স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

জন মিল্টন, অন্ধত্ব যাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি



আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
বিশ্বসাহিত্য থেকে মিল্টনের প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না

বিশ্বসাহিত্য থেকে মিল্টনের প্রাসঙ্গিকতা কখনো ফুরাবে না

  • Font increase
  • Font Decrease

সপ্তদশ শতক। রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় টানাপোড়েন চলছে গোটা ইউরোপ জুড়ে। ঠিক সেই সময়েই আগমন ঘটল এক নতুন সুরের। জন মিল্টন—বিশ্বসাহিত্যের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাকবি। বলা হয়, শুধুমাত্র প্যারাডাইজ লস্ট যতটা প্রভাব ফেলেছে তার পরবর্তী পাশ্চাত্য সাহিত্যকর্মে; হোমারের ইলিয়াড এবং অডিসি ছাড়া আর কোনো লেখাই ততটা ফেলতে পারেনি।

১৬০৮ সালের ৯ ডিসেম্বর। লন্ডনের প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জন মিল্টন। বলে রাখা ভালো, তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ক্যাথোলিক। পিতা মিল্টন সিনিয়র প্রথম ক্যাথোলিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদে দীক্ষিত হন। শিশু মিল্টন শিক্ষালাভ করেন টমাস ইয়ং নামের জনৈক প্রেসবিটেরিয়ান মতাবলম্বীর কাছে থেকে। খুব সম্ভবত এই শিক্ষকের প্রভাবই পরবর্তীকালে তার যুগান্তকারী ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহযোগিতা করে।

হাতেখড়ি শেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। ধ্রুপদী ল্যাটিন এবং গ্রিক ভাষায় অর্জন করেন দক্ষতা। পড়াশোনা করেন ক্যামব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে। পড়াশোনার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করলেও টিউটর বিশপ উইলিয়াম চ্যাপেলের সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল না।

১৬২৯ সালে মেধা তালিকায় চতুর্থ অবস্থান নিয়ে গ্রাজুয়েশন সমাপ্তি করেন মিল্টন। চেয়েছিলেন এংলিকান চার্চে যাজক হিসাবে যোগ দিতে। অনেকটা সে কারণেই মাস্টার্সের ডিগ্রি নেবার আগ পর্যন্ত থেকে গেলেন ক্যামব্রিজেই। সত্যি বলতে ল্যাটিন নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং পড়াশোনার পরিবেশ মিল্টনের মনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিতে দেয়নি। উপরন্তু ঘৃণা করতেন মারাত্মকভাবে। তবে দুয়েকজন বন্ধু যে জোটেনি, তা না। এরই মধ্যে লেখালেখিতে হাত পাকাতে থাকলেন। প্রথম প্রকাশিত লেখা ‘এপিটাফ’ নামে ছোট্ট একটা কবিতা। লেখা হয়েছিল শেক্সপিয়ারকে প্রশংসা করে।

মিল্টন বুঝতে পেরেছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয় তার ক্ষুধা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। তাই মাস্টার্স শেষ করার পর টানা ছয় বছর নিজের মতো করে পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকলেন। আধুনিক ও প্রাচীন লেখাগুলোর পাশাপাশি সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ভাষাবিজ্ঞান, অলঙ্কারশাস্ত্র, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন করলেন। মূলত এই সময়ে তিনি কবিতার দিকে ক্রমশ ঝুঁকে পড়েন।

পরিবারে মেয়েদের সাথে মিল্টন


 

১৬৩৮ সালের মে মাস। মিল্টন ইউরোপে ভ্রমণে বের হলেন। ফ্রান্সের প্যারিস হয়ে পৌঁছালেন ইতালিতে। জুলাইতে তিনি ফ্লোরেন্সে গিয়ে উঠলেন; সেখানকার বুদ্ধিজীবী আর জ্ঞানীরা বেশ শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন তাকে। একমাস পরে চলে গেলেন রোমে। সিসিলি আর গ্রিসেও যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু ১৬৩৯ সালের গ্রীষ্মে বন্ধুর মৃত্যুর কারণে লন্ডন ফিরে আসতে হলো।

লন্ডনে তখন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত চলছে। তা মিল্টনকেও প্রভাবিত করল এক পর্যায়ে। ধর্ম আর শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনার স্বার্থে কলম তুলে নিলেন হাতে। ১৬৪২ সালে ১৬ বছর বয়সের বালিকা ম্যারি পাওয়েলকে বিয়ে করে নিজেকে স্থির করতে চাইলেন। কিন্তু অসম এই বিয়ে খুব একটা সুখী হতে দেয়নি তাকে। ম্যারি তিন বছরের জন্য চলে যায় তাকে ছেড়ে। পরে ফিরে আসলেও টানাপোড়েনের সমাধান হয়নি। তাদের ঘরে চারটি সন্তানের জন্ম হয়। ছেলেটি শৈশবে মারা যায়। বাকি তিন মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে চোখের সামনেই।

মিল্টন লেখালেখি করতেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে


 

ইংল্যান্ডে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে। মিল্টন তার লেখনীশক্তিকে কাজে লাগান সেই সুযোগ পেয়ে। তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রপন্থী। সরকারের পক্ষ থেকে ডেকে নেওয়া হয় পররাষ্ট্র বিভাগে, বিশেষ করে ল্যাটিনের কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে। ১৬৫২ সালে ইংল্যান্ডের মানুষের পক্ষ নিয়ে ল্যাটিনে লিখলেন Defensio pro Populo Anglicano গ্রন্থ। দুই বছর পরে লিখলেন অলিভার ক্রমওয়েলের সমর্থনে। যদিও তিনি ১৬৪৫ সালেই তার কবিতার সংকলন প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। তথাপি তার কবি পরিচিতিটা এই সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং লেখালেখির মধ্যে।

ঠিক এই বছরেই মিল্টন বলতে গেলে অন্ধই হয়ে পড়লেন। তারপরেও গদ্য আর পদ্য আকারে বের হতে থাকল তার অনুভূতি। লেখার কাজে সাহায্য করার জন্য রাখা হয়েছিল লোক। সবচেয়ে বিখ্যাত সনেট—“When I Consider How My Life Is Spent,” লেখা হয়েছে এই সময়েই। ১৬৫৬ সালে ক্যাথরিন উডকুক নাম্নী এক রমণীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বছর দুই পরে সন্তান প্রসবকালে তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। মারা যায় সেই শিশু কন্যা সন্তানটিও।

অন্ধত্ব তাকে ঠেকাতে পারেনি


 

১৬৫৮ সাল। অলিভার ক্রমওয়েল মৃত্যুবরণ করলে ইংল্যান্ডের প্রজাতন্ত্র আবার হুমকির মুখে পড়ে। মিল্টন তার পূর্বতন আদর্শ মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের পক্ষেই কথা বলে যাচ্ছিলেন; যদিও তা ফলপ্রসূ হয়নি। আবার প্রতিষ্ঠিত হলো রাজতন্ত্র। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর মিল্টন বাধ্য হলেন গোপনে চলে যেতে। তার বিরুদ্ধে তখন গ্রেফতারের পরোয়ানা আর সেই সাথে লেখাগুলোকে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ। অবশ্য খুব শীঘ্রই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে আর তাকে জেলের ভয়ে পালাতে হয়নি। আরো একবার বিয়ে করলেন ২৪ বছরের নারী এলিজাবেথকে। শোনা যায়, এলিজাবেথ ছিল তারই মেয়ের বন্ধু।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রবন্ধ আর পদ্য লেখাতে মনোযোগ দেন। দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনা এবার তার কলমের নিবে পরিণত অবস্থায় বের হতে শুরু করে। ১৬৬৪ সালে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’। স্বর্গ থেকে মানুষের পতনকে তুলে ধরলেন এক অনন্য ভাষা ও চিন্তার মিশেলে। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের মাস্টারপিস হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় মহাকাব্যটি। লুসিফারের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপনের জন্য উন্মোচিত হয় তার খ্রিস্ট্রীয় বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা। হন নিন্দিত ও নন্দিত। সেই সূত্র ধরেই লিখেন ‘প্যারাডাইজ রিগেইনড’।

প্যারাডাইস্ট লস্ট-এ প্রতিফলিত হয়েছে তার ধর্ম-দর্শন আর শিল্পবোধ 


 

১৬৭৪ সালের ৮ নভেম্বর কিডনি সমস্যায় মৃত্যুবরণ করেন মিল্টন। কিন্তু তার চিন্তাধারা ইংরেজি কবিতাকে দেখিয়েছে নতুন পথ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তার লেখা অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছে কবিদের কল্পনায়। তাকে আসন দেওয়া হয়েছে শেক্সপিয়ারের পাশেই। আধুনিক বিশ্বের যে প্রান্তেই প্রথা ভাঙার আন্দোলন ওঠে; সেখানেই নিজের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হাজির হয় মিল্টন আর তার সাহিত্যকর্ম।

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'

সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'

  • Font increase
  • Font Decrease

[গ্রন্থালোচনা: সরদার ফজলুল করিম (২০০৯), ‘আমি মানুষ’, ঢাকা: কথাপ্রকাশ।]

সরদার ফজুলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) আমার প্রিয় মানুষদের একজন। হৃদয়ের গভীরতম স্থানেই তাঁর আসন। কেন তাঁকে এতবেশি ভালোবাসি তাঁর সংক্ষিপ্ত কোন জবাব নেই। আসলে ভালোবাসার কারণ প্রকাশ দুঃসাধ্য।

বৈচিত্রময় জীবনের অধিকারী সরদার ফজুলল করিম একজন মানবতাবাদী দার্শনিক। তাঁর দর্শনের প্রধান উৎস ‘মানুষ’। জ্ঞান-কারবারী এ-মানুষটি আজীবন মানুষকে কেন্দ্রবিন্দু করেই জ্ঞানের কণা কুড়িয়েছেন আর বিলিয়েছেন। যতদিন এ ধরাভূমে ছিলেন ততদিন তিনি এ কাজ করেছেন। জীবনে যা কিছু ভেবেছেন, যা কিছু করেছেন তার সবই মানুষের জন্য। আজ তিনি নেই কিন্তু তাঁর রচনাবলি তাঁর পক্ষে এমনই সাক্ষ্য দেয়।

মানুষের রহস্যাবৃত জগতে তিনি মানুষকেই তালাশ করেছেন বিচিত্র উপায়ে। তাঁর স্পষ্টবাদিতা তো এমনই বলে। তাই মানুষের ভালো-মন্দ সব কিছুই তাঁকে ভাবিয়েছে। ইট-পাথুরের গাঁথুনির চেয়ে হৃদয়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

মানুষই পাপ-পূণ্যের উৎসস্থল। মানুষই অপরাধী, মানুষই বিচারক, মানুষই পূণ্যবান আবার মানুষই পাপী। মানুষই দাতা আবার মানুষই ডাকাত। মানুষের জন্যই স্বর্গ আবার মানুষের জন্যই নরক। এভাবে বহু কথার অবতারণা করা যায়।  তবে সার-নির্যাসে এটুকু বলা যায় যে, ধরণীর সমস্ত কিছুই মানুষের জন্য মানুষ করেছে। মানুষই সৃষ্টি করে মানুষই ধ্বংস করে।  সত্যিই ‘মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি’।

মানুষেই আস্থা রাখে মানুষ। মানুষেই আস্থা হারায় মানুষ। তাই তো গীত হয়, ‘...আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ/ তোমাদের কাছে এসে দু হাত পেতেছি’। ‘মানুষ, মানুষের জন্যে জীবন জীবনের জন্যে...’। মানুষই আবার মানুষের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দেয় মানুষকে মারার জন্য। মানুষই আবার বানরের হাতে লাঠি তুলে দেয় মানুষকে আঘাতের জন্য।

সরদার ফজুলুল করিম তাঁর ৮৯ বছরের জীবনে পড়িয়েছেন ও  লিখেছেন। ভাষান্তর করেছেন। শক্ত কঠিন অন্যের রচনাকে মোলায়েম করে মাতৃভাষায় ভাষান্তর করেছেন। দূর গ্রিক দার্শনিকদের রচনাকে নিজভূমে সহজলভ্য ও প্রিয় করে তুলেছেন। কালজয়ী ত্রিপুরুষ- সক্রেটিস (খ্রি. পূ. ৪৭০-৩৯৯), প্লেটো (খ্রি. পূ. ৪২৮-৩৪৮) ও অ্যারিস্টটলকে (খ্রি. পূ. ৩৮৪-৩২২) এদেশের জ্ঞানপীঠে নাগরিকত্ব দিয়েছেন।  সরদার ফজলুল করিম  তাঁর কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। আমরা কী করেছি তাঁর জন্যে?

ফিরে আসি মূল কথায়। তাঁর অসংখ্য রচনা থেকে ক্ষুদ্র পরিসরের ‘আমি মানুষ’ বইটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার তাগিদ অনুভব থেকেই এ লেখা।

মানুষ কী? মানবকুলে জন্ম নিলেই কী মানুষ হওয়া যায়? তাহলে মানুষ হতে হলে কী লাগে? মনুষ্যাকৃতি থাকলেই কী মানুষ হয়? তাহলে মানুষের আকৃতি কী রকম? ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রশ্নমালা দীর্ঘতর করা যায়।

দুনিয়ায় চিরকালীন নামজারি-করা অনেকেই এসব প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন। মতামতও দিয়েছেন। আবার ভবিয়েছেন, ভাবাচ্ছেনও। এ কালের কুশীলব হিসেবে তিনিও তালাশ করেছেন এসব প্রশ্নের উত্তর।

‘ আমি মানুষ’ বইটি উৎসর্গ করেছেন ‘মানুষ’কে। ২০টি নাতিদীর্ঘ রচনা নিয়ে পুরো বইটি ৮০ পৃষ্ঠার। বইটির প্রথম রচনাও ‘আমি মানুষ’। ২০০৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এটি প্রকাশিত হয়।

আলোচ্য বইটির রচনাগুলো ২০০১-২০০৪ এবং ২০০৮ সালে লিখিত। এর মধ্যে ২০০৩ সালে লিখিত হয়েছে ৭টি, ২০০৪ সালে ১০টি এবং ২০০১, ২০০২ ও ২০০৮ সালে ১টি করে রচনা লিখিত হয়েছে।

ক্ষুদ্রাকৃতির এ বইতে তিনি বেশ কিছু ভারী ও ওজনদার কথার অবতারণা করেছেন। আমাকে কথাগুলো বেশ ভাবাচ্ছে। তাই লেখনীর খরাকালেও কাগজ-কলম নিয়ে বসেছি।

বাংলাদেশ ও ভারতে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার বুদ্ধিজীবী প্রদত্ত নাম ‘সাম্প্রদায়িকতা’। কারা এসব কুকর্মে জড়িত থাকে রাষ্ট্র সব জানে। কিন্তু রাষ্ট্র চুপ থাকে আর তখন একদল আরেক দলকে দোষারোপ করে। তখন শুরু করে ‘দোষারোপের রাজনীতি’। পৃথিবী এখন বড় ব্যস্ত। কে কাঁদে কার জন্যে? কিন্তু পোঁড়া ঘা দেখে মানুষ অতীতকে মনে করে নিজেই কেঁদে উঠে। এসব ঘটনা যখন মুষড়ে উঠে তখন সরদার ফজুলুল করিম বুকে ব্যথা অনুভব করে বলে আমাদের জানিয়েছেন।

‘...মানুষ মানুষকে পণ্য করে/ মানুষ মানুষকে জীবিকা করে...’ মানুষকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সব শিল্প-কারখানা, বিধাতার স্বর্গ-নরক, রাষ্ট্রের কয়েদখানা, সুগন্ধি কারখানা, শরাব কারখানা। ধর্মশালায় প্রত্যেকে মানব-মানবীর স্বতন্ত্র পরিচয়- কেউ মুসলিম, কেউ ইহুদি, কেউ খ্রিস্টান, কেউ হিন্দু, কেউ শিখ, কেউ জৈন। আবার কেউ যদি এসব নিয়ে মাথা না ঘামালে সবাই মিলে তাকে ডাকে ‘নাস্তিক’।

বইটির নাম কেন যে তিনি ‘আমি মানুষ’ রেখেছেন তার একটি ফিরিস্তি দিয়েছেন। একদিন বাজার করতে গিয়ে  দোকানী একটি মেয়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েই তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি মানুষ’। পরক্ষণেই  দোকানীর কন্ঠে শুনতে পান ‘...উনি মানুষ’(পৃ.১২)।

বইটিতে তাঁর প্রিয়জনদের লেখালেখি এবং তাঁদের চিন্তাধারা এবং তাঁর প্রতি তাঁদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশও রয়েছে। ৮৯ বছর বেঁচেও তাঁর মধ্যে আফসোসের শেষ ছিল না। তারাশঙ্করের নিতাইচরণের কন্ঠে বলেছেন, ‘জীবন ছোটো ক্যানে?’(পৃ.১৪)।

মায়া মানুষের সহজাত। প্রাচীন গ্রিক দর্শন ও দার্শনিকদের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। আড়াই হাজার বয়সী বুড়ো সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের সাথেই ছিল তাঁর আলাপচারিতা, জ্ঞান-কারবার ও দহরম-মহরম। অন্তিম মুহূর্তেও উতলে উঠেছে অ্যারিস্টটলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। এ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’-এর গায়ের ধুলো আমার গায়ের জামা দিয়েই মুছলাম। পরিষ্কার করলাম।...আমি এর এক অন্ধভক্ত। আমি জানি এর যে কোন পাতাটিই স্বর্ণ কেন, হীরক খণ্ড' (পৃ. ১৭)।

আমৃত্যু জ্ঞানসাধক সরদার ফজুলুল করিম নিজেকে ‘বই-এর বলদ’ (পৃ. ২২) বলে পরিচয় দিতেন। বইয়ের সাথেই তাঁর হৃদ্যতা, বইয়ের সাথেই তাঁর সারা জীবনের কথোপকথন। বই কী? এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বই অবশ্যই লিখিত এবং মুদ্রিত, মানুষের এক মহৎ আবিষ্কার। ...যে বই পাঠ করা হয় না, সে বই, বই নয়। একটা হালকা বস্তু বটে। কেবল তাই নয়, যে বই পঠিত হয়, কিন্তু তার বিষয়বস্তু আলোচিত হয় না, তার বক্তব্য অনুসৃত হয় না, সে বইও বই নয়। বস্তু মাত্র’ (পৃ. ২২)।

বিজ্ঞান একই সাথে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। বিজ্ঞানের অভিশাপ পর্যালোচনা করে তাঁর নিজের ভেতর হাহাকার উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘রোবট বানান, ক্ষতি নেই। কিন্তু আগে মানুষ বানান’ (পৃ. ২২)। মানুষ বিশ্বকে সৃষ্টি করেনি, কিন্তু বিশ্বকে ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে। তাই বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর দুঃশ্চিন্তা।

বাংলাদেশের রাজনীতির দুরারোগ্য একটি ব্যাধির সরকারি নাম হচ্ছে ‘হরতাল’। যে তালে হরহামেশা জানমালের ক্ষতি হয় আদতে তা-ই হরতাল। জীবনে বেতালের সৃষ্টি করে বলে বাংলাদেশের হরতাল নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁর দুঃখ হচ্ছে হরতালের দিনে তিনি বাসায় বন্দী থাকেন। ফলে মানুষের সাক্ষাৎ না পেলে তাঁর আর নিজেকে দেখা হয় না।

বাংলায় গ্রিকদর্শন মানেই সরদার ফজলুল করিমের অনুবাদের আশ্রয় গ্রহণ। এতো প্রাণবন্ত অনুবাদ- জ্ঞান তালাশকারীদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক সৃষ্টি করে। তাঁর বিপুল অনুবাদের মধ্যে ‘প্লেটোর সংলাপ’-ই যে প্রথম অনুবাদ করেছিলেন জেলখানায় বসে তা এ-বই পাঠে অবগত হলাম। তাঁর অনুবাদে মুগ্ধ হয়ে প্রফেসর মুজাফফর (ন্যাপ) বিস্মিত হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুজাফফর নিজে ‘প্লেটোর সংলাপ’ আজিজ সুপার মার্কেট থেকে কিনে বেশ মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছে। ওঁর কেবল প্রশ্ন ছিল : সত্যই কি এই রকম একটা মানুষ ছিল? (পৃ. ৩১)।

প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর নিখাদ প্রেম । আজকের প্রকৃতি বিনাশী কার্যক্রম তাঁকে ব্যথিত করে। সে কথা বেশ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন। সমুদ্রপ্রেমিক মানুষটি বলেন, ‘কক্সবাজারের সমুদ্রের পূর্ব কিংবা পশ্চিমের দিগন্তে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের ছবি আমার মনকে উদ্দীপিত করে’ (পৃ. ৩৫)।

মানুষের দানবিক আচরণের কিছু নমুনা তিনি দিয়েছেন। সেটি আমেরিকার দ্বারা ইরাকে হামলা হোক কিংবা অন্যদের দ্বারা আমেরিকায় হামলা হোক। এসব তাঁর মনোকষ্ট বৃদ্ধি করেছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংস সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই হচ্ছে, আজকের, এই মুহূর্তের পৃথিবী। এটা কি মানুষের পৃথিবী?’ (পৃ. ৪২)।

জ্ঞানিক আলোচনায় ঋদ্ধ ক্ষৃদ্রাকৃতির বইটি সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-মনোবিদ্যাসহ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে। এখানে তাঁর একান্ত কিছু কথাও রয়েছে। কিন্তু পাঠের পর পরক্ষণেই মনে হয়- এ তো আমাদেরই মনের কথা।

পুরো বইটিই ‘মানুষ’কে নিয়ে লিখিত হয়েছে। তবে, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র প্রকৃতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করে তারও বর্ণনা রয়েছে। সভ্যতা বিনাশকারী মানুষের ওপর ক্ষোভের উদ্গীরণ করেছেন। প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে ইট-পাথরের গাঁথুনি- তাঁকে ব্যথিত করেছে। এমনকি, এদেশে অহরহ নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, নিপীড়ন আর অবিচারের ঘটনায় তাঁর মনের ক্ষোভের কথাও জানা যায়। ব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব, মর্মযন্ত্রনা, স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্রে বয়ানও এ-বইতে রয়েছে।

মানুষ হিসেবে বাঁচার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসও এ-গ্রন্থে পাওয়া যায়। বইটি যে কোন পাঠকের ভালো লাগবে। এ আশাবাদ নির্দ্ধিধায় করা যায়।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

;