কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিস্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প



ড. রূপ কুমার বর্মণ
কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

  • Font increase
  • Font Decrease

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মুক্তিসংগ্রাম আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বহুচর্চিত বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলণের বহুকৌণিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমান্তরাল ধারা হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান নেতৃবর্গকে “আইকন” বানানোর প্রয়াস। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ বিশ শতকের ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জাতীয় ইতিহাসে “ব্যক্তির ভূমিকা” শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমেরও আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর জন্যই আমরা রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) শুরু করে ‘বঙ্গবন্ধু’ পর্যন্ত আরোও অন্যান্য জাতীয় চরিত্রকে আমাদের দৈনন্দিন আলোচনার বৃত্তে নিয়ে আসি। আর এক্ষেত্রে যার কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় তিনি হলেন “অহিংস আন্দোলনের পূজারি” মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮)। বস্তুতঃ ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ (১৯১৭), ‘অসহযোগ আন্দোলন’ (১৯২০-১৯২২),  ‘আইন-অমান্য আন্দোলন’ (১৯৩০-৩২) ও ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের’ (১৯৪২-১৯৪৪) মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণ-আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব ও সকলকে একত্রিত করে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার পদ্ধতি তৎকালীন ভারতকে (১৯২০-১৯৪৮) এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর মতো সংগ্রামী নেতা-নেত্রীদের তুলনার ক্ষেত্রে গান্ধীই হয়ে উঠেছিলেন Point of Reference। ফলে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ তিন দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ হয়ে উঠেছিল ‘বহু গান্ধীর দেশ’। স্বাভাবিকভাবেই “সীমান্ত গান্ধী” (খাঁন আব্দুল গফফর খাঁন: ১৮৯০-১৯৮৮), মেদিনীপুরের “গান্ধী বুড়ি” (মাতঙ্গিনী হাজরা : ১৮৭০-১৯৪২), “উড়িষ্যা গান্ধী” (গোপবন্ধু দাস : ১৮৭৭-১৯২৮) বা “বিহারি গান্ধীর” (রাজেন্দ্র প্রাসাদ: ১৮৮৪-১৯৬৩) মতো আর অনেক স্থানীয় গান্ধীই স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। তবে অনেক গান্ধীই রয়ে গেছেন ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে। কেউবা আবার হারিয়ে গেছেন স্মৃতির অতল গহ্বরে। এরকমই একজন প্রায় বিস্মৃত গান্ধী ছিলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” বা নলিনীমোহন পাকরাশী (১৮৯৪-১৯৭৬)।

নলিনীমোহন পাকরাশীর (ভট্টাচার্য) জন্ম ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা (তিপ্রা/ত্রিপুরা) জেলায়। বহু পণ্ডিত ও সংগ্রামীর জন্মস্থান বাংলার অন্যতম সংস্কৃতিবান এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানা এলাকায় ছিল তাঁর পৈত্রিক বাড়ি। মিথিলা থেকে ‘ন্যায়রত্ন’ উপাধিপ্রাপ্ত তাঁর পিতা নবীনচন্দ্রের যখন মৃত্যু হয় (১৯০৪ সালে) তখন নলিনীমোহনের বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। স্বাধীনচেতা নলিনীমোহন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫) সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ও পারিবারিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নলিনীমোহনকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহে। জমিদার, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ময়মনসিংহে এসে নলিনীমোহন জড়িয়ে পড়লেন যুগান্তর দলের সঙ্গে। যুগান্তর দলের সুরেন্দ্র মোহন ঘোষের [১৮৯৩-১৯৭৬) সান্নিধ্যে এসে তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করেন। কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতির চাপে নলিনীমোহনকে চলে আসতে হয় রংপুরে। এখানে উচু বেতনে কাজ নেন এক ঠিকাদারি সংস্থায়। তাঁর তত্বাবধানে তৈরি হয় রংপুরের কারমাইকেল কলেজের [Carmichael College (1916)] বাড়ি।

স্বাধীন রাজনৈতিক চিন্তা ও বহু মানুষকে একত্রিতভাবে কাজ করানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে নলিনীমোহন ডুয়ার্স অঞ্চলে আসেন ১৯২১ সালে। ততদিন ডুয়ার্সের রাজাভাতখাওয়ায় গড়ে উঠেছে জঙ্গলের কাঠ বিক্রির Auction Centre। বাবু রামরূপ সিংহের অধীনে ১৫০ টাকার বেতনে চাকরি নিয়ে ১৯২৯ থেকে নলিনীমোহন পাকাপাকিভাবে আলিপুরদুয়ারে বসবাস শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ডুয়ার্স অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভূটান থেকে অধিকৃত ডুয়ার্সকে নিয়ে ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় জলপাইগুড়ি জেলা। জলপাইগুড়ি মহকুমার সঙ্গে আলিপুরদুয়ার মহকুমার বক্সা, ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম, শামুকতলা, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি ও অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন ধরনের ভুমি বন্দোবস্ত শুরু হয়। শুরু হয় কৃষিজমি, নদী, ঘাট ও হাট থেকে খাজনা আদায়ের নতুন প্রথা।

পাশাপাশি ইংল্যান্ডের “শিল্পায়নজনিত উদ্বৃত্ত মুলধনের” বিনিয়োগ করার জন্য আসাম ও ডুয়ার্স হয়ে ওঠে চা-বাগিচার বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। ডুয়ার্স রূপান্তরিত হয় “ঔপনিবেশিক শক্তির বাগানে” (Garden of the Empire)। আলিপুরদুয়ার মহকুমার ভুটান ঘেঁষা অঞ্চলে দেশীয় ও ইউরোপীয় উদ্যোগীদের প্রচেষ্টায় স্থাপিত বেশ কিছু চা-বাগান। কালচিনি, হ্যামিলটনগঞ্জ, মাদারিহাট, রাজাভাতখাওয়া, কার্তিক, রায়ডাক, তুরিতুরি ও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলি ভরে ওঠে আদিবাসী শ্রমিক ও বাঙালি ‘বাবুদের’ ভিড়ে।

চা-বাগান অর্থনীতি, কাঠ ও প্রশাসনিক কারনে জলপাইগুড়ি হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ জেলা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, চা-নিলাম কেন্দ্র, আদালত, নগরায়ন ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্ররূপে বিশ শতকের প্রথমার্ধে জলপাইগুড়ি শহর পরিণত হয় তার  প্রাণকেন্দ্রে। রাজনৈতিক চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল ধারক হয়ে ওঠে জলপাইগুড়ি শহরের পাশ্চত্য শিক্ষায় আলোকিত আইনজীবী ও তাদের সহযোগী শ্রেণি। খুব সংগত কারণেই ডুয়ার্সের চা-বাগানের শ্রমিক ও “উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্রে নিযুক্ত” স্থানীয় জাতি-জনজাতি সম্প্রদায়গুলি থেকে যায় জলপাইগুড়ির “অভিজাত- নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তের” বাইরে।

অন্যদিকে, জলপাইগুড়ি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত আলিপুরদুয়ার মহকুমা শহর ছিল অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। গুটিকয় হাইস্কুল গড়ে উঠলেও এই শহরে ছিল না কোন কলেজ। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলির অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। বিশ শতকের গোড়ায় মিশনারিদের চেষ্টায় বেশ কিছু প্রাইমারি ও মিডল ইংলিশ স্কুল গড়ে উঠলেও কুমারগ্রাম, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি, শামুকতলা, ফালাকাটা, মাদারহাটি ও বীরপাড়ার স্থানীয় মানুষেরা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তাঁদের পক্ষে এলিট-রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করা বা রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব।

বিশ শতকের গোড়ার দিকের আলিপুরদুয়ারের এরকম পরিস্থিতিতে ১৯২১ এ নলিনীমোহন আলিপুরদুয়ারে এসে দেখলেন যে এখানে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ(১৮৮৩), কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯)  বা রংপুরের কারমাইকেল কলেজের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই পূর্ববাংলার জমিদার শ্রেণির কৃষক শোষণ। এমনকি পূর্ববাংলার মতো রাজনীতি চেতনাও নেই। তবে এখানে আছে অন্য ধরনের শাসন ও শোষণ। শাসিতের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষের বড় অভাব। জলপাইগুড়ির এলিট নেতৃবর্গের ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো মানসিকতাই ছিলোনা। এরকম পরিস্থিতিতে নলিনীমোহন চুপ থাকতে পাড়েননি। মাসিক ১৫০ টাকা বেতনের কাজ ছেড়ে নলিনীমোহন ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনগণকে সংগঠিত করার কাজে। নিজেকে উৎসর্গ করলেন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব  দেওয়ার জন্য। তাঁর নেতৃত্বে শামুকতলার শুক্রবারের হাটে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন (১৯২৯) ও ফালাকাটায় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) তাঁকে ডুয়ার্সের রাজনৈতিক মহলে পরিচিত করে তোলে। কুমারগ্রামদুয়ার থেকে মাদারিহাট, ভলকা থেকে ফালাকাটা---ডুয়ার্সের সবত্রই নলিনীমোহন হয়ে ওঠেন “নলিনী ঠাকুর”। কুমারগ্রামদুয়ার, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা ও মাদারিহাটের অন্যান্য কৃষক সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবকে সংগঠিত করেন নলিনীমোহন।

ভারত শাসন আইন (The Government of India Act, 1935) গৃহিত হওয়ার পরে ১৯৩৭ এর বিধানসভার নির্বাচনে ডুয়ার্সের নির্বাচনী রাজনীতিতে ভাগ বসানোর জন্য এগিয়ে আসেন জলপাইগুড়ির এলিট-রাজনীতিকগন। প্রসন্নদেব রায়কত, খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৯৮-১৯৮৫) ও উপেন্দ্রনাথ বর্মন (১৮৯৮-১৯৮৮) জলপাইগুড়ি থেকে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেন। জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি বিধানসভা ক্ষেত্রের তপশিলিজাতির প্রতিনিধি উপেন্দ্রনাথ ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রীসভার (১৯৪১-৪৩) মন্ত্রী হয়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের কৃষকদের খাজনা কমানোর আর্জি জানিয়েছিলেন বিধানসভায়। কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হয়নি। ডুয়ার্স অঞ্চলের মাটি পূর্ববাংলা বা দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মতো এতোটা উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার জোত জমির কৃষকদের পক্ষে ভূমি রাজস্বের হার হয়ে উঠেছিল একটা বড় বোঝা। কৃষকদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল খাজনা না দেওয়ার প্রবণতা।  “No Rent” বা খাজনার বন্ধের আন্দোলন কুমারগ্রামদুয়ার এলাকায় প্রখর রূপ ধারন করেছিল নলিনীমোহনের নেতৃত্বে। কুমারগ্রামের জোতদার মঘা দেওয়ানী বা মদন সিং বরুয়ার মতো কংগ্রেসি কৃষকেরা খাজনা বন্ধের আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিলেন। খাজনা বন্ধের প্রভাব পড়েছিল কুমারগ্রামের কুলকুলি, দলদলি ও শামুকতলার হাটেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯৩৯-১৯৪৫) ভারতের রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে ১৯৪২ এর ৮ই আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের “ভারত ছাড়ো” (Quite India) আন্দোলনের ডাক দেয়। “করেঙ্গে-ইয়ে-মরেঙ্গে” ধ্বনিতে ভেসে ওঠে ভারতের আকাশ বাতাস। ৯ই আগস্ট গান্ধীজী সহ জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় নেতৃবর্গকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে স্থানীয় কংগ্রেসী নেতৃবর্গ তাঁদের নিজস্ব মত ও কর্মপন্থানুযায়ী ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায় মেতে উঠেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক (বিশেষত রেললাইন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা) সমূহের উৎপাটনে মেতে উঠে উন্মত্ত জনতা। ডুয়ার্সের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর প্রভাব অনুভূত হল। নলিনীমোহনের নেতৃত্বে কুমারগ্রাম থানা আক্রমন করে টেলিগ্রাম লাইন কেটে দিয়ে কাঠের তৈরি সেতুগুলির পাটাতন উপরে দিয়ে কুমারগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন এখানকার স্থানীয় জনগণ। ‘তারকাটা আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই গন-আন্দোলনের পর নলিনীমোহন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” নামে।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায় আমাদের সকলেই জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ভারতের রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের আলাপ-আলোচনার ফলস্বরূপ বিভিন্ন পরিকল্পনা গৃহিত হয়। ১৯৪৬ এর নির্বাচনের পর ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গঠিত হয় ভারতের সংবিধান সভা (The Constituent Assembly)। ১৯৪৭ এর আগষ্ট মাসে ব্রিটিশ-ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি জাতিরাষ্ট্র (Nation State)। পশ্চিম বাংলার অন্যান্য জেলার মতো জলপাইগুড়িও ভরে যায় পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের ভিড়ে। পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ, পাবনা ও রংপুর থেকে উৎখ্যাত মানুষের ভিড়ে দ্রুত পাল্টে যায় ডুয়ার্সের জনবৈচিত্র। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডুয়ার্সের জনগণ নলিনীমোহনকে ভুলতে শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় (১৯৭২-১৯৭৭) কোচবিহারে এসে নলিনীমোহনকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেও বা তাঁকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীর’ পদক দিয়ে ভারত সরকার সম্মানিত করলেও পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের শাসনকালে (১৯৭৭-২০১১) নলিনীমোহনের মতো ‘ডুয়ার্স গান্ধী’ চলে যান বিস্মৃতির অন্তরালে।

লক্ষ্য করার বিষয় হল জাতিয়তাবাদী দৃষ্টিতে লেখা পাঠ্যপুস্তকে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিবাচক সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সরাসরি শোষিত ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল, কৃষক, আদিবাসী, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষেরা গুরুত্ত্ব পান নি। মার্ক্সবাদী ও নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিকেরা কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনকে ইতিহাসের আলোচনায় স্থান দিলেও তাঁরা ডুয়ার্স অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার আন্দোলন বা নলিনীমোহনের মতো নিস্বার্থ দেশসেবকের অবদানকে স্বীকৃতি দেননি। তবে ঔপনিবেশিক শাসন-সৃষ্ট আধুনিক শিক্ষা, মুদ্রনযন্ত্র, সংবাদ পত্র ও সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবহীন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতাকে অনুভব করতে হলে ‘কুমিল্লা থেকে আসা নলিনীমোহনের ডুয়ার্স গান্ধী হয়ে ওঠাকে’ স্মরণ করতে হবে ।

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;