রোদ

রাকিবুল হায়দার
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

রোদটা সাঁৎ করে আলিমুদ্দির মাথায় ঢুকে গেল। তারপর থেকেই শুরু হলো বিপত্তি। প্রথমে আলিমুদ্দির মাথার ভেতর বসে বিলকিছ বেগম হা হা করে হেসে উঠল। শুধু হেসে উঠলে কোনো বিষয় ছিল না। বিলকিছের এরপরের কাণ্ডকারখানা আলিমুদ্দিকে বেশ ভোগাল। বিয়ের শাড়ি পরা বিলকিছ বেগম আয়নার সামনে বসে সাজতে সাজতে আয়নার ভেতর দিয়ে আলিমুদ্দিকে দেখতে লাগল। আলিমুদ্দি ততক্ষণে ক্ষেতের আইলে বসে পড়েছে। তার শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে নোনা ঘাম। সে হাতের তালু দিয়ে কপাল থেকে ঘাম মুছল। তারপর লুঙ্গির পাড় দিয়ে মুখ আর ঘাড়ও মুছে নিল। তারপর আয়নার ভেতর দিয়ে নতুন বউয়ের সাজে থাকা বিলকিছ বেগমকে এক নজর তাকিয়ে দেখল। বিলকিছ বেগমের নাকের উপরের তিলটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টা আলিমুদ্দির কাছে কেমন যেন ঠেকল। তাছাড়া বিলকিছ বেগমকেও কেমন যেন দূরের মনে হচ্ছে। অথচ বিলকিছ বেগম অন্য কারো সাথে বিয়ে বসেনি।

আলিমুদ্দিই গত শীতে তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে। এই যে দুপুর, এখন হয়তো বিলকিছ ভাত রান্না শেষ করে দরজার পুকুরে গোসল করতে গেছে। সাথে নিয়েছে সুগন্ধী সাবান আর কালো রঙের শ্যাম্পু। কালো রঙের শ্যাম্পু সদর থেকে গত বুধবারে আলিমুদ্দিই এনে দিয়েছে। আর সুগন্ধী সাবানটা বিলকিছ বেগমের মামাতো ভাই সৌদিফেরত অছিরুদ্দিনের দেওয়া। আলিমুদ্দি এখন বিলকিছ বেগমের গোসল করার দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ব্লাউজছাড়া বুকের মধ্যে গামছা দিয়ে সাবান ঘষছে বিলকিছ বেগম। সেই সাবান ঘষার তালে বুকজোড়া এদিক-ওদিক হামাগুড়ি দিচ্ছে। বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আলিমুদ্দির লজ্জা লাগে। ইচ্ছে করে চোখ সরিয়ে নিতে। কিন্তু সরিয়ে নেওয়া যায় না। আলিমুদ্দি তাকিয়ে থাকে। তার শরীর থেকে আরো বেশি ঘাম ঝরতে থাকে। আর মাথার ভেতরের রোদটা চাড়া দিয়ে ওঠে। মাথার এপাশ-ওপাশে বিলকিছ বেগমের বুকের মতো আথালি-পিতালি করে।

আলিমুদ্দি আইল থেকে উঠে পড়ে। দাঁড়িয়ে লুঙ্গির গিঁট ঠিকমতো বাঁধে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো লাগে। মাতালের মতো দুলতে দুলতে বাদামের জমির পাশের ডোবায় নেমে পড়ে আলিমুদ্দি। ডোবার পাড়ে বসে সঙ্গমের পরের সময়ের মতো ফোঁস ফোঁস করে হাঁপায়। গলা শুকিয়ে আসছে। মুখ থেকে থুতু ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সে। তার চোখের সামনে আবার ভেসে ওঠে বিলকিছ বেগম।

এবার বিলকিছ বেগম কুপি জ্বালিয়ে বিছানায় বসে আছে। বোঝা যাচ্ছে আলিমুদ্দি ঘরে নেই। জানালার দিকে তাকিয়ে চোরা হাসি হাসে বিলকিছ বেগম। সেখান থেকে কেউ একজন সরে যায়। লোকটাকে চিনতে পারে না আলিমুদ্দি। একবার মনে হয়, দত্তবাড়ির রইসউদ্দিন। আবার বিলকিছ বেগমের সৌদিফেরত মামাতো ভাইকেও সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না কিছুতেই। সে হয়তো একটা কালো শ্যাম্পুর বোতল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলিমুদ্দির অস্থির লাগে। রোদটা মাথার ভেতর লাঙ্গলের ফলা ঢুকিয়ে দিচ্ছে এখন। বিলকিছ বেগমকে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারলে যন্ত্রণাটা একটু হলেও কমত। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস আসায় কুপিটা নিভে যায়। কিন্তু বিলকিছ বেগম সেই অন্ধকারেই আবার হা হা করে হেসে ওঠে।

কার সাথে হাসল আবার! আলিমুদ্দি সন্দেহের খাতায় আর কারো নাম লিখতে পারে না। তার হাত কেঁপে ওঠে। আঙুল থেকে নাম লেখার কলমটা গড়িয়ে পড়ে ডোবায় নেমে যায়। আলিমুদ্দি আবার উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সে। কলমটার মতো করে গড়িয়ে পড়ল ডোবায়। তারপর মাথার ভেতর রোদ আর চোখের ভেতর বিলকিছ বেগমকে নিয়ে আস্তে আস্তে ডুবে গেল আলিমুদ্দি।

আপনার মতামত লিখুন :