গল্পত্রয়ী



সরকার কবিরউদ্দিন
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডেভিলস্ মার্বেলস্

সামারে, বিকেল পাঁচটায়ও বাইরে অনেক আলো থাকে। মঈন অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় পৌঁছে যায় ছয়টার আগেই। বাসায় ফিরে এসে করার কিছু থাকে না মঈনের। ও একা মানুষ। এঘর-ওঘর করে। টবের গাছগুলোকে পানি দেয়। জুলফিয়া ওকে ফেলে রেখে চলে গেছে, তাও বছরের উপর হয়ে আসছে। যাবার আগে বিছানায় বালিশের পাশে একটা চিরকুট লিখে গিয়েছিল। মঈন অফিস থেকে এসে পেয়েছে। অল্প ক’টা কথা, “আরমানের সাথে যাচ্ছি। আর আসব না। খুঁজবে না। যদি কখনো জানতে ইচ্ছে হয় কেন গিয়েছি, জানবে আরমান তোমার থেকে অনেক বেশি আর্য-মানুষ।”

এখন, বাসায় ফিরে কিছুই করার থাকে না মঈনের। সম্ভবত সাম্প্রতিককালে তৈরি করা একটা ডক্যুমেন্টারি দেখাচ্ছে টেলিভিশনে। বড় মগে এক মগ কফি করে মঈন টেলিভিশনের সামনে বসে। যে জায়গাটা দেখাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরির ডেভিলস্ মার্বেলস্, একটা মরুভূমিময় এলাকা। এলিস্ স্প্রিংস্ থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার উত্তরে। প্রধানত আদিবাসীরাই থাকে ওখানে। নেরেটার বলছে, বাইরের মানুষ ওইসব এলাকায় যেতে হলে আদিবাসীদের অনুমতি নিতে হয়। মানুষের আধুনিক সভ্যতার বিষয়গুলো ওখানে অত্যন্ত ক্ষীণ, ছোঁয়া নেই বললেই চলে। আদিবাসী এলাকা, আস্ট্রেলিয়ার এ্যবোরিজিনরা থাকে। ডক্যুমেন্টারিটির নেরেটার এবং উপস্থাপক একজন আইরিশ ওয়াইল্ড লাইফ বাইলোজিস্ট। তার সঙ্গে একজন ঝোপ-জঙ্গলের এ্যবোরিজিন প্রৌঢ়। মুখটা সাদা দাড়ি-গোঁফ-চুলে প্রায় ঢেকে গেছে। ওয়াইল্ড লাইফ বাইলোজিস্ট পাথর-লালমাটির গর্তের ভেতর থেকে একটা গোয়েনা (গুইসাপ) বের করে আনল, ফুট-দেড়ফুট লম্বা। মরুভূমির প্রাণী, দীর্ঘ, চিকন দু’ভাগ করা জিহ্বা। এ্যবোরিজিন মানুষটা হাসিমুখে বলল, ‘ইট ইজ আ বেবি বয়।’
বাইলোজিস্ট জিজ্ঞেস করল, ‘ছোটকালে এইগুলো খেয়েছো?’
আদিবাসী ততধিক হাসিমুখে বলল, ‘এখনো খাই।’
সাদা মানুষটি জানতে চাইল, ‘এইটা খাবারের জন্য নিয়ে যাবে?’
অমায়িক আর পবিত্র একটা হাসি হেসে সে বলল, ‘নাহ্, হি ইজ আ বেবি। লেট হিম গ্রো-আপ।’

সাদা মানুষটি গোয়েনাটিকে ছেড়ে দিল। ও দৌড়ে পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল। ওই গুইসাপটির সাথে এই আদিবাসী মানুষটির ইহজীবনে হয়তো আর দেখাই হবে না।

পোড়া-পোড়া, ভেজা-ভেজা সুবাস

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আলীনূর, ওর ভাইয়ের কাছ থেকে নয় হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরে থাকে অনেক বছর ধরে। কম-বেশি তিরিশ বছর হবে।

শৈশব-কৈশোরের কথা। স্বাধীনতাপূর্ব সময়। আলীনূররা তখন করাচিতে, দেশের পশ্চিমাংশে থাকত। ওরা তো বাঙালি ছিল। বাঙালি ভাত পছন্দ করে। পারলে তিন বেলাতেই বাঙালিরা ভাত খায়। আলীনূররা রাতে ভাত খেত না। কারণটা ছিল বোধহয় ভৌগোলিক অবস্থানের, চারপাশের। উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটি ছিল পাড়ায় পাড়ায়। আলীনূরের আম্মা বাসায়, এক-একটি রুটি সমান আটার দলা বানিয়ে, এ্যালুমিনিয়ামের, ট্রের মতো ছড়ানো একটা গোল পাত্রে সাজিয়ে দিত, একটা ধুতে ধুতে নরম হয়ে যাওয়া মার্কিন সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে। আশেপাশের আর সবাই, পাড়া-প্রতিবেশিও তাই করত।

আলীনূর আর ওর ছোটভাই, দুইজনে মিলে সেগুলো তান্দুর ভাঁটিতে নিয়ে যেত। সময়টা ছিল সন্ধ্যার পর। লাইন দিতে হতো। লাইন লম্বা হলে, অন্যসব ছেলেমেয়েদের সাথে ওরা দুইভাই খেলত, রুটি তৈরি হওয়া পর্যন্ত। সূর্য ডুবে যাবার পরে খেলতে পারাটা ছিল বিরাট পাওনা। সোসাইটিতে নিয়ম ছিল, মাগরিবের আজান শেষ হবার আগেই বিকেলের খেলা সাঙ্গ করে, যার যার বাড়ি ফিরে যেতে হতো।

ওইসব উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটিতে চার-পাঁচজন মানুষ কাজ করত। পর্যায়ক্রমে আটার দলাটা পিড়িতে সামান্য কিছুটা বেলে, গোলাকৃতি থেকে চ্যাপ্টা করে, দুই হাতের তালু দিয়ে ছড়ানো হতো শূন্যের ওপর ছুড়ে। রুটি-সমান হলে লম্বা একটা লাঠির একপ্রান্তে তাওয়া-সমান হাতায় রেখে, ঘরের মতো বড় তান্দুর ভাঁটির ভেতর দিয়ে দিত। বাসায় মায়েরা রাতের খাবারের রুটি বানাতেন না, অন্ততপক্ষে চুলার কাজটা করতেন না। প্রতিটা রুটি বানিয়ে দিতে ওরা দুই পয়সা করে নিত। এইসব সামাজিক অনুশীলনের মধ্যে পড়ত।

ওই উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটির চারপাশে রাত-রাত, উষ্ণ, পোড়া-পোড়া, ভেজা-ভেজা সুবাস উড়ে বেড়াত। এখনো, এত এত বছর পরে, হাত বানানো গরম রুটি পেলে, ওই সুবাসটা পায় আলীনূর। চোখ মুদে ওইসব সন্ধ্যারাতে চলে যেতে পারে।
এমন হয় তো। হয় না?

এর সাথে ঠিক করে তার দেখা হয়েছে কই?

কাওসার সাহেব বছর কয়েক আগে স্ত্রী, কামরুনকে সঙ্গে করে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলেন। তিনি খুব সাদামাটা ধরনের মানুষ। কাওসার সাহেবের সামান্য যে একআধটা শখ আছে, তার একটা হচ্ছে দূরের পথে গাড়ি চালানো। নিউজিল্যান্ডের সাউথ-আইল্যান্ডের একটা হাইওয়ের নাম, ‘স্টেট হাইওয়ে সিক্স’। কাওসার সাহেব ক্রাইসচার্চ থেকে সাড়ে পাঁচঘণ্টা ট্রেন-জার্নি করে পৌঁছেছেন গ্রে-মাউথ। গ্রে-মাউথ সমুদ্র উপকূলীয় ছোট একটা শহর। ছিমছাম। তাসমান সাগরের পাড়ে। গ্রে-মাউথ থেকে কুইন্স-টাউন স্টেট হাইওয়ে সিক্স ধরে যাবেন বলে মন ঠিক করে রেখেছেন কাওসার সাহেব। তিনি যে পথে গিয়েছেন, একদিন সারাদিন গাড়ি চালালেও পৌঁছানো যাবে না কুইন্স-টাউন, দূরত্ব এতটাই। পথিমধ্যে দুদিন ‘ফ্রেন্জ যোসেফ গ্লেসিয়ার’, ছোট একটা শহরে থেমেছেন, থেকেছেন। কাওসার সাহেব গ্লেসিয়ারের কথা বইয়ে পড়েছেন। সেই তার প্রথম গ্লেসিয়ার দেখা। বরফের বিশাল নদী, পর্বতচূড়া থেকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে নিম্নাভিমুখী, খালি চোখে এই চলন বোঝা যায় না। অত্যন্ত ঘন আর এর বিশালতা, একে নিজের ভারে চলন্ত করে রেখেছে ক্রমাগত, শত শত বছর ধরে।

ফ্রেন্জ যোসেফ গ্লেসিয়ারে যে মোটেলে তিনি আর কামরুন থেকেছেন, তার একদম লাগোয়া অনেক উঁচু এক পাহাড় আছে। পাহাড়ের নামটা জানা হয়নি কাওসার সাহেবের। এত উঁচু, উপরে, চূড়ায় বরফ জমে থাকে। সারাক্ষণ বরফ দেখা যায় না, উপরের অংশের অর্ধেকের বেশি মেঘে ঢেকে থাকে। কখনো কখনো মেঘ সরে গেলে রুপালিময়তা বের হয়ে আসে, এমনকি রাতেও। ওখানকার একতলা মোটেলগুলোর কমন-চরিত্র হচ্ছে যার যার গাড়ি, তার রুমের বাইরে পার্ক করতে হয়। কাওসার সাহেব গাড়ি ভাড়া করে এসেছিলেন সিডনি থেকেই। ভাড়া গাড়ির কোম্পানি গ্রে-মাউথ অফিস থেকে তুলে নিয়েছেন। বাইরে, গাড়ির আড়ালে দরজার পাশে দুটো চেয়ার দিয়ে টেবিলপাতা ছিল।

কাওসার সাহেব ফ্রেন্জ যোসেফের পরের দিনের সকালবেলায় হঠাৎ করেই কামরুনকে বললেন, সংসারটা খুব বেশি মায়ার জায়গা, তাই না?
কামরুন জানতে চেয়েছে, কেন এমন মনে হয়েছে তার?
কাওসার সাহেব বললেন, বলছি। গতকাল গভীর রাতে অনেকক্ষণ রুমের বাইরে বসেছিলাম।
কামরুন অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন।
কাওসার সাহেব আবারও বললেন, বলছি। রাতে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল…

তিনি যা বলেননি, তা হচ্ছে, রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিছানা থেকে উঠে, শব্দহীন, স্ত্রীকে না জাগিয়ে, এককাপ চা বানিয়ে বাইরে গিয়ে বসেন। ওপরে, পাহাড়ের চূড়ায় রুপালি রঙ জ্বলজ্বল করছে। শীত শীত, সবকিছু চুপচাপ। কেবলই মনে হচ্ছিল, এই যে জীবনটা তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন, এর সাথে ঠিক করে তার দেখা হয়েছে কই?

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;