কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিস্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প



ড. রূপ কুমার বর্মণ
কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

কুমিল্লা থেকে ডুয়ার্স: বিশ্মৃতপ্রায় ডুয়ার্স গান্ধীর গল্প

  • Font increase
  • Font Decrease

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মুক্তিসংগ্রাম আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বহুচর্চিত বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলণের বহুকৌণিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সমান্তরাল ধারা হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান নেতৃবর্গকে “আইকন” বানানোর প্রয়াস। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ বিশ শতকের ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জাতীয় ইতিহাসে “ব্যক্তির ভূমিকা” শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমেরও আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর জন্যই আমরা রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) শুরু করে ‘বঙ্গবন্ধু’ পর্যন্ত আরোও অন্যান্য জাতীয় চরিত্রকে আমাদের দৈনন্দিন আলোচনার বৃত্তে নিয়ে আসি। আর এক্ষেত্রে যার কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় তিনি হলেন “অহিংস আন্দোলনের পূজারি” মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮)। বস্তুতঃ ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ (১৯১৭), ‘অসহযোগ আন্দোলন’ (১৯২০-১৯২২),  ‘আইন-অমান্য আন্দোলন’ (১৯৩০-৩২) ও ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের’ (১৯৪২-১৯৪৪) মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণ-আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব ও সকলকে একত্রিত করে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার পদ্ধতি তৎকালীন ভারতকে (১৯২০-১৯৪৮) এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর মতো সংগ্রামী নেতা-নেত্রীদের তুলনার ক্ষেত্রে গান্ধীই হয়ে উঠেছিলেন Point of Reference। ফলে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ তিন দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ হয়ে উঠেছিল ‘বহু গান্ধীর দেশ’। স্বাভাবিকভাবেই “সীমান্ত গান্ধী” (খাঁন আব্দুল গফফর খাঁন: ১৮৯০-১৯৮৮), মেদিনীপুরের “গান্ধী বুড়ি” (মাতঙ্গিনী হাজরা : ১৮৭০-১৯৪২), “উড়িষ্যা গান্ধী” (গোপবন্ধু দাস : ১৮৭৭-১৯২৮) বা “বিহারি গান্ধীর” (রাজেন্দ্র প্রাসাদ: ১৮৮৪-১৯৬৩) মতো আর অনেক স্থানীয় গান্ধীই স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। তবে অনেক গান্ধীই রয়ে গেছেন ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে। কেউবা আবার হারিয়ে গেছেন স্মৃতির অতল গহ্বরে। এরকমই একজন প্রায় বিস্মৃত গান্ধী ছিলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” বা নলিনীমোহন পাকরাশী (১৮৯৪-১৯৭৬)।

নলিনীমোহন পাকরাশীর (ভট্টাচার্য) জন্ম ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা (তিপ্রা/ত্রিপুরা) জেলায়। বহু পণ্ডিত ও সংগ্রামীর জন্মস্থান বাংলার অন্যতম সংস্কৃতিবান এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানা এলাকায় ছিল তাঁর পৈত্রিক বাড়ি। মিথিলা থেকে ‘ন্যায়রত্ন’ উপাধিপ্রাপ্ত তাঁর পিতা নবীনচন্দ্রের যখন মৃত্যু হয় (১৯০৪ সালে) তখন নলিনীমোহনের বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। স্বাধীনচেতা নলিনীমোহন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫) সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ও পারিবারিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নলিনীমোহনকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহে। জমিদার, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান ময়মনসিংহে এসে নলিনীমোহন জড়িয়ে পড়লেন যুগান্তর দলের সঙ্গে। যুগান্তর দলের সুরেন্দ্র মোহন ঘোষের [১৮৯৩-১৯৭৬) সান্নিধ্যে এসে তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করেন। কিন্তু পারিবারিক পরিস্থিতির চাপে নলিনীমোহনকে চলে আসতে হয় রংপুরে। এখানে উচু বেতনে কাজ নেন এক ঠিকাদারি সংস্থায়। তাঁর তত্বাবধানে তৈরি হয় রংপুরের কারমাইকেল কলেজের [Carmichael College (1916)] বাড়ি।

স্বাধীন রাজনৈতিক চিন্তা ও বহু মানুষকে একত্রিতভাবে কাজ করানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে নলিনীমোহন ডুয়ার্স অঞ্চলে আসেন ১৯২১ সালে। ততদিন ডুয়ার্সের রাজাভাতখাওয়ায় গড়ে উঠেছে জঙ্গলের কাঠ বিক্রির Auction Centre। বাবু রামরূপ সিংহের অধীনে ১৫০ টাকার বেতনে চাকরি নিয়ে ১৯২৯ থেকে নলিনীমোহন পাকাপাকিভাবে আলিপুরদুয়ারে বসবাস শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ডুয়ার্স অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভূটান থেকে অধিকৃত ডুয়ার্সকে নিয়ে ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় জলপাইগুড়ি জেলা। জলপাইগুড়ি মহকুমার সঙ্গে আলিপুরদুয়ার মহকুমার বক্সা, ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম, শামুকতলা, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি ও অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন ধরনের ভুমি বন্দোবস্ত শুরু হয়। শুরু হয় কৃষিজমি, নদী, ঘাট ও হাট থেকে খাজনা আদায়ের নতুন প্রথা।

পাশাপাশি ইংল্যান্ডের “শিল্পায়নজনিত উদ্বৃত্ত মুলধনের” বিনিয়োগ করার জন্য আসাম ও ডুয়ার্স হয়ে ওঠে চা-বাগিচার বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। ডুয়ার্স রূপান্তরিত হয় “ঔপনিবেশিক শক্তির বাগানে” (Garden of the Empire)। আলিপুরদুয়ার মহকুমার ভুটান ঘেঁষা অঞ্চলে দেশীয় ও ইউরোপীয় উদ্যোগীদের প্রচেষ্টায় স্থাপিত বেশ কিছু চা-বাগান। কালচিনি, হ্যামিলটনগঞ্জ, মাদারিহাট, রাজাভাতখাওয়া, কার্তিক, রায়ডাক, তুরিতুরি ও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলি ভরে ওঠে আদিবাসী শ্রমিক ও বাঙালি ‘বাবুদের’ ভিড়ে।

চা-বাগান অর্থনীতি, কাঠ ও প্রশাসনিক কারনে জলপাইগুড়ি হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ জেলা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, চা-নিলাম কেন্দ্র, আদালত, নগরায়ন ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্ররূপে বিশ শতকের প্রথমার্ধে জলপাইগুড়ি শহর পরিণত হয় তার  প্রাণকেন্দ্রে। রাজনৈতিক চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল ধারক হয়ে ওঠে জলপাইগুড়ি শহরের পাশ্চত্য শিক্ষায় আলোকিত আইনজীবী ও তাদের সহযোগী শ্রেণি। খুব সংগত কারণেই ডুয়ার্সের চা-বাগানের শ্রমিক ও “উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্রে নিযুক্ত” স্থানীয় জাতি-জনজাতি সম্প্রদায়গুলি থেকে যায় জলপাইগুড়ির “অভিজাত- নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তের” বাইরে।

অন্যদিকে, জলপাইগুড়ি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত আলিপুরদুয়ার মহকুমা শহর ছিল অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। গুটিকয় হাইস্কুল গড়ে উঠলেও এই শহরে ছিল না কোন কলেজ। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলির অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। বিশ শতকের গোড়ায় মিশনারিদের চেষ্টায় বেশ কিছু প্রাইমারি ও মিডল ইংলিশ স্কুল গড়ে উঠলেও কুমারগ্রাম, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি, শামুকতলা, ফালাকাটা, মাদারহাটি ও বীরপাড়ার স্থানীয় মানুষেরা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তাঁদের পক্ষে এলিট-রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করা বা রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব।

বিশ শতকের গোড়ার দিকের আলিপুরদুয়ারের এরকম পরিস্থিতিতে ১৯২১ এ নলিনীমোহন আলিপুরদুয়ারে এসে দেখলেন যে এখানে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ(১৮৮৩), কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯)  বা রংপুরের কারমাইকেল কলেজের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই পূর্ববাংলার জমিদার শ্রেণির কৃষক শোষণ। এমনকি পূর্ববাংলার মতো রাজনীতি চেতনাও নেই। তবে এখানে আছে অন্য ধরনের শাসন ও শোষণ। শাসিতের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষের বড় অভাব। জলপাইগুড়ির এলিট নেতৃবর্গের ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো মানসিকতাই ছিলোনা। এরকম পরিস্থিতিতে নলিনীমোহন চুপ থাকতে পাড়েননি। মাসিক ১৫০ টাকা বেতনের কাজ ছেড়ে নলিনীমোহন ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনগণকে সংগঠিত করার কাজে। নিজেকে উৎসর্গ করলেন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব  দেওয়ার জন্য। তাঁর নেতৃত্বে শামুকতলার শুক্রবারের হাটে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন (১৯২৯) ও ফালাকাটায় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) তাঁকে ডুয়ার্সের রাজনৈতিক মহলে পরিচিত করে তোলে। কুমারগ্রামদুয়ার থেকে মাদারিহাট, ভলকা থেকে ফালাকাটা---ডুয়ার্সের সবত্রই নলিনীমোহন হয়ে ওঠেন “নলিনী ঠাকুর”। কুমারগ্রামদুয়ার, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা ও মাদারিহাটের অন্যান্য কৃষক সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবকে সংগঠিত করেন নলিনীমোহন।

ভারত শাসন আইন (The Government of India Act, 1935) গৃহিত হওয়ার পরে ১৯৩৭ এর বিধানসভার নির্বাচনে ডুয়ার্সের নির্বাচনী রাজনীতিতে ভাগ বসানোর জন্য এগিয়ে আসেন জলপাইগুড়ির এলিট-রাজনীতিকগন। প্রসন্নদেব রায়কত, খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৯৮-১৯৮৫) ও উপেন্দ্রনাথ বর্মন (১৮৯৮-১৯৮৮) জলপাইগুড়ি থেকে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেন। জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি বিধানসভা ক্ষেত্রের তপশিলিজাতির প্রতিনিধি উপেন্দ্রনাথ ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রীসভার (১৯৪১-৪৩) মন্ত্রী হয়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের কৃষকদের খাজনা কমানোর আর্জি জানিয়েছিলেন বিধানসভায়। কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হয়নি। ডুয়ার্স অঞ্চলের মাটি পূর্ববাংলা বা দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মতো এতোটা উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার জোত জমির কৃষকদের পক্ষে ভূমি রাজস্বের হার হয়ে উঠেছিল একটা বড় বোঝা। কৃষকদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল খাজনা না দেওয়ার প্রবণতা।  “No Rent” বা খাজনার বন্ধের আন্দোলন কুমারগ্রামদুয়ার এলাকায় প্রখর রূপ ধারন করেছিল নলিনীমোহনের নেতৃত্বে। কুমারগ্রামের জোতদার মঘা দেওয়ানী বা মদন সিং বরুয়ার মতো কংগ্রেসি কৃষকেরা খাজনা বন্ধের আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিলেন। খাজনা বন্ধের প্রভাব পড়েছিল কুমারগ্রামের কুলকুলি, দলদলি ও শামুকতলার হাটেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯৩৯-১৯৪৫) ভারতের রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে ১৯৪২ এর ৮ই আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের “ভারত ছাড়ো” (Quite India) আন্দোলনের ডাক দেয়। “করেঙ্গে-ইয়ে-মরেঙ্গে” ধ্বনিতে ভেসে ওঠে ভারতের আকাশ বাতাস। ৯ই আগস্ট গান্ধীজী সহ জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় নেতৃবর্গকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে স্থানীয় কংগ্রেসী নেতৃবর্গ তাঁদের নিজস্ব মত ও কর্মপন্থানুযায়ী ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায় মেতে উঠেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক (বিশেষত রেললাইন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা) সমূহের উৎপাটনে মেতে উঠে উন্মত্ত জনতা। ডুয়ার্সের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর প্রভাব অনুভূত হল। নলিনীমোহনের নেতৃত্বে কুমারগ্রাম থানা আক্রমন করে টেলিগ্রাম লাইন কেটে দিয়ে কাঠের তৈরি সেতুগুলির পাটাতন উপরে দিয়ে কুমারগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন এখানকার স্থানীয় জনগণ। ‘তারকাটা আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই গন-আন্দোলনের পর নলিনীমোহন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” নামে।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায় আমাদের সকলেই জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ভারতের রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের আলাপ-আলোচনার ফলস্বরূপ বিভিন্ন পরিকল্পনা গৃহিত হয়। ১৯৪৬ এর নির্বাচনের পর ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গঠিত হয় ভারতের সংবিধান সভা (The Constituent Assembly)। ১৯৪৭ এর আগষ্ট মাসে ব্রিটিশ-ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি জাতিরাষ্ট্র (Nation State)। পশ্চিম বাংলার অন্যান্য জেলার মতো জলপাইগুড়িও ভরে যায় পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের ভিড়ে। পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ, পাবনা ও রংপুর থেকে উৎখ্যাত মানুষের ভিড়ে দ্রুত পাল্টে যায় ডুয়ার্সের জনবৈচিত্র। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডুয়ার্সের জনগণ নলিনীমোহনকে ভুলতে শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় (১৯৭২-১৯৭৭) কোচবিহারে এসে নলিনীমোহনকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেও বা তাঁকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীর’ পদক দিয়ে ভারত সরকার সম্মানিত করলেও পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের শাসনকালে (১৯৭৭-২০১১) নলিনীমোহনের মতো ‘ডুয়ার্স গান্ধী’ চলে যান বিস্মৃতির অন্তরালে।

লক্ষ্য করার বিষয় হল জাতিয়তাবাদী দৃষ্টিতে লেখা পাঠ্যপুস্তকে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিবাচক সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সরাসরি শোষিত ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল, কৃষক, আদিবাসী, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষেরা গুরুত্ত্ব পান নি। মার্ক্সবাদী ও নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিকেরা কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনকে ইতিহাসের আলোচনায় স্থান দিলেও তাঁরা ডুয়ার্স অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতার আন্দোলন বা নলিনীমোহনের মতো নিস্বার্থ দেশসেবকের অবদানকে স্বীকৃতি দেননি। তবে ঔপনিবেশিক শাসন-সৃষ্ট আধুনিক শিক্ষা, মুদ্রনযন্ত্র, সংবাদ পত্র ও সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবহীন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতাকে অনুভব করতে হলে ‘কুমিল্লা থেকে আসা নলিনীমোহনের ডুয়ার্স গান্ধী হয়ে ওঠাকে’ স্মরণ করতে হবে ।

ড. রূপ কুমার বর্মণ, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;