ঐশ্বর্যময় কবি দিলওয়ার



সাঈদ চৌধুরী
ঐশ্বর্যময় কবি দিলওয়ার

ঐশ্বর্যময় কবি দিলওয়ার

  • Font increase
  • Font Decrease

কবি দিলওয়ার বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদ পুরুষ। তার মন ছিল গভীর ঐশ্বর্যময়। স্বভাব ছিল বহতা নদীর মতো, সতত বহমান।

দিলওয়ার এক বিস্ময় প্রতিভা। মানুষ হিসেবে এবং কবি হিসেবে ছিলেন অনেক বড় মাপের অনন্য একজন। তিনি গণমানুষের কবি। মুক্তিকামী মানুষের কবি। তার নিজের ভাষায়- ‘পৃথিবী স্বদেশ যার, আমি তার সঙ্গী চিরদিন’।

কাব্যের সুদূর প্রসারী আবেদন সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন বলেই কবি বলতে পেরেছেন- ‘এবার এলো শক্তিহীনের/ শক্তি লাভের দিন/ নবীন ভুবন সৃষ্টি হবে/ ঐক্যে অমলিন।‘

২০০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা টাউন হলে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ কর্তৃক কবি দিলওয়ারকে প্রদত্ত সংবর্ধনার মানপত্রে উল্লেখ করা হয়- ‘সাথী আজ তোমাকে সংবর্ধিত করার সুযোগ পেয়ে আমরা আনন্দিত। তোমাকে সম্মান জানানোর নাম মানুষকে ভালোবাসা। … তুমি কোনো একটি দেশের নও। কোনো দেশের কোন সীমানা তোমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। তোমার আশ্চর্যজনক সুস্থমন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় আত্মসম্মানবোধ তোমাকে এক কর্মযোগী করে তুলেছে।’

কবি দিলওয়ার সাম্য, মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তিনি আমাদের অনেক স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন। তার কবিতার বহু পংক্তি সাধারণ মানুষেরও মুখস্থ। সমাজ পরিবর্তনে সংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করে তার এসব ছড়া ও কবিতা।

জাতীয় মুক্তির সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি বলেন- ‘চাই বিপ্লব, চাই বিপ্লব, চাই/ বিপ্লব ছাড়া মুক্তির উপায় নাই/ পুরাতন করে কর্তন/ আনো নব পরিবর্তন/ নরদানবের বংশ/ করবো সমুলে ধ্বংস/ বুঝে নাও আজ এই ধরণীর/ প্রাপ্য যে যার অংশ/ রুখিয়া দাঁড়াও ভাইরে/ জীবনের গান গাইরে/ প্রাণ ধারণের প্রাপ্য রাসদ/ চাইরে মোদের চাই/ বিপ্লব ছাড়া জীবন জাগার কোনো উপায় নাই/ দাও তবে প্রতিঘাত/ হাতেতে মিলাও হাত/ দাও হুঙ্কার, টুটাবোই মোরা/ দুঃস্বপ্নের রাত।’


সিলেট শহরতলীতে ঠিকানা থাকলেও কবি দিলওয়ার আলোচিত ও সমাদৃত ছিলেন রাজধানী ঢাকা ও কলকাতার শীর্ষ কবিদের মধ্যে। ১৯৮০ সালে কবি দিলওয়ার কাব্য চর্চায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ লাভ করেন ১৯৮১ সালে। ২০০৮ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক, নাট্যকার ও গীতিকার ছিলেন। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে তার কবিতা প্রেরণা সঞ্চার করেছে।

দিলওয়ার গণমানুষকে হদয়ে কতটা জায়গা দিয়েছিলেন তার প্রমাণ মিলে বিভিন্ন কবিতায়। ‘আয়রে চাষি মজুর কুলি মেথর কুমার কামার/ বাংলা ভাষা ডাক দিয়েছে বাংলা তোমার-আমার।’ অথবা ‘বহু লাঞ্ছনা, বহু অপমান/ সহিয়াছে যারা মুখ করি ম্লান/ জয় হবে সেই নিপীড়িতদের/ জালিমেরা শির নোয়াবে/ এইবারে রাত পোহাবে।‘

কবি দিলওয়ারের কণ্ঠে জাগরনীর সুর ছিল। নিজ সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যে তিনি উজ্জ্বল হয়ে আছেন। বেদনাক্লিষ্ট মানুষকে জাগ্রত করে কবি বলেন-‘পৃথিবীতে এসে কেঁদে যায় যারা বেদনার গেয়ে গান/ হতাশার কালো নয়নে মাখিয়া তপ্ত নিশ্বাস ফেলে/ নত করি শির চরণে নিজের দুঃখের পসরা ঠেলে/ মহাজীবনের ললাটে আঁকিয়া তলোয়ার খরশান/ তাদের বিফল জীবনের লাগি, বলো ঠিক দায়ী কারা/ বিধি না জনক? শাক্ত না ধনী? কোথায় জবাব তার/ লুকালো কোথায় উত্তরদাতা, সে কোন অন্ধাকার?/ নিবিড় আবেগে কাঁপিছে আমার দুইটি আঁখির তারা!’

‘গণমানুষের কবি’ বললে তার নাম বলতে হয়না। ১৯৭৭ সালের ৭ মার্চ সিলেটে কবি দিলওয়ারকে দেয়া নাগরিক সংবর্ধনার মানপত্রে ‘গণমানুষের কবি’ অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়। এরপর তিনি আজীবন বরণীয় হয়েছেন এই নামেই।

শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের প্রতি কবির ভালোবাসার অন্ত নেই। শিশুর মত তার সরল কবি মন কোমলমতি মানুষদের টানে। ছোট বেলায় কবির কথা মনে হলে শান্ত সকালে সুরমা পারের সূর্যোদয় অবলোকন করে করে অনাবিল আনন্দে ছুটে যেতাম। মনে মনে আবৃতি করতাম তার ‘কীনব্রীজে সূর্যোদয়’। ‘এখন প্রশান্ত ভোর। ঝিরঝিরে শীতল বাতাস/ রাত্রির ঘুমের ক্লান্তি মন থেকে ঝেড়ে মুছে নিয়ে/ আমাকে সজীব করে। উর্ধ্বে ব্যাপ্ত সুনীল আকাশ/ পাঠায় দূরের ডাক নীড়াশ্রয়ী পাখীকে দুলিয়ে।/ নীচে জল কলকল বেগবতী নদী সুরমার,/ কান পেতে শুনি সেই অপরূপ তটিনীর ভাষা/ গতিবন্ত প্রাণ যার জীবনের সেই শ্রেয় আশা/ সৃষ্টির পলিতে সেই বীজ বোনে অক্ষয় প্রজ্ঞার।/ সহসা ফিরিয়ে চোখ দিয়ে দেখি দূর পূবাকাশে/ তরুণ রক্তের মতো জাগে লাল সাহসী অরুণ/ পাখীর কাকলি জাগে। ঝিরঝিরে শীতল বাতাসে/ দিনের যাত্রার শুরু। অন্তরালে রজনী কুরণ!/ ধারালো বর্শার মতো স্বর্ণময় সূর্যরশ্মি ফলা/ কীন ব্রীজে আঘাত হানে। শুরু হয় জনতার চলা।’

সিলেটে বৃটিশ ঐতিহ্যের নিদর্শন এই ব্রিজ। পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ পায়ে হাঁটার সেতু। বড় বড় লোহার কাঠামোয় অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। ১৯৩৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ১৯৩৬ সালে। তৎকালীন আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল কীনের নামে এই সেতুর নামকরণ হয় কীনব্রিজ। ১১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৮ ফুট প্রস্থ ব্রিজ দিয়ে হাঁটার সময় বড় মনোরম দেখায়। নদীর কাব্যময় ঢেউ বয়ে চলে অবিরাম। বুকের মধ্যে ছল ছল করে ঢেউ ছলকায়। কখন পৌছে যাই কবি মন্জিল। ভার্থখলা, খান মন্জিল।

খান মঞ্জিল আমার খালার বাড়ি। মুসলিম খান আমার খালু। তিনি কবি দিলওয়ারের বড় ভাই। বিশিষ্ট ছড়াকার কাদের নওয়াজ খান ও ছড়াকার বদরুল আলম খান আমার খালাত ভাই। কবিপুত্র কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, শাহীন ইবনে দিলওয়ার, কামরান ইবনে দিলওয়ার এবং তাদের ভাই-ভাতিজাসহ অনেকে লেখেন। মান সম্পন্ন লেখ। তবে আমার কাছে মূলত তিনিই প্রধান আকর্ষণ। মনের গভীরে থাকে সুরমা পারের কবি, আমাদের প্রিয় দিলু মাম।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জননন্দিত লেখক কবি দিলওয়ার আমাদের সাহিত্যে দৃঢ়তা ও শক্তিময়তার অভাব অবলীলায় পূরণ করেছেন। তার কবিতা স্বাধীনতা, মানবতা এবং সুবিচার প্রত্যাশায় তীক্ষ্ণ, তীর্য ও উজ্জ্বল। তার কল্পনায় ধর্মীয় উদারতা ও সাম্যবাদ আবার কখনো নৈরাজ্য স্পর্শ করেছে। তবে ভালোবাসা সর্বত্র প্রাধান্য পেয়েছে।

‘সে’ কবিতায় কবি দিলওয়ার বলেন- ‘ভারি মজার মজার কতো কথাই-না সে বলতো/ সে বলতো হাত দুটি নেড়ে নেড়ে, সহাস্যে, সোল্লাসে/ ছাই ছাপা আগুনের মত সেই ক্ষণে সে জ্বলতো/ আমি বুঝতাম বৈকি। আমি বুঝতাম অনায়াসে।/ … তার সেই ক‘টি কথা এই মনে এখনো সরব/ হিটলারের মুন্ডু হাতে আমি যেন মার্শাল জুকভ।’

কবির মুখে কত শত পংক্তিমালা শুনেছি, আজো কানে বাজে। সমাজ বিকাশের চেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা। যে কবিতা সূর্যের মতো সর্বত্রই রশ্মি ছড়ায়। ‘যতদিন বেঁচে আছো ততদিন মুক্ত হয়ে বাঁচো/ আকাশ-মাটির কন্ঠে শুনি যেনো তুমি বেঁচে আছো।’ অথবা ‘মৃত্যুর মিছিলে তুমি জীবনের দীপ্ত তরবারী/ একথা নতুন করে তোমাকে জানাতে হবে নাকি?/ এ-কথারি ঢেউ নিয়ে কখন ছেড়েছে নীড় পাখী/ উন্মুক্ত আকাশ তলে তোমারি বন্দনা শুনি, নারী...সে কথা ভুলোনা তুমি। ভুলো না পাথর চাপা ঘাসে/ তোমারি সৌহার্দে, নারী, ঈশ্বর শিশুর মতো হাসে।

‘তুমি রহমতের নদীয়া, দোয়া করো মোরে হযরত শাহজালাল আউলিয়া’ এসব গান ও কবিতা সিলেটের জনমনে এখনো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। সিলেট বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়েছিলো কবি দিলওয়ারের এই গানটি দিয়ে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে সিলেটের অসংখ্য শিল্পী তার লেখা গান গেয়ে আসছেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে তার লেখনি নিসৃত হয়েছে। করিব কণ্ঠে কতবার শুনেছি- ‘আমিতো কাঠুরে নই, আমি তো চাইনে কেটে নিতে/ ফুলের ফলের উৎস: গাছের সবুজ বাহুগুলি/ চুলোর নারকী ক্ষুধা নেই তো ইচ্ছের চারিভিতে/ নির্বিকার বহ্নিমান পোড়াতে বাসনা শতমূলী।/ আমার একান্ত সুখ বৃক্ষের আদিম সমতায়/ যে-পাখীরা নীড়ভ্রষ্ট, আসুক উল্লাসে তারা ফিরে/ সবুজ সুঠাম যতো বাহুর সহিষ্ণু মমতায়/ শূন্যের বিপুল আর্তি ফিরুক শূন্যের বুক চিরে!/ আমার কুঠার যেই, রইবে সে ক্রোধে চিরকাল/ শ্বাপদসংকুল যতো গহন অরণ্যপানে খাড়া/ অশান্ত কাঁপিয়ে যাবে জীঘাংসু রাত্রির শিরদাঁড়া/ কুঠারের তীক্ষ্ণ ধারে বহমান অনন্ত সকাল!/ ফুলের গন্ধের নদী ফলের নৌকোর খোলে হাল/ বৃক্ষের বাহুতে বসে পাখিরা সংগীতে তোলে তাল।

‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন’ কবিতায় শ্রেণি বিভক্তির বিরুদ্ধে কবির দৃপ্ত উচ্চরণ- ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন যদি অপরাধ হয়/ আমরা কি আজো দিতে পারলাম/ মানুষের পরিচয়?/ ডুবে আছি আজো খন্ডে খন্ডে সাম্প্রদায়িক পাঁকে/ দম্ভদূষিত নাগপাশে বেঁধে/ মানুষের বিধাতাকে।/ প্রতিদিন ভোরে ও-কার সূর্য মর্মরক্তে ভিজে/ আমাদের ঘরে আলো দিয়ে যায়/ বিগলিত হয়ে নিজে?/ ও-কার বাতাস প্রতি নিশ্বাসে বিশ্বজনীন হয়?

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন/ এ তো ভুলবার নয়।/ শুধু মুখে নয় বুকেও ক্ষরিত সাম্প্রদায়িক বিষ/ অঘ্রাণে তাই ব্যথারক্তিম ঐশী ধানের শিষ!/ কতকাল ধরে, বলতে পারি না/ আত্মহনন কাজে/ ব্যস্ত রয়েছি আমরা সবাই। প্রভাত মথিত সাঁঝে।/ কেটে গেল কত পিতামহ আর/ প্রপিতামহের কাল/ বোধির গোড়ায় সার হলো কত বিভেদের জঞ্জাল।

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন/ চিরাচরিতের পথে/ জীবন কখনো চলতে পারে না- নদীর জীবন স্রোতে!/ ঔরসজাত মানবতা চাই/ কালের শুদ্ধসুধা/ রক্তে আমার এই তো ধর্ম/ এই তো মাতৃক্ষুধা।

‘বলে রাখি শোনো, করো নাকো হৈ চৈ/ যতদিন আছে শ্রেণি বিভক্ত জাতি/ আমি কিছুতেই তোমাদের দলে নই।’

নিপীড়িত জনতার সাহসের বাতিঘর গণ মানুষের কবি দিলওয়ার বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সদা সোচ্চার। তার ভাষায়- ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি: পদ্মা তোমার যৌবন চাই/ যমুনা তোমার প্রেম/ সুরমা তোমার কাজল বুকের পলিতে গলিত হেম।/ পদ্মা যমুনা সুরমা মেঘনা/ গঙ্গা কর্ণফুলী/ তোমাদের বুকে আমি নিরবধি/ গণমানবের তুলি!/ কত বিচিত্র জীবনের রং/ চারদিকে করে খেলা/ মুগ্ধ মরণ বাঁকে বাঁকে ঘুরে/ কাটায় মারণ বেলা!/ রেখেছি আমার প্রাণ স্বপ্নকে/ বঙ্গোপসাগরেই/ ভয়াল ঘূর্ণি সে আমার ক্রোধ/ উপমা যে তার নাই!/ এই ক্রোধ জ্বলে আমার স্বজন/ গণমানবের বুকে/ যখন বোঝাই প্রাণের জাহাজ/ নরদানবের মুখে!/ পদ্মা সুরমা মেঘনা…/ অশেষ নদী ও ঢেউ/ রক্তে আমার অনাদি অস্থি,/ বিদেশে জানে না কেউ!’

কবির সত্যিকারের সহযাত্রী আনিসা দিলওয়ার আছেন তার সৃষ্টিশীলতার বড় একটা অংশ জুড়ে। ‘গোটা বিশ্ব আজ প্রিয়তমা’ কবিতায় তিনি বলেন- ‘প্রিয়তমা এসো তুমি যৌথকণ্ঠে শেষ বার বলি/ আমরা বহন করি অলৌকিক মানবতা বোধ/ তাকে রোজ স্নাত করে অতলের জলীয় আমোদ/ তার স্বাদ পেতে চায় আদিম প্রাণের কথাকলি/ উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখি রোদ হাতে নাজিম হিকমত/ ম্যাক্সিম গোর্কির রাত আজো কিনা হয়নি নিঃশেষ/ জননীর কণ্ঠে শুনি বাঁধভাঙ্গা কঠোর আদেশ/ ধ্বংসকে দেখিয়ে দাও সৃজনের ধ্র“পদী হিম্মত/ প্রিয়তমা, মনে রেখো পৃথিবীর সূর্যপ্রদক্ষিণ/ অগত্যা বিশ্রাম নেই আকাঙ্খিত আলোর সফরে/ অনাগত সন্তানেরা রক্তস্রোতে বিচরণ করে/ পশু মানুষের হাতে নয় তারা কখনো অধীন/ প্রিয়তমা তুমি নও, গোটা বিশ্ব আজ প্রিয়তমা/ তার জন্য অনিবার্য বৈপ্লবিক প্রেম-পরিক্রমা।’

ষাটের দশকে দক্ষিণ স্বাধীনতাকামী নেলসন ম্যান্ডেলা যখন জেলে বন্দি, তখন দিলওয়ার তাকে নিয়ে লিখেন- ‘নেলসন ম্যান্ডেলা: একটি আগ্নেয় স্মরণ।’ কবি বিশ্বমানবতার পক্ষে কলম ধরেন ‘আনিসা শুনতে পাও, ‘উহুরু’ ‘উহুরু’ সেই ডাক?/ অগ্নিগোলকের মতো কৃতঘ্ন আঁধার ভেদ করে/ সে-ডাক ছুটন্ত দ্যাখো। রৌদ্র নৃত্য কালের অধরে!/ কৃষ্ণ সাগরের স্রোতে শ্বেতদৈত্য আতংকে নির্বাক/ এবং শুনতে পাও খাচাভাঙ্গা সিংহের গর্জন?/ শানিত থাবায় তার জন্মগত মুক্তির সনদ/ সে হাঁকে অকুতোভয়ে: করবে কে আয় গতিরোধ/ দেখি কার শক্তি কতো। আমি আজ অরাতি দমন/ সেই বজ্রনাদ শুনে, চেয়ে দ্যাখো, ধবল প্যান্থার/ শ্বেতাঙ্গ অসুরবৃন্দ জ্বরার্ত শিশুর মতো কাঁপে/ বিপুলিপ্ত নিকটবর্তী। শাখায় ঝুলন্ত স্বৈরাচার/ অতল তিমির গর্ভে সূর্যকান্ত মণির মতোন/ আফ্রিকা ক্রমশঃ দীপ্ত কন্ঠে কোটি পল রোবসন’।

কেবলমাত্র নেলসন ম্যান্ডেলা নিয়েই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেক বিষয় নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। যেখানে কবিতায় সর্বাগ্রে স্থান পেয়েছে সাম্য, মৈত্রী ও মানবতার অমীয় বাণী।

কবি দিলওয়ারের প্রথম কবিতা ‘সাইফুল্লাহ হে নজরুল’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক যুগভেরীতে। ১৯৫৩ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জিজ্ঞাসা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ সালে বের হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ঐকতান’। এরপর কবি একে একে লিখেন পুবাল হাওয়া (গানের বই, ১৯৬৫), উদ্ভিন্ন উল্লাস (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৬৯), বাংলা তোমার আমার (গানের বই, ১৯৭২), ফেসিং দি মিউজিক (ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৫), স্বনিষ্ঠ সনেট (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৭), রক্তে আমর অনাদি অস্থি (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৮১), বাংলাদেশ জন্ম না নিলে (গ্রবন্ধগ্রন্থ, ১৯৮৫), নির্বাচিত কবিতা (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৮৭), দিলওয়ারের শত ছড়া (ছড়ার বই, ১৯৮৯), দিলওয়ারের একুশের কবিতা (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৩), দিলওয়ারের স্বাধীনতার কবিতা (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৩), ছাড়ায় অ আ ক খ (ছড়ার বই, ১৯৯৪), দিলওয়ারের রচনাসমগ্র ১ম খণ্ড (১৯৯৯), দিলওয়ার-এর রচনা সমগ্র ২য় খণ্ড (২০০০), ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর ডাকে (ভ্রমণ, ২০০১), দুই মেরু, দুই ডানা (কাব্যগ্রন্থ ২০০৯)৷

সাহসী শব্দ সৈনিক কবি দিলওয়ারের ‘চলমান শব্দাবলী’র মতো কলামগুলো দেশে-বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তার গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘সাদা কালো বিড়াল’ এবং ‘ইলিশ মাছের কাঁটা’। মঞ্চ নাটক হচ্ছে ‘আসল মুক্তিযুদ্ধ এবং রুধিরাক্ত কাল’।

ইংরেজি রচনা ও অনুবাদেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন কবি দিলওয়ার। অনুবাদ করেছেন মার্কিন কবি নরমান, কোরীয় লেখক মোগউ, জার্মান কবি কাল ক্রালাউ, রুশ কবি আইওন, ইতালিয়ান কথা সাহিত্যিক মোরাকিয়ান সহ বিখ্যাত লেখকদের বই।

কবি ক্লান্তিহীন উদ্যম, দুর্বার উদ্দীপনায় ছিলেন গতিশীল ও প্রত্যাশাময়ী। আমার 'ছায়াপ্রিয়া' উপন্যাস সম্পর্কে গণমানুষের কবি দিলওয়ার লিখেন- ‘বোধশক্তি অর্জনের পর থেকেই মানুষ যে তিনটি অমূল্য উপকরণকে পাথেয় করে নানাভাবে নিজের প্রকাশ ঘটাতে থাকে সেই ত্রয়ী হচ্ছে মন, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি। মানুষের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জগতে যে সব বিস্ময় স্তরে স্তরে বিন্যস্ত রয়েছে, তাদের একটি হচ্ছে সাহিত্য। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে কবিতার স্থান সর্বোচ্চ হলেও উপন্যাসের শুরু প্রায় দেড়শ বছর থেকে। সমালোচকেরা এক্ষেত্রে প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য করেন যে গ্রন্থটিকে তার নাম "আলালের ঘরের দুলাল"। অতি অল্প সময়কালের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের ধারাটি বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করে। আমার এই অতীত স্মৃতি চারণের মূলে একজন তরুণের লেখা একটি উপন্যাস 'ছায়াপ্রিয়া'।

একান্ত স্নেহাস্পদ উপন্যাসিক সাঈদ চৌধুরী তার প্রথম গ্রন্থটি নিয়ে পাঠক সমাজে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছেন। এই উৎসাহ ব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, সাঈদ চৌধুরী তার লেখায় পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থার মানসিক সুখ-দুঃখকে অনেকটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে এটি এক প্রাচুর্যময় সম্ভাবনার ঝলকানি। পরিমিত কলেবরের উপন্যাসটিতে লেখক ভাবনা একাত্ব হয়ে আছে। কেন জানি মনে পড়ে যায় আমার প্রথম যৌবনে পঠিত একটি বিদেশী উপন্যাসের কথা। সেই উপন্যাস রচয়িতার বাড়ি ছিল নরওয়ের এক গ্রামাঞ্চলে। তিনি হলেন বিশ্ব বিখ্যাত ন্যুট হামসুন। উপন্যাসের নাম হাংগার। যদিও বিষয় বস্তুর তুলনায় সাঈদ চৌধুরী ও হামসুনের মধ্যে ব্যবধান বিপুল। তা সত্ত্বেও আত্মপ্রকাশের প্রশ্নে দু'জনের মধ্যে কোথাও যেন একটি মিল রয়েছে।

আমি খুবই আনন্দিত যে, 'ছায়াপ্রিয়া' উপন্যাসটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আমি আশা করবো সাঈদ চৌধুরী পাঠকদের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্যতার যে সম্মান অর্জন করেছেন, আগামীতে আরো সতর্কতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে নতুন নতুন সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্য পথে এগিয়ে যাবেন। প্রসঙ্গতঃ আমরা অবশ্যই স্মরণ করবো যে, প্রতিটি উন্নত দেশ তার অস্তিত্বে ধারণ করে আছে নিজ নিজ সাহিত্য-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। আমি লেখকের ফলপ্রসূ দীর্ঘায়ু কামনা করি। -দিলওয়ার, ভার্থখলা, সিলেট।’

কবি দিলওয়ার ১ জানুয়ারি ১৯৩৭ সালে সিলেট শহরের দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলাস্থ পৈতৃক নিবাস খান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী হাসান খান এবং মাতা মোছাম্মৎ রহিমুন্নেসা। পুরো নাম দিলওয়ার খান। যদিও তিনি পারিবারিক ‘খান’ পদবি কখনো ব্যবহার করেননি। রক্ষণশীল পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙে কবি দিলওয়ার সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিলেন। সকল চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে কবি দিলওয়ারের চেতনায় ছিল শুধুই দেশপ্রেম। মানুষকে ভালোবেসে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।

‘আমার মৃত্যুর পর’ শীর্ষক লেখা কবিতায় কবি দিলওয়ার বলেছেন, ‘আমার মৃত্যুর পরে যদি তুমি/ কখনো খুঁজতে যাও এই মর্মভূমি/ মনে রেখো তবে/ বাংলার হৃদয় নিয়ে কেটেছে/ আমার দিন/ প্রতীচ্যের মুক্তির গৌরবে।’

২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর বার্ধক্যজনিত কারণে ইহকাল ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এই কবি। যার ভালোবাসা ছিল কর্মচঞ্চল মানুষের সাথে। জনতার বহমান কর্মধারার সঙ্গেও। তিনি একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব। ঐশ্বর্যময় কবি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মানবতার মুক্তিকন্ঠ, গণমানুষের কবি দিলওয়ারকে।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী। সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

   

ভাষার লড়াই কালে কালে



সায়েম খান
ভাষার লড়াই কালে কালে

ভাষার লড়াই কালে কালে

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন ডেনমার্কের ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে একটি সুপ্রাচীন, সুমিষ্ট ভাষার প্রচলন ছিল। ভাষাটির নাম ফ্যারোইজ। ড্যানিশ জাতি আজ থেকে ৫০০ বছর আগে সেই দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের উপর ভাষাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের উপর ড্যানিশ ভাষা চাপিয়ে দিল। তাদের গির্জা, উপাসনালয় কিংবা পাঠশালাগুলোতে ফ্যারোইজ ভাষা বাদ দিয়ে ড্যানিশ ভাষা ব্যবহার আইন বলে বিবেচিত হল। শুরু হল ফ্যারোইজদের সাথে ড্যানিশদের ভাষাগত বিবাদ। সেই থেকে আজ অবধি ফ্যারোইজরা তাদের এই ভাষাকে আলাদা করে চর্চা ও লালন করে আসছে। ফ্যারোইজ ভাষার রয়েছে নিজস্ব শব্দ। এখনও সংযোজিত হচ্ছে নতুন শব্দগুচ্ছ। গল্প, গান আর নাচে সমৃদ্ধ একটি ভাষা ফ্যারোইজ। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা তাদের প্রাণের ভাষাকে আজও মিশ্রিত হতে দেয়নি অন্য ভাষার সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে। একবিংশ শতাব্দীতেও লড়াই করে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করতে ফ্যারোইজ ভাষার মাধ্যমে।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, আর্য সংস্কৃতির বিস্তার এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের সময়ে সংস্কৃত ভাষা ছিল শক্তিশালী মাধ্যম। আজ থেকে ৪০০০ থেকে ৫০০০ বছর আগে ইন্দো-আর্য গোষ্ঠী থেকে সংস্কৃত ও আবেস্তীয় ভাষার উৎপত্তি। এই দুটি ভাষা কালের পরিক্রমায় দুই ভাগে বিভক্ত হতে থাকে কিছু শাব্দিক অর্থের বিভেদের কারণে। উদাহরণস্বরুপ, সংস্কৃতে "দেবা" শব্দের অর্থ যেখানে দেবতা, সেখানে আবেস্তীয় ভাষায় "দেবা" শব্দের অর্থ দাড়ায় "শয়তান"। যা দুই জাতের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব একটি বড় কারণ হয়ে দাড়ায়। ইন্দো ও আর্যদের ভাষাগত ও জাতিগত উৎপত্তির এক ও অভিন্ন সংযোগ থাকার পরেও শুধুমাত্র ভাষাগত সমস্যার কারণে ইন্দো ও আর্য নামক দুটি স্বাতন্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ঠিক একই ধারায়, ভারতীয় উপমহাদেশে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন যখন হয়, তখন থেকেই সামাজিকভাবে গুরুত্ব হারিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে ভারতবর্ষের আদিমতম "সংস্কৃত"ভাষা। এখন পর্যন্ত এই ভাষাটি পূরাণ, বেদ, উপনিষদ ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রের ভাষা হিসাবে "সংস্কৃত" বিবেচিত। মোঘলরা যখন ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু করতে থাকল, তখন থেকেই সংস্কৃত ভাষার সামাজিক প্রচলনের আবেদন কমতে থাকে। ঠিক একই ভাবে, বৃটিশরা যখন মোঘলদের হটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের শাষনামল শুরু করল তারাও শুরুর দিকে তাদের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে প্রচলন থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষাগত জটিলতার কারণে ফার্সীকে বাদ দিয়ে ইংরেজীর প্রচলন শুরু করেছিল এবং তখন থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মোঘলদের সম্ভ্রান্ত ফার্সী ভাষা বিলুপ্তি ঘটতে থাকে।

পৃথিবীতে ঔপনিবেশিক যুগের প্রারম্ভ থেকে আমরা দেখে এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে ক্ষমতা ও রাজ্য দখলের পর ক্ষমতা দখলকারী শাসকশ্রেণী, পরাজিত আদি জনগোষ্ঠীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। শাষকশ্রেণীর ধারণা, ক্ষমতা ও দখল চিরস্থায়ী করার জন্য সবার আগে নিশ্চিহ্ন করতে হবে শাষিত প্রজাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার যেসব দেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার ছায়াতলে ছিল, সেসব দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার চর্চা ও প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। যারা ইংরেজি জানত ও শিখত তাদের সামাজিক ভাবে গুরুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। তৎকালীন বৃটিশ-বেনিয়াদের সৃষ্ট এলিট শ্রেণীর সাথে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের মেলামেশা ছিল খুব সহজ। ঠিক তেমনি, ফরাসি ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে অদ্ধাবধি ফরাসি ভাষার আধিপত্য বিরাজমান।

প্রাচীন বুলগেরীয় ভাষার প্রাচীন যুগ বিস্তৃত ছিল ৯ম থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত। ১৬শ শতকের শুরুতে বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় এই ভাষার আধুনিক যুগ। ইউরোপের অতি প্রাচীন এই ভাষা নিয়েও ১৮শ শতকে শুরু হয়েছিল আন্দোলন সংগ্রাম। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বুলগেরীয় জনগণের সংগ্রাম এখনও ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুতে অসমীয় ভাষাকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করার পর শুরু হয় আন্দোলন বিক্ষোভ। ১৯৬১ সালের ১৯মে ভাষার জন্য এই বিক্ষোভে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষা বিপ্লবী। ১১ বিপ্লবী শহীদের প্রাণ উৎসর্গের কারণে এখনও ১৯ শে মে’কে আসামে ভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন ও আদি ভাষা "বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী" ভাষা যেন বিলুপ্তির প্রতিবাদে ১৯৯৬ সালে ১৬ই মার্চ শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ। তাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় ভাষা শহীদ বলা হয়ে থাকে। ভারতে ভাষার জন্য এসব আত্মত্যাগের কারণে বর্তমানে ২২টি ভাষাকে সরকারি ভাষা ও ৪টি ভাষাকে ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। আসামের বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সুদেষ্ণা সিংহের মহান আত্মত্যাগের কারণে ১৬ মার্চ আসাম জুড়ে একটি স্মরণীয় দিন হিসাবে পালন করা হয়।

১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির একটি ইহুদি সাহায্যকারী সংস্থা যার নাম ছিল হিলফসভেরেইন ডের ডিউচচেড জুডেন। এই সংস্থাটি তৎকালীন ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের জন্য একটি টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সেই জার্মান সংস্থা শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইহুদি ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেয় জার্মান ভাষা। তখন ইহুদীদের শিক্ষার ভাষা কি হবে সে নিয়ে জার্মান ভাষা সমর্থনকারী ও হিব্রু ভাষাভাষী ইহুদীদের মধ্যে একটি প্রকাশ্য বিবাদ তৈরি হয়। ইসরাইলের হাইফা সিটি মিউজিয়ামে এ ঘটনা নিয়ে স্বাতলানা রেইনগোল্ড নামে এক চিত্রশিল্পী ২০১১ সালে "ভাষার যুদ্ধ" নামে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।

ভাষার জন্য পৃথিবীতে প্রথম গুলিবর্ষণ হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পূর্ব-বাংলার সরকারি ভাষা তখন থেকেই মুহুর্মুহু প্রতিবাদের উঠতে শুরু করল। প্রতিবাদ-সংগ্রামের এক পর্যায়ে বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয় সালাম, জাব্বার, রফিক, বরকতের মত তাজা প্রাণ। সেই মর্মস্পর্শী ঘটনাকে সাক্ষী রেখে এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজও বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস"।

ভাষা এমন এক অধিকার যা কখনো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়। ভাষা নিয়ে বিভেদ, বিবাদ, প্রতিবাদ, সংগ্রাম হয়েছে দেশে দেশে, কালে কালে। একটি সভ্যতার ক্রমবিকাশে ভাষা অপরিহার্য। ভাষা হল মানবসভ্যতার স্পন্দন। ভাষা নিয়ে লড়াই নয়। ভাষা হোক মুক্তি ও মানবতার জন্য। ভাষা হোক ভালবাসার জন্য।

;

বইমেলায় তমসা অরণ্যের বই- নাই সন্তানের জননী

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ উপলক্ষে প্রকাশিত হলো কবি ও লেখক তমসা অরণ্যের গল্পের বই – নাই সন্তানের জননী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স ও স্নাতকোত্তর কবি ও লেখক তমসা অরণ্য আপনমনে ও নিভৃতে সাহিত্যচর্চা করেন।

তার ফেসবুক ওয়ালে ঢুকলেই দেখা যায়, নিজের মনের মগ্নতায় ডুবে আপনমনে লিখে চলেন ফাউন্টেন পেনে। তার সাহিত্য চর্চা ও শব্দচয়নে মুন্সিয়ানার ভাব। মনে হয়, রবিঠাকুর, জীবনানন্দ দাশের মতো আত্মমগ্নতায় ডুবে রয়েছেন।

রাতে নিভৃতে দিনের পর দিন লিখেছেন কালো কালির আঁচড়ে একেকটি কবিতা কিংবা মনের কোনো ভাবনা। পাঠক মাত্রই বুঝতে পারেন কবি ও লেখক তমসা অরণ্য বেখেয়ালে লিখে চলেছেন ঘাসফড়িং বা রাতের আঁধারে জ্বল জ্বল করা মাকড়শার জালে ধ্যানমগ্ন মাকড়শার মনোকথন। মানুষের ভাবনাকে ছাড়িয়ে লেখক নিয়ে চলেন এক অনাঘ্রাত পৃথিবীতে। প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষই শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে তমসা অরণ্যের লেখার উপজীব্য!

সে রকমই সাধারণ মানুষের জীবনকথা উঠে এসেছে লেখক তমসার ‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থটিতে। বইয়ের উপজীব্য সম্পর্কে লেখক তমসা বলেন, একজন লেখকের থাকতে হয় দেখার চোখ, লেখার হাত, অনুভূতিসম্পন্ন হৃদয় ও কল্পনাশক্তির জয়ের সক্ষমতা।

তিনি বলেন, এগুলোর সূত্র ধরেই যাতে মনোযোগ দিয়েছি, তা ছিল- মানুষ ও সমাজপাঠ। তারই পথ ধরে আমার গল্পগুলোর ‘সব চরিত্র কাল্পনিক নয়’, বরং ‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থের প্রতিটা গল্পেরই কোনো না কোনো চরিত্র বাস্তব এবং কাছ থেকে কিংবা দূর থেকে দেখা। আর কিছু না হোক, অন্তত চরিত্রগুলোর সঙ্গে আড্ডা দিতে হলেও বইটি পড়া যেতেই পারে।’

‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন আইয়ুব আল আমিন। প্রকাশ করেছে অনুপ্রাণন প্রকাশন। অমর একুশে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে স্টল নম্বর ৮৫-৮৬। ২৫% ছাড়ে বইটির দাম পড়বে ২৬২ টাকা।

তমসা অরণ্যের বই প্রকাশের পর তার এক বন্ধু ফেসবুকে মন্তব্য করে লিখেছেন- তমসা অরণ্য খুব নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ মানুষ, যার ফলে ওর বইয়ের কথা আমি নিউজফিড থেকে জানতে পারি অর্থাৎ সে আমাকেও ব্যক্তিগতভাবে জানায়নি।

এমনকি বইয়ের প্রচারণায় ও বলছে, বই হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে ভালো মনে হলে তবেই কিনতে! আমি নেক্সট টাইম মেলায় গেলে তার বইটা কিনবো। নিজের বান্ধবী বলে না। প্রচ্ছদের বেড়ালের ছবি আর বইয়ের নাম দেখে একটা গল্প অনুমান করতে পারছি, এই আগ্রহ থেকে। তমসা অরণ্যের বইয়ের জন্য অশেষ শুভ কামনা রইলো।"

তমসা অরণ্যে লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে যে কেউ তার ফেসবুক ওয়ালে ঢুঁ মারতেই পারেন। তার লেখার পরিমিতিবোধ ও অনিন্দ্য সুন্দর হাতের লেখার সঙ্গেও পরিচয় ঘটবে পাঠকের। তমসা অরণ্যের ফেসবুক আইডি- Tomosha Aronnya (তমসা অরণ্য)

;

বইমেলায় এক সন্ধ্যা

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
বইমেলায় এক সন্ধ্যা

বইমেলায় এক সন্ধ্যা

  • Font increase
  • Font Decrease

মিসবাহ জামিল ভীষণ সিদ্ধান্তহীনতায়। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী, হাছন রাজা; অন্যদিকে পারিবার। না, আদর্শিক ব্যাপার এখানে নাই; একদম নাই। ওসমানী-হাছন রাজার মোচ তাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে, আবার এই বয়সে মোচ নিয়ে তিনি অনেকটা বিপত্তিতেও। মানুষের মতো দেখতে ঠিকঠাক, কিন্তু পরিবারের দাবি তাকে ‘মানুষ’ হতে হবে। এবং মানুষ হওয়ার অন্যতম শর্ত মোচ কাটতে হবে!

তুমুল সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা মিসবাহ জামিল এক রাতগভীরে ফেসবুকে লিখে ফেললেন, ‘‘ভাবছিলাম, দাড়ি মোচ শেভ করব। কিন্তু বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর গোঁফ দেখে মনে হচ্ছে মোচটা রাখা সুন্দর। কিন্তু কী করব, সামনে পারিবারিক একটা অনুষ্ঠান আছে। আমাকে যে 'মানুষ' সাজতে হবে!!’’ ভোরের আগে আমিও লিখে বসলাম সেখানে—‘‘পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান থাকলেই কেবল আমি মোচ রাখি। এর পর পরই কেটে দিই। মোচওয়ালা কবির মানে সামনে-পিছে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ’’। উদ্দেশ্য কৌতুক, সঙ্গে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বটিকা। কাজ হয় কি, হয়নি—এনিয়ে আর ভাবিনি।

বইমেলায় ঢুকতেই হঠাৎই চোখে পড়ল মিসবাহ জামিলকে। 'মানুষ খাওয়ার পদ্ধতি' আর 'রাশেদা মোকাম' নামের দুইটা বই তার পড়েছি। ভালো কবিতা লিখেন। বয়স কম। তবে এই কম বয়সেও কবি-মহলে তার পরিচিতি বেশ। তাকে অবাক করে দিয়ে মোচ নিয়ে আঁতকা গল্প জুড়ে দিলাম। তিনি বুঝতে পারেননি কী কারণে হঠাৎ মোচ-প্রসঙ্গ আর আমার এমন আন্তরিকতা। একটা সময়ে ঠিক আমাকে চিনে ফেললেন। অনেক ‘মোটা’ হয়ে গেছি আমি। শুধরে দিয়ে বললাম মোটা নয়, বলো—‘বিশাল’। বিশাল মানে বিশাল। এই যেমন বিশাল কবির ভাই। বুনন সম্পাদক খালেদ উদ-দীনও একই কথা বললেন; উত্তরও আমার একই! ‘বিশাল’ কবির অথবা কবির ভাই কেন? বাক্যের প্যাঁচ ভাঙিয়ে দিয়ে বললাম—যে সমাজে যাবে সেখানে যদি বলো বিশাল কবির, তবে ওই সমাজের মানুষেরা আকৃতি নয়, অবস্থান দিয়ে মাপবে বিশালত্বের পরিধি। কবি-সমাজে বিশাল কবি, সাংবাদিক-সমাজে বিশাল সাংবাদিক; এমন। সিরিয়াস কথা নয় যদিও, তবু বলা!

খালেদ উদ-দীন বুনন নামের একটা সাহিত্যের ছোটকাগজ প্রকাশ করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। সারাদেশে লিটলম্যাগ আন্দোলনে ভাটা পড়লেও খালেদ উদ-দীন এটা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবারের বইমেলায় তিনি প্রকাশ করেছেন এর ‘যুদ্ধ ও আগ্রাসন-বিরোধী সংখ্যা’। পৃষ্ঠাসংখ্যা সহস্রাধিক। বিশাল কলেবরের এই সংখ্যায় যুদ্ধ ও আগ্রাসন নিয়ে অনেকগুলো লেখা স্থান পেয়েছে। এখানে আমারও একটি লেখা আছে। প্রুফরিডারের অতি-আগ্রহে আমার লেখাটি পরিচিতি হারিয়েছে বলে তিনি আমার হাতে প্রকাশিত সংখ্যাটি তোলে দিতে পারেননি। এনিয়ে তার খানিকটা দুঃখবোধ আমাকে পীড়িত করেছে বলে কথা বাড়াইনি। এরবাইরে জেনেছি, এবারের বইমেলায় তিনি তার মালিকানাধীন বুনন প্রকাশনী থেকে অনেকগুলো বই প্রকাশ করেছেন। প্রকাশনা সংস্থাটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বলে তার মাঝে সন্তুষ্টি আছে, এবং এই কাজকে তিনি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতেও চান।


কথা হলো, সমসাময়িক কবি ও কবিতা নিয়ে। খালেদ উদ-দীন অনেকটাই হতাশ এই সময়ের কবি ও কবিতা নিয়ে। এ সময়ে ভালো লেখালেখি তেমন হচ্ছে না বলে মন্তব্য করলেন। জানালেন কারণও। বললেন—বেশিরভাগ কবির মধ্যে এখন আর দ্রোহ নেই, আছে আপোষকামি মনোভাব। তাই দ্রোহের কিছু বেরিয়ে আসছে না। ভালো কবিতাও হচ্ছে না। আমি-আমি আছে এখনো, কিন্তু এই আমি-আমি শেষ করে দিচ্ছে অনেককে, বললেন তিনি।

কথা বলছি, গান শুনছি। শুনছি আবৃত্তিও। গোলজার আহমদের আবৃত্তি অনেকদিন পর শোনা হলো। ব্যস্ত সাংবাদিক বলে আবৃত্তিতে মন থাকলেও সময় থাকে না এখন তার। শ-কয়েক দর্শকদের একাংশ যারা মঞ্চে মনোযোগী ছিল তারা গ্রহণ করল ভালোভাবেই। চোখে চোখ পড়ল মৃণাল কান্তি দাসের। দেখে মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকেই চোখ তার। অপেক্ষার। বইমেলায় গেলে মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে আমার দেখা হয় না, এমন কখনো হয়নি। এবারও বইমেলায় যাওয়ার সময়ে ভেবেছি আর যাই হোক মৃণালের সঙ্গে দেখা হবে আমার। আমার পছন্দের অন্যতম মানুষ। ভালো লেখালেখি করেন। তার অনেকগুলো বই আমি পড়েছি। মৃণাল কান্তি দাস প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মাছরাঙা প্রকাশনের কর্ণধার। থাকেন মৌলভীবাজারের বড়লেখায়। গণিতে স্নাতকোত্তর মৃণাল পেশাগত জীবনে স্কুল-শিক্ষক।

যতবার মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ততবারই লেখালেখি নিয়ে আলাপ হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নিজে লেখক বলে অন্য সকলের লেখালেখি নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ। এবারের বইমেলায় তার প্রকাশনী করেছে ৩৭টি বই। জানালেন এর ত্রিশের বেশি সিলেট বিভাগের বাইরের লেখকদের বই। বইয়ের বিষয়েও রয়েছে বৈচিত্র্য। আমার ছেলের বয়স দশে পড়েছে জেনে তার লেখা দুটো ছোটোদের বই দিয়ে বললেন—রাইআন বইগুলো পড়ে যেন বলে কেমন লাগল তার। ছোটোমানুষ তাই নির্মোহ মন্তব্য করবে। রাইআনকে বইগুলো দিলাম। সে খুশি হলো। তার পড়ার আগেই রাইআনের মা বই পড়ে ফেলেছেন।

মৃণাল কান্তি দাসের একটা বই ‘মহাকাশ বিজ্ঞানের গল্প—ছোটো মামার রহস্যময় এলিয়েন’। বইয়ের শুরুটা এভাবে—‘‘স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই মিতার মনটা আনন্দে নেচে উঠল। ছোটোমামা এসেছেন। ছোটোমামা বেড়াতে এলে একটা না একটা মজার ঘটনা ঘটবেই। গতবার যখন এসেছিলেন তিনি একটা ভুত ধরেছিলেন।’’ আগ্রহ-জাগানিয়া নিঃসন্দেহ। মৃণাল জানালেন, পাঠ্যবইয়ে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কেও আছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিশুদের মহাকাশ সম্পর্কে জানাতে কল্পে-গল্পে তিনি বলতে চেয়েছেন। দেড় ফর্মার বইটিতে চমৎকার অলঙ্করণ শিশু ও অনতি-তরুণ পাঠকদের আকৃষ্ট করবে বলে আমার ধারণা জন্মেছে।

আয়াজ বাঙ্গালী নামের একজন লোকগান রচয়িতা রয়েছেন। তার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখায়। জনপ্রিয় লোকগান শিল্পী আশিক আয়াজ বাঙ্গালীর ‘চৌদ্দ নম্বর বেয়াক্কল’ শিরোনামের একটা গান করেছেন। এই গানটি তুমুল জনপ্রিয়। চৌদ্দ ধরনের বেয়াক্কল নিয়ে এই গান। ‘চৌদ্দ নম্বর বেয়াক্কল’ শিরোনামে একটি বই গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন মৃণাল কান্তি দাস। বইটি হাতে নিতেই মৃণাল জানালেন, এক জনপ্রতিনিধি ফটোসেশনে এসে এই বই নিয়ে ছবি তুললেন। এরপর হঠাৎই বইয়ের শিরোনাম দেখে তৎক্ষণাৎ হাত থেকে বইটি রেখে দিলেন। বললেন, অন্য আরেকটি বই দিতে। তারা বই দিলেন, তিনিও ছবি তুলে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে অবশ্য যারা তার এবং ‘চৌদ্দ নম্বর বেয়াক্কল’ শিরোনামের বইয়ের ছবি তুলেছেন তাদেরকে ছবি মুছে দেওয়ার নির্দেশ কিংবা অনুরোধ করে যান। মৃণাল কান্তি দাসের মুখ থেকে এসব জেনে বইটি হাতে নিয়ে ছবি তোলার ইচ্ছা হলো। মনে হলো, লাইনে ১৪ জনকে দাঁড় করিয়ে নিজে ১৪ নম্বরে থেকে বইটি হাতে নিয়ে ছবি তুলি। সেটা হয়নি শেষমেশ; এত এত মানুষের ভিড়ে ঠিক ১৪ জনকে জোগাড় করা কঠিন বৈকি!

মাছরাঙা প্রকাশনের স্টলে বসে যখন আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন শিশুদের নিয়ে একাধিক অভিভাবকের আগমন লক্ষ্য করলাম। নেড়েচেড়ে বই দেখলেন অনেকেই। বইও নিলেন কেউ কেউ। আমি তাকে বললাম, আপনি ছোটোদের নিয়েই লিখুন কেবল। কারণ এই শিশুসাহিত্যে আমাদের অপূর্ণতা অথবা বিষয়-বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। মৃণাল জানালেন, বড়লেখার মতো প্রান্তিক অঞ্চলে তিনি একটা বইয়ের দোকান খুলেছেন। ঢাকায় যেমন পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র তেমনই। উদ্দেশ্যও জানালেন। বললেন, প্রান্তিক অঞ্চলের লাইব্রেরিগুলোতে এখন আগের মতো বই পাওয়া যায় না। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে খুব কমই বই দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেটও থাকে কম। তিনি মূলত বইয়ের এই কেন্দ্র খুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করে। কম দাম দিয়ে হলেও তিনি প্রতিষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানে বই ছড়িয়ে দিতে চান। এখানে তিনি লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছেন না।

মৃণাল বললেন, আমার একটা বই তিনি করতে চান। জানালাম, আমি বই করি না মূলত প্রকাশকের দিক চিন্তা করে। আমি যে ধারায় লেখালেখি করি সেটা জনপ্রিয় ধারার নয়। ২০১৪ সালের পর থেকে বই আমি করিনি। আমার ধারণা আমার লেখা বইয়ের ক্রেতা সংখ্যা কম; চাই না ক্ষতির মুখে ফেলতে কোন প্রকাশককে। মৃণালের কথা, লাভক্ষতির চিন্তা করছি না। আগামী বইমেলায় একটা বই তিনি আমার করবেনই। কথা ও-পর্যন্ত থাকল। এরই মধ্যে বার্তা২৪.কমের স্টাফ রিপোর্টার মশাহিদ আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। চমৎকার মানুষ, শেখার প্রবল আগ্রহ। বয়সে তরুণ হলেও এই ছেলেদের এই আগ্রহকে কাজে লাগানো জরুরি বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সমস্যার জায়গা একটাই সিলেটের মতো শহরে দিকনির্দেশনা এবং সার্বিক সহায়তার যে জায়গা সেটা অনেকেই পায় না। মশাহিদের সঙ্গে আলাপে মনে হয়েছে সুযোগ পেলে তার পক্ষে সম্ভব অনেক দূর যাওয়া।

ইয়াহইয়া মারুফ, মাসুদ আহমদ রনি, আনিস মাহমুদ, হয্রত বিনয় ভদ্র, সামসুল আমিন, গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, রণদীপম বসু, তারেক অণু, নাবিল এইচ, শুভ, জফির সেতু, এনামুল কবির, মালেকুল হক, মোস্তাক আহমাদ দীন, রাজীব চৌধুরী, সুফি সুফিয়ান, অপূর্ব শর্মাসহ আরও অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর, আবার অনেকের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়েছে। পরিব্রাজক তারেক অণুকে বললাম—আপনি বিশ্ব দেখেন, আর আমরা আপনাকে দেখি। রণদীপম দা সিলেট ফিরেছেন জেনে ভালো লেগেছে। জানালেন, আগের নাম্বারেই আছেন। তিনি অবাক হয়ে আছেন কীভাবে এতদিন ঢাকায় থাকলেন?

বলে রাখা দরকার এই বইমেলা বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৪ নয়, এটা সিলেটের বইমেলা। প্রথম আলো বন্ধুসভা কবছর ধরে সিলেটে নিয়মিতভাবে এই বইমেলার আয়োজন করছে। একটা পত্রিকার একটা পাঠক সংগঠনের আয়োজনে হলেও দিন দিন এ মেলার শ্রী বৃদ্ধি পাচ্ছে; আগ্রহী করছে পাঠককে-লেখককে।

যেখানে মানুষ, সেখানেই বই পৌঁছাক। ঘরে-ঘরে বই গেলে এ সময়ের পাঠক না হোক, কোন একটা সময়ের পাঠক সে বই পড়বেই!

;

ইতিহাসবিদ ফরিদ আহম্মদ ও অভিনেতা আহমেদ রুবেলের স্মৃতি রক্ষার দাবি



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অধুনা ভাওয়ালের (বর্তমান গাজীপুর) পথিকৃত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. ফরিদ আহম্মদ ও শক্তিমান অভিনেতা আহমেদ রুবেলের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তাদের স্বজন ও অনুরাগীরা। গাজীপুর জেলার অকাল প্রয়াত এই ২ কৃতি সন্তানের স্মরণে শনিবার অনুষ্ঠিত নাগরিক স্মরণসভায় এই দাবি জানানো হয়। গাজীপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই স্মরণ আলোচনায় যোগ দেন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, প্রয়াত গবেষক এবং অভিনেতার পরিবারের সদস্য ও অনুরাগীরা। 

‘কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস’ গবেষক ও স্থানীয় দৈনিক গণমুখ সম্পাদক অধ্যাপক আমজাদ হোসেনের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় বক্তারা ইতিহাসবিদ ড. ফরিদ আহম্মদ সম্পর্কে বলেন, ঐতিহাসিক ভাওয়াল পরগণার পরিধিবহুল যে ইতিহাস তা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে এনেছেন ফরিদ আহম্মদ। প্রাচীন ভাওয়াল জনপদ থেকে আধুনিক গাজীপুর সম্পর্কে ধারণা পেতে ড. ফরিদ আহম্মদের গবেষণা গ্রন্থই এখন পর্যন্ত প্রণিধানযোগ্য ও অবিকল্প হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। তাঁর অকাল প্রয়াণে গাজীপুরে ইতিহাসচর্চায় এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। 

বক্তারা আরও বলেন, আগামীর গাজীপুরে জ্ঞানভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে ড. ফরিদ আহম্মদ ও অভিনেতা আহমেদ রুবেলের মতো কৃতি পুরুষদের স্মরণীয় করে রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্বজন ও অনুরাগীদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে থাকা এই দুই বিশিষ্টজনের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, গাজীপুর মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণসহ তাদের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে নিতে নানামূখি উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বক্তারা। 

বাংলাদেশ-ভারত ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরষদ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন অন্যস্বর’র যৌথ আয়োজনে এই নাগরিক স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন- ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অসীম বিভাকর, বাংলাদেশ-ভারত ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, কবি অবু নাসির খান তপন, অভিনয় শিল্পী আশরাফ হোসেন টুলু, ইনাম সারোয়ার বেণু, অন্যস্বর’র সভাপতি এবং দৈনিক মুক্ত সংবাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কবি সৈয়দ মোকছেদুল আলম লিটন, গাজীপুর প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি এম এ সালাম শান্ত, কবি সৈয়দা নাজমা বেগম, কবি ও লেখক রিপন বাসার, অভিনয় ও আবৃত্তি শিল্পী অ্যাডভোকেট মোক্তাদীর হোসেন, নৃত্য প্রশিক্ষক আশরাফী ফরিদ হোসেন, সাংবাদিক এম এ ফরিদ, তবলা শিল্পী সৈয়দ আবু আল মামুন, অভিনয় শিল্পী ও সংগঠক খোরশেদ আলম রুবেল, শিক্ষক মাধব মন্ডল, কবি মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান প্রমুখ।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি গাজীপুর এর নাট্য প্রশিক্ষক খন্দকার রফিকের সঞ্চালনায় এই নাগরিক স্মরণসভা শেষে প্রয়াত ফরিদ আহম্মদ ও আহমেদ রুবেলের আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

;