আমেরিকা বলে কোনো স্থান নেই



অনুবাদ : মিলু হাসান
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

গল্প বলে এমন একজনের গল্প ছিল আমার কাছে। আমি তাকে বলতে বলতে কান ঝালাফালা করে ফেলছি যে আপনের গল্পে আমার এক ছটাকও ঈমান নাই। আমি বলছি—আপনে মিছা কইতাছেন। আপনের আষাঢ়ের গপ্ আমার লগে কইয়েন না, বানাইয়া বানাইয়া, আমারে বিশ্বাস করানির জন্য। এসব বলার পরেও তার উপরে কোনো প্রভাব পড়ল না। তার কোনো ভাবান্তর হলো না, সে গল্প বলেই যাচ্ছে, তারপর আমি শেষে বললাম—আপনে মিথ্যুক, আপনে আজগুবি গপ্ কওয়া লোক, আপনে মিষ্টি মিষ্টি গপ্ ফাঁদেন একটার পর একটা, আপনে ধাপ্পাবাজ রসিক। সে একরোখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, মাথা নেড়ে হুঁ হুঁ করল, একটা মনমরা হাসি দিল আর খুব নরম সুরে এমন কথা বলল যে আমি নিজে বেশ শরমিন্দা বোধ করলাম, শরমে পড়ে গেলাম, সে বলল : আমেরিকা বলে কোনো দ্যাশ নাই।

শুধু তারে বুঝ দেবার জন্য আমি তারে কথা দিছিলাম যে আমি তার গল্পটা লিখব। গল্পটা শুরু হয়েছিল পাঁচশো বছর আগে স্পেনের রাজার রাজদরবারে। তার মধ্যে আছে এক রাজপ্রসাদ, রেশম আর মখলম, সোনা, রুপা, দাড়ি, মুকুট, মোমবাতি, দাসদাসী, আছে তারা যারা সকাল হতে না হতে একে অন্যের ভুঁড়িতে ঢুকিয়ে দেয় তলোয়ার, যারা আগের রাতে পরস্পরের পায়ের কাছে দস্তানা ছুড়ে চ্যালেঞ্জ দেয় যুদ্ধের আর মিনারে পাহরাদার বাজায় শিঙা। আর আছে বার্তাবাহক এরা লাফিয়ে নামে ঘোড়া থেকে আর লাফিয়ে ওঠে জিনপড়ানো ঘোড়ায়, আছে রাজার সাচ্চা দোস্তরা আর ভণ্ড দোস্তরাও, আছে চোখ ধাঁধানো রূপবতী আর ছলচাতুরী আয়ত্ত করা বিপদজনক রমণী, আছে অঢেল সুরা আর রাজপ্রসাদের চারদিকে আছে এমন সব লোকজন যারা এইসব কিছুর জন্য দাম চুকানো ছাড়া ভালো কিছু করার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু এরকম জীবন যাপন করা ছাড়া রাজা অন্য কোনো জীবন যাপনের কথা ভাবতেই পারে না, যেখানেই যে বেঁচে থাকুক থাকুক, খুব আলিশানভাবে আরাম-আয়েশে কিংবা দীনদরিদ্রে, মাদ্রিদ, বার্সেলোনা অথবা যেখানেই হোক, দিনশেষে সেই একঘেয়ে ডেইলি রুটিন, বিরক্তি চরমে উঠে যায়। যেমন যারা অন্যখানে থাকে তারা ভাবে বার্সেলোনা একটা চমৎকার জায়গা আর যারা বার্সেলোনা থাকে তারা ভাবে অন্য কোনোখানে গেলে বুঝি বাঁচে প্রাণ।

গরিবরা ভাবে রাজার মতো জীবন যাপন করা কতই না মজার আর এ ভেবে দিলে কষ্ট পায় যে রাজা ভাবে গরিবদের গরিব হওয়াই ঠিক আছে।

সকালে রাজা ঘুম থেকে উঠে আর রাত্রে বিছানায় নিদ্রা যায়, আর সারাটা দিন কাটে একঘেয়ে, বিরক্তিকর আর কত যে টেনশন—দাসদাসী নিয়ে টেনশন, সোনা, রুপা, মখমল, রেশম নিয়ে টেনশন আর তার উপরে মোমবাতিগুলোও তার একঘেয়ে লাগে। তার বিছানা পরিপাটি-সাজানো-গোছানো, জমকালো কিন্তু এতে ঘুম দেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করবার কিছু নাই।

দাসদাসীরা সকালে তারে মাথা নুয়ে সম্মান করে—ঠিক ততটুক নোয় পরদিন সকালে, এতে রাজা অভ্যস্ত, এগুলা সে খেয়াল করে না। কেউ তাকে দেয় কাঁটা চামিচ, কেউ তাকে দেয় তলোয়ার, কেউ তার বসার জন্য কেদারা পেতে দেয়, আমজনতা তারে জাঁহাপনা বলে ডাকে আর সাথে জুড়ে দেয় কত কত লকব আর ব্যস, এই তো, এইসব। কেউ তাকে কখনোই বলেনি—আপনি ইডিয়েট, আপনি বোকারাম আর আজকে তার সাথে তারা যে বাতচিৎ করেছে, সেসব পুরানো প্যাঁচাল তারা গতকালও তার সাথে করেছে।

এই হলো গিয়ে অবস্থা।

আর এ জন্য রাজা মশাই রাজদরবারে ভাঁড় পালেন। ভাঁড়েরা যা খুশি করার অনুমতি দেওয়া আছে, যা খুশি তাইই বলতে পারে—রাজামশাইয়ের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য, আর যখন তাদের কাণ্ডকীর্তি দেখে রাজা মশাইয়ের হাসি পায় না তখন তিনি তাদের কতল করার হুকুম জারি করেন কিংবা অইরকম কিছুই করার হুকুম দেন।

তো, একবার তার রাজদরবারে এক ভাঁড় ছিল যে কথাবার্তায় প্যাঁচগোছ লাগিয়ে দিত। রাজা মশাই এতে হাসির খোরাক খুঁজে পেতেন। ভাঁড় ‘রাজামশাই’ না বলে বলত ‘পাদমশাই’, ‘প্রসাদ’ না বলে বলত ‘পরসাদ’ আর ‘গুড মর্নিং’ না বলে বলতো ‘মুড গরিং’।

আমার মনে হয় ব্যাপারটা বোকাসোকা কিন্তু রাজা মশাই ভাবতেন ফানি। বছরের অর্ধেকটা সময়, ৭ জুলাই অব্দি, তিনি ভাবতেন ব্যাপারটা ফানি আর যখন ৮ তারিখ উনার ঘুম ভাঙল আর ভাঁড় বলল—‘মুড গরিং’, ‘পাদমশাই’—তখন রাজা মশাই বললেন—ওর থেকে আমারে রেহাই দাও।

আরেকজন ভাঁড় খাটো, মোটাসোটা যাকে সবাই পেপে বলে ডাকত, সে রাজামশাইকে মাত্র চারদিন খুশি রাখতে পেরেছিল। সে রাজদরবারের নারী, পুরুষ, রাজপুত্র, উজির-নাজির, সেনাপতির চেয়ারে মধু মেখে রাজার মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। চতুর্থদিনে সে যখন রাজামশাইয়ের সিংহাসনে মধু মাখল, রাজামশাইয়ের হাসি পেল না আর পেপে ভাঁড় রইল না। তারপর রাজা মশাই দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ভাঁড়টিকে খরিদ করে আনলো৷ সে দেখতে কুৎসিত, একইসাথে হাড্ডিসার আবার নাদুস-নুদুস, লম্বা-রোগা আবার বেঁটে-মোটা। কেউ জানত না সে কথা বলতে পারে কিনা নাকি ইচ্ছা করেই চুপ করে থাকে কিংবা সে বোবা কিনা। তার চোখের নজরের ভাব ছিল বিদ্বেষপরায়ণ, তার মুখ ছিল দেখতে বদমেজাজি, তার একমাত্র মধুর দিক ছিল তার নাম : তাকে জনি বলে ডাকা হতো।

কিন্তু তার সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার ছিল তার হাসবার ভঙ্গি৷ হাসিটা শুরু হতো ছোট আকারে, তার পেটের মাঝখান থেকে স্বচ্ছন্দে ধীরে ধীরে, ফুলে ফেঁপে উঠে, আস্তে আস্তে তা ঢেঁকুরে পরিণতি লাভ করে জনির দম আটকে চোখ-মুখ লাল হয়ে বিস্ফোরণের মতন ফেটে পড়ত, এক ভয়ংকর গর্জনের মতন চেঁচিয়ে একাকার হয়ে যেত; তারপর সে জোরে জোরে শব্দ করে মাটিতে পা ঠুকত, নাচত আর হাসতেই থাকত হো-হো করে আর এতে রাজা মশাই বেশ মজা পেতেন আর অন্যদের মুখ বেজার হয়ে যেত আর ভয়ে কলিজা চুপসে যেত। আর রাজপ্রাসাদের সব জায়গায় যখন এ হাসির আওয়াজের শব্দ পেত লোকেরা তখন দরজা-জানলা বন্ধ করে দিত, শাটার নামিয়ে নিত, বাচ্চাদের বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দিত আর কর্ণে গুঁজে দিত তুলা।

জনির হাসবার ভঙ্গি ছিলো দিন-দুনিয়ার সবচে ভয়ংকর ব্যাপার।

আর রাজা মশাই যাই বলতেন জনি হাসতোই। একদিন রাজা মশাই বললেন : জনি আমি তোরে ফাঁসিতে ঝুলাব। আর জনি তা শুনে হাসতেই থাকল হি-হি-হা-হা-হি-হি-হো-হো করে হাসতেই থাকল, এরকম হাসি সে আগে কখনোই হাসেনি।

তারপর রাজা মশাই সিদ্ধান্ত নিল আগামীকাল জনিকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। রাজা ফাঁসিকাষ্ঠ বানালেন, তিনি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ছিলেন সিরিয়াস, ফাঁসিকাষ্ঠের সামনে কেমন করে হাসে জনি তা দেখবার খায়েশ জেগেছিল উনার মনে।

তিনি হুকুম জারি করলেন আমজনতাকে এ ন্যক্কারজনক মজমা দেখতে আসার জন্য। কিন্তু লোকেরা সব লুকিয়ে পড়ল, দরজার খিল লাগিয়ে দিল আর সকালে রাজা মশাই দেখলেন তিনি আর জল্লাদ, জল্লাদের হেল্পার আর হাস্যরত জনি।

আর রাজা তার দাসদাসীকে চিল্লাইয়া বললেন—লোকজনরে ধরে আন্। দাসদাসীরা পুরো শহর খুঁজে কাউকে পাইল না, রাজা রাগে কিরমির করতেছিল আর জনি হাসছিল। অবশেষে দাসদাসীরা খুঁজে আনলো একটা বালককে, তারা টেনে হিঁচড়ে তাকে রাজার সামনে আনলো। বালকটি ছিল দেখতে ছোট্ট, গোমড়ামুখ আর লাজুক। রাজা তাকে ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে নির্দেশ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। বালকটি ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে তাকাল, হাসল আর হাততালি দিতে থাকল আর বিস্ময় নিয়ে বলল—আপনে নিশ্চয়ই খুব ভালা রাজা, পায়রা বসনের জন্য দাঁড় বানাইছেন, দ্যাখেন, দ্যাখেন, অলরেডি দুইটা আইসা বইছে।
রাজা বলল—তুই একটা ইডিয়েট। তোর নাম কী?
: আমি ইডিয়েট, রাজামশাই, আমার নাম কোলম্বো, আমারে মায় কোলুম্বিনে কইয়া ডাকে।
রাজা বলল—তুই ইডিয়েট। এখানে একজনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।
কোলুম্বিনে জিজ্ঞাসা করল—উনার নাম কী? যখন সে তার নাম শুনল, সে বলল—কী সুন্দর একটা নাম, তাহলে তার নাম জনি। এত সুন্দর একটা নাম যার তারে কেউ ফাঁসিতে ঝুলাইতে পারে?
রাজা বললেন—কারণ ওর হাসি ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি। রাজা জনিকে হাসতে বললেন আর জনি আগের চেয়ে দ্বিগুণ ভয়ংকর, বেজায় বিচ্ছিরি করে হেসে উঠল। কোলুম্বিনে তাজ্জব হয়ে গেল আর উনাকে জিজ্ঞেস করল—জনাব, রাজা মশাই, আপনার কাছে উনার হাসি হাছা- হাছাই ভয়ংকর লাগতাছে ? রাজা অবাক হলেন, কোনো উত্তর উনার মাথায় এলো না আর কোলুম্বিনে বলতে থাকল—ওর হাসির ভঙ্গিটা আমার পছন্দ লাগতাছে না, কিন্তু দ্যাখেন, দ্যাখেন, পায়রাগুলি এহনো ফাঁসিকাষ্ঠে বইসা আছে। ওর হাসি শুইন্না ডরায় নাই। তাদের কাছে উনার হাসি ভয়ংকর লাগেনি। পায়রাদের কান খুবই স্পর্শকাতর। জনিকে আপনার ছাইড়া দিতে হবে। রাজা ব্যাপারটা ভেবে-চিন্তে বললেন—যা, জনি, তোরে ছেড়ে দিলাম। আর জনি পহেলাবারের মতো একটা কথা উচ্চারণ করল কোলুম্বিনের উদ্দেশ্যে—শুকরিয়া। তারপর ভালো মানুষের মতো একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। রাজার আর কোনো ভাঁড় রইল না।
রাজামশাই কোলুম্বিনেকে বলল—আমার লগে চল্।
রাজ-দাসদাসী, রাজদরবারের সবাই ভাবল যে, কোলুম্বিনে রাজদরবারের নতুন ভাঁড়।

কিন্তু কোলুম্বিনে এতে মোটেও খুশি হলো না। সে দাঁড়িয়ে রইল, তাজ্জব। কালেভাদ্রে একটা কথা বলবে কি বলবে না, হো হো করে হাসেও না, শুধু একটা মুচকি হাসল আর কেউ এতে হাসল না। লোকজন বলল—সে তো ভাঁড় না, সে ইডিয়েট। কোলুম্বিনে বলল—আমি ভাঁড় নই, আমি ইডিয়েটই।

তখন লোকজন তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করল। রাজা যদি জানতেন কোলুম্বিনেকে নিয়ে লোকে হাসি-তামাশা করছে, তাহলে তিনি রাগান্বিত হয়ে পড়তেন, কিন্তু কোলুম্বিনে রাজার কাছে তা বলল না। কারণ তাকে নিয়ে কেউ হাসি-তামাশা করলে সে কিচ্ছুই মনে করে না। রাজদরবারে আছে পালোয়ান, চালাক-চতুর লোক, রাজা তো রাজাই, রুপসী আওরাত, সাহসী পুরুষ, অনুগত ধর্মযাজক আর রান্নাঘরের দাসীরা বেশ পরিশ্রমী—কেবল কোলুম্বিনে, এই কোলুম্বিনে কিচ্ছুই না। যখন কেউ একজন বলে—আয়, কোলুম্বিনে আমার লগে কুস্তি লাগ্, কোলুম্বিনে উত্তর দেয়—আমার শইলে আপনের মতন জোর নাই। যখন কেউ বলে—সাত গুণ দুই কত রে? কোলুম্বিনে উত্তর দিত—আমি আপনের চেয়ে বেশি মুর্খচোদা। যখন কেউ একজন বলে—তোমার কি ঝরনা থেকে লাফ দেওয়ার সাহস আছে ? কোলুম্বিনে জবাব দিত—আমি ভীতুর ডিম। আমার সেরম সাহস নাই।

যখন রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল—কোলুম্বিনে তুমি কী হতে চাও? কোলুম্বিনে জবাবে বলল—আমি কিচ্ছুই হইবার চাই না। আমি তো অলরেডি একটা কিচ্ছু হয়েই আছি৷ আমি কোলুম্বিনে। রাজা মশাই বললেন—কিন্তু তোমাকে তো একটা কিছু হতেই হবে। কোলুম্বিনে বলল—একটা মানুষ কী কী হইবার পারে?
তারপর রাজা মশাই বললেন—ওই যে, দাড়িওলা লোকটি দেখতাছো, তামাটে রঙের, শুকনো ও কুঁচকানো মুখশ্রী, সে হলো নাবিক। সে নাবিকই হতে চেয়েছে আর তাই-ই হয়েছে। সে পাল খাটানো জাহাজে করে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় আর রাজা মশাইয়ের জন্য নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করে। কোলুম্বিনে বলল—রাজা মশাই যদি চান, তাহলে আমিও নাবিক হব। এ কথা শুনে রাজদরবারে হাসির রোল পড়ে গেল। কোলুম্বিনে রাজদরবার থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল আর উচুস্বরে কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দেশ আবিষ্কার করমু। লোকজন পরস্পরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল আর মাথা ঝাঁকাল আর কোলুম্বিনে রাজপ্রাসাদ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শহরের ওপর দিয়ে, মাঠের ওপর দিয়ে আর মাঠে যেসব কৃষকেরা ছিল তারা তাকে দ্রুত ছুটতে দেখছিল, সে তাদেরকে ডেকে বলল—আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু, আমি একটা দ্যাশ আবিষ্কার করমু। আর সে দৌড়াতে দৌড়াতে এক অরণ্যে এসে পৌঁছল। আর সপ্তাহে পর সপ্তাহ অরণ্যের ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে রইল এবং ওই সপ্তাহগুলিতে কেউ কোলুম্বিনের কোনো খোঁজ পেল না৷ রাজা মশাই বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়লেন, নিজকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকলেন আর রাজদরবারের লোকেরা যারা কোলুম্বিনেকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছিল তারা শরমিন্দায় ভুগতে থাকল। আর সেজন্য মিনারের পাহারাদার যখন শিঙায় ফুঁ দিল তখন কোলুম্বিনেকে মাঠ পেরিয়ে, শহর পেরিয়ে, রাজফটক পার হয়ে রাজা মশাইয়ের কাছে আসতে দেখল সবাই বেশি আনন্দিত হলো আর কোলুম্বিনে রাজা মশাইকে বলল—জাঁহাপনা, কোলুম্বিনে, একটা দ্যাশ আবিষ্কার করছে। রাজদরবারের কেউ কোলুম্বিনেকে নিয়ে যেহেতু হাসি-তামাশা করতে চাচ্ছিল না, তাই তারা গম্ভীর মুখের ভান করে সওয়াল করল—নাম কী দ্যাশের? কোনহানে এইটা? কোলুম্বিনে জবাব দিল—এইটার এহনো নাম হয় নাই, এই তো মাত্র দ্যাশটার সন্ধান পাইলাম, এইটা মেলা দূর, সমুদ্রের ভিত্তে। এরপর দাড়িওলা নাবিক জোশ নিয়ে উঠে দাঁড়াল আর বলল—ঠিক আছে, কোলুম্বিনে। আমি, আমেরিকাগো ভিসপুচ্চি। আমি দ্যাশটা খুঁজতে যামু, তুমি খালি কও কেমনে যাইতে হবে।
কোলুম্বিনে জবাব দিল—পাল খাটানো জাহাজ লইয়া সমুদ্রে বেরিয়ে পড়বেন, তারপরে সোজা সামনে যাইতেই থাকবেন, যাইতেই থাকবেন, যদ্দিন না দ্যাশটার দেখা না পান, হাল ছাইড়া ফিরা আইলে কিন্তু হবে না। কোলুম্বিনে ডর পেয়ে গেল, কারণ সে ছিল মিথ্যুক, সে জানত যে ওরকম কোনো দেশ নাই। সেই টেনশনে কোলুম্বিনের রাতের আরামের ঘুম হারাম হলো। কিন্তু আমেরিকাগো ভেসপুচ্চি দেশটার খোঁজে বেড়িয়ে পড়ল। কেউ জানত না সে পাল খাটানো জাহাজ নিয়ে কোথায় গেছে।

হয়তো সে অরণ্যে লুকিয়ে ছিল। আর যখন শিঙায় ফুঁ দেওয়া হলো আমেরিকাগো ফিরে আসল।

কোলুম্বিনের মুখ লজ্জায় লালে লাল হয়ে গেল আর এত নামজাদা-এত বড় নাবিকের দিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত সে পাচ্ছিল না। ভেসপুচ্চি রাজা মশাইয়ের সামনে দাঁড়াল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে চোখ টিপ্পি দিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিল, কোলুম্বিনের দিকে চেয়ে আবার চোখ টিপল, শোনা যায় এরকম জোরে স্পষ্টভাবে বলল—রাজামশাই, সে বলল—রাজা মশাই, এরকম একটা দ্যাশ আছে। ভেসপুচ্চি আমেরিকাগো গোমর ফাঁস না করার কারণে কোলুম্বিনে এতই খুশি হলো যে দৌড়িয়ে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আর বলল—আমেরিকাগো, আমার জান আমেরিকাগো। আর লোকে ধরে নিল এটাই বুঝি দেশটার নাম আর তারা যে দেশটা নাই তার নাম দিল—আমেরিকা।

রাজামশাই বলল—এখন তুই বড় মানুষ হইছস্ আর এখন থেকে তোর নাম—কলম্বাস। কলম্বাস নামজাদা হয়ে গেল, সবাই তার দিকে হা করে চেয়ে থাকত আর পরস্পর ফিশফিশ্ করে বলত—বুঝলা, হে-ই আমেরিকা আবিষ্কার করছে। প্রত্যেকে আমেরিকা বলে যে একটা দেশ আছে এটা বিশ্বাস করল, শুধু কলম্বাস এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না, সারাটা জীবন তার সন্দেহে কাটল আর তার সাহসে কুলালো না নাবিককে জিজ্ঞাসা করতে যে সত্যিটা কী তা যেন তাকে বলে।

তারপর অন্যান্য লোকেরা পাল খাটিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্য রওনা করল, ফিরেও আসলো অনেকে আর তারা ফিরে এসে বলল যে—আমেরিকা বইলা একটা দ্যাশ আছে।
যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে বলল—আমার কথাই যদি ধরো, এই আমি কখনো আমেরিকা যাইনি।
জানিও না এ আমেরিকা নামে কোনো দেশ আছে কিনা। সম্ভবত লোকজন ভান করে যে এরকম দেশ আছে যাতে করে কলম্বাসের দিলে কষ্ট না লাগে। যখন দুজন লোক আমেরিকার ব্যাপারে কথা বলে তারা খুব কম ‘আমেরিকা’ বলে, সচরাচর তারা ধোঁয়াশা করে বলে—একটা দেশ বা ওই দেশ অথবা ওইরকম একটা কিছু—আকার ইঙ্গিতে কথা বলে।

সম্ভবত যারা আমেরিকা যেতে চায় তাদের প্লেনে অথবা জাহাজে কোলুম্বিনের গল্পটা শোনানো হয়, পরে তারা কোথাও লুকিয়ে থাকে এবং ফিরে এসে বলে—কাউবয়, স্কাইস্ক্র্যাপার, নয়াগ্রা জলপ্রপাত, মিশিসিপি, নিউ ইয়র্ক, সান ফ্রান্সসিককো সম্পর্কে খোশগল্প ফাঁদে আর বলে।

যাই হোক তারা সকলে একই গল্প বলে, এমন গল্প বলে যা তারা আমেরিকা যাওয়ার আগেই জানত, এটা তুমি মঞ্জুর করে নিবে যে এটা একটা সন্দেহ জাগানো ব্যাপার। কিন্তু লোকজন এখনো তর্কাতর্কি করে এ নিয়ে যে কলম্বাস আসলে কে ছিল।
আমি জানি সে আসলে কে ছিল।

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;

সাঈদ চৌধুরী: চিত্তে উড়ে জালালী কইতর



মুসা আল হাফিজ
সাঈদ চৌধুরী

সাঈদ চৌধুরী

  • Font increase
  • Font Decrease

আপনি গল্পকার। প্রত্যক্ষের আড়ালে জীবনের যে জটিলতা ও রহস্যময়তা, তাকে আপনি বয়ন করেন। সেই বয়নে চরিত্রের প্রতি আপনি পক্ষপাতশূন্য, আবেগ বিষয়ে ঘোরাহত কিন্তু নির্বিকার, শিল্পী হিসেবে অঙ্গীকারাবদ্ধ কিন্তু নিরাসক্ত, পরিবেশ বিষয়ে বহুদর্শী ও সচেতন, বিচারবুদ্ধি সম্পর্কে আপনি নাছোড়, নিরাপোষ। আপনার মনোযোগ মূলত স্বরূপ সন্ধানে।

হ্যাঁ, আপনি গল্পকার। চোখ আপনার চাই। নিজের চোখ। এক জোড়া, কয়েক জোড়া, কিংবা কয়েক শত ... জ্বলজ্বলে, ড্যাবড্যাবে চোখ। রঞ্জনরশ্মি তাতে থাকবে, সব ঘষে ঘষে যাচাই করার ক্ষমতা সরবরাহ করবে সেই চোখ, শব্দে, বাক্যে, চরিত্রে, প্লটে সেই চোখের জ্যোতি জ্বলতে থাকবে। এর ভেতরে থাকবে অভিজ্ঞতা, বাইরে থাকবে শিল্পরূপায়ন।

এই যে আমরা চোখ নিয়ে কথা বলছি, উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে সাঈদ চৌধুরীর একগুচ্ছ গল্প। গল্পগুলোতে আন্তরজীবনের অন্তরীণ ভাষা যতোটা বন্ধনমুক্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে বাইরের চিত্রপট। সাঈদ চৌধুরীর দেখার চোখ ভ্রামণিকের কথা মনে করিয়ে দেয়। যার দৃষ্টি ও সৃষ্টির একপ্রান্তে সবুজ-শ্যামলে, প্রাণে ও অধ্যাত্মে পল্লবিত সিলেট, আরেক প্রান্তে টেমসের তীর, ব্রিটেন-ইউরোপ।

সাঈদ চৌধুরী মানুষের জীবন যাপনের বিচিত্র অনুষঙ্গকে দেখেছেন দুনিয়ার নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে। তার প্রান্ত যেখানেই যাক, শেকড় থেকেছে বাংলায়, দেশ মৃত্তিকায় আর স্বকীয় আত্মপরিচয়ে। যে পরিচয় জন্ম নিয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য থেকে। তার আলোকের ঝরণাধারা স্থির মূল্যবোধ থেকে উড়নচণ্ডী এই সমাজ ও সময়কে দেখার ও দেখানোর একটি প্রতিবেদন। এই দেখা ও দেখানোর মূল লক্ষ্য ও কেন্দ্র হলো আলোয় প্রত্যাবর্তনের ব্যাকুলতা।


গল্প অনেক রকম। ব্যক্তির যে নিজস্ব যাপন, সেই যাপনের পটভূমি থেকে যখন গল্প তৈরী হয় আর তার চরিত্র সমূহ বিকশিত হয়, একে আমরা লিপ্তধারার গল্প বলতে পারি। সাঈদ চৌধুরী মূলত লিপ্তধারার গল্পকার। ফলে তার চরিত্রগুলোকে তার জীবনের যাপন থেকে যেমন আলাদা মনে হয় না, তেমনি তার পরিবেশ চিত্রায়নও তার যাপনশীলতার অংশ।

আলোক ঝরণাধারা গল্পের হান্নানা থাকেন সিলেটে, যেখানে একদিকে চাষণীপীরের মাজার, অপরদিকে অসংখ্য বানরের বসবাস। যখন মাজার হাজির হলো, মনষ্কামনাও হাজির। হান্নানা আপন মনোবাসনা পুরণের আশায় মাজারে মান্নত করেন, তবে গল্পের আলাল একে পছন্দ করে না। যদিও পশুপাখির প্রতি তার অনুরাগ প্রবল।

আলালের হৃদয়ে বসবাস করে সামিয়া। ভালোবাসা দিবসে তারা বিনিময় করে ফুল। এই ফুল ক্রয়ে দোকানযাত্রায় লেখক হাজির করেন ভালোবাসা দিবসের আড়ালে বাণিজ্যের পসরাকে। গল্পের প্রধান চরিত্র পলাশ থাকেন ইংল্যান্ডে, ফিরে আসেন সিলেটে, স্ত্রী মারা গেছেন এখানেই। বিয়ে করতে চান না। কিন্তু পরিবার মনে করে, প্রয়োজন হাজির করে। গল্পের সমাপ্তি ইতিবাচকতায়। রঙধনুর রঙের ছটায় সুদর্শন পরীর মতো হানিফা জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে।

এই একটি গল্প সাঈদ চৌধুরীর গল্পমানসকে চিহ্নিত করার জন্য চাবিগল্পের কাজ করতে পারে। এখানে তার রূপদক্ষতা চিহ্নিত, প্রকৃতিকে বয়ানের যে মনোজ্ঞ রুচিবাগীশী, সাঈদে তা প্রতিফলিত। দৃশ্য- কী লন্ডনে, কী সিলেটে; গুচ্ছ গুচ্ছ আর্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। এই গল্পের কেন্দ্রে আছে পারিবারিক বন্ধন, শুভবোধ। যখন পরিবার ভাঙছে, মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, শিথিল হচ্ছে ভ্রাতৃবোধ। সাঈদ চৌধুরী তার গল্পে যুথবদ্ধ একটি পরিবারের পাটাতনে এই অবক্ষয় থেকে উদগতি কামনা করেছেন। যেভাবে অন্য এক গল্পে তিনি মারওয়ানের জবানে হাজির করেন বিয়ের যুক্তি ও প্রয়োজন, গল্পের নায়িকা সাবিহা যখন বিয়ের বিপক্ষে।  

কিন্তু এখানে কি স্পষ্ট কোনো প্রতিবাদ আছে? আছে, কিন্তু তা চিত্কৃত নয়, প্রচ্ছন্ন। গল্পকারের স্বার্থকতার জন্য এটি জরুরী। সাঈদ চৌধুরী যে কাব্যিক, এর সাক্ষ্য রয়েছে তার বাক্যে, স্থাপত্যে। কবির গদ্য বলে যে একটা কথা, তা বাংলা গল্পকথনে শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়েছে। সাঈদ সে ঐতিহ্যের ফসল। এই কাব্যগন্ধ ভাষার মধ্যে একটি তন্ময়তা নিশ্চিত করে, যা গল্পের লাবণ্যে আনে বিশেষ মাত্রা।

সাঈদ চৌধুরীর অন্যসব গল্পে নজর বুলাই। সৌভাগ্যের স্বর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে দেখা যায় প্রবাস, একটি পরিবার, সিলেট, সিলেটের টেকেরঘাট, প্রাকৃতিক সম্পদ, চুনাপাথর, কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকত, মাটির তলের রত্ন, একটি গ্রামে শীতের সকাল, আনাসের বাড়ী, ভরপুর গাছপালা, বর্ষা, ফুল-ফল, শাক-সবজি, এরই মাঝে বরকত-ফারিয়ার প্রেম। গল্পের আনাস সঙ্গদোষের অনুতাপে পুড়ে। ভাগ্যের উদার অনুগ্রহ তাকে দেয় উন্নত মানবিক জীবনের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা সবার মধ্যেই রয়েছে এবং সাঈদ চৌধুরী চান এর যথাবাস্তবায়ন।  

কিন্তু আরবান জীবনের দু:সহ অবক্ষয়ের পাশাপাশি চিরায়ত গ্রামীন সমাজও তো ডুবে আছে ঝগড়া, প্রতারণা, স্বার্থসংঘাত ইত্যাদিতে। মানবিকতা গল্পে এর চিত্র বাংলাদেশী লোকজীবনের এক ব্যথিত প্রেক্ষাপটের জানান দেয়। গ্রামে ঢুকে পড়া গাঁজা, দেশীয় অস্ত্র, দা, ছুরি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। সেগুলো প্রতারণার হাতিয়ার হচ্ছে। ক্ষমতার প্রশ্রয়ে নির্দোষকে বানানো হচ্ছে দোষী।

চলমান ও জ্বলন্ত সংকট সাঈদ চৌধুরীকে বিচলিত করেছে, তার গল্পে আছে দুর্ভিক্ষের ছায়া, করোনায় বাবা হারানো ফারহানার দু:খাকুল বাস্তবতায় অসুস্থ মা আর হাসপাতাল। বিপদের চোখরাঙানি তাকে ঘিরে ধরলেও সে শুভবাদী; মানুষের হয়ে কাজ করতে উদগ্রীব ও সচেষ্ট। সে বেদনা ও জটিলতাকে জয় করে মানবপ্রেম দিয়ে। এর মধ্যে নিয়ে আসে আনন্দের আস্বাদ।

জীবন যেখানে দু:খতরঙ্গের খেলা, সেখানে আশাকেই ফারহানা একমাত্র ভেলা মনে করে না। সে ইতিবাদী প্রচেষ্টা ও শুভেচ্ছাকে ভেলা বানায়। তৈরী হয় ‘শুভ্র সাদায় আচ্ছাদিত’ বাগানের এমন দৃশ্যপট, যেখানে অসুস্থ মা সুস্থ হয়ে উঠেন এক ভোরে, যেখানে অসুস্থতার ভেতর অলৌকিক ঝরণা আর পুষ্পিত সুন্দরতায় হাটতে দেখেন আপন স্বামীকে। সেই দেখাকে উচ্চরবে তিনি ব্যক্ত করেন। যেন জীবনের নিরাশার ভেতর কথা বলছে ঐশী বিশ্বাস!

সাঈদ চৌধুরীর অতিন্দ্রীয় বিশ্বাসের যে স্বচ্ছলতা, তার চিত্রায়ন এ গল্পে স্পষ্ট। যেভাবে স্পষ্ট মানবিক দায়শীলতার অনুভব। যেভাবে জিনের অস্তিত্ব প্রমাণে তিনি যুক্তির অবতারণা করেছেন ‘বাসকিউন্স ভুত’ আর ‘ভুতের অট্টহাসি’ গল্পে। উভয় গল্পে তৈরী হয় এক গা ছমছমে পরিস্থিতি। ভূতের গল্প বলতে বলতে দৌড় দেয় ইংল্যান্ডের জন। আর বাংলার একটি গ্রামে ভূতের বাস্তবতায় উচ্চারিত হয় আয়াতুল কুরসির তেলাওয়াত।   

সাঈদ চৌধুরীর এই গল্পজার্নি আমাদের জীবন যাপনের ভাঙ্গা টুকরোগুলোকে জড়ো করে করে অগ্রসর হয়। প্রকৃত অর্থে এই টুকরাগুলো সাঈদ চৌধুরীর জীবনেরই ছিন্নভিন্ন মুখ, ছিন্নভিন্ন কিন্তু সমন্বিত। সেই সমন্বয় থেকে জন্ম নেয় তার গল্প, চরিত্র। ফলে সাঈদ চৌধুরীর আত্মপ্রকাশের প্রথম লগ্নে তার উপন্যাসের আহমদ চরিত্রকে ঠিক জায়গায় সনাক্ত করেছিলেন কবি-কথাকার আল মাহমুদ। লিখেছিলেন ছায়াপ্রিয়া  উপন্যাসের নায়ক ‘আহমদ’ চরিত্রটির আড়ালে আমি যেন সাঈদ চৌধুরীর মুখটিই দেখতে পেয়েছি। কাল্পনিক এ চরিত্রটি যেন আদর্শ হয়ে ধরা দিয়েছে, পাঠকের চেতনে। আর আহমদের ভাললাগার মানুষটির মাঝে নিজের প্রিয়তমার প্রতিচ্ছবি কেউ দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।‘

সাঈদ চৌধুরীর সেই উপন্যাসের ৪টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিলো বলে আল মাহমুদ নিজের আশ্বস্তি জ্ঞাপন করেন। স্বার্থক একটি সৃষ্টির বৈশিষ্ট বোধ হয় এমনই হয়। তার উদ্দেশ্যে আল মাহমুদ বলেছিলেন, পেশাগত শত ব্যস্ততার ভেতরে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে। তখন তাকে যথাযথ মূল্যায়ণ করতে সুবিধা হবে বৈকি।

এই যে শত ব্যবস্থতার কথা বললেন আল মাহমুদ, তা সাঈদ চৌধুরীর জীবনের প্রধান এক দিক। ব্রিটেন প্রবাসী এই লেখক ও এক্টিভিস্ট পেশাগতভাবে ব্যবসায়ী, এয়ারলাইন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন, বিমান কোম্পানির ছিলেন একজন ডাইরেক্টর। ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ’ এর প্রতিষ্ঠায় ছিলেন যুক্ত, সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা। করেছেন রিসোর্ট ব্যবসা। আবার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল মাহমুদ ফাউন্ডেশনের, নেতৃত্বে আছেন সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্ট সহ বহু সংগঠনের।

 ইতোমধ্যে লিখেছেন নানা গ্রন্থ। উপন্যাস ছায়াপ্রিয়া, প্রবন্ধ গ্রন্থ সুনিকেত, সাক্ষাৎকার কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা আল মাহমুদ, কবিতাগ্রন্থ আত্মার অলিন্দে, আরব জাহান নিয়ে স্মৃতিময় লেখা ধুসর মরু বুকে, বিলেত নিয়ে লেখা লন্ডনে যাপিত জীবন, সাহিত্য আলোচনা সমকালীন সাহিত্য ভুবন ইত্যাদি।

সাঈদ চৌধুরীর কলাম, প্রতিবেদন, ফিচার ও সাহিত্য আলোচনাও দৃষ্টিতে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে এক ধরণের সাংবাদিকসূলভ বর্ণনা ও মনস্বীতা। তার এ চরিত্রের রচনায় রয়েছে এক ধরণের স্বাদু ব্যাপার। কয়েকটি রচনা শিরোনামের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। (লিংক সংযুক্ত)

এভাবে লেখালেখি ও টেলিভিশন আলোচনায়ও তার চারুউচ্চারণ শোনা যায়। সাংগঠনিকতায় নিজেকে রেখেছেন সক্রিয়। এতো সব মাত্রার মধ্য দিয়ে সাঈদ চৌধুরী সচল থাকছেন। নিজের ও নিজের দেখা জীবনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে প্রতিবেদনদেহ সাজানোর কাজ করছেন। যেন হৃদয়গ্রাহী সুন্দরের হাসির পাশে তার রক্তাক্ত শরীর ও রোদনের ধ্বনি আমাদের দৃষ্টি ও কান না এড়ায়। এরই মধ্যে লড়াই করে অগ্রগতি নিশ্চিত করাই তো মানবপ্রগতির ইতিহাস।

একটা সময়ে পৃথিবীটা মানুষের কাছে আতঙ্কই ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশ, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার আর দুর্গমতার কারণে। মানুষের কাছে একটা গোষ্ঠীর বিচরণ ভূমিই সমগ্র পৃথিবী বলে পরিগণিত হয়েছে। মানুষ একে একে পৃথিবীটাকে জয় করতে পেরেছে তার উদ্যম অদম্য স্পৃহা আর সীমাহীন দৃঢ় মনোবলের কারণে। মানুষ বদলাতে পেরেছে প্রকৃতির খেয়াল, আয়ত্তে আনতে পেরেছে বৈরী পরিবেশের, জন্তু-জানোয়ার অধীন হয়েছে মানুষের আর দুর্গম আর দুর্গম নেই, মানুষের পদচারণায় মুখর হয়েছে অজানা-অচেনা পৃথিবী। এখন প্রকৃতি কেবল প্রকৃতি নয়, মানবিক প্রকৃতি।

এই যে জয়, সেখানেও আছে প্রখর শুন্যতা। কারণ প্রকৃতি জয়ে মানুষ অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষ কি জয় করতে পেরেছে নিজেকে? মানুষকে? নিজের মধ্যকার পিশাচকে জয় করতে পারেনি বলেই তাদের লোভের থাবা ও হিংস্রতা শুধু প্রকৃতিকে বিপন্ন করছে না, মানুষের ভবিষ্যতকেও হুমকিগ্রস্থ করছে। ফলে মানুষের ভেতরের অমানুষের সাথে যে লড়াই, সেটা অতীতে যেমন গুরুতর বিষয় ছিলো, আজকে আরো বেশি। এ লড়াই জারি থেকেছে সেই কাল থেকে এই কালে এবং আগামী সব দিনে-রাতে। নানা তত্ত্ব, নানা চেষ্টা, নানা সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকবার পরিসরকে বড় করার লড়াই জারি রাখে। সেই লড়াইয়ে একজন কবি, একজন গাল্পিক, একজন শব্দশিল্পী মনের ও হৃদয়ের আলোকমালাকে ব্রক্ষাস্ত্র বানিয়ে লড়েন। চিরায়ত সুন্দরের অন্বেষা তাদের করে তৃপ্তিহীন। সেই লড়াই ও অতৃপ্ত যাত্রা তাদেরকে বহুমুখি সৃষ্টিশীলতায় সক্রিয় রাখে।

সাঈদ চৌধুরীও আপন সৃজনক্ষেত্রে নানা মাত্রিক। কবিতা হচ্ছে তার আত্মপ্রকাশের অন্যতম এক প্রকরণ। কবিতায় সাঈদ চৌধুরী সরল, সাবলীল। একদম ঠোঁটের ভাষায় রচিত তার কবিতা। প্রকরণের প্রতি মনোযোগের চেয়ে বিষয় ও বক্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা এক ধরণের কবিতায় প্রকাশ পায়। সেগুলো মূলত বক্তব্যপ্রধান কাব্য। এমন কাব্যে সাঈদ প্রগলভ। 

সাঈদ চৌধুরীর গল্পে  মজলিসি মেজাজ রয়েছে, কবিতায়ও প্রাধান্য পেয়েছে কথকতা। এরই মধ্যে ভেসে উঠে  একটি ভাবনাবিহবল, স্বাপ্নিক চৈতন্যের মুখ। প্রকৃতি ও জীবনভাবনায় যার অঙ্গীকার। স্মৃতিকাতরতা ও নষ্টালজিয়া সেখানে উচ্চকিত :

নিসর্গের সবুজ শ্যামলিমায়/ মাইজগাঁও থেকে সারকারখানা/ সমান্তরালে ছুটে চলে গাড়ি ও ট্রেন/ ফেঞ্চুগঞ্জ কলেজ মোড়ে আইসক্রিম/ লেহন করে তৃষনার্ত যুবতি/ দ্যুতিময় হাতে কৌণ আইসক্রিম/ স্পন্দিত নদীর মতো ঝরায় বসন্ত/ গলতে থাকে রৌদ্র জ্যোৎস্নায়। 

সাঈদ চৌধুরী বিশ্বাসে সমর্পিত, ঈমানে উদ্দীপ্ত তার উচ্চারণ। তার কবিতায় আমরা শুনি   জীবনমুখিতার মধ্যেও ভাববাদী উচ্চারণ এবং বস্তসর্বস্ব দুনিয়ার করুণ চিত্র :

১.  নিরবে সন্ধ্যা ছড়িয়ে পড়ে/ দিগন্তের ঐ ধূসর আলোয়/ ঝলমলে গোধুলী বেলায়।/ সান্ধ্যরাতের কফির কাপে/ হারিয়ে যাওয়া মুখগুলি সব/ ভেসে ওঠে আলো-ছায়ায়।/ অবাক করা এক গুঞ্জনধ্বনি/ চুলগুলো সব পাতলা হচ্ছে/ কে যেন আজ জানতে চায়।

২. অনুভূতিশূন্য আবেশ ছিল মনুষ্য হৃদয়ে/ মুক্তকেশে ঝড়ের মেঘের কোলে/ এখন বিপর্যয়ের বাতাস বইছে/ দুর্ভাবনায় ভুগছে মহাবিশ্ব/ প্রযুক্তির অর্থহীন দৃশ্যে/ খোলা চোখে ঘুমাচ্ছে/ ডুবে যাওয়া মুখ।

৩. দিন চলেছে আশায় আশায়/ রাত জাগে নির্ঘুম দুর্ভাবনায়/ এই প্রীতি অবেলার অভিলাষ/ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সময় করছ বিনাশ।/ অতিক্রান্ত জীবন ক্লান্ত অধীর/ তুমি কি তবে অন্ধ এবং বধির?/ বৈশাখী মেঘেরা ঘিরেছে আকাশ/ হচ্ছে কেবল হৃদপিন্ডের সর্বনাশ। 

সাঈদ চৌধুরীর একটি কবিতার নাম অপার্থিব, অলীক-অসার। এতে তিনি  লিখেছেন, নীলাভ আকাশ জুড়ে জালালী কেইতর উড়ে/ রোদেলা বিকেলে ঝিলমিল সোনালি আভায়/ ভালোবাসা পেয়েছি আমি বিত্ত নয় চিত্তে/ দিনের  সূর্যালোকে আর রাতের পূর্ণিমায়।  

এই পঙক্তিমালায় সাঈদ চৌধুরী সম্ভবত নিজেকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তার জীবনবোধের  আকাশটা প্রসারিত এবং নীল। সেখানে বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তৈরী করে সোনালি আভা। যার মধ্যে ডানা মেলেছে জালালি কইতর!  

লেখক: কবি, গবেষক প্রাবন্ধিক

;