হ্যাপি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে



ফাতেমা আবেদীন
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ছেলেটা এক মনে তারাবতি, মরিচাবাতি পুড়িয়ে যাচ্ছে। চোখেমুখে কী নিদারুণ আনন্দ। আমি মুগ্ধ হয়ে একজন সুখী মানুষ দেখছি। কিন্তু এই ভর সন্ধ্যাবেলায় পার্কের এই চুপচাপ কোনাটায় কেন এত আনন্দ নিয়ে একটা ছেলে তারাবাতি পোড়াবে এই ঘটনার কোনো সুরাহা করতে না পেরে বেঞ্চিতে গা এলিয়ে আপনমনে দেখছি।

ছেলেটা লেকের দিকে মুখ করে বাতি পোড়াচ্ছে। আমি এক সাইড থেকে ওর মুখ দেখলাম আবারও। ঝলমল করছে আনন্দে। আমাকে এখনো দেখতে পায়নি। এখানে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আমি এসে বসি। দুয়েকঘণ্টা বসে থেকে চলে যাই। এই একলা সময়টুকু আমি প্রতিদিন আত্মহত্যার পরিকল্পনা করি। কিন্তু খুব বেশি সাহস নেই বলে গত আট বছরে আত্মহত্যার মতো কোনো কাজ আমি করে উঠতে পারলাম না। বিষয়টা আসলেই খুব খুব কঠিন। জগতের মোহ ছাড়তে পারি না। আসলে আমি আত্মহত্যা কোনোদিনই করব না। আমি না থাকলে আমার পরিবারের কার কেমন লাগবে। কে কেমন করে কাঁদবে এটুকু ভেবেই আমি সুখ নেই নিজে নিজে। অজান্তে যে কতবার নিজের চোখে জল এসেছে তার ইয়ত্তা নেই আমার লাশের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে আমার মা কাঁদছেন। আমার স্ত্রী বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন, আমার চার বছরের ছেলে টুবলু ‘বাবা না এলে ভাত খাব না’ বলে জেদ করছে। এইসব ভাবনা প্রতিদিন আমাকে এই জগতের জন্য অপরিহার্য করে তোলে। তাই মরে যাওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি খুব সন্তর্পণে রাস্তা পার হই, ইলেক্ট্রিকের তারের দিকে নজর দিই। চোর, ছিনতাইকারী পিছু নিল কিনা সারক্ষণ খেয়াল করতে থাকি। আমি মরলে নিজে মরে যেতে চাই। এইসব অপঘাতে নই। অপঘাতে মরব না বলে যেসব খুঁতখুঁতানি সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমার স্ত্রী শীলা ভীষণ বিরক্ত। শীলাকে কে বোঝায় আমি চাইলেই মরে যেতে পারি। শুধু টুবলুর জলভরা চোখ গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে। মরে গেলে তো ঐপারে মায়ের শাড়ির গন্ধ পাব না।

এই অসুখে-বিসুখে মরে যেতেও ইচ্ছুক নই আমি। তাই বাড়িতে আমার কঠোর ডায়েট। কোলেস্টেরল হাই হওয়া যাবে না, বিপি বাড়তে দেব না, এমনকি চাষের কই-মাগুর খেয়ে শেষ বয়সে ক্যান্সারও হতে দেব না বলে ধণু ভাঙা পণ করেছি আমি। ফলাফল সংসারে অশান্তি। প্রথম প্রথম শুধু শীলা খুব বিরক্ত হতো। মাঝে একবার বাজার-ঘাট নিয়ে অশান্তি করায় বাপের বাড়ি চলেও গেছিল। ইদানীং মা আর টুবলুও আমার ওপর বেশ চোটপাট করে।
আমার বিধবা মা সারাজীবন খুব অভাব-অনটনে পার করেছেন। পছন্দের খেতে পাননি, পরতে পাননি। ছেলেকে মস্ত ইঞ্জিনিয়ার করে এখন একটু আয়েশ শুরু করেছেন মাত্র। মাঝে মাঝেই টুবলুর সঙ্গে ইন্টারনেট দেখে এটা-সেটা বাইরে থেকে আনিয়ে খান দুজনে। শীলার এতে মহা উৎসাহ। বাইরের ফুচকা, গ্রিল, স্যান্ডউইচ, পিজ্জা পেলে ওরা আমাকে ভুলে যায়। অথচ ওদের ভালো রাখতেই তো এসব খাবার খেতে দিতে চাই না। সব খাবারে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট আছে। স্বাদের লোভ দেখিয়ে কারিনার জায়গায় মর্জিনা গছিয়ে দেয় এ ওদের কে বোঝাবে।

নিজেকে প্রবোধ দিতেই আমি অফিসের পর কিংবা অফিসের ফাঁকে লেকের এই নির্জন জায়গাটায় এসে বসি। এখানে বসে বসেই ছক করি কিভাবে একদিন কোনো ঝুট ঝামেলা ছাড়া এই পানিতে ডুবে যাব। সচরাচর এখানে কেউ এসে বসে না। আসলেও এই ভর সন্ধ্যায় পাঞ্জাবি পরে বাবু সেজে হাতে তারাবাতি, মরিচাবাতি নিয়ে কেউ আসেই না। তাহলে এ কে? মরিচাবাতিতে আগুন দিতে দিতে ছেলেটা বেশ দরাজগলায় গান ধরল—“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়”…

কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ডাক দিলাম, এই যে ভাই, শুনছেন?
ছেলেটার মুখটা এবার স্পষ্ট দেখতে পেলাম। এমন সুপুরুষ অনেকদিন দেখিনি। আমি হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছি। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ছেলেটা নিজেই বসা থেকে উঠে হেঁটে পাশে এলো। আমার দাদী বলতেন, রূপের মাইয়া ছিনাল, রূপের বেডা মাইগ্যা। এমন সুপুরুষের খুঁত খোঁজার চেষ্টা করলাম। পাশে বসতেই আগরবাতির গন্ধ টের পেলাম। খুব হালকা কিন্তু স্পষ্ট গন্ধ। আগরবাতি তো কেউ গায়ে মাখে না। তার মানে দীর্ঘক্ষণ আগরবাতির পাশ থেকে উঠে এসেছে। মসজিদে গিয়েছিলেন? জিজ্ঞেস করেই জিভ কাটলাম। মসজিদে কেন আগরবাতি জ্বালাবে। তিনি মিষ্টি করে হেসে জবাব দিলেন, না কবরস্থান থেকে এলাম।

এবার আমার চমকাবার পালা। দুটো কারণে চমকেছি। প্রথমত এই সুপুরুষের কণ্ঠও তার চেহারার মতো বিস্ময়কর সুন্দর। আর কবরস্থান থেকে কেউ ফিরে এত আনন্দিত কাউকে হতে দেখিনি। দীর্ঘদিনের শত্রুর কবর জিয়ারত করে থ্রিলার বইয়ের প্রতিশোধকামী নায়কের মতো হাসি দেখলাম তার মুখে।
আমি জানতে চাইলাম, কে মারা গেছেন?
তিনি বললেন, আমার স্ত্রী
: ওহ, স্যরি।
: আরে আপনি স্যরি বলবেন কেন?
: আসলে আপনজনের মৃত্যুতে কী বলতে হয় আমি জানি না।
: সবকিছু কি জানতে হয়? আর যাই হোক স্যরি হয়তো বলতে হয় না।
: কবে মারা গেছেন? প্রায়ই তার কবরে যান?

তার উত্তরে এবার আমার চমকাবার পালা—
সে জবাব দিল, আজ ভোরে মারা গেছেন। তার মৃত্যু উদযাপন করতেই এই জায়গাটা বেছে নিয়েছি। এই জায়গাটায় কেউ থাকবে না মনে হচ্ছিল। কিন্তু আপনি এসে গেছেন। আমি শরীফ, আপনি?

আমি একটা কাষ্ঠের হাসি দিলাম। এতটাই শুষ্ক হাসি যে তেষ্টা পাচ্ছে। পানি না খেলে যেন মরেই যাব। আমি এখানে প্রতিদিনই আসি, সেটা বললাম তাকে। দিনের একটা সময় আমার কিছু ভালো লাগে না, কাউকে ভালো লাগে না, হয়তো বিষণ্নতার কারণে। তাই কিছুটা সময় একা কাটাতে আমি এখানে আসি।

ছেলেটা এবার হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসিতে তাচ্ছিল্যের সুর খুব প্রকট। আমায় পালটা প্রশ্ন করল, এত বিষণ্নতা কেন? বউ মরে গেছে? সংসারে কেউ নেই? কাউকে পাননি? কেউ ঠকিয়েছে? দীর্ঘদিন একটা ভালো সেক্স করা হয় না? টাকা-পয়সার অভাব? কারো জন্য এমন বাজি ধরেছেন যে নিঃস্ব হয়ে গেছেন?

হড়বড় করে এত প্রশ্ন আমাকে কোনো ইন্টারভিউতেও কেউ করেছে কিনা মনে পড়ছে না।

আমি সবেগে মাথা নাড়লাম। এসব কিছুই আমার সঙ্গে ঘটেনি। আমার শুধু মরে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেটা এই অচেনা ভীষণ সুখী তরুণকে বলতে ইচ্ছা করতেছে না। ছেলেটাকে খুব সেলফিশ মনে হলো। তার সঙ্গে আলাপ না করাটাই সমীচীন মনে করেও জানতে চাইলাম, আপনার সঙ্গে ঘটেছে এই ঘটনাগুলো?

ছেলেটা মোবাইল আনলক করে সময় দেখে নিয়ে জানতে চাইল, শুনতে চান কী ঘটেছে? সময় আছে?

আমি মাথা নাড়লাম। পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবান একজন পুরুষের জীবনের গল্প মুগ্ধ হয়ে শোনার চেষ্টা করছি। ছেলেটা বলতে শুরু করেছে—

আমার স্ত্রী তৃষাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। প্রেম করলে যা হয়, মেয়ের বা ছেলের সকল যোগ্যতা থাকার পরেও সে পরিবারে নানা কারণে অচ্ছুত হয়ে ওঠে। তৃষারও তেমনটাই ঘটেছিল। তৃষার তিনকূলে কেউ ছিল না। সে খুব প্রেমিকা মেয়ে ছিল। মফস্বলের একটা সাধারণ অনার্স মেয়ের এত স্মার্টনেস আর এত প্রেম কোথা থেকে এসেছিল জানি না। আমি তখন বিসিএস পাস করেছি মাত্র। নওগাঁয় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ হয়েছে আমার। মুক্তির মোড়ে আমার অফিস স্টাফরাই আমার জন্য বাসা ঠিক করল। সে কী দুর্বিষহ জীবন। সারাজীবন ঢাকা শহরে মায়ের কোলে বড় হওয়া ছেলে আমি। এমনকি বিসিএসের রিটেন পরীক্ষার সময়গুলোতেও আমার মা আমার হলের সামনে বসে থেকেছেন। আমার বন্ধু-বান্ধব বেশ হাসাহাসি করলেও আমি মায়ের এই কাজগুলোকে কখনোই বাধা দিতাম না। আমার মেঝখালা শুধু বলতেন বড় আপা তুমি তো বুঝবা না এই ছেলেই তোমাকে এমন আঘাত দেবে, এত মা ন্যাওটা ছেলেরাই বড় বড় অন্যায় করে। তুমি মিলিয়ে নিও।

আমিও তাই করেছিলাম তৃষাকে বিয়ে করে। তৃষার আগমণ খালার ভবিষ্যত বাণীকে সত্য করল। আমি তৃষাদের পাশের বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম, চাচা-চাচীদের সংসারে আশ্রিত। আমার রান্না-খাবারটা ওদের বাড়ি থেকেই আসত। তৃষার তখন ২১ বছর বয়স। আমার দুর্বিষহ মফস্বল শহরে স্বপ্নের মতো হয়ে এলো সে।

শরীফের মফস্বলের দুর্বিষহ জীবনের কথা শুনে আমার ঢাকা শহরের দুঃসহ প্রতিদিন চাগাড় দিয়ে উঠল। এই শহরে মানুষ থাকে? শীতকালে শীত নেই, কিন্তু ধুলায় ধূসর চারিপাশ। অনেকক্ষণ ধরে মশা পিন পিন করছে কানের কাছে। শরীফের সেসব দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে একমনে বলে চলেছে—

সকাল আর রাতের খাবার গুছিয়ে আনত সে। যতক্ষণ না খেয়ে শেষ করতাম ততক্ষণ আমার ঘরে থাকত। আমার বিছানা গোছানো, কাপড় গুছিয়ে রাখার কাজ করত। আমি তখন খেয়ে নিতাম। এই সময়টায় ও অনেক গল্প করত। স্থানীয় একটা ডিগ্রি কলেজে অনার্স পড়ত। রাত-দিন এত কাজ করত, কিন্তু তার চেহারায় কোনো ক্লান্তি দেখিনি আমি, সৌন্দর্যের খামতি নেই। আমার ঘরে যখন ঘুর্ণি তুলে ঘুরে বেড়াত। আমি একদিন জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম, তোমার ভয় লাগে না? ও বিস্ময়ে জানতে চাইল, কিসের ভয়?

একা একটা পুরুষ মানুষের ঘরে তুমি এভাবে আসো সেই ভয় নেই তোমার? ওর উত্তর আমাকে বিস্মিত নয় অভিভূত করেছিল, বলা যায় তখনই প্রেমে পড়েছিলাম ওর।

তৃষা বলেছিল, বড়জোর আমার গায়ে হাত দেবেন, আমাকে ভোগ করবেন। আমার এই দেহ নশ্বর, তেমনটা কেউ করলে আমি গায়ে আগুন লাগিয়ে এই রূপ জ্বালিয়ে দেব। আগুন ছিল মেয়েটির চোখে।

কী ডাকসাইটে মেয়েরে বাবা। বলেই ফেললাম। শরীফ হেসে ফেলল। আমিও হাসতে হাসতে একটা মশা মেরে ফেললাম। এখানে বেশ মশা। কিন্তু এই মশাও এই ছেলেকে থামাতে পারছে না। কথা বলার নেশায় পেয়েছে তাকে—

…ছুটিতে ঢাকায় এসে আমি মাকে তৃষার কথা বললাম। মা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি তার কুচুমুচু বেইবি তার অবাধ্য হয়ে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়তে পারে। তৃষার ছবি দেখে অনেক খুঁত ধরার চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হলেন। শেষমেষ বের করতে পারলেন—তৃষা এতিম। বাবা-মা কেউ নেই। আমি শ্বশুড়বাড়ির কোনো আদর পাব না। আমার ছেলে-মেয়ে ভবিষ্যতে নানা-নানীর আদর পাবে না। আর কোনো মানুষের বাবা-মা ছোটবেলায় মারা যায়, যারা অভাগা। আমার মা তো জেনে শুনে তার সৌভাগ্যের বরপুত্র ছেলের জন্য এমন অভাগা মেয়ে আনতে পারেন না। কোনো মানুষের এতিম হওয়াটা যে দোষের হতে পারে সেটা সেদিনই জানলাম। আমি আগেই আপনাকে বললাম আমি ভীষণ মা ন্যাওটা। বাবার কোনো ভূমিকাই নেই আমার জীবনে। আজকের আমি এই মায়ের জন্যই। জেদ চেপে গেল। নিজের অজান্তেই আমার সামনে মা আর তৃষা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল। মা আমার সঙ্গে নওগাঁ যাওয়ার জেদ করলেন। আমি মাকে ফেলে একাই ফিরে এলাম। ফিরে এসে তৃষার পরিবারকে জানালাম বিয়ে করতে চাই তাদের মেয়েকে। তৃষার চাচা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। কেবল উচ্ছল তৃষাকেই দেখলাম কেমন একটা মিইয়ে যেতে। মুচমুচে মুড়িতে যেমন দুধ ঢেলে দিলে নেতিয়ে পড়ে, ঠিক তেমন বিষণ্ন হয়ে পড়েছিল তৃষা। আমি ভাবলাম বাবা-মায়ের কথা মনে পড়েছে। তৃষার সেই বিষণ্নতার রহস্য উদ্ধার করি আমাদের বিয়ে তিন বছর পর।

এক সপ্তাহের মধ্যে খুব অনাড়ম্বর আয়োজনে আমার আর তৃষার বিয়েটা হয়ে গেল। বাবা এসেছিলেন আমাদের দোয়া করতে। বিয়ের খবরে আমার মা শয্যা নিলেন। আমি তৃষাকে নিয়ে মাকে দেখতে গেলে মা তাকে ঘরে ঢুকতে দিলেন না। আমার স্ত্রীকে অপমান মানে আমাকে অপমান করা। আমি সে রাতেই ফিরে আসি। সেদিনও মা খুব কাঁদছিলেন। বারবার বলছিলেন অলক্ষ্মী মেয়ে এনেছি এই বাড়িতে। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। মায়েদের অভিশাপ বোধ হয় লেগে যায়।

আমি তখন সুখের সমুদ্রে। জীবনে পরিবর্তন বলতে তৃষা আমার ঘরে খাবার নিয়ে এসে রাতে চলে যায় না, আমার চারপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকে। দাম্পত্য সম্পর্কে সুখী হতে যা যা লাগে সব কিছু দিয়েই সে আমাকে সুখী করেছিল। উই হ্যাড গুড সেক্স, অ্যাক্সিলেন্ট মেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট। এত সুখের মধ্যেও ওর চোখের তীব্র বিষণ্নতা আমার চোখে পড়ত। ওকে জিজ্ঞাসা করলেই বলত মায়ের অভিশাপ ও নিতে পারেনি। ভয় লাগে ওর।

আমার জীবনের আর সব সত্য ঘটনার মতো ভয় সত্য হয়ে এলো। আমরা সেদিন রাতে সিনেমা দেখে ফিরছিলাম। আমাদের বাড়িতে আসার আগে একটা অন্ধকার গলি আছে, সেদিন সন্ধ্যায় কারেন্ট ছিল না। তিনজন লোক আমাদের ওপর হামলা করে। অন্ধকারে একদম বুঝতে পারিনি ওরা কারা। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। সারাদিন নানান মামলা মোকদ্দমা হ্যান্ডেল করি। তারাই কেউ আক্রমণ করেছে। মফস্বলের লোকেরা ভীষণ প্রতিশোধপরায়ণ বলেই জেনে বড় হয়েছি আমি। ওদের কেউ একজন আমাকে আঘাত করতে চাপাতি নিয়ে আসছিল। সে সময় তৃষা আমার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলাফল তৃষার মাথায় তীব্র আঘাত। তৃষা লুটিয়ে পড়তেই ওকে মারলি কেন, ওকে মারলি কেন বলতে বলতে তিনজনের সেই দলটা ছুটে পালিয়ে গেল। তৃষাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে সদর হাসপাতালে ছুটলাম। সেখান থেকে ঢাকায়। অ্যাম্বুলেন্সে করে তৃষাকে নিয়ে ছুটছি। আমার সারা গায়ে রক্ত। কী বিচ্ছিরি হয় রক্তের গন্ধ। জানি না ওকে বাঁচাতে পারবো কিনা। ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে প্রথম মনে হলো মাকে ফোন দিতে হবে। হাসপাতালে ডাক্তারদের জিম্মায় তৃষাকে দিয়ে আমার সঙ্গে আসা সহকর্মীর ফোন থেকে মাকে ফোন দিলাম। আমার বা তৃষার ফোন কোথায় পড়েছে জানা নেই। মা এলেন। খুব শান্ত হয়ে সব ঘটনা শুনলেন। তৃষা তখন আইসিইউতে। ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে আমার সঙ্গে আইসিউতে ঢুকলেন মা। অচেতন তৃষার গায়ে হাত রেখে বললেন, তুমি আমার খোকাকে বাঁচিয়েছো। আমিও তোমায় বাঁচাব।

এটুকু বলেই থামল শরীফ। তার চোখ চিকচিক করছে। চোখে পানি।
আমি কাঁধে হাত রেখে বললাম, প্রকৃতি কী অদ্ভুত মিলিয়ে দেয়, তাই না?
: হ্যাঁ দেয়। তবে জীবিতের সঙ্গে মৃতকে মিলিয়ে দিয়ে কী লাভ হয় আমার জানা নেই।
: আপনার স্ত্রী সেদিন মরে গিয়েছিল? তবে আজ কে মারা গেলেন?
: আজ তৃষা আনুষ্ঠানিকভাবে মারা গেছে, যে মৃত মানুষকে আমি কবরে নামিয়ে দিয়ে আসতে পেরেছি। সেই আঘাতে তৃষার ব্রেন ডেড হয়ে যায়। বেঁচে থাকা মানুষ কিচ্ছু করতে পারবে না, কিচ্ছু শুনবে না, বলবে না, হাত পা নাড়াতে পারবে না। পারার মধ্যে শুধু যদি আমরা খেতে দিই তবে খেতে পারবে, কখনো ভোকাল কাজ করলে শব্দ বের হবে কিছু, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার কোনো কাজ রইল না। সাড়ে তিনমাস তৃষাকে এই হাসপাতাল থেকে সেই হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছি। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, এভাবেই বেঁচে থাকবে তৃষা।

একটা সময় ভীষণ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। তৃষাকে আমি হাসপাতালে রাখব নাকি বাসায়। মা সিদ্ধান্ত নিলেন তৃষাকে নিয়ে বাসায় ফিরবেন তিনি। তার সন্তানকে রক্ষাকারী এই তরুণীকে তিনি কথা দিয়েছিলেন যে বাঁচাবেন। আমার জীবন ঋণ শোধ করতে মা তৃষাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ফেরার আগে সব ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে হাসপাতালের বিছানা, হুইল চেয়ার কিনলেন তিনি। আমার ঘর একটা হাসপাতাল হয়ে গেল। স্যালাইন স্ট্যান্ড, ক্লিনিক্যাল প্ল্যাম্পার্স, ক্যাথেটার, অষুধের তীব্র গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো অ্যান্টিবেডসোর ক্রিম। আমাদের একটু অযত্নে পচে যেতে পারে তৃষার শরীর। মাত্র দেড়মাস সংসার করেছিলাম ওর সঙ্গে। কী নরম মাখনের মতো শরীর, কী আদর কাঙাল একটা মেয়ে ছিল। ওর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ চিনে নিয়েছিলাম আমি। আজ আমার সামনে সে একতাল কাদা হয়ে পড়ে আছে। একটা প্রায় মৃতদেহ। কিন্তু কী অদ্ভুত সুন্দর সেই শরীর।

তৃষার দেখাশোনার জন্য মা একজন নার্স ঠিক করেন। নার্স আর মায়ের জিম্মায় তৃষাকে দিয়ে আমি দীর্ঘ চারমাস পর কাজে জয়েন করি। নওগাঁ থেকে আমাকে স্ট্যান্ড রিলিজ দেওয়া হয় নিরাপত্তার খাতিরে। আনুষ্ঠানিকতার খাতিরেই আমার সহকর্মীরা একটা হত্যাচেষ্টা মামলা করে। সেটায় সাক্ষ্য দিয়ে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। সন্দেহভাজন কাউকেই পাওয়া যায় না।

সারাদিন কাজ করি, রাতে তৃষার পাশে, বসে শুয়ে গল্প করি। অনেক গল্প। শুধু সে জবাব দেয় না। মাঝে মাঝে অক্সিজেন আর রাইস টিউবের নল খুলে আমি চুমু খাই। কেউ আমায় পালটা চুমু দেয় না। তৃষার নরম পেলব বুকে নাক ডুবিয়ে আমি শুধু বেডসোর ক্রিমের গন্ধ পাই, অষুধের গন্ধ পাই। কখনো কখনো ভীষণ ঘেন্না লাগত। কখনো পাগলের মতো তাকে চাইতাম। মানুষ তো আমি পুরুষ মানুষ।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শরীফের কথা শুনছি। কোনো পুরুষের এত সরল স্বীকারোক্তি আমি শুনিনি। একটু করে বাতাস বইছে, বেশ ঠান্ডা লাগতে শুরু করছে। সব উপেক্ষা করে আমি এই ছেলেটার গল্প শুনছি।

তৃষার সঙ্গে সারাদিন কী হলো তার গল্প করা আমার একটা নেশার মতো হয়ে গেল। রাতে ওর সঙ্গে আমিই থাকা শুরু করলাম। নার্সের কাছ থেকে শিখে নিলাম ওকে খাইয়ে দেওয়া, পোশাক পালটে দেওয়া। ওকে পরিচ্ছন্ন করে দেওয়া।

একদিন এক বন্ধু এলো বাসায়। তৃষার কথা একটু আধটু শুনেছে। সামনাসামনি আমার সেবা করা দেখে সেটি ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। ব্যাস আর যায় কই। আকাশে-বাতাসে আমার আর মায়ের স্তুতি। মৃতপ্রায় একজন মানুষকে আমরা কী অসীম ভালোবাসা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। বড় বড় টিভি চ্যানেল, পত্রিকা থেকে লোক আসতে লাগল আমাদের বাড়িতে। আমার ভালোবাসার গুণকীর্তন হতে লাগলো পত্র-পত্রিকায়। একজন লেখক আমাদের গল্প নিয়ে বই লিখলেন, উৎসর্গ করলেন আমাদেরকে। উৎসর্গপত্রে লিখলেন, ভালোবাসার অমর জুটি তৃষা-শরীফকে।

এভাবে কেটে গেল তিনটা বছর। আমি ভুলেই গেছিলাম আমার মা আমাদের অভিশাপ দিয়েছিলেন। আমি এখন ফেসবুক সেলেব। তৃষার মাথার কাছে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে থাকি। ইনবক্সে আসা নানা প্রশ্নের উত্তর দিই। কতজন ভালোবাসার কথা জানতে চায়। সরকারি কেরানি আমি ভালোবাসার বাণী বিলিয়ে যাই। অজানা-অচেনা মানুষের কৌতূহল মেটাতেই নিত্য ইনবক্স, আউটবক্স সব চেক করি।

একদিন আউটবক্সে একটা ম্যাসেজ এলো। ফেইক একটা আইডি থেকে। কোনো পরামর্শ চেয়ে বা ভালোবাসার স্তুতি গেয়ে নয়। চরম সত্য ভালোবাসার গল্পটা জানাতে। সেই ম্যাসেজে লেখা ছিল—“আপনি তৃষাকে এতটা ভালোবাসবেন আমার কল্পনাতেও ছিল না, আমি ক্ষমা চাইতে লিখছি আপনাকে। তৃষা আসলে আমায় ভালোবাসত। আমাদের পালিয়ে বিয়ে করার কথা ছিল। কিন্তু আপনি ম্যাজিট্রেট হওয়ায় সেই সাহস করিনি, একবার তৃষা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। সেটি তাকে করতে দিইনি। আপনার সঙ্গে বিয়ের পরও আমাদের দেখা হয়েছে, ভালোবাসা হয়েছে। আমরা দুজনে মিলেই ঠিক করি, আপনাকে খুন করে আমরা পালিয়ে যাব। গোপনে সব গুছিয়ে রেখেছিলাম। তৃষা যদি সামনে এসে আপনাকে না বাঁচাত তাহলে সেদিন আপনি মরে যেতেন, তৃষা কেন আপনাকে বাঁচাল জানি না, হয়তো আপনাকে সে ভালোবেসে ফেলেছিল।”

আইপি ট্রেস করে কিছুই ধরতে পারলাম না। পুলিশে বলব নাকি না, সেটি নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম।

সেদিন রাতে কেন জানি খুব বমি হলো। ঘেন্নায় বমি বুঝলাম, কিন্তু কাকে ঘৃণা করব বুঝতে পারলাম না। ঘরে দরজা আটকে মুখে কাপড় দিয়ে চিৎকার করে কাঁদলাম। আমার এক মন তৃষাকে তীব্র ঘৃণা করতে শুরু করে সেসময়, আরেক মন আমাকে বাঁচিয়ে দেওয়ার কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়ে। এই প্রথম আমি মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে গেলাম আমার জীবনের আরো একটি চরম সত্য। যাকে এত এত ভালোবেসেছি, তার এই দ্বিচারণ মা নিতে পারবে না। হয়তো মেরেই ফেলবে তৃষাকে। যত যা-ই হোক শেষ পর্যন্ত সেই তো আমায় বাঁচিয়েছিল।

তবে আমি আর লোক দেখানো বা মন থেকে কোনোভাবেই ভালোবাসতে পারছিলাম না তৃষাকে। কেমন অসহায় লাগতে শুরু করে আমার। সেসময় থেকে তৃষার শরীরও খুব খারাপ হতে শুরু করে। ভালোবাসার অভাবে চারাগাছ মরে যায়, আর সে তো জলজ্যান্ত মানুষ। সারাদিন আগলে রাখা সেই সুন্দর শরীরে ঘা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আজ সকালে সে মারা যায়। সে মারা যাওয়ার পর আমি এতটা নির্ভার হয়েছি, এতটা স্বাধীন হয়েছি যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না

শরীফ ছেলেটা কাঁদছে। এত সুপুরুষ মানুষের কান্না খুব কদর্য হয়। খুব বিশ্রি লাগে সে অনুভূতি। তবু আমার প্রশ্ন থেকেই যায়, আপনাকে বাঁচাতেই তো তৃষার এই পরিণতি, তবু এত খুশি হতে পারলেন আপনি?

শরীফ এবার হো হো করে হেসে ওঠে, পালটা প্রশ্ন করে, প্রাপ্তবয়স্ক একটা মানুষের পায়খানার গন্ধ সহ্য করেছেন কখনো? প্রস্রাবের কাপড় বদলে দিয়েছেন, বেড সোর হয়ে যাওয়া পিঠে মলম মালিশ করেছেন কখনো? নাকে দেওয়া রাইস টিউব থেকে ইনফেকশন হয়ে বিচ্ছিরি গন্ধের পুঁজ পরিষ্কার করেছেন কখনো? গলায় ফুটো করে খাদ্য নালীতে নল ঢোকানো সুন্দরী রমণীকে সহ্য করার গল্প শুনেছেন আগে কখনো?

আমার গা গুলিয়ে উঠল!

প্রতিদিন দুই থেকে তিন বা চার বেলা সেই পায়খানা পরিষ্কার করতাম আমি আর আমার মা, মানবসেবা আর ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপনের মোহে। কতদিন ভাতের থালা হাতে নিয়ে ফেলে রেখে উঠে পড়েছি। ভোকাল চলে যাওয়া একজন মানুষের জান্ত্যব গোঙানি শুনেছেন রাতের পর রাত? তখন আল্লারাখার সেতার বাজলেও অসহ্য লাগত। পুরুষ হয়ে শুধু সততার বিমূর্ত প্রতীক হতে আমি কোনো নারীকে স্পর্শ করিনি। আমার কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিয়েছি। আজ আমি সব থেকে মুক্ত। অষুধের গন্ধ থেকে, আমার নকল ভালোবাসার বেড়াজাল থেকে। আজ আমার স্বাধীনতা দিবস।

প্রায় নটা বেজে গেছে। ইদানীং আমার দেরি হলে টুবলুটা ভীষণ কাঁদে। ওর কথা মনে পড়তেই আমার চোখ জ্বালা শুরু হলো, যেন ছেলের শোকে আমি কেঁদেই ফেলব। শরীফ উঠে দাঁড়িয়েছে। তার ফোন বাজছে। রিসিভ করে খুব শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ মা আমি আসছি।

বিদায় নিয়ে একটু এগিয়ে এসে শরীফকে আবার ডাক দিলাম। ‘হ্যাপি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ বলে একটা হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলাম, ফের তাকালাম না, মুক্তি পাওয়া পুরুষের হাসি দেখতে আমার ভীষণ হিংসা হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;