ট্রিহাউসে থিম পার্টি

মঈনুস সুলতান
বনানীতে বৃক্ষকুটির। ছবি: লেখক

বনানীতে বৃক্ষকুটির। ছবি: লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজপথ ছেড়ে পয়দলে চলে আসি ছাঁতা ধরে ঝুরঝুরে প’ড়ো কাঠের দোতালা বাড়িটির পেছনে। এদিকে ঝোপঝাড় ও গাছবিরিক্ষে রীতিমতো জংলা হয়ে আছে। একটু দাঁড়াই, রোডম্যাপটি নজর করে দেখি। পথের ডিরেকশন দিয়ে লেখা বর্ণনায় ভাঙ্গারোঙ্গা দোতালা বাড়িটির উল্লেখ আছে দেখে খুশি হই। কৃপার হস্তাক্ষর চেয়ে দেখার মতো লীলায়িত, রোডম্যাপের টুকরো কাগজটি থেকে ছড়ায় ধূপকাঠি বা আতরের গন্ধ।

ঘাড় অব্দি নেমে আসা কোঁকড়ানো কালো চুলের শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে নিকট-অতীতে নজর করে দেখেছি বার কয়েক ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস্-এর দু-একটি কোর্সে ক্লাস করার সময়। তার নাম ‘কৃপা’, এবং নামের মর্মার্থ সম্পর্কে মেয়েটি সচেতন, বিষয়টি আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। অন্তরঙ্গভাবে কৃপার সঙ্গে বাতচিত করার প্রথম মওকা সৃষ্টি হয়—সতীর্থদের সাথে মিলেঝুলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী একটি উপবনে অভার-নাইট রিট্রিট করতে গেলে।

অপরাহ্ণে হ্রদের পাড়ে দলবেঁধে প্রচুর হল্লাগুল্লা হচ্ছিল, হাতে হাতে ঘুরছিল বিয়ারের ক্যান, বার্বিকিউ চড়িয়ে আগুনের গনগনে আঁচে ঝলসানো হচ্ছিল সচে জারিত চিকেন, বিফ স্টেক ও র্যসেট পটেটো। কৃপা কিন্তু বনভোজনের রমরমে পরিবেশ থেকে বেশ দূরে, হ্রদের অপর পাড়ে প্রকাণ্ড একটি বোল্ডারের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে পাঠ করছিল পেপারব্যাকে ভারতবর্ষের পঞ্চতন্ত্রের কেসসা-কাহিনী।

আমি বাইনোকুলার হাতে অনুসরণ করছিলাম ইস্টার্ন ব্লু বার্ড নামে দারুণ রকমের নীল একটি পাখি। খেচরটি চঞ্চল ডানায় আসমানী রঙের অঞ্জন ছড়িয়ে বোল্ডারের উপর দিয়ে পেছনের ঘন বনে আউড়ি দিলে, আমি তার তালাশে এসে পড়ি প্রকাণ্ড পাথরটিতে চুপচাপ বসে থাকা কৃপার কাছাকাছি। পেপারব্যাক থেকে চোখ তুলে মৃদু হেসে সে ফিরে যায় পাঠে। হাঁটুর খানিক নিচ অব্দি কাটআউট জিন্স পরেছিল কৃপা। তা ছাপিয়ে মেয়েটির আলতা পরা খালি পা আমাকে স্মৃতিবিধুর করে তুলেছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কৃপা, ডু ইউ নো হোয়াট আর ইউ উয়ারিং ইন ইয়োর ফুট?’ সে বইটির পাতা মুড়ে রেখে জবাব দিয়েছিল, ‘ইট ইজ কল্ড আলতা, তুমি কথা বলতে চাইলে.. হপ অন অভার, বোল্ডারের ওপর উঠে বসো, উই ক্যান চ্যাট আ বিট।’ অই বিকালে নীলাঞ্জন ছাড়ানো ইস্টার্ন ব্লু বার্ডটির আর কোনো সুলুক সন্ধান করা হয়নি। তবে কৃপার পিতা-মাতা ও তার শৈশবের আপব্রিংগিং সম্পর্কে বেশ খানিকটা জানতে পেরেছিলাম।

কৃপার বিষয়-আশয় নীরবে তর্পণ করতে করতে একটু অন্যমনষ্ক হয়েছিলাম, খেয়াল করে দেখি, এসে পড়েছি লালচে মোরাম বিছানো এক মেঠোপথে। ফের ডিরেকশন ঘেঁটে, সাবধানে হেঁটে বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে আমি এসে পড়ি পমপাস গ্রাস নামে সুদীর্ঘ ঘাসের উপবনে। লিকলিকে এ তরুটির ডগায় দুলছে কাবুলি বিলাইয়ের পশমি লেংগুড়ের মতো শুভ্র প্রসূন। এখানে ইন্টারেস্টিং আরেকটি বস্তু দেখতে পাই। জংধরা লোহার খুঁটিতে ঝুলছে আদ্দিকালের কুচকুচে কালো একটি রোটারি টেলিফোন। রিসিভারটি পেঁচিয়ে উঠেছে কোঁকড়ানো লতা। তার তলায় চড়ুই পাখি বেঁধেছে নীড়। তা ছাড়িয়ে যেতে যেতে মসের পুরু স্তরে সবুজ হয়ে ওঠা একটি ঘরের পাথুরে ভিতও দৃশ্যমান হয়। সিড়ির তলা থেকে সরসরিয়ে বেরিয়ে আসে তেড়াবেড়া লেংগুড়অলা একটি কাঠবিড়ালী। আমি বুনো মার্জারটিকে অবজ্ঞা করে ডিরেকশন মোতাবেক আরো খানিক হাঁটি। রবার্ট ফ্রস্ট্র ট্রেইলের এখানে পাইন ও ফারের বনানী নিবিড় হয়ে ওঠে। ফের হাতে লেখা ডিরেকশনের দিকে তাকাই। জং ধরা কয়েকটি গাড়ির কংকালের আড়ালে সড়কের সার্প বাঁকটি খুঁজে পেতে অসুবিধা কিছু হয় না।

সামনে সবুজ ঘাস কেটে মেঠো ট্রেইলটি চলে গেছে অরণ্যের আরো গভীরে। জায়গাটি এমন নির্জন হয়ে আছে যে শরীর আপনা আপনি সতর্ক হয়ে ওঠে। আমি পা টিপে টিপে আগ বাড়ি। কিন্তু ক্লান্ত লাগে, কেন জানি নিঃসঙ্গতা ঝেপে আসে। ট্রেইলের পাশে একটি বড়সড় বোল্ডার দেখতে পেয়ে তাতে চড়ে বসে পাইপে ট্যবাকো পুরি। স্মোক করতে করতে ফের কৃপার প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবি। রিট্রিটের নৈশপার্টিতে কৃপা অজন্তার শিলাপাথরে বিধৃত নারীদের কায়দায় নাভির নিচে ডুরে শাড়িটি পরে ফায়ারপ্লেসের পাশে এসে দাঁড়ালে তার সতীর্থ ছেলেদের মধ্যে তৈয়ার হয়েছিল যৎসামান্য সেনসেশন। কৃপা দৃশ্যমান হয়েছিল দারুণভাবে, কিন্তু কারো সঙ্গে ঠিক মিশতে পারছিল না।

নৈশপার্টির আজাইরা বৈঠক এক পর্যায়ে বোরিং হয়ে উঠেছিল। আমি একটু ফ্রেশ এয়ার পেতে চাপলিশে উঠে এসেছিলাম ছাদের খোলামেলা ডেকে। দেখি, রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কৃপা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। তার শরীর থেকে ছড়াচ্ছে অগুরু-চন্দনের সৌরভ। অই রাতে আকাশে তারকা ছিল এন্তার, ছায়াপথের কসমিক সয়লাবে ভাসছিলো অজস্র জ্যোতিষ্ক। কিন্তু নক্ষত্রের বিপুল বিভা আমাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি। আমরা মৃদু স্বরে কথা বলছিলাম জিম করবেটের বাঘশিকারী কেতাবে বর্ণিত রুদ্রপ্রয়াগের জংগল নিয়ে। শ্রী পরমহংস যোগানন্দের (১৮৯৩-১৯৫৩) অটোবায়োগ্রাফিতে রওয়ালপিন্ডি থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে কাশ্মীর যাওয়ার বর্ণনা যে তার প্রিয়, তা জানিয়ে কৃপা ফের আমাকে স্রেফ ইমপ্রেসড্ করে দিয়েছিল!

পাইপের আগুন নিভে আসে, বনানীতে অপরাহ্ণ আলোরিক্ততায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। আজাইরা আকাশ কুসুম কুড়ানোতে আর সময় ক্ষেপণ করা সঠিক মনে হয় না। তাই বোল্ডার থেকে নেমে গা ঝাড়া দিয়ে ফের পদব্রজের উদ্যোগ নিই। ঠিক বুঝতে পারি না কৃপার তাল্লাশে আর কতদূর হাঁটতে হবে।

আকাশ খানিক মেঘলা হয়ে উঠছে, সন্ধ্যাও মনে হয় আসন্ন। কিছু অজানা পতঙ্গের গুঞ্জন অধীর হয়ে ওঠা হৃদয়ের মতো কেবলই বেজে যাচ্ছে। এদিকে হেঁটে যেতে বাঁদাড়ে মৃদু হুল্লোড় তোলা ঝিঁঝি পোকার কথা কেবল মনে পড়ে যায়। ঠিক বুঝতে পারি না কেন এ ভর বিকালে কৃপার সন্ধানে আগ বাড়ছি। তার আকর্ষণকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। ভারতবর্ষীয় পোশাক বা প্রসাধনের প্রভাবে তার শরীর যে কখনো-সখনো ছড়ায় অসামান্য শোভা, এ ব্যাপারে আমি সচেতন, তবে এ নিয়ে আমার কোনো আচ্ছন্নতা নেই, তার মন পাওয়ার বিষয়েও আমার মধ্যে কখনো তৈরি হয়নি কোনো মন্বন্তর, দেন হোয়াই অ্যাম আই রানিং আফটার হার? তবে কী, যে সংস্কৃতি আমার নিজস্ব, তার প্রতি কৃপার আকর্ষণ আমাকে প্রীত করে, নাকি গড়পড়তা সতীর্থ নারীদের চেয়ে সে আচার আচরণে ব্যতিক্রমী? ঘটনা যাই হোক, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে তাকে খুঁজে পেতে হয়। তাই আমি ফের মেঠোপথ সংলগ্ন বনানীতে মনোযোগ দেই।

যেতে যেতে বিচিত্র একটি কাঠের স্ট্রাকচার দেখে তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি! গাছের দুটি গুড়ির ওপর গোল করে কাটা কাণ্ডের টুকরা দিয়ে যেন তৈরি করা হয়েছে বৃক্ষ-ভাস্কর্য। তাতে সৃষ্টি হয়েছে সিঁড়ির মতো অসমতল পরিসর, ওখানকার কোণা-কানচিতে জড়ো করে রাখা বিবিধ সাইজের কতগুলো পাথর। আন্দাজ করি, অজানা কেউ মেহনত করে এ বৃক্ষ-ভাস্কর্যটি গড়েছে। এ শৈল্পিক উদ্যোগের পেছনে পাথর-পূঁজার কোনো ব্যাপার আছে কিনা ঠিক বোধগম্য হয় না। বৃক্ষ-ভাস্কর্যটির কাছে দাঁড়িয়ে পাইপের ছাই ঝেড়ে ফের ট্যবাকো পুরি। আগুন দিতে দিতে মুহূর্ত কয়েক আগে কৃপার প্রতি আমার এ্যাটরাকশনের যে বিশ্লেষণ করেছি, তা আংশিক মনে হয়। আরো কিছু ভাবনা করোটিতে ভুবনচিলের মতো ঘুরুন্টি মারে। কৃপা যে হামেশা ভারতীয় কেতায় পোশাক পরে বা সাজগোজ করে—তথ্যটি অসম্পূর্ণ। কোনো কোনো ক্রস ক্যালচারেল পার্টিতে আমি তাকে নাইজেরিয়ান মেয়েদের বাটিকের পোশাক পরতেও দেখেছি। ভারতবর্ষী সংস্কৃতি ছাড়া আরেকটা বিষয়ে তার আগ্রহ বিগত, সেটা হচ্ছে ফ্যাশন। এ ব্যাপারে আমার প্রশ্নের জবাবে সে জানিয়েছে, ‘আই অ্যাম কনসটেন্টলি সার্চিং সামথিং নিউ টু এক্সপ্রেস মাইসেল্ফ।’

 গাছের কাটা কাণ্ড ও পাথর দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য। ছবি: লেখক ◢


এই সেল্ফ এক্সপ্রেশনের বিষয়টা ভাবতে ভাবতে গাছপালার ভেতর দিয়ে ছমিলের বর্জ উডচিপস্ ফেলা সরু পায়ে চলার একটি ট্রেইল খুঁজে পাই। অটাম আসতে আর বিশেষ দেরি নেই, তাই ট্রেইলের ওপর ছড়িয়ে আছে দু-চারটি সোনালি লোহিত ও জাফরানি রঙের ঝরা পাতা। ফ্যাশনের ব্যাপারে আমি যে অসচেতন, তা নয়। তবে তামাম জিন্দেগিভর আমি কোর্তা-পয়াজামা, বড়জোর কোটি-কোলাপুরি দিয়ে দিন গোজরান করছি। নিজেকে এক্সপ্রেস করার জন্য শিলমাছের চামড়া দিয়ে এক্সিমোদের কায়দায় নিমা বানিয়ে পরব, অথবা শিখ সর্দারজীর পুত্রের মতো কল্লায় পাগড়ি চাপিয়ে পার্টিতে হাজির হব, না, এখনো আমি অতোটা সৃজনশীল হয়ে ওঠতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে কৃপার ফ্যাশন সেন্সকে অ্যাপ্রিসিয়েট না করার মতো রক্ষণশীলও আমি নই।

কৃপা আমাকে আজ বনানীতে হ্যাট ও সানগ্লাস পরে আসতে বলেছে। এ মুহূর্তে জংগলে আমার গন্তব্য হচ্ছে তার ডিরেকশন মোতাবেক একটি ট্রিহাউস বা বৃক্ষকুটির। ওখানে থিম পার্টি নামক ছোট্ট একটি বৈঠকের আয়োজন হওয়ার কথা। পার্টির রিল্যাক্স সামাজিকতা আমার খুবই প্রিয়, এবং থিম পার্টির কনসেপ্টের সাথে কৃপার মাধ্যমেই আমার পরিচয় ঘটে। আমরা একবার বনানী-ঋদ্ধ হ্রদের পাড়ে নিরিবিলি এক বোট-হাউসে সন্ধ্যাবেলা জড়ো হয়েছিলাম। কাঠের জেটিতে বাঁধা ছিল অনেকগুলো হালকা ক্যানো জাতীয় নৌকা। কৃপা অই পার্টিতে এসে হাজির হয়েছিল মঙ্গোলিয়ার ঘোড়া ছুটানো যুবতীদের মতো আঁটোসাঁটো পোশাক পরে। আমি গুরু-পাঞ্জাবী গতরে গোমূর্খের মতো এদিক ওদিকে ইতিউতি তাকাচ্ছিলাম, ঠিক ঠাউরে ওঠতে পারছিলাম না—এ থিম পার্টিতে আদতে কী ঘটতে যাচ্ছে? হালকা পানভোজনের পর আবগারি ধূমপানে আমরা যখন খানিক টিপসি, তখন পার্টির মাস্টার অব সেরিমনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘গাইজ, ফুল মুন ইজ আউট আপ ইন দ্য স্কাই, গো এহেড এন্ড ফাইন্ড ইয়োর পার্টনার...ক্যানো নৌকাগুলো রেডি আছে, দুজনের বেশি কোনো নৌকাতে চড়া যাবে না.. গো এহেড এন্ড এনজয় দ্য বোটরাইড।’

অই রাতে পার্টনারের জন্য আমাকে গরুখোঁজা করতে হয়নি। কৃপাকে কিভাবে অ্যাপ্রোচ করব—তা নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হয়নি, কেবলমাত্র চোখের ছোট্ট ইশারাই কাফি হয়েছিল। নৌকাটিতে বসে আমি বৈঠা চালানোতে অধিক মনোযোগ দিয়েছিলাম, তবে কৃপা টুকটাক কথাবার্তা বলছিল। তার পোশাকে গাঁথা ধাতব বোতামগুলো জোৎস্নায় রূপালি আভা ছড়াচ্ছিল। আমি তার ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়ানো টিউনিকটির জবর তারিফ করলে সে মন্তব্য করেছিল, ‘সামটাইমস্ ইউ নো..থ্রো ইন্টারেস্টিং ফ্যাশন আই ফাইন্ড দ্য মিনিং অব লাইফ।’ আমি ডাক-উইড নামক ভেসে থাকা জলজ গুল্মের আস্তরণ বৈঠা মেরে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কৃপা হাত বাড়িয়ে জলে পূর্ণ-চাঁদের প্রতিফলন ছুঁয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘ডিড ইউ এভার কেইম এ্যক্রস দ্য মিনিং অব লাইফ?’ আমি কোনো ভাবনা-চিন্তা না করে জবাব দিয়েছিলাম, ‘লুক, আই লাইক পার্টিজ্, সামটাইমস্ গুড টাইম ইন আ ফাইন পার্টি মিনস আ লট ইন মাই লাইফ।’ সে ‘দিস সাউন্ডস্ কুল’ বলে ঝুঁকে গ্রীবা বাড়িয়ে দিয়ে যৎসামান্য অন্তরঙ্গ হয়েছিল, তা ছাড়া অই রাতে আমাদের মধ্যে আর উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি।

গাছপালার পাতা সম্পূর্ণ ঝরেনি, তাই আমাকে চলতে চলতে ঘাড় বাঁকিয়ে ট্রিহাউসটির খানাতল্লাশি করতে হয়। আজকের থিম পার্টিতে কী ঘটতে যাচ্ছে—তা নিয়েও কিঞ্চিত টেনশন জমে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতে কৃপার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তার কিছুটা ফিরে আসে আমার করোটিতে। কৃপার শ্বেতাঙ্গ পিতামাতা—মিস্টার ও মিসেস ওলাপ ছিলেন মূলত ভবঘুরে, হিপিদের মতো হামেশা তাঁরা নানা দেশে ভ্রাম্যমাণ হালতে দিন গোজরান করতেন। ভারত ছাড়া নাইজেরিয়া ও মঙ্গোলিয়াতে তারা দীর্ঘদিন বসবাস করেছিলেন। সে যখন খুব ছোট্ট, তখন তারা তাকে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন। বছর দুয়েকের ভারতবাসে তারা ছোট্ট কৃপাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান বেনারস, আলমোড়া, মৌসুরি ও কাশ্মীরে। আদিতে কৃপার নাম ছিল আমেনডা ওলাপ। বেনারসের মাণিকর্নিকায় এক সাধু মহারাজ নাকি তার চোখেমুখে গঙ্গাজল ছিটিয়ে, কপালে চন্দনের টিকা কেটে দিয়ে নাম দেন কৃপা। সে থেকে মেয়েটির ধারণা—সে নবজন্ম পেয়েছে। তার ভারতবাসের দিনগুলো থেকেই সে খেতে ভালোবাসে গর্মাগ্রম পাকোড়া ও জিলাপি, এবং কারণে অকারণে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে সৌরভ ছড়ানোও তার পছন্দের তালিকায় পড়ে।

ট্রেইলের মোড়ে এসে আমি একটু ধন্দে পড়ি। এখানেই তো বৃক্ষকুটিরের থাকার কথা। ঠিক তখনই লাল রঙের দুটি বেরি ঢিপ করে আমার মাথায় ঝরে পড়ে। পাখপাখালির খাবার এ গোটাগুলো নরোম ও লুকলুকে। আরেকটি গোটা ছুটে এসে আমার সানগ্লাসে ফেটে লেপ্টে গেলে আমি বিরক্ত হয়ে ঈশান কোণে তাকাই, দেখি একটি গাছের বাঁকা হয়ে মাটির দিকে প্রসারিত বড়সড় ডালায় বসে আছে কৃপা। তার কোঁচড়ে ফুল-গাঁথা হ্যাটে রাখা বেশ কিছু লোহিত বেরি। সে খানিক আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে ডালায় বসে আছে, তাই তার পা ও ঊরুতে তৈরি ত্রিভূজের ভেতর দিয়ে তাকাতে হয়। খানিক দূরে শত বছরের পুরানো গাছের ডালপালার ওপর ভর দিয়ে তৈরি ট্রিহাউসটিকে তখন পরিষ্কার দেখতে পাই। কৃপা কোনো কারণ ছাড়াই খিলখিলিয়ে হেসে নিচের দিকে হাত বাড়িয়ে লাফ দেয়। আমি দু হাতে তাকে রিসিভ করতে বাধ্য হই, এবং আমরা হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে পড়ি ঘাসে। লম্ফজনিত তোড়ে তার হ্যাট থেকে চারদিকে ছিতরে পড়ে লাল রঙের নরোম বেরি। সে চন্দনের সৌরভ ছড়িয়ে আমার বাহুর গ্রিপ থেকে আলগা হয়, কোমর বাঁকিয়ে নিচু হয়ে প্রথমে সে বেরিগুলো কুড়ানোর চেষ্টা করে। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ও ওয়েল, বেরিগুলো পাতার নিচে চলে গেছে, এগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

সে আজ কপালে ফিকে গোলাপি বিন্দি পরে এসেছে। আমি কিছু দিন আগে তাকে জামদানির একটি ঊর্ণা উপহার দিয়েছিলাম। সে তা দড়ির মতো পাকিয়ে নাভির নিচে পরা জিন্সে বেল্টের মতো করে জড়িয়েছে। কৃপা জানতে চায়, ‘ডিড ইউ ব্রিং দ্যাট সুপার রোমান্টিক টেইপ?’ একবার আমার অ্যাপার্টমেন্টে ছোট্ট একটি পার্টিতে এসে সে হারানো দিনের বাংলা গানের টেইপ শুনেছিল। থিম পার্টিতে দাওয়াতের সময় আমাকে সে অনুরোধ করেছিল—ক্যাসেটটি আমি যেন সাথে করে নিয়ে আসি। তো আমি ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে ক্যাসেট-টেইপটি তার হাতে দেই। সে তা টপে গুঁজে হাঁটে ট্রিহাউসের দিকে।

আমরা স্টিলের ঘুরানো হিলহিলে সিঁড়ি বেয়ে ভূমি থেকে প্রায় পয়ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু ট্রিহাউসে উঠি। চারদিকে প্রসারিত গাছের বেশ কতকগুলো ডালের ওপর ভর নিয়ে তৈরি ট্রিহাউসে বেলকনির মতো চিলতে চিলতে বারান্দা। ভেতরের কামরায় ততোক্ষণে জড়ো হয়েছে থিম পার্টিতে আগত আরো চারটি যুবতী। মেয়েগুলো এবং আমি ছাড়া আরো এসেছে বিলাই-চোক্কা জকড়ি মকড়ি লাগানো কাঁধ-জোকা জটা চুলের অপরিচিত একটি তরুণ। আমরা কাঠের ফ্লোরে হ্যাটগুলো সাজিয়ে রাখি। দেখতে দেখতে ফ্লোরে বেশ কতগুলো হ্যাটের সমবায়ে ফুটে ওঠে পানপাতা শেইপের হৃদয়ের আকৃতি। কার্পেট বিছিয়ে মেয়েগুলো সব গোল হয়ে বসে পড়ে একপাশে। বনানীতে সূর্য কেবল মাত্র অস্ত যাচ্ছে, জানালা গলে ঢুকে পড়া আলোয় সকলের রোদচশমাগুলো বর্ণিল হয়ে ওঠে।

বিলাই-চোক্কা ছেলেটি খালি গায়ে একটি মস্ত বাক্সের ওপর পদ্মাসনে বসেছে। তার দিকে ভালো করে চেয়ে—সে কফিনের ওপর বসে আছে দেখে একটু চমকে ওঠি! ভাবি, হয়তো বাক্সটি নকল। কৃপা ছেলেটির কপালে কাঠি দিয়ে চন্দনের তিলক কেটে দেয়। মেয়েগুলো কাচের মিনিয়েচার হুকায় কল্কে সাজিয়েছে। তার স্বচ্ছ নালিতে পোরা হয়েছে বরফের কুচি। হুকাটি হাতে হাতে ঘুরে, এবং বরফকুচির ফিল্টারে পাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা হাশিশের ধোঁয়ায় ভরপুর হয়ে যায় বৃক্ষকুটির। মেয়েগুলো যেখানে বসেছে, তার খানিক দূরে বাচ্চাদের দোলনায় রাখা একটি কাঠের হাতি। মেয়েগুলো ধূমপান করতে করতে তাতে মৃদু-মন্দ দোল দিয়ে জড়ানো ঠোঁটে জপে, ‘উই লাভ ইউ লিটিল গনেসা। টুডে ইউ আর উইথ আস।’

অন্ধকার আর একটু গাঢ় হয়, কৃপা উঠে খুঁজে পেতে জ্বেলে দেয় বেশ কয়েকটি মোমবাতি। ছেলেটি মনে হয় প্রাণায়ম করছে। তার নাভিকুণ্ড থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে রোদ পোহানো কুকুরের মতো কাঁইকুই আওয়াজ। থিম পার্টির থিমটা কী—তা ঠিক বুঝতে পারি না। তাই আমি ফের ধন্ধে পড়ি? কৃপাও কামরার এক কোণে উধাও হয়েছে। কোথায় যেন আমার ক্যাসেটটি মৃদু স্বরে বেজে ওঠে। কৃপা জিন্স বদলিয়ে এসে দাঁড়ায় হ্যাট দিয়ে তৈরি হৃদয়ের নকশার মাঝখানে। সে হাওয়াইয়ান ঘাসে তৈরি স্কার্ট পরে এসেছে। তার শরীরে ঝুলছে বেশ কিছু লতায় বোনা সোনালি লোহিত ও জাফরানি রঙের ঝরা পাতা। গানের সুরে সে মৃদু তালে নাচতে শুরু করে। ক্যাসেটে বেজে যায় ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে..।’ নৃত্যের দোদুল্যমানতায় পাতার বক্ষবন্ধনীতে ঢেউ লাগা পদ্মের মতো কাঁপে তার স্তন যুগল।

আমি থিম পার্টির থিম নিয়ে ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসি ছোট্ট ঝুল বারান্দায়। বনানীতে নিবিড় হয়ে নামছে অন্ধকার। নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে আবছা সব গাছপালা। পতঙ্গের তীব্র গুঞ্জনের ভেতর দিগন্তে ফুটে ওঠে সন্ধ্যাতারা। সাঁঝের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আমি থিম পার্টি ও অকাশপ্রদীপ শব্দগুলো নিয়ে ভাবি।

আপনার মতামত লিখুন :