শীতে পাওয়া সাহিত্য

দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৭৬৭ সাল। ডিসেম্বর মাস। ফ্রান্সের এক তরুণ চিকিৎসক জাঁ ডেনিস এক শীতের রাতে অসামান্য এক আবিষ্কার করেন। পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে রক্তসঞ্চালন করায় প্রথম সফল হলেন তিনি। তার এই আবিষ্কার চমকে দিল সমস্ত বিশ্বকেই। কিন্তু ডেনিস আসলে একজন মানুষকে হত্যা করতে সাহায্যকারী হিসেবেই ছিলেন তার পরীক্ষায়। এই মানুষটির নাম আন্তোনি মরোয়া। এক মায়াবী জোছনা রাতে নদীর ধারে অর্ধনগ্ন অবস্থায় প্রথম তাকে দেখেছিল ডেনিস। একদল স্কুলপড়ুয়া তার পেছনে ছিল। ক্ষেপিয়ে তুলছিল তাকে। ডেনিস পেয়ে যায় তার ‘সাবজেক্ট’। ১৯ ডিসেম্বর ১৬৬৭ রাতে বাছুরের রক্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল আন্তোনির শরীরে। প্রথমে কিছুটা ভালো থাকলেও, এরপর আরো দু’ দুবার রক্ত সঞ্চালন করা হয়েছিল বলে মৃত্যু হয় আন্তোনির।

উল্লেখযোগ্য বিষয় ৩৪৪ বছর আগেকার এই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। জানা যায়নি হত্যাকারী ঠিক কারা।
(সূত্র: ব্লাড ওয়ার্ক, হোলি টাকার, প্রকাশক: ডবলু ডবলু নর্টন অ্যান্ড কোং, নিউ ইয়র্ক)

হত্যাকারী কারা এটি না জানলেও জানি এই কবিতাটি :

“শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব—প্রতি সন্ধ্যায়
কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত
ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে—আমি চুপ করে বসে থাকি—অন্ধকারে”

আমার একটি প্রিয় কবিতা। শীতকাল এলেই মনে পড়ে সুপর্ণাকে। সুপর্ণা বলে কেউ নেই। তবু মনে হয় আছে। তার অপেক্ষা করি।

কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা। তিনি জানতেন কিনা এই ইতিহাস! কিন্তু ইতিহাসের এই অধ্যায়টির পাতা মাইক্রোজেরক্স করেই যেন সূত্র হিসাবে রাখা আছে শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা কবিতায়। আমার শরীরে কি অলরেডি কেউ ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়েছে? না হলে শীতকালের জন্য, সুপর্ণার জন্য আমি অন্ধকারে ঝিমুতে থাকি কেন? আমার মতো ঝিমুতেন একজন। তিনি তো মারা গেছেন সেই ১৪০০ সালে। নাম জিওফ্রে চসার। তার স্ত্রী ফিলিপ্পা ছিলেন ব্রিটেনের রাজপরিবারের দূরবর্তী আত্মীয়। অভিজাত সম্প্রদায়ে ফিলিপ্পার জন্ম। কিন্তু চসারের কবিতা পছন্দ করতেন। উল্টোদিকে চসার তরুণ বয়সে তার সব কবিতা লিখতেন এক ক্যাবারে ড্যান্সারের জন্য। নাম অ্যাবে মিনাস। ১৩৮০ সালে সামারে গ্যাংরেপের পর খুন হন মিনাস। এরপর থেকে চসারের মানসিক অবস্থা এতই ওলটপালট হয়ে যায় যে তিনি সামার এলেই বেশিরভাগ সময় ঘুমের ইনজেকশন নিয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন।

ফিলিপ্পোর কাছে জানতে চাইতেন, “ফিলিপ্পো, শীতকাল কবে আসবে?” (সূত্র: দ্য শর্ট অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার, থার্ড এডিশন, এন্ড্রু স্যান্ডার্স) কিন্তু শীতকালে ভালো থাকতেন শেলি। ব্রিটিশ কবি শেলি তাঁর এক কবিতায় শীতকে আশাবাদের ঋতু হিসেবেও দেখেছেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন, “ও, ভিন্ড, ইফ ভিন্টার কামস্, ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড?” অর্থাৎ “যদি শীত আসে, বসন্ত কি খুব দূরে থাকতে পারে?” আহা শেলির মতন যদি শীতকালকে দেখতে পারতেন রাশান কবি মায়াকোভস্কি। শেষঅব্দি তার সুইসাইডের পেছনে শীতকালও দায়ী ছিল বলে একদল ফরাসি মনোবিদদরা দাবি করছেন। তার প্রেমিকা পোলানস্কায়ারের কথাগুলো এমন, “আমি বেরিয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়েছি কয়েক পা। একটা গুলির শব্দ। আতঙ্কে চিৎকার করে ছুটে এলাম করিডোরের দিকে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে ভয় হলো। তারপর ভেতরে ঢুকলাম, যেন একযুগ হয়ে গেছে। সারা ঘরে বারুদের ধোঁয়া, কার্পেটের ওপর পড়ে আছেন মায়াকোভস্কি। হাত দুটো ছড়ানো। বুকে রক্তের দাগ। শীতকালে সে খুব বিষাদে ভুগত। শীতকাল নিয়ে আমাকে একটা চিঠিও লিখেছিল। সেই শীতকালই নিয়ে গেল তাকে।”

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে মায়াকোভস্কির সঙ্গে পোলানস্কায়ারের শেষ দেখা এবং সেদিনই রিভলভারের গুলিতে কবি আত্মহত্যা করেন। পোলানস্কায়া ধনী পরিবারের অসুখী গৃহবধু। ভালোবাসতেন মায়াকোভস্কির কবিতা ও মুভি। অনেক নারী তার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু আর্থিক দীনতায় ভুগতেন বলে মায়াকোভস্কি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইতেন না। শুধু চেয়েছিলেন পোলানস্কায়াকে পেতে। কিন্তু পোলানস্কায়া সংসার করতে রাজি হননি। মায়াকোভস্কি তাকে বলেছিলেন, “তুষারপাত বড় অসাম্যবাদী। কাউকে করে মিলনমুখর, কাউকে বিরহকাতর। টাকাও তাই। তোমাকে দিয়েছে আভিজাত্য। আমাকে দিয়েছে বেঁচে থাকার ঘাম।” মায়াকোভস্কি কমিউনিস্ট ছিলেন এবং তিনি সমাজতান্ত্রিক সেন্সরশিপের বিপক্ষে মত দিয়ে বলেছিলেন, “এ ব্যবস্থা টিকে থাকবে না।” তার আত্মহত্যার পর আন্নামাখতভা বলেছিলেন, “মায়াকোভস্কি প্রায়ই বলত, সে জর্জিয়ার ঘাসের মতন। তাকে যেন কেউ মাড়িয়ে না যায়, এড়িয়ে যায়। সে ছিল অনেক কোমল মনের। সমাজতন্ত্রের ডিকটেটরশিপ তাই হয়তো মেনে নিতে পারেনি।” কিন্তু মায়াকোভস্কির জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়ায় ১৮৯৩ সালের ১৯ জুলাই জন্ম। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৭ বছর। কিন্তু শৈশবে দেখেছেন বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ, মাতলামি আর মারামারি। যৌবনে বলশেভিক বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করায় তাকে কিছুদিনের জন্য দেশত্যাগ করতে হয়। রিফিউজির জীবন শুরু হয় তার। পার্কে, ফুটপাতে, গাড়িবারান্দায় ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছে। তিনি ‘দ্য ওয়ার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘এবাউট দ্যাট’ এবং আরো বেশ কিছু কবিতার বই লেখেন। তার মুভিগুলো হচ্ছে, ‘দ্য লেডি এ—দ্য হুলিগান’ এবং ‘জিউস অন ল্যান্ড’। মায়াকোভস্কির বন্ধু আন্নামাখতভার জীবনও যেন কুয়াশার কুহকে ঢাকা।

কিন্তু তার আগে আসুন পড়ি মায়াকোভস্কির শীতকাল নিয়ে পোলানস্কায়াকে লেখা সেই চিঠি :

“প্রিয়, জানি যা মরে যায় তা মরে যায়, ফিরে যা আসে তা একইরকম দেখালেও অন্য। শীতের ঝরাপাতা দেখেছো? মরাপাতা দেখেছো? সেবার আমরা দুজনে কিরান পার্কে যখন একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম ঝরাপাতা উড়ছিল। একটা শীতল সাপ গর্তে ঢুকে যাওয়ার মতন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম একেবারেই শৈশবকে মনে পড়ায়। দূরে কোনো স্ট্রিট সিংগার বেহালা বাজাচ্ছিল, মনে আছে তোমার? সন্ধ্যার একটু পর তখন। তুমি আমার কাছে জানতে চাইলে, ‘কাঁপছো কেন?’ বললাম, ‘শীত এলেই মনে হয় মরে যাব। কুঁকড়ে যাই। ফায়ারপ্লাস জ্বালিয়ে ভদকা খেয়ে অথবা তোমাকে কতদিনই বা পাই যৌন উত্তাপের জন্য যে উত্তাপ থাকবে আমার শরীরে? একটা সময় খুব চিঠি লিখতাম। যখন বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম। বাবা-মা-খালা-শৈশবের বন্ধুদের। এরপর যত বড় হলাম চিঠি লেখার অভ্যাসটা মরে গেল। বিশ্বাস করো নিজের কাছেও আমি চিঠি লিখেছি। দেখা গেল রাতে লিখে ঘুমানোর আগে বালিশের নিচে রেখে দিয়েছি। পরেরদিন নাস্তা সেরে খুব আয়েশ করে রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে পড়েছি। এসব কিছু না। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। কিন্তু শীতকাল যেন মদ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকারই জন্যে শুধু। জেগে উঠলেই কুঁকড়ে যাওয়া।”

এবার দেখি চলুন আন্নামাখতভা শীতে কী কাণ্ডকারখানা করছেন! একবার সাইবেরিয়ে গেলেন বেড়াতে। তখন তার বয়স বেশি নয়। স্কেটিং করার সময় তার হঠাৎ মনে হলো সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। তিনি নিজেকে ছেড়ে দিলেন। যা হবার তাই হলো। গড়িয়ে যেতে লাগলেন। বহুদূর গড়িয়ে যাওয়ার পর স্কেটিংরত যে মানুষটির ওপর গিয়ে ধাক্কা খেলেন এবং বেঁচে গেলেন সেই মানুষটি মায়াকোভস্কি। একেবারে মুভি মুভি মনে হচ্ছে। কিন্তু জীবন যে মুভির চেয়েও বেশি নাটকীয়। আন্নামাখতভা ও মায়াকোভস্কি ট্রেনে চেপে একবার আয়ারল্যান্ড যাচ্ছেন। ভীষণ তুষারপাত হচ্ছে। তাদের উল্টোদিকে একজোড়া দম্পতি একটি শিশুসন্তানসহ। শিল্পকলা-দর্শন-সমাজতন্ত্র সবই আলাপ হচ্ছিল মায়াকোভস্কি ও আন্নামাখতভার মধ্যে। এবার ক্যামেরা ধরেন। লংশটে তাদের দেখে থাকলে এবার ক্লোজশটে আসুন। কী দেখছেন, আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে আন্নামাখতভা মায়াকোভস্কিকে চুমু খেয়েই যাচ্ছেন। আর বিড়বিড় করে বলছেন, ‘শীত শীত’।

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

আহা শীত। শেলির মতো শীতকে অনেকেই নিতে পারেননি। শেলির মতন যারা নিয়েছিলেন তাদের কথা পরে বলছি। এর আগে সিলভিয়া প্লাথকে একটু স্মরণ না করলে কেমন দেখায়। ১৯৬২ সাল। এই বছর শতাব্দীর ভয়াবহ শীত পড়ে। প্লাথ তাঁর কন্যা ও পুত্রকে নিয়ে লন্ডনে একটা সস্তা ফ্লাটে ওঠেন যেখানে টেলিফোন লাইন পর্যন্ত ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর টেডের সাথে বিচ্ছিন্নতা এই দুই মিলে প্লাথ বিষণ্ণ থাকেন। আর এমন বিষণ্ণ অবস্থায় তিনি লিখে যান জীবনের সবচেয়ে ভালো কবিতাগুলো। একই সময়েই তিনি শেষ করেন তাঁর একটি মাত্র উপন্যাস ‘দ্যা বেলজার’ যা তিনি পেননেম—ভিক্টরিয়া লুকাস নামে প্রকাশ করেন। এই সময়ে তিনি ২৬টি কবিতা লেখেন যা ‘এরিয়েল অ্যান্ড আদার পয়েমস’ নামে কাব্য সংকলনের স্ক্রিপ্ট রেখে যান। ‘এরিয়েল’ নামের শিরোনাম কবিতাটিতে প্লাথ নিজেকে একজন অশ্বারোহী হিসাবে চিত্রিত করেন। তিনি কখনো দ্রুত ধাবমান ঘোড়ার লাগাম ঠিকভাবে ধরে তাকে সঠিক পথে চালনা করছেন আবার কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। এরিয়েল শুধু ঘোড়দৌড়ের স্মৃতিকথা নয় বরং তা প্রকৃতি, জীবন, ভয়, আর মৃত্যুর কোলাজ। এরিয়েলে তিনি ব্যবহার করেন অনিয়মিত ছন্দ, রেপিটেশন, এবং ধ্বনি যা চিত্রময়তাকে ছাড়িয়ে কবিতাটিকে শ্রুতিময় করে তোলে। প্লাথ সংকলনটির নাম দেন ‘এরিয়েল অ্যান্ড আদার পয়েমস’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, তাঁর মৃত্যুর দু বছর পরে বইটি প্রকাশিত হয় শুধু ‘এরিয়েল’ নামে। আর প্লাথের মনোনীত কবিতাগুলোকে ইচ্ছেমতো বাদ দিয়ে তাঁর অন্য ১৫টি কবিতা সংযোজন করে বইটি প্রকাশ করেন তাঁর প্রাক্তন স্বামী টেড হিউজেস। প্লাথ তাঁর প্রাক্তন এই কবি স্বামী সম্পর্কে একবার লিখেছিলেন—“এই লোকটির প্রতি আমার ঘৃণা ও ক্ষোভ এতটাই প্রবল যে তার সম্পর্কে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতেও আমার ঘৃণা হয়।” সেই প্লাথের মৃত্যু কী মর্মান্তিক! গ্যাস চেম্বারে মুখ ঢুকিয়ে সুইসাইড। ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। সেবারও ভয়াবহ শীত। সেই শীতে তিনি তার পাশের বাড়ির ডাক্তারকে বলেছিলেন, “শীত আর অবসাদ আর সহ্য করতে পারছি না।” কয়েকবার সুইসাইডের চেষ্টা করেছিলেন। অসফল। কিন্তু সেদিনের ঘটনা অন্যরকম। ভোর সাড়ে ৪টা, গৃহকর্ত্রী ও বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত নার্স এসে দেখলেন ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। পরে আরেকজন গৃহকর্মীর সাহায্যে দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল রান্নাঘরের বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্লাথ মৃত পড়ে আছেন।

“শীতকে উদযাপন করো। শীতে বাজারে ওঠে নতুন শাকসবজি। পরা যায় বাহারি পোশাক। ব্লেজার। ব্লেজারের পকেটে রেখে দাও একটু রাম। আর ঘুরে বেড়াও। যৌনতাও খারাপ না। তখন নেই গরীবের ঘাম আর অভিজাতের স্বেদবিন্দু।” কথাগুলো কে বলতে পারেন! সেই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ই। তো, উনারই মতন ছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চেক কথা সাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা। Life Is Elsewhere (জীবন অন্য কোথাও) বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ এর বসন্তকালে। এই বই লেখা প্রসঙ্গে মিলান কুন্ডেরা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বইটি শীতকালে লেখা। সেবার শীতে একটা হোটেলে ছিলাম। প্রচুর মার্টিনো খেয়েছিলাম। আর জানালার পাশে যে টেবিল-চেয়ার ছিল ওখানে বসে তুষারপাত দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে এলো এক কবির কথা। কবির জীবন নিয়ে শুরু করলাম লেখা। সত্যি বলতে কী, উইন্টারে লিখি। মুড ভালো থাকে। বসন্তে ঘুরে বেড়াই।”

উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটি বিপ্লবী সময়ে জন্ম নেওয়া কোনো এক কবি ও তার যৌবন। কবি আর যৌবনকে গল্পকার একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন এখানে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যৌবন হচ্ছে কবিতা তৈরির সময়, কবি হওয়ার সময়। আর কবিতা তরুণদের ন্যায় সদা জাগ্রত, সদা চঞ্চল। একজন কবির জীবনকে ঘিরে (বিশেষত জন্ম, যৌবন, মৃত্যু) তার পরিবার, তার সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী, ইতিহাস এমনকি দর্শন ও সাহিত্য কিভাবে আবর্তিত হয় সেটাই এখানে গল্পকার তুলে ধরেছেন। তবে লেখক এখানে জীবনের ঘটনাবলি তুলে ধরেননি। তিনি তুলে ধরছেন জীবনের সে সকল ঘটনাবলি ‘যা না হতে পারত’। সহজ করে বলতে গেলে গল্পকার এখানে জীবনের এমন সব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যেগুলো হয়তো প্রত্যেকের জীবনেই ঘটার সম্ভবনা আছে, কিন্তু ঘটে না। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন কাটে কিছু শর্তের মধ্যে থেকে। শর্তাধীন জীবন কাটাতে কাটাতে আমরা যখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি তখন আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরেকটি সত্তা আমাদের আরেক ধরনের জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখায়—কিন্তু সে স্বপ্ন নিছকই স্বপ্নই রয়ে যায়।

আরো পড়ুন ➥ স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে The art of the novel প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। লুইস ওপেনহেইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ বই প্রসঙ্গে বলেন, “এই বই শুধু না আমার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জোকস’ও শীতকালে লেখা। শীতকালে আমি খুব স্মৃতিকাতরতায় ভুগি। প্রেমেও পড়ি প্রচুর। আমার প্রথম প্রেমও শীতকালে। তুষারপাতের ভেতর গাড়ি আটকে গিয়েছিল। লেভসিসের (তার প্রথম প্রেমিকা) গাড়িও ঠিক এক জায়গায় আটকে গেল। তুষারঝড় না থামা অব্দি আমরা দুজনেই নিজ নিজ গাড়িতে বসে ছিলাম। থামার পর পরিচিত হই। সেই শুরু প্রেম। থ্যাংকস উইন্টার।”

উইলিয়্ম ফকনর শীতে ঘুরতে বের হন। অথচ পশ্চিমে মানুষ সামারে ঘুরতে বের হয়। ফকনারের এ বিষয়ে অভিমত, “শীতে জগত ভিজে। ভিজে জগতকে দেখলে আমি মাতৃজঠরের কথা বেশি ভালো করে ভাবতে পারি এবং বুঝি যে ওখান থেকে বেরিয়ে না এলে আমি এই সুন্দর জগত দেখতে পারতাম না।”

গ্রেগরি রাবাসা। “ইংরেজি ভাষায় ল্যাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ লেখক”—এই বলে যাকে একদিন ঘোষণা করেছিলেন গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেস। তিনিই প্রথম মার্কেসের জাদুবাস্তবতার অনন্য আখ্যান নিঃসঙ্গতার একশ বছরকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে সারা পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তিনি ১৯১৬ সালে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান। তো তিনি, শীতকালে কোনো কাজই করতেন না। ক্যাসিনোতে ডুবে থাকতেন। নয়তোবা নারীসঙ্গ। নয়তো জিমে। তিনি বলেছিলেন, “শীতে ক্যাসিনো, নারীসঙ্গ ও জিম তিনটিইতেই যে আমি বিভোর হয়ে থাকি সেটির একমাত্র কারণ স্বাস্থ্যরক্ষা। নিজেকে ফিট করে নেওয়া। সামারে মানুষের মধ্যে উৎসবভাব দেখে আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। কারণ যে কোনো উৎসবই ধনী-গরিবের মধ্যেকার সীমারেখাটা বড় করে টেনে দেয়। আই হেইট সামার। হেইট মুনসুন। লাভ উইন্টার। শীতে আমি নারীদের অপেক্ষায় থাকি।” সেইসব নারীরা কি সুপর্ণা? উত্তর জানা নেই।

তবে কবি-লেখকদের মধ্যে মৌসুম একেকরকম প্রভাব ফেলে এটি বেমালুম দেখা যাচ্ছে। হায় মৌসুম। তুমিই ঘুরে ফিরে আসো। জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ‘এখন যে হেমন্তেও হয় বৃষ্টিসন্ত্রাস। আমার জীবনানন্দ বিলাস নিয়ে ঘাসগুলো করে পরিহাস।’ কবি শ্রীজাতের আক্ষেপ তাই জারি রাখা যায় মৌসুমকে তার মতো চরিত্রে ফিরে পাওয়ার জন্যে। নাকি?

আপনার মতামত লিখুন :