আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও লেখক

গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে আমার স্নেহভাজন সহকর্মী ও প্রিয় ছাত্র প্রফেসর মোহাম্মদ আলম চৌধুরী রচিত 'আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা' গ্রন্থটি যখন হাতে এলো, তখন রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধ-দ্বিশত জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। কিছুদিন আগেই পালিত হয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী। দুইবছর বাদেই অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদেরও ১১০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হবে।

সত্য কবুল করে বলতে দ্বিধা নেই যে, আধুনিক ইতিহাসের ধারায় হিন্দু ও মুসলিমের মিলিত বৃহত্তর বাঙালি সমাজে শতবর্ষব্যাপী আলোচিত ও স্মরণীয় মনীষার সংখ্যা খুব বেশি নয়। অত্যল্প ব্যক্তিত্বই নিজের জীবন ও সমকালের পরিসরকে গৌরবের সঙ্গে অতিক্রম করে শতাব্দীর পরিসীমায় নিজের জাগরস্বপ্নকে প্রলম্বিত করতে সফল হয়েছেন। আর্থ, সামাজিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপরিসীম ও অমোচনীয় প্রভাবের কারণে তাদের জীবন ও কর্ম কাল-কালান্তরে ও প্রজন্মব্যাপী সতত আলোচিত হয়েছে।

সমাজ ও মানুষের কাছে চিরায়ত গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা লাভকারী অগ্রণী ও বিশিষ্ট বাঙালি আইকনিক চরিত্রের মধ্যে অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ নানা কারণে অতুলনীয় ও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম স্বরূপ। কারণ, তিনি তৎকালীন রাজধানী কলকাতা বা ঢাকায় অবস্থান করেননি এবং কোনরূপ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বদান্যতার পরোয়া করেননি। স্বকীয় মেধা ও মননের শক্তিতে সম্পূর্ণ স্বনির্মিত মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন প্রথা ও গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে নীতি, নৈতিকতা ও শুদ্ধাচারের বিদ্রোহী প্রতিমূর্তি। তিনি জীবনভর সক্রিয় ও ভূষিত ছিলেন মাটি, মানুষ ও সমাজ-সংশ্লিষ্টতার শাশ্বত চৈতন্যের আলোকমালার বর্ণালীতে।

এমনই এক বহুমাত্রিক, ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী মানুষের জীবনচরিতের সামগ্রিক বিশ্লেষণ শুধু সাহিত্যিক দিক থেকেই নয়, ও সামাজিক গবেষণার নিরিখেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, কাজটি ব্যাপক, বিশাল অধ্যাবসায়ের ও শ্রমসাপেক্ষ। প্রফেসর মোহাম্মদ আলম চৌধুরী রচিত 'আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা' গ্রন্থটি বহুবছরের প্রচেষ্টায় সম্পন্ন তেমনই এক নান্দনিক প্রয়াস, যা গতানুগতিক জীবনী সাহিত্য বলতে যা বোঝায়, তার চেয়ে অগ্রসর ও নিবিড় গবেষণামূলক প্রচেষ্টা।

সাধারণত কোন ব্যক্তির জীবন কেন্দ্রিক প্রত্যাগত মাধ্যমে রচিত সাহিত্যকে জীবনী সাহিত্য বলে। সংস্কৃতে এমন অনেক জীবনী সাহিত্যর পরিচয় মেলে, যেখানে জীবনী সাহিত্যকে 'কারিকা' বা 'বৃত্তি' বলা হত। মধ্যযুগের চৈতন্য দেবের আবির্ভাবের পর তাকে কেন্দ্র করে এবং তার পার্ষদদের কেন্দ্র করে এই জীবনী সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অনেক জীবনী রচিত হয়েছে। যার মধ্যে গোলাম মুরশিদের 'আশার ছলনে ভুলি' (মাইকেল মধুসূদন জীবনী) ও সুমন চট্টোপাধ্যায়ের 'প্রথম নাগরিক' (ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি জীবনী) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা' ভাষায়, বর্ণনায়, বিশ্লেষণে, তথ্যের সমাবেশে, কাঠামো ও পরিসরের বিস্তৃতিতে উচ্চাঙ্গের জীবনী গ্রন্থের তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য।

আসহাবউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশি লেখক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও দক্ষ সংগঠক ছিলেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং একজন কমিউনিস্ট ছিলেন। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় মোট ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০০৫ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক-এ ভূষিত হন।

শিক্ষকতা দিয়ে আসহাব উদ্দীন আহমদ কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম কলেজ, পরে একে একে তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজ), লাকসাম নবাব ফয়েজুন্নেসা কলেজ, ফেনী সরকারী কলেজ-এ ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ-এ ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন বেসরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির মুখপত্র 'দি টিচার'-এর সম্পাদক।

আসহাব উদ্দীন ১৯১৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর গ্রামের সচ্ছল এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুনশী সফর আলী চৌধুরী ও মা নাসিমা খাতুন। তিনি ১৯৩২ সালে বাণীগ্রাম-সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৩৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর ১৯৩৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় উঠেন এবং কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। মার্ক্সবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দেন কৃষক-শ্রমিকদের পাশে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী লীগের (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিপ্লবী রাজনীতির অনুসারী হওয়ায় তাকে পাকিস্তান আমলে এক বছর জেল খাটতে হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পর তার রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় এবং তার নামে হুলিয়া জারি হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ডে হুলিয়া মাথায় নিয়ে জীবন কাটাতে হয়। পাকিস্তান সরকার তাকে ধরে দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

১৯৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলে তিনি পিকিংপন্থিদের সাথে ছিলেন এবং ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। সেই সময়ে তিনি বিভিন্ন গ্রামে কৃষকদের বাড়িতে তাদের আশ্রয়ে আত্মগোপন করে কাটান। ১৯৮০ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে গণচীন সফর করেন ও সে বছরের শেষের দিকে সক্রিয় রাজনীতি হতে অবসর নেন।

আসহাব উদ্দীনের লেখালেখির মূল উপাদান ছিল শোষণমুক্তি ও সমাজ পরিবর্তন। ১৯৪৯ সালে তার রচিত প্রথম 'বই বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর' প্রকাশিত হয়। তিনি তার আমার সাহিত্য জীবন বইতে বলেছেন, আমার লেখায় হাসি-ঠাট্টার ভেতর দিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অবিচারকে তুলে ধরা হয়েছে এবং জনগণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রচার করা হয়েছে, জনপ্রিয় করা হয়েছে, প্রোপাগান্ডার আকারে নয়, সাহিত্য রূপে।

অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৪ সালের ২৮ মে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।

প্রফেসর মোহাম্মদ আলম চৌধুরী রচিত 'আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা' গ্রন্থটিতে একটি সুগভীর বিশ্লেষণাত্মক ভূমিকার পাশাপাশি তিনটি অধ্যায় ও ১২টি পরিশিষ্ট রয়েছে। একটি বিশুদ্ধ উচ্চতর গবেষণা কাঠামোয় সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে গ্রন্থটি রচিত হয়েছে। আসহাবউদ্দীন সংক্রান্ত যাবতীয় আকর তথ্য এবং প্রাথমিক ও প্রকাশিত সূত্রের ব্যবহারে গ্রন্থটি আহসানউদ্দিনের সামগ্রিক জীবন ও কর্মের পর্যালোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, ভাবীকালের গবেষকদের জন্যেও অনুপ্রেরণার উৎস।

একজন ব্যক্তিমানুষের মানস গঠন ও ব্যক্তিত্ব নির্মাণের দীর্ঘতম পর্যায়গুলো খুঁড়ে বের করেছেন লেখক। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত জনপদ থেকে একজন মানুষের পক্ষে জাতীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরে পরিণত হওয়ার রোমাঞ্চকর বৃত্তান্ত এই গ্রন্থ। এই গ্রন্থ এক প্রতিবাদী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী, দ্রোহী ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বিদ্রূপমাখা কণ্ঠ আর অক্ষরের অধিকারী এক লেখকসত্ত্বাও ইতিবৃত্ত।

লেখকের ভাষা অনন্য, বিশ্লেষণ অতলস্পর্শী, পর্যালোচনা সুদূরপ্রসারী, বিন্যাস বহুমাত্রিক নান্দনিকতায় দীপ্তিময়। অতীতে আহমদ ছফা ও উইল ডুরান্ডকে নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় বক্ষ্যমান গ্রন্থে লেখকের কুশলী কৃতিত্ব ও সুনিপুণ পারঙ্গমতা সুস্পষ্ট। 'প্রকৃতি' থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি মুদ্রণ সৌকর্যে উন্নততর ও প্রতিনিধিত্বমূলক।

ঘটনাচক্রে গ্রন্থের লেখকের মতো প্রচ্ছদ শিল্পী জাওয়াদ উলআলম চৌধুরী আমার স্নেহভাজন ছাত্র, যিনি অধুনা শিল্পকলার ইতিহাস ও সমকালীন প্রপঞ্চ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সামাজিক বিজ্ঞানের ব্যাপক পরিধিকে শিল্প-নন্দনের মেলবন্ধনে উদ্ভাসিত করার পারঙ্গমতায় তিনি দক্ষতার সঙ্গে বহু প্রশংসনীয় কাজ করছেন। একইভাবে সাহিত্যিক ঘরানার জীবনীচর্চাকে সামাজিক-রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ব্যাপকতর পরিপ্রেক্ষিতে জারিত করে নবতর বীক্ষণে উপস্থাপনায় ও বহুবর্ণা দৃষ্টিকোণ উন্মোচনায় লেখক প্রফেসর মোহাম্মদ আলম চৌধুরীর সাবলীল কৃতিত্বপূর্ণ দক্ষতা সমকালীন মননচর্চা ও গবেষণায় দৃষ্টান্তমূলক ও সাধুবাদের যোগ্য। 'আসহাবউদ্দীন আহমদ ও মানবসমাজের মুক্তিভাবনা' বিশেষভাবে আহসাবচর্চায় ও সাধারণভাবে বাংলা জীবনী সাহিত্যে মূল্যবান সংযোজন রূপে বিবেচিত হবে বলে আশা করা যায়।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

   

বইমেলায় প্রকাশিত হলো- ‘সুষুপ্ত পাঠক এর কথোপকথন’

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে বইমেলা- ২০২৪ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে ‘সুষুপ্ত পাঠক এর কথোপকথন’। এটি মূলত ইতিহাসখ্যাত মনীষীদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে কল্পিত সাক্ষাৎকার।

লিখেছেন ব্লগার ও লেখক সুষুপ্ত পাঠক। তিনি মূলত ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী ক্ষণিক স্ফূলিঙ্গ ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এর একজন নেপথ্য নায়ক।

দেশে একসময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি কোনো কথা বলতে পারতো না। এর বিরুদ্ধে দেশের একদল তরুণ প্রজন্ম ব্লগ লিখে মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের চেতনা, ’৭২-এর সংবিধান, বিজ্ঞানমুখি শিক্ষাব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সপক্ষে জনমত গড়ে তোলা চেষ্টা করেন।

তারা শহিদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হাতে কলম তুলে ধরেন।

তাদেরই একজন সুষুপ্ত পাঠক। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকদের যখন একের পর এক হত্যা করতে থাকে মৌলবাদী শক্তি, তখন অনেকেই জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়েন। কেউ কেউ ব্লগ লেখা বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।

কিন্তু ব্যতিক্রমদের একজন সুষুপ্ত পাঠক। তার কলম যেন আরো ক্ষুরধার হয়ে ওঠে। আজ পর্যন্ত তাঁর কলম থেমে থাকেনি। তাঁকে একের পর এক হত্যার হুমকি দেওয়া হলেও তিনি কখনো থেমে যাননি।

২০২৪ সালেও তাঁর লেখা বহমান। তাঁর লেখা পাণ্ডলিপি কোনো প্রকাশক আগে প্রকাশ করতে সাহস করেননি জীবনহানি ও হয়রানির আশঙ্কায়। তবে ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে ‘সব্যসাচী প্রকাশনী’র প্রকাশক শতাব্দী ভব সুষুপ্ত পাঠকের পাণ্ডলিপি ‘সুষুপ্ত পাঠক এর কথোপকথন’ বই আকারে প্রকাশ করেছে।

বইটির ভূমিকায় সুষুপ্ত পাঠক লিখেছেন- ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে গল্প উপন্যাস নতুন কিছু নয়। সেসব চরিত্রদের মুখে লেখক যেসব সংলাপ যোগান তার সবই ইতিহাসে মেলে না। এটুকু স্বাধীনতা লেখক পেতেই পারেন। কিন্তু কিছুতে যেন ইতিহাস বিকৃত না হয়, সেদিকে লেখক সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।

এই বইতে আমি ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের মতো করে আলাপ করেছি। পারতপক্ষে তাদের মুখে এমন কিছু বলাইনি যেটা তাদের জীবন ও কর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক্। আমাদের সময়কাল নিয়ে তাদের দু-একটি উক্তি নিতান্তই ফিকশন হিসেবে ধরতে হবে।

এরকম আলাপ চলতিপথে আমার মাথার মধ্যে দুটি কণ্ঠস্বর হয়ে আমাকে প্রায়ই আনমনা অন্যমনস্ক করে তোলে। এই বদ অভ্যাস থেকে কিছু লেখা বের হবার পর পাঠকদের বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়।

ইতিহাসের রসকষহীন পৃষ্ঠার চাইতে গল্পের মতো করে ইতিহাস পাঠ যে, তাদের আগ্রহের হেতু বলাই বাহুল্য। সেই অনুপ্রেরণায় অনেকগুলো লেখা জমে যাবার পর সবগুলো লেখা এক মলাটে রাখার সিদ্ধান্ত নিই।

‘সব্যচাষী’র শতাব্দী ভব সেই ইচ্ছাকে বাস্তব করতে এগিয়ে আসেন। নিঃসন্দেহে দুঃসাহসের একটি কাজ।

এমন সব মানুষদের নিয়ে কথা বলেছি, যাদের কয়েকজন মনীষী হিসেবে ইতিহাস স্বীকৃত। তাদের সঙ্গে আমার কথোপকথন কখনো সীমা লঙ্ঘন করেছে কিনা জানি না। তবে আমি নিজের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছি। বাকিটা পাঠক বিবেচনা করবেন।

বইটিতে সূচি হিসেবে রয়েছে- গৌতম বুদ্ধ; ঈশ্বর বিদ্যাসাগর; রোকেয়া, শ্রীচৈতন্যদেব; অ্যাটম বোমার খলনায়ক; সিরাজ সিকদার; গজনীর সুলতান মাহমুদ; সম্রাট আকবর, মীর মোশাররফ হোসেনের মন; বাবুরনামা ও ভারতের ইতিাস; ভারতের দাসজীবন; কবি জসীম উদদীনের ‘জীবনকথা’ ও গ্রামবাংলার জীবনে ওহাবিজমের থাবা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতার বিরোধিতা করেছিলেন; বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী।

বইয়ের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ১১২। প্রচ্ছদ এঁকেছেন- আল নোমান। মুদ্রিত মূল্য- ৪০০ টাকা। বইমেলায় ২৫% ছাড়ে ৩০০ টাকা। প্রথম প্রকাশ- একুশে বইমেলা ২০২৪। বইটি পাওয়া যাচ্ছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে।

;

কওমি মাদরাসা নিয়ে সিদ্দিকুর রহমান খানের অনবদ্য গ্রন্থ

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কওমি ঘরানা নিয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থ না থাকার আক্ষেপ ঘোচালো ‘কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা’। গ্রন্থটির লেখক সিদ্দিকুর রহমান খান। শিক্ষা সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময়ে গভীর অনুসন্ধানী একগুচ্ছ প্রতিবেদনের সঙ্গে হালনাগাদ সব এক্সক্লুসিভ তথ্য জুড়ে তিনি বইটি সাজিয়েছেন। অতি বিরল ও গোপনীয় নথির সংযোজন এই প্রকাশনাকে আরো অতুলনীয় করে তুলেছে। কওমি মাদরাসা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো বইয়ের জন্য যারা হা-পিত্যেশ করছেন, তাদের হাতে স্বস্তির বারতা হয়ে উঠতে পারে এই বই।

বইটির ফ্ল্যাপে লেখা আছে, একগুচ্ছ শঙ্কা ও প্রশ্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট জুড়ে। উইকিলিকসের তারবার্তাও বাইরে নয়। প্রশ্নগুলো প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ডালপালা গজিয়েছে সর্বত্র। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উত্থানপর্বের আগে-পরে এই চিত্রটিও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। সংসদের ভেতরেও প্রশ্ন ছিলো কওমি মাদরাসার উত্থান নিয়ে। এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থী অভিভাবকদের এন্তার প্রশ্নেরও সদুত্তর ছিলো না।

এ সংক্রান্ত সব জবাবই ছিলো ধোঁয়াশামাখা। জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়াতেও সেক্যুলার শব্দ বাতিল করিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন কওমিধারার ধারক-বাহকরা। অর্থের সন্দেহজনক উৎস, উসকানি, মৌলিক সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ --এসব প্রশ্নবোধকের জবাব খুঁজতেই একজন সিদ্দিকুর রহমান খানের অনুসন্ধান। সদরে, অন্দরে, সর্বক্ষেত্রে। কী হয়েছিল খালেদা জিয়া, ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন ও শেখ হাসিনা সরকারের জমানায়?

সাংবাদিক ও লেখক সিদ্দিকুর রহমান খানের সৃজনশীলতার শুরু কবি জীবনানন্দ দাশের আজন্মসুধা ধানসিঁড়ির প্রতিবেশী নলছিটির সুগন্ধার পাড়ে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক স্নিগ্ধ হাওয়ায় গা ভাসিয়েছেন কাগজে লেখার স্বপ্নে। তারপর তার কলম এগিয়েছে অভিজ্ঞতার অম্ল-মধুরতায়। লিখে লিখে জীবিকায়নের মাধ্যমটা সব সময়ই ছিলো ইংরেজি। দৈনিক নিউ এইজ, ইনডিপেন্ডেন্ট এবং বাংলাদেশ টুডেসহ কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিকে।

শিক্ষার বর্ষসেরা রিপোর্টার হিসেবে একাধিকবার মিলেছে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির সৌজন্যে’ পুরস্কার। রিপোর্টার হিসেবে পেয়েছেন আরো অনেক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। আর শিক্ষার নানা বিশ্লেষণ বাংলায় গণপাঠকের মন ও মানসে পৌঁছে দিতে নিজের সম্পাদিত দৈনিক শিক্ষাডটকম ছাড়াও বেছে নিয়েছিলেন ইত্তেফাক, প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল, সকালের খবরসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক।

বর্তমানে শিক্ষা বিষয়ক দেশের একমাত্র জাতীয় প্রিন্ট পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তার প্রধান সম্পাদক এবং শিক্ষা বিষয়ক একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকম এর তিনি সম্পাদক ও প্রকাশক।

সিদ্দিকুর রহমান খানের লেখা ‘কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা’ বইটি এবারের বইমেলায় পাওয়া যাবে ‘স্বদেশ শৈলীর স্টলে (স্টল নং ৫০৭)। 

;

বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অমর একুশে ও তার চেতনাবাহী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথ মর্যাদার সাথে পালিত হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাংলাভাষী রাজ্যগুলোতে এই ঐতিহাসিক দিবসকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদ্‌যাপন করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে যেভাবে রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর ও জব্বার শহিদ হয়েছিলেন। একইভাবে রাজ্যভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে পুলিশের গুলিতে কমলা ভট্টাচার্যসহ এগারোজন শহিদ হন।

বাঙালির আত্মরক্ষা ও আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রশ্নে ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত অভিজ্ঞান, অঞ্চল নির্বিশেষে, সর্বস্তরের বাঙালির ঐক্যমন্ত্র। সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চ ২০১৫ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পাশাপাশি ২০ ফেব্রুয়ারি ভাষা গণতন্ত্র দিবস পালন করে আসছে।

এ বছর একুশে চেতনা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র ও সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চের উদ্যোগে ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা ভবনের সিনেট হলে দু'দিন ব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী রাজ্যগুলোর বহু ভাষাসংগ্রামী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিশিষ্ট জনেরা।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য-তাত্ত্বিক, সমালোচক ও কবি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড.তপোধীর ভট্টাচার্য সেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মেলনের উদ্দেশে পূর্বেই প্রেরিত তাঁর শুভেচ্ছা বাণী 'ঐকতান গবেষণা পত্র'-এ মুদ্রিত হয়।

অধ্যাপক ভট্টাচার্যের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর প্রজ্ঞাময় শুভেচ্ছা বাণী বার্তা২৪.কম-এ প্রকাশিত হলো।

'সমুদ্র দূরত্বে কথা বলি আমরা
আকাশ দূরত্বে কথা বলি আমরা
নক্ষত্র দূরত্বে কথা বলি আমরা
যতক্ষণ কথা বলি ততক্ষণ
পরস্পর নিবিড় আশ্রয় ...'

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-১]

এসময় পরস্পরকে নিবিড় আশ্রয় দেওয়ার, আসুন বাঙালি ভাইয়েরা, নিজেদের মধ্যে কথা বলুন, আশ্রয় খুঁজে নিন আমাদের ভাই ও বোনের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আর উনিশে মে : আমরা কি ভুলিতে পারি বলেও আদৌ মনে রেখেছি কি? আসুন,বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জাতির বিক্ষত মুখাবয়ব অবলোকন করি !

পুণ্যলাভের ফাঁদে কীটাণু পতঙ্গ—ধারালো কৃপাণ
প্রতিদিন ধড়হীন দেহ ফেলে যায় রাস্তায়!

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-৫]

এই ভয়াবহ দৃশ্য তৈরি করে চলেছে সময়। রাহুগ্রস্ত পৃথিবীতে যত হলাহল উগরে দিক,আসুন বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা, আমরা আত্মপ্রতারক অন্ধকার মুছে দিয়ে নিজেদের পুনরাবিষ্কার করি।

আসুন, বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা,
আমরা পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার পুনর্জাগরণ ঘটাই। কারণ,
'অন্তর গভীরে তবু বয়ে যায় প্রেমনদী
স্তরীভূত শিলার অতলে বিশুদ্ধ পানীয় জল
নিজেকে নিঃশব্দে বহমান রেখে দিতে জানে ...'

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-৭]

আসুন, জাতিসত্তার দুর্নিবার পিপাসা মেটাতে প্রেমনদী বইয়ে দিন। খুঁজে নিন অস্তিত্বের গভীরে বহমান বিশুদ্ধ পানীয় জল। জয় হোক বাঙালির, কলুষিত বিভাজনপন্থা পর্যুদস্ত হোক॥

'সবাই যখন জীবন্মৃত অন্ধকারে', বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বিষ্ট স্বৈরতন্ত্রী শক্তি যখন আতঙ্ক ছড়াতে গিয়ে নিজেই কাঁপছে ভয়ে থরথর, বাঙালির ঘরে ঘরে চতুর্দশীরা একাই লড়ছে চেতন ভরে। চোখ মেলে আসুন, দেখি, 'ওষ্ঠ জুড়ে দারুণ ফোটা কথকতা'! সবাই মিলে যেন নতুন ভোরের সূচনা করতে পারি!

বাঙালি জাতির চিরকালীন অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ কেন লিখেছিলেন 'কালান্তর'-এর এই দিগদর্শক বাণী, আসুন নতুন করে আবার বুঝে নিই:

'বঙ্গবিচ্ছেদ ব্যাপারটা আমাদের অন্নবস্ত্রে হাত দেয় নাই, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করিয়াছিল। সেই হৃদয়টা যতদূর পর্যন্ত অখণ্ড ততদূর পর্যন্ত তাহার বেদনা অপরিচ্ছিন্ন ছিল। আসুন, নিজেদেরই প্রশ্ন করি: আমরা কি সেই হৃদয়কে টুকরো করিনি? ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পে আমাদের চেতনাকে কি আমরাই আচ্ছন্ন হতে দিইনি?

বাঙালির জাতিসত্তার নিয়ামক তার ভাষা, তার বর্ণমালা, তার ভাষাশীলিত সংস্কৃতি। ধর্ম যার যার, সংস্কৃতি ও ভাষা সবার। তাই বাঙালি শুধুই বাঙালি। হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিষ্টীয় নয়; প্রাগার্য-অনার্য-আর্য রক্তধারার বহু সহস্রাব্দ ব্যাপ্ত সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতির বর্ণভেদ মিথ্যা; কেউ বড়ো নয়, কেউ ছোট নয়। সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে আমাদের বাংলামায়ের অভিষেক চিরদিন হয়েছে, চিরদিন হবে। আমাদের পথ বিভেদের অন্ধকারে নয়, আলোকিত সম্মিলনের।

যারা বাঙালির ঐক্য ভাঙতে মরিয়া, তারাই আমাদের হিন্দু-মুসলমান আর উঁচুজাত-নিচুজাতে বিভক্ত করতে চক্রান্ত জারি রেখেছে। বাঙালির শত্রুদের চিনে নিন, সংহতি দিয়ে পরাস্ত করুন।

বাঙালি জাতিসত্তার বহু সহস্রাব্দ ব্যাপ্ত ইতিহাসকে বিকৃত করার ও মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন। বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসী বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত করাই হোক এসময় আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

'যে আপনাকে পর করে সে পরকে আপনার করে না, যে আপন ঘরকে অস্বীকার করে কখনোই বিশ্ব তাহার ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করিতে আসে না।' (রবীন্দ্রনাথ: 'পরিচয়')।

তাই সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চ বিপন্ন ছিন্নবিচ্ছিন্ন আত্মবিস্মৃত স্বজাতিকে আপন ঘরের নিকট আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করার রীতিকে সর্বজনীন করে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।

;

ভাষার লড়াই কালে কালে



সায়েম খান
ভাষার লড়াই কালে কালে

ভাষার লড়াই কালে কালে

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন ডেনমার্কের ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে একটি সুপ্রাচীন, সুমিষ্ট ভাষার প্রচলন ছিল। ভাষাটির নাম ফ্যারোইজ। ড্যানিশ জাতি আজ থেকে ৫০০ বছর আগে সেই দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের উপর ভাষাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের উপর ড্যানিশ ভাষা চাপিয়ে দিল। তাদের গির্জা, উপাসনালয় কিংবা পাঠশালাগুলোতে ফ্যারোইজ ভাষা বাদ দিয়ে ড্যানিশ ভাষা ব্যবহার আইন বলে বিবেচিত হল। শুরু হল ফ্যারোইজদের সাথে ড্যানিশদের ভাষাগত বিবাদ। সেই থেকে আজ অবধি ফ্যারোইজরা তাদের এই ভাষাকে আলাদা করে চর্চা ও লালন করে আসছে। ফ্যারোইজ ভাষার রয়েছে নিজস্ব শব্দ। এখনও সংযোজিত হচ্ছে নতুন শব্দগুচ্ছ। গল্প, গান আর নাচে সমৃদ্ধ একটি ভাষা ফ্যারোইজ। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা তাদের প্রাণের ভাষাকে আজও মিশ্রিত হতে দেয়নি অন্য ভাষার সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে। একবিংশ শতাব্দীতেও লড়াই করে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করতে ফ্যারোইজ ভাষার মাধ্যমে।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, আর্য সংস্কৃতির বিস্তার এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের সময়ে সংস্কৃত ভাষা ছিল শক্তিশালী মাধ্যম। আজ থেকে ৪০০০ থেকে ৫০০০ বছর আগে ইন্দো-আর্য গোষ্ঠী থেকে সংস্কৃত ও আবেস্তীয় ভাষার উৎপত্তি। এই দুটি ভাষা কালের পরিক্রমায় দুই ভাগে বিভক্ত হতে থাকে কিছু শাব্দিক অর্থের বিভেদের কারণে। উদাহরণস্বরুপ, সংস্কৃতে "দেবা" শব্দের অর্থ যেখানে দেবতা, সেখানে আবেস্তীয় ভাষায় "দেবা" শব্দের অর্থ দাড়ায় "শয়তান"। যা দুই জাতের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব একটি বড় কারণ হয়ে দাড়ায়। ইন্দো ও আর্যদের ভাষাগত ও জাতিগত উৎপত্তির এক ও অভিন্ন সংযোগ থাকার পরেও শুধুমাত্র ভাষাগত সমস্যার কারণে ইন্দো ও আর্য নামক দুটি স্বাতন্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ঠিক একই ধারায়, ভারতীয় উপমহাদেশে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন যখন হয়, তখন থেকেই সামাজিকভাবে গুরুত্ব হারিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে ভারতবর্ষের আদিমতম "সংস্কৃত"ভাষা। এখন পর্যন্ত এই ভাষাটি পূরাণ, বেদ, উপনিষদ ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রের ভাষা হিসাবে "সংস্কৃত" বিবেচিত। মোঘলরা যখন ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু করতে থাকল, তখন থেকেই সংস্কৃত ভাষার সামাজিক প্রচলনের আবেদন কমতে থাকে। ঠিক একই ভাবে, বৃটিশরা যখন মোঘলদের হটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের শাষনামল শুরু করল তারাও শুরুর দিকে তাদের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে প্রচলন থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষাগত জটিলতার কারণে ফার্সীকে বাদ দিয়ে ইংরেজীর প্রচলন শুরু করেছিল এবং তখন থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মোঘলদের সম্ভ্রান্ত ফার্সী ভাষা বিলুপ্তি ঘটতে থাকে।

পৃথিবীতে ঔপনিবেশিক যুগের প্রারম্ভ থেকে আমরা দেখে এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে ক্ষমতা ও রাজ্য দখলের পর ক্ষমতা দখলকারী শাসকশ্রেণী, পরাজিত আদি জনগোষ্ঠীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। শাষকশ্রেণীর ধারণা, ক্ষমতা ও দখল চিরস্থায়ী করার জন্য সবার আগে নিশ্চিহ্ন করতে হবে শাষিত প্রজাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার যেসব দেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার ছায়াতলে ছিল, সেসব দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার চর্চা ও প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। যারা ইংরেজি জানত ও শিখত তাদের সামাজিক ভাবে গুরুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। তৎকালীন বৃটিশ-বেনিয়াদের সৃষ্ট এলিট শ্রেণীর সাথে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের মেলামেশা ছিল খুব সহজ। ঠিক তেমনি, ফরাসি ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে অদ্ধাবধি ফরাসি ভাষার আধিপত্য বিরাজমান।

প্রাচীন বুলগেরীয় ভাষার প্রাচীন যুগ বিস্তৃত ছিল ৯ম থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত। ১৬শ শতকের শুরুতে বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় এই ভাষার আধুনিক যুগ। ইউরোপের অতি প্রাচীন এই ভাষা নিয়েও ১৮শ শতকে শুরু হয়েছিল আন্দোলন সংগ্রাম। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বুলগেরীয় জনগণের সংগ্রাম এখনও ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুতে অসমীয় ভাষাকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করার পর শুরু হয় আন্দোলন বিক্ষোভ। ১৯৬১ সালের ১৯মে ভাষার জন্য এই বিক্ষোভে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষা বিপ্লবী। ১১ বিপ্লবী শহীদের প্রাণ উৎসর্গের কারণে এখনও ১৯ শে মে’কে আসামে ভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন ও আদি ভাষা "বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী" ভাষা যেন বিলুপ্তির প্রতিবাদে ১৯৯৬ সালে ১৬ই মার্চ শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ। তাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় ভাষা শহীদ বলা হয়ে থাকে। ভারতে ভাষার জন্য এসব আত্মত্যাগের কারণে বর্তমানে ২২টি ভাষাকে সরকারি ভাষা ও ৪টি ভাষাকে ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। আসামের বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সুদেষ্ণা সিংহের মহান আত্মত্যাগের কারণে ১৬ মার্চ আসাম জুড়ে একটি স্মরণীয় দিন হিসাবে পালন করা হয়।

১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির একটি ইহুদি সাহায্যকারী সংস্থা যার নাম ছিল হিলফসভেরেইন ডের ডিউচচেড জুডেন। এই সংস্থাটি তৎকালীন ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের জন্য একটি টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সেই জার্মান সংস্থা শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইহুদি ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেয় জার্মান ভাষা। তখন ইহুদীদের শিক্ষার ভাষা কি হবে সে নিয়ে জার্মান ভাষা সমর্থনকারী ও হিব্রু ভাষাভাষী ইহুদীদের মধ্যে একটি প্রকাশ্য বিবাদ তৈরি হয়। ইসরাইলের হাইফা সিটি মিউজিয়ামে এ ঘটনা নিয়ে স্বাতলানা রেইনগোল্ড নামে এক চিত্রশিল্পী ২০১১ সালে "ভাষার যুদ্ধ" নামে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।

ভাষার জন্য পৃথিবীতে প্রথম গুলিবর্ষণ হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পূর্ব-বাংলার সরকারি ভাষা তখন থেকেই মুহুর্মুহু প্রতিবাদের উঠতে শুরু করল। প্রতিবাদ-সংগ্রামের এক পর্যায়ে বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয় সালাম, জাব্বার, রফিক, বরকতের মত তাজা প্রাণ। সেই মর্মস্পর্শী ঘটনাকে সাক্ষী রেখে এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজও বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস"।

ভাষা এমন এক অধিকার যা কখনো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়। ভাষা নিয়ে বিভেদ, বিবাদ, প্রতিবাদ, সংগ্রাম হয়েছে দেশে দেশে, কালে কালে। একটি সভ্যতার ক্রমবিকাশে ভাষা অপরিহার্য। ভাষা হল মানবসভ্যতার স্পন্দন। ভাষা নিয়ে লড়াই নয়। ভাষা হোক মুক্তি ও মানবতার জন্য। ভাষা হোক ভালবাসার জন্য।

;