কাহলিল জিবরানের ‘দ্য প্রোফেট’ এবং কবিতায় নতুন বিপ্লব

আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
কাহলিল জিবরান [জানুয়ারি ৬, ১৮৮৩-এপ্রিল ১০, ১৯৩১]

কাহলিল জিবরান [জানুয়ারি ৬, ১৮৮৩-এপ্রিল ১০, ১৯৩১]

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ শতকের বিস্ময়কর কয়েক ব্যক্তিত্বের মধ্যে কাহলিল জিবরান অন্যতম। ইংরেজি সাহিত্যের পুরোধা শেক্সপিয়ার এবং চীনের প্রাজ্ঞপুরুষ লাওৎসের পর জিবরানই সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের লেখক হিসাবে স্বীকৃত। ১৯২৩ সালে লেখা ‘দ্য প্রোফেট’ তাকে পরিণত করেছে সর্বকালের সেরা কবিদের একজনে। বিশ্বের প্রায় সব ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে গ্রন্থটি। স্থান দেওয়া হয় ধর্মগ্রন্থের কাছাকাছি জায়গায়।

‘দ্য প্রোফেট’কে গণ্য করা হয় মাস্টারপিস হিসাবে


২৬টি পৃথক অনুচ্ছেদের ধাঁচে লেখা বইটি কেবল আমেরিকাতেই বিক্রি হয়েছে নয় মিলিয়ন কপির বেশি। প্রথম সংস্করণ তো প্রথম মাসেই শেষ। ষাটের দশকের পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায় সপ্তাহে পাঁচ হাজারেরও বেশি বিক্রি হবার তথ্য। এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক হারে বিক্রি চলছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আসলে কী আছে ‘দ্য প্রোফেট’-এ? তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যই আজকের আয়োজন।

নতুন যুগের প্রসূতি

‘দ্য প্রোফেট’ গ্রন্থটির প্রধান সফলতা ভাষার প্রয়োগরীতিতে। আরবি বাইবেল এবং কোরান সম্পর্কে জিবরানের ধারণা ছিল আগে থেকেই। বাইবেলের উপমা এবং প্রবাদ ব্যবহারের স্টাইল তাকে স্পর্শ করে। এজন্য প্রায়ই রচনার ভেতরেও সেই চিহ্ন খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না। বিয়ে, বিচার, কৃষি, প্রেম, জীবন প্রভৃতি নিয়ে তার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে অন্যরকম মাত্রা নিয়ে। যদিও গ্রন্থে কোনো ধর্মীয় আদর্শের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই; তারপরেও এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা বিবৃত হয়েছে। অনেক সমালোচকই বইটিকে ‘প্রজ্ঞাপুস্তক’ নামে শ্রেণিকরণ করতে চান।

জিবরানকে গণ্য করা হয় নতুন যুগের ধাত্রী হিসাবে। কারণ, আধুনিক বস্তুবাদী জগতে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় সীমানার বাইরে থেকেও আধ্যাত্মিকতাকে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। ব্যক্তিক অতীন্দ্রিয়বোধ, পরিশুদ্ধির সুর বেজে উঠেছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মপ্রচার ছাড়াই।

নির্বাসনের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আল মুস্তফাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত গল্প। বারো বছর নির্বাসন বাসের পর বিদায়ী এক জাহাজে চলে যাবার আগে শহুরে জনতার আবেষ্টনীতে দাঁড়িয়ে তিনি বলে যান বিভিন্ন প্রসঙ্গে। আগ্রহী জনতা একের পর এক উপদেশ চাইতে থাকে প্রাজ্ঞপুরুষের কাছে। জবাব এসেছে নানা রূপক এবং নাটকীয় শৈলি নিয়ে। জিবরান নিজ বাসভূমি লেবানন ছেড়ে ১২ বছর যাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রে। অনেকে তাই এই আমেরিকা জীবনকেই নির্বাসন হিসাবে ব্যাখ্যা দিতে চান। সে যাই হোক, আল মুস্তফাকে বিয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তর দেন—“তোমরা একসাথে দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু মিলেমিশে যাবে না;
কারণ মন্দিরের পিলারগুলো মাঝখানে ফাঁকা রেখেই দাঁড়িয়ে থাকে,
আর ওক এবং সাইপ্রাস গাছ একে অন্যের ছায়ায় বেড়ে উঠতে পারে না।”

তাঁর হাতে জন্ম নিয়েছে সাহিত্যের এক নতুন ধারা


কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্বের বাইরে এসে আল মুস্তফার উত্তর মুগ্ধ করে রাখে পাঠককে। কেউ একজন তার কাছে সন্তানের ব্যাপারে জানতে চাইলে সোজসাপ্টা ছিল তার জবাব—“তাদেরকে তোমার ভালোবাসা দিতে পারো কিন্তু চিন্তাগুলোকে না;
তাদেরও রয়েছে নিজস্ব চিন্তাভাবনা;
তাদের দেহকে আশ্রয় দিতে পারো; আত্মাকে না
কারণ তাদের আত্মা বসবাস করে আগামীর আশ্রয়ে;
যেখানে তুমি স্বপ্নেও যেতে পারবে না।”

কবি এবং পেছনে এক নারী

জিবরান সম্পর্কে অন্যতম জনপ্রিয় দাবি, তিনি তাঁর নিজের গল্পগুলোতেই নাটকীয়তা এনে পুস্তক করে তুলেছেন। তাঁর জীবনী নিয়ে নাড়াচাড়া করলে ম্যারি হাসকেল নামের জনৈক রমণীকে পাওয়া যায়; যিনি নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দিয়ে সফল করেছেন জিবরানের প্রতিষ্ঠা। কবির লেখাগুলো পর্যন্ত নিজে কাটাছেঁড়া করে দিয়েছেন। আর জিবরানও গ্রহণ করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। বস্তুত তিনি নিজেও শিখেছেন; আর এই অভিজ্ঞতা তাকে জীবন সম্পর্কে গভীর দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করেছিল। এজন্য ভালোবাসার মতো বিষয়েও তার ঝুলি শূন্য থাকেনি। জিবরান লিখেন—“নিজেকে পূর্ণতা দেওয়া ছাড়া ভালোবাসার আর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই,
কিন্তু যদি তুমি ভালোবাসো, তবে আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে;
তাই একে নিজের আকাঙ্ক্ষায় পরিণত করো।”

ম্যারি হাসকেলের পৃষ্ঠপোষকতা সহজ করে দিয়েছে চলার পথ


মৃত্যু এবং দ্বৈততা

জিবরান কেবল সার্থক কবি ছিলেন না। চিত্রকলার ওপর ছিল উচ্চতর পড়াশোনা। এজন্য ‘দ্য প্রোফেট’ পুস্তকের মাঝে মাঝে অসম্ভব সুন্দর কিছু চিত্রকর্মের দেখা মেলে; যা জিবরানেরই সৃষ্টি। সারাজীবনে এরকম প্রায় ৭০০ ছবি সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাদের মধ্যে ইয়েটস্, ইয়াং-এর পোর্ট্রেটও ছিল।

জিবরানের মৃত্যু হয় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে। এরইমধ্যে সৃষ্টিকর্মের এক বিশাল জগৎ দিয়ে গেলেন মানুষকে। পরবর্তীতে গার্ডেন অব প্রোফেট, স্যান্ড এন্ড ফোম, ম্যাডম্যান, ব্রোকেন উইংস প্রভৃতি লেখাগুলো মাইলফলক তৈরি করে গিয়েছে কবিতার ধারণায়। সমালোচনাকারীদের অভিযোগ, জিবরান দ্বৈততাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তার লেখাগুলো তাই প্রায়শ পরিণত হয়েছে প্যারাডক্স-এ। তাদের মনে রাখা দরকার, তাওবাদের প্রধান গ্রন্থ ‘তাও তে চিং’ কিংবা মধ্যযুগের মুসলিম অনেক সুফিদের লেখায় দ্বৈততা একটা অলঙ্কারের মতোই উঠে এসেছে। আনন্দ ও দুঃখ নিয়ে জিবরানের অভিমত—“কেউ বলে সুখ দুঃখের চেয়ে বড়, কারো দাবি সুখের চেয়ে বড় দুঃখ;
আমি বলি এরা আলাদা না, তারা একসাথেই আসে,
যখন একজন তোমার সাথে বসে থাকে; তখন এইকথা ভুলে যেও না—
অন্যজন তোমারই বিছানায় ঘুমিয়ে।”

আধ্যাত্মিকতা এবং বিস্তৃতি

ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, তাওবাদ প্রভৃতি ধর্ম নিয়ে জিবরানের ধারণা ছিল; তা তার লেখাতেই স্পষ্ট। বস্তুত তার আল মুস্তফা চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে একজন মহাপুরুষের চোখে পৃথিবীর বিভিন্ন গতানুগতিক বিষয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় চাপা পড়ে যাওয়া হৃদয়কে উদ্ধার করার চেষ্টা ফুটেছে ছত্রে ছত্রে। কোনো প্রকার হিংসা, উগ্রতা কিংবা বিচ্ছিন্নতাকে উসকে না দিয়ে বিশ্বমানবকে বিশ্ব-আত্মার সাথে একীভূত করতে চেয়েছেন জিবরান। এজন্য ‘দ্য প্রোফেট’ গ্রন্থটি সর্বকালের সেরা বইগুলোর তালিকাতে ঠাঁই পেয়েছে। প্রতিটা ভাষায় জিবরানের ‘দ্য প্রোফেট’ গৃহীত হয়েছে সাদরে। তাকে পাঠ করা হচ্ছে রুমি ও সা’দী কিংবা শেক্সপিয়ার ও উইলিয়াম ব্ল্যাকদের সাথে।

বইকে কেন্দ্র করে হলিউডে নির্মিত হয়েছে এনিমেটেড চলচ্চিত্র


 

আপনার মতামত লিখুন :