গল্পত্রয়ী

সরকার কবিরউদ্দিন
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডেভিলস্ মার্বেলস্

সামারে, বিকেল পাঁচটায়ও বাইরে অনেক আলো থাকে। মঈন অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় পৌঁছে যায় ছয়টার আগেই। বাসায় ফিরে এসে করার কিছু থাকে না মঈনের। ও একা মানুষ। এঘর-ওঘর করে। টবের গাছগুলোকে পানি দেয়। জুলফিয়া ওকে ফেলে রেখে চলে গেছে, তাও বছরের উপর হয়ে আসছে। যাবার আগে বিছানায় বালিশের পাশে একটা চিরকুট লিখে গিয়েছিল। মঈন অফিস থেকে এসে পেয়েছে। অল্প ক’টা কথা, “আরমানের সাথে যাচ্ছি। আর আসব না। খুঁজবে না। যদি কখনো জানতে ইচ্ছে হয় কেন গিয়েছি, জানবে আরমান তোমার থেকে অনেক বেশি আর্য-মানুষ।”

এখন, বাসায় ফিরে কিছুই করার থাকে না মঈনের। সম্ভবত সাম্প্রতিককালে তৈরি করা একটা ডক্যুমেন্টারি দেখাচ্ছে টেলিভিশনে। বড় মগে এক মগ কফি করে মঈন টেলিভিশনের সামনে বসে। যে জায়গাটা দেখাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরির ডেভিলস্ মার্বেলস্, একটা মরুভূমিময় এলাকা। এলিস্ স্প্রিংস্ থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার উত্তরে। প্রধানত আদিবাসীরাই থাকে ওখানে। নেরেটার বলছে, বাইরের মানুষ ওইসব এলাকায় যেতে হলে আদিবাসীদের অনুমতি নিতে হয়। মানুষের আধুনিক সভ্যতার বিষয়গুলো ওখানে অত্যন্ত ক্ষীণ, ছোঁয়া নেই বললেই চলে। আদিবাসী এলাকা, আস্ট্রেলিয়ার এ্যবোরিজিনরা থাকে। ডক্যুমেন্টারিটির নেরেটার এবং উপস্থাপক একজন আইরিশ ওয়াইল্ড লাইফ বাইলোজিস্ট। তার সঙ্গে একজন ঝোপ-জঙ্গলের এ্যবোরিজিন প্রৌঢ়। মুখটা সাদা দাড়ি-গোঁফ-চুলে প্রায় ঢেকে গেছে। ওয়াইল্ড লাইফ বাইলোজিস্ট পাথর-লালমাটির গর্তের ভেতর থেকে একটা গোয়েনা (গুইসাপ) বের করে আনল, ফুট-দেড়ফুট লম্বা। মরুভূমির প্রাণী, দীর্ঘ, চিকন দু’ভাগ করা জিহ্বা। এ্যবোরিজিন মানুষটা হাসিমুখে বলল, ‘ইট ইজ আ বেবি বয়।’
বাইলোজিস্ট জিজ্ঞেস করল, ‘ছোটকালে এইগুলো খেয়েছো?’
আদিবাসী ততধিক হাসিমুখে বলল, ‘এখনো খাই।’
সাদা মানুষটি জানতে চাইল, ‘এইটা খাবারের জন্য নিয়ে যাবে?’
অমায়িক আর পবিত্র একটা হাসি হেসে সে বলল, ‘নাহ্, হি ইজ আ বেবি। লেট হিম গ্রো-আপ।’

সাদা মানুষটি গোয়েনাটিকে ছেড়ে দিল। ও দৌড়ে পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল। ওই গুইসাপটির সাথে এই আদিবাসী মানুষটির ইহজীবনে হয়তো আর দেখাই হবে না।

পোড়া-পোড়া, ভেজা-ভেজা সুবাস

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আলীনূর, ওর ভাইয়ের কাছ থেকে নয় হাজার কিলোমিটারেরও অধিক দূরে থাকে অনেক বছর ধরে। কম-বেশি তিরিশ বছর হবে।

শৈশব-কৈশোরের কথা। স্বাধীনতাপূর্ব সময়। আলীনূররা তখন করাচিতে, দেশের পশ্চিমাংশে থাকত। ওরা তো বাঙালি ছিল। বাঙালি ভাত পছন্দ করে। পারলে তিন বেলাতেই বাঙালিরা ভাত খায়। আলীনূররা রাতে ভাত খেত না। কারণটা ছিল বোধহয় ভৌগোলিক অবস্থানের, চারপাশের। উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটি ছিল পাড়ায় পাড়ায়। আলীনূরের আম্মা বাসায়, এক-একটি রুটি সমান আটার দলা বানিয়ে, এ্যালুমিনিয়ামের, ট্রের মতো ছড়ানো একটা গোল পাত্রে সাজিয়ে দিত, একটা ধুতে ধুতে নরম হয়ে যাওয়া মার্কিন সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে। আশেপাশের আর সবাই, পাড়া-প্রতিবেশিও তাই করত।

আলীনূর আর ওর ছোটভাই, দুইজনে মিলে সেগুলো তান্দুর ভাঁটিতে নিয়ে যেত। সময়টা ছিল সন্ধ্যার পর। লাইন দিতে হতো। লাইন লম্বা হলে, অন্যসব ছেলেমেয়েদের সাথে ওরা দুইভাই খেলত, রুটি তৈরি হওয়া পর্যন্ত। সূর্য ডুবে যাবার পরে খেলতে পারাটা ছিল বিরাট পাওনা। সোসাইটিতে নিয়ম ছিল, মাগরিবের আজান শেষ হবার আগেই বিকেলের খেলা সাঙ্গ করে, যার যার বাড়ি ফিরে যেতে হতো।

ওইসব উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটিতে চার-পাঁচজন মানুষ কাজ করত। পর্যায়ক্রমে আটার দলাটা পিড়িতে সামান্য কিছুটা বেলে, গোলাকৃতি থেকে চ্যাপ্টা করে, দুই হাতের তালু দিয়ে ছড়ানো হতো শূন্যের ওপর ছুড়ে। রুটি-সমান হলে লম্বা একটা লাঠির একপ্রান্তে তাওয়া-সমান হাতায় রেখে, ঘরের মতো বড় তান্দুর ভাঁটির ভেতর দিয়ে দিত। বাসায় মায়েরা রাতের খাবারের রুটি বানাতেন না, অন্ততপক্ষে চুলার কাজটা করতেন না। প্রতিটা রুটি বানিয়ে দিতে ওরা দুই পয়সা করে নিত। এইসব সামাজিক অনুশীলনের মধ্যে পড়ত।

ওই উড-ফায়ার তান্দুর ভাঁটির চারপাশে রাত-রাত, উষ্ণ, পোড়া-পোড়া, ভেজা-ভেজা সুবাস উড়ে বেড়াত। এখনো, এত এত বছর পরে, হাত বানানো গরম রুটি পেলে, ওই সুবাসটা পায় আলীনূর। চোখ মুদে ওইসব সন্ধ্যারাতে চলে যেতে পারে।
এমন হয় তো। হয় না?

এর সাথে ঠিক করে তার দেখা হয়েছে কই?

কাওসার সাহেব বছর কয়েক আগে স্ত্রী, কামরুনকে সঙ্গে করে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলেন। তিনি খুব সাদামাটা ধরনের মানুষ। কাওসার সাহেবের সামান্য যে একআধটা শখ আছে, তার একটা হচ্ছে দূরের পথে গাড়ি চালানো। নিউজিল্যান্ডের সাউথ-আইল্যান্ডের একটা হাইওয়ের নাম, ‘স্টেট হাইওয়ে সিক্স’। কাওসার সাহেব ক্রাইসচার্চ থেকে সাড়ে পাঁচঘণ্টা ট্রেন-জার্নি করে পৌঁছেছেন গ্রে-মাউথ। গ্রে-মাউথ সমুদ্র উপকূলীয় ছোট একটা শহর। ছিমছাম। তাসমান সাগরের পাড়ে। গ্রে-মাউথ থেকে কুইন্স-টাউন স্টেট হাইওয়ে সিক্স ধরে যাবেন বলে মন ঠিক করে রেখেছেন কাওসার সাহেব। তিনি যে পথে গিয়েছেন, একদিন সারাদিন গাড়ি চালালেও পৌঁছানো যাবে না কুইন্স-টাউন, দূরত্ব এতটাই। পথিমধ্যে দুদিন ‘ফ্রেন্জ যোসেফ গ্লেসিয়ার’, ছোট একটা শহরে থেমেছেন, থেকেছেন। কাওসার সাহেব গ্লেসিয়ারের কথা বইয়ে পড়েছেন। সেই তার প্রথম গ্লেসিয়ার দেখা। বরফের বিশাল নদী, পর্বতচূড়া থেকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে নিম্নাভিমুখী, খালি চোখে এই চলন বোঝা যায় না। অত্যন্ত ঘন আর এর বিশালতা, একে নিজের ভারে চলন্ত করে রেখেছে ক্রমাগত, শত শত বছর ধরে।

ফ্রেন্জ যোসেফ গ্লেসিয়ারে যে মোটেলে তিনি আর কামরুন থেকেছেন, তার একদম লাগোয়া অনেক উঁচু এক পাহাড় আছে। পাহাড়ের নামটা জানা হয়নি কাওসার সাহেবের। এত উঁচু, উপরে, চূড়ায় বরফ জমে থাকে। সারাক্ষণ বরফ দেখা যায় না, উপরের অংশের অর্ধেকের বেশি মেঘে ঢেকে থাকে। কখনো কখনো মেঘ সরে গেলে রুপালিময়তা বের হয়ে আসে, এমনকি রাতেও। ওখানকার একতলা মোটেলগুলোর কমন-চরিত্র হচ্ছে যার যার গাড়ি, তার রুমের বাইরে পার্ক করতে হয়। কাওসার সাহেব গাড়ি ভাড়া করে এসেছিলেন সিডনি থেকেই। ভাড়া গাড়ির কোম্পানি গ্রে-মাউথ অফিস থেকে তুলে নিয়েছেন। বাইরে, গাড়ির আড়ালে দরজার পাশে দুটো চেয়ার দিয়ে টেবিলপাতা ছিল।

কাওসার সাহেব ফ্রেন্জ যোসেফের পরের দিনের সকালবেলায় হঠাৎ করেই কামরুনকে বললেন, সংসারটা খুব বেশি মায়ার জায়গা, তাই না?
কামরুন জানতে চেয়েছে, কেন এমন মনে হয়েছে তার?
কাওসার সাহেব বললেন, বলছি। গতকাল গভীর রাতে অনেকক্ষণ রুমের বাইরে বসেছিলাম।
কামরুন অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন।
কাওসার সাহেব আবারও বললেন, বলছি। রাতে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল…

তিনি যা বলেননি, তা হচ্ছে, রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিছানা থেকে উঠে, শব্দহীন, স্ত্রীকে না জাগিয়ে, এককাপ চা বানিয়ে বাইরে গিয়ে বসেন। ওপরে, পাহাড়ের চূড়ায় রুপালি রঙ জ্বলজ্বল করছে। শীত শীত, সবকিছু চুপচাপ। কেবলই মনে হচ্ছিল, এই যে জীবনটা তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন, এর সাথে ঠিক করে তার দেখা হয়েছে কই?

আপনার মতামত লিখুন :