বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

গভীর অবসাদ থেকে স্যাটায়ারের সৃষ্টি হয়। অবসাদকে কানাডার পশ্চিম অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রড মার্টিন সৃষ্টিশীলতার যোগ্য অস্ত্র বলেছেন। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মার্টিন অবসাদ ও হাস্যরসের বিভিন্ন ধরন (আহ্বান পর্যায়) নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং প্রচুর তথ্য যোগাড় করেছেন প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হাস্যরসের নানা ভূমিকা নিয়ে। মার্টিন চার ধরনের স্যাটায়ারের কথা জানিয়েছেন—১) অনুমোদনকারী : একটি “সামাজিক লুব্রিকেন্ট (তেল জাতীয় দ্রব্য)” হিসাবে হাস্যরসকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন পার্টি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সমাবেশে পরিবেশের উন্নতি করা। (২) আত্ম-উন্নতি : যা অবসাদের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য হাস্যরসের ওপর নির্ভর করে, এবং স্থিতিস্থাপকতা একটি ধরন। (৩) আক্রমণাত্মক : যার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা অধিকারের অনুভূতি বজায় রাখার জন্য তিক্ততা এবং অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল শব্দসমষ্টি ব্যবহার করা। (৪) আত্ম-পরাজয় : কৌতুকের আড়ালে নিজেকে ছোট করা, এবং যা কয়েক দশক ধরে কৌতুক নামে চলে আসছে।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার গুরুত্বপূর্ণ বই ‘উইট অ্যান্ড ইটস রিলেশন টু দা আনকনশ্যাস’ বইয়ে বলছেন, “বেশিরভাগ সময় সৃষ্টিশীল মানুষ হাস্যরস ব্যবহার করেন পরোক্ষভাবে নিজেদের এমন অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য যা অচেতন মন অন্যভাবে প্রকাশ করতে বাধা সৃষ্টি করে।” একটি ভালো উদাহরণ হলো ব্যঙ্গ, যার নির্ধারণ ফ্রয়েড সঠিকভাবে করেন প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষরূপে। তাঁর মতে, “কৌতুক আমাদের চেপে রাখা অনুভূতিগুলিকে (যেমন অভিযোগ বা হিংসা) উপরে উঠে আসতে এবং ব্যাক্ত হতে সাহায্য করে—এর ফলে আমাদের আন্তরিক টানাপোড়েন কমে। আমরা সবাই এমন ব্যক্তিদের চিনি যারা অন্যদের হেয় করার জন্য বিদ্রূপ ব্যবহার করেন, নিজের অভিযোগের কথা সরাসরি না জানিয়ে। এবং সেসব কসমিক লোনলিনেস, জগতের সব রহস্য আবিষ্কার করা অবসাদগ্রস্ত মানুষদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে।” এ কিস্তিতে সৃষ্টিশীল কয়েকজনের সেন্স অব হিউমার ও অবসাদ নিয়ে কিছু বলব।

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একদিন বাজার করতে গেছেন। দোলা বাজারে। পরিচিত এক লোকের সাথে দেখা। তো, দুজনে মিলে ঘুরে ঘুরে সবজি কিনছেন। এক দোকানিকে সন্দীপন বললেন, শিমের বিচি কত করে?
সাথের পরিচিতজন আস্তে আস্তে সন্দীপনকে বললেন, “আপনি শিমের দানা বলতে পারতেন। বিচি বললেন? আপনি একজন সাহিত্যিক।”
সন্দীপন বললেন, “অণ্ডকোষ তো আর বলিনি।”
সেই লোক সন্দীপনের কাছে জানতে চাইলেন, “আপনি বাজারে অণ্ডকোষও বলতে পারবেন?”
সন্দীপন জবাব না দিয়ে হেসে বাজার করলেন। দুজনের বাসা পাশাপাশি। রোববার। ছুটির দিন। তাড়াহুড়ো নেই। ফেরার পথে বইপাড়া। সন্দীপন একটি বইয়ের দোকানে ঢুকলেন। সাথে ওই লোক। সন্দীপন বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলেন, “আপনাদের কাছে অণ্ডকোষ হবে কি?”
বিক্রেতা একটা বই এগিয়ে দিলেন। সন্দীপন কিনলেন সেটি। বইয়ের ওপরে লেখা ‘অণ্ডকোষ’। পাশের লোকটি আগ্রহভরে বইটি একসময় হাতে নিয়ে দেখলেন, বইটি আসলেই অনু-রেণু বিষয়ে লেখা।

এই ঘটনাই প্রথমে বলার উদ্দেশ্য হলো—হাস্যরসের সৃষ্টিও হয় মেধা এবং মেধাহীনতার চিন্তাক্ষেত্রে যোগাযোগহীনতা হেতু। কথাটি বলেছিলেন রাশান লেখক লিও টলস্টয়।

একবার তিনি পেত্রোগাদে সেমিনারে বক্তৃতা করছিলেন। বক্তৃতায় সব প্রাণীর প্রতি অহিংস ও সহানুভূতিশীল হওয়ার কথা বলছিলেন এমন সময় একজন প্রশ্ন করেন, “বনের ভেতর একটা বাঘ যদি আমাকে আক্রমণ করে, কী করব বলুন তো?” টলস্টয় বলেছিলেন, “নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন। এমন ঘটনা জীবনে বারবার ঘটে না!” সেইজন ভাবল জীবন দেওয়ার কথা আর টলস্টয় বলেছিলেন নিজের সেরা অস্তিত্ব জানান দেওয়ার কথা।

সমাধিস্থলের চারদিকে দেয়ালের জন্য মার্ক টোয়েনের কাছে চাঁদা চাইতে গেলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “সমাধিস্থলের চারদিকে দেয়াল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখি না। কারণ যারা ওখানে থাকে তাদের বাইরে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা নেই। আর যারা বাইরে থাকেন তাদের ওখানে যাবার কোনো ইচ্ছে আছে বলে আমার মনে হয় না।” কোনটা দরকারি কোনটা অদরকারি এ নিয়ে মানুষভেদে তফাত অবশ্যই থাকবে। সেই তফাত দৃষ্টিভঙ্গির। উদাহরণ দিই। একবার বিখ্যাত নর্তকী ইসাডোনা ডানকান জর্জ বার্নার্ডশকে লিখলেন, “ভাবুন তো, আপনি আর আমি যদি একটা শিশুর জন্ম দিই, ব্যাপারটা কী চমৎকারই না হবে! সে পাবে আমার রূপ, আর আপনার মতো মেধা।”

আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ওরিয়ল নামের এক নারী নিজের ছেলেকে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত করার জন্য একবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কাছে গিয়ে বললেন, “এটা আমার দাবি, এ পদটা আমার ছেলের প্রাপ্য। আমার দাদা কেসিংটনে যুদ্ধ করেছেন, আমার চাচা ব্লাডেনসবার্গ যুদ্ধের মাঠ থেকে পালিয়ে যাননি, আমার দাদা নিউ অরলিয়ান্সে যুদ্ধ করেছেন আর আমার স্বামী তো মন্টেরিরি যুদ্ধে মারাই গেলেন।” ভদ্রমহিলার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে লিংকন বললেন, “ম্যাডাম, আমার ধারণা আপনার পুরো পরিবার দেশের জন্য অনেক করেছে। দেশ এখন তাদের জন্য করবে। বিশেষ ভাতা পাবে। তবে এবার অন্যদের সেনাবাহিনীতে একটু সুযোগ দেওয়া উচিত।”

এখানে এসে একটা দাড়ি টানা হোক। ব্র্যাকেটে বলা দরকার, জগতের সবাইকে যদি আপনি শুধু বারবার হাসাতে যান তবে তারা আপনাকে জোকার বা ভাঁড় ভাববে, তাই কান্নার গল্পও সিরিয়াসলি শোনাতে হয়। তবে একটা ক্লাইমেক্স তৈরি হয়। কথাটি লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্রের। ক্লাইমেক্স কী জিনিস? ঘটনাকে তুঙ্গে তোলা! লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন। তার নতুন একটা ছবি মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ওই ছবির কাহিনী নিয়ে কথা উঠেছে। বুদ্ধদেব গুহ পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন যে, কাহিনীটি তাঁর, প্রেমেন্দ্র মিত্র যা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র কয়েকদিন বাসা থেকেই বের হলেন না। টানা ছয়দিন সিডেটিভ ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে হজম করতে হলো এ অপমান। এদিকে সবাই উদগ্রীব, প্রেমেন্দ্র মিত্র কী বলেন! কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র কিছু বলছেন না। ক’দিন পর প্রেমেন্দ্র মিত্র বিবৃতি দিলেন। তিনি বললেন, “চলচ্চিত্রের কাহিনীটি আমার না সেটা সত্যি, তবে বুদ্ধদেব গুহ যেখান থেকে গল্পটি নিয়েছে, আমিও ওই একই জায়গা থেকে নিয়েছি।” গল্পটি ছিল জমেস জয়েসের ‘কার্নিভ্যাল’।

চার্লি চ্যাপলিন গ্রেট অভিনেতা ছিলেন। হাসতেন। হাসাতেন। এই হাসানোই ছিল তার রুজির পথ। কিন্তু জানেন কি, তিনি বৃষ্টি হলে রাস্তায় নেমে হাঁটতেন এবং সেসময় কাঁদতেন। তার কান্না কেউ দেখতে পেত না। বৃষ্টির ফোঁটা মনে করত। জওহরলাল নেহেরু ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “তুমি কখনো তোমার কান্না কাউকে দেখাবে না। যদি কান্না পায় তাহলে বাথরুমে গিয়ে কান্না করবে।” কান্না দেখানোর জিনিস নয়। হাসিই দেখানোর। এমনই মনে করতেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক। অথচ তিনি গভীর বিষাদে ভুগতেন। রাতে ঘুম হতো না। ছিলেন ইনসমনিয়ার রোগী। একসময় তার বউ ডোরা তাকে ছেড়ে চলে গেলেন। তখন এক সন্ধ্যায় তিনি বেলকনিতে বসে মদ খাচ্ছিলেন। দৃষ্টি ছিল আকাশের তারাপানে। পরে ওইদিনের ঘটনা লিখতে গিয়ে ‘অলমোস্ট হ্যাপিনেস’ বইতে লিখেছেন, “ডোরা চলে যাওয়ার পর আমি আবিষ্কার করলাম আমি এ জগতে সত্যিকার অর্থেই একা। কেউ নেই। তখন এক সন্ধ্যাবেলা আকাশের বিশালতা দেখে আমার মনে পড়ল, সবাই এ জগতে আসে। সবাই চলে যায় চিরকালীন। কেউ ফেরে না। এ সত্যটা হঠাৎ খুব গভীরে করোটিতে আমার ঢুকে গেল। এরপর থেকে অবসাদ কেটে যেতে লাগল। চারপাশে সবকিছুই তুচ্ছ মনে হতে লাগল। রসবোধের তৈরি হলো। একটা ঘটনা বলি। একবার পরিচিত এক ব্যক্তির দাওয়াত পেয়ে রাতের ভোজে যোগ দিলাম। সেখানে অনেক খাবারই ছিল। কিন্তু যে খাবারটি আমার সবচেয়ে প্রিয়, তা পরিমাণে খুব কম ছিল। কাজেই মনের ভেতর অতৃপ্তি নিয়ে খাওয়া শেষ করলাম। বিদায় নেওয়ার সময় আয়োজক আমাকে সৌজন্য দেখিয়ে বলেন, ‘আশা করি, শিগগিরই আবার আপনি আমাদের সঙ্গে খাবেন।’ আমি উনার তথাকথিত ভদ্রতায় রসিকতা করে ওই খাবারের কথা উল্লেখ করে বলি, ‘ওই খাবার থাকলে এখনই আবার খাওয়া শুরু করতে কোনো অসুবিধা নেই।”

খ্যাতিমান শিল্পী পাবলো পিকাসোর বাড়িতে একদিন এক অতিথি এলেন বেড়াতে। সারা বাড়ি ঘুরে তিনি ভীষণ অবাক। বাড়িতে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু পিকাসোর কোনো চিত্রকর্ম নেই। এত বড় একজন শিল্পীর বাড়িতে তাঁর নিজের আঁকা ছবি থাকবে না, এ কেমন কথা! কৌতূহল দমাতে না পেরে তিনি পিকাসোকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘কী ব্যাপার, বাড়িতে আপনার আঁকা কোনো ছবি নেই কেন?’ পিকাসো দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, ‘আমার এত টাকা কোথায় যে বাড়িতে পিকাসোর ছবি থাকবে? তাঁর ছবিগুলোর যে দাম।” আহা পিকাসো! কত অল্পদামে তিনি ছবিগুলো প্রথমদিকে বিক্রি করেছেন। রোজগার ভালো ছিল না বলে প্রথম স্ত্রী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। পিকাসো এই শপ থেকে ওই শপে যেতেন আর পেইন্টিং কিনবেন কিনা জানতে চাইতেন।

অ্যাডগার অ্যালান পো’র ধরাবাঁধা চাকরি করতে মন চাইত না। গল্প লেখার নেশা। মাথায় ঘোরাফেরা করে সবসময় অসংখ্য চরিত্র। সেসব চরিত্ররা তাকে ঘোরগ্রস্ত রাখে সবসময়। কিন্তু বাস্তবতা আরেক রকম। তাকেও চাকরি করতে হতো। জীবনের কিছু সময় সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। একবার পাবলিক প্যারেডে নির্দেশ এলো—সাদা বেল্ট আর গ্লাভস পরে আসতে হবে। পো ভাবলেন এই নির্দেশকে ব্যঙ্গ করা দরকার। যাতে তার চাকরিটা খারিজ হওয়ার একটা অজুহাত তৈরি হয়। তাই তিনি পরদিন আক্ষরিক অর্থেই দিগম্বর হয়ে পাবলিক প্যারেডে অংশগ্রহণের জন্য যান। গায়ে ছিল শুধু সাদা বেল্ট আর গ্লাভস!

অভাব ছিল প্যারীচাঁদ মিত্রের জীবনে। আর্থিক অনটন লেগেই থাকত। কিন্তু খুব ভোজন রসিক ছিলেন। একবার এলাকার অন্যতম ধনী দেবনারায়ণ দে’র বাড়িতে একটা বড়সড় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। লেখা হচ্ছিল দেনাপাওনা ও খরচাপাতির ফর্দ। সেখানে উপস্তিত ছিলেন রসিক লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। খরচের ফর্দ দেখে প্যারীচাঁদ মিত্র বললেন, “একি মিষ্টান্নের জন্য এত কম টাকা? ব্রাহ্মণকেও তো তেমন দেওয়া হচ্ছে না। এসব খরচ কিছু বাড়িয়ে দিন।”
দেবনারায়ণ বললেন, “প্যারীচাঁদ বাবু, আপনি শুধু খরচ বাড়াতে বলছেন। টাকাটা কে দেবে শুনি?” প্যারীচাঁদ মিত্রের তড়িৎ জবাব, “কেন, আপনি দেবেন। আপনার নামের আগে দে, নামের পরেও দে। দিতে আপনাকে হবেই।” সেবার প্যারীচাঁদের মিষ্টি খাওয়া হয়নি। কারণ তার কন্যা মালতী মিত্র প্রাইভেট টিউশনি শেষে বাড়ি ফেরার পথে রেপড হন এবং সুইসাইড করেন। সেই ঘটনার পর প্যারীচাঁদ বাসা থেকে মেয়ের লাশ মর্গে রেখে নিজের বাড়িতে টানা একমাস তেইশদিন ফিরতে পারেননি। কেননা, তিনি নিজ বাড়ির এড্রেস ভুলে গিয়েছিলেন। চিনতেন না। সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন। বিড়বিড় করে বলতেন, “মালতি”। বাকি আলাপ বারান্তরে।

আপনার মতামত লিখুন :