শামসুর রাহমান যেভাবে আমাদের হলেন

ফরিদ কবির
শুভ জন্মদিন শামসুর রাহমান

শুভ জন্মদিন শামসুর রাহমান

  • Font increase
  • Font Decrease

কবি শামসুর রাহমানকে আমার প্রায়ই মনে পড়ে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কেন? অনেকে এও বলতে পারেন তাঁর কবিতা তো আমরা পড়ি না। তারা কী পড়েন, কার লেখা পড়েন, কেন পড়েন—এমন প্রশ্ন করার আগ্রহ আমার নাই। আমি যদি ধরেও নিই, তাঁর কবিতা পড়ার প্রয়োজনীয়তা আমাদের ফুরিয়ে গেছে, তাহলেও শামসুর রাহমান আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। একই সঙ্গে একথাও বলতে হবে, শামসুর রাহমানের কবিতা এতটাই প্রভাবসঞ্চারী যে বাংলাদেশের কবিতায় তিনিই একমাত্র কবি যার প্রভাব আমার ধারণা, এখনো একেবারে অপসৃত হয়নি। এখনো অনেক কবিই অজান্তে তাঁর ভাষা ও প্রকরণ অনুসরণ করে চলেছেন। যেমনটা হয়তো শামসুর রাহমানও এক অর্থে ছিলেন জীবনানন্দ দাশের কাব্যভাষারই উত্তরসূরী।

আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হকসহ দু-একজন ব্যতিক্রম বাদে রফিক আজাদ, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে খোন্দকার আশরাফ হোসেনসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল কবির কাব্যভাষায় শামসুর রাহমানের প্রবল উপস্থিতির কথা অস্বীকার করা মুশকিলই। এমনকি এখনো আমাদের অনেক কবি আসলে তাঁর ভাষা ও প্রকরণ সামান্য অদলবদল করে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে বহন করে চলেছেন তাঁরই উত্তরাধিকার। এমন উদাহরণ আমি অনেক দিতে পারব।

এই যে একজন কবি তাঁর পরবর্তী কবিদের ওপর প্রভাব জারি রাখতে পারলেন দীর্ঘদিন ধরে এটিই তাঁর সাফল্য, এরই মাধ্যমে তিনি আসলে জায়গা করে নিয়েছেন এদেশের কবিতার ইতিহাসে। এখন তাঁকে কে পাঠ করল বা না করল তাতে কিছুই তাঁর যায় আসে না। এবং এটাও সত্যি, তাঁর কবিতা যে এখনকার নবীন কবিরা তেমন পড়েন না তার কারণ তৈরি হয়েছে আশির দশকেই। সে সময়ে একঝাঁক তরুণ কবি বাংলা কবিতার শামসুরীয় ধারাকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করে নতুন এক কাব্যধারার উন্মেষ ঘটান। তাঁর কবিতা না পড়ার পেছনে একদিকে যেমন তাঁকে অস্বীকার করার মানসিকতা কাজ করেছে, তেমনি আছে তাঁর কবিতার প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়ার ভয়ও। আমার তো মনে হয়, শামসুর রাহমানের কবিতার এমন এক আগ্রাসী শক্তি আছে যা অপেক্ষাকৃত তরুণ কবিদের আকৃষ্ট করতই।

যদি এমনও হয়, শামসুর রাহমান আর কেউ পড়ছে না, তাতেই কি তিনি বিস্মৃত হয়ে যাবেন? আমার তাও মনে হয় না। একটা-দুটো পঙক্তি, বা কোনো বিশেষ উপলক্ষে লেখা তাঁর কোনো কোনো কবিতা এখন জড়িয়ে আছে আমাদের এই দেশের এমন কিছু ঘটনা ও ইতিহাসের সঙ্গে যে তাঁকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা কঠিনই। হোক তা তাঁর একটি অত্যন্ত দুর্বল কবিতা। এদেশ যতদিন থাকবে তাঁর ‘স্বাধীনতা তুমি’ বা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম উচ্চারিত হবেই। যতক্ষণ না আর কোনো কবিতা নতুন এবং আরো সর্বগ্রাসীরূপে তাকে ছাপিয়ে না যাচ্ছে।

না। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে আসলে এই লেখা লিখতে বসিনি। শামসুর রাহমানকে আমার মনে পড়ে অন্য নানাবিধ কারণে। একজন মানুষকে যেমন মানুষ হয়ে উঠতে হয়, একজন কবিকেও তেমনি কবিও হয়ে উঠতে হয়। তার ছাপ তাঁর জীবনাচরণেও পড়তে বাধ্য। তাঁর মধ্যে এমন কিছু আছে যে এখনো ‘কবি’ এই শব্দটি উচ্চারণমাত্র আমার তাঁর মুখটাই মনে পড়ে। চোখের সামনে তাঁর মুখটাই ভেসে উঠতে দেখি।

আমার এক কবিবন্ধু সাখাওয়াৎ টিপু একদিন বলছিলেন, শামসুর রাহমান তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। এমন কথা আমি বহুজনের মুখে শুনেছি। তাঁর কালের কবি-শিল্পীরা যেমন তাঁর কথা বলতেন, তেমনি অনেক সাধারণ মানুষও যারা এক-দুবার তাঁর সান্নিধ্যে গেছেন, তারা তাঁকে ভুলতে পারতেন না। এর অর্থ, কবি হোক বা না হোক, শামসুর রাহমান সবাইকেই একই রকমভাবে কাছে টেনে নিতে পারতেন। মিশতে পারতেন যে কারোর সঙ্গেই। এমনকি, তিনি ছোট-বড় সকলকেই সম্বোধন করতেন ‘আপনি’ বলে। এর জন্য অনেক বড় একটা কলিজার দরকার হয়। কাউকেই আমি অসম্মান করতে দেখিনি তাঁকে।

আমি তো আমার অনেক কবিবন্ধুকে দেখি, লোকজনের সঙ্গে মেশার ব্যাপারে তারা খুবই শুচিবায়গ্রস্ত। সকলের সঙ্গে তারা মিশতে পারেন না। শামসুর রাহমান মিশতেন সকলের সঙ্গেই। কেউ তাঁর দপ্তরে বা বাড়িতে গেলে তাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানাতেন।

অনেক তরুণ কবিকেই তিনি নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। একটা ঘটনার উল্লেখ এখানে না করলেই নয়। ১৯৮৭ কি ৮৮ সাল। আমার ছোট ভাই তখন পড়াশোনা শেষ করে একেবারেই বেকার। আমি একদিন দৈনিক বাংলায় তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক। তাঁকে বললাম, রাহমান ভাই, আমার ছোট ভাইকে একটা চাকরি জোগাড় করে দেন। রাহমান ভাই সাজ্জাদকে চিনতেন। ওর কবিতা খুবই পছন্দ করতেন। তিনি বললেন, আচ্ছা, চেষ্টা করব।

বাংলাদেশ জেনারেল ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে সাজ্জাদের চাকরি হয়ে গেল। পরে জেনেছি, সেখানে তিনি কবি ত্রিদিব দস্তিদারেরও চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সম্প্রতি আমাকে ‘আওয়ার টাইম’ পত্রিকার সাংবাদিক ফাকরুল চৌধুরী জানালেন, আমি বলে দেবার পরই নাকি ওরও চাকরির ব্যবস্থা হয়েছিল ‘মূলধারা’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকায়। রাহমান ভাই তখন সে কাগজের সম্পাদক।

রাহমান ভাই শুধু কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে অভিভাবকের মতো। যে কোনো বিপদে, সমস্যায় আমরা অনেকেই তাঁর কাছে ছুটে যেতাম, তাঁর পরামর্শ নিতাম। যে কোনো তরুণকে তিনি কিভাবে এতটা প্রশ্রয় দিতে পারতেন, তা ভাবলে এখনো আমার বিস্ময়ই জাগে।

রাহমান ভাই ছিলেন তরুণদের চাইতেও তরুণ। কেমন সেটা?
১৯৮৫ সাল। কলকাতায় আবৃত্তিলোক আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী একটা কবিতা উৎসবের দাওয়াত পেয়েছি আমরা বেশ কয়েকজন। উৎসব কর্তৃপক্ষ কলকাতায় আমাদের থাকা-খাওয়া ছাড়াও বিমানে আমাদের যাতায়াতেরও ব্যবস্থা করবে। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনসহ আমরা সড়কপথেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাতে টাকা বাঁচিয়ে সেটা দিয়ে বইপত্র কিনতে পারি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ ও রুবী রহমানসহ অন্য কবিরা বিমানে যাবেন, তেমনই ঠিক হলো। এরই মধ্যে শামসুর রাহমান একদিন জানতে চাইলেন, আমরা কিভাবে যাচ্ছি?
আমি বললাম, রাহমান ভাই, আমরা তো বাই রোড যাচ্ছি। বেনাপোল হয়ে।
শুনে তিনি বললেন, কেন, বিমানে যাচ্ছেন না কেন?
আমি মজা করতে বললাম, বিমানে গেলে তো কিছুই দেখা হবে না। হাওয়ায় ভেসে চা খেতে খেতেই দেখব কলকাতা পৌঁছে গেছি! আমরা আসলে অনেক কিছু দেখতে দেখতে যেতে চাই।
রাহমান ভাই বললেন, বাই রোড কে কে যাচ্ছেন?
আমি নামগুলো বলতেই দেখি তাঁর চোখ চকচক করছে! তিনি প্রায় ছেলেমানুষের মতো বললেন, আমিও তবে আপনাদের সঙ্গেই যাব।
আমি বললাম, রাহমান ভাই, এ বয়সে এত লম্বা জার্নি আপনার পোষাবে না। সারা রাত বাসে বসে যাওয়া আপনার জন্য অনেক কষ্টকর হবে। আপনি প্লেনেই যান।
রাহমান ভাই বললেন, বাস জার্নি যদি আপনাদের জন্য কষ্টকর না হয়, তবে আমার জন্যও হবে না।
আমি তাঁকে অনেক বলেও নিরস্ত করতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত তিনি দলছুট হয়ে আমাদের সঙ্গে বাসেই কলকাতা রওনা হলেন।

তখন এত আরামদায়ক বাস যেমন ছিল না, তেমনি ভ্রমণও এত মসৃণ ছিল না। আরিচা গিয়ে আমাদেরকে লঞ্চে উঠতে হতো। তারপর ওপার গিয়ে নতুন একটা বাসে উঠতে হতো।

শামসুর রাহমান সাধারণ মানুষের কাছে কতটা প্রিয় ছিলেন তা আমাদের জানা ছিল না। বাসে-লঞ্চে সর্বত্রই আমাদের আড্ডা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। নানান শ্রেণির মানুষ এসে তাঁর সঙ্গে আলাপ জমাতে আসছিলেন। অনেকে তাঁর অটোগ্রাফ নিচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন সেলিব্রেটিও।

আরেকটা ঘটনা বলেই, এ লেখা শেষ করব।
শামসুর রাহমানকে কখনোই আমার দরিদ্র মনে হতো না। কিন্তু তিনি আদতে তেমন ধনী ছিলেন না। কিন্তু বিপদে পড়ে কেউ তাঁর কাছে একবার পৌঁছুতে পারলে তাকে ফেরাতেনও না।

১৯৮৬ সাল। আমার তখন প্রচণ্ড আর্থিক অনটন চলছে। আমার বন্ধুদের বেশিরভাগই তখন বেকার। যে দু-চারজন চাকরি করেন, তাদেরও ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। আমার মনে পড়ল, একবার বিপদে পড়ে আমারই কবিবন্ধু তাঁর কাছ থেকে একবার ধার করেছিলেন। আমার কেন জানি মনে হলো, রাহমান ভাই আমাকে ফেরাবেন না। আমি দৈনিক বাংলা অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তখন সম্পাদক হলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আমাদের এপয়েন্টমেন্ট-টেপয়েন্টমেন্ট করতে হতো না। আমরা তাঁর রুম কিছুটা খালি দেখলেই দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়তাম। সেদিনও তেমনভাবেই ঢুকলাম। ভেতরে বেশ কয়েকজন কবি ও সাংবাদিক বসে ছিলেন। আমি চুপ করে একপাশে বসে রইলাম। তারা চলে গেলে রাহমান ভাই আমার দিকে ফিরলেন। স্বভাবসুলভভাবেই হেসে কেমন আছি জানতে চাইলেন।
আমি বললাম, রাহমান ভাই আমি খুব বিপদে পড়েছি। আমাকে কি একটু হেল্প করা যায়?
শুনে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
কী বিপদ বলেন তো? জানতে চাইলেন তিনি। তাঁর কণ্ঠ বরাবর আন্তরিক।
বললাম, রাহমান ভাই, আমার কিছু টাকার দরকার।
আমি তাঁর কাছে টাকা চাইতে পারি এটা সম্ভবত তিনি আঁচ করতে পারেননি। তিনি কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তবে মুহূর্তেই সেটা সামলে নিয়ে বললেন, কতো?
আমি বললাম, হাজার দুয়েক।
রাহমান ভাই চুপ করে থাকলেন। আমি তখন তাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেও ঘামতে শুরু করলাম টেনশনে।
রাহমান ভাই কিছুক্ষণ পর মুখ খুললেন—এখনই লাগবে?
আমি মাথা নাড়লাম। মানে, এখনই লাগবে।
তাঁর পকেটে সম্ভবত অতো টাকা ছিল না। তিনি আমাকে বললেন, এত টাকা তো আমার কাছে নেই। ঘণ্টাখানেক কোথাও থেকে ঘুরে আসেন। দেখি কী করা যায়।
আমি উঠে এলাম।
ঘণ্টাখানেক পর তাঁর রুমে আবার গেলাম। তাঁর রুমে অনেক লোকজন। রাহমান ভাই আমার দিকে একটা খাম এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, এটা রাখেন।
রাহমান ভাই সেই টাকা আমার কাছে কখনো ফেরত চাননি। কখনোই না। আর, আমারও সেই টাকা তাঁকে ফেরত দেওয়া হয়নি।

অল্প বয়সে আমরা ভাবতাম, তিনি হয়তো বেশ পয়সাঅলা! কিন্তু পরে, ধীরে ধীরে জেনেছি, তিনি খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। পরে এও শুনেছি, তাঁর তেমন কোনো সঞ্চয়ও ছিল না! দৈনিক বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাঁর আয়ের পথ প্রায় ছিলই না। প্রকাশকরা তাঁকে ঠিকমতো টাকা-পয়সা দিত না। ‘অধুনা’ বা ‘মূলধারা’র মতো কিছু সাহিত্য পত্রিকায় তিনি কিছুদিন কাজ করেছিলেন। বাকি সময়টা তিনি প্রায় লিখেই কাটিয়েছেন। জীবনের শেষ সময়টা তাঁর কেটেছে বেশ অর্থকষ্টের মধ্যেই। তবে, তাঁর সৌভাগ্য, অনেক তরুণের হৃদয়ে তিনি নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। অনেকেই তাঁর কাছে যেতেন।

শামসুর রাহমান, সব শ্রেণির, সব বয়সের মানুষকেই গ্রহণ করতেন আন্তরিকভাবে। তাঁর মুখে লেগে থাকত তাঁর চিরপরিচিত মৃদু হাসিটুকুও।
তেমন প্রশ্রয়, তেমন হাসি এ জগতসংসারে আর দেখি না।

আপনার মতামত লিখুন :