প্রেম ও পুরুষের পৃথিবীতে



এনামুল রেজা
হেমিংওয়েও এবং তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদ

হেমিংওয়েও এবং তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদ

  • Font increase
  • Font Decrease

কোনো ভোর ভালো লাগলে, কোথাও বা গড়ের পিছনে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হলে কোনোদিন, কাঁধে হাত রেখেছি নিজের, ‘সত্যি তো, নাকি বই পড়ে শিখেছো?’ হবহু স্মরণ হচ্ছে না লাইনগুলো, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কোনো লেখায় পড়েছিলাম। খুব একটা ধাঁধা কি লেগেছিল? না সম্ভবত।

মানুষের জীবন-যাপনের প্রক্রিয়াটাই এমন যে, সে সবসময় অন্যদের চিন্তা ও কাজ থেকে অনবরত প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হবে। বই পড়ে হোক, সিনেমা দেখে হোক, এমনকি যে লোকটা বছরভর কেবল ক্ষেতে কাজ করত অন্য চাষীদের সঙ্গে আর নবান্নের মেলায় বায়োস্কোপে আইফেল টাওয়ার ও সংসদ ভবন দেখত, ব্যক্তি হিসেবে সেও ছিল অন্যদের থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার এক সমষ্টিমাত্র।

এতসব কথা আমার মগজে ভিড় করছে মূলত রবার্ট খোন সম্পর্কে জেক বার্নসের একটা মন্তব্যে। এরা দুজনেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য সান অলসো রাইজেসের চরিত্র। উপন্যাসটার আরো এক আদুরে নাম আছে। ফিয়েস্তা। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজনের ভাষায় শব্দটাকে আত্মীকৃত যদি করি, সরলার্থে একে বলা চলে ‘আইড়ের নাড়ই’ (ষাঁড়ের লড়াই)।

২.

১৯২০ সনের পারি নিয়ে যতই লিখি, যেভাবেই লিখি, আমার মুগ্ধতা ও অবসেশন ওতে ঠিক পরিষ্কার হবে না। যে প্রাচীন নগরীকে এখনো দেখা হয়নি সশরীরে, সময়টিতে ফিরে যাওয়াও অসম্ভব, যে সকল মানুষেরা শুধুই আমার বই ও মিডিয়ালব্ধ স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, তাদের নিয়ে কেন এই কাতরতা?

ওই সময়ে সারা পৃথিবীর বিবিধ প্রান্তের শিল্পীরা এসে ভিড় জমাচ্ছেন পারির টালি বিছানো পথঘাট, বুলেভার্দ আর কাফেগুলোয়। ফরাসি দেশের এই রাজধানী তখন পৃথিবীর সমস্ত চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, কবি, ফিল্মমেকার, গায়ক অথবা ভাস্করদের জন্য স্বর্গভূমি।

কম খরচে থাকা-খাওয়া যায়, চেষ্টা চরিত্র করলেই বন্ধুদের থেকে ধার মেলে, এমনকি ভাগ্য ভালো থাকলে বিত্তশীল কোনো শিল্প-অনুরাগীর সঙ্গ মিলে যায় যিনি নির্দ্বিধায় অর্থ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এছাড়া সমমনাদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সুযোগ তো আছেই। দিন-রাত যে কোনো সময় চলতে পারে আড্ডা। নৃত্য ও মদের আসর। বিখ্যাত-অখ্যাত যে কেউ যে কারো সঙ্গে মুহূর্তে মিশে যাচ্ছেন, তুমুল তর্কে টেবিল চাপড়ে একে অন্যের উপর রেগে গিয়ে ঝাঁপ দিচ্ছেন।

হারানো প্রজন্মের পারি সম্পর্কে এমনটাই তো জেনে এসেছি আমরা চিরকাল। কিন্তু সময়টা আসলেই কি শুধু আনন্দ-হিল্লোলে পূর্ণ ছিল? নাকি অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের শোরগোল ঢেকে ফেলেছিল একটা মহাযুদ্ধ আর অজস্র মৃত্যুর গ্লানি বয়ে বেড়ানো অসংখ্য তরুণ শিল্পীর চাপা আর্তনাদ? হারানো প্রজন্ম কেন বলা হতো ওদেরকে?

গত শতকে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে শিল্প-সাহিত্যের বিপ্লব ঘটে যাবে যাদের হাতে, সেসব তরুণেরাই তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন পারির সেইসব আড্ডা। এদের মাঝে হেমিংওয়েও ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৈরাশ্য ও প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে করে আমেরিকার কানসাস থেকে এই ফরাসি শহরে তরুণ হেমিংওয়ে এসেছিলেন নতুন জীবনের আশা নিয়ে। ফরেন করেসপন্ডেন্ট হিসেবে সাংবাদিকতা করছেন দিনে, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছেন স্বদেশি ও বিদেশি অন্যান্য এক্সপেট্রিয়েটদের সঙ্গে। আর লিখছেন। এসমস্ত দিন রাত্রির অভিজ্ঞতা থেকেই যে সান অলসো রাইজেসের জন্ম হয়েছিল, বইটা পড়তে পড়তে খুব টের পাওয়া যায়।

একদল যুবক-যুবতী ঘুরে বেড়াচ্ছে পারির এমাথা ওমাথা। এক কাফে থেকে আরেক কাফেতে ঢুকছে। একটু পরপরই গিলছে মদ। গল্প করছে। মদ গিলছে। লিখছে। প্রেম করছে। গান শুনছে বা গাইছে। আর মদ গিলছে।

খালি চোখে এদের জীবনের যেন কোনো উদ্দেশ্য নেই। আনন্দের সমস্ত উপকরণ ছড়ানো ছিটানো চারপাশে। খোলা চোখে স্বাধীনতাও অবাধ। মূল্যবোধের চিন্তা নেই, চার্চের শেকল নেই, নেই প্রশাসনের কড়াকড়ি। কিন্তু সবকিছুর মাঝেই যেন কী রকমের এক তিক্ততা। উপরে সবার হাসিমুখ। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সবাই জানে, কেউ তারা সুখী নয়, নিত্যদিন যে যার নিজস্ব হতাশায় ডুবসাঁতার খেলছে। কোথাও কিছু একটা যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে রোজ। সুতরাং, একদিন তারা ঠিক করল পারির এই চিরচেনা কাফে সোসাইটি থেকে কিছুদিনের মুক্তি তাদের চাই।

স্পেনের পামপ্লোনায় এগিয়ে আসছিল ফিয়েস্তার মৌসুম। বই পড়ে পড়ে পারির ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠা রবার্ট খোন, সাংবাদিক ও গোপনে লেখক হবার অভিলাষি জেক বার্নস, ইতোমধ্যেই কিছু খ্যাতি ও অর্থের মুখ দেখা ঔপন্যাসিক বিল গর্টন ঠিক করে ফিয়েস্তা দেখতে যাবে তারা। যাত্রাপথে বেয়োন হয়ে স্পেনের বারগুয়েতে শহরে থামবে, পাহাড়ি নদী ইরাতিতে শিকার করবে ট্রাউট। সঙ্গে যোগ দেবে ব্রেট এশলি এবং তার বর্তমান প্রেমিক মাইকেল। ব্রেট এমন এক নারী যে অনবরত সঙ্গী বদল করায় আগ্রহী, যখন তখন যে কোনো পুরুষের প্রেমে পড়ে যেতে পারে সে।

পারির চিরচেনা ও নীরস হয়ে উঠতে থাকা জীবনের বাইরে গিয়ে ওরা সবাই কি নিজেদের আবিষ্কার করবে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াইয়ের উন্মাদনায়? যেই উন্মাদনা, উন্মত্ত ষাঁড় ও এফিসিয়ানেডোদের ভিড়ে একদল পুরুষ মুখোমুখি হবে যার যার পৌরুষ ও অহমের সঙ্গে?

৩.

খুব চিত্তাকর্ষক কোনো গল্প উপন্যাসটা বলে না। মূলত গল্পটা ক্লান্তিকর। অন্যদিকে এই ক্লান্তির বর্ণনা হেমিংওয়ে যে ভাষায় আমাদের শোনান, তা উত্তেজক। সোজাসাপ্টা সংলাপের মাধ্যমেই চরিত্র নির্মাণ হতে থাকে। উপন্যাসের পরিবেশে কেমন ঘুরপাক খেতে থাকে প্রচ্ছন্ন কুয়াশা।

চরিত্রগুলো খুবই জীবন্ত। এবং এরা বৈচিত্র্যময়। অতীতে যে যা করে এসেছে, এমন নয় সেইসব ঘটনাবলি এই বৈচিত্র্যময়তার ভিত্তি। চরিত্রগুলো আসলে বিচিত্র হয়ে ওঠে তাদের প্রায় কোনো কিছুই না করে সময় কাটিয়ে দিতে পারবার ক্ষমতার মধ্যে। উপন্যাসের ভাষা আর এদের দিন যাপন মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে চলে প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

হেমিংওয়ের বিখ্যাত রচনাশৈলির প্রমাণও যথাযথ মেলে। যা বলা হচ্ছে না, তা মূলত লুকিয়ে আছে যা বলা হচ্ছে সে সমস্ত শব্দের নিচেই। জেক বার্ন্স ব্রেট এশলির প্রেমে অন্ধপ্রায়, বহুগামী হলেও জেককে অপছন্দ করে না ব্রেট, কিন্তু কেন তারা প্রেম করতে পারে না? কোথাও এই কারণ স্পষ্ট করে বলা হয় না, ইঙ্গিত দেওয়া হয় মাত্র। কিন্তু পাঠক বুঝে নিতে পারে। অন্তত বুঝবার চেষ্টা করলে তা বৃথা যাবে না বলেই মনে হয়।

বাড়তি পাওনা হিসেবে মেলে এক আমেরিকান লেখকের ইউরোপিয়ান পরিবেশ, প্রকৃতি ও পাশ কাটিয়ে যাওয়া বিদেশি মানুষদের সংক্ষিপ্ত অথচ প্রায় দৃশ্যমান ও মনোজ্ঞ বর্ণনা। উপন্যাসিক হিসেবে হেমিংওয়ের জনপ্রিয়তার অনেকগুলো কারণের একটা জবর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় এই ব্যাপারটি থেকে। মার্কিনীরা বিশ্বাস করে স্বতন্ত্র্য জাতিসত্তা হিসেবে একটা মজবুত পরিচয় আছে তাদের, সেই পরিচয় নিয়ে বিদেশের মাটি ও সংস্কৃতির মাঝখানে কিভাবে তাদের এক লেখক পৃথিবীকে আবিষ্কার করছে? আর কোনো কারণ যদি নাও থাকত, আমেরিকানরা শুধু এই একটা ব্যাপার জানবার ইচ্ছেতেও হেমিংওয়েকে নিজেদের বুকশেলফে জায়গা দিতে পারত অনায়াসে।

৪.

যে মন্তব্যের ইশারা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে আসা যাক। উপন্যাসের এক যায়গায় জেক বার্নস জানায় যে, রবার্ট খোন এক ফরাসি লেখকের বই খুব পড়ছে আজকাল, যার বইয়ের পৃষ্ঠা ভরে আছে পারির দুর্নামে। সে অনুমান করে, পারি আর খোনকে টানছে না কেননা তার ওই পছন্দের লেখক বলছেন পারি ভালো না। অর্থাৎ খোন মূলত বই থেকে শেখা জীবন কাটাতে চায়, বা না চাইলেও সে আদতে তার পছন্দের লেখকদের বই থেকে উঠে আসা একটা চরিত্রই হয়ে ওঠে প্রতিনিয়ত। সে বিবাহিত ও ডিভোর্সি, দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করে কোনো নারীকে সে নিষ্ঠুরের মতো ছেড়ে দিতে পারে, নিদারুণ প্রত্যাখ্যানের পরেও ব্রেটের পেছনে সে আঠার মতো লেগে থাকতে পারে নির্দ্বিধায়।

কিন্তু জেক বার্নস কি তেমনটা চায়? তুর্গেনেভের ‘আ স্পোর্টসম্যানস স্কেচেস’ সে নিয়মিত পড়ে, যখনই মন অশান্ত থাকে, এ বই পড়লে তার ভালো লাগে। এছাড়া আরো অনেক দৃশ্যে দেখি সে বই পড়ছে, মাছ ধরবার অবসরে, ট্রেনের কামরায়। কিন্তু বাস্তবতা দিয়ে সে বড় বেশি পীড়িত, যে কারণে খোনের মতো সে হতে পারে না। তার মেকি আচরণে জেক বিরক্ত হয়, আবার বন্ধু হিসেবে ওকে সে পছন্দও করে।

ঠিক এমন দুটি পাশাপাশি চরিত্র তৈরি করে হয়তো হেমিংওয়ে নিজেকে তার অন্যান্য এক্সপেট্রিয়েট লেখকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চান। লেখক হিসেবে তার নিঃসঙ্গ যাত্রা শুরু হয়। সাংবাদিক ব্রুস বার্টনের কলমে লেখা হয় সেই বিখ্যাত উক্তি, “লোকটা এমনভাবে লেখে যেন আগের কোনো লেখকের রচনা সে পড়েনাই, লেখালেখির কৌশলটা যেন সে নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছে।”

৫.

এই উপন্যাসের নাম কেনই বা ফিয়েস্তা আর কেনই বা দ্য সান অলসো রাইজেস?
সম্ভবত, হেমিংওয়ে তার প্রেম ও পৌরুষেয় দর্শনের যোগ্য রূপক খুঁজে পেয়েছিলেন ষাঁড়ের লড়াইয়ের মাঝে। ষাঁড় এক বুনো অদম্য শক্তি, তার সঙ্গে ডিল করে বুদ্ধিমান ও চৌকষ বুলফাইটার। যে লড়াইয়ে ষাঁড় মরবে এটাই প্রত্যাশিত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দর্শকেরা চায় বুলফাইটার বিপদে পড়ুক, যত বিপদ তত উত্তেজনা। লড়াকুর এক মুহূর্তের ভুলে প্রমত্ত ষাঁড়ের ধারালো শিং বিঁধে যেতে পারে তার দেহে আর মৃত্যু হতে পারে নিমেষেই।

পুরুষ চরিত্রগুলো অনবরত ঘুরতে থাকে একজন নারীকে কেন্দ্র করে। হিংসা এক নতুন মাত্রা পায় তাদের জীবনে। সবাই তাকে পাবে না, এটা জেনেও প্রত্যেকেই যেন এক অলিখিত যুদ্ধে নামে। পুরুষ মূলত মৃত্যুমুখী, এটাই কি হেমিংওয়ে বলতে চান?

আজ থেকে বহুদিন আগে কথাশিল্পী আবুল ফজল এই উপন্যাসটির ধারহীন এক অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু তার দেওয়া বাংলা নামটা ছিল তুলনাহীন। তবুও সূর্য ওঠে। ফিয়েস্তার রঙিন ও রক্তাক্ত দিন পেছনে ফেলে ওরা সবাই তাদের পুরনো জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। যে নৈরাশ্য থেকে কয়েকদিনের মুক্তি চেয়েছিল এই দুখি মানুষের দল, ওরা বোঝে যে পুরনো ক্ষতের কাছেই তাদের ফিরে যেতে হবে। কেননা যে নদীর তীরে অন্ধকার নামে, সেই একই তীরেই তো সূর্য ওঠে, আবার।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;