানে অদরকারি এটাসেটা, মনের ভুলে কিনে ফেলা চায়ের কাপ, চুড়ি, মাটির পাতিল, যা কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু কখনো দেখলে মনে হয় আহা কিনেছিলাম এইসবও । এইসব... সব... প্যাকিং বাক্সে চালান হয় বারংবার। ভাঙ্গা জিনিস, ভাঙ্গা কথা, ভাঙ্গা স্মৃতি, ভাঙ্গা প্রমিস, এসব নিয়েই ভাঙ্গা সংসার আবার একটু একটু করে ফেভিকল দিয়ে জোড়া লাগানো।

আমি ও রোজেনও ফেভিকল দিয়ে জোড়া লাগিয়েছিলাম। ফেভিকল হয়ত তুণা ছিল। তারপর একদিন পরবর্তী সংসারের জন্য বা একা থাকাকেই মেনে নিয়ে গোপন দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নতুনভাবে চলা। যেন জিনসের প্যান্টে ধুলো লেগেছে। ঝেড়ে ফেলা। বিশ্ব সংসারে মনে হয় সবাই একাই , জাস্ট নিজের কাছেই অচেনা । ডার্ক পোট্রেট । তবু আরেকজনকে চিনতে চিনতে সংসারে গুম হয়ে যাওয়া । প্রেমে গুম হওয়া। যেন মনুষ্য জীবন একটা তৈরিই হয় শিকারের জন্য । শীরিষ গাছের ডালে বিতুয়া পাখি তাকিয়ে আছে আপনার দিকে, বিশ্বাস করেন একটু নড়লে চড়লেই ঠোকর। বেইসিক্যালি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু সেটাই আসলে বড়ো প্রোডাকশন। আমিও এক সন্ধ্যায় ফের রোজেনের বাসা ছাড়ি।

ছয়

এসবের মধ্যে আরো কিছু আলেখ্য রয়েছে। যেমন তাবুর স্বামী স্ট্রোক করে মারা গেছে। তাবু সেকথা জানিয়েছিল কয়েকদিন আগে। আমি বসুন্ধরায় এক বন্ধুর বাসায় ফের সাবলেটে উঠি। তুণা ভর্তি হয়েছে। ভালো আছে। রোজেনের প্রমোশন হয়েছে। বদলি হবে চিটাগাং , একদিন ফোনে জানালো। তাবু প্রেম করছে শহিদুল নামের এক ব্যাংকারের সাথে। রোজি একটা এনজিওর কাজে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

একরাতে আমার কাছে মেসেনজারে কল আসে। সম্ভবত ছোটবেলার বন্ধু উৎপলের। আমি কি বলি ঠিক মনে নেই। বা সে কি বলে সেটিও বুঝতে পারি না। মনে হয় আমরা অনেক দুরে দুরেই কথা বলছি। নেটওয়ার্কের সমস্যা। বাসার বেলকনিতে রকিং চেয়ারে বসেছিলাম , এটুকু শুধু মনে আছে। এর আগে বা পরে সত্যি কথা কি আমি মনেই করতে পারছিলাম না আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের মতো। হয়। এমন হয়। অনেক বেশি গল্প জমা হলে। লাম্পট্যের গল্প। প্রেমের গল্প। অপ্রেমের গল্প । মায়ার গল্প। বিশ্বাসহীনতার গল্প। ঠিক কোন গল্পটা থেকে আমি নিজেকে আলাদা করব অথবা সব গল্পতেই আমাকে খুঁজতে খুঁজতে যেন আমি একটা মলাট তৈরি করি।

মলাটের মধ্যে মিশে যেতে থাকি। যেখানে সবটাই গল্প। এক বৃহত্তর গল্প, তার মধ্যে আরো কিছু বড়গল্প, মেজোগল্প, ছোটগল্প। যেমন, শৈশবে জ্যামিতি বইয়ের পাতায় বিদঘুটে সম্পাদ্যের চিত্রের নিচে যে “অংকনের বিবরণ” লেখা থাকে সেখানে মাঝে মাঝেই দেখা পেতাম হঠাৎ সূক্ষ্মকোণ কিংবা স্থূলকোণ অঙ্কিত। আবার উপপাদ্যের প্রমাণেও দেখতাম, “তারা পরস্পর বিপ্রতীপ কোণ” কিংবা “তারা পরস্পর সম্পূরক কোণ”-এই ধরণের লেখা। এখন আমি যদি সূক্ষ্মকোণ আর স্থূলকোণ কীভাবে আঁকতে হয় তা না জানি অথবা বিপ্রতীপ কোণ আর সম্পূরক কোণ কখন হয় তা না জানি, তাহলে আমার জন্যে সম্পাদ্য আঁকা কিংবা উপপাদ্য প্রমাণ করা উভয়ই প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। আমি যেন ওই অসম্ভব ধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছি।

আমার এরপর আর সত্যি আগে বা পরের কিছুই মনে ছিল না। শুধু কিছু একলা আকার সেই রাতে দেখতে পারছিলাম। আর কিছুই না। এমনকি আমার প্রাণপ্রিয় তুণাকেও না।

 

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;