জন মিল্টন, অন্ধত্ব যাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি

আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
বিশ্বসাহিত্য থেকে মিল্টনের প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না

বিশ্বসাহিত্য থেকে মিল্টনের প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না

  • Font increase
  • Font Decrease

সপ্তদশ শতক। রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় টানাপোড়েন চলছে গোটা ইউরোপ জুড়ে। ঠিক সেই সময়েই আগমন ঘটল এক নতুন সুরের। জন মিল্টন—বিশ্বসাহিত্যের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাকবি। বলা হয়, শুধুমাত্র প্যারাডাইজ লস্ট যতটা প্রভাব ফেলেছে তার পরবর্তী পাশ্চাত্য সাহিত্যকর্মে; হোমারের ইলিয়াড এবং অডিসি ছাড়া আর কোনো লেখাই ততটা ফেলতে পারেনি।

১৬০৮ সালের ৯ ডিসেম্বর। লন্ডনের প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জন মিল্টন। বলে রাখা ভালো, তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ক্যাথোলিক। পিতা মিল্টন সিনিয়র প্রথম ক্যাথোলিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদে দীক্ষিত হন। শিশু মিল্টন শিক্ষালাভ করেন টমাস ইয়ং নামের জনৈক প্রেসবিটেরিয়ান মতাবলম্বীর কাছে থেকে। খুব সম্ভবত এই শিক্ষকের প্রভাবই পরবর্তীকালে তার যুগান্তকারী ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহযোগিতা করে।

হাতেখড়ি শেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। ধ্রুপদী ল্যাটিন এবং গ্রিক ভাষায় অর্জন করেন দক্ষতা। পড়াশোনা করেন ক্যামব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে। পড়াশোনার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করলেও টিউটর বিশপ উইলিয়াম চ্যাপেলের সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল না।

১৬২৯ সালে মেধা তালিকায় চতুর্থ অবস্থান নিয়ে গ্রাজুয়েশন সমাপ্তি করেন মিল্টন। চেয়েছিলেন এংলিকান চার্চে যাজক হিসাবে যোগ দিতে। অনেকটা সে কারণেই মাস্টার্সের ডিগ্রি নেবার আগ পর্যন্ত থেকে গেলেন ক্যামব্রিজেই। সত্যি বলতে ল্যাটিন নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং পড়াশোনার পরিবেশ মিল্টনের মনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিতে দেয়নি। উপরন্তু ঘৃণা করতেন মারাত্মকভাবে। তবে দুয়েকজন বন্ধু যে জোটেনি, তা না। এরই মধ্যে লেখালেখিতে হাত পাকাতে থাকলেন। প্রথম প্রকাশিত লেখা ‘এপিটাফ’ নামে ছোট্ট একটা কবিতা। লেখা হয়েছিল শেক্সপিয়ারকে প্রশংসা করে।

মিল্টন বুঝতে পেরেছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয় তার ক্ষুধা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। তাই মাস্টার্স শেষ করার পর টানা ছয় বছর নিজের মতো করে পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকলেন। আধুনিক ও প্রাচীন লেখাগুলোর পাশাপাশি সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ভাষাবিজ্ঞান, অলঙ্কারশাস্ত্র, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করলেন। মূলত এই সময়ে তিনি কবিতার দিকে ক্রমশ ঝুঁকে পড়েন।

পরিবারে মেয়েদের সাথে মিল্টন


 

১৬৩৮ সালের মে মাস। মিল্টন ইউরোপে ভ্রমণে বের হলেন। ফ্রান্সের প্যারিস হয়ে পৌঁছালেন ইতালিতে। জুলাইতে তিনি ফ্লোরেন্সে গিয়ে উঠলেন; সেখানকার বুদ্ধিজীবী আর জ্ঞানীরা বেশ শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন তাকে। একমাস পরে চলে গেলেন রোমে। সিসিলি আর গ্রিসেও যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু ১৬৩৯ সালের গ্রীষ্মে বন্ধুর মৃত্যুর কারণে লন্ডন ফিরে আসতে হলো।

লন্ডনে তখন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত চলছে। তা মিল্টনকেও প্রভাবিত করল এক পর্যায়ে। ধর্ম আর শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনার স্বার্থে কলম তুলে নিলেন হাতে। ১৬৪২ সালে ১৬ বছর বয়সের বালিকা ম্যারি পাওয়েলকে বিয়ে করে নিজেকে স্থির করতে চাইলেন। কিন্তু অসম এই বিয়ে খুব একটা সুখী হতে দেয়নি তাকে। ম্যারি তিন বছরের জন্য চলে যায় তাকে ছেড়ে। পরে ফিরে আসলেও টানাপোড়েনের সমাধান হয়নি। তাদের ঘরে চারটি সন্তানের জন্ম হয়। ছেলেটি শৈশবে মারা যায়। বাকি তিন মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে চোখের সামনেই।

মিল্টন লেখালেখি করতেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে


 

ইংল্যান্ডে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। মিল্টন তার লেখনীশক্তিকে কাজে লাগান সেই সুযোগ পেয়ে। তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রপন্থী। সরকারের পক্ষ থেকে ডেকে নেওয়া হয় পররাষ্ট্র বিভাগে, বিশেষ করে ল্যাটিনের কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে। ১৬৫২ সালে ইংল্যান্ডের মানুষের পক্ষ নিয়ে ল্যাটিনে লিখলেন Defensio pro Populo Anglicano গ্রন্থ। দুই বছর পরে লিখলেন অলিভার ক্রমওয়েলের সমর্থনে। যদিও তিনি ১৬৪৫ সালেই তার কবিতার সংকলন প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। তথাপি তার কবি পরিচিতিটা এই সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং লেখালেখির মধ্যে।

ঠিক এই বছরেই মিল্টন বলতে গেলে অন্ধই হয়ে পড়লেন। তারপরেও গদ্য আর পদ্য আকারে বের হতে থাকল তার অনুভূতি। লেখার কাজে সাহায্য করার জন্য রাখা হয়েছিল লোক। সবচেয়ে বিখ্যাত সনেট—“When I Consider How My Life Is Spent,” লেখা হয়েছে এই সময়েই। ১৬৫৬ সালে ক্যাথরিন উডকুক নাম্নী এক রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বছর দুই পরে সন্তান প্রসবকালে তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। মারা যায় সেই শিশু কন্যা সন্তানটিও।

অন্ধত্ব তাকে ঠেকাতে পারেনি


 

১৬৫৮ সাল। অলিভার ক্রমওয়েল মৃত্যুবরণ করলে ইংল্যান্ডের প্রজাতন্ত্র আবার হুমকির মুখে পড়ে। মিল্টন তার পূর্বতন আদর্শ মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের পক্ষেই কথা বলে যাচ্ছিলেন; যদিও তা ফলপ্রসূ হয়নি। আবার প্রতিষ্ঠিত হলো রাজতন্ত্র। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর মিল্টন বাধ্য হলেন গোপনে চলে যেতে। তার বিরুদ্ধে তখন গ্রেফতারের পরোয়ানা আর সেই সাথে লেখাগুলোকে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ। অবশ্য খুব শীঘ্রই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে আর তাকে জেলের ভয়ে পালাতে হয়নি। আরো একবার বিয়ে করলেন ২৪ বছরের নারী এলিজাবেথকে। শোনা যায়, এলিজাবেথ ছিল তারই মেয়ের বন্ধু।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রবন্ধ আর পদ্য লেখাতে মনোযোগ দেন। দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনা এবার তার কলমের নিবে পরিণত অবস্থায় বের হতে শুরু করে। ১৬৬৪ সালে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’। স্বর্গ থেকে মানুষের পতনকে তুলে ধরলেন এক অনন্য ভাষা ও চিন্তার মিশেলে। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের মাস্টারপিস হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় মহাকাব্যটি। লুসিফারের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপনের জন্য উন্মোচিত হয় তার খ্রিস্ট্রীয় বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা। হন নিন্দিত ও নন্দিত। সেই সূত্র ধরেই লিখেন ‘প্যারাডাইজ রিগেইনড’।

প্যারাডাইস্ট লস্ট-এ প্রতিফলিত হয়েছে তার ধর্ম-দর্শন আর শিল্পবোধ 


 

১৬৭৪ সালের ৮ নভেম্বর কিডনি সমস্যায় মৃত্যুবরণ করেন মিল্টন। কিন্তু তার চিন্তাধারা ইংরেজি কবিতাকে দেখিয়েছে নতুন পথ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তার লেখা অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছে কবিদের কল্পনায়। তাকে আসন দেওয়া হয়েছে শেক্সপিয়ারের পাশেই। আধুনিক বিশ্বের যে প্রান্তেই প্রথা ভাঙার আন্দোলন ওঠে; সেখানেই নিজের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হাজির হয় মিল্টন আর তার সাহিত্যকর্ম।

আপনার মতামত লিখুন :