জঠর

নাহার মনিকা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

মেইড ইন ইংল্যান্ড, সোনালি বর্ডার দেওয়া শাদা ফিনফিনে কাপে চা ছাঁকতে গিয়ে জ্বরতপ্ত হাত কেঁপে গেলে ভয় লাগে মাজেদার। আলমারির কাচ মুছতে গিয়ে এর আগে শুধু বাইরে থেকে চেয়ে দেখেছে এইসব দামি কাপ প্লেট।

মালিকের দেখা পাওয়ার সাধ মাজেদার কম না। তাই বলে আগে সংবাদ দেওয়ার খবর নাই, এমন বিল উপচানো বাদলার দিনে?

চুপ থাক! এরা কি হামাক পুছ করিয়া তাবাদে আইসপে?’—সাদেক আলি গলা নামিয়ে ধমকে উঠলেও তাকে চাবির গোছা দেয়। স্বামীর সঙ্গে আজকে খেলোয়াড়ের দক্ষতায় অভিযোগহীন থাকতে হবে। চা ঢালতে ঢালতে মাজেদার গা কাঁপে। রান্নাঘরের কোনায় মেঝেতে স্তূপাকার ধান, পায়ে এসে ধাক্কায়। এত ধান! ভাতের অভাব নাই! এই ধান নিয়ে তাদের গ্রামে ফিরে যাওয়া যেত যদি!

গোড়ালির ওপরে প্যান্ট গুটিয়ে নাবিল মিয়া উঠোনে রাখা ইটের ওপর পা ফেলে ফেলে মেয়ের কাছে আসে। নোরা বারান্দায় দাঁড়ানো, নিজের সাইজের টেডিবিয়ার দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছে। লাল কোঁকড়া চুল, পরনের ফুলতোলা ফ্রক। বয়স সাত নাকি ছয়? তাকিয়ে, নিজেকে এই মেয়েটার গুলতি খেলার কাছে জিম্মি করে দেয় মাজেদা। কাছে যেতে ভয় লাগে আবার প্রবল কৌতূহলে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। এটা করলে সবার আগে যে লোক ক্ষেপে উঠবে সে হচ্ছে সাদেক আলি। ফলে মাজেদা নিজের ইচ্ছেটাকে মনে মনে চোখ রাঙ্গায়।

লাল সিমেন্টের তকতকে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে নোরা তার ব্যাকপ্যাক খুলে খেলনা বের করে টেপাটিপি শুরু করে। কপালের চিন্তিত ভাঁজ টান টান করে প্রশ্রয়ের হাসি হাসে নাবিল মিয়া,—‘তাই আর তাইর গেইম! গেইম খেলাত দেলাইলে আর কুনতা লাগে না’...‘আসলে আমিও বড় তাড়াহুড়ার মাজে আইছি। আগে ফুন দিবার সময় ফাইছি না...’ নাবিল মিয়ার টক টকে লাল ত্বকে অবনত ভঙ্গি, ‘সাদেক চাচা, আমি আসলে এখটা বিফদে ফরছি, আমার কিছুদিন দেশো থাকা লাগব। আই মিন, আত্মীয় স্বজনরে জানাইমু... কয়দিন বাদে, আফনে তো জানইন, আত্মীয় স্বজন বেশি আমরার...

ইংল্যান্ড থেকে আনা কিছু জিনিস তাকে ঢাকায় এয়ারপোর্ট কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে সরাসরি গ্রামের বাড়ি আনতে হবে আর এ ব্যপারে সে আত্মীয়দের জড়াতে চায় না। কেন চায় না, সে ব্যাখ্যার কিছুটা সাদেক বোঝে, বাকিটা বোঝার জন্য পলক না ফেলে নাবিল মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

নাবিল মেয়েকে কোলে জড়িয়ে তারপর গুজগুজ কথায় জমে যায়। এক পর্যায়ে নোরা হারিয়ে যাওয়া পায়রার মতো ফুপিয়ে কাঁদে। ইংরেজিতে কথা বলে যায় আর নাবিল মিয়ার ইন করা প্যান্টের বেল্ট খামচে ধরে আর ছাড়ে না। নাবিল মিয়ার কথা শেষের বাংলা লাইন—‘এইনতাইন তুমারে লুক আফটার কররা’—শুনে সাদেক আলির মুখের হাসির রেখা বিস্তৃত হয়।

‘আহারে, মেয়াটার চোক্ষের পানিটা একনা মুছিয়া দেয়া নাগে...’ মাজেদা একটু এগিয়ে এসেও থেমে যায়। এদের সামনে স্বামীর ধমক খাওয়ার দরকার কি?

অনেক দিন পরেই এবার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত করে মোবাইল বেজে উঠেছিল। একটা সময় ছিল দুই-চার বছরে এক আধবার বাড়ি গমগম করত তখন ধোওরে, মোছরে, গাড়ি ভাড়া, লোক জোগাড়, বিমান বন্দর—নানান রকম আর নানান কায়দার ব্যস্ততা। টিলা পার হয়ে বিলের এপারে আসার চেয়ে সিলেট শহরে হোটেল, রেস্ট হাউস।

‘ওরা আর আইসপে। কুনো একদিন আসিয়া জমিজমা বেঁচি টাকা নিয়া যাইবে।’

‘চুপ কর, কইলেই হয় নাকি?’ সাদেক আলি রেডিওর নব ঘুরায়। সতের বছর আগে নাবিল মিয়ার বাপের কাছ থেকে পাওয়া দুই ব্যান্ড এফ এম, কাটা গরুর শ্বাসনালীর জান্ত্যব শব্দের মতো এক বাতাস থেকে আরেক বাতাসে লাফায়। মাজেদা তখন চুপ করে গিয়ে ঘুরে আসে তার গ্রামের খটখটে ফেটে যাওয়া শুকনো মাটির ধান ক্ষেত। ইঁদুরের গর্ত খুড়ে গুপ্তধন পাওয়ার মতো দু এক ধামা ধান।

****
জ্বর তার এই দিনেই আসতে হবে? মেয়েটাকে এমন হুড়মুড় করে ফেলে দিয়ে নাবিল মিয়া সাদেককে নিয়ে উল্কার মতো আবার বেরিয়ে যাবে মাজেদা ভাবতে পারেনি।

অবশ্য আজকে রাতের মামলা। ‘কাইল সক্কাল সক্কাল চলি আইসমু’—সাদেক আলি আশ্বস্ত করেছে। মুঠভর্তি টাকার বান্ডিল পকেটে ভরতে গিয়ে নাবিল সাদেককে কয়েকটা নোট দিলে তা মাজেদার হাতে গুঁজে দিয়ে শ্যালো নৌকাইয় লাফিয়ে উঠে বসে সে। ইঞ্জিন স্টার্ট নেয়।

ঘাট পাড়ে ভেজা ঘাসের ডগা বৃষ্টি বিদ্বেষে মুখিয়ে থাকতে থাকতে নুয়ে গেছে। নোরার পায়ে কাদা লেগে গেছে। নিজে ধুয়ে দেবে কিনা বুঝতে পারে না। সাদেক বারবার সাবধান করে দিয়ে গেছে, অকারণে যেন মেয়েটাকে বিরক্ত না করা হয়।

বারান্দার কোনায় বড় প্লাষ্টিকের বালতিতে ধরে রাখা বৃষ্টির পানি দেখিয়ে দিলে নোরা প্রথমে মাথা নেড়ে না বলে, তারপর দু হাতের আজলায় পানি নিয়ে কিছুক্ষণ এমনভাবে খেলা করে যেন তার না দেখা কোনো অলীক দৃশ্য হাতের আঙুল থেকে কনুইতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, হাত গড়িয়ে বৃষ্টির পানি গুঁড়ি গুঁড়ি মুক্তো ফুটিয়ে নেমে যায়।

নাবিল মিয়াদের তালাবন্ধ বড়ঘরে মাজেদার প্রবেশাধিকার নাই। আজকে এই শিশুকন্যাটির দেখভাল করতে যেয়ে একের পর এক বন্ধ দরজা খুলে যাওয়ার উত্তেজনা তার বুকে ফড়ফড় করে ঘুরপাক খায়। নোরা বিনা কথায় ঘরের মালিক হবার উত্তরাধিকার বুঝে নিয়ে ছোট স্যুটকেস টেনে মেঝেতে রাখলে মাজেদা তার বই, খেলনা টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখে। কাপড় গুছিয়ে রাখতে গিয়ে মাজেদার মাথা ঘোরে, দেয়ালে ঝোলানো ফটোগুলি একের পর এক নেমে আসে মসৃণ লাল মেঝেতে। নাবিল মিয়া, তার মা আর তার বিদেশি বৌ। তাকে সুপারি কাটতে বললে মাজেদা তার শোনা গল্পের মধ্যে আকুপাকু করে সাঁতার কাটতে থাকে।

নোরা তার গেইম খেলার জন্য প্লাক পয়েন্ট বের করে ইলেক্ট্রিসিটির কানেকশান দেয়। সেদিকে তাকিয়ে হাসলে প্রতিদান দেবার মুখটি গেইম খেলাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। তার মাথার ওপরে খোলা জানালা দিয়ে বর্ষার ক্লান্ত আকাশের দুর্বল আলো।

খোদ বিলাতের বিদেশিনীর গর্ভজাত একটি কন্যা শিশু তার এত কাছে বসে আছে!—এই ভাবনা মাজেদাকে ক্রমাগত অপ্রস্তুত করে তোলে।

গাইবান্ধায় তাদের গ্রাম থেকে সাদেক আলি যখন এই হাওরের দেশে কাজ করতে আসে সে বছর মাটি ফেটে চৌচির। পানি আনতে মাজেদারা ফাটা মাঠের মধ্যে দুই মাইল পাড়ি দেয়। কলসির পানি চুয়ে হাফপ্যান্টের ইলাস্টিক ভিজে যায়। রোদের তাপে ভেজা গামছা মাথায় শুকিয়ে ওঠে, তাও ওরা পানি আনতে দুই মাইল যায়। আর ভাত আনতে তার বড়ভাই, সাদেক আলি আরো কতজন দূরের পথ, কোথায় কোথায় যায়, কেউ ফিরে আসে, কেউ আসে না। ধান ক্ষেতের ফাটলের ভেতরে তাদের না ফেরার কাহিনী ঠেসে ঠুসে ঢুকিয়ে মাজেদারা দু একবার তার ধার ঘেঁষে বসে কাঁদে তারপর আবার পানি আনতে যায়।

তারপর একদিন যখন বৃষ্টি নামে, কাঁখের কলসির মুখ অপ্রশস্ত বলে আসমানী নেয়ামত ধরে রাখতে সুবিধা হয় না। তারা থালা, মাটির মালসা সবকিছু তাদের ছনের চালার নিচে ধরে রাখে কিন্ত সে পানিও পচা খড় চোয়ানো হলুদ পানি, আর তাতে মেয়ের গা জুড়ানোর উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে না দেখে মাজেদার বাপ মা—মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত হয়। আর এ সময় মওকামত রোজার ঈদের সময় কয়েকদিনের জন্য গ্রামে আসা সাদেক আলির সঙ্গে তার বিয়ের কথা ওঠে।

আড়তে ধান শুকানো আর তুষ ঝাড়ার কাজটা মাজেদা মেয়ে পেটে নিয়ে, বুকে নিয়ে করেই গেছে। হাওড় এলাকা সাদেক আলিকে দুতিন রাতের জন্য ছুটি দিয়ে তারপর সহস্র রাতের জন্য আটকে রেখে দেয়।

অঘটনের পরে সুঘটনাও মানুষের জীবনেই ঘটে, মাজেদার মনে হয়, তা না হলে তের-চৌদ্দ বছর পরে সাদেক আলি তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে! নোরার দিকে তাকিয়ে দেয়ালে ফটো থেকে দাদা-দাদীর সাথে চেহারার মিল খোঁজে মাজেদা। নাহ, মেয়েটা একদম বিলাতি পুতুল! তার নিজের মেয়েটা তার মতোই কালো ছিল।

কী খেতে দেবে মেয়েটাকে সে? লম্বা টেবিলের একপ্রান্তে হাত গুটিয়ে বসে থাকে নোরা। সাদেক আলি থাকলে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারত যে আজকে তাদের আসবার কথা জানা ছিল না, আর বৃষ্টির কারণে হাট বাজার যাওয়ার উপায় নাই, আগামীকাল তার পছন্দের বন্দোবস্ত হবে।

মাজেদা কি তাকে একটু ভাত খাইয়ে দেবার উদ্যোগ নেবে? ভালো করে কনুই অব্ধি হাত ধুয়ে মাছ বাছতে বসলে চোখ কোনাকুনি করে তাকে দেখে নোরা, তারপর কালো, কড়া পরা হাতের এগিয়ে আসা দেখে উঠে দাঁড়ায়, টেবিলের ওপর ভাপ ছড়ানো মাখা ভাত। এক চামচ তার মুখের কাছে তুলে ধরলে অনিচ্ছার একটি ছোট্ট হা মাছের মুখের সঙ্গে মিল রেখে খোলে। নোরা দুতিনবার চিবোয় আর তারপরই ওয়াক তুলে প্লেটে ফেলে দেয়। পানি খেয়ে আরেক দফা ওয়াক তোলে সে। মেয়েটার ফোঁপানো কান্নায় মাজেদার দমবন্ধ লাগে, সে একটা চড়ারোদ্রের মাঠে বসে ঘামতে থাকে, কোথাও একটা গাছ দেখা যায় না, আর পানির সংকীর্ণ রেখাটিও দূরে বিলীয়মান।

****
নোরার ঘুম ভাঙার অপেক্ষা করছিল মাজেদা। টিভিটাও চালিয়ে দিতে হবে। প্লাগ লাগানো ফেলে রেখে রান্নাঘরে চলে যায়। তারপর শাড়ির আঁচলে গরম দুধের গেলাস চেপে উঠান পার হয়ে ঘরে আসে। নোরা সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে জানায় যে সে গরম দুগ্ধ পান করে না। মাজেদা তার এগিয়ে নিয়ে আসা হাতের সান্নিধ্যে নোরার হাতটি মিলিয়ে নিজের অবস্থানগত তফাৎটির স্পষ্টতা আরো ভালো করে ধরতে পারলে গাঢ় খয়েরী রঙ্গের কেন্নোর মতো হাত গুটিয়ে ফেলে।

মেয়েটাও তাকে দেখলে কেমন সিঁটিয়ে গরম তাওয়ায় পানির ছিটার মতো জ্বলে উঠে শুকিয়ে যায়। সকাল থেকে কিছু না খাওয়া মেয়েটাকে কি খাওয়াবে?

কালো রঙজ্বলা ছাতা সহায়তার ভঙ্গিতে ঘরের কোনে ঝুলছে। মাজেদার সাহস হয়। ভালো করে আঁচলের ওপর গামছা জড়ালে নিজেকে বেশি নিরাপদ মনে হয়। নোরাকে বাইরে যাওয়ার কারণ বোঝাতে তার হাতের ইশারা আর মুখের আওয়াজ তোলা যথেষ্ট মনে হয় না। ঝিঁঝিঁ পোকার মতো অস্বস্তির সুর তার সঙ্গে বাজতে বাজতে উঠানে নামে।

সাদেক আলিরা চলে যাওয়ার পর একটু রোদের মুখ দেখা গেলেও এখন একেবারেই ঘোর সন্ধ্যামাখা অন্ধকার। ঘাটে যেতে দ্রুত পা চালায় মাজেদা। টিলায় এ বাড়িতে উঠে আসার কত মাস হলো, তার বাইরে যাওয়ার দরকার পড়েনি। দিন পার করার আয়োজন সাদেক আলি করে দেয়।

টিলার ঢাল পার হয়ে ওপাশের টিলায় আরো দুটো বাড়ি। শুকনার দিনে একদিন কারো বৌ ঝি হবে, মাজেদা কৌতূহল নিয়ে তাদের শহরে যাওয়া দেখেছিল। ঘাটের নৌকা তার অলস গা ঝাড়া দিলে মাজেদা জানা সব দোয়া দুরুদ পড়ে লগি ঠেলে। মন্থর গতির বৃষ্টি ক্রমাগত ভিজিয়ে যায়, কালো পানির গায়ে লেগে থাকা কচুরিপানা, তির তির ভেসে থাকা শ্যাওলা তার কাছে হঠাৎ অচেনা লাগে। লগি দিয়ে ঘাঁই মেরে মেরে মাজেদা পানির ওপরে ভেসে থাকার মামলায় জয়ী হতে চায়। চারপাশ ঘিরে বৃষ্টি, ঠান্ডা বাতাসের ঝাপ্টা তাকে এক ঝটকায় নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

এ রকম না, পরিষ্কার দিন ছিল, তুষ ঝাড়তে দুই বছরের মেয়েকে ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে পিঠে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল। আহ সে বাঁশের চোঁচ দিয়ে নাড়ি কাটার মতো ছেঁড়া লুঙ্গির গিঁট খুলে দিয়েছিল। চালের আড়তে মহাজনের বারান্দায় তার তুষ ঝাড়া কি কেয়ামত পর্যন্ত চলতে চেয়েছিল? মেয়ে খেলতে খেলতে মাজেদার কুলার বাতাসে খয়েরী তুষের গুঁড়া গুঁড়িগুঁড়ি বাতাসে মিশে বাতাসের রঙ বদলে দিয়েছিল কি? নইলে তার কুলার ঝাপ্টার ওপারে মাটির চারা দিয়ে খেলতে খেলতে মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল?
আহাজারি ছাপিয়ে নিজের স্বাভাবিক কণ্ঠ কানে বাজে বেশি—সে রাস্তায় মানুষ থামিয়ে থামিয়ে বলে, “মেয়াটাক পাইনা আফা, আইজ দশ দিন হয়া গেল, তুষ ঝাড়বার গেলাম, অয় খেলবার নাগছিল, কায় নিয়া গেল, কবার পারি না। আমার মেয়াটাক পাই না ভাইজান।” বুকের ভেতরে দাপিয়ে বসা আহাজারি বলক দিয়ে দিয়ে উঠে চারপাশ ভারী করে তোলে, মাজেদার চোখ তবু শুকনো, ফাটা মাটির মতো খটখটে।

মানুষ তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পুলিশের কাছে পাঠায়। ধুলার বিল সাঁতার দিয়ে কত হাঁটল মাজেদা, মনে পড়ে না। সাথে নজমুল, তাদের মেম্বারের ছোটভাই। থানার বারান্দায় উঠতে উঠতে দুপুর গড়ায়। নজমুল “ম্যাট্রিক পাশ দিলে কি হয়, কিছুই গুছায়া কবার পারে না।” মাজেদাকে আগে বাড়তে হয়। একজন, দুজন করে কত পুলিশের কাছে ঘুরল মাজেদা!

“ঠিক আছে, খুঁইজা পাইলে জানতে পারবা।”

নজমুল নাম ঠিকানা লিখে দেয়। থানার বারান্দা ছেড়ে রাস্তায় ফিরে আসার আগে মাজেদা আরেকবার শেষ চেষ্টা করে—“পুলিশ ভাইজান আপনাক ধর্মবাপ ডাকি ভাইজান। পেলাস্টিকের চুড়ি আছিল হাতোত, এই একনা গোল গোল হাত। ছিটের ফরাক পিন্দনে। হাগিয়া ছুছবার পারেনা মেয়া আমার। মেয়াটাক আনি দেন ভাইজান।”

****
মাজেদার ইচ্ছে করে নৌকায় বসে ভেজে। কোনো ঘাটে না ভিড়িয়ে বসে থাকে মাঝ দরিয়ায়। কালো জলের অঠাঁই নিচে গিয়ে যদি দুই বছরের গোল গোল নীল চুড়ি পরা ছোট্ট হাত দুটো খুঁজে পাওয়া যায়!

পাশের টিলার ঘাটে নৌকা ভিড়লে নোরাকে একা রেখে আসার উচিত-অনুচিতবোধ মাজেদাকে গ্রাস করলেও দম নিয়ে সে ঘাটে উঠে আসে। কাপড় ভেজা তাই বারান্দার নিচে দাঁড়াতে হয়। কাঁপুনির সঙ্গে মাথা ঘোরা বেড়ে যায়। বুড়ো বুড়ির নাতি আর নাতবৌ সিঁড়ির ওপর থেকে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দীর্ঘ প্রশ্ন করে সন্তুষ্ট হলে তবেই সে তার ভেজা আঁচলের তলায় মুরগির মাংসের তরকারি ভর্তি টিফিনবক্স আর পরদিন ভোরে দেখতে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আবার রওনা দেয়।

সাদেক আলি বাপ না পাষাণ? ‘যায় নেওয়ার মালিক তায় নিছে—এটা কোনো কথা?

নাবিল মিয়ার সাথে যেমন ক্ষিপ্রগতিতে যাত্রা করল, নিজের মেয়েটাকে খুঁজতে তেমন কি বেরুতে পারত না? না দেখলে কি বাপের টান থাকে না?
কোনোমতে কাপড় বদলে মাথাঘুরে মেঝেতে বসে পড়ে মাজেদা। নোরা তখন তার বই পড়ে। …“মেয়াটা কাপড় বদলাবে না? জুতা খুইলবে না?”... ইস একটু জ্বরের ওষুদ যদি চাইত বুড়ার নাতির কাছে! ভাবতে না ভাবতেই বুড়ার নাতি নৌকা ঠেলে হাজির।

তার চোখে অবাধ সন্দেহ। সাদেকের সঙ্গে ফোনে কথা বলা উচিত বিবেচনা করে সে এখানে ওখানে ফোন করতে থাকে। তার খই ভাজার মতো কথার শব্দে নোরা বই ফেলে বাইরে বারান্দায় আসে। বুড়ার নাতি ইংরেজিতে তার সঙ্গে পরিচিত হয়। কারো সঙ্গে মনের ভাব বিনিময় উপযোগী ভাষার সন্ধান পেয়ে তাকে আনন্দিত দেখায়। সে তার বাবার ফোন নাম্বার বুড়ার নাতিকে দেয়। মাজেদার চোখ চায়ের পাতার রঙ ছাড়া দেখে কিন্তু মন পড়ে থাকে দুর্বোধ্য কথপোকথনের দিকে।

বুড়ার নাতির সংক্ষেপ বিবরণে মাজেদার জানা আরো পোক্ত হয়, নোরার বাপ কাল পরশু ফিরে আসবে। আর নোরার মা?—“দে আর ডিভোর্সড।” মাজেদা না বুঝেও বুঝে ফেলে যে এই মেয়ের মায়ের আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।

****
রাত্রে নোরা খাটে আর মাজেদা মেঝেতে, খাটের পায়ায় হেলান দিয়ে কাঁথা গায়ে জড়সড় হয়। নীল ডিম লাইটে নোরার মশারি গুঁজে দিতে গিয়ে নিজেকে একটা পানিভর্তি পুকুরে ডোবানো দেখে। সেখানে নোরার কচি মুখ, অপার্থিব নীল পদ্মের মতো ফুটে থাকে। আহ, এই রকমের পুকুর যদি তার নিজের গ্রামে থাকত! মেয়েটাকে কত দিন ভালো করে ডলে গোসল দেওয়া হয়নি। হঠাৎ হঠাৎ নামও মনে পড়ে না। তার মেয়ের নাম হয় মরিয়ম নইলে সাদেকা। সাদেকা নাকি মরিয়ম? এক কোমর পানি বন্যার তোড়ের মতো বুকের কাছে বেড়ে শীতে কাঁপিয়ে যায় তাকে। ভেজা শাড়ি ভালো করে জড়িয়েও ঠক ঠক করে কাঁপে মাজেদা। পুকুর ঘাটে শুকনা কাপড় আছে, কিন্তু ঘাট কোথায়?

লম্বা সুপারি গাছের সারি পুকুর ঘিরে তেমনি নির্বিকার। দড়িবাঁধা কোষা নাও বাতাসের সাথে দোল খায়।

“খালি ঘাটের সিঁড়িগুলান উধাও হইলো ক্যাংকা করি?”—শীতে কাঁপতে কাঁপতে বিড় বিড় করে মাজেদা।

তার কপালে ছোট হাতের গরম আঙুল ছুঁয়ে গেলে সে চোখ খোলে। নীল পুকুরের অপার্থিব পদ্ম তার মুখের ওপর ঝুঁকে হাত দিয়ে জ্বর দেখছে।

আপনার মতামত লিখুন :