স্বাধীনতার ৫০ বছর: কতদূর এগুলো বাংলাদেশের সাহিত্য?



অসীম নন্দন, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

অলংকরণ ও সম্পাদনা: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

একটা দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী মানে বিরাট ব্যাপার। আর আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের স্বাদ পাচ্ছি। স্বাধীন দেশ মানে অন্য অনেক অধিকার অর্জনের সাথে সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও লাভ করা। আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পেলেই কেবল একটা দেশের শিল্প-সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে পারে। যত বেশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাওয়া যায় তত বেশি সমৃদ্ধ হয় দেশের সাহিত্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের সাহিত্য গত ৫০ বছরে কতটুকু সমৃদ্ধ হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব আসলে এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। কেন বাংলাসাহিত্যের কথা না বলে আমি বাংলাদেশের সাহিত্যের কথা বলছি? প্রথমেই এই বিষয়টা পরিষ্কার করে নিতে চাই। কারণ ঐতিহাসিক দিক থেকে অঞ্চলগতভাবে বাংলাসাহিত্যে একটা স্পষ্ট বিভাজন আছে। ৪৭-এর সেই দেশবিভাগের কূটকৌশলে এই বিভাজন সৃষ্টি হলো।

আর আমরা এক শাসকের থেকে মুক্তি পেয়ে আরেক শাসকের হাতে শৃঙ্খলিত হলাম। তবে আমরাই সেই জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি। এটা আমাদের অহংকার। আর এই বাংলা ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা চাওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন একটা ভূখন্ডের স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলাম। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের স্বপ্নদ্রষ্টা। এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা পেলাম এই বাংলাদেশ।

এখন আমরা বাংলাদেশের সাহিত্যের দিকে তাকালে এর বিচিত্র সম্ভাবনাকে খুঁজে পাবো। যদিও দশকের চিন্তা থেকে কোনো সাহিত্যকে কিংবা সাহিত্যিককে বিশ্লেষণ করা বিশেষ কার্যকরী বিষয় নয়। তবে আলোচনার সুবিধার্থে আমরা এই দশকের চিন্তা ধরেই এগোবো। এবং সবশেষে আমরা একটা সামগ্রিক চিত্র পাবো।

যেহেতু সত্তরের দশকেই বাংলাদেশের জন্ম তাই তার পরবর্তী দশকগুলোকেই আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্য বলা উচিত। কিন্তু এখানেই দশকের হিসাবে গন্ডগোলটা বাঁধে। কেননা সত্তরের দশকে বাংলাদেশের জন্ম হলেও পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের শক্তিমান কবি-সাহিত্যিকদের অমর সৃষ্টিগুলোকে আমরা বাংলাদেশের সাহিত্য থেকে বাদ দিতে পারি না।

তাঁদের সাহিত্যের অন্তর্দৃষ্টিতে সমাজের ঐসময়টাকে আমরা প্রকটভাবে দেখতে পাই। তাঁদের বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভা এই দেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল উত্তাল। বারবার ক্ষমতার পটপরিবর্তন, মানুষের স্বপ্নের অতৃপ্তি আর অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সমীকরণগুলো বাংলাদেশকে সেসময়ে একরকম দুঃস্বপ্নের দেশে পরিণত করেছিল। আর সেই উত্তাল সময়কে আমরা আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যের মাঝেও দেখতে পাই।

একরকম নির্মোহ বয়ানে সেই সময়টা লেখকদের লেখায় চিত্রিত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-নির্ভর কোনো কাজ তখন প্রকাশিত হয়নি। মানে কোনো সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার বয়ানে কোনো কথাসাহিত্য সেই দশকে কেন হয়নি তা প্রশ্নবিদ্ধ। পরবর্তী সময়ে যদিও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ।

এই সময়কার কবিতায় সবচেয়ে যে বৈশিষ্ট্যটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তাহলো কবিতার শ্লোগানধর্মীতা। এই সময়ের কবিতাগুলোই একেকটি শ্লোগান হয়ে উঠেছিল। কিংবা বলা যায় শ্লোগানই হয়ে উঠেছিল কবিতা।

তবে ৮০'র দশকে বাংলাদেশের কবিতায় একটা নতুন ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই দশক থেকেই লিটল ম্যাগাজিনের উত্থান ঘটে। গাণ্ডিব, অনিন্দ্য, পেঁচা, দামোদর, পূর্ণদৈর্ঘ্য, ফু, প্রসূন এবং আরো অনেক লিটল ম্যাগাজিনের উত্থান ঘটে এই সময়ে। যার ফলে বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এসময়ে সাহিত্যে নানানরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। এছাড়া লিটল ম্যাগাজিনের কল্যাণে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা'র তাত্ত্বিক আবহাওয়া এসময় খুব জনপ্রিয়তা পায়।

যদিও বর্তমানে লিটল ম্যাগাজিনের সেই প্রতাপ এখন ম্লান হয়ে গেছে। তবে এখনও কালি ও কলম, চিরকুট,মেঘফুল, দেশলাই, বিন্দু, ড্যাস এবং আরো অনেক লিটলম্যাগ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। ৮০'র দশককে লিটল ম্যাগাজিনের দশক বলা হলেও এর প্রকৃত সূত্রপাত হয়েছিল ৬০'র দশকে। সেই সময়কার উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগগুলো হচ্ছে স্যাড জেনারেশন, সপ্তক, স্বাক্ষর, না, বহুবচন প্রভৃতি।

৯০'র দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের আরো একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এবং এই দশকের পরবর্তী সময়ে মানে একবিংশ শতকের শূন্য দশক এবং তারপরের দুই দশকে এদেশের সাহিত্যে নানানরকম সংযোজন শুরু হয়।

শ্লোগানধর্মীতা থেকে কবিতা ধীরে ধীরে উত্তরাধুনিককালে উন্নিত হয়। এবং কবিতার বৈশিষ্ট্য অনেক বেশি বিমানবিকতার দিকে ধাবিত হয়েছে। কবিতার মাঝে গল্পধর্মী পরাবাস্তববাদী এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাওয়া যায় বর্তমান সময়ে। এছাড়া কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও নানানরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান আছে। কথাসাহিত্যে সুররিয়ালিটির ব্যবহার দেখা পাওয়া যায় এসময়ে।

এছাড়া ইতিহাস-নির্ভর কথাসাহিত্যও প্রবলভাবে বিকশিত হয়েছে এই সময়ে। ইতিহাস-নির্ভর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে নিষিদ্ধ লোবান, মা, দেয়াল, রাইফেল রোটি আওরাত, জীবন আমার বোন, হাঙর নদী গ্রেনেড, আমার বন্ধু রাশেদ, জোছনা ও জননীর গল্প, ক্রাচের কর্নেল ইত্যাদি।

গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রভাব-বিস্তারকারী কাজ সেই তূলনায় অপ্রতুলই রয়ে গেছে। যে কারণে মৌলবাদীতার নীল দংশন থেকে আমাদের স্বপ্নের দেশ এখন বাস্তবের রূপ দেখতে পায়নি। আমাদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন যতটা হবার কথা ছিল, সেই তুলনায় হয়েছে সামান্যই। সমাজতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক যে সমাজের স্বপ্নের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল, তা রয়ে গেছে অধরাই।

সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে আমরা প্রকৃত মুক্তমনা সাহিত্যিকদের দেখা পেলেও একবিংশ শতকের শূণ্য, এক এবং দুইয়ের দশকে তেমন সাহিত্যিকদের কাজ পেয়েছি খুব কম। একটা দেশের মননকে সমুন্নত করতে মুক্তমনা সাহিত্যের যে পরিমাণ সহযোগিতা দরকার ছিল, তা আমরা সেই চাহিদা মতো পাইনি। বাংলাদেশের সাহিত্যে মননশীল পাঠক তৈরির জন্য যে অনমনীয় দৃষ্টান্ত থাকা উচিত ছিল, এই সময়ের চাটুকার সাহিত্যের জয়জয়কারে তা বিঘ্নিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জনগণ জ্ঞান অর্জন করে মননশীল ও সৎ-মানুষ হবার চেষ্টার দিকে না গিয়ে, একপ্রকার ছা-পোষা কেরানি হবার স্বপ্নের দিকে ধাবিত হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায়ভার অবশ্যই বাংলাদেশের সাহিত্যিকগোষ্ঠী এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে নিতে হবে। কেননা তাঁরা সেই রকম প্রভাববিস্তারকারী কাজ করতে পারেনি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা যেসব গুণী কবি-সাহিত্যিকদের বাংলাদেশের সাহিত্যে পেয়েছি তাঁরা হলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হুমায়ুন আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, আবিদ আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, হুমায়ুন আহমেদ, শহীদুল জহির, প্রমুখ।

এছাড়া আরো অনেকেই আছেন যাদের নাম নিতে গেলে আসলে নামের তালিকাটা দীর্ঘ থেকে আরো দীঘর্তর হবে। আগেই বলেছিলাম সাহিত্য কিংবা সাহিত্যিক কাউকেই দশকের হিসেবে বিশ্লেষণ করাটা কঠিন এবং কখনো কখনো অচল ব্যবস্থাও বলা যায়।

এখন কথা হচ্ছে আমাদের দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আসলে কতটা কার্যকরী হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবটা সন্ধান করা খুবই জরুরি। কারণ সমৃদ্ধ সাহিত্যের জন্যই এই স্বাধীনতা থাকাটা খুব জরুরি। এবং সাহিত্য যত সমৃদ্ধ হবে তত বেশি মানুষের মাঝে তা প্রভাববিস্তার করবে।

৫২'র ভাষা আন্দোলনে তো আমরা স্বাধীনভাবে নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার অধিকারের জন্যই প্রাণ দিয়েছিলাম। এই ইতিহাস যেমন আমাদের জন্য গৌরবের, সেরকমই আমাদের দেশে এই মতপ্রকাশের অধিকার যে এখনও প্রশ্নবিদ্ধ; এই প্রশ্নবিদ্ধতাও আমাদের জন্য পীড়াদায়ক।

এই বিশ্লেষণ থেকেই কি আমরা বলতে পারবো বাংলাদেশের সাহিত্য গত পঞ্চাশ বছরে সমৃদ্ধি'র চরম শিখরে পৌঁছে গেছে? না, একেবারে এত মোটা দাগে বলা মুশকিল। যেহেতু এখনও আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যের আন্তর্জাতিক কদর সেরকম অর্থে আমরা বৃদ্ধি করতে পারিনি। এবং অনুবাদ সাহিত্যে আমরা কাঙ্খিত সফলতা পাইনি।

সাহিত্যের আন্তর্জাতিক কদর বৃদ্ধি করতে চাইলে আমাদেরকে অনুবাদ-সাহিত্যে মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের সকল উল্লেখযোগ্য বইকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন ভালো অনুবাদের ব্যবস্থা করা। আর এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সাহিত্যের বিচিত্র সম্ভার বিশ্বের মানুষের দরবারে পৌঁছে যাবে ও সমৃদ্ধি পাবে।

সকলরকম প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তির হিসাবনিকাশ শেষ হলে আমরা একটা কথা খুব দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে কেবল বাংলাদেশের সাহিত্যই টিকিয়ে রাখতে পারবে। যদিও অনেকে মনে করেন ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোর প্রভাব বাংলা ভাষাকে দূষণ করছে, তবে এই দূষণকে আমরা শাপে-বর বলতে পারি। কেননা ভাষা তো চিরকাল প্রবহমান। পরিবর্তনই তার ধর্ম।

আর পরিবর্তনের জন্য অন্য ভাষা থেকে গ্রহণটাও বাংলা ভাষার জন্য পুষ্টিকর। তবে অধিক আহার গ্রহণ করা যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর হতে পারে, সেরকমভাবে অন্য ভাষার অধিক প্রভাবও ভাষার জন্য অস্বাস্থ্যকর হতে পারে।

তাই বাংলাদেশের সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আর আমরা প্রচন্ডরকম আশাবাদী; এই সকল প্রশ্ন এবং জবাবের মধ্য দিয়ে, বাংলা ভাষার দীর্ঘদিন টিকে থাকার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলবে।

 

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;

মনোহারী মধুকর



শরীফুল আলম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তাঁকে আজও দেখিনি
অথচ আমি তাঁর প্রেমে পড়ে আছি
বোঝা গেল প্রেমে পড়ার জন্য
দেখাটা খুব জরুরি নয়
তবে অনিবার্য কিনা তা বলতে পারবনা
তবুও ক্রমশ নীল ডানা মেলে
বেগচ্যুত বাতাস মায়াবী রোদের পানে যায়
অতল পিয়াসি এই মন সমর্পণ করে নূহের প্লাবন
বিরামচিহ্নহীন ভাবে আমি তাঁর পানে চেয়ে থাকি
হৃদপিণ্ডে ক্রমশই বাড়ে হৈচৈ ,
আমি তাঁর জ্যোৎস্না লুটে নেই
হিমু সেজে আড়ালে দাঁড়াই
ঠিক তাঁর লাবণ্য রেখা বরাবর।

জানি তুমি দিগন্তের চাইতেও বহু দূরে
কখনো তাঁতের শাড়ি, গায়ে আলতা, হাতে রেশমি চুড়ি ,
প্রিয়ন্তি, ওটি আমার দেয়া নাম
তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল
তবুও মাঝেমধ্যে আমরা তর্কে জড়াতাম ,
তিনি ছিলেন সেক্যুলার
আর আমি?
সময়ের ক্রীতদাস
আজও রোদের হলুদ মেখে বসে থাকেন তিনি
সমান্তরাল শব্দ শুনবে বলে
আমি তাঁর নীল মুখ দেখে পরাজয় মেনে নেই
তাঁর বাদামি শরীরে তখনও জ্যোৎস্নার প্লাবন
অশান্ত বারিধারা মনোহারী মধুকর
অথচ অজস্র দ্বিধা আমারও আছে
আমরাও আছে আদর্শের খসড়া, বসন্তের নির্দয়,
আমি তাঁর লুকোনো হারেম আজও দেখিনি
তবুও অজানা মেলোডি বুকে নিয়ে
নির্বিকার স্বপ্ন দেখি
লোভীর মতই তাঁকে ভালবাসতে চাই।

;