একলা একলা আকার



দেবদুলাল মুন্না, অতিথি লেখক
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

‘সাব-লেট যারা দেন তারা মাঝারি অসহায় । যারা সাব-লেট নিন তারা প্রান্তিক। ফলে এই দুই অসহায় পক্ষের মালিক বাড়িমালিক। আবার ভাড়াটে ও সাব-লেট নেনেওয়ালা না থাকলে মালিক অসহায়। এটিকে একটি স্পেসকে নিয়েও দ্বন্ধ। সপ্তদশ শতাব্দীতে প্যারিসের লুঁগে শহরে সাব-লেট সংক্রান্ত একটি মামলায় বলা হয়েছিল, ইহা আপাত স্থানসংকুলানের জন্য মানবিক মনে হলেও খুব ঝুঁকিপূর্ণ সহাবস্থান।’
-সেভেন লেটার্স ডাউন মেমোরি: মন্টেস্কু

এক

পুরোটাই খেলা। আমি দেখছিলাম ব্রা। কালো। বেশ আটসাট করে জড়ানো তাবুর শরীরে। এবার আস্তে আস্তে হাতুড়ি গাঁইতি নিয়ে এগোলাম। টুকরোগুলো খুলি। নগ্ন নারী শরীরের স্তনকে কতভাবে ভেবেছি। কিন্তু ‘বাস্তবে এই প্রথম। আচ্ছা এভাবেওতো ভাবা যায় ব একটা র-ফলা পরে আছে। গ্রেট, তার মানে এভাবে বলা যায় যে র-ফলা পরে ফেললেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে বা"- এটা তো ডিকন্সট্রাকশান এবং লিটারেল থিংকিং এর প্রথম ভাগ।

এটা একটা দেখাপদ্ধতি , আমরা কি দেখতে পারি একটা ত্রিভুজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার আকার, ত্রিভুজের সাথে ডিভোর্স তাই সে ত্রিভুজাকার নয়? ত্রিভুজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার একলা আকার... এইসবই কিন্তু র-ফলা ছাড়িয়ে নেওয়া অবিতর্কিত বা এর সন্তান... বা, আমরা কি এমন কোন দিকে যেতে পারি যেখানে র-ফলা কে ঢেউ বা তরঙ্গ’র মতো দেখি। ভাবি, বক্ষবন্ধনী থেকে তরঙ্গ খুলে নিলে দুইটি স্তনের মাঝে অপশান জেগে ওঠে।

তাবু জানতে চায়, এ আদরের সময়ও তুমি কি ভাবো ?
বলি, ধরো যদি তোমার উপরে আমি মারা যাই হঠাত, তখন কি হবে ? পুলিশ, মামলা কি করে তুমি হ্যান্ডলিং করবে বা পালাবে আমার লাশ ফেলে?
তাবুর মনে হলো বিছানাটা কেমন যেন আর্দ্র আর্দ্র লাগছে। এক ঝটকায় কাঁথাটা সরিয়ে দিতেই বিস্ফারিত চোখে সে তাকাল বেডশিটের উপর। রক্তজবার মতো লালরক্তে ভিজে আছে বিছানার মাঝখানটা। সমস্ত চাদরটা যেন দেখাচ্ছে জাপানের পতাকার মতো। রাতে তার রজস্বলা হয়েছে সে টেরই পায়নি। আজ তো ঋতুস্রাব হওয়ার কথা নয়। ধার্য তারিখ আরো দু’দিন পর। জলের স্রোতের মতো এমন রজোদর্শনে খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে তাবু।

সে জানতে চায় এ অবস্থায় আমি তার ভুবনে যেতে চাই কিনা। আমি বলি, তুমি তো আমার কাছে সাব-লেটের মতো ছিলে। মালিক ছিল তোমার স্বামী। আমি প্রেমিক। আমি তোমার মন ও শরীর ভাড়া করেছিলাম প্রেমের দেনমোহরে। কিন্তু আমারই জন্যে তোমার সংসার ভাঙবে, তুমি সত্যি ইন্দিরা রোডে একটা বাসায় সাবলেট নিয়ে একা একা থাকবে, আমি ভাবিনি কোনোদিন।

এসব বলার সময় আমি আবারও তার তলপেটে ত্রিভুজাকারের একটি কোণ দেখি। কিছু ঘাস। আর রক্তপাত। আমি তার ভেতরে যেতে যেতে ভাবি,না , আর কখনো কোথাও বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব হবে না,এখন সব যেন একলা একলা আকার। অন্যরকম খেলা। গ্র্যান্ড ম্যাটা ন্যারেটিভলেসের। তাবু তবু কিসব জানি বলতে থাকে। বসন্ত তুমি আর এসো না এটি তো বলা যায় না। বলা গেলেও সে আসবে।

পাওলো কোয়েলহোর একটা উপন্যাস আছে। নাম, ইলাভেন মিনিট। এটির গল্প তাবু আজ আসার পরই শুনিয়েছি। মুভি হয়েছে এটি। তাবু কয়েকদিন আগে দেখেছে জানালে আমার মনে পড়ে সব। সেখানে মারিয়া নামের যৌনকর্মী এক জায়গায় ভাবছে বা বলা যায় ডায়েরিতে লেখছে : আমি আবিষ্কার করেছি কী কারণে একজন পুরুষ একজন মহিলাকে টাকা দেয়। সে সুখী হতে চায়। শুধুমাত্র অর্গ্যাজম পাওয়ার জন্য সে এক হাজার ফ্রাংক দেয় না। সে সুখী হতে চায়। আমিও চাই। সবাই চায়। অথচ কেউ সুখী নয়। আমার কী হারাবার আছে, যদি কিছুক্ষণের জন্য আমি ঠিক করি আমি হব একজন ‘ ’।

তার রেগুলার কাস্টমার বা প্রেমিক র্যালফের সঙ্গে কিছু আলাপ:
মারিয়া:একজন বেশ্যার প্রেমে পড়লে কী করে?
র‌্যালফ : আমার মনে হয় এর কারণ, তোমার শরীর কোনোদিন আমার একার হবে না জেনে আমি মন দিয়েছি তোমার আত্মাকে জয় করাতে।
মারিয়া: তোমার ঈর্ষা হয় না? আমার কাছে তো অন্যরাও আসে?
র‌্যালফ : না। তুমি বসন্তকে বলতে পারো না, এখানে এসো আর যতদিন সম্ভব থাকো।
মারিয়া: মানে ?
র‌্যালফ : মানে হলো ১১ মিনিটই অসীম। তুমি তো স্থায়ী কারো না। তাই তোমাকে পাওয়ার ব্যাকুলতা। হয়তো অস্থায়ীকেই মানুষ নিজের অজান্তে বেশি ভালবাসে। ঠিক জানি না। এটাও উত্তর হতে পারে।
তাবু ওইসব আমাদের এডাল্ট সিনগুলো উপভোগ ও আমি ‘ইলেভেন মিনিট’ কাটানোর ঘোর কাটাতেই বুঝতে পারি সন্ধ্যা নামছে। তাবু ওয়াশরুমে যায়। ফ্রেশ হয়। শাড়ি পরে। আমিও সে যাহা আমি তাহা। এরপর তাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বরোড পর্যন্ত এসে একটা স্কুটারে তোলে তাবুকে বিদায় দিই।

দুই

রোজেনের সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়েছে কতোবছর আগে ঠিক মনে নেই। সেটার হিসাব রাখতেও চাই না। রোজেন মাঝেমধ্যে ফোনকল দেয়। আমিও। আমাদের এখনও যোগাযোগের কারণ সন্তান । তুণা। তুণা এ লেভেল শেষ করে চেষ্টা করছে বাইরে পড়তে যাওয়ার। রোজেন একদিন আমাকে ফোনকল দেয়, বলে, তোমার মেয়েতো ডিপ্রেসনে ভুগতেছে। তার নাকি কিচ্ছু ভাল লাগে না। হাত ব্লেড দিয়া কাটছে। এতটুকু বলে লাইন কেটে দেয়।

আমি তুণাকে ফোন করি। সে ধরে না। ওইদিনই সন্ধ্যায় আমি রোজেনদের বাসায় যাই। নিজেকে মেহমান মনে হচ্ছিল। তুণাকে বলি , তোমার সমস্যা কী ? তুণা উত্তর দেয়, সমস্যা কী ? নাই তো! আমি তাকে যেন এখুনি হারিয়ে যাবে কিন্তু হারাতে দেবো না এমন ভয়ে খুব জোরেসোরে জড়িয়ে ধরি। সে ঘটনার আকস্মিকতায় একটু অপ্রস্তুত। আমি বুঝি ঠিক হচ্ছে না, বিয়িং ইজি। ওকে ছেড়ে দিয়ে দুহাত ধরে নেইলপালিশ দেখার ভান করে বলি, বাহ, সুন্দর রঙ তো।

আসলে দেখি তার বাম হাতের ব্লেডে কাটা ধীরে ধীরে লাল থেকে কালো হতে থাকা দাগগুলো। বলি, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। আসলে দেখি তার চোখ ভরা বিষন্নতা। রোজেন চাওমিন দেয়। আমি ও তুণা খাই। খাবার ফাঁকে তুণা হঠাৎ জানতে চায়, বাবা, তুমি কি এখনও মদ খাও ? ভাবি, খাইতো। কিন্তু তাকে এখন বলা ঠিক হবে কি! বলি খাই, খুব কম। মাসে এক বা দুইদিন।

এসব কথার মাঝেই তার হাউস টিউটর এলে তুণা পড়তে চলে যায় রিডিংরুমে। কিছুক্ষণ টিভি চ্যানেল সার্ফিং করি। রোজেন এলে এটা সেটা মানে দরকারি কথা বলি। এরপর কি মনে করে বলে ফেলি, তুণার জন্য আমাকে কি সাবলেট দিবে ? ওর ডিপ্রেসন কেটে গেলে বাইরে চলে গেলে আমিও চলে যাবো।’

রোজেনের এমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখি যেন বাংলা মুভির কোন সংলাপ আওড়াচ্ছি আমি। সে আমাকে বিদায় দেবার সময় এতো জোরে দরজা লাগায় সে শব্দটা চারতলা থেকে আমি নিচে নামার আগেই বাসার গেট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। আমি সিড়ি দাপিয়ে নিচে নামতে থাকি এবং আমার মাঝে সেই প্রথম ইচ্ছা জাগে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করুক। কিন্তু আমি জানি, বাস্তবতা হলো মানুষের জীবনে অপেক্ষার চেয়ে বড়ো কাজ হলো বহুপথে বারবার নিজের কাছে ফেরা।

বাসায় ফেরার পর রোজি ফোন করে জানায়, পরদিন দেখা করতে । পরদিন ধানমন্ডির সাতাশ নাম্বারের একটা রেস্তেরায় স্লাইডার ঠেলে রোজি ঢুকে । সোফার কোণে বসে ছিলাম। বসল মুখোমুখি। একটু সময় নিলো। মাঝে দুটি কফির মগ। আমি বললাম, 'দেখো রুচিবোধ চিরস্থায়ী কোনো ব্যাপার না। যার থাকে সে কুপমণ্ডুক। এটি তুমি ও না। আমি ও না। আমাদের মধ্যে অনেক কিছু হয়েছে। একটা ডিপ রিলেশন।

এটাকে কেউ প্রেম বলে। কিন্তু প্রেম বলো আর যাই বলো মানুষের রিলেশন তো স্থবিরতার শর্ত মেনে বেচেঁ থাকবে না। যদি বেচেঁ থাকে তবে সেটি ভণ্ডামি । অবশ্য জীবন একটু কপটতাকে ও এ্যালাও করে। অকপট হয়ে সমাজ সংসারে বেঁচে থাকা যায় না। এটাও তুমি জানো।'

এর বেশি কিছু বলিনি। বেরিয়ে যায় রোজি যা বোঝার সেটি বোঝে। কি বুঝেছে সেটি অবশ্যই আমার জানার কথা না। লাটিমের চক্কর। এই চক্রকে ঘিরে নাচে বাদর। মানুষের ভীড়। এরিমধ্যে হেটে যায় সবুজ টিয়া। রব উঠে, আমার নাম সুশান্ত। টিয়া যায় এগিয়ে। একটি হলুদ এনভেলাপ তোলে। ওই এনভেলাপ নেয় কারবারি। বলে যায় , ‘সুশান্ত ঘোষ, আপনার সামনে মহা বিপদ’।
এসব দেখতে দেখতে খবর পাই, রোজি আরেকজনের সঙ্গে প্রেম করছে। সরেছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। যেন ঘুরে বেড়ানোর জন্যই মন জন্মেছি আমরা। ঘুরেফিরে বলছি,‘নিঃসঙ্গতা মানে সঙ্গের অভাব নয়। নিঃসঙ্গতা আরো ব্যপ্ত এক ক্ষেত্র, এক কুয়াশাময় জগত। ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট। সেখানে ঢুকে যাওয়া সহজ, সেখান থেকে ফিরতে পারা সহজ নয়। মুখ বদলে গেলেও সঙ্গীর,থেকে যায় স্মৃতি। আই এ্যাম সিঙ্গেল বাট নট এলোন।’

রোজির সাথে আর আমার দেখা হয়নি। এখন শরতকাল। তবু বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরে বসে গান শুনি। কথাগুলো এমন,একটা কাঁচঘর। সেই কাঁচঘরে বসে তুমি ই ঢিল ছুড়ছো। ভেঙে পড়ছে তোমার চারপাশ। তুমি কি তোমার সব্বাইকে ভুলে গিয়েছ !

আসলে এসব যেনবা আমার সাজানো ফ্যান্টাসি। আমি একটা অন্যজগতে ঢুকে পড়েছি। বারবার যখন প্রেমে পরা কোনো নারীকে প্রত্যাখান করে ফিরে আসছি তখন যেন মনে হয়, রোজেন আমাকে যেভাবে ডিভোর্স দিয়ে প্রত্যাখান করেছিল সেসময়ের আমার যন্ত্রণা, বিষাদ সবটুকু সেসব নারীদের ভেতর দিয়ে আমি রোমেনকে ফেরত দিতে চাচ্ছি। এরকম খেলায় মেতে উঠা নিশ্চয়ই সুস্থতা না। অদ্ভুত একটা ব্যাপারও ঘটে, যেমন প্রেমে জড়ানোর সময় মনে হয় ঠিক ঠিক আশ্রয় চাইছি। কিন্তু কিছুকাল চলে যাওয়ার পর ওইসব প্রেমিকারাই আমার কাছে একঘেয়ে উঠে পড়ে কিনা আমি খুব ক্লিয়ার না। নাকি তুণার কথা মনে পড়ে বলে সরে আসি?

মনে হয় সেসব সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগে যেনবা তুণা আমাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনছে। আমার হাত’ পা মোটা রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা। সারা শরীরে কালো বসন্তের দাগ। একমুখ চুল দাড়ি। চোখ ঘোলাটে।বিছুটি। আমাকে কোথাও থেকে নিয়ে হেটে হেটে ফিরছে তুণা। সে সামনে। আমি পেছনে। দেখা যায় এরপরও আমি তুণার কাছ থেকে ছিটকে পড়ে ফের ভুলপথে পা বাড়াচ্ছি।

তিন

সেই ভুল পথেই পা দেওয়াতেই কী তুণা ডিপ ডিপ্রেসনে যাচ্ছে ? আমিও তো খুব ছোটবেলা থেকে খালি পালাতেই চেয়েছি। কখনো প্লেনে করে, কখনো ট্রেনে, কখনো কালিঘাটের ট্যাক্টরে, কখনো বা ঘুমের ওষুধে, মদে, আবার কখনো অচেনা মানুষদের নিজের ঘরবাড়ি ভেবে নিয়ে। এভাবে পালাতে পালাতেই তো দুদিক থেকে দুজন মানুষ জড়ো হয়েছিল রেলস্টেশনের ওয়েটিং রুমে। শ্রীমঙ্গলে। ট্রেনের দেরি। রোজেন আর আমি। এরপর আলাপ। ট্রেনে মুখোমুখি সিটে বসে যাত্রা।

ওহ আচ্ছা, রোজেন আপনার নাম? অর্থ কি? অর্থ হচ্ছে উপযুক্ত ? আধুনিক? অস্থির? নাকি আইনস্টাইনের ক্ষুদ্র বিবর ? আচ্ছা ওই ক্ষুদ্র বিবরটা কেমন ? সেই বিবর চিনতে চিনতে একসময় ঘরের মেঝেতে বিছানা। শিওরে লাল টেবিল ল্যাম্প। মাথার নিচে কার্লমার্কসের চারখন্ড ও কহলিল জিবরানের প্রফেট, এসবের ওপরে গোটা পাঁচেক ওড়না। কিন্তু তুণার জন্মের পরপরই তো পাল্টে গেল সব।

সেই তুণাই কি এখন প্রতিদিনের অন্ধকার ভেতরে নিয়েছে, অনেক ভেতরে। খুব যখন ছোট্ট ছিল, অন্ধকার ঘরে তাকে বন্ধ করে দেওয়া হত মজা দেখার জন্য। ওইটুকু মেয়ে, অন্ধকার ঘরে ভয় পায় না! কাঁদে না! যে কাঁদে না, সে কি ভয় পায় না? অনেক, অনেকদিন পর একদিন বলেছিল আমাকে, যে বলাগুলো বহুকাল ধরে গভীরে পুঁতে রাখা, শিকড় গজিয়ে গাছ হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা খুঁড়ে বের করে আনা, যে ভয় তো পেত, খুব ভয় করত। কিন্তু কাঁদত না। কাঁদতে পারত না।

আসলে, বুঝতেই পারত না যে কাঁদা উচিৎ। ওসব সে শিখেওছিল দার্জিলিং এ মাউন্ট হারম্যান বোর্ডিং ইশকুলে যখন তাকে পড়তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ওই ছোট্টবেলা থেকেই তুণার একটা ভেতরকার জগৎ ছিল। একটা অন্য মাত্রার সত্যি, যা বাস্তবের মিথ্যে রাংতা-মোড়ক ঢাকা পৃথিবীতে খুলে দেখানো যায় না। খুব ছোট্ট ছোট্ট কিছু চাহিদা ছিল তার, কিছু পুঁচকে পুঁচকে আনন্দ, যার অধিকাংশই, অন্ধকারের স্বাভাবিক নিয়মে, কারো না কারো বাস্তবের বুটজুতো থেঁতলে দিয়েছে। সেই থেঁতলানো ইচ্ছেগুলোই অপু জমিয়ে রেখেছে তাও।

সহজে সে কিছু ফেলে দিতেও পারে না। নিজের পুরনো কাপড়, ডায়েরি, বলপ্যান , টর্চলাইট সবই। মনের ভেতরে যে বিশাল দিঘীটার বাস, সেখানে সবচেয়ে গহন জায়গাটায় কৌটোয় পুরে রাখা তুণার যে প্রাণভোমরা, তা আসলে এক সমুদ্রসমান মায়া। খালি চোখে দেখা যায় না, চশমা পরেও না। আমি হয়ত দেখি। বা দেখিনা। বা ওকে ঘিরেও রয়েছে হয়তোবা আমার ফ্যান্টাসি।

চার

তাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ফেসবুকে। এরপর ঘনিষ্ঠতা। একদিন দেখাও হয়। তখন তার স্বামী আছে। সংসার আছে। ভালো চাকরি আছে। বাড়ি আছে। গাড়ি আছে। যা নেই সেটি হলো কোনো বন্ধু নেই। আর আমার, বন্ধু রাখার জায়গা নেই প্রায়। সন্ধেবেলা শিশির পড়ছে,শিল্পকলা একাডেমিতে ‘নিত্যপুরাণ’ নাটক দেখে আমি আর তাবু মাঠে বসে ছিলাম। সেদিনই প্রথম দেখা।

আমি বলি, ‘এত গল্প জমে আছে আমার কাছে, তুমি শুনতে শুনতে বোরড ফিল করবে না তো?’ সে হাসে। বলে, ‘একটু অদলবদল ছাড়া সব মানুষের আসলে একই গল্প। তুমি যেভাবেই বলো না কেন, চমকাব না। ঘোর লাগার সময় কেটে গেছে আমার। হয়তো সেজন্যই নির্বান্ধব। তড়িঘড়ি করে বলার কিছু নেই। আবার ধীরে আস্তে অনেক ভেবেও বলার কিছু নেই।’

আমি তাবু’কে মুগ্ধ করার জন্য বললাম, আচ্ছা, তোমার কি ওই গল্পটা জানা আছে যে এক বৃদ্ধ লোক নিজেকেই চিঠি লিখত ও পোস্টঅফিসে গিয়ে চিঠি পোস্ট করে চলে আসত। এরপর সেই চিঠির অপেক্ষায় থাকত। পিয়ন এসে চিঠি দিয়ে গেলে সে পড়ত। এভাবে একশো একুশটা চিঠি লিখেছিল প্রেরক ও প্রাপক হিসেবে।

তাবু বলে, জগৎ পুরনো। মানুষ নতুন। এ গল্প নতুন ভার্সন। পুরনোটা এমন, এক আদিবাসী দ্বীপে একা থাকত। কেউ কথা বলার ছিল না। তাই কাজকর্মের ফাঁকে সে দুই কণ্ঠস্বরে কথা বলত। এক নারীকণ্ঠ। অন্যটি তার। পরে একদিন তার কণ্ঠই নারীকণ্ঠের মতোন হয়ে গেল। আর আসল কণ্ঠ ফিরে পেল না।

আমি জানতে চাই, তুমি এ দুটি গল্পে কী পাও?
সে বলে, মানুষের একাকিত্ব। আসলে মায়ার সংসারে ভাষার সংসারে আমরা প্যান্টোমাইম। আমরা কতোটুকুই বা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি? পারি না। গল্পের ভাষার তো তাই ভাণ্ডার বড়ো থাকার কথা নয়। আপনি পারবেন আমার অনুভূতি অনুবাদ করতে? বা আমি আপনার?

আমার তখন সদ্য রোজেনের সাথে ডির্ভোস হয়েছে। ফলে একটা নারীসঙ্গ দরকার। কিন্তু কথা বলে বুঝতে পারি তাবু বেশ ফেমিনিস্ট। নিজেকে যতোটুকু আমি জানি সেটা হচ্ছে আমার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মেল শভিনিজম কাজ করে। কিন্তু সেটা প্রকাশিত হলে তো আর কাজ হবে না। তাই আমি তার সাথে যে কৌশলটা নিই সেটি হলো, নারীবাদ পশ্চিমা প্রেডাক্ট,বিশেষ ইস্যু, এটসেটরা এটসেটরা। যে সমাজে পুরুষই মানুষ হিসেবে মুক্ত না সেখানে কে কাকে মুক্তি দিবে।

মানে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টার ভেতর দিয়ে কৌশলে আমার মেলশেভিনিজমকে আড়াল করে তার ফেমিনিস্ট সত্ত্বাকে ভাঙতে থাকি। সে আমাকে জানায়, তার স্বামী শরীরে হাত তোলে। মাস্টারবেশন করে। পর্ণো দেখে। মানুষের সঙ্গে মিশুক চায় না। অনেকটা বোঝে না বোঝে একটা ঘোরের মধ্যেই তাবু একসময় আমার প্রেমিকা হয়ে ওঠে। আমাদের গল্প পুরনো হয়। হয় প্রাগহৈতিহাসিক।

এরপর বহুদিন পর কোভিডকালে হোম কোয়ারেন্টাইনের কোনো একদিনে আমি ফোনকল পাই তাবুর। ওপাশে সে কাঁদছে। তার কান্না যেন কুন্ডুলি পাকিয়ে আমার কানে এসে ঢুকে আমার শৈশবের কালিঘাটের তেতুল গাছের ওপরে বসে থাকা ঘুঘুর মতো। বৃষ্টির দিনে ঘুঘু ডাকে সেই প্রথম আমি জেনেছিলাম। সেই শৈশবে। তাবু জানায়, সে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছে। মনে হয়, তার বেরিয়ে পড়া যেন ট্রেন মিস করা হোটেলের বিল মিটিয়ে বেরিয়ে পড়া একটা মেয়ের নিরুপায় রিকশা নিয়ে ইতস্তত এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি।

তাবু জানায়, কোথাও উঠবে। আর স্বামীর বাসায় ফিরবে না। মনে হয়, আমি এভাবে বহুবার এখান থেকে ওখানে আশ্রয়ের জন্য ছুটেছিলাম, সেই ছুটা শেষে ফের রাস্তায় ওভারস্যাক ঝুলিয়ে দাড়িয়ে থাকা। তাবু সেই থেকে সে ইন্দিরা রোডে একটা বাসায় এক বান্ধবীর সহায়তায় সাবলেটে উঠে। এর আগে বান্ধবীর বাসায় ছিল। তাবু আমাকে ফোন করে, জানতে চায় তুণার খবর। বলি, আমি রোজেনের কাছে তুণার জন্য সাবলেট চেয়েছি। এ সাবলেটটা আমার খুব দরকার।

পাঁচ

এর দুমাসের ভেতরেই আমি রোজেন ও তুণাদের সঙ্গে নতুন কলাবাগানের বাসায় সাবলেট উঠি। তুণা বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময়ই আমার ঘরে কাটায়। আমি ও তুণা প্রায়ই খাবার খেতে একসাথে টেবিলে বসি। টিভি দেখি। আমাদের বাবা-মেয়ের সহাবস্থানের সময় পাশের রুমে বা অন্যখানে রোজেন থাকে। তার কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। টের পাই, আমার পছন্দের খাবার রান্না করতে সে ভুলে যায়নি। মাঝেমধ্যে শুনি রোজেন তুণার কাছে আমাকে নিয়ে গল্পও করে।

এই যেমন, প্যাথলজিক্যাল টেস্টের জন্য তুণাকে নিয়ে রোজেন গিয়েছিল। ব্লাড দেওয়ার সময় একটু ভয় পাচ্ছিল তুণা। ছয় টিউব রক্ত দিতে হবে শুনেই ভয় পেয়েছিল মা-মেয়ে। সেসময় রোজেনও বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। ব্লাড দেওয়ার পর রোজেন তুণাকে বলেছিল, তুমি ছোট তাকতে টিকাটুকা দেওয়ার সময় তোমার আব্বু আসত। আমি তো এসব দেখে অভ্যস্ত নই। এ ঘটনা তুণা আমাকে না বললে আমি জানতাম না।

জগতের নিয়মই তাই যে কোনোকিছুই একইরকম থাকে না। বিলীন অথবা বিস্তার। ভয় থেকে সভ্যতার শুরু। আবার সভ্যতাই ভয়েরও জন্ম দেয়। কী অবাক প্যারাডক্স। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগুলো ঠিকই কিন্তু যেন জানান দিলো একটা ধুলির চেয়েও ক্ষুদ্র অদৃশ্য ভাইরাস বা ব্যকটেরিয়া সবকিছু শেষ করে দেয়। তুণা ফিজিক্সে ভাল। সে আমাকে এসব শোনায়। আমি জানি না এমন ভাব করে সব শুনি তাকে মুগ্ধ করার জন্যে। মেটোনিমি ও মেটাফোরের ক্ষেত্রে যে সাদৃশ্য রয়েছে সেটির ব্যাখা আমাকে শোনায়। আমি শুনি আর বয় পাই। আহা তুণা অল্প বয়সে জগতের বেশিকিছু জেনে ফেলেনি তো!

সে কি রহস্যগুলোর দরজা একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে! একদিন ড্রয়িংরুমে খুব জোরে একটা ব্যালেন্ডিয়া মিউজিকের সুর শুনি। এরপরই তুণা আমাকে ডাকতে ডাকতে আমার গরে আসে। জড়িয়ে ধরে। জানায়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাই করেছিল ভর্তির জন্যে। সেখান থেকে পরীক্ষার রেজাল্ট পেয়েছে। পাস করেছে। ভর্তি হতে বলেছে। আমিও ছুটে যাই আনন্দে। রোজেন সোফায় বসেছিল। সেইপ্রথম ডিভোর্সের পর তিনজনে আড্ডায় আনন্দে মেতে উঠি।

আমি ও রোজেন তুণাকে তিন/চারটা অতীতের গল্প শোনাই যেসব অনুপ্রেরণামুলক। ফাঁকে প্রেসার কুকার বাজে। বিড়ালটা সোফার কোণ থেকে লাফ দিয়ে দেয়ালে ঝুলানো স্মার্ট টিভিতে আরেকটি বিড়ালকে দেখে ঝাপটে ধরতে যায়। রোজেন কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভিয়ে দেয় ‘চোখে বড় লাগছে’ বলে। তুণার মধ্যে কোনো ডিপ্রেসন নেই। অনেকদিন থেকেই ছিল না অবশ্য। আমি তুণা’কে বলি, কতো কতো দেশ ঘুরবে। কি আনন্দ তোমার!

তোমার ইলিনয়ের ম্যাজিক হোমে যাওয়ার খুব ইচ্ছা করত একসময় আমার। আমি তো যেতে পারিনি। তুমি যেও। সেই ম্যাজিশিয়ানের বাড়ি। কি যেন নাম, ডেভিড ক্র্যাটস। তুণা খুব আগ্রহভরে জানতে চায়। ম্যাজিক হোম নিয়ে আমিও ভালো একটা জানি না। কি বলব, মিথ্যার ধরণই এমন যে বেশিক্ষণ সে সাবলীল থাকেনা। তাই যতোটুকু জানি সেটুকুই বলতে থাকি, ম্যাজিক হোমে একসময় কলম্বাসের সঙ্গী এক ম্যাজিশিয়ান আশ্রয় নিয়েছিল। সে সারাদিন সারাসন্ধ্যা হাটত শহরময়। কারো সাথে কথা বলত না। এমনকি কখনো কখনো হেটে একশহর থেকে অন্য শহরেও যেতো। সে বেঁচে ছিল অনেকদিন। কিন্তু মরে যাওয়ার কয়েকবছর আগে তার বাড়ির বিভিন্ন ঘরবাড়ি সে বিভিন্নজনকে সাব-লেট দেয়। সন্ধ্যার পর সে একটা হলঘরের মতো রুমে সবাইকে আসতে বলত।

সবাই মিলিত হওয়ার পর সে পিয়ানো বাজিয়ে শোনাতো। এরপর মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে সে নিরুদ্দেশ হয়। তার বাড়ির সাব-লেটবাসীরা অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সে ফিরে না।এরপর একরাতে বোমা বর্ষিত হয় বাড়িতে। কারা করেছিল, কে জানে। কোনো একটা যুদ্ধে এমন হয়েছিল। মজার ব্যাপার সে ই বোমা বর্ষণে সবাই মারা যান। এর পঁচিশবছর পর একটা মানুষকে দেখা যায় সেই ভাঙা বাড়ি ঠিক করছেন। গড়ছেন। যারা ম্যাজিশিয়ানকে চিনতেন তারা দেখেন সেই ম্যাজিশিয়ান ফিরে এসেছেন। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব ! আবার এটাও তো সত্য সেই মানুষ , বয়স চেহারা , আচরণ, উচ্চতা সবদিক থেকে মিলিয়ে ওই ম্যাজিশিয়ানেরই মতোন।
এসব আনন্দমুখর দিনগুলো আমাদের কেটে যায় দ্রুতই। রোজেন, তুণা ও আমি ঘুরে ঘুরে শপিং করে তুণার জন্য। টিকেট কনফার্ম করি। এরপর একদিন সেই দিন আসে। তুণার বিমানে চড়ার। আমরা একটু আগেভাগেই যাই।

তুণা চলে যায়। একটা ট্যাক্সিক্যাবে আমি ও রোজেন নিশ্চুপ বসে বাসায় ফিরি। দুজন দুঘরে। এর সপ্তাহ খানেকের ভেতরেই রোজেন আমাকে জানায় সাব-লেটের দিন শেষ। সংসার মানে একসঙ্গে একটা প্রোডাকশন, একটা ছবি, একটা গল্প। সংসার মানে অদরকারি এটাসেটা, মনের ভুলে কিনে ফেলা চায়ের কাপ, চুড়ি, মাটির পাতিল, যা কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু কখনো দেখলে মনে হয় আহা কিনেছিলাম এইসবও । এইসব... সব... প্যাকিং বাক্সে চালান হয় বারংবার। ভাঙ্গা জিনিস, ভাঙ্গা কথা, ভাঙ্গা স্মৃতি, ভাঙ্গা প্রমিস, এসব নিয়েই ভাঙ্গা সংসার আবার একটু একটু করে ফেভিকল দিয়ে জোড়া লাগানো।

আমি ও রোজেনও ফেভিকল দিয়ে জোড়া লাগিয়েছিলাম। ফেভিকল হয়ত তুণা ছিল। তারপর একদিন পরবর্তী সংসারের জন্য বা একা থাকাকেই মেনে নিয়ে গোপন দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নতুনভাবে চলা। যেন জিনসের প্যান্টে ধুলো লেগেছে। ঝেড়ে ফেলা। বিশ্ব সংসারে মনে হয় সবাই একাই , জাস্ট নিজের কাছেই অচেনা । ডার্ক পোট্রেট । তবু আরেকজনকে চিনতে চিনতে সংসারে গুম হয়ে যাওয়া । প্রেমে গুম হওয়া। যেন মনুষ্য জীবন একটা তৈরিই হয় শিকারের জন্য । শীরিষ গাছের ডালে বিতুয়া পাখি তাকিয়ে আছে আপনার দিকে, বিশ্বাস করেন একটু নড়লে চড়লেই ঠোকর। বেইসিক্যালি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু সেটাই আসলে বড়ো প্রোডাকশন। আমিও এক সন্ধ্যায় ফের রোজেনের বাসা ছাড়ি।

ছয়

এসবের মধ্যে আরো কিছু আলেখ্য রয়েছে। যেমন তাবুর স্বামী স্ট্রোক করে মারা গেছে। তাবু সেকথা জানিয়েছিল কয়েকদিন আগে। আমি বসুন্ধরায় এক বন্ধুর বাসায় ফের সাবলেটে উঠি। তুণা ভর্তি হয়েছে। ভালো আছে। রোজেনের প্রমোশন হয়েছে। বদলি হবে চিটাগাং , একদিন ফোনে জানালো। তাবু প্রেম করছে শহিদুল নামের এক ব্যাংকারের সাথে। রোজি একটা এনজিওর কাজে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

একরাতে আমার কাছে মেসেনজারে কল আসে। সম্ভবত ছোটবেলার বন্ধু উৎপলের। আমি কি বলি ঠিক মনে নেই। বা সে কি বলে সেটিও বুঝতে পারি না। মনে হয় আমরা অনেক দুরে দুরেই কথা বলছি। নেটওয়ার্কের সমস্যা। বাসার বেলকনিতে রকিং চেয়ারে বসেছিলাম , এটুকু শুধু মনে আছে। এর আগে বা পরে সত্যি কথা কি আমি মনেই করতে পারছিলাম না আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের মতো। হয়। এমন হয়। অনেক বেশি গল্প জমা হলে। লাম্পট্যের গল্প। প্রেমের গল্প। অপ্রেমের গল্প । মায়ার গল্প। বিশ্বাসহীনতার গল্প। ঠিক কোন গল্পটা থেকে আমি নিজেকে আলাদা করব অথবা সব গল্পতেই আমাকে খুঁজতে খুঁজতে যেন আমি একটা মলাট তৈরি করি।

মলাটের মধ্যে মিশে যেতে থাকি। যেখানে সবটাই গল্প। এক বৃহত্তর গল্প, তার মধ্যে আরো কিছু বড়গল্প, মেজোগল্প, ছোটগল্প। যেমন, শৈশবে জ্যামিতি বইয়ের পাতায় বিদঘুটে সম্পাদ্যের চিত্রের নিচে যে “অংকনের বিবরণ” লেখা থাকে সেখানে মাঝে মাঝেই দেখা পেতাম হঠাৎ সূক্ষ্মকোণ কিংবা স্থূলকোণ অঙ্কিত। আবার উপপাদ্যের প্রমাণেও দেখতাম, “তারা পরস্পর বিপ্রতীপ কোণ” কিংবা “তারা পরস্পর সম্পূরক কোণ”-এই ধরণের লেখা। এখন আমি যদি সূক্ষ্মকোণ আর স্থূলকোণ কীভাবে আঁকতে হয় তা না জানি অথবা বিপ্রতীপ কোণ আর সম্পূরক কোণ কখন হয় তা না জানি, তাহলে আমার জন্যে সম্পাদ্য আঁকা কিংবা উপপাদ্য প্রমাণ করা উভয়ই প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। আমি যেন ওই অসম্ভব ধাঁধায় জড়িয়ে পড়েছি।

আমার এরপর আর সত্যি আগে বা পরের কিছুই মনে ছিল না। শুধু কিছু একলা আকার সেই রাতে দেখতে পারছিলাম। আর কিছুই না। এমনকি আমার প্রাণপ্রিয় তুণাকেও না।

 

গল্প 'ব্রহ্মপুত্রের ঘাট': মাহফুজ পারভেজ



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও বলা যাবে না। যাত্রাপথ সাকুল্যে পয়তাল্লিশ মিনিটের। কোনও বিভ্রাট হলে প্লাস-মাইনাস পাঁচ থেকে দশ মিনিট। যাত্রার সময়ের মতো পথের রেখাও ঝকঝকে, স্পষ্ট। কিশোরগঞ্জ থেকে নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে ডানে গৌরীপুর, নেত্রকোনা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট রেখে শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। ট্রেনে এলেও মোটামুটি একই সময় লাগে আর অভিন্ন জনপদগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। পূর্ব ময়মনসিংহের এই চিরায়ত ভূগোলে সড়ক আর রেলপথ বলতে গেছে সমান্তরালে চলেছে। 

শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুরের ঘাটের চিত্রটিও আদি আর অকৃত্রিম গুদারা ঘাটের বর্ধিত সংস্করণ মাত্র। পারস্যের বহু ফারসি শব্দের মতো গুদারা শব্দটিও দিব্যি টিকে আছে বাংলা অভিধানে। ঘাটে গিজগিজ করছে পূর্ব ও উত্তর ময়মনসিংহের বাসগুলো। গুদারা নৌকায় অপর পাড়ে ময়মনসিংহ শহর। সেখানেও অনেকগুলো ঘাট: থানা ঘাট, এসকে হাসপাতাল ঘাট, পাটগুদাম ঘাট। যার যেদিকে কাজ, সেদিকের গুদারা নৌকায় যাচ্ছে। নদীর অবিরাম স্রোতের মতো নৌকা ও মানুষের ছুটে চলা যেন চলছেই অনাদিকাল থেকে। মূক ব্রহ্মপুত্র যার সাক্ষী।   

কনক বাস থেকে নেমে নদী ও ওপারের ল্যান্ডস্কেপে আবছা শহরের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়। প্রলম্বিত গ্রীষ্মের তেজি ভাব নেই নদী তীরের জলমগ্ন পরিবেশে। বাতাসে হাল্কা সুখের পরশ ভাদুরে গুমোট গরমকে  কিছুটা পরাজিত করেছে। নদী যে কতটা স্বস্তি ও আরামের, তীরে এলে টের পাওয়া যায়।

কনকের ভাগ্যে প্রাকৃতিক মোলায়েম পরশ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আসা-যাওয়ার বাসগুলোর মধ্যে ঢুকছে আরও নানা রকমের যানবাহন, যাত্রী ও পথচারী। থেমে থেমে শুরু হয়েছে যন্ত্রদানবের পৈশাচিক হর্নের মর্মন্তুদ উল্লাস। কালো ধূম্রকুণ্ডলী পাগলা মোঘের মতো খোলা আকাশ ও মুক্ত বাতাসকে হনন করছে। ঘাটের কুখ্যাত যানজট, শব্দ ও বায়ু দূষণ, বিশৃঙ্খলার উৎপাত থেকে কিছুটা দূরে সরে কনক একটা অস্থায়ী গোছের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে।

একমুখ হাসিতে মাঝবয়েসী দোকানি আমন্ত্রণের গলায় বলল, ‘চা আর একটু হাওয়া খেয়ে নৌকায় উঠে পড়ুন। এখনও রোদ কড়া হয় নি, আরামে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’

দোকানির কথায় কনক সৌজন্যে মাথা ঝাঁকিয়ে একই সঙ্গে সম্মতি ও চায়ের অর্ডার দেয়।

ঘাটের এদিকে বিশেষ ভিড় নেই। জন কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, হর্ন ও ভিড়ের প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম। অদূরে ধনুকের মতো উত্তর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যেতে। চোখে পড়লো, নদীতে ব্রিজের কাজ চলছে। পিলার বসছে মাঝ বরাবর।

কনক ব্রিজের চলমান কাজকর্মের দিকে অনেকক্ষণ স্থির চোখ আকিয়ে আছে দেখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে দোকানি কথা বলে, ‘ব্রিজ হলে তো ঘাট থাকবে না। গুদারা, মাঝি, আমাদের মতো দোকানদারদের বিপদ হবে।’

কথাগুলো ঠিক কনককে উদ্দেশ্য করে বলা হয় নি। স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত। কনক চুপ করে শোনে। কোনও উত্তর দেয় না। চা শেষ করে ঘড়ি দেখে কনক। প্রায়-আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনও জ্যোতি আসে নি। অথচ আজকে জ্যোতির আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইচ্ছে করলেই সে নৌকা ধরে ময়মনসিংহ শহরে চলে যেতে পারে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটবে না। তাদের মধ্যে ঠিক করা আছে, এক সপ্তাহে কনক ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে শহরে আসবে। পরের সপ্তাহে জ্যোতি আসবে নদী পেরিয়ে শম্ভুগঞ্জে। মফস্বল শহরের ছোট্ট পরিসরে সবাই মুখচেনা লোক। নিয়মিত এক জায়গায় দেখা-সাক্ষাত হলে লোকমুখে সেটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।

একবার শহরের জনবহুল গাঙিনার পাড়ে কনক ও জ্যোতিকে একসঙ্গে দেখে পাড়ার এক বড় ভাই কটমটে চোখে তাকিয়ে ছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় জেরা-জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে যায়। আরেক বার রেল স্টেশেনের কাছে তাজমহল রেস্টুরেন্টে চা খেতে গিয়ে প্রায় হাতেনাতে ধরাই পড়ে গিয়েছিল কলেজের মহেশ স্যারের কাছে। সেবারও ভাগ্যের জোরে সটকে পড়েছিল দুজনে। তারপর থেকে পরিকল্পনা বদলে ফেলে তারা। এক সপ্তাহে কনক শহরে গিয়ে দেখা করে। দেখার জায়গাও তারা বদল করে নিয়মিত। কখনও ছায়াবাণী, পূবরী বা অলকা সিনেমা হলের সামনে। কখনও সার্কিট হাউসের আশোপাশে। কখনও নদীর তীর-ঘেঁষা পার্ক ও রাস্তায় সন্তর্পণে কিছুটা সময় কাটায় তারা।

জ্যোতি শহরের বাইরে এলে শম্ভুগঞ্জের আশেপাশে নদীর তীর ধরে নির্বিঘ্নে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় দুজনে।

এই সপ্তাহে হিসাব মতো জ্যোতি আসবে শম্ভুগঞ্জে। সে রকমই কথা হয়ে আছে। জ্যোতি জরুরি কিছু কথা বলার বিষয়েও আগাম জানিয়ে রেখেছে  । কনকেরও বলার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জমে আছে। শুধু কথা নয়, দুজনের ভাগ্যও পাশের ব্রহ্মপুত্রের মতো বাঁক বদল করতে চলেছে। কনক পড়তে চলে যাবে পাহাড় ও সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্যোতি চান্স পেয়েছে উত্তরের মতিহার ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রকে সাক্ষী রেখে তাদের আসা-যাওয়া আর মেলামেশাও ইতি ঘটতে চলেছে। তাদের হৃদয়ে মিলনের আকুতি সুতীব্র হলেও দুজনের জীবনগতির সামনেই অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চিত টান। এই সপ্তাহে দুজনের দেখা হওয়া তাই খুবই জরুরি। এ কথা কনক যেমন জানে, জ্যোতিও জানে।

কনক যথারীতি উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিকে না দেখে সে চিন্তিত এবং কিছুটা বিস্মিত ও শঙ্কিত। জ্যোতি তো কথার হেরফের করার মেয়ে নয়। তাহলে কেন এই বিলম্ব? মাথায় এই আস্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে কনক চা দোকানের বেঞ্চিতে অপেক্ষায় থাকে।

কোন ফাঁকে অপেক্ষার মাঝ দিয়ে কয়েক কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, কনক টের পায় না। টের পেলো যখন প্রতীক্ষার টেনশনে ও কয়েক কাপ চায়ের দ্রব্য গুণে পেটে অম্বলের চাপ তৈরি হলো, তখন। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে তবু জ্যোতি আসে নি। আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কনক আলতো পায়ে মন খারাপ করে নদীর দিকে পা বাড়ায়। ওপার থেকে আসা নৌকাগুলোর দিকে চোখ রেখে রেখে সে তীরে পায়চারি করতে থাকে।

কনক দেখে কত রঙ-বেরঙের মানুষ নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের এপার-ওপার করছে। বিচিত্র তাদের বয়স, পেশা, ব্যক্তিত্ব। ছাত্র, ব্যবসায়ী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, কুলি, কামলা, হকার রোগি, নারী, পুরুষের অভাবনীয় এক জগৎ তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে। এখানেই একদিন জ্যোতির সঙ্গে কনকেরও দেখা হয়ে গিয়েছিল। এক অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে কনক নেমেছিল শম্ভুগঞ্জের ঘাটে। গুদারা নৌকায় চেপে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে অস্থির ও ব্যাকুল কনককে দেখছিল সহযাত্রীরা। কনক আগে ময়মনসিংহ শহরে আসে নি। সে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিচ্ছে জীবনে প্রথম বারের মতো। তা-ও একা এবং একজন সঙ্কটাপন্ন মানুষকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। পাশের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চেয়ে বিশেষ লাভ হয় নি তার।

অকস্ম্যাৎ উদ্বিগ্ন কনক অবাক হয় একটি তরুণীর কণ্ঠস্বরে, ‘চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেবো।’

‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমাকে পথঘাট বলে দিলেই আমি পারবো।’

`আমার কষ্ট হবে না। আমি ওদিকেই থাকি।’

মাঝ নদীতে কনক যে মেয়েটির কথায় আশার দ্বীপ খুঁজে পায়, তার নাম জ্যোতি। জ্যোতির কারণে নতুন শহরে আগন্তুকের মতো একেলা ও অসহায় কনক স্বচ্ছন্দ্যে সব কাজ করতে পারে। রোগি ভর্তি থেকে চিকিৎসার যাবতীয় কাজে না বললেও জ্যোতি পাশে থাকে। রুটিন করে দিনে দুইবার হাসপাতালে চলে আসে জ্যোতি। বারণ করলে   বলে, ‘ঐ যে আমাদের বাসা দেখা যায়। দুই মিনিটের পথ। বার বার এলেও আমার কোনও অসুবিধা হবে না।’

হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দিন জ্যোতি সারাক্ষণ পাশে থাকে। শহরের প্রান্তস্পর্শী ব্রহ্মপুত্রের ঘাট পর্যন্ত সঙ্গে আসে। নৌকায় বসে কনক দেখে পাড়ে তখনও দাঁড়িয়ে জ্যোতি। হঠাৎ নিজের ভেতরে অকস্ম্যাৎ পরিচিতি মেয়েটির জন্য অজানা-অচেনা কেমন একটা টান অনুভব করে কনক। মনে হয় ব্রহ্মপুত্রের  সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সে একটি স্বল্প পরিচিত তরুণী সঙ্গে যৌথ সাঁতারে। নৌকা ছাড়ার আগে কনক হঠাৎ চিৎকার করে বলে, ‘শুক্রবার আমি আবার আসবো তোমার কাছে।’ হাল্কা মাথা নাড়িয়ে সলাজ মুখ লুকায় তীরে দাঁড়ানো জ্যোতি।

সেই শুরু। তারপর দেখতে দেখতে দুই বছর হয়ে গেছে। বিশেষ কারণ ছাড়া কোনও সপ্তাহেই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাদ যায় নি। আজকে জ্যোতির দেখা না পেয়ে পুরনো কথাগুলো মনে হয় তার। জ্যোতির দেখা না-পেয়ে কনকের মনে হলো, উত্তরের গারো পাহাড় কাছে চলে এসে বেদনার প্রচণ্ড ভারে তাকে চেপে ধরেছে।

কনক ঠিক বুঝতে পারে না, কেন জ্যোতি আসে নি? এমন তো কখনও হয় নি। বিশেষ করে, এবারের দেখাটা অনেক জরুরি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তাদের মধ্যে হওয়া দরকার।

কনক দেখে দুপুরের সূর্য মাথার উপর গনগন করছে। ব্রহ্মপুত্রের জলজ বুকে রুদ্রদিনের দাবদাহে বাষ্পের আবছা ছায়া দৃষ্টিতে বিভ্রম ছড়াচ্ছে। সে নিজেও কম বিভ্রান্ত নয়। তার বুকেও চলছে আগুনের হল্কা। কনক স্থির করতে পারে না, তার কি চলে যাওয়া উচিত? নাকি ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে যাওয়া দরকার জ্যোতির কাছে?

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নৌকা ধরে শহরে চলে আসে কনক। বেশ খিদেও পেয়েছে তার। তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে সে চলে আসে সেহরা, আকুয়া পেরিয়ে জ্যোতির বাসার কাছাকাছি। জ্যোতির বাসা চিনলেও কোনও দিন সেখানে তার যাওয়া হয় নি। একবার শুধু বড় রাস্তা থেকে জ্যোতি দেখিয়েছিল তাদের হলুদ বাড়িটি। আন্দাজে খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক সময় কাটিয়ে বিকেলের মুখে কনক জ্যোতিদের বাড়ির ঠিক সামনে পৌঁছে যায়। পুরো আবাসিক এলাকায় সারিবদ্ধ বাড়িগুলো দেখতে পায় সে। কোন দোকান-পাট নেই যে দাঁড়িয়ে দেখবে বা কিছু খোঁজ-খবর করবে। জ্যোতির বাসার পাশে তার চোখে পড়ে গেটের ভেতরে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়ানো। লোকজনও চলাচল করছে। অন্য বাড়িগুলোর মতো নিশ্চুপ ঝিমুচ্ছে না জ্যোতিদের বাসা। বাসার আরেক পাশে একটি ল্যাম্পপোস্টের তলায় তিনটি ছেলে জটলা করছে। কনক ধীর পায়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সে স্পষ্ট শুনতে পায় তাদের কথোকথন, ‘খুব ভালো বিয়ে হয়েছে জ্যোতির। যদিও কাজটা হয়েছে ওর অসম্মতিতে জোর-জবরদস্তি করে।’

চট করে এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়ায় কনক। পেছন ফিরে ছেলেগুলোর মাথার উপর দিয়ে তীর্যক দেখতে পায় জ্যোতিদের বাড়িটি যেন নিমেষে কারাগার হয়ে গেছে। সামনের দিকে ফিরে পা বাড়ানোর আগে কনক শুনতে পায় ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজনের গলা, ‘জ্যোতিকে আর দেখতে পাবো না। কালই বরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে সে।’

যন্ত্রের মতো কখন যে কনক প্রাচীন ময়মনসিংহ শহরের অলি-গলি পেরিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে চলে আসে, বুঝতেও পারে না। বোধশক্তিহীন মানুষ এখন সে। অভ্যাসের বশে সে চিনতে পারে ঘাট, গুদারা, নৌকা, ব্রহ্মপুত্র, জ্যোতির মুখের স্মৃতি। চিনলেও সে যেন কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেকে তার মনে হয় খুবই একা ও অচেনা এবং পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষের মতো সঙ্গীহীন। নদীর তীর থেকে কেউ একজন তাকে ধরে নৌকায় বসিয়ে

দেয়। চরাচর জুড়ে প্রদোষের আবির রঙা বেদনায় কনক ব্রহ্মপুত্রে জলে তাকিয়ে চমকে উঠে। কনক দেখে, ব্রহ্মপুত্র নিজের চেহারা লুকিয়ে জলের কল্লোলে তার নিজের চেহারাই বিম্বিত করেছে। নদীর দিকে তাকিয়ে কনক বুঝতে পারে, তার আর জ্যোতির জীবন প্রবাহ যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

পুরনো নদীর বুকে জন্ম নেওয়া একেকটি বালুচর পেরিয়ে কনকের নৌকা শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ফিরে আসার সময় তার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এইসব বালুচরের ওপর শুয়ে স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর কথা ব্রহ্মপুত্র মনে রাখবে? তাদের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যাগুলো মনে রাখবে শম্ভুগঞ্জের ঘাট?

কোনও এক অনিন্দ্য ভোরে হঠাৎ শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসে একদিন কনক জেনে নেবে এইসব প্রশ্নের উত্তর।

পাদটীকা: ব্রহ্মপুত্র নদ প্রেমে পড়েছে। সে প্রেমে পড়েছে সুন্দরী নদী গঙ্গার। গঙ্গার রূপের গল্প শুনে সে অস্থির হয়ে পড়েছে। যে করেই হোক, গঙ্গাকে তার চাই। ব্রহ্মপুত্র সিদ্ধান্ত নিলো সে গঙ্গাকে বিয়ে করবে। যে-ই ভাবা সে-ই কাজ। গঙ্গাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হতে থাকলো সে। ওদিকে গঙ্গাও ব্রহ্মপুত্রকে পছন্দ করেছে। কিন্তু পছন্দ করলেই তো হবে না। ব্রহ্মপুত্র কি সত্যি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, সেটা যাচাই করে দেখাও দরকার। তাই গঙ্গা এক অভিনব বুদ্ধি বের করলো। সে তার রূপবতী অবয়বে বৃদ্ধার সাঁজ নিলো। বৃদ্ধা গঙ্গা অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা একার এগিয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্রের দিকে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র তার দীর্ঘ যাত্রা শেষে গঙ্গার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বৃদ্ধা গঙ্গাকে চিনতেই পারলো না। চিনবেই বা কেমন করে, গঙ্গা তো তখন ছদ্মবেশী বুড়িগঙ্গা। কৌত‚হলী ব্রহ্মপুত্র বুড়িগঙ্গাকে শুধালো, ‘মা, গঙ্গা কোথায়?’ বুড়িগঙ্গা এই প্রশ্নে ক্রোধান্বিত হয়ে গেলেন। গঙ্গাকে চিনতে না পারার মাশুল দিতে হলো ব্রহ্মপুত্রকে। গঙ্গা তাকে ফিরিয়ে দিলো। ব্রহ্মপুত্র তারপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেলো। নাম আড়াল করে গঙ্গাও মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে সাগরে হারিয়ে গেলো। একই সাগরে মিলেমিশেও কেউ আর কাউকেই চিনতে পারলো না।

'ভারত বিচিত্রা'র সৌজন্যে।

;

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;