আমেরিকা বলে কোনো স্থান নেই



অনুবাদ : মিলু হাসান
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

গল্প বলে এমন একজনের গল্প ছিল আমার কাছে। আমি তাকে বলতে বলতে কান ঝালাফালা করে ফেলছি যে আপনের গল্পে আমার এক ছটাকও ঈমান নাই। আমি বলছি—আপনে মিছা কইতাছেন। আপনের আষাঢ়ের গপ্ আমার লগে কইয়েন না, বানাইয়া বানাইয়া, আমারে বিশ্বাস করানির জন্য। এসব বলার পরেও তার উপরে কোনো প্রভাব পড়ল না। তার কোনো ভাবান্তর হলো না, সে গল্প বলেই যাচ্ছে, তারপর আমি শেষে বললাম—আপনে মিথ্যুক, আপনে আজগুবি গপ্ কওয়া লোক, আপনে মিষ্টি মিষ্টি গপ্ ফাঁদেন একটার পর একটা, আপনে ধাপ্পাবাজ রসিক। সে একরোখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, মাথা নেড়ে হুঁ হুঁ করল, একটা মনমরা হাসি দিল আর খুব নরম সুরে এমন কথা বলল যে আমি নিজে বেশ শরমিন্দা বোধ করলাম, শরমে পড়ে গেলাম, সে বলল : আমেরিকা বলে কোনো দ্যাশ নাই।

শুধু তারে বুঝ দেবার জন্য আমি তারে কথা দিছিলাম যে আমি তার গল্পটা লিখব। গল্পটা শুরু হয়েছিল পাঁচশো বছর আগে স্পেনের রাজার রাজদরবারে। তার মধ্যে আছে এক রাজপ্রসাদ, রেশম আর মখলম, সোনা, রুপা, দাড়ি, মুকুট, মোমবাতি, দাসদাসী, আছে তারা যারা সকাল হতে না হতে একে অন্যের ভুঁড়িতে ঢুকিয়ে দেয় তলোয়ার, যারা আগের রাতে পরস্পরের পায়ের কাছে দস্তানা ছুড়ে চ্যালেঞ্জ দেয় যুদ্ধের আর মিনারে পাহরাদার বাজায় শিঙা। আর আছে বার্তাবাহক এরা লাফিয়ে নামে ঘোড়া থেকে আর লাফিয়ে ওঠে জিনপড়ানো ঘোড়ায়, আছে রাজার সাচ্চা দোস্তরা আর ভণ্ড দোস্তরাও, আছে চোখ ধাঁধানো রূপবতী আর ছলচাতুরী আয়ত্ত করা বিপদজনক রমণী, আছে অঢেল সুরা আর রাজপ্রসাদের চারদিকে আছে এমন সব লোকজন যারা এইসব কিছুর জন্য দাম চুকানো ছাড়া ভালো কিছু করার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু এরকম জীবন যাপন করা ছাড়া রাজা অন্য কোনো জীবন যাপনের কথা ভাবতেই পারে না, যেখানেই যে বেঁচে থাকুক থাকুক, খুব আলিশানভাবে আরাম-আয়েশে কিংবা দীনদরিদ্রে, মাদ্রিদ, বার্সেলোনা অথবা যেখানেই হোক, দিনশেষে সেই একঘেয়ে ডেইলি রুটিন, বিরক্তি চরমে উঠে যায়। যেমন যারা অন্যখানে থাকে তারা ভাবে বার্সেলোনা একটা চমৎকার জায়গা আর যারা বার্সেলোনা থাকে তারা ভাবে অন্য কোনোখানে গেলে বুঝি বাঁচে প্রাণ।

গরিবরা ভাবে রাজার মতো জীবন যাপন করা কতই না মজার আর এ ভেবে দিলে কষ্ট পায় যে রাজা ভাবে গরিবদের গরিব হওয়াই ঠিক আছে।

সকালে রাজা ঘুম থেকে উঠে আর রাত্রে বিছানায় নিদ্রা যায়, আর সারাটা দিন কাটে একঘেয়ে, বিরক্তিকর আর কত যে টেনশন—দাসদাসী নিয়ে টেনশন, সোনা, রুপা, মখমল, রেশম নিয়ে টেনশন আর তার উপরে মোমবাতিগুলোও তার একঘেয়ে লাগে। তার বিছানা পরিপাটি-সাজানো-গোছানো, জমকালো কিন্তু এতে ঘুম দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করবার কিছু নাই।

দাসদাসীরা সকালে তারে মাথা নুয়ে সম্মান করে—ঠিক ততটুক নোয় পরদিন সকালে, এতে রাজা অভ্যস্ত, এগুলা সে খেয়াল করে না। কেউ তাকে দেয় কাঁটা চামিচ, কেউ তাকে দেয় তলোয়ার, কেউ তার বসার জন্য কেদারা পেতে দেয়, আমজনতা তারে জাঁহাপনা বলে ডাকে আর সাথে জুড়ে দেয় কত কত লকব আর ব্যস, এই তো, এইসব। কেউ তাকে কখনোই বলেনি—আপনি ইডিয়েট, আপনি বোকারাম আর আজকে তার সাথে তারা যে বাতচিৎ করেছে, সেসব পুরানো প্যাঁচাল তারা গতকালও তার সাথে করেছে।

এই হলো গিয়ে অবস্থা।

আর এ জন্য রাজা মশাই রাজদরবারে ভাঁড় পালেন। ভাঁড়েরা যা খুশি করার অনুমতি দেওয়া আছে, যা খুশি তাইই বলতে পারে—রাজামশাইয়ের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য, আর যখন তাদের কাণ্ডকীর্তি দেখে রাজা মশাইয়ের হাসি পায় না তখন তিনি তাদের কতল করার হুকুম জারি করেন কিংবা অইরকম কিছুই করার হুকুম দেন।

তো, একবার তার রাজদরবারে এক ভাঁড় ছিল যে কথাবার্তায় প্যাঁচগোছ লাগিয়ে দিত। রাজা মশাই এতে হাসির খোরাক খুঁজে পেতেন। ভাঁড় ‘রাজামশাই’ না বলে বলত ‘পাদমশাই’, ‘প্রসাদ’ না বলে বলত ‘পরসাদ’ আর ‘গুড মর্নিং’ না বলে বলতো ‘মুড গরিং’।

আমার মনে হয় ব্যাপারটা বোকাসোকা কিন্তু রাজা মশাই ভাবতেন ফানি। বছরের অর্ধেকটা সময়, ৭ জুলাই অব্দি, তিনি ভাবতেন ব্যাপারটা ফানি আর যখন ৮ তারিখ উনার ঘুম ভাঙল আর ভাঁড় বলল—‘মুড গরিং’, ‘পাদমশাই’—তখন রাজা মশাই বললেন—ওর থেকে আমারে রেহাই দাও।

আরেকজন ভাঁড় খাটো, মোটাসোটা যাকে সবাই পেপে বলে ডাকত, সে রাজামশাইকে মাত্র চারদিন খুশি রাখতে পেরেছিল। সে রাজদরবারের নারী, পুরুষ, রাজপুত্র, উজির-নাজির, সেনাপতির চেয়ারে মধু মেখে রাজার মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। চতুর্থদিনে সে যখন রাজামশাইয়ের সিংহাসনে মধু মাখল, রাজামশাইয়ের হাসি পেল না আর পেপে ভাঁড় রইল না। তারপর রাজা মশাই দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ভাঁড়টিকে খরিদ করে আনলো৷ সে দেখতে কুৎসিত, একইসাথে হাড্ডিসার আবার নাদুস-নুদুস, লম্বা-রোগা আবার বেঁটে-মোটা। কেউ জানত না সে কথা বলতে পারে কিনা নাকি ইচ্ছা করেই চুপ করে থাকে কিংবা সে বোবা কিনা। তার চোখের নজরের ভাব ছিল বিদ্বেষপরায়ণ, তার মুখ ছিল দেখতে বদমেজাজি, তার একমাত্র মধুর দিক ছিল তার নাম : তাকে জনি বলে ডাকা হতো।

কিন্তু তার সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার ছিল তার হাসবার ভঙ্গি৷ হাসিটা শুরু হতো ছোট আকারে, তার পেটের মাঝখান থেকে স্বচ্ছন্দে ধীরে ধীরে, ফুলে ফেঁপে উঠে, আস্তে আস্তে তা ঢেঁকুরে পরিণতি লাভ করে জনির দম আটকে চোখ-মুখ লাল হয়ে বিস্ফোরণের মতন ফেটে পড়ত, এক ভয়ংকর গর্জনের মতন চেঁচিয়ে একাকার হয়ে যেত; তারপর সে জোরে জোরে শব্দ করে মাটিতে পা ঠুকত, নাচত আর হাসতেই থাকত হো-হো করে আর এতে রাজা মশাই বেশ মজা পেতেন আর অন্যদের মুখ বেজার হয়ে যেত আর ভয়ে কলিজা চুপসে যেত। আর রাজপ্রাসাদের সব জায়গায় যখন এ হাসির আওয়াজের শব্দ পেত লোকেরা তখন দরজা-জানলা বন্ধ করে দিত, শাটার নামিয়ে নিত, বাচ্চাদের বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দিত আর কর্ণে গুঁজে দিত তুলা।

জনির হাসবার ভঙ্গি ছিলো দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ব্যাপার।

আর রাজা মশাই যাই বলতেন জনি হাসতোই। একদিন রাজা মশাই বললেন : জনি আমি তোরে ফাঁসিতে ঝুলাব। আর জনি তা শুনে হাসতেই থাকল হি-হি-হা-হা-হি-হি-হো-হো করে হাসতেই থাকল, এরকম হাসি সে আগে কখনোই হাসেনি।

তারপর রাজা মশাই সিদ্ধান্ত নিল আগামীকাল জনিকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। রাজা ফাঁসিকাষ্ঠ বানালেন, তিনি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ছিলেন সিরিয়াস, ফাঁসিকাষ্ঠের সামনে কেমন করে হাসে জনি তা দেখবার খায়েশ জেগেছিল উনার মনে।

তিনি হুকুম জারি করলেন আমজনতাকে এ ন্যক্কারজনক মজমা দেখতে আসার জন্য। কিন্তু লোকেরা সব লুকিয়ে পড়ল, দরজার খিল লাগিয়ে দিল আর সকালে রাজা মশাই দেখলেন তিনি আর জল্লাদ, জল্লাদের হেল্পার আর হাস্যরত জনি।

আর রাজা তার দাসদাসীকে চিল্লাইয়া বললেন—লোকজনরে ধরে আন্। দাসদাসীরা পুরো শহর খুঁজে কাউকে পাইল না, রাজা রাগে কিরমির করতেছিল আর জনি হাসছিল। অবশেষে দাসদাসীরা খুঁজে আনলো একটা বালককে, তারা টেনে হিঁচড়ে তাকে রাজার সামনে আনলো। বালকটি ছিল দেখতে ছোট্ট, গোমড়ামুখ আর লাজুক। রাজা তাকে ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে নির্দেশ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। বালকটি ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে তাকাল, হাসল আর হাততালি দিতে থাকল আর বিস্ময় নিয়ে বলল—আপনে নিশ্চয়ই খুব ভালা রাজা, পায়রা বসনের জন্য দাঁড় বানাইছেন, দ্যাখেন, দ্যাখেন, অলরেডি দুইটা আইসা বইছে।
রাজা বলল—তুই একটা ইডিয়েট। তোর নাম কী?
: আমি ইডিয়েট, রাজামশাই, আমার নাম কোলম্বো, আমারে মায় কোলুম্বিনে কইয়া ডাকে।
রাজা বলল—তুই ইডিয়েট। এখানে একজনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।
কোলুম্বিনে জিজ্ঞাসা করল—উনার নাম কী? যখন সে তার নাম শুনল, সে বলল—কী সুন্দর একটা নাম, তাহলে তার নাম জনি। এত সুন্দর একটা নাম যার তারে কেউ ফাঁসিতে ঝুলাইতে পারে?
রাজা বললেন—কারণ ওর হাসি ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি। রাজা জনিকে হাসতে বললেন আর জনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি করে হেসে উঠল। কোলুম্বিনে তাজ্জব হয়ে গেল আর উনাকে জিজ্ঞেস করল—জনাব, রাজা মশাই, আপনার কাছে উনার হাসি হাছা- হাছাই ভয়ংকর লাগতাছে ? রাজা অবাক হলেন, কোনো উত্তর উনার মাথায় এলো না আর কোলুম্বিনে বলতে থাকল—ওর হাসির ভঙ্গিটা আমার পছন্দ লাগতাছে না, কিন্তু দ্যাখেন, দ্যাখেন, পায়রাগুলি এহনো ফাঁসিকাষ্ঠে বইসা আছে। ওর হাসি শুইন্না ডরায় নাই। তাদের কাছে উনার হাসি ভয়ংকর লাগেনি। পায়রাদের কান খুবই স্পর্শকাতর। জনিকে আপনার ছাইড়া দিতে হবে। রাজা ব্যাপারটা ভেবে-চিন্তে বললেন—যা, জনি, তোরে ছেড়ে দিলাম। আর জনি পহেলাবারের মতো একটা কথা উচ্চারণ করল কোলুম্বিনের উদ্দেশ্যে—শুকরিয়া। তারপর ভালো মানুষের মতো একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। রাজার আর কোনো ভাঁড় রইল না।
রাজামশাই কোলুম্বিনেকে বলল—আমার লগে চল্।
রাজ-দাসদাসী, রাজদরবারের সবাই ভাবল যে, কোলুম্বিনে রাজদরবারের নতুন ভাঁড়।

কিন্তু কোলুম্বিনে এতে মোটেও খুশি হলো না। সে দাঁড়িয়ে রইল, তাজ্জব। কালেভাদ্রে একটা কথা বলবে কি বলবে না, হো হো করে হাসেও না, শুধু একটা মুচকি হাসল আর কেউ এতে হাসল না। লোকজন বলল—সে তো ভাঁড় না, সে ইডিয়েট। কোলুম্বিনে বলল—আমি ভাঁড় নই, আমি ইডিয়েটই।

তখন লোকজন তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করল। রাজা যদি জানতেন কোলুম্বিনেকে নিয়ে লোকে হাসি-তামাশা করছে, তাহলে তিনি রাগান্বিত হয়ে পড়তেন, কিন্তু কোলুম্বিনে রাজার কাছে তা বলল না। কারণ তাকে নিয়ে কেউ হাসি-তামাশা করলে সে কিচ্ছুই মনে করে না। রাজদরবারে আছে পালোয়ান, চালাক-চতুর লোক, রাজা তো রাজাই, রুপসী আওরাত, সাহসী পুরুষ, অনুগত ধর্মযাজক আর রান্নাঘরের দাসীরা বেশ পরিশ্রমী—কেবল কোলুম্বিনে, এই কোলুম্বিনে কিচ্ছুই না। যখন কেউ একজন বলে—আয়, কোলুম্বিনে আমার লগে কুস্তি লাগ্, কোলুম্বিনে উত্তর দেয়—আমার শইলে আপনের মতন জোর নাই। যখন কেউ বলে—সাত গুণ দুই কত রে? কোলুম্বিনে উত্তর দিত—আমি আপনের চেয়ে বেশি মুর্খচোদা। যখন কেউ একজন বলে—তোমার কি ঝরনা থেকে লাফ দেওয়ার সাহস আছে ? কোলুম্বিনে জবাব দিত—আমি ভীতুর ডিম। আমার সেরম সাহস নাই।

যখন রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল—কোলুম্বিনে তুমি কী হতে চাও? কোলুম্বিনে জবাবে বলল—আমি কিচ্ছুই হইবার চাই না। আমি তো অলরেডি একটা কিচ্ছু হয়েই আছি৷ আমি কোলুম্বিনে। রাজা মশাই বললেন—কিন্তু তোমাকে তো একটা কিছু হতেই হবে। কোলুম্বিনে বলল—একটা মানুষ কী কী হইবার পারে?
তারপর রাজা মশাই বললেন—ওই যে, দাড়িওলা লোকটি দেখতাছো, তামাটে রঙের, শুকনো ও কুঁচকানো মুখশ্রী, সে হলো নাবিক। সে নাবিকই হতে চেয়েছে আর তাই-ই হয়েছে। সে পাল খাটানো জাহাজে করে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় আর রাজা মশাইয়ের জন্য নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করে। কোলুম্বিনে বলল—রাজা মশাই যদি চান, তাহলে আমিও নাবিক হব। এ কথা শুনে রাজদরবারে হাসির রোল পড়ে গেল। কোলুম্বিনে রাজদরবার থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল আর উচুস্বরে কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দেশ আবিষ্কার করমু। লোকজন পরস্পরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল আর মাথা ঝাঁকাল আর কোলুম্বিনে রাজপ্রাসাদ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শহরের ওপর দিয়ে, মাঠের ওপর দিয়ে আর মাঠে যেসব কৃষকেরা ছিল তারা তাকে দ্রুত ছুটতে দেখছিল, সে তাদেরকে ডেকে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু। আর সে দৌড়াতে দৌড়াতে এক অরণ্যে এসে পৌঁছল। আর সপ্তাহে পর সপ্তাহ অরণ্যের ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে রইল এবং ওই সপ্তাহগুলিতে কেউ কোলুম্বিনের কোনো খোঁজ পেল না৷ রাজা মশাই বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়লেন, নিজকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকলেন আর রাজদরবারের লোকেরা যারা কোলুম্বিনেকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছিল তারা শরমিন্দায় ভুগতে থাকল। আর সেজন্য মিনারের পাহারাদার যখন শিঙায় ফুঁ দিল তখন কোলুম্বিনেকে মাঠ পেরিয়ে, শহর পেরিয়ে, রাজফটক পার হয়ে রাজা মশাইয়ের কাছে আসতে দেখল সবাই বেশি আনন্দিত হলো আর কোলুম্বিনে রাজা মশাইকে বলল—জাঁহাপনা, কোলুম্বিনে, একটা দ্যাশ আবিষ্কার করছে। রাজদরবারের কেউ কোলুম্বিনেকে নিয়ে যেহেতু হাসি-তামাশা করতে চাচ্ছিল না, তাই তারা গম্ভীর মুখের ভান করে সওয়াল করল—নাম কী দ্যাশের? কোনহানে এইটা? কোলুম্বিনে জবাব দিল—এইটার এহনো নাম হয় নাই, এই তো মাত্র দ্যাশটার সন্ধান পাইলাম, এইটা মেলা দূর, সমুদ্রের ভিত্তে। এরপর দাড়িওলা নাবিক জোশ নিয়ে উঠে দাঁড়াল আর বলল—ঠিক আছে, কোলুম্বিনে। আমি, আমেরিকাগো ভিসপুচ্চি। আমি দ্যাশটা খুঁজতে যামু, তুমি খালি কও কেমনে যাইতে হবে।
কোলুম্বিনে জবাব দিল—পাল খাটানো জাহাজ লইয়া সমুদ্রে বেরিয়ে পড়বেন, তারপরে সোজা সামনে যাইতেই থাকবেন, যাইতেই থাকবেন, যদ্দিন না দ্যাশটার দেখা না পান, হাল ছাইড়া ফিরা আইলে কিন্তু হবে না। কোলুম্বিনে ডর পেয়ে গেল, কারণ সে ছিল মিথ্যুক, সে জানত যে ওরকম কোনো দেশ নাই। সেই টেনশনে কোলুম্বিনের রাতের আরামের ঘুম হারাম হলো। কিন্তু আমেরিকাগো ভেসপুচ্চি দেশটার খোঁজে বেড়িয়ে পড়ল। কেউ জানত না সে পাল খাটানো জাহাজ নিয়ে কোথায় গেছে।

হয়তো সে অরণ্যে লুকিয়ে ছিল। আর যখন শিঙায় ফুঁ দেওয়া হলো আমেরিকাগো ফিরে আসল।

কোলুম্বিনের মুখ লজ্জায় লালে লাল হয়ে গেল আর এত নামজাদা-এত বড় নাবিকের দিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত সে পাচ্ছিল না। ভেসপুচ্চি রাজা মশাইয়ের সামনে দাঁড়াল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে চোখ টিপ্পি দিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে আবার চোখ টিপল, শোনা যায় এরকম জোরে স্পষ্টভাবে বলল—রাজামশাই, সে বলল—রাজা মশাই, এরকম একটা দ্যাশ আছে। ভেসপুচ্চি আমেরিকাগো গোমর ফাঁস না করার কারণে কোলুম্বিনে এতই খুশি হলো যে দৌড়িয়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আর বলল—আমেরিকাগো, আমার জান আমেরিকাগো। আর লোকে ধরে নিল এটাই বুঝি দেশটার নাম আর তারা যে দেশটা নাই তার নাম দিল—আমেরিকা।

রাজামশাই বলল—এখন তুই বড় মানুষ হইছস্ আর এখন থেকে তোর নাম—কলম্বাস। কলম্বাস নামজাদা হয়ে গেল, সবাই তার দিকে হা করে চেয়ে থাকত আর পরস্পর ফিশফিশ্ করে বলত—বুঝলা, হে-ই আমেরিকা আবিষ্কার করছে। প্রত্যেকে আমেরিকা বলে যে একটা দেশ আছে এটা বিশ্বাস করল, শুধু কলম্বাস এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না, সারাটা জীবন তার সন্দেহে কাটল আর তার সাহসে কুলালো না নাবিককে জিজ্ঞাসা করতে যে সত্যিটা কী তা যেন তাকে বলে।

তারপর অন্যান্য লোকেরা পাল খাটিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্য রওনা করল, ফিরেও আসলো অনেকে আর তারা ফিরে এসে বলল যে—আমেরিকা বইলা একটা দ্যাশ আছে।
যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে বলল—আমার কথাই যদি ধরো, এই আমি কখনো আমেরিকা যাইনি।
জানিও না এ আমেরিকা নামে কোনো দেশ আছে কিনা। সম্ভবত লোকজন ভান করে যে এরকম দেশ আছে যাতে করে কলম্বাসের দিলে কষ্ট না লাগে। যখন দুজন লোক আমেরিকার ব্যাপারে কথা বলে তারা খুব কম ‘আমেরিকা’ বলে, সচরাচর তারা ধোঁয়াশা করে বলে—একটা দেশ বা ওই দেশ অথবা ওইরকম একটা কিছু—আকার ইঙ্গিতে কথা বলে।

সম্ভবত যারা আমেরিকা যেতে চায় তাদের প্লেনে অথবা জাহাজে কোলুম্বিনের গল্পটা শোনানো হয়, পরে তারা কোথাও লুকিয়ে থাকে এবং ফিরে এসে বলে—কাউবয়, স্কাইস্ক্র্যাপার, নয়াগ্রা জলপ্রপাত, মিশিসিপি, নিউ ইয়র্ক, সান ফ্রান্সসিককো সম্পর্কে খোশগল্প ফাঁদে আর বলে।

যাই হোক তারা সকলে একই গল্প বলে, এমন গল্প বলে যা তারা আমেরিকা যাওয়ার আগেই জানত, এটা তুমি মঞ্জুর করে নিবে যে এটা একটা সন্দেহ জাগানো ব্যাপার। কিন্তু লোকজন এখনো তর্কাতর্কি করে এ নিয়ে যে কলম্বাস আসলে কে ছিল।
আমি জানি সে আসলে কে ছিল।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;