ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;

মনোহারী মধুকর



শরীফুল আলম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তাঁকে আজও দেখিনি
অথচ আমি তাঁর প্রেমে পড়ে আছি
বোঝা গেল প্রেমে পড়ার জন্য
দেখাটা খুব জরুরি নয়
তবে অনিবার্য কিনা তা বলতে পারবনা
তবুও ক্রমশ নীল ডানা মেলে
বেগচ্যুত বাতাস মায়াবী রোদের পানে যায়
অতল পিয়াসি এই মন সমর্পণ করে নূহের প্লাবন
বিরামচিহ্নহীন ভাবে আমি তাঁর পানে চেয়ে থাকি
হৃদপিণ্ডে ক্রমশই বাড়ে হৈচৈ ,
আমি তাঁর জ্যোৎস্না লুটে নেই
হিমু সেজে আড়ালে দাঁড়াই
ঠিক তাঁর লাবণ্য রেখা বরাবর।

জানি তুমি দিগন্তের চাইতেও বহু দূরে
কখনো তাঁতের শাড়ি, গায়ে আলতা, হাতে রেশমি চুড়ি ,
প্রিয়ন্তি, ওটি আমার দেয়া নাম
তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল
তবুও মাঝেমধ্যে আমরা তর্কে জড়াতাম ,
তিনি ছিলেন সেক্যুলার
আর আমি?
সময়ের ক্রীতদাস
আজও রোদের হলুদ মেখে বসে থাকেন তিনি
সমান্তরাল শব্দ শুনবে বলে
আমি তাঁর নীল মুখ দেখে পরাজয় মেনে নেই
তাঁর বাদামি শরীরে তখনও জ্যোৎস্নার প্লাবন
অশান্ত বারিধারা মনোহারী মধুকর
অথচ অজস্র দ্বিধা আমারও আছে
আমরাও আছে আদর্শের খসড়া, বসন্তের নির্দয়,
আমি তাঁর লুকোনো হারেম আজও দেখিনি
তবুও অজানা মেলোডি বুকে নিয়ে
নির্বিকার স্বপ্ন দেখি
লোভীর মতই তাঁকে ভালবাসতে চাই।

;

'পরিবর্ত অনুসন্ধান': ইতিহাসচর্চার এক বিকল্প প্রয়াস



পায়েল দেশমুখ
লেখক- রূপ কুমার বর্মণ ও তার গ্রন্থের প্রচ্ছদ।

লেখক- রূপ কুমার বর্মণ ও তার গ্রন্থের প্রচ্ছদ।

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীর প্রতিটি ব্যক্তিই তার সমকালীন সমাজ, আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। ঠিক একইভাবে প্রান্তিক গ্রামগুলিও তাদের পার্শ্ববর্তী জেলা, রাজ্য, দেশ, রাজধানী, প্রতিবেশি রাষ্ট্র বা বিশ্বের মূল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চালিকা শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সমকালীন বিশ্ব-ইতিহাসের এইরকম একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গ্রাম ও মহানগরের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিককালে যেসমস্ত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাদের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হল ড. রূপ কুমার বর্মণের লেখা ‘পরিবর্ত অনুসন্ধান: রাষ্ট্র, নাগরিকত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও ইতিহাসচর্চা’ গ্রন্থটি [রূপ কুমার বর্মণ: পরিবর্ত অনুসন্ধান: রাষ্ট্র নাগরিকত্ব বাস্তুচ্যুতি ও ইতিহাসচর্চা, কলকাতা: গাঙচিল, ২০২২,পৃষ্ঠা: ১৭০, মূল্য: ৪৫০/ ভারতীয় টাকা]। একজন ব্যক্তির নিজের জীবনের যাত্রাপথের সঙ্গে তার সমকালীন বিশ্বকে সম্পর্কযুক্ত করার এক অনন্য প্রয়াস হল এই ‘পরিবর্ত অনুসন্ধান’।     

এই যাত্রাপথের বর্ণনা লেখক শুরু করেছেন ভুটানের পাদদেশে অবস্থিত আলিপুরদুয়ারের রায়ডাক তীরের ছোট চৌকির বস গ্রাম থেকে। প্রকৃতির কোলে অবস্থিত এই গ্রামের পথ থেকে লেখক পাঠককে বিচরণ করিয়েছেন মহাকালগুড়ি, শামুকতলা, কামাক্ষ্যাগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, শিলিগুড়ি, নকশালবাড়ি, দার্জিলিং , কোচবিহার ও কলকাতার রাজপথে। তাঁর এই পুরো যাত্রায় পাঠকের সামনে দৃশ্যকল্পের মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে উত্তরবঙ্গ, আসাম, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ভূপ্রকৃতি, জনজীবনের বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জনজীবন। লেখকের ঐতিহাসিক সত্ত্বা, তাঁর লেখনীর মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছে ১৯৭০ থেকে২০২২,  এই সময়পর্বের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও তার ইতিহাসচর্চাকে।

চারটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ‘পরিবর্ত অনুসন্ধানের’ প্রথম অধ্যায়ে লেখক আলোচনা করেছেন তাঁর শৈশব ও ছোট চৌকির বস গ্রামের কথা। এই গ্রামের ভৌগলিক ও জনজীবনের বৈচিত্র্য আলোচনা করে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর দ্বারা এই প্রান্তিক অঞ্চলটি প্রভাবিত হয়েছিল। প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখি মহাকালগুড়ি মিশন স্কুলে পড়ার সময় ঐ অঞ্চলের বহুমুখী সংস্কৃতির সঙ্গে লেখক খুঁজে পান বিশ্ব ইতিহাসের চালিকা শক্তিকে। এমনকি তার কিশোর মনের কল্পনায় মাহাকালগুড়ি গ্রামে তিনি খুঁজে পেয়েছেন William Wordsworth (1770-1850) এর কবিতায় বর্ণিত ইয়ুরোপের গ্রামের সাদৃশ্য। আলিপুরদুয়ার কলেজের ছাত্রজীবনের প্রসঙ্গে লেখকের কলমে উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনীতি (১৭৫৭-১৯৪৭), ডুয়ার্সের গণ-আন্দোলন (১৯২০-১৯৪২) , আসাম আন্দোলন (১৯৭৭-১৯৮৫), পশ্চিমবঙ্গের  পশ্চিমবঙ্গের  বামপন্থী রাজনীতি (১৯৪৭-২০১১) ও আঞ্চলিকতার আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১), শীতল যুদ্ধ (১৯৪৫-১৯৯১), সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন, Paris Principles (1991), মানবাধিকার ও বিশ শতকের স্বৈরাচারী শাসনের কথাও। অর্থাৎ ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকের প্রেক্ষাপটে নিজের ব্যাক্তি-জীবনের সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক পাঠকের সামনে নতুন বিশ্বকে তুলে ধরেছেন।

আলোচ্য গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের আখ্যান পর্ব গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকের ছাত্রজীবন তথা দার্জিলিং শহরের আবহে। এই পর্বে লেখক তাঁর এক ব্যাক্তিগত যাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে তুলে ধরেছেন ‘নকশালবাড়ি আন্দোলনের’ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। একজন তীক্ষ্ণমেধার ঐতিহাসিক হিসাবে বিশ শতকের শেষ তিন দশকের ইতিহাসচর্চার নতুন ধারারগুলির সঙ্গেও পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ‘পরিবর্ত অনুসন্ধানের’ লেখক। এই অধ্যায়ের শেষে দেখা যায় লেখক প্রবেশ করছেন তার পেশাগত জীবনে।

তৃতীয় অধ্যায়ের সূচনাতে রূপ কুমার তাঁর পেশাগত জীবনের (সেন্ট জোসেফ কলেজ এবং পরবর্তীকালে এ.বি.এন শীল কলেজের সহকারী অধ্যাপক) বর্ণনা করতে গিয়ে কোচবিহার রাজ্যের সূচনা, তার বিকাশ তথা গণস্মৃতির (public memory) ইতিহাস আলোচনা করেছেন। একইসঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের World Trade Centre)  সদর দপ্তরে জঙ্গী আক্রমণ (২০০১) ও ডারবান সম্মেলন (২০০১) প্রসঙ্গে লেখক বর্ণবাদের (Racism) সঙ্গে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক এবং বাংলার ইতিহাসচর্চায় তার প্রভাবের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

চতুর্থ অথ্যায়ের সূচনায় লেখক ভারতের এক বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়ার সূত্রে তুলে ধরেছেন বাস্তুচ্যতি, বর্ণবাদিতা (Casteism) এবং গ্রাম ও মহানগরের জীবনের বৈপরীত্যের ইতিহাস। তবে এই অধ্যায়ে ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার থেকেও বেশি প্রাধান্য পেয়েছে ইতিহাসচর্চার ধারাগুলি। বিশ ও একুশ শতকের আবহে সৃষ্ট ‘পরিবেশের ইতিহাস’, রাষ্ট্র নির্মাণ, বাস্তুচ্যুতি ও নাগরিকত্বের দ্বন্দ; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা; এবং দলিত প্রতর্ক সম্পর্কিত ইতিহাসচর্চায় আলোকপাত করতে গিয়ে ‘পরিবর্ত অনুসন্ধানের’ লেখক পাঠককে মনে করিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের (Common People) ইতিহাস শুধু লেখ্যাগারের তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাইহোক, শেষ অধ্যায়ে আমরা দেখেছি  যে ঐতিহাসিকের নৈপুণ্যতা ও ইতিহাসচর্চার  পদ্ধতির ব্যবহারে এই গ্রন্থটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথাকে অতিক্রম করে গেছে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়  ‘পরিবর্ত অনুসন্ধান’ একটি ‘ অভিনব স্মৃতিকথা’ যা প্রকৃতপক্ষে জাতি, রাষ্ট্র ও বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে ব্যাক্তি-জীবনের আশ্চর্য মিশেল। তবে প্রথাগত আত্মজীবনী থেকে  ভাবগতভাবে এই গ্রন্থটি অনেকটাই পৃথক। কারণ বিশ্ব-সমাজের মধ্যে ব্যক্তির অবস্থান বা প্রান্তিক অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের সংযোগের ইতিহাস নির্মাণ করতে গিয়ে লেখক প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। লেখকের অন্যতম প্রেরণা সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মন (১৯১৪-১৯৫১)  উপন্যাসের মধ্যে জলজীবনের গাথা অঙ্কনে যে কাব্যিক স্বাধীনতা গ্রহণ করেছিলেন, সেই স্বাধীনতাটুকুকেই পরিহার করে ছন্দময় গাথার উত্তরাধিকার লেখক বহন করেছেন বর্তমান গ্রন্থে। 

রূপ কুমার বর্মণ: পরিবর্ত অনুসন্ধান: রাষ্ট্র নাগরিকত্ব বাস্তুচ্যুতি ও ইতিহাসচর্চা, কলকাতা: গাঙচিল, ২০২২,পৃষ্ঠা: ১৭০, মূল্য: ৪৫০/ ভারতীয় টাকা

পায়েল দেশমুখ, গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ভারত।

;