ট্রিহাউসে থিম পার্টি



মঈনুস সুলতান
বনানীতে বৃক্ষকুটির। ছবি: লেখক

বনানীতে বৃক্ষকুটির। ছবি: লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজপথ ছেড়ে পয়দলে চলে আসি ছাঁতা ধরে ঝুরঝুরে প’ড়ো কাঠের দোতালা বাড়িটির পেছনে। এদিকে ঝোপঝাড় ও গাছবিরিক্ষে রীতিমতো জংলা হয়ে আছে। একটু দাঁড়াই, রোডম্যাপটি নজর করে দেখি। পথের ডিরেকশন দিয়ে লেখা বর্ণনায় ভাঙ্গারোঙ্গা দোতালা বাড়িটির উল্লেখ আছে দেখে খুশি হই। কৃপার হস্তাক্ষর চেয়ে দেখার মতো লীলায়িত, রোডম্যাপের টুকরো কাগজটি থেকে ছড়ায় ধূপকাঠি বা আতরের গন্ধ।

ঘাড় অব্দি নেমে আসা কোঁকড়ানো কালো চুলের শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে নিকট-অতীতে নজর করে দেখেছি বার কয়েক ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস্-এর দু-একটি কোর্সে ক্লাস করার সময়। তার নাম ‘কৃপা’, এবং নামের মর্মার্থ সম্পর্কে মেয়েটি সচেতন, বিষয়টি আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। অন্তরঙ্গভাবে কৃপার সঙ্গে বাতচিত করার প্রথম মওকা সৃষ্টি হয়—সতীর্থদের সাথে মিলেঝুলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী একটি উপবনে অভার-নাইট রিট্রিট করতে গেলে।

অপরাহ্ণে হ্রদের পাড়ে দলবেঁধে প্রচুর হল্লাগুল্লা হচ্ছিল, হাতে হাতে ঘুরছিল বিয়ারের ক্যান, বার্বিকিউ চড়িয়ে আগুনের গনগনে আঁচে ঝলসানো হচ্ছিল সচে জারিত চিকেন, বিফ স্টেক ও র্যসেট পটেটো। কৃপা কিন্তু বনভোজনের রমরমে পরিবেশ থেকে বেশ দূরে, হ্রদের অপর পাড়ে প্রকাণ্ড একটি বোল্ডারের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে পাঠ করছিল পেপারব্যাকে ভারতবর্ষের পঞ্চতন্ত্রের কেসসা-কাহিনী।

আমি বাইনোকুলার হাতে অনুসরণ করছিলাম ইস্টার্ন ব্লু বার্ড নামে দারুণ রকমের নীল একটি পাখি। খেচরটি চঞ্চল ডানায় আসমানী রঙের অঞ্জন ছড়িয়ে বোল্ডারের উপর দিয়ে পেছনের ঘন বনে আউড়ি দিলে, আমি তার তালাশে এসে পড়ি প্রকাণ্ড পাথরটিতে চুপচাপ বসে থাকা কৃপার কাছাকাছি। পেপারব্যাক থেকে চোখ তুলে মৃদু হেসে সে ফিরে যায় পাঠে। হাঁটুর খানিক নিচ অব্দি কাটআউট জিন্স পরেছিল কৃপা। তা ছাপিয়ে মেয়েটির আলতা পরা খালি পা আমাকে স্মৃতিবিধুর করে তুলেছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কৃপা, ডু ইউ নো হোয়াট আর ইউ উয়ারিং ইন ইয়োর ফুট?’ সে বইটির পাতা মুড়ে রেখে জবাব দিয়েছিল, ‘ইট ইজ কল্ড আলতা, তুমি কথা বলতে চাইলে.. হপ অন অভার, বোল্ডারের ওপর উঠে বসো, উই ক্যান চ্যাট আ বিট।’ অই বিকালে নীলাঞ্জন ছাড়ানো ইস্টার্ন ব্লু বার্ডটির আর কোনো সুলুক সন্ধান করা হয়নি। তবে কৃপার পিতা-মাতা ও তার শৈশবের আপব্রিংগিং সম্পর্কে বেশ খানিকটা জানতে পেরেছিলাম।

কৃপার বিষয়-আশয় নীরবে তর্পণ করতে করতে একটু অন্যমনষ্ক হয়েছিলাম, খেয়াল করে দেখি, এসে পড়েছি লালচে মোরাম বিছানো এক মেঠোপথে। ফের ডিরেকশন ঘেঁটে, সাবধানে হেঁটে বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে আমি এসে পড়ি পমপাস গ্রাস নামে সুদীর্ঘ ঘাসের উপবনে। লিকলিকে এ তরুটির ডগায় দুলছে কাবুলি বিলাইয়ের পশমি লেংগুড়ের মতো শুভ্র প্রসূন। এখানে ইন্টারেস্টিং আরেকটি বস্তু দেখতে পাই। জংধরা লোহার খুঁটিতে ঝুলছে আদ্দিকালের কুচকুচে কালো একটি রোটারি টেলিফোন। রিসিভারটি পেঁচিয়ে উঠেছে কোঁকড়ানো লতা। তার তলায় চড়ুই পাখি বেঁধেছে নীড়। তা ছাড়িয়ে যেতে যেতে মসের পুরু স্তরে সবুজ হয়ে ওঠা একটি ঘরের পাথুরে ভিতও দৃশ্যমান হয়। সিড়ির তলা থেকে সরসরিয়ে বেরিয়ে আসে তেড়াবেড়া লেংগুড়অলা একটি কাঠবিড়ালী। আমি বুনো মার্জারটিকে অবজ্ঞা করে ডিরেকশন মোতাবেক আরো খানিক হাঁটি। রবার্ট ফ্রস্ট্র ট্রেইলের এখানে পাইন ও ফারের বনানী নিবিড় হয়ে ওঠে। ফের হাতে লেখা ডিরেকশনের দিকে তাকাই। জং ধরা কয়েকটি গাড়ির কংকালের আড়ালে সড়কের সার্প বাঁকটি খুঁজে পেতে অসুবিধা কিছু হয় না।

সামনে সবুজ ঘাস কেটে মেঠো ট্রেইলটি চলে গেছে অরণ্যের আরো গভীরে। জায়গাটি এমন নির্জন হয়ে আছে যে শরীর আপনা আপনি সতর্ক হয়ে ওঠে। আমি পা টিপে টিপে আগ বাড়ি। কিন্তু ক্লান্ত লাগে, কেন জানি নিঃসঙ্গতা ঝেপে আসে। ট্রেইলের পাশে একটি বড়সড় বোল্ডার দেখতে পেয়ে তাতে চড়ে বসে পাইপে ট্যবাকো পুরি। স্মোক করতে করতে ফের কৃপার প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবি। রিট্রিটের নৈশপার্টিতে কৃপা অজন্তার শিলাপাথরে বিধৃত নারীদের কায়দায় নাভির নিচে ডুরে শাড়িটি পরে ফায়ারপ্লেসের পাশে এসে দাঁড়ালে তার সতীর্থ ছেলেদের মধ্যে তৈয়ার হয়েছিল যৎসামান্য সেনসেশন। কৃপা দৃশ্যমান হয়েছিল দারুণভাবে, কিন্তু কারো সঙ্গে ঠিক মিশতে পারছিল না।

নৈশপার্টির আজাইরা বৈঠক এক পর্যায়ে বোরিং হয়ে উঠেছিল। আমি একটু ফ্রেশ এয়ার পেতে চাপলিশে উঠে এসেছিলাম ছাদের খোলামেলা ডেকে। দেখি, রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কৃপা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। তার শরীর থেকে ছড়াচ্ছে অগুরু-চন্দনের সৌরভ। অই রাতে আকাশে তারকা ছিল এন্তার, ছায়াপথের কসমিক সয়লাবে ভাসছিলো অজস্র জ্যোতিষ্ক। কিন্তু নক্ষত্রের বিপুল বিভা আমাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি। আমরা মৃদু স্বরে কথা বলছিলাম জিম করবেটের বাঘশিকারী কেতাবে বর্ণিত রুদ্রপ্রয়াগের জংগল নিয়ে। শ্রী পরমহংস যোগানন্দের (১৮৯৩-১৯৫৩) অটোবায়োগ্রাফিতে রওয়ালপিন্ডি থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে কাশ্মীর যাওয়ার বর্ণনা যে তার প্রিয়, তা জানিয়ে কৃপা ফের আমাকে স্রেফ ইমপ্রেসড্ করে দিয়েছিল!

পাইপের আগুন নিভে আসে, বনানীতে অপরাহ্ণ আলোরিক্ততায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। আজাইরা আকাশ কুসুম কুড়ানোতে আর সময় ক্ষেপণ করা সঠিক মনে হয় না। তাই বোল্ডার থেকে নেমে গা ঝাড়া দিয়ে ফের পদব্রজের উদ্যোগ নিই। ঠিক বুঝতে পারি না কৃপার তাল্লাশে আর কতদূর হাঁটতে হবে।

আকাশ খানিক মেঘলা হয়ে উঠছে, সন্ধ্যাও মনে হয় আসন্ন। কিছু অজানা পতঙ্গের গুঞ্জন অধীর হয়ে ওঠা হৃদয়ের মতো কেবলই বেজে যাচ্ছে। এদিকে হেঁটে যেতে বাঁদাড়ে মৃদু হুল্লোড় তোলা ঝিঁঝি পোকার কথা কেবল মনে পড়ে যায়। ঠিক বুঝতে পারি না কেন এ ভর বিকালে কৃপার সন্ধানে আগ বাড়ছি। তার আকর্ষণকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। ভারতবর্ষীয় পোশাক বা প্রসাধনের প্রভাবে তার শরীর যে কখনো-সখনো ছড়ায় অসামান্য শোভা, এ ব্যাপারে আমি সচেতন, তবে এ নিয়ে আমার কোনো আচ্ছন্নতা নেই, তার মন পাওয়ার বিষয়েও আমার মধ্যে কখনো তৈরি হয়নি কোনো মন্বন্তর, দেন হোয়াই অ্যাম আই রানিং আফটার হার? তবে কী, যে সংস্কৃতি আমার নিজস্ব, তার প্রতি কৃপার আকর্ষণ আমাকে প্রীত করে, নাকি গড়পড়তা সতীর্থ নারীদের চেয়ে সে আচার আচরণে ব্যতিক্রমী? ঘটনা যাই হোক, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে তাকে খুঁজে পেতে হয়। তাই আমি ফের মেঠোপথ সংলগ্ন বনানীতে মনোযোগ দেই।

যেতে যেতে বিচিত্র একটি কাঠের স্ট্রাকচার দেখে তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি! গাছের দুটি গুড়ির ওপর গোল করে কাটা কাণ্ডের টুকরা দিয়ে যেন তৈরি করা হয়েছে বৃক্ষ-ভাস্কর্য। তাতে সৃষ্টি হয়েছে সিঁড়ির মতো অসমতল পরিসর, ওখানকার কোণা-কানচিতে জড়ো করে রাখা বিবিধ সাইজের কতগুলো পাথর। আন্দাজ করি, অজানা কেউ মেহনত করে এ বৃক্ষ-ভাস্কর্যটি গড়েছে। এ শৈল্পিক উদ্যোগের পেছনে পাথর-পূঁজার কোনো ব্যাপার আছে কিনা ঠিক বোধগম্য হয় না। বৃক্ষ-ভাস্কর্যটির কাছে দাঁড়িয়ে পাইপের ছাই ঝেড়ে ফের ট্যবাকো পুরি। আগুন দিতে দিতে মুহূর্ত কয়েক আগে কৃপার প্রতি আমার এ্যাটরাকশনের যে বিশ্লেষণ করেছি, তা আংশিক মনে হয়। আরো কিছু ভাবনা করোটিতে ভুবনচিলের মতো ঘুরুন্টি মারে। কৃপা যে হামেশা ভারতীয় কেতায় পোশাক পরে বা সাজগোজ করে—তথ্যটি অসম্পূর্ণ। কোনো কোনো ক্রস ক্যালচারেল পার্টিতে আমি তাকে নাইজেরিয়ান মেয়েদের বাটিকের পোশাক পরতেও দেখেছি। ভারতবর্ষী সংস্কৃতি ছাড়া আরেকটা বিষয়ে তার আগ্রহ বিগত, সেটা হচ্ছে ফ্যাশন। এ ব্যাপারে আমার প্রশ্নের জবাবে সে জানিয়েছে, ‘আই অ্যাম কনসটেন্টলি সার্চিং সামথিং নিউ টু এক্সপ্রেস মাইসেল্ফ।’

 গাছের কাটা কাণ্ড ও পাথর দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য। ছবি: লেখক ◢


এই সেল্ফ এক্সপ্রেশনের বিষয়টা ভাবতে ভাবতে গাছপালার ভেতর দিয়ে ছমিলের বর্জ উডচিপস্ ফেলা সরু পায়ে চলার একটি ট্রেইল খুঁজে পাই। অটাম আসতে আর বিশেষ দেরি নেই, তাই ট্রেইলের ওপর ছড়িয়ে আছে দু-চারটি সোনালি লোহিত ও জাফরানি রঙের ঝরা পাতা। ফ্যাশনের ব্যাপারে আমি যে অসচেতন, তা নয়। তবে তামাম জিন্দেগিভর আমি কোর্তা-পয়াজামা, বড়জোর কোটি-কোলাপুরি দিয়ে দিন গোজরান করছি। নিজেকে এক্সপ্রেস করার জন্য শিলমাছের চামড়া দিয়ে এক্সিমোদের কায়দায় নিমা বানিয়ে পরব, অথবা শিখ সর্দারজীর পুত্রের মতো কল্লায় পাগড়ি চাপিয়ে পার্টিতে হাজির হব, না, এখনো আমি অতোটা সৃজনশীল হয়ে ওঠতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে কৃপার ফ্যাশন সেন্সকে অ্যাপ্রিসিয়েট না করার মতো রক্ষণশীলও আমি নই।

কৃপা আমাকে আজ বনানীতে হ্যাট ও সানগ্লাস পরে আসতে বলেছে। এ মুহূর্তে জংগলে আমার গন্তব্য হচ্ছে তার ডিরেকশন মোতাবেক একটি ট্রিহাউস বা বৃক্ষকুটির। ওখানে থিম পার্টি নামক ছোট্ট একটি বৈঠকের আয়োজন হওয়ার কথা। পার্টির রিল্যাক্স সামাজিকতা আমার খুবই প্রিয়, এবং থিম পার্টির কনসেপ্টের সাথে কৃপার মাধ্যমেই আমার পরিচয় ঘটে। আমরা একবার বনানী-ঋদ্ধ হ্রদের পাড়ে নিরিবিলি এক বোট-হাউসে সন্ধ্যাবেলা জড়ো হয়েছিলাম। কাঠের জেটিতে বাঁধা ছিল অনেকগুলো হালকা ক্যানো জাতীয় নৌকা। কৃপা অই পার্টিতে এসে হাজির হয়েছিল মঙ্গোলিয়ার ঘোড়া ছুটানো যুবতীদের মতো আঁটোসাঁটো পোশাক পরে। আমি গুরু-পাঞ্জাবী গতরে গোমূর্খের মতো এদিক ওদিকে ইতিউতি তাকাচ্ছিলাম, ঠিক ঠাউরে ওঠতে পারছিলাম না—এ থিম পার্টিতে আদতে কী ঘটতে যাচ্ছে? হালকা পানভোজনের পর আবগারি ধূমপানে আমরা যখন খানিক টিপসি, তখন পার্টির মাস্টার অব সেরিমনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘গাইজ, ফুল মুন ইজ আউট আপ ইন দ্য স্কাই, গো এহেড এন্ড ফাইন্ড ইয়োর পার্টনার...ক্যানো নৌকাগুলো রেডি আছে, দুজনের বেশি কোনো নৌকাতে চড়া যাবে না.. গো এহেড এন্ড এনজয় দ্য বোটরাইড।’

অই রাতে পার্টনারের জন্য আমাকে গরুখোঁজা করতে হয়নি। কৃপাকে কিভাবে অ্যাপ্রোচ করব—তা নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হয়নি, কেবলমাত্র চোখের ছোট্ট ইশারাই কাফি হয়েছিল। নৌকাটিতে বসে আমি বৈঠা চালানোতে অধিক মনোযোগ দিয়েছিলাম, তবে কৃপা টুকটাক কথাবার্তা বলছিল। তার পোশাকে গাঁথা ধাতব বোতামগুলো জোৎস্নায় রূপালি আভা ছড়াচ্ছিল। আমি তার ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়ানো টিউনিকটির জবর তারিফ করলে সে মন্তব্য করেছিল, ‘সামটাইমস্ ইউ নো..থ্রো ইন্টারেস্টিং ফ্যাশন আই ফাইন্ড দ্য মিনিং অব লাইফ।’ আমি ডাক-উইড নামক ভেসে থাকা জলজ গুল্মের আস্তরণ বৈঠা মেরে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কৃপা হাত বাড়িয়ে জলে পূর্ণ-চাঁদের প্রতিফলন ছুঁয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘ডিড ইউ এভার কেইম এ্যক্রস দ্য মিনিং অব লাইফ?’ আমি কোনো ভাবনা-চিন্তা না করে জবাব দিয়েছিলাম, ‘লুক, আই লাইক পার্টিজ্, সামটাইমস্ গুড টাইম ইন আ ফাইন পার্টি মিনস আ লট ইন মাই লাইফ।’ সে ‘দিস সাউন্ডস্ কুল’ বলে ঝুঁকে গ্রীবা বাড়িয়ে দিয়ে যৎসামান্য অন্তরঙ্গ হয়েছিল, তা ছাড়া অই রাতে আমাদের মধ্যে আর উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি।

গাছপালার পাতা সম্পূর্ণ ঝরেনি, তাই আমাকে চলতে চলতে ঘাড় বাঁকিয়ে ট্রিহাউসটির খানাতল্লাশি করতে হয়। আজকের থিম পার্টিতে কী ঘটতে যাচ্ছে—তা নিয়েও কিঞ্চিত টেনশন জমে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতে কৃপার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তার কিছুটা ফিরে আসে আমার করোটিতে। কৃপার শ্বেতাঙ্গ পিতামাতা—মিস্টার ও মিসেস ওলাপ ছিলেন মূলত ভবঘুরে, হিপিদের মতো হামেশা তাঁরা নানা দেশে ভ্রাম্যমাণ হালতে দিন গোজরান করতেন। ভারত ছাড়া নাইজেরিয়া ও মঙ্গোলিয়াতে তারা দীর্ঘদিন বসবাস করেছিলেন। সে যখন খুব ছোট্ট, তখন তারা তাকে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন। বছর দুয়েকের ভারতবাসে তারা ছোট্ট কৃপাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান বেনারস, আলমোড়া, মৌসুরি ও কাশ্মীরে। আদিতে কৃপার নাম ছিল আমেনডা ওলাপ। বেনারসের মাণিকর্নিকায় এক সাধু মহারাজ নাকি তার চোখেমুখে গঙ্গাজল ছিটিয়ে, কপালে চন্দনের টিকা কেটে দিয়ে নাম দেন কৃপা। সে থেকে মেয়েটির ধারণা—সে নবজন্ম পেয়েছে। তার ভারতবাসের দিনগুলো থেকেই সে খেতে ভালোবাসে গর্মাগ্রম পাকোড়া ও জিলাপি, এবং কারণে অকারণে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে সৌরভ ছড়ানোও তার পছন্দের তালিকায় পড়ে।

ট্রেইলের মোড়ে এসে আমি একটু ধন্দে পড়ি। এখানেই তো বৃক্ষকুটিরের থাকার কথা। ঠিক তখনই লাল রঙের দুটি বেরি ঢিপ করে আমার মাথায় ঝরে পড়ে। পাখপাখালির খাবার এ গোটাগুলো নরোম ও লুকলুকে। আরেকটি গোটা ছুটে এসে আমার সানগ্লাসে ফেটে লেপ্টে গেলে আমি বিরক্ত হয়ে ঈশান কোণে তাকাই, দেখি একটি গাছের বাঁকা হয়ে মাটির দিকে প্রসারিত বড়সড় ডালায় বসে আছে কৃপা। তার কোঁচড়ে ফুল-গাঁথা হ্যাটে রাখা বেশ কিছু লোহিত বেরি। সে খানিক আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে ডালায় বসে আছে, তাই তার পা ও ঊরুতে তৈরি ত্রিভূজের ভেতর দিয়ে তাকাতে হয়। খানিক দূরে শত বছরের পুরানো গাছের ডালপালার ওপর ভর দিয়ে তৈরি ট্রিহাউসটিকে তখন পরিষ্কার দেখতে পাই। কৃপা কোনো কারণ ছাড়াই খিলখিলিয়ে হেসে নিচের দিকে হাত বাড়িয়ে লাফ দেয়। আমি দু হাতে তাকে রিসিভ করতে বাধ্য হই, এবং আমরা হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে পড়ি ঘাসে। লম্ফজনিত তোড়ে তার হ্যাট থেকে চারদিকে ছিতরে পড়ে লাল রঙের নরোম বেরি। সে চন্দনের সৌরভ ছড়িয়ে আমার বাহুর গ্রিপ থেকে আলগা হয়, কোমর বাঁকিয়ে নিচু হয়ে প্রথমে সে বেরিগুলো কুড়ানোর চেষ্টা করে। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ও ওয়েল, বেরিগুলো পাতার নিচে চলে গেছে, এগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

সে আজ কপালে ফিকে গোলাপি বিন্দি পরে এসেছে। আমি কিছু দিন আগে তাকে জামদানির একটি ঊর্ণা উপহার দিয়েছিলাম। সে তা দড়ির মতো পাকিয়ে নাভির নিচে পরা জিন্সে বেল্টের মতো করে জড়িয়েছে। কৃপা জানতে চায়, ‘ডিড ইউ ব্রিং দ্যাট সুপার রোমান্টিক টেইপ?’ একবার আমার অ্যাপার্টমেন্টে ছোট্ট একটি পার্টিতে এসে সে হারানো দিনের বাংলা গানের টেইপ শুনেছিল। থিম পার্টিতে দাওয়াতের সময় আমাকে সে অনুরোধ করেছিল—ক্যাসেটটি আমি যেন সাথে করে নিয়ে আসি। তো আমি ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে ক্যাসেট-টেইপটি তার হাতে দেই। সে তা টপে গুঁজে হাঁটে ট্রিহাউসের দিকে।

আমরা স্টিলের ঘুরানো হিলহিলে সিঁড়ি বেয়ে ভূমি থেকে প্রায় পয়ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু ট্রিহাউসে উঠি। চারদিকে প্রসারিত গাছের বেশ কতকগুলো ডালের ওপর ভর নিয়ে তৈরি ট্রিহাউসে বেলকনির মতো চিলতে চিলতে বারান্দা। ভেতরের কামরায় ততোক্ষণে জড়ো হয়েছে থিম পার্টিতে আগত আরো চারটি যুবতী। মেয়েগুলো এবং আমি ছাড়া আরো এসেছে বিলাই-চোক্কা জকড়ি মকড়ি লাগানো কাঁধ-জোকা জটা চুলের অপরিচিত একটি তরুণ। আমরা কাঠের ফ্লোরে হ্যাটগুলো সাজিয়ে রাখি। দেখতে দেখতে ফ্লোরে বেশ কতগুলো হ্যাটের সমবায়ে ফুটে ওঠে পানপাতা শেইপের হৃদয়ের আকৃতি। কার্পেট বিছিয়ে মেয়েগুলো সব গোল হয়ে বসে পড়ে একপাশে। বনানীতে সূর্য কেবল মাত্র অস্ত যাচ্ছে, জানালা গলে ঢুকে পড়া আলোয় সকলের রোদচশমাগুলো বর্ণিল হয়ে ওঠে।

বিলাই-চোক্কা ছেলেটি খালি গায়ে একটি মস্ত বাক্সের ওপর পদ্মাসনে বসেছে। তার দিকে ভালো করে চেয়ে—সে কফিনের ওপর বসে আছে দেখে একটু চমকে ওঠি! ভাবি, হয়তো বাক্সটি নকল। কৃপা ছেলেটির কপালে কাঠি দিয়ে চন্দনের তিলক কেটে দেয়। মেয়েগুলো কাচের মিনিয়েচার হুকায় কল্কে সাজিয়েছে। তার স্বচ্ছ নালিতে পোরা হয়েছে বরফের কুচি। হুকাটি হাতে হাতে ঘুরে, এবং বরফকুচির ফিল্টারে পাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা হাশিশের ধোঁয়ায় ভরপুর হয়ে যায় বৃক্ষকুটির। মেয়েগুলো যেখানে বসেছে, তার খানিক দূরে বাচ্চাদের দোলনায় রাখা একটি কাঠের হাতি। মেয়েগুলো ধূমপান করতে করতে তাতে মৃদু-মন্দ দোল দিয়ে জড়ানো ঠোঁটে জপে, ‘উই লাভ ইউ লিটিল গনেসা। টুডে ইউ আর উইথ আস।’

অন্ধকার আর একটু গাঢ় হয়, কৃপা উঠে খুঁজে পেতে জ্বেলে দেয় বেশ কয়েকটি মোমবাতি। ছেলেটি মনে হয় প্রাণায়ম করছে। তার নাভিকুণ্ড থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে রোদ পোহানো কুকুরের মতো কাঁইকুই আওয়াজ। থিম পার্টির থিমটা কী—তা ঠিক বুঝতে পারি না। তাই আমি ফের ধন্ধে পড়ি? কৃপাও কামরার এক কোণে উধাও হয়েছে। কোথায় যেন আমার ক্যাসেটটি মৃদু স্বরে বেজে ওঠে। কৃপা জিন্স বদলিয়ে এসে দাঁড়ায় হ্যাট দিয়ে তৈরি হৃদয়ের নকশার মাঝখানে। সে হাওয়াইয়ান ঘাসে তৈরি স্কার্ট পরে এসেছে। তার শরীরে ঝুলছে বেশ কিছু লতায় বোনা সোনালি লোহিত ও জাফরানি রঙের ঝরা পাতা। গানের সুরে সে মৃদু তালে নাচতে শুরু করে। ক্যাসেটে বেজে যায় ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে..।’ নৃত্যের দোদুল্যমানতায় পাতার বক্ষবন্ধনীতে ঢেউ লাগা পদ্মের মতো কাঁপে তার স্তন যুগল।

আমি থিম পার্টির থিম নিয়ে ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসি ছোট্ট ঝুল বারান্দায়। বনানীতে নিবিড় হয়ে নামছে অন্ধকার। নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে আবছা সব গাছপালা। পতঙ্গের তীব্র গুঞ্জনের ভেতর দিগন্তে ফুটে ওঠে সন্ধ্যাতারা। সাঁঝের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আমি থিম পার্টি ও অকাশপ্রদীপ শব্দগুলো নিয়ে ভাবি।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার গর্বের সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;