শীতে পাওয়া সাহিত্য



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৭৬৭ সাল। ডিসেম্বর মাস। ফ্রান্সের এক তরুণ চিকিৎসক জাঁ ডেনিস এক শীতের রাতে অসামান্য এক আবিষ্কার করেন। পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে রক্তসঞ্চালন করায় প্রথম সফল হলেন তিনি। তার এই আবিষ্কার চমকে দিল সমস্ত বিশ্বকেই। কিন্তু ডেনিস আসলে একজন মানুষকে হত্যা করতে সাহায্যকারী হিসেবেই ছিলেন তার পরীক্ষায়। এই মানুষটির নাম আন্তোনি মরোয়া। এক মায়াবী জোছনা রাতে নদীর ধারে অর্ধনগ্ন অবস্থায় প্রথম তাকে দেখেছিল ডেনিস। একদল স্কুলপড়ুয়া তার পেছনে ছিল। ক্ষেপিয়ে তুলছিল তাকে। ডেনিস পেয়ে যায় তার ‘সাবজেক্ট’। ১৯ ডিসেম্বর ১৬৬৭ রাতে বাছুরের রক্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল আন্তোনির শরীরে। প্রথমে কিছুটা ভালো থাকলেও, এরপর আরো দু’ দুবার রক্ত সঞ্চালন করা হয়েছিল বলে মৃত্যু হয় আন্তোনির।

উল্লেখযোগ্য বিষয় ৩৪৪ বছর আগেকার এই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। জানা যায়নি হত্যাকারী ঠিক কারা।
(সূত্র: ব্লাড ওয়ার্ক, হোলি টাকার, প্রকাশক: ডবলু ডবলু নর্টন অ্যান্ড কোং, নিউ ইয়র্ক)

হত্যাকারী কারা এটি না জানলেও জানি এই কবিতাটি :

“শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব—প্রতি সন্ধ্যায়
কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত
ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে—আমি চুপ করে বসে থাকি—অন্ধকারে”

আমার একটি প্রিয় কবিতা। শীতকাল এলেই মনে পড়ে সুপর্ণাকে। সুপর্ণা বলে কেউ নেই। তবু মনে হয় আছে। তার অপেক্ষা করি।

কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা। তিনি জানতেন কিনা এই ইতিহাস! কিন্তু ইতিহাসের এই অধ্যায়টির পাতা মাইক্রোজেরক্স করেই যেন সূত্র হিসাবে রাখা আছে শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা কবিতায়। আমার শরীরে কি অলরেডি কেউ ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়েছে? না হলে শীতকালের জন্য, সুপর্ণার জন্য আমি অন্ধকারে ঝিমুতে থাকি কেন? আমার মতো ঝিমুতেন একজন। তিনি তো মারা গেছেন সেই ১৪০০ সালে। নাম জিওফ্রে চসার। তার স্ত্রী ফিলিপ্পা ছিলেন ব্রিটেনের রাজপরিবারের দূরবর্তী আত্মীয়। অভিজাত সম্প্রদায়ে ফিলিপ্পার জন্ম। কিন্তু চসারের কবিতা পছন্দ করতেন। উল্টোদিকে চসার তরুণ বয়সে তার সব কবিতা লিখতেন এক ক্যাবারে ড্যান্সারের জন্য। নাম অ্যাবে মিনাস। ১৩৮০ সালে সামারে গ্যাংরেপের পর খুন হন মিনাস। এরপর থেকে চসারের মানসিক অবস্থা এতই ওলটপালট হয়ে যায় যে তিনি সামার এলেই বেশিরভাগ সময় ঘুমের ইনজেকশন নিয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন।

ফিলিপ্পোর কাছে জানতে চাইতেন, “ফিলিপ্পো, শীতকাল কবে আসবে?” (সূত্র: দ্য শর্ট অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার, থার্ড এডিশন, এন্ড্রু স্যান্ডার্স) কিন্তু শীতকালে ভালো থাকতেন শেলি। ব্রিটিশ কবি শেলি তাঁর এক কবিতায় শীতকে আশাবাদের ঋতু হিসেবেও দেখেছেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন, “ও, ভিন্ড, ইফ ভিন্টার কামস্, ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড?” অর্থাৎ “যদি শীত আসে, বসন্ত কি খুব দূরে থাকতে পারে?” আহা শেলির মতন যদি শীতকালকে দেখতে পারতেন রাশান কবি মায়াকোভস্কি। শেষঅব্দি তার সুইসাইডের পেছনে শীতকালও দায়ী ছিল বলে একদল ফরাসি মনোবিদদরা দাবি করছেন। তার প্রেমিকা পোলানস্কায়ারের কথাগুলো এমন, “আমি বেরিয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়েছি কয়েক পা। একটা গুলির শব্দ। আতঙ্কে চিৎকার করে ছুটে এলাম করিডোরের দিকে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে ভয় হলো। তারপর ভেতরে ঢুকলাম, যেন একযুগ হয়ে গেছে। সারা ঘরে বারুদের ধোঁয়া, কার্পেটের ওপর পড়ে আছেন মায়াকোভস্কি। হাত দুটো ছড়ানো। বুকে রক্তের দাগ। শীতকালে সে খুব বিষাদে ভুগত। শীতকাল নিয়ে আমাকে একটা চিঠিও লিখেছিল। সেই শীতকালই নিয়ে গেল তাকে।”

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে মায়াকোভস্কির সঙ্গে পোলানস্কায়ারের শেষ দেখা এবং সেদিনই রিভলভারের গুলিতে কবি আত্মহত্যা করেন। পোলানস্কায়া ধনী পরিবারের অসুখী গৃহবধু। ভালোবাসতেন মায়াকোভস্কির কবিতা ও মুভি। অনেক নারী তার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু আর্থিক দীনতায় ভুগতেন বলে মায়াকোভস্কি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইতেন না। শুধু চেয়েছিলেন পোলানস্কায়াকে পেতে। কিন্তু পোলানস্কায়া সংসার করতে রাজি হননি। মায়াকোভস্কি তাকে বলেছিলেন, “তুষারপাত বড় অসাম্যবাদী। কাউকে করে মিলনমুখর, কাউকে বিরহকাতর। টাকাও তাই। তোমাকে দিয়েছে আভিজাত্য। আমাকে দিয়েছে বেঁচে থাকার ঘাম।” মায়াকোভস্কি কমিউনিস্ট ছিলেন এবং তিনি সমাজতান্ত্রিক সেন্সরশিপের বিপক্ষে মত দিয়ে বলেছিলেন, “এ ব্যবস্থা টিকে থাকবে না।” তার আত্মহত্যার পর আন্নামাখতভা বলেছিলেন, “মায়াকোভস্কি প্রায়ই বলত, সে জর্জিয়ার ঘাসের মতন। তাকে যেন কেউ মাড়িয়ে না যায়, এড়িয়ে যায়। সে ছিল অনেক কোমল মনের। সমাজতন্ত্রের ডিকটেটরশিপ তাই হয়তো মেনে নিতে পারেনি।” কিন্তু মায়াকোভস্কির জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়ায় ১৮৯৩ সালের ১৯ জুলাই জন্ম। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৭ বছর। কিন্তু শৈশবে দেখেছেন বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ, মাতলামি আর মারামারি। যৌবনে বলশেভিক বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করায় তাকে কিছুদিনের জন্য দেশত্যাগ করতে হয়। রিফিউজির জীবন শুরু হয় তার। পার্কে, ফুটপাতে, গাড়িবারান্দায় ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছে। তিনি ‘দ্য ওয়ার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘এবাউট দ্যাট’ এবং আরো বেশ কিছু কবিতার বই লেখেন। তার মুভিগুলো হচ্ছে, ‘দ্য লেডি এ—দ্য হুলিগান’ এবং ‘জিউস অন ল্যান্ড’। মায়াকোভস্কির বন্ধু আন্নামাখতভার জীবনও যেন কুয়াশার কুহকে ঢাকা।

কিন্তু তার আগে আসুন পড়ি মায়াকোভস্কির শীতকাল নিয়ে পোলানস্কায়াকে লেখা সেই চিঠি :

“প্রিয়, জানি যা মরে যায় তা মরে যায়, ফিরে যা আসে তা একইরকম দেখালেও অন্য। শীতের ঝরাপাতা দেখেছো? মরাপাতা দেখেছো? সেবার আমরা দুজনে কিরান পার্কে যখন একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম ঝরাপাতা উড়ছিল। একটা শীতল সাপ গর্তে ঢুকে যাওয়ার মতন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম একেবারেই শৈশবকে মনে পড়ায়। দূরে কোনো স্ট্রিট সিংগার বেহালা বাজাচ্ছিল, মনে আছে তোমার? সন্ধ্যার একটু পর তখন। তুমি আমার কাছে জানতে চাইলে, ‘কাঁপছো কেন?’ বললাম, ‘শীত এলেই মনে হয় মরে যাব। কুঁকড়ে যাই। ফায়ারপ্লাস জ্বালিয়ে ভদকা খেয়ে অথবা তোমাকে কতদিনই বা পাই যৌন উত্তাপের জন্য যে উত্তাপ থাকবে আমার শরীরে? একটা সময় খুব চিঠি লিখতাম। যখন বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম। বাবা-মা-খালা-শৈশবের বন্ধুদের। এরপর যত বড় হলাম চিঠি লেখার অভ্যাসটা মরে গেল। বিশ্বাস করো নিজের কাছেও আমি চিঠি লিখেছি। দেখা গেল রাতে লিখে ঘুমানোর আগে বালিশের নিচে রেখে দিয়েছি। পরেরদিন নাস্তা সেরে খুব আয়েশ করে রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে পড়েছি। এসব কিছু না। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। কিন্তু শীতকাল যেন মদ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকারই জন্যে শুধু। জেগে উঠলেই কুঁকড়ে যাওয়া।”

এবার দেখি চলুন আন্নামাখতভা শীতে কী কাণ্ডকারখানা করছেন! একবার সাইবেরিয়ে গেলেন বেড়াতে। তখন তার বয়স বেশি নয়। স্কেটিং করার সময় তার হঠাৎ মনে হলো সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। তিনি নিজেকে ছেড়ে দিলেন। যা হবার তাই হলো। গড়িয়ে যেতে লাগলেন। বহুদূর গড়িয়ে যাওয়ার পর স্কেটিংরত যে মানুষটির ওপর গিয়ে ধাক্কা খেলেন এবং বেঁচে গেলেন সেই মানুষটি মায়াকোভস্কি। একেবারে মুভি মুভি মনে হচ্ছে। কিন্তু জীবন যে মুভির চেয়েও বেশি নাটকীয়। আন্নামাখতভা ও মায়াকোভস্কি ট্রেনে চেপে একবার আয়ারল্যান্ড যাচ্ছেন। ভীষণ তুষারপাত হচ্ছে। তাদের উল্টোদিকে একজোড়া দম্পতি একটি শিশুসন্তানসহ। শিল্পকলা-দর্শন-সমাজতন্ত্র সবই আলাপ হচ্ছিল মায়াকোভস্কি ও আন্নামাখতভার মধ্যে। এবার ক্যামেরা ধরেন। লংশটে তাদের দেখে থাকলে এবার ক্লোজশটে আসুন। কী দেখছেন, আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে আন্নামাখতভা মায়াকোভস্কিকে চুমু খেয়েই যাচ্ছেন। আর বিড়বিড় করে বলছেন, ‘শীত শীত’।

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

আহা শীত। শেলির মতো শীতকে অনেকেই নিতে পারেননি। শেলির মতন যারা নিয়েছিলেন তাদের কথা পরে বলছি। এর আগে সিলভিয়া প্লাথকে একটু স্মরণ না করলে কেমন দেখায়। ১৯৬২ সাল। এই বছর শতাব্দীর ভয়াবহ শীত পড়ে। প্লাথ তাঁর কন্যা ও পুত্রকে নিয়ে লন্ডনে একটা সস্তা ফ্লাটে ওঠেন যেখানে টেলিফোন লাইন পর্যন্ত ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর টেডের সাথে বিচ্ছিন্নতা এই দুই মিলে প্লাথ বিষণ্ণ থাকেন। আর এমন বিষণ্ণ অবস্থায় তিনি লিখে যান জীবনের সবচেয়ে ভালো কবিতাগুলো। একই সময়েই তিনি শেষ করেন তাঁর একটি মাত্র উপন্যাস ‘দ্যা বেলজার’ যা তিনি পেননেম—ভিক্টরিয়া লুকাস নামে প্রকাশ করেন। এই সময়ে তিনি ২৬টি কবিতা লেখেন যা ‘এরিয়েল অ্যান্ড আদার পয়েমস’ নামে কাব্য সংকলনের স্ক্রিপ্ট রেখে যান। ‘এরিয়েল’ নামের শিরোনাম কবিতাটিতে প্লাথ নিজেকে একজন অশ্বারোহী হিসাবে চিত্রিত করেন। তিনি কখনো দ্রুত ধাবমান ঘোড়ার লাগাম ঠিকভাবে ধরে তাকে সঠিক পথে চালনা করছেন আবার কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। এরিয়েল শুধু ঘোড়দৌড়ের স্মৃতিকথা নয় বরং তা প্রকৃতি, জীবন, ভয়, আর মৃত্যুর কোলাজ। এরিয়েলে তিনি ব্যবহার করেন অনিয়মিত ছন্দ, রেপিটেশন, এবং ধ্বনি যা চিত্রময়তাকে ছাড়িয়ে কবিতাটিকে শ্রুতিময় করে তোলে। প্লাথ সংকলনটির নাম দেন ‘এরিয়েল অ্যান্ড আদার পয়েমস’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, তাঁর মৃত্যুর দু বছর পরে বইটি প্রকাশিত হয় শুধু ‘এরিয়েল’ নামে। আর প্লাথের মনোনীত কবিতাগুলোকে ইচ্ছেমতো বাদ দিয়ে তাঁর অন্য ১৫টি কবিতা সংযোজন করে বইটি প্রকাশ করেন তাঁর প্রাক্তন স্বামী টেড হিউজেস। প্লাথ তাঁর প্রাক্তন এই কবি স্বামী সম্পর্কে একবার লিখেছিলেন—“এই লোকটির প্রতি আমার ঘৃণা ও ক্ষোভ এতটাই প্রবল যে তার সম্পর্কে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতেও আমার ঘৃণা হয়।” সেই প্লাথের মৃত্যু কী মর্মান্তিক! গ্যাস চেম্বারে মুখ ঢুকিয়ে সুইসাইড। ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। সেবারও ভয়াবহ শীত। সেই শীতে তিনি তার পাশের বাড়ির ডাক্তারকে বলেছিলেন, “শীত আর অবসাদ আর সহ্য করতে পারছি না।” কয়েকবার সুইসাইডের চেষ্টা করেছিলেন। অসফল। কিন্তু সেদিনের ঘটনা অন্যরকম। ভোর সাড়ে ৪টা, গৃহকর্ত্রী ও বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত নার্স এসে দেখলেন ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। পরে আরেকজন গৃহকর্মীর সাহায্যে দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল রান্নাঘরের বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্লাথ মৃত পড়ে আছেন।

“শীতকে উদযাপন করো। শীতে বাজারে ওঠে নতুন শাকসবজি। পরা যায় বাহারি পোশাক। ব্লেজার। ব্লেজারের পকেটে রেখে দাও একটু রাম। আর ঘুরে বেড়াও। যৌনতাও খারাপ না। তখন নেই গরীবের ঘাম আর অভিজাতের স্বেদবিন্দু।” কথাগুলো কে বলতে পারেন! সেই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ই। তো, উনারই মতন ছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চেক কথা সাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা। Life Is Elsewhere (জীবন অন্য কোথাও) বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ এর বসন্তকালে। এই বই লেখা প্রসঙ্গে মিলান কুন্ডেরা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বইটি শীতকালে লেখা। সেবার শীতে একটা হোটেলে ছিলাম। প্রচুর মার্টিনো খেয়েছিলাম। আর জানালার পাশে যে টেবিল-চেয়ার ছিল ওখানে বসে তুষারপাত দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে এলো এক কবির কথা। কবির জীবন নিয়ে শুরু করলাম লেখা। সত্যি বলতে কী, উইন্টারে লিখি। মুড ভালো থাকে। বসন্তে ঘুরে বেড়াই।”

উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটি বিপ্লবী সময়ে জন্ম নেওয়া কোনো এক কবি ও তার যৌবন। কবি আর যৌবনকে গল্পকার একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন এখানে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যৌবন হচ্ছে কবিতা তৈরির সময়, কবি হওয়ার সময়। আর কবিতা তরুণদের ন্যায় সদা জাগ্রত, সদা চঞ্চল। একজন কবির জীবনকে ঘিরে (বিশেষত জন্ম, যৌবন, মৃত্যু) তার পরিবার, তার সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী, ইতিহাস এমনকি দর্শন ও সাহিত্য কিভাবে আবর্তিত হয় সেটাই এখানে গল্পকার তুলে ধরেছেন। তবে লেখক এখানে জীবনের ঘটনাবলি তুলে ধরেননি। তিনি তুলে ধরছেন জীবনের সে সকল ঘটনাবলি ‘যা না হতে পারত’। সহজ করে বলতে গেলে গল্পকার এখানে জীবনের এমন সব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যেগুলো হয়তো প্রত্যেকের জীবনেই ঘটার সম্ভবনা আছে, কিন্তু ঘটে না। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন কাটে কিছু শর্তের মধ্যে থেকে। শর্তাধীন জীবন কাটাতে কাটাতে আমরা যখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি তখন আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরেকটি সত্তা আমাদের আরেক ধরনের জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখায়—কিন্তু সে স্বপ্ন নিছকই স্বপ্নই রয়ে যায়।

আরো পড়ুন ➥ স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে The art of the novel প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। লুইস ওপেনহেইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ বই প্রসঙ্গে বলেন, “এই বই শুধু না আমার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জোকস’ও শীতকালে লেখা। শীতকালে আমি খুব স্মৃতিকাতরতায় ভুগি। প্রেমেও পড়ি প্রচুর। আমার প্রথম প্রেমও শীতকালে। তুষারপাতের ভেতর গাড়ি আটকে গিয়েছিল। লেভসিসের (তার প্রথম প্রেমিকা) গাড়িও ঠিক এক জায়গায় আটকে গেল। তুষারঝড় না থামা অব্দি আমরা দুজনেই নিজ নিজ গাড়িতে বসে ছিলাম। থামার পর পরিচিত হই। সেই শুরু প্রেম। থ্যাংকস উইন্টার।”

উইলিয়্ম ফকনর শীতে ঘুরতে বের হন। অথচ পশ্চিমে মানুষ সামারে ঘুরতে বের হয়। ফকনারের এ বিষয়ে অভিমত, “শীতে জগত ভিজে। ভিজে জগতকে দেখলে আমি মাতৃজঠরের কথা বেশি ভালো করে ভাবতে পারি এবং বুঝি যে ওখান থেকে বেরিয়ে না এলে আমি এই সুন্দর জগত দেখতে পারতাম না।”

গ্রেগরি রাবাসা। “ইংরেজি ভাষায় ল্যাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ লেখক”—এই বলে যাকে একদিন ঘোষণা করেছিলেন গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেস। তিনিই প্রথম মার্কেসের জাদুবাস্তবতার অনন্য আখ্যান নিঃসঙ্গতার একশ বছরকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে সারা পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তিনি ১৯১৬ সালে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান। তো তিনি, শীতকালে কোনো কাজই করতেন না। ক্যাসিনোতে ডুবে থাকতেন। নয়তোবা নারীসঙ্গ। নয়তো জিমে। তিনি বলেছিলেন, “শীতে ক্যাসিনো, নারীসঙ্গ ও জিম তিনটিইতেই যে আমি বিভোর হয়ে থাকি সেটির একমাত্র কারণ স্বাস্থ্যরক্ষা। নিজেকে ফিট করে নেওয়া। সামারে মানুষের মধ্যে উৎসবভাব দেখে আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। কারণ যে কোনো উৎসবই ধনী-গরিবের মধ্যেকার সীমারেখাটা বড় করে টেনে দেয়। আই হেইট সামার। হেইট মুনসুন। লাভ উইন্টার। শীতে আমি নারীদের অপেক্ষায় থাকি।” সেইসব নারীরা কি সুপর্ণা? উত্তর জানা নেই।

তবে কবি-লেখকদের মধ্যে মৌসুম একেকরকম প্রভাব ফেলে এটি বেমালুম দেখা যাচ্ছে। হায় মৌসুম। তুমিই ঘুরে ফিরে আসো। জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ‘এখন যে হেমন্তেও হয় বৃষ্টিসন্ত্রাস। আমার জীবনানন্দ বিলাস নিয়ে ঘাসগুলো করে পরিহাস।’ কবি শ্রীজাতের আক্ষেপ তাই জারি রাখা যায় মৌসুমকে তার মতো চরিত্রে ফিরে পাওয়ার জন্যে। নাকি?

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;